
মামাবাড়ির ছাদ / দেবব্রত কর বিশ্বাস
“ছাদটার অবস্থা মোটেই ভাল নয় রে। যে কোনও দিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে দেখিস।” রাতুলের কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ছন্দা। ঠিক যেন সুচিত্রা সেন। মনখারাপের মধ্যেও হেসে ফেলল রাতুল। সেই কোন ছোটবেলায় দূরদর্শনে ‘সপ্তপদী’-তে প্রথম দেখেছিল, তারপর থেকে বহু বছর ধরে এই বিশেষ তাকানোর ভঙ্গীটা রপ্ত করেছে ছন্দা। রাতুলকে হাসতে দেখে সে বলল, “বোকার মতো হাসছিস কেন? এই কথার সঙ্গে কেউ হাসে? গাধা কোথাকার!” ছন্দা রাতুলের মাসির মেয়ে। বয়সের তফাৎ মাত্র এক বছরের। তাই ওরা দাদা-বোন কম, বন্ধু বেশি। একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছে ওরা। ডানা মেলে উড়তে শিখেছেও একসঙ্গে। যেভাবে উড়তে শিখলে চড়াইছানারা উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়। কিচিরমিচির ঝগড়া করে, সারা পাড়া মাথায় করে। আবার এক গাছেই বাস করে। রাতুল আর ছন্দাও ঠিক সেই রকম। রাতুল মিথ্যে রাগ দেখিয়ে বলল, “চোখ দেখাস না আমাকে। তোর চোখ দুটো গেলে দেব।” রাতুলের মুখে এই কথা শুনে ছন্দার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল, নীচু স্বরে সে বলল, “তাই কর, দাদাভাই। যা সব দেখতে হচ্ছে জীবনে, তারচেয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়া ভাল।” সন্ধে নেমেছে সবে। কয়েকটা বাড়ি পরেই বিশাল ঝিল। বিকেল থেকেই খুব হাওয়া দেয়, রোজ। কিন্তু আজ আশপাশের গাছগুলোয় একটা পাতাও নড়ছে না। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে তনয়া। রাতুলের বউ, আর ছন্দার ক্লাসমেট। পরিবেশটা হালকা করার জন্য ও বলে উঠল, “দেখিস বাবা, তোরা আবার মারপিট শুরু করিস না। তোদের ওপর আমার কোনও বিশ্বাস নেই।” রাতুল আর ছন্দা হেসে ফেলল। হাসার সময় ওদের দু’জনেরই মুখগুলো বাচ্চাদের মতো হয়ে যায়। যতই বয়স বাড়ুক, দাদা আর বোন, দু’জনেই ভিতর থেকে বড্ড ছেলেমানুষ। তনয়া নিশ্চিন্ত হল। ফুরফুরে হাওয়া বইতে শুরু করল হঠাৎ।
গত পরশু রাতে দিদা চলে গিয়েছে। ফসলে ভরে থাকা দশ বিঘা জমি পেরিয়ে পদ্মপুকুরের পাড় দিয়ে হেঁটে নিমগাছটার নীচে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিক। গত ছ’মাস ধরে দিদা বায়না ধরেছিল, মরে গেলে তাকে নিমগাছটার নীচেই সমাধি দিতে হবে। আদরের বুড়িকে কিছুতেই বোঝানো যায়নি, সে আর বরিশালে থাকে না। তবু, মন কি কখনও মানে? শরীর পুড়ে যায়, মন যেখানে বাস করবে বলে ভাবে, সেখানেই থাকে। পূর্ববাংলায় দাদুদিদার বাড়িতে পাকা ছাদ ছিল না। টিনের দেওয়াল, মাথার উপরেও টিন। ছাদের প্রতি দিদার টান ছিল বাদ্যযন্ত্রের তারের থেকেও বেশি টানটান। আঙুল ছোঁয়ালেই সুর বেজে উঠত। কলকাতায় এই বাড়িতে শুরু থেকেই ছাদ রয়েছে। এক তলার ছাদ, তার উপর হল দোতলার ছাদ। সেই ছাদে অনেক রাত অবধি থাকত। গাই গাইত, কাঁপা গলায়। শেষ বয়সেও সেই স্বভাব যায়নি। এই করতে গিয়েই ঠান্ডা লাগিয়ে বসল। সারাদিন ঘড়ঘড় ঘড়ঘড় আওয়াজ হত বুকে, যেন চাকা চলছে। সময়ের চাকা। একদিন চাকাটা থেমে গেল। রাতুলের মা অসীমা আর ছন্দার মা অরুণা দু’জনের শক্ত মনের মানুষ। ভেঙে পড়েছে ওঁদের একমাত্র ভাই তরুণ। মা অন্তপ্রাণ তিনি। ছোড়দি অরুণা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলছে, “ভেঙে পড়িস না তরুণ। এখন তো তোকেই সব সামলাতে হয় ঠান্ডা মাথায়। তুইই তো এখন এই পরিবারের ছাদ।” কথাটা শুনে চমকে তাকাল রাতুল। এদিকে হোয়াটসঅ্যাপে অফিসের গ্রুপে পরপর মেসেজ ঢুকছে। কানে লাগছে মেসেজ ঢোকার টং টং আওয়াজ। ইয়ারপডটা খুলল রাতুল। মাথায় একটা ভাবনা এল, মানুষের ছাদ দরকার নাকি ছাদের মানুষকে?
