
সত্য, প্রমাণিত ও অপ্রমাণিত লেভ শেস্তভ তর্জমা– বিপ্লব নায়ক
লেভ শেস্তভ ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম মৌলিক রুশ-ইহুদি দার্শনিক। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের স্বাধীনতা, যন্ত্রণা, বিশ্বাস এবং যুক্তির সীমা। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—মানুষ কি যুক্তি ও ‘অপরিহার্য সত্য’-এর কাছে চিরকাল বন্দি? শেস্তভ মনে করতেন, দর্শনের কাজ কেবল প্রতিষ্ঠিত সত্যকে মেনে নেওয়া নয়, তাকে প্রশ্ন করাও। দস্তয়েভস্কি, নীৎসে ও কিয়ের্কেগার্দের চিন্তা তাঁর দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি যুক্তির সর্বময় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে মানুষের অস্তিত্বগত বিদ্রোহকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে ‘অসম্ভব’ বলে কিছু মেনে নেওয়ার আগে মানুষের প্রশ্ন করা উচিত। বিশ্বাসের মধ্যে তিনি এমন এক সম্ভাবনা দেখেছিলেন, যা যুক্তির সীমাকে অতিক্রম করতে পারে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আথেন্স অ্যান্ড জেরুজালেম-এ যুক্তি ও বিশ্বাসের এই দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাই শেস্তভের দর্শন শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাধীনতা ও অসম্ভবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক গভীর দার্শনিক আহ্বান।
প্রতিটি অভিব্যক্ত ভাবনারই কোনো না কোনো প্রমাণ চাই, আমাদের এমন অভ্যাস ঠিক কোথা থেকে গড়ে উঠলো? মানুষ যে কোনো লাভ বা অন্য স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রায়শই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিজের পড়শিদের ঠকিয়ে থাকে, সেই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা এই ক্ষেত্রে অর্থহীন বলে যদি আমরা সরিয়ে রাখি, তাহলে যথার্থভাবে বললে, প্রমাণের প্রয়োজন আর কিছুই থাকে না। এটা সত্য যে তার পরেও আমরা নিজেরাই নিজেদের ঠকিয়ে অনিচ্ছাকৃত ভুলের ফাঁদে পড়তে পারি। কখনও কখনও আমরা কল্পবস্তুকে বাস্তব বলে ধরে নিই আর সেই যাচ্ছেতাই ভুল যাতে না করে বসি তার জন্য সতর্ক থাকারও চেষ্টা করি। কিন্তু যখন এই আন্তরিক ভুলগুলোর সম্ভাবনাও অপসারিত হচ্ছে, তখন যুক্তি-তর্ক-বিচার বা প্রসঙ্গোল্লেখ (বা সূত্র উল্লেখ) ছাড়াই আমরা সোজাসাপটা কথাবার্তা বলতে পারি। যদি তোমার ইচ্ছা হয়, বিশ্বাস করো, আর যদি ইচ্ছা না হয় তো বিশ্বাস কোরো না। আর এমন এক দেশ আছে, যে দেশ সর্বদা মনুষ্যপ্রজাতির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধিদের আকর্ষণ করে এসেছে, যেখানে সর্বজনগ্রাহ্য প্রমাণ নিতান্তই এক অসম্ভব বস্তু। এতোদিন আমাদের শিখিয়ে আসা হয়েছে যে কোনোকিছু প্রমাণ না করা গেলে তা নিয়ে কথাও বলা যাবে না। চার থেকে আরো সমস্যার হলো এই যে আমরা আমাদের ভাষা এমনভাবে সাজিয়েছি যে যা-ই আমরা বলি না কেন তা-ই প্রকৃত অর্থে একরূপ বিচারের আদলে প্রকাশিত হয়, অর্থাৎ, এমন