
রাজ সিংহাসন চিরশ্রী দেবনাথ
রাজার চোখেমুখে এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা। উপত্যকায় এখন বসন্তের রঙ। চারদিক ঝলমল করছে রোদে ও ফুলে। সাধারণ নাগরিকদের রক্তও টগবগ করে ফুটছে। আশা করা যাচ্ছে কদিন পরেই একটি যুদ্ধ হবে।
শুধু যাদের ছেলেরা সৈন্যবাহিনীতে আছে তাদের মায়েরা কাঁদছে। বাবারা বারান্দায় মাথা নিচু করে বসে আছে।
কিন্তু কবে যুন্ধ হবে ঠিক নেই। রাজ্যের শেষপ্রান্তে দাঁড়ালে যে শৈলশ্রেণি দেখা যায়, যার ওপারে কি আছে এখনও তেমন কেউ জানে না, সেই জায়গাটা জয় করতে হবে।
—প্রস্তুতি প্রায় শেষ মহারাজ । আপনি ইঙ্গিত করলেই যাত্রা শুরু হবে?
—কিসের যাত্রা? কেনই বা যাত্রা?
—কি বলছেন মহারাজ । যুদ্ধযাত্রা !
—কিন্তু সেনাপতি সূর্যনারায়ণ , আমাকে যুদ্ধ নিয়ে কিছুটা ভাবতে হবে।
—এ কি বলছেন মহারাজা । রাজ্যের হাজার হাজার যুবককে বিগত ছয়মাস ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তারা সমস্তরকম আধুনিক অস্ত্রে পারঙ্গম হয়ে উঠেছে।
—এতো অস্ত্র তারা কোথায় পেল সূর্যনারায়ণ?
—-মহারাজ আপনার কি হয়েছে? আপনি কি অসুস্থ হয়ে গেছেন? রাজকোষ প্রায় শূন্য করে আপনিই তো জুগিয়েছেন অর্থ !
—-আমার বিশেষ সংবাদবাহক ভার্গব এসে বলল রাজ্যের পশ্চিম অংশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে। তুমি তো আমাকে একথা একবারও বলোনি সেনাপতি সূর্যনারায়ণ?
—-আমি তো সেনাপতি, এই কাজ তো আমার নয়। আপনি আমাকে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন ।আমি তাই করেছি। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ঐ মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশ দখল করা। কত মেঘ সেখানে আর আমাদের এখানে শুধু খরা আর খরা।
—+তুমি কি যুদ্ধ করে মেঘ নামাবে ? মেঘ কি কারো কথা শোনে? পশ্চিমাঞ্চলের খরা ও দু্র্ভিক্ষ আমাকে ভাবাচ্ছে । আমি যাবো সেখানে।
—-কেন এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন ? ঐ প্রদেশে সব গরিব লোকেরা থাকে, ওরা মরলে কিছু হবেনা।
বলছ ? তবুও যদি বিদ্রোহ হয়?
সে ভার আমার ওপর ছাড়ুন, যে কজন বিদ্রোহে নেতা হবে তাদেরকে রাজধানীতে এনে কয়েকটা পদ বা অর্থসাহায্য দিলেই বিদ্রোহ শেষ হয়ে যাবে।
—এতোই সহজ?
—মহারাজ এসব তো আপনার কাছ থেকেই শেখা, এভাবেই তো পূর্বাঞ্চলের অরণ্য বিদ্রোহ দমন করেছিলেন ।
—-কিন্ত সবসময় কি এক নিয়ম যথেষ্ট?
—মহারাজ , আবারো বলছি , সৈন্যদের রক্ত এখন টগবগ করে ফুটছে। সহস্র অস্ত্রযান, খাদ্যশকট সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রাজ্যের প্রায় সমস্ত যুবক এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য তৈরি।
আপনি যুদ্ধ ঘোষণা করা মাত্রই আমরা আক্রমণ করব। জয় তো শুধু সময়ের অপেক্ষা।
—কিন্তু সেনাপতি, সকল যুবক যদি যুদ্ধে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে তবে দেশ চলবে কি করে?
