
মোস্তাক আহমেদ-এর গুচ্ছ কবিতা
এক অদৃশ্য আলোর কাছে
তোমাকে ভালোবেসে জেনেছি—
সম্পর্কেও থাকে গোপন আগুন;
স্বচ্ছতার অতলে অন্তর্গত দহনের ইতিহাস।
তোমাকে ভালোবেসে জেনেছি—
অন্ধকারও আনে আত্মগত সুখ;
একটি স্বপ্ন সারারাত জোনাকি কুড়োয়।
আমার ব্যর্থতা, বেসুরো গান, ভাঙনের অসুখ—
তোমার দিকে এগিয়ে গেছে সন্তর্পণে।
তোমার নীরবতা নরম রোদের মতো,
স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে বৃক্ষ, পাতা, ফুল— অন্তর্গত যন্ত্রণা।
এক অদৃশ্য আলোর কাছে শুধু নতজানু হয়ে বসি।
তোমাকে ভালোবেসে জেনেছি—
আলো কখনো সম্পূর্ণ নেভে না;
ক্রমাগত জ্বলে থাকাও তার স্বভাব নয়।
উদাস স্পর্ধায় চেয়ে থাকি অনন্তের দিকে…
শুশ্রূষা
কোথাও কোনো রং নেই—
আলো খুলে রাখে তবু অদৃশ্য প্যালেট,
বাতাসের গায়ে ভেসে আসে
অপরিচিত সুরের পরাগ।
কেউ একজন
ক্ষতের উপর রেখে যায়
রামধনুর শীতল ছায়া।
সংশয়
পাখির পালকে
ভোরের আভা মেখে
আবার উড়তে শেখে।
আশ্রয়
শক্তি রূপ বদলায়।
একটি শব্দ
আর-একটি শব্দের ভিতর
অদৃশ্য আলো হয়ে বেঁচে থাকে।
ভালেরি একদিন
সমীকরণের দিকে ফিরে গেলেন।
বিনয় একদিন
সমীকরণ থেকে কবিতার দিকে।
অদৃশ্য অনুপাতে মিলে যায়
বৃত্ত, রেখা, নক্ষত্র, হৃদয়।
শব্দহীন সংলাপ
শস্য-পল্লবিত প্রকৃতির সাথে একসূত্রে বাঁধা—
শিরায় শিরায় ক্লোরোফিলের গোপন অনুরণন,
প্রতিদিন হাওয়ার সঙ্গে শব্দহীন সংলাপ,
তাতেই লেখা হয় আমাদের চুক্তিপত্র।
নদীর প্রতিটি বাঁকে প্রতীক্ষা বসে থাকে,
নিভৃত আলোয় গড়া এক আত্মঘন সম্পর্ক;
শস্যভরা মাঠের গন্ধে জেগে ওঠে স্মৃতি,
মাটি ছুঁয়ে থাকে শিরার গভীরে স্নিগ্ধতা।
নৈর্ব্যক্তিক শুদ্ধি
নতজানু বোধে আত্মধিক্কার
নিজেরই ছায়ার কাছে
একটু একটু করে পরাজিত মানুষ
একদিন আবিষ্কার করে—
অন্ধকার তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি।
সমস্ত উচ্চারণের আগে
এক দীর্ঘ নীরবতা থাকে।
সমস্ত বিশ্বাসের আগে
অসংখ্য সংশয়ের বীজ।
সেই বীজই একদিন
আলোর প্রথম ব্যাকরণ হয়ে ওঠে।
দোলাচল নয়— অন্তর্গত স্থিতি।
শূন্যের ভেতরে
নিঃশব্দে জেগে ওঠে ঢেউ;
নৈর্ব্যক্তিক উত্তাপে
ধুয়ে যায় পাপ।
শব্দেরা ছুঁতে শেখে অলৌকিক ভোর।
স্থবির বিস্তার
মোস্তাক আহমেদ
মাঠের হাওয়া, রোদে পোড়া মাটির গন্ধে
সে নিজের ভূখণ্ডের ভাষ্যকার।
পায়ের নিচে এখনও লেগে থাকে
অদৃশ্য ধুলোর সোহাগ।
কথার পিঠে কথা জমে,
প্রতিটি সম্বোধন
ফিরে ফিরে আসে।
কোথা থেকে এল এত বাড়িঘর,
এত মানুষ, এত পসরা!
এত বাজারের উজ্জ্বল আয়োজন!
হেঁটে চলে পরিব্রাজক।
কাঁধে তার সময়ের অবক্ষেপ।
আলাপের আঁচলে জেগে ওঠে
অতলের অশ্রুত শব্দ।
সভ্যতা কেবল
নিজের স্থবিরতাকেই
চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।
নির্বিকল্প অভিঘাত
মোস্তাক আহমেদ
বোধের তন্তুসমবায়ে ক্রমশ নিমজ্জন।
স্বাভাবিক বিশুদ্ধির ভেতর
উন্মোচিত হয় পরমের আভাস;
অনায়াস অবমর্শ স্পর্শ করে যায়
শিবত্বের নীরব দীপ্তি।
কোনো অভিমুখহীন চাঞ্চল্য নয়;
পক্ষহীন নিরাপদ দূরত্ব থেকে
কথারা ভেসে যায়।
ভাবনায়-চেতনায় ঘোর লাগে,
সত্যি বেঁচে থাকে অভিঘাতে;
ইতিহাসের চেয়েও সেসব পরম সত্যি।
শব্দ যখন আশ্রয়
আত্মজিজ্ঞাসার ক্ষত আরও রক্তাক্ত হয়।
দোলাচলের সঙ্গে সংঘাতে ক্লান্ত মানুষ
বুঝতে শেখে— সব ‘না’ মিশে থাকে স্পষ্ট উচ্চারণে।
চারদিকে অনিশ্চয়তার ধুলো, অভাবের দীর্ঘ ছায়া,
অসুস্থ শরীরের নিঃশব্দ প্রতিরোধ, অপূর্ণতার দহন,
অপারগতার বিপরীতে শব্দ জ্বালিয়ে রাখে
নিঃশর্ত দৃঢ়তার প্রদীপ।
অনুশাসনের দেয়ালে দেখা দেয় সূক্ষ্ম ফাটল।
আলো প্রবেশ করে, অরণ্য কেঁপে ওঠে।
দিগন্তের পর দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে
এক অদৃশ্য প্রতিধ্বনি।
যখন সমস্ত আশ্রয় ভেঙে যায়,
শব্দই নিঃশব্দে মানুষের পাশে এসে বসে।