এক আদলে প্রকাশিত হয় যা প্রমাণের সম্ভাব্যতা মাত্র নয়, প্রমাণের আবশ্যকীয়তাকেই স্বীয় পূর্বানুমান করে তোলে। সম্ভবত এই কারণেই অধিবিদ্যা এতো নিরন্তর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। অধিবিদ্যার ব্যর্থতা কেবল এটা নয় যে তার সত্যগুলো প্রকাশের জন্য সে এমন কোনো অভিব্যক্তি-রূপ গড়ে তুলতে পারে নি যা তাকে প্রমাণের দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত করবে, তার ব্যর্থতা এখানেও যে সে এই দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বোধ করেনি। অধিবিদ্যা নিজেকে সর্বোৎকৃষ্ট মানের বিজ্ঞান রূপে গণ্য করেছে, আর তাই ধরে নিয়েছে যে নিজ ডানার নিচে আশ্রয় দেওয়া বিচার-বিবেচনাগুলোর প্রমাণ তাকে আরো ধরে-কষে ও আরো বিরাট করে দিতে হবে। সে ভেবে নিয়েছে যে প্রমাণ করে দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব অবহেলা করলে তাকে তার সমস্ত অধিকারই খোয়াতে হবে। আর, আমার মনে হয়, এটাই হয়েছে তার প্রাণঘাতী ভুল। অধিকারসমূহ ও দায়িত্বসমূহের মধ্যে এই সাযুজ্যস্থাপন হয়তো আইন-সম্পর্কিত মতবাদের একটি আবশ্যকীয় সত্য (বা একটি আবশ্যকীয় গপ্পো), কিন্তু দর্শনের বলয়ে তার সূচনা হয়েছে একটি ভুল-বোঝাবুঝি-র মধ্য দিয়ে। এখানে বরং তার উল্টো নীতিকেই রাজার আসনে বসানো হয়েছে: অধিকারসমূহ ও দায়িত্বসমূহের মধ্যে সম্পর্কটি ব্যস্তানুপাতিক। আর যখন সমস্ত দায়িত্বের অবসান ঘটে, কেবলমাত্র তখনই সবচেয়ে বড়ো ও সবচেয়ে অনতিক্রম্য অধিকার— চূড়ান্ত সত্যসমূহের সঙ্গে আলাপনের অধিকার— অর্জিত হয়। এখানে এক মুহূর্তের জন্যেও ভুললে চলবে না চূড়ান্ত সত্যসমূহের সঙ্গে মধ্যবর্তী সত্যসমূহের কোনো মিল-ই নেই, আর এই মধ্যবর্তী সত্যসমূহের যৌক্তিক নির্মিতিই গত দুই হাজার বছর ধরে আমাদের কতো-না-অভিনিবিষ্ট অধ্যয়নের বিষয় হয়ে থেকেছে। মৌলিক তফাতটি হলো এখানে যে চূড়ান্ত সত্যসমূহ আমাদের বোধ্যতার পরিধির বাইরে, অর্থাৎ, একেবারেই অবোধ্য। আবারও বলি, চূড়ান্ত সত্যসমূহ বোধ্যতার পরিধির বাইরে, কিন্তু তা বলে আমাদের নাগালের বাইরে নয়। আবার একথাও সত্য যে কঠোরভাবে বললে, মধ্যবর্তী সত্যগুলোও অবোধ্য: কে বা আর দাবি করবে যে আলো, তাপ, যন্ত্রণা, গর্ব, আনন্দ, অধঃপতন এহেন সবকিছুকে সে বোঝে?
কিন্তু তা হলেও, আমাদের মন জোট বেঁধেছে সর্বশক্তিমান অভ্যাসের সঙ্গে, আর এই জোটের কাজ হয়েছে আমাদের নাগালের মধ্যে সর্বজনীন জীবনের ঘটনা-প্রতীতির যেটুকু অংশ ধরা পড়ে সেই সমাহারের উপর কিছু জোর-করে-করা ব্যাখ্যার সাহায্যে এক প্রকার ঐক্য-সঙ্গতি-র রূপ আরোপ করা, আর অনাদিকাল থেকে এটাই সৃষ্ট বিশ্বজগৎ সম্পর্কে বোধ্য ব্যাখ্যা নামে খ্যাতি অর্জন করেছে। তবু আমাদের চেনা-পরিচিত জগতের মধ্যেই এতো অবোধ্যতা বিরাজ করে যে খোলা চোখে দেখলে অবোধ্যতাকে জগৎ-সত্তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অসম্ভব হয়ে ওঠে কিছু সাজানো কথা আউড়ে এই মেনে-নেওয়া-কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা, যেমন