—ওদেরকে পরাজিত করলে, মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশের যুবকেরা আমাদের হয়ে যাবে। শুনেছি তারা বলবান , দীর্ঘকায় এবং তাদের দেশের নারীরাও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, তারা আমাদের অধিকারে থাকবে , তাছাড়া যাদের যুদ্ধে যাওয়ার বয়স হয়নি সেই বালকেরা তো রয়েছেই। ওদেরকে এখন থেকেই অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে তৈরি করতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।
—-সেনাপতি তোমার মাথায় কি এতোটুকু বুদ্ধি নেই , শত্রু দেশের যুবকেরা অধীনতা মানবে না, আমাদের দেশকে শেষ করে দেবে ভেতর থেকে ?
—আমরা তো এখনো মরে যাইনি।
—সূর্যনারায়ণ তুমি এখন যাও তো, আমি আরো ভাবব ।
—মহারাজ ভাবাভাবির সময় নেই, জনগণের আবেগ তরতাজা আছে, মায়াবী শৈলশ্রেণি আমাদের দিকে যেন ঐশ্বর্যের আগুন চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে,
—শীঘ্র আদেশ দিন , দেবী শাকম্ভরী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত জানিয়েছেন,আগামীকাল ব্রাহ্মমুহূর্তে যুদ্ধযাত্রা করলে জয় সুনিশ্চিত।
“সেনাপতি ,আপনি কি করে জানলেন জয় সুনিশ্চিত? মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশ প্রযুক্তিতে অত্যন্ত উন্নত। তাদের ভিন্নরকম সমরাস্ত্র আছে এই সংবাদ আমি গুপ্তচরদের কাছ থেকে পেয়েছি, নিরুপায় না হলে তা তারা ব্যবহার করেনা।
যুদ্ধ শুরু করার আগে আমাদের আরো নিবিড় ও অন্যরকম প্রস্তুতি দরকার !”
এই কথাগুলো যিনি বললেন তিনি এ রাজ্যের রাজকুমারী সৌম্যকুমারী , সৌম্যকুমারীকে সূর্যনারায়ণ ভয় পায়।
কারণ সৌম্যকুমারী উন্নত দেশ থেকে প্রচুর পড়াশোনা করে এসেছে। তাছাড়া তাকে সহজে কোন কথা বিশ্বাস করানো যায় না। এপর্যন্ত তবু মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু কিছুদিন হলো সৌম্যকুমারীর সঙ্গে একজন গৌরবর্ণ দীর্ঘদেহী পুরুষকে প্রায়শই রাজ অন্তঃপুরে পর্যন্ত ঢুকতে দেখা যায়, যার কন্ঠস্বর এখনও শুনতে পায়নি সূর্যনারায়ণ । চুলগুলোও একটি অদ্ভুত বস্ত্রাবরণে ঢাকা, নাক ও ঠোঁটের ওপরেও রয়েছে মুখাবরণ । শুধু হাতের পাতাগুলোর দিকে তাকালে গাত্রবর্ণ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যায়। মনে হয় এই যুবক অত্যন্ত গৌরবর্ণ।
সূর্যনারায়ণ আজ তিরিশ বছর ধরে দেশের সৈন্যবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করে আজ প্রধান সেনাপতি। মহারাজ তার কোনো অভাব রাখেননি। কিন্তু এরকম স্থিতাবস্থা
আজকাল সূর্যনারায়ণকে ক্লান্ত করছে।
সাংঘাতিক একটা কিছু না ঘটালে জনগণ তাকে আর সেনাপতি হিসেবে মানবে কেন? সাহসের পরীক্ষা তো দেওয়াই হলো না প্রায়।
জীবনে সে মাত্র দুবারই প্রধান যুদ্ধে অংশ নিতে পেরেছিল, যখন দেশকে সমুদ্রপথে আক্রমণ করেছিল সম্পুর্ণ অচেনা এক দস্যুবাহিনী। যারা এই দেশের সম্পদ লুট করতে চেয়েছিল। তাদের
বিরুদ্ধে টানা একবছর গেরিলা যুদ্ধ চলেছিল ।
আরো একবার পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র দেশ যা আবার নারীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তারা কেন জানি সীমান্তে এসেছিল নারীবাহিনী নিয়ে এবং বিনা আলোচনায় অস্ত্র ছুঁড়তে শুরু করেছিল, সূর্যনারায়ণকে তখন পাঠানো হয়েছিল, বেশ আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কয়েকঘন্টা। কিন্তু যুদ্ধ যখন উত্তেজনার তুঙ্গে উঠবে উঠবে করছে তখনই এক অজ্ঞাতকারণে হঠাৎ যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ এলো মহারাজার কাছ থেকে , সূর্যনারায়ণ কোন পরাক্রমই দেখাতে পারল না তেমন।
