
এলভিসের ছদ্মবেশে — পলি নেলসন অনুবাদে – হিরণ্ময় বসুমল্লিক
শুরু হল গল্প বিশ্ব। অর্থাৎ বিশ্বের নানা প্রান্তের লেখকদের গল্পের অনুবাদ। আজ পলি নেলসনের গল্প। পলি নেলসন (Polly Nelson) একজন মার্কিন আইনজীবী ও লেখক। তিনি ১৯৫২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় জন্মগ্রহণ করেন। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং পরে আইনশাস্ত্রে (J.D.) ডিগ্রি অর্জন করেন। আইনজীবী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় হলো কুখ্যাত ধারাবাহিক হত্যাকারী Ted Bundy-র মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে শেষ আইনি প্রতিরক্ষা দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করা। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি বান্ডির পক্ষে একাধিক আপিল ও আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা Defending the Devil: My Story as Ted Bundy's Last Lawyer তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি এনে দেয়। বইটিতে তিনি একজন আইনজীবীর নৈতিক দায়িত্ব, মৃত্যুদণ্ড, বিচারব্যবস্থা এবং একজন কুখ্যাত অপরাধীর সঙ্গে কাজ করার জটিল মানসিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত অকপটে তুলে ধরেছেন। বইটি আইন, অপরাধমনস্তত্ত্ব এবং নৈতিকতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু পলি নেলসনের পরিচয় কেবল আইনজীবী হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছোটগল্পও লিখেছেন। তাঁর রচনায় প্রায়ই ব্যঙ্গ, ব্ল্যাক হিউমর, মানব-মনস্তত্ত্ব এবং আমেরিকার ছোট শহরের সামাজিক বাস্তবতা স্থান পায়। "Impersonating Elvis" তাঁর অন্যতম পরিচিত ছোটগল্প। গল্পটিতে একজন ঈর্ষাকাতর, আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগা কথকের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ্য, ব্যর্থতা, আত্মপ্রতারণা এবং 'আমেরিকান স্বপ্ন'-এর ব্যঙ্গাত্মক রূপ ফুটে ওঠে। এলভিস প্রিসলির জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীককে ব্যবহার করে নেলসন এখানে মানুষের অহংকার, হিংসা এবং ভাগ্যের নির্মম পরিহাসকে হাস্যরসের মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। গল্পটির শেষের অপ্রত্যাশিত মোচড় তাঁর গল্প বলার দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
এটা এলভিস প্রিসলির গল্প নয়। এটা চাকি ওয়ালাচ, আমি আর চাকের স্ত্রী ক্যারলকে নিয়ে একটা গল্প। ক্যারলের আমার স্ত্রী হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু জীবনে সবকিছু যেমন হওয়া উচিত, তেমন তো আর হয় না। তাই শেষ পর্যন্ত সে আমার নয়, চাকের স্ত্রীই হলো।