কেউ কেউ করে থাকেন এইরকম-সব কথা আউড়ে: জগতকে আমরা বুঝতে পারি না তার একমাত্র কারণ আমাদের কাছ থেকে কিছু জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, বা, আমাদের মন দুর্বল, সুতরাং পরমেশ্বর যদি একদিন ইচ্ছে হয় আর কিছু লুকিয়ে না রেখে সৃষ্টিরহস্যের সবকিছু আমাদের সামনে খুলে-মেলে ধরার, বা, মানুষের মগজ যদি পরবর্তী এক কোটি বছরে এতোটাই বিকশিত হয়ে যায় যে তা আমাদের এখনকার মগজ থেকে ততোটাই উন্নত হবে যতোটা আমাদের মগজ আমাদের সরকারি পূর্বপুরুষ বানরদের মগজের চেয়ে উন্নত, তাহলে তখন বিশ্বজগৎ বোধ্য হয়ে উঠবে। না, না, না! বাস্তবতাকে বোঝার জন্য তার উপর যে ক্রিয়াকলাপগুলো আমরা চালাই, অন্তঃসারগতভাবেই তারা ঠিক ততোক্ষণই প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী থাকে, যতোক্ষণ অবধি তা একটা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। একটি চলন্ত যানের বিধি-বন্দোবস্ত বোঝা সম্ভব। সূর্যগ্রহণ বা ভূমিকম্পের ব্যাখ্যা খোঁজাও অসঙ্গত নয়। কিন্তু এভাবে এগোতে এগোতে এমন এক মুহূর্ত এসে পড়ে— ঠিক কখন তা আমরা বলে দিতে পারিনা— যখন ব্যাখ্যাসমূহ তাদের সব অর্থ হারিয়ে বসে এবং এবং নিখাদ ফালতু বিষয়ে পরিণত হয়। যেনবা কোমরে বাঁধা এক দড়ির টানে— যথাযথেষ্ট যুক্তির নিয়ম রূপী মহান দড়ির টানে— আমাদের কোথাও একটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে: ‘এবার যেখানে খুশি যেদিকে খুশি যাও’। আর যেহেতু আমরা জীবনযাপনে ওই দড়ির টানে চলাতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি, আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে ওই দড়ির টান-ই হলো জগতের সারবস্তুর অংশ। স্পিনোজা-র মতো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চিন্তকদের একজনও ভাবতেন যে স্বয়ং ঈশ্বর নিজেই বাধ্যবাধকতার বাঁধনে বাঁধা আছেন।
কেউ নিজেই নিজেকে খুঁটিয়ে দেখলে টের পাবে যে স্পিনোজার অনুমানটি বাদ দিয়ে তার পক্ষে ভাবা ও বাঁচা দুটোই প্রায় অসম্ভব। কার্যকারণগত আবশ্যকতার স্বতঃসিদ্ধের বিরোধিতা হিউম করেছিলেন কতো না চমৎকারভাবে, কিন্তু তাঁর কাজও মাত্র অর্ধেক সারা হয়েছিলো। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন যে কোনো আবশ্যক যোগাযোগের অস্তিত্ব প্রমাণ করা অসম্ভব। কিন্তু তার উল্টোটা প্রমাণ করাও একই রকম অসম্ভব। ফলে সবকিছু আবার আগের মতোই রয়ে গেলো: কান্ট এবং তাঁর পরবর্তী গোটা মানবজাতিই স্পিনোজার অবস্থানে ফিরে গেছেন। তাড়া খেয়ে স্বাধীনতা গিয়ে সেঁধিয়েছে বৌদ্ধিক জগতে এক অজানা দেশে,
‘যে দেশ থেকে
কোনো যাত্রীই আর ফিরে আসে না,’