তারপর এতো বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই হলো না আর।
মহারাজের পুত্র নেই। রাজকন্যা আছে। রাজকন্যা বিবাহযোগ্যা । বিবাহ হয়ে অন্যদেশে গেলে এই অরক্ষিত দেশের শাসনভার সূর্যনারায়ণের হাতেই এসে পড়বে এটা সুনিশ্চিত কারণ মহামন্ত্রী নগেন্দ্রকুমার দুর্বল ও আংশিক নেশাগ্রস্থ।
তাকে ক্ষমতাহীন করে রাখা কোন ব্যাপারই নয়।
সেনাপতি সূর্যনারায়ণ ক্রমাগত বিরক্ত হয়ে উঠছেন রাজার প্রতি। এই রাজাকে সরিয়ে দেশ দখল করতে সেনাপতি সূর্যনারায়ণের খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়, বিগত দুই বছর ধরে বহু চাতুর্যে এই যুদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন সূর্যনারায়ণ,
অনুগত সৈন্য পাঠিয়ে সীমান্তে অশান্তি সৃষ্টি করেছেন, মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশ অপূর্ব সুন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ , এরকমই শুনেছেন সূর্যনারায়ণ।
রাজকুমারী সৌম্যকুমারী বলে উঠল,
“প্রধান সেনাপতি, আপনি একটু বাইরে অপেক্ষা করুন। আমাদের কিছু আলোচনা আছে।”
—কিছু মনে করবেন না মহামান্য রাজকুমারী, আপনার সঙ্গের এই অপরিচিত যুবকটি কে জানতে চাই ? দেশের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রধান সেনাপতি হিসেবে একথা জিজ্ঞেস করতেই পারি ।
—নিশ্চয়ই পারেন। “ প্রধান সেনাপতি” আপনি।
কিন্ত এই দায়িত্ব আমার। স্বল্প সময়েই জানতে পারবেন অপরিচিত যুবকের আসল পরিচয়।
বরফ আর মরুভূমি কিছু লুকোয় না সেনাপতি,
ঢেকে রাখে প্রয়োজনে।
মহারাজের বিশেষ পরামর্শকক্ষের দরজা বন্ধ হলো। বাইরে দাঁড়িয়ে লাভ নেই। এই আলোচনাকক্ষ থেকে কোনোরকম শব্দ বাইরে বের হয় না, কিন্তু বাইরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শব্দও ভেতরে পৌঁছে যায়।
অতঃপর প্রধান সেনাপতি রাজপ্রাসাদের সর্বোচ্চ কক্ষটিতে উঠলেন যেখান থেকে সম্পূর্ণ রাজধানী পাখির চোখে দেখে নেওয়া যায়। প্রধান সেনাপতি হওয়ায় সর্বত্র তিনি বাধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন, আসতে যেতে প্রহরীরা তাঁকে প্রণাম ঠোকে ।
সৌম্যকুমারী আর সেই রহস্যময় যুবকটি মহারাজের সঙ্গে নিশ্চয়ই যুদ্ধ বিষয়ে আলোচনা করবে। তারপর যুদ্ধ থেমে যাবে। রাজকোষ থেকে আর দেদার অর্থ আসবে না।
মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশে কি আছে? সূর্যনারায়ণ ভাবতে লাগলেন । যদি বিপুল রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে দেশটা জয় করে নেওয়া যায় তাহলে তিনি একসঙ্গে দুটো দেশেরই রাজা হতে পারবেন। সৌম্যকুমারী ছাড়া সামনে আর কোনো বাধা নেই।
—রাজকুমারী, প্রধান সেনাপতিকে ডাকছে গো।
চমকে উঠলেন সূর্যনারায়ণ , পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন অন্তঃপুরের সুরসিকা দাসী প্রেমবালা।
—বড়ো চমকে গেলে যে?
যুদ্ধের চিন্তা করছ বুঝি ? নাকি রাজকন্যার সঙ্গে ঐ ষণ্ডাগণ্ডা যুবককে নিয়ে ভাবছ ? প্রেমবালা হাসছে।
—তুই যদি এর পরিচয় জানতে পারিস, তোকে দশ স্বর্ণমুদ্রা দেবো।
—-ইস্ দশ স্বর্ণমুদ্রা, নিজে লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা কামিয়ে নিচ্ছো আর আমার বেলায় দশ স্বর্ণমুদ্রা?
—আমি এমনিতেই তোমাকে একটা বিরাট আগাম সংবাদ দিচ্ছি, শুনে তোমার মুখটা আম আঁটির মতো চুপসে যাবে , তুমি যে যুদ্ধ যুদ্ধ করছ, যুদ্ধটাই হবে না, এই বলে দিলাম ,
যাও যাও মন্ত্রণাকক্ষে যাও, তোমাকে ডেকেছে এবার, প্রথমে তো বের করে দিয়েছিল, হি হি,
—কোথায় বের করেছে, আমি নিজেই বেরিয়ে এসেছি, এসব অপরিচিত লোকদের সামনে বসে থাকা আমার শোভা পায় না।
—-আর বলো না, তোমার মহারাজ হওয়ার স্বপ্ন যে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে গো সেনাপতিমশাই, ওই ষণ্ডামার্কা যুবক কোন যে সে লোক নয়, যোদ্ধাও নয়, বিজ্ঞানী গো বিজ্ঞানী , রাজকুমারী আর সে একসঙ্গেই পড়েছে , নাও দেখি কি খেল্ হয় এবার,
—-চলো চলো নিচে চলো ।
—সূর্যনারায়ণ পিল পিল করে ঘামছেন, যুদ্ধ না হলে কি হবে তার, যুদ্ধ না হলে তো তার পরাজয় হলো যুদ্ধ না করেই, না না এ হতে দেওয়া যায় না!
—-বিশেষ মন্ত্রণাকক্ষের সামনে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল। সেখানে সেই যুবক এখন নেই, রাজকুমারী আর মহারাজ শুধু।
—-বসুন প্রধান সেনাপতি।
—-যুদ্ধ নাকি হবেনা? বলেই সূর্যনারাণ বুঝলেন ভুল করে ফেলেছেন, বুদ্ধিমতী রাজকুমারী যা বোঝার বুঝে ফেলেছেন। রাজকুমারীর এতো বুদ্ধি হওয়ার কি দরকার ছিল? ভ্যাদভ্যাদে , রুপসী রাজকন্যা হলে কত সুবিধে হতো,
কয়েকদিন পর বিবাহের মাধ্যমে অন্য রাজ্যের রানি হয়ে চলে যেত।
আগ বাড়িয়ে কথা বলা তার মতো শীর্ষস্থানীয়দের শোভা পায় না।
—আপনার কেন মনে হলো যুদ্ধ হবে না? আমি কি তাই বলেছি একবারো?
—না মানে এমনি মনে হলো।
—এমনি তো আপনার মনে হবে না প্রধান সেনাপতি ! তবে আপনি কি জানেন মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশে সেরকম কোনো মানুষ সৈন্যবাহিনী নেই? ওদের অস্ত্রাগার নেই, দুর্দান্ত উন্নত প্রযুক্তি আছে, হাজার হাজার শস্যাগার আছে , প্রচুর অরণ্য আর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত রয়েছে, গত একশ বছরের প্রচেষ্টায় আজ তাদের এই সাফল্য, কিন্তু এখন চারপাশের বহু দেশ তাদের ওপর লোভ দিচ্ছে, এর মধ্যে আমরাও একটি দেশ।
—রাজকুমারী আপনার বয়স অল্প, কূটনীতি বোঝেন না, আমরা ওদের আজ আক্রমণ না করলে ওরা আমাদের দখল করে নেবে। পাশের দেশকে কখনো শক্তিশালী হতে দেওয়া যায় না।
—-দখল হতে আপনার কিসের আপত্তি?
—-এ কি কথা বলছেন রাজকুমারী ? জানেন এই কথার জন্য আমি আপনাকে বন্দি করতে পারি, সেনানায়ক হিসেবে আমার অধিকার আছে একজন দেশদ্রোহিনী রাজকুমারীকে গ্রেপ্তার করার।
—-তাই নাকি, যুদ্ধ যুদ্ধ বলে চিৎকার করলেই দেশপ্রেমী হওয়া যায় না প্রধান সেনাপতি। নিতান্ত অপারগ না হলে কোন দেশ যুদ্ধ করে না।
আর আমার বাবা , আপনাদের মহারাজ এই যুদ্ধে সম্মত নন, এতে লোকক্ষয় , বিপুল অর্থের অপচয় হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, বাচ্চাদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে।
—-কিন্তু দেশবাসী যুদ্ধ চায়, আপনি জিজ্ঞেস করে আসুন ?
—-ওরা চাইলেই রাজা যুদ্ধ করবেন নাকি? তিনি মহারাজ । সবার মঙ্গলের কথা চিন্তা করেন।
সূর্যনারায়ণ মনে মনে ভাবতে লাগল—” এতো মহা হ্যাঁপা ।”
সেদিন আর কোনো কথা হলো না, সূর্যনারায়ণ ক্ষুণ্ণ মনে কক্ষ ত্যাগ করল।
ঘোরতর অমাবস্যা সেদিন। সমস্ত রাজ্য এক অজানা আশঙ্কায় থমথম করে প্রতি রাতে। দিনের বেলা মানুষ দৈনন্দিন কাজে ব্যাপৃত থাকে, চাপা আশঙ্কার কথা ফিসফিস করে বলে , কিন্তু সূর্যের আলো কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে অশ্বারোহী সৈন্যরা রাজপথে, অলিতে গলিতে ঢুকে পড়ে, চারদিকে তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কোথাও কোন কর্মহীন তরুণের দল বিদ্রোহের মতলব করছে নাতো? সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এইসব যুবক। তাদের চোখে শুধু অবিশ্বাস। কাউকে ভয় পায় না তারা।
বিশেষ করে সেনাপতি সূর্যনারায়ণকে দেখলেই
কারা যেন বলে ওঠে , “ যাচ্ছে শৃগাল এক, সিংহের বাড়িতে / পথমধ্যে গলা টিপে ধরে তারে
কতগুলো ভূতে “ !
কোন মানে হয়?
এইসমস্ত খবর দেওয়ার জন্য সূর্যনারায়ণের জনা পঞ্চাশ গুপ্তচর আছে।
এক বিকট অশান্তিতে সেনাপতি সূর্যনারায়ণ আর স্থির থাকতে পারছেন না। অবশেষে রাত্রি দ্বিপ্রহরে তিনি তার বিশেষ বিশ্বস্ত দশজন সেনাকে ডেকে পাঠালেন। অস্ত্রাগার থেকে বের করে আনলেন সদ্য কেনা অত্যন্ত শক্তিশালী
পাশুপত অ্যাম্বিশিয়াস কম্ব্যাট সিস্টেম। যা আসলে একটি বায়োমেট্রিক-অ্যাক্টিভেটেড হাইটেক বিশেষ ওষুধি অস্ত্র । কিন্তু এটা কি সত্যিই তার এখন প্রয়োগ করার সময় এসেছে?
তবে সাবধানের মার নেই। কেন জানি আজ দুপুরের পর থেকে রাজকুমারী সৌম্যকুমারীকে ভীষণ ভয় লাগছে সেইসঙ্গে ঐ গৌরবর্ণ যুবককেও। শুধু মহারাজকে তিনি ভয় করেন না।
একটা বুড়ো কাপুরুষ মহারাজা কবে থেকে রাজ
সিংহাসন দখল করে বসে আছে! আর এটা চলতে দেওয়া যায় না।
মুখোশে মুখ ঢেকে সশস্ত্র সেনাপতি ও দশজন সৈনিক নিঃশব্দে প্রাসাদ অলিন্দ দিয়ে চলছেন রাজা এবং রাজকুমারীর ব্যক্তিগত অম্বরমণি মহলের দিকে। সমস্ত দ্বাররক্ষীরা তখন এক অজানা গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমে ঢলে পড়ে রয়েছে
এদিক ওদিক ।
প্রভাতে প্রধান সেনাপতি ঘোষণা দিলেন ,
“এখন থেকে রাজার নাম সূর্যনারায়ণ , সৈন্যদের যুদ্ধ প্রস্তুতি চুরান্ত করতে আদেশ দিলেন, খুব সম্ভবত আজ রাতের অন্ধকারের মায়াবী শৈলশ্রেণির দেশের ওপর আঘাত হানা হবে।”
–মহারাজ কোথায়? রাজকুমারী সৌম্যকুমারীই বা কোথায়? কয়েকজন প্রজা প্রশ্ন করল।
—চুপ,এখন যুদ্ধের সময়, কোনো প্রশ্ন নয়, প্রজারা যুদ্ধে সাহায্য করো , সবকিছু বন্ধ , এটাই আমার আদেশ , আর এটাই শেষ কথা ।
“মহারাজ আর রাজকুমারীকে কি এখনই মেরে ফেলা ঠিক হবে না কিছুদিন বন্দি রেখে তারপর মারা উচিত ?”
সূর্যনারায়ণ ভাবছিলেন , —মেরে ফেললে পরবর্তীতে প্রজা বিদ্রোহ সামাল দেওয়া যাবে তো? ভয় শুধু সেই রহস্যময় যুবককে নিয়ে, তাকে কোথাও দেখা গেল নাতো ?
কিন্তু নিজে শয়তান হয়ে গেলে সবাইকেই শয়তান মনে হয়, সূর্যনারায়ণেরও তাই মনে হচ্ছে , নিজের সাঙ্গোপাঙ্গদেরও সরুচোখে দেখছেন। কাউকেই বিশ্বাস করা ঠিক নয়।
আপাতত তিনি সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে ঘেরা বিশেষ কক্ষে বসে আছেন , চারপাশে তার অতি অনুগত কুড়িজন সৈনিক। তিনি সকাল থেকে কিছু খাননি। ভীষণ ভয় ভয় লাগছে । আশ্চর্য যতদিন মহারাজার অধীনে ছিলেন একদমই ভয় লাগত না, বেশ নিশ্চিন্ত ছিলেন কিন্তু শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেওয়া মাত্রই কেমন যেন বুক ধরফর করছে ।
—নতুন মহারাজের জয় হোক !
—কে?
সূর্যনারায়ণ ভীষণভাবে চমকে উঠলেন, সেই রহস্যময় যুবক। এই রাজমহলেই আছে সে , কিন্তু তন্ন তন্ন করেও তো তাকে তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি, এর কি অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা আছে নাকি? ভীষণ ব্যাপার তো, সূর্যনারায়ণের হাত পা কেমন ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগল ।
—আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল নতুন মহারাজ
আমার সঙ্গে? আপনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন , কিন্তু আপনার পরিচয় কি?
—আমি একজন বিজ্ঞানী ।
তাহলে তো ঠিকই বলেছিল প্রেমবালা। মনে মনে বললেন সূর্যনাায়ণ।
—আপনি নির্ভয়ে বলুন !
একথা বলেই সূর্যনারায়ণ বিস্মিত বোধ করলেন, তার গলার স্বর এমন হয়ে যাচ্ছে কেন? এতো নরম ও কেমন যেন রাজা রাজা ভাব ।
—আরে আমি এমনিতেও আপনাকে ভয় পাচ্ছি না, বিজ্ঞানীরা কাউকে ভয় পায় না। তবে আপনি এখন মহারাজা, তাই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আপনাকে জানানো দরকার, যে কারণে রাজকুমারী সৌম্যকুমারী আমাকে এই দেশে এনেছে, একে একে বলছি শুনুন।
—আগে কক্ষ শূন্য করে দিই।
মোটেও না, এখানে কোনো গুপ্ত আলোচনা হচ্ছে না মহারাজা , যা হচ্ছে তা সবার জানা দরকার,
বিজ্ঞানী না থেমে বলতে লাগলেন.
“দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তীব্র খরা, যা দূর হতে পারে মায়াবী শৈলশ্রেনির দেশ থেকে জলধারাকে শুষ্ক নদীখাতে প্রবাহিত করে আমাদের দেশে আনতে পারলে ।
এ দেশ খাদ্যে স্বয়ংম্ভর না, যুদ্ধখাতে অনাবশ্যক অস্ত্রনির্মানে ব্যয় বেশি হতে থাকায় দেশ কৃষিক্ষেত্রে উন্নত হতে পারছে না, তাই কিছু দক্ষ কৃষক ও উন্নত প্রযুক্তি দরকার আমাদের, যা ঐ দেশ দিতে পারে।
সর্বোপরি আমি দেশের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে নানান ধরনের জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে, আমি চিকিৎসাক্ষেত্রে গবেষণা করি, কিন্তু এখানে উন্নত পরিকাঠামো নেই, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে।”
—থামুন। আপনার চালাকি বুঝতে পেরেছি, যুদ্ধ থামাতে চান ?