ছন্দার বর সুজন খুবই ব্যস্ত মানুষ। রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা। সে সারাদিন নিজের কাজ নিয়ে থাকে। হীরে থেকে জিরে, সংসারের খুঁটিনাটি সামলায় ছন্দা। ছেলে আদৃত এবার বোর্ড পরীক্ষা দেবে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও মামাবাড়ি নিয়ে চিন্তাটা মাথা থেকে সরাতে পারছে না সে। সুজন বলেছে, পুরনো দিনের বাড়ি। বেশিদিন চলবে না। বিশেষ করে ছাদটা যেন খুবই কমজোরি হয়ে গিয়েছে। রিপেয়ার করেও লাভ নেই। একটা বয়সের পর চিকিৎসা করালেও মানুষকে বাঁচানো যায় না। কিন্তু, ছাদটা ভাঙতে দিতে রাজি নয় ছন্দা। ছাদটা ভাঙলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। “কিন্তু কেন? তোমরা ভাইবোন এই ছাদ নিয়ে এত রিজিড কেন?” সুজন যতবার এই প্রসঙ্গ তুলেছে, কথা ঘুরিয়ে নিজেও অন্য দিকে চলে গিয়েছে ছন্দা। সত্যিটা কোনওভাবেই বলা যাবে না সুজনকে। এখন ছন্দা আর রাতুল ছাড়া কেউ জানে না। এমনকি অসীমা, অরুণা, তরুণকেও বলেনি তারা। কত স্মৃতি ওই ছাদটায়। ছোটবেলায় সে আর দাদাভাই সারাদিন ছুটে বেড়াত। তার কোন ছেলেকে ভাল লাগল, দাদাভাইয়ের কোন মেয়েকে ভাল লাগল, সেই নিয়েই আলোচনা। মামাবাড়ির উল্টোদিকের বাড়ির দোতলায় একটা পরিবার ভাড়া থাকত। জানলার পাশে বসে সেই ছেলেটা বই পড়ত। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছন্দাকে দেখত আড়চোখে। সেই তাকানো দেখে ছন্দার নাভিতে হাজারো প্রজাপতি উড়ত ফরফরিয়ে। কী যেন ছিল ছেলেটার তাকানোর মধ্যে। দিদাও জানত ব্যাপারটা। কিন্তু দিদাকে একদম পছন্দ করত না ছেলেটা। ছাদে দিদাকে দেখতে পেলেই জানলা বন্ধ করে দিত। কিন্তু কেন? দিদার কাছে জানতে চেয়েছিল ছন্দা। হাসতে হাসতে দিদা বলেছিল, “অনেক রাতে আমি ছাদে গান গাই, ও পড়ে। একদিন ভয় পেয়ে তাকিয়েছিল। তারপর থেকেই ওরকম করে। ছাড় তো!” ছাড়তে পারেনি ছন্দা। ছেলেটাই ওই ভাবে হাঁ করে তাকিয়ে অভ্যেস ছেড়ে দিয়েছিল। কিছুদিন পরে ছেলেটার পরিবার বাড়ি বদলে অন্য পাড়ায় চলে গিয়েছিল। নিজের প্রথম প্রেমকে বাঁচাতে পারেনি ছন্দা। যেভাবেই হোক ছাদটাকে অন্তত বাঁচাতেই হবে। বিড়বিড় করতে করতে রাতুলকে ফোন করল ছন্দা। ফোনটা বেজেই গেল। তনয়ার ফোনও ব্যস্ত। অগত্যা অসীমাকে ফোন করল ছন্দা, “বড়মাসিমণি, দাদাভাই বাড়িতে নেই?” ফোনের ওপার থেকে অসীমার গলায় বিরক্তি, “বাড়িতে নেই। অফিস ছুটি নিয়ে বড়বাজারের দিকে কোন এক রুফ ট্রিটমেন্ট সেন্টারে গিয়েছে। তোরা কী শুরু করেছিস বল তো? ছাদটা ভেঙে নতুন করে বানালে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে শুনি?”
দিদা মহাভারত পড়তে ভালবাসত খুব। দুলে দুলে, সুর করে করে। ছোটবেলায় স্মৃতি মনে পড়ে খুব। বিকেলবেলায় ছাদে বসে দিদা মহাভারত পাঠ করত। প্রথমে পাঠ করত, পরে সেই গুলোই গল্পের আকারে বলত। কী যে ভাল লাগত