সেন্টিমসন হাই স্কুল থেকে পাশ করার পরপরই ক্যারল গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল। সত্যি বলতে কী, অষ্টম শ্রেণির পর থেকে ক্যারল আর আমি একবারও ডেটে যাইনি। তবু আমি তাকে বিয়ে করতাম। যদিও তখন আমার হিসাববিজ্ঞানের কলেজে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা ছিল, আর এটাও জানতাম যে ওর গর্ভের সন্তান কোনোভাবেই আমার হতে পারে না। জুনিয়র হাই স্কুলেই আমি এমন ভদ্রলোক ছিলাম যে ওই ধরনের কিছু ঘটার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু চাকি ওয়ালাচ? ক্যারল নিজেই স্বীকার করেছিল বাচ্চাটা চাকের। তাই বিয়েটাও চাকই করল।
এই হলো চাক ওয়ালাচের সারকথা। আমি একে বলি—অন্যায় রকমের ভাগ্য।
সোফোমোর বছরে আমাদের সিনিয়র দলের কোয়ার্টারব্যাক তামারা নিউজোমের বাবার মাস্ট্যাং গাড়ির সামনের সিট টপকাতে গিয়ে কুঁচকিতে এমন টান খেল যে চারটে ম্যাচ খেলতেই পারল না। আর পুরো জয়ী মৌসুমের কৃতিত্বটা গিয়ে জুটল কার? চাকি ওয়ালাচের। বছরের শেষে স্টিমসন হাইয়ের মিউজিক্যালে বলিষ্ঠ চেহারার নায়ক দরকার হলো। পিটি বয়েড বিসলি ল্যারিঞ্জাইটিসে পড়ে যাওয়ায় আমার বদলে ভূমিকাটা পেল কে? চাকি ওয়ালাচ।
ভুল বুঝবেন না। মানতেই হবে, তখন থেকেই ওর গলায় একটা আলাদা ব্যাপার ছিল। গভীর, টেনে টেনে গাওয়া, একটু জড়ানো স্বর—যেন মুখে এমন কিছুর স্বাদ লেগে আছে, যার নাগাল আমাদের বাকিদের কোনোদিনই মিলবে না। চাক সবসময় মেয়েদের পেত। এমনকি ক্যারলকেও। আমার বক্তব্য এখানেই শেষ। মেয়েদের ভোটেই সে ক্লাস প্রেসিডেন্টও হয়েছিল। ওর নির্বাচনী স্লোগান হওয়া উচিত ছিল—’মগজের চেয়ে পেশি’। আঁটসাঁট জিন্স আর হাঁসের লেজের মতো পিছনে আঁচড়ানো চুল—এই ছিল ওর আসল যোগ্যতা।
যাই হোক, এসব ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে। এখন আমি পরিণত মানুষ। ক্ষমা করতে শিখেছি, ভুলতেও শিখেছি।
তবে…
হাই স্কুলের ঠিক পরেই ক্যারলের সেই সামান্য অসাবধানতার জন্য চাকের বাবা ছেলেকে পারিবারিক ব্যবসায় নিয়ে গিয়ে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ বানিয়ে দিলেন। আর আমি কলেজে গেলাম। বেশ ভালোই চলছিল। তারপর বাবা গম কাটার কম্বাইন মেশিনে পা এমনভাবে কেটে ফেললেন যে প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, আর মা শূকর খামারিদের এক বিরল রোগে আক্রান্ত হলেন। বাধ্য হয়ে আমাকে বাড়ি ফিরতে হলো।
স্টিমসনের মতো জায়গায় খামারের বাইরে কাজ বলতে একটাই—ওয়ালাচ স্কুল বাস বডি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট।
আমি নিজেকে কোনো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বলে চালাতে চাই না। কারণ আমি তা নই। কিন্তু সংখ্যার ব্যাপারে আমার হাত ভালো। স্টিমসন হাইয়ের খেলায় স্কোরবোর্ড চালানোর সময় থেকেই চাক সেটা জানত। তার ওপর আমি কমিউনিটি কলেজে চারটিরও বেশি কোর্স শেষ করেছিলাম। তাই ওয়ালাচ বাস কোম্পানি আমাকে সরাসরি ইনভেন্টরি বিভাগের প্রধান করে দিল।