—না তো, আমি চলে যাচ্ছি, আপনি যুদ্ধ শুরু করুন, পূর্বতন মহারাজ ও রাজকুমারী নিরুদ্দেশ, এখন আপনিই রাজা তাই জানিয়ে গেলাম , আসি নতুন মহারাজ।
—দাঁড়ান। এতো সহজে যেতে পারেন না, আপনি এখন আমাদের যুদ্ধবন্দি, সৈন্যরা বন্দি করো একে।
বিজ্ঞানী বন্দি হলেন। কোথায় নেওয়া হলো কেউ জানল না।
কিন্তু নতুন মহারাজা সূর্যনারায়ণ প্রজাদের জানালেন এখনি যুদ্ধ শুরু হচ্ছে না, শত্রুর ক্ষমতা পরিদর্শন করে যুদ্ধাস্ত্রগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। আপাতত তিনি বিহঙ্গযানে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন।
দিন গেল, মাস গেলো যুদ্ধ আর শুরু হয় না, সৈন্য শিবিরে খাবারে টান পড়তে শুরু করল, কিছু সৈন্য বিনা অনুমতিতে বাড়ি ফিরে চাষবাস শুরু করল, দেশে জলের জন্য হাহাকার চলছে, মহারাজা সূর্যনারায়ণের কাছে খবর আসতে লাগল দিকে দিকে প্রজাবিদ্রোহ শুরু হয়েছে, নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান ইন্দ্রকুমার , সূর্যনারায়ণকে
পরামর্শ দিতে লাগলেন , অবিলম্বে যুদ্ধ শুরু হোক, বিদ্রোহ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে অন্যরা ।
—আমাকে আরো একটু ভাবতে দাও ইন্দ্রকুমার ,
নিজের মৃদু কন্ঠস্বরে নিজেই চমকে গেলেন সূর্যনারায়ণ, তিনি যে পূর্বতন মহারাজার মতোই কথা বলছেন , তবে কি রাজসিংহাসন যে চোখ দিয়ে দেখছিলেন আজ যেন কেমন অন্যরকম সব ।
সিংহাসন তত সহজ নয়, যেখানে বসলে বদলে যায় ভেতরটা , এতোদিন যিনি সেনানায়কের
ভূমিকায় ছিলেন। তখন তো কিছুই মনে হতো না।
প্রজা আবার কি জিনিস ?
এখন ধোঁয়ার মতো কেবল আজেবাজে চিন্তা। কীসব মনে হচ্ছে চারদিকে প্রজাদের দুঃখ কষ্ট দারিদ্র ইত্যাদি ইত্যাদি …
একদিন অপরাহ্নে প্রাসাদ অলিন্দে পুরনো মহারাজা , রাজকন্যা সৌম্যকুমারী এবং সেই বিজ্ঞানী তিনজনকেই জনতা দেখতে পেল, শুধু অলিন্দপ্রাচীরের আড়ালে তাদের শিকল বাঁধা হাত প্রজারা দেখতে পেল না।
প্রজারা চিৎকার করে উঠল আনন্দে,
—জয়, রাজকুমারী সৌম্যকুমারীর জয়
জয়, মহারাজের জয়!
সূর্যনারায়ণ এগিয়ে গিয়ে সেই বাঁধন খুলে দিলেন,
—জয় মহারাজের জয়, আমাকে ক্ষমা করুন মহারাজ …
আমি শুধুই প্রধান সেনাপতি, রাজসিংহাসন শুধু কাঁটার মতো ক্ষতবিক্ষত করছিল আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে …
অন্যায় করেছিলাম ,এখন আমার চলে যাওয়ার সময় এসেছে,
বসন্তের রোদ মেখে দীর্ঘদেহী সূর্যনারায়ণের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মহারাজ সৌম্যকুমারীকে মৃদু হেসে বললেন ,
—তুমি বলছিলে আমরা কেন বন্দি আছি, এখনই তো মুক্ত করতে পারি নিজেদের, আমি না করেছিলাম, কেন করেছিলাম জানো?
—যুদ্ধ না করে জিতে যাওয়া এই প্রধান সেনাপতিকে ফিরে পেতে, আমার দেশের জন্য এরকম সেনানায়ক যে বড়ো দরকার, এবার ডাকো তাকে, ফিরিয়ে আনো …

