
অজাতশত্রুর আখ্যানের খোঁজে হিন্দোল ভট্টাচার্য
অনির্বাণ কুণ্ডুর ‘অজাতশত্রু’কে শুধু একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে পড়লে তার গভীরতাকে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। প্রাচীন মগধের রাজা অজাতশত্রুর জীবন, তাঁর পিতৃহত্যা, সিংহাসনের জন্য ক্ষমতার লড়াই, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, হিংসা, অপরাধবোধ এবং শেষ পর্যন্ত গৌতম বুদ্ধের কাছে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও উপন্যাসটির প্রকৃত বিষয় মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব এবং অপরাধের পর আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। অজাতশত্রু ছিলেন মগধরাজ বিম্বিসারের পুত্র। রাজ্য ও সিংহাসনের প্রতি তাঁর প্রবল আকাঙ্ক্ষা ক্রমে তাঁকে পিতার বিরুদ্ধেই দাঁড় করায় এবং ক্ষমতা দখলের জন্য তিনি পিতাকে বন্দি ও শেষ পর্যন্ত হত্যা করেন। কিন্তু যে সিংহাসনের জন্য এই নির্মমতা, সেই সিংহাসন অর্জনের পরও তাঁর ভিতরের অস্থিরতা দূর হয় না। বরং পিতৃহত্যার স্মৃতি তাঁকে ক্রমশ তাড়া করতে থাকে। এখানেই অজাতশত্রু চরিত্রটি নিছক একজন ক্ষমতালোভী রাজা থেকে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রে পরিণত হয়। তাঁর মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে ক্ষমতার উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের অপরাধ সম্পর্কে তীব্র যন্ত্রণা। তিনি একদিকে নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধি, অন্যদিকে সেই বাস্তবতারই শিকার। তাঁর বাহ্যিক সাফল্য এবং অন্তর্গত পরাজয়ের এই দ্বন্দ্বই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান শক্তি।
অনির্বাণ কুণ্ডু অজাতশত্রুর কাহিনিকে শুধু রাজপরিবারের ক্ষমতার সংঘাত হিসেবে দেখেননি; এর মধ্যে তিনি মানুষের চিরন্তন ক্ষমতালিপ্সা এবং তার মূল্যকে অনুসন্ধান করেছেন। ক্ষমতা মানুষকে অন্যের উপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ দেয়, কিন্তু সেই ক্ষমতা অর্জনের পথে মানুষ যখন সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং মানবিকতাকে বিসর্জন দেয়, তখন শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতাই তার কাছে এক ধরনের কারাগারে পরিণত হয়। অজাতশত্রুর ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। তিনি রাজা হন, কিন্তু নিজের অতীত থেকে মুক্ত হতে পারেন না। তাঁর পিতার মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক বিজয়ের ভিতরেই একটি স্থায়ী পরাজয়ের চিহ্ন হয়ে থাকে। এই দিক থেকে অজাতশত্রুর চরিত্রের সঙ্গে শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’-এর তুলনা করা যায়। ম্যাকবেথ যেমন হত্যার মাধ্যমে রাজক্ষমতা অর্জন করেও অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হতে পারেন না, অজাতশত্রুও পিতৃহত্যার পর নিজের বিবেকের কাছ থেকে পালাতে পারেন না। তবে অজাতশত্রুর কাহিনিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত মাত্রা রয়েছে—গৌতম বুদ্ধের উপস্থিতি। উপন্যাসে বুদ্ধ কেবল একজন ঐতিহাসিক ধর্মগুরু নন, তিনি হয়ে ওঠেন ক্ষমতা, হিংসা ও প্রতিহিংসার বিপরীতে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনদর্শনের প্রতীক। একদিকে রয়েছে রাজদণ্ড, সেনাবাহিনী, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই এবং রক্তপাত; অন্যদিকে রয়েছে করুণা, অহিংসা, সংযম এবং আত্মজিজ্ঞাসা। অজাতশত্রুর বুদ্ধের কাছে পৌঁছনো তাই কেবল একজন রাজপুরুষের ধর্মীয় আশ্রয় গ্রহণ নয়, বরং তাঁর অস্তিত্বের ভিতর একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা। যে মানুষ এতদিন অন্যকে জয় করার জন্য হিংসাকে আশ্রয় নিয়েছিল, সে শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের হিংসা, অপরাধবোধ ও অস্থিরতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়। এখানেই উপন্যাসটি রাজনৈতিক ইতিহাসের সীমা অতিক্রম করে একটি আধ্যাত্মিক ও অস্তিত্ববাদী উপন্যাসের রূপ নেয়। অজাতশত্রুর পিতৃহত্যাও তাই কেবল একটি রাজনৈতিক অপরাধ নয়; এটি তাঁর নিজের অস্তিত্বের উপর চাপিয়ে দেওয়া এক অনিবার্য বোঝা। পিতাকে হত্যা করে তিনি সিংহাসন পেয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের অতীত, নিজের নৈতিক সত্তা এবং নিজের শান্তিকেও হত্যা করেছেন। এই অপরাধবোধের প্রশ্নটি উপন্যাসের কেন্দ্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—অপরাধ করার পর কি মানুষ সত্যিই অতীতকে মুছে ফেলতে পারে? ক্ষমা কি অপরাধের স্মৃতি মুছে দেয়, নাকি মানুষকে সেই স্মৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকার নতুন পথ শেখায়? বুদ্ধের কাছে অজাতশত্রুর আগমন এই প্রশ্নগুলিরই দার্শনিক পরিসর তৈরি করে। বুদ্ধের দর্শন এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিপরীতে আত্মজয়ের দর্শন হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজা হওয়া মানে অন্যকে শাসন করা, কিন্তু বুদ্ধের শিক্ষা মানুষকে নিজের লোভ, ক্রোধ, হিংসা ও অহংকারকে শাসন করতে শেখায়। এই দুই ধরনের জয়ের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য, অজাতশত্রুর জীবন তারই নাটকীয় উদাহরণ। উপন্যাসটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইতিহাসের সঙ্গে সমকালের সম্পর্ক। প্রাচীন মগধের রাজনৈতিক সংঘাতকে সামনে রেখে লেখক আসলে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির দিকে তাকানোর সুযোগ তৈরি করেছেন। আড়াই হাজার বছর আগে যেমন ক্ষমতা দখলের জন্য ষড়যন্ত্র, হিংসা, রক্তপাত এবং সম্পর্কের বিশ্বাসঘাতকতা ঘটেছে, আধুনিক পৃথিবীতেও ক্ষমতার রাজনীতিতে সেই প্রবণতাগুলি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলেছে, রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে, সভ্যতার বাহ্যিক কাঠামো বদলেছে, কিন্তু মানুষের ক্ষমতালিপ্সা কি বদলেছে? ‘অজাতশত্রু’ এই প্রশ্নটিই পরোক্ষভাবে সামনে নিয়ে আসে।
সেই অর্থে ইতিহাস এখানে নিছক অতীতের পুনর্নির্মাণ নয়; ইতিহাস হয়ে ওঠে বর্তমানকে বোঝার একটি আয়না। অজাতশত্রু একদিকে নির্দিষ্ট সময়ের একজন রাজা, অন্যদিকে তিনি মানুষের ভিতরের এক চিরন্তন প্রবণতার প্রতীক—ক্ষমতা পাওয়ার জন্য সবকিছু বিসর্জন দেওয়া এবং পরে উপলব্ধি করা যে ক্ষমতা অর্জনের মূল্য হয়তো ক্ষমতার চেয়েও বড়। তাঁর ট্র্যাজেডি এই যে, তিনি বাহ্যিক পৃথিবীকে জয় করতে গিয়ে নিজের ভিতরের পৃথিবীকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। আর তাঁর মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই, যখন তিনি বাহ্যিক জয়ের পরিবর্তে নিজের অন্তর্জগতের দিকে তাকাতে শুরু করেন। এই কারণেই অনির্বাণ কুণ্ডুর ‘অজাতশত্রু’র মূল দ্বন্দ্বকে শুধু রাজনীতি বনাম ধর্ম বলে দেখলে যথেষ্ট হবে না; বরং এটি ক্ষমতা বনাম বিবেক, হিংসা বনাম করুণা, অপরাধ বনাম অনুশোচনা এবং বাহ্যিক বিজয় বনাম আত্মজয়ের দ্বন্দ্ব। উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই—মানুষ অন্যকে পরাজিত করে কত বড় রাজ্যই না জয় করতে পারে, কিন্তু নিজের লোভ, হিংসা ও অপরাধবোধকে পরাজিত করতে না পারলে সেই বিজয়ের মূল্য কতটুকু? অজাতশত্রুর জীবন এই প্রশ্নের এক মর্মান্তিক উত্তর। তাঁর যাত্রা তাই শুধু সিংহাসনের দিকে যাত্রা নয়; শেষ পর্যন্ত তা সিংহাসন থেকে আত্মজিজ্ঞাসার দিকে, হিংসা থেকে অহিংসার দিকে, ক্ষমতার মোহ থেকে অনুতাপের দিকে এবং বাহ্যিক জয় থেকে অন্তরের শান্তির দিকে একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই কারণেই ‘অজাতশত্রু’কে কেবল অতীতের রাজা ও রাজনীতির গল্প হিসেবে নয়, মানুষের অপরাধ, বিবেক, অনুশোচনা এবং মুক্তির চিরন্তন কাহিনি হিসেবেও পাঠ করা যায়।