আর বাকি সবকিছু তার আগের জায়গাতেই রয়ে যায়। দর্শন যে কোনো মূল্যে বিজ্ঞান হয়ে উঠতে চায়। তার পক্ষে এতে সফল হওয়া একেবারেই অসম্ভব, কিন্তু ‘বিজ্ঞান’ নামধারণের অধিকার কেনার জন্য যে মূল্য তাকে চোকাতে হয়েছে, তা আর ফেরত হবে না। যা তার দরকার তা যেখানে পারে সেখানে খোঁজার যে অধিকার তা সে বিসর্জন দিয়েছে, আর তার মধ্য দিয়ে চিরতরে সে অধিকার সে খুইয়ে বসেছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে সেই অধিকার কি সত্যিই তার প্রয়োজন ছিলো? আপনি যদি সমসাময়িক জার্মান দর্শনের দিকে তাকিয়ে বিচার করেন, দ্বিধাহীনভাবে বলে দিতে পারেন যে ওই অধিকারের মোটেই কোনো প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু ভুলক্রমে বা নতুন নাম কেনার তাগিদে, কোনোভাবেই তো দর্শন তার মহান বৃত্তিকে বিসর্জন দিতে পারেনি, সেই বৃত্তিই এখন তার কাছে অসহ বোঝা হয়ে উঠেছে। দৃশ্যমান ও স্পর্শগ্রাহ্য পৃথিবী যে স্পষ্টতা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিরাট রহস্যগুলো যে সেই একইভাবে কখনো প্রতিভাসিত হয়ে উঠতে পারে না, তা স্বীকার করতে আমাদের যতোই কষ্ট হোক না কেন, স্বীকার না করেও গতি নেই। ব্যতিক্রমহীনভাবে সমস্ত মানুষকে যতোটা সন্দেহাতীতভাবে বৈজ্ঞানিক সত্য সম্বন্ধে আপনি প্রত্যয়ী করে তুলতে পারবেন, অন্যদের কেবল নয়, আপনি নিজেকেও আপনার নিজের সত্য সম্বন্ধে তেমন নিঃসন্দেহ করে তুলতে পারবেন না।
প্রতিভাস, যদি তা ঘটেও, ঘটে কেবল এক মুহূর্তের জন্য। দস্তইয়েভস্কি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে মহম্মদ স্বর্গে পৌঁছতে সফল যদি বা হয়ে থাকেন, সেখানে থাকতে পেরেছিলেন খুবই কম সময়ের জন্য, হয়তো আধ সেকেন্ড থেকে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে কিছু একটা সময়ের জন্য হবে। আর দস্তইয়েভস্কি স্বর্গে প্রবেশ করেছিলেন কেবলই এক মুহূর্তের জন্য। আর এই পৃথিবীতে তাঁরা উভয়েই দশকের পর দশক ধরে বেঁচেছেন, পার্থিব অস্তিত্বের নরকবাস যেনবা অন্তহীন হয়ে উঠেছিলো। নরক নিয়ে সংশয়ের কিছু ছিলো না, আর তা প্রমাণযোগ্যও বটে, তাকে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে নির্দিষ্ট ও প্রদর্শন করা যায়। কিন্তু স্বর্গকে কী কোনোভাবে প্রমাণ করা যায়? কীভাবে কেউ সেই আধ সেকেন্ডের স্বর্গলাভের পরম সুখকে নির্দিষ্ট বা প্রকাশ করতে পারে, বিশেষত যখন বাইরে থেকে তাকে দেখতে লাগে খিঁচুনি, তীব্র প্রকোপ, গাঁজলা-ওঠা মুখ, কখনও-বা অলক্ষুণে হঠাৎ-পতন, রক্তারক্তি সহযোগে ঘটা বিশ্রী ও ভয়ানক মৃগীরোগের উৎপাতের মতো? আবারও ফিরে আসে সেখানে: চাইলে বিশ্বাস করো, না চাইলে বিশ্বাস কোরো না। যে মানুষ কখনো স্বর্গে বাস করে, আবার কখনো বা নরকে, সে নিশ্চিতভাবেই জীবনকে অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে দেখে। আর সে ভাবতে চায় যে তার দেখাটা সঠিক, ভাবতে চায় যে তার অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক, তার চেয়ে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা ও সীমিত আবেগের মানুষরা যেভাবে বর্ণনা করে থাকে জীবন মোটেই সেরকম নয় বলে সে মনে করে। দস্তইয়েভস্কি কতো না মরীয়াভাবে সকলকে তাঁর সঠিকতা বোঝাতে চেষ্টা করে গেছেন, কতো না একগুঁয়েভাবে তিনি সব প্রমাণ-প্রদর্শন করতেন, আর তবু তাঁর আত্মার গভীরে বাসা বেঁধে