সাধারণ মানুষ জানেই না একটা স্কুল বাসের গায়ের কাঠামো বানাতে কত কিছু লাগে। শুধু বাচ্চাদের মাপের গদি-লাগানো ধাতব আসন, হলুদ রং আর বড় বড় লাল-হলুদ ফ্ল্যাশার লাইট হলেই তো বাস হয় না। বাইরে থেকে ভাঁজ করা সামনের দরজা খোলার মধ্যেও এমন এক ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল আছে যে—
না, এটাও স্কুল বাসের নকশা বা তৈরির গল্প নয়।
এটা চাকের এলভিস সাজার গল্প।
হয়তো চাক আমার চেয়ে অনেক আগে থেকে কোম্পানিতে আছে বলেই এমন হয়েছে। কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ওর আর বাস তৈরির ব্যবসায় তেমন কোনো আগ্রহই নেই। গত এক বছর ধরে কার্যত আমিই পুরো কারখানা চালাচ্ছি। কিছুটা কারণ আমি ওর চেয়ে ভালো পারি, আর তার চেয়েও বড় কারণ—চাকি ওয়ালাচ বিশ্বাস করে, সে এলভিস হতে পারে।
ও জুলপি রেখেছে। আমি যেমন স্বাভাবিকভাবে চুল পেকে যেতে দিয়েছি, সে তেমন করেনি। বরং পুরো মাথা কুচকুচে কালো রং করতে শুরু করেছে। দেখলেই ঘেন্না লাগে। শুধু ফুলে ওঠা পম্পাডুর চুল বা গালের সস্তা জুলপির কথা বলছি না। বলছি সেই বুকের লোমের গোছাগুলোর কথা, যেগুলো শার্টের খোলা ‘ভি’ গলা দিয়ে বেরিয়ে থাকে। ও হ্যাঁ, চাকের বাবা দুই বছর আগে ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর থেকেই চাক অফিসে টাই পরা ছেড়ে দিয়েছে। এখন সে নিজেই চালকের আসনে বসে আছে বলেই এসব কাণ্ড করে পার পেয়ে যায়।
এ বছরের কোম্পানির পিকনিকে চাক হাজির হলো সাদা-সোনালি লামে কাপড়ের পোশাক পরে, সঙ্গে তিনজন ব্যাক-আপ গায়িকা আর পুরো একটা ব্যান্ড। আমার তো সন্দেহ, ওই পোশাকের ভেতরে স্প্যানডেক্সের বডি-সাপোর্টও ছিল। কারখানার শ্রমিকরা হাততালি দিয়ে পাগল। দাঁড়িয়ে অভিবাদন পর্যন্ত দিল। কিন্তু তাতে কী? বছরের দুইশো একষট্টি দিন-দেড়েক তো ওদের ওই লোকটারই অধীনে কাজ করতে হয়। পাঁচ বছর চাকরি হলে অবশ্য তিন সপ্তাহ ছুটি মেলে।
আর ক্যারল!
সে এসেছিল ছোট্ট এক ফ্লেয়ার-স্কার্ট পরে। চারপাশে যেন জালের মতো নরম কাপড় উড়ছে। মঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে ওসব বেশ মানায়, কিন্তু নিচে দাঁড়িয়ে চোখে পড়লে ভেতরের খোলা কাঠামোটা বেশিই চোখে লাগে। সেও চাককে উৎসাহ দিল। অবশ্য দিতেই হবে। লোকটার সঙ্গে তো তাকে বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই থাকতে হয়, কোনো পরিকল্পিত ছুটি ছাড়াই।
তবু ক্যারল এখনও অসাধারণ সুন্দরী। চল্লিশ পেরোনো সব নারী পুডল স্কার্ট আর প্লাটিনাম রঙের উল্টে-দেওয়া চুল এত আভিজাত্যের সঙ্গে বহন করতে পারে না। চাকি ওয়ালাচের চেয়ে তার রুচি অনেক উঁচু। আর সে যখন মঞ্চের নিচে ঝুঁকে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি ওর ব্যক্তিগত টেবিলে গিয়ে দুপুরের খাবার খাব, তখনই বুঝলাম—অবশেষে চাক নামের ওই ফাঁপা মানুষটাকে সে সহ্য করতে পারছে না। একই সঙ্গে এটাও বুঝলাম, আমাদের দুজনের শূন্য, ব্যথায় ভরা জীবনকে আমরা কতটা পরিপূর্ণ করে তুলতে পারি।
সেই মুহূর্তেই আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা এল।
আমি আগেই জানতাম, মার্চ মাসে চাক এলভিস-সদৃশ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন ফি জমা দিয়েছে। চাকি ওয়ালাচ একা নয়; পৃথিবীতে আরও অনেক মানুষ আছে যারা ভাবে তারা এলভিসের মতো দেখতে। হিসেবমতো আরও একশো ছত্রিশজন মুস মাখা চুলওয়ালা বোকা সেই একই ধারণা পোষণ করে। অর্থাৎ এ ছিল এলভিসদের যুদ্ধ। এলভিসরা? এলভিসগণ? যাই হোক।
আমি বহু বছরের জমে থাকা আঠারো সপ্তাহেরও বেশি ছুটির মধ্যে থেকে দু-সপ্তাহ ওই প্রতিযোগিতার সময় নিলাম। কিনলাম অস্থায়ী কালো চুলের রং, আর একটা ছোট নলওয়ালা ‘স্যাটারডে নাইট স্পেশাল’ রিভলভার—জীবনের শেষ দিকে এলভিস যেমন পছন্দ করত। প্রতিযোগিতার হোটেলেই একটা ঘর বুক করলাম। তবে নিজের আসল নামে নয়। আর প্রতিযোগিতাতেও নাম লিখলাম না।
পরিকল্পনাটা ছিল দারুণ। প্রায় নির্ভুল।
একবার কল্পনা করুন—পুলিশ খুঁজছে এমন এক এলভিস-খুনিকে, যে দেখতে এলভিসের মতো। আর সেই শহরে একশো সাঁইত্রিশজন এলভিস ঘুরে বেড়াচ্ছে। কে কাকে চিনবে? কে বর্ণনা দেবে?
আমাকে লুকোতেও হয়নি।
আমি সোজা এলভিস গ্র্যান্ড বলরুমে ঢুকলাম, বন্দুক বের করলাম, আমার এলভিসকে গুলি করলাম, বন্দুকটা ফেলে রেখে বেরিয়ে এলাম। অন্য এলভিসদের কোমর দোলানোরও সুযোগ হলো না।
তারপরই বিমানে চেপে স্টিমসনে ফিরে এলাম। মাথার মধ্যরাত-নীল পম্পাডুর ধুয়ে ফেললাম। আর পরদিন সকালে যথারীতি অফিসে হাজির।
গিয়ে দেখি—চাকি ওয়ালাচ দিব্যি বসে আছে।
এলভিস সাদৃশ্য প্রতিযোগিতায় তৃতীয় রানার-আপ হয়েছে।
ছুটি কাটিয়ে কেনোশা থেকে ফিরলাম কি না, সে প্রশ্ন কেউ করল না। সবার চোখ বরাবরের মতোই চাকের দিকেই।
চাক তো খবরের ঝুলি খুলে বসল। জানা গেল, যে ‘দ্বিতীয় সেরা এলভিস’ খুন হয়েছে, সে নাকি তিন-তিনটি আলাদা রাজ্যে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের জন্য ওয়ান্টেড ছিল। যে গুলিতে লোকটা মারা গেছে, সেটাই নাকি ভাগ্যবান চাককে সামান্য ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। ফলে চাক এখন গোটা ঘটনার নায়ক। সব কাগজে ছবি, জাতীয় সংবাদে সাক্ষাৎকার। যাদের একটু বুদ্ধি থাকার কথা, তারাও ওকে প্রায় সুপারস্টারের মর্যাদা দিতে শুরু করেছে।
বিশেষ করে ক্যারল।
এমনকি সে-ই আবার আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি ওদের বিমানবন্দর পর্যন্ত গাড়ি করে পৌঁছে দেব?
শুনলাম, এলভিস প্রতিযোগিতার সেই হোটেল এত প্রচার পেয়েছে যে, নায়ক চাক আর তার আরাধ্য স্ত্রীকে এক সপ্তাহের জন্য তাদের ‘হার্টস-বুকে হানিমুন স্যুট’-এ বিনা খরচায় থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