সর্বোপরি অনির্বাণ কুণ্ডুর ‘অজাতশত্রু’-র যে দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হল এর গদ্যভাষা এবং কাহিনির বুনন। উপন্যাসটি ঐতিহাসিক বিষয় অবলম্বনে লেখা হলেও এর ভাষা নিছক ইতিহাসের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েনি। বরং প্রাচীন সময়কে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য লেখক এক ধরনের ঐতিহাসিক আবহময়, সংযত এবং দৃশ্যধর্মী গদ্যভাষা নির্মাণ করেছেন। চরিত্রের সংলাপ, রাজসভা, অন্তঃপুর, কারাগার, যুদ্ধের প্রস্তুতি কিংবা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাষা কাহিনির পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। ফলে ভাষার মধ্যে যেমন প্রাচীন ভারতের একটা দূরত্ব ও ঐতিহাসিক আবহ তৈরি হয়, তেমনই পাঠকের সঙ্গে কাহিনির যোগাযোগও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। উপলব্ধ আলোচনাতেও দেখা যায়, উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে অজাতশত্রুর সিংহাসনলিপ্সা, পিতৃহত্যা, আত্মগ্লানি এবং বুদ্ধের কাছে আশ্রয় নেওয়ার দীর্ঘ অন্তর্দ্বন্দ্ব; একই সঙ্গে এই ঐতিহাসিক আখ্যানের ভিতর দিয়ে সমকালীন রক্তাক্ত রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরা হয়েছে।
এই উপন্যাসের গদ্যের একটি বড় গুণ হল কাহিনির গতি এবং বর্ণনার মধ্যে ভারসাম্য। ঐতিহাসিক উপন্যাসের একটি স্বাভাবিক বিপদ হল তথ্যের ভারে গল্পের প্রাণ হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু ‘অজাতশত্রু’-তে রাজনৈতিক ঘটনা, পারিবারিক সংঘাত, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং অন্তর্দ্বন্দ্বকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা আছে। ফলে কাহিনি শুধু এক রাজা কীভাবে সিংহাসনে বসলেন তার ধারাবিবরণী হয়ে থাকে না; বরং সিংহাসনে বসার পর তাঁর ভিতরে কী ঘটে, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অজাতশত্রুর বাহ্যিক উত্থানের সঙ্গে তাঁর অন্তর্গত পতনকে পাশাপাশি রেখে কাহিনির বুনন তৈরি হয়েছে। এই দ্বৈত গতি—একদিকে রাজ্যবিস্তার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তার, অন্যদিকে অপরাধবোধ ও আত্মজিজ্ঞাসার গভীরতা—উপন্যাসটিকে নিছক ঘটনাপ্রধান হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। কাহিনির বুননে ক্ষমতা ও বিবেকের সমান্তরাল রেখা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অজাতশত্রু যখন পিতাকে সরিয়ে সিংহাসন দখলের পথে এগিয়ে যান, তখন কাহিনি বহির্মুখী—রাজনীতি, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার হিসাব, সামরিক প্রস্তুতি এবং রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু পিতৃহত্যার পর সেই একই কাহিনি ক্রমশ অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কাহিনির কেন্দ্র ধীরে ধীরে ‘রাজা অজাতশত্রু’ থেকে ‘অপরাধবোধে আক্রান্ত মানুষ অজাতশত্রু’-তে সরে যায়। এই পরিবর্তনটি উপন্যাসের গঠনগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে ঐতিহাসিক ঘটনা এবং মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস—দুটি প্রবাহ একসঙ্গে কাজ করে।আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, কাহিনিটি একটি সরল নৈতিক উপাখ্যানে পরিণত হয়নি। অজাতশত্রু শুধু খলনায়ক নন, আবার তাঁর অনুশোচনাও তাঁকে সহজে নায়কে পরিণত করে না। তাঁর মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, নিষ্ঠুরতা আছে, অপরাধ আছে; পাশাপাশি আছে অনুতাপ, আত্মগ্লানি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এই জটিলতাই চরিত্রটিকে জীবন্ত করে। তাঁর পিতৃহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাহিনি যত এগোয়, পাঠক ততই বুঝতে পারেন যে ইতিহাসের ‘অপরাধী রাজা’ এবং ব্যক্তিগত যন্ত্রণায় আক্রান্ত ‘মানুষ অজাতশত্রু’ একই চরিত্রের দুই ভিন্ন স্তর। এই দ্বৈততাকে ধরে রাখাই উপন্যাসের বুননের একটি বড় সাফল্য। ভাষার ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় লক্ষণীয়—রাজনীতি ও দর্শনকে একই গদ্যের ভিতরে ধরে রাখার চেষ্টা। অজাতশত্রুর ক্ষমতার রাজনীতি যেমন কাহিনিকে উত্তেজনা দেয়, তেমনই বুদ্ধের অহিংসা ও শান্তির দর্শন তাকে অন্য একটি স্তরে নিয়ে যায়। ফলে কাহিনির মধ্যে দুটি ভিন্ন সুর তৈরি হয়—একটি রক্তাক্ত ও বহির্মুখী, অন্যটি শান্ত, অন্তর্মুখী ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক। এই দুই সুরের সংঘাতই উপন্যাসের মূল আবহ তৈরি করে। ‘অজাতশত্রু’ তাই কেবল ‘রাজা কী করলেন’-এর গল্প নয়; ‘মানুষ কেন এমন করল’ এবং ‘তারপর সে নিজের কাজের সঙ্গে কীভাবে বাঁচল’—এই প্রশ্নগুলিও কাহিনির কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়। বিশেষত উপন্যাসের শেষ পর্বের দিকে বুদ্ধের উপস্থিতি কাহিনির অর্থকে পুনর্নির্মাণ করে। শুরুতে যে অজাতশত্রুকে আমরা দেখি, তাঁর কাছে ক্ষমতা হল জয়ের চূড়ান্ত প্রতীক। কিন্তু বুদ্ধের সান্নিধ্যে এসে জয়ের সংজ্ঞাটিই বদলে যায়। অন্যকে পরাজিত করা নয়, নিজের লোভ, হিংসা, ক্রোধ ও অপরাধবোধকে অতিক্রম করাই হয়ে ওঠে প্রকৃত জয়। ফলে কাহিনির বুনন একটি রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি থেকে ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির আখ্যানের দিকে সরে যায়। এই রূপান্তরই উপন্যাসের বৃহত্তর তাৎপর্য তৈরি করে। তবে এই উপন্যাসের গদ্যকে বিচার করতে গেলে এটাও বলা যায় যে, ঐতিহাসিক আবহ নির্মাণের তাগিদে কোথাও কোথাও ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে ভারী ও প্রাচীনতাসন্ধানী হয়েছে। এই প্রবণতা একদিকে উপন্যাসের সময়কালকে বিশ্বাসযোগ্য করে, অন্যদিকে আধুনিক পাঠকের কাছে কখনও কখনও পাঠের গতি কিছুটা ধীর করে দিতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রকৃতির কথা মাথায় রাখলে এই ভাষাভঙ্গি মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়; বরং লেখক যে সময়কে পুনর্নির্মাণ করতে চাইছেন, তার একটি স্বতন্ত্র ভাষিক পরিবেশ তৈরি করার প্রয়াস হিসেবেই তাকে দেখা উচিত।সব মিলিয়ে ‘অজাতশত্রু’-র গদ্য ও কাহিনির বুননের মূল শক্তি হল ইতিহাস, রাজনীতি ও মনস্তত্ত্বকে একই আখ্যানের মধ্যে যুক্ত করার চেষ্টা। ঘটনাগুলি একে অপরের সঙ্গে কেবল কালানুক্রমিকভাবে যুক্ত নয়; প্রতিটি ঘটনা অজাতশত্রুর মানসিক পরিবর্তনেরও একটি ধাপ। পিতৃহত্যা তাই শুধু একটি ঘটনা নয়, তাঁর পরবর্তী সমস্ত অস্তিত্বের ভিত্তি; সিংহাসন শুধু ক্ষমতার প্রতীক নয়, অপরাধবোধেরও উৎস; আর বুদ্ধের কাছে শরণ নেওয়া শুধু ধর্মীয় ঘটনা নয়, কাহিনির নৈতিক ও দার্শনিক পরিণতি। এই কারণেই উপন্যাসটির গদ্য কেবল ইতিহাসকে বর্ণনা করার মাধ্যম হয়ে থাকে না, বরং ইতিহাসের ভিতরে মানুষের মনকে অনুসন্ধানের মাধ্যম হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ‘অজাতশত্রু’-র কাহিনির বুনন আমাদের একটি চিরন্তন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ক্ষমতা অর্জন কি সত্যিই বিজয়, যদি সেই বিজয়ের পর মানুষকে নিজের বিবেকের কাছে পরাজিত হতে হয়? এই প্রশ্নটিই উপন্যাসটির ইতিহাসকে সমকালের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এর গদ্য ও আখ্যানকে নিছক ঐতিহাসিক পুনর্কথন থেকে একটি মানবিক ও রাজনৈতিক উপন্যাসের মর্যাদায় উন্নীত করে।
অজাতশত্রু/অনির্বাণ কুণ্ডু/ ধানসিড়ি/৪৫০ টাকা