থাকা চেতনা যখন গুমরে উঠতো যে আদৌ কোনোকিছু প্রমাণ করার ক্ষমতাই তাঁর নেই তখন কতো-না ক্রুদ্ধ তিনি হয়ে উঠতেন! কিন্তু ঘটনা তো ঘটনা-ই থেকে যায়। হয়তো মৃগীরোগী আর উন্মাদরা এমন কিছু জিনিষ জানেন যার কণামাত্র আঁচ-আন্দাজ-ও স্বাভাবিক মানুষরা করতে পারে না, কিন্তু তাদের সেই জ্ঞানকে অন্যদের কাছে জ্ঞাপন করার বা প্রমাণ করার কোনো ক্ষমতা তারা পায়নি। এরপর আছে এক সর্বজনীন জ্ঞান, যার সন্ধানেই দর্শন নিরত, যার সঙ্গে কেউ আলাপে অন্তরঙ্গ হতে পারে, কিন্তু যা সারবস্তুগতভাবেই এমন যে তা সবাইকে জ্ঞাপন করা যায় না, অর্থাৎ, যাচাই-করা প্রমাণযোগ্য সর্বজনীন সত্যে রূপান্তরিত করা যায় না। এখন ‘বিজ্ঞান’ নামধারী হওয়ার অধিকার কেনার জন্য দর্শন যদি এই জ্ঞানকেই অস্বীকার করে বসে! কখনো কখনো মানুষ এমন করে বসেছে বটে। এমন বেশ কিছু প্রশান্ত যুগ এসেছিলো যখন বৌদ্ধিক শ্রম করতে পারে এমন প্রত্যেকেই সদর্থক জ্ঞানের পিছু ধাওয়া করতেই নিরত ছিলো। বা হয়তো এমনও বহু যুগ এসেছিলো যখন কেউ সদর্থক বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কিছু অনুসন্ধান করলেই তাকে সবাই উপেক্ষা-অবজ্ঞা-তাচ্ছিল্য করেছে: তেমন কোনো যুগে জন্মালে প্লেটো কোনো সহমর্মী পেতেন না, অখ্যাতির অন্ধকারে ডুবেই তাঁকে মরতে হতো। অন্তত একটা বিষয় খুব স্পষ্ট। প্রমাণযোগ্য নয়, প্রদর্শনযোগ্য নয়, এমন সব সত্যের সন্ধানই যদি কোনো ব্যক্তির প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়, জীবনের ব্রত হয়, তাহলে সাধারণ বোঝাবুঝি অনুযায়ী যাকে সম্পূর্ণ বা আপেক্ষিক বন্ধ্যাত্ব বলে মনে করা হয়, সেই অবস্থাতেই দিন কাটানো তার নিয়তি। সেই ব্যক্তি যদি চালাক ও প্রতিভাবান হয়, লোকে হয়তো তার মগজ বা প্রতিভা নিয়ে উৎসুক হতে পারে, কিন্তু তার সমস্ত কাজকর্মকেই তারা অনাসক্তি, অবজ্ঞা, এমনকি ভয় ও ঘৃণা নিয়ে এড়িয়ে যাবে, আর জগতের সবাইকে তার সম্পর্কে সাবধান করে দিতেও শুরু করবে:
‘ওই আভাগাকে দেখো আমার বাছারা,
কেমন কাঠখোট্টা, ফ্যাকাশে আর রোগা,
সে গরিব, সে ন্যাংটো,
আর সবার চোখে সে ইতর।’
যে দূরদর্শীরা চূড়ান্ত সত্যের খোঁজ করেছেন, তাদের কাজকর্ম কি নিষ্ফলা ও অকেজো হয়নি? জীবন কি তাদের কোনো মূল্য দিয়েছে? জীবন তার নিজের পথে চলেছে, আর ওইসব দূরদর্শীদের কণ্ঠস্বর কেবল অবণ্যে রোদন হয়ে বেজেছে, এখনও বাজে, ভবিষ্যতেও বাজবে। কারণ তারা যা দেখে বা যা জানে, তা প্রমাণ করা যায় না, প্রমাণ করার যোগ্যই তা নয়। সর্বদাই দূরদর্শীরা তাদের গর্বের মধ্যে তালা-বন্ধ হয়ে একা, বিচ্ছিন্ন, আলাদা, অসহায় হয়েই থেকেছে। দূরদর্শীরা যেন এমন সব রাজা যাদের কোনো সৈন্য নেই। তাদের প্রজাদের তারা খুবই ভালোবাসে, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রজাদের জন্য কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই, আর প্রজারাও কেবল সেই রাজাদেরই সম্মান করে যারা ভয়-ধরানো সামরিক ক্ষমতার অধিকারী। আর— এমনই যেন দীর্ঘকাল থাকে!
বাংলা তর্জমা: বিপ্লব নায়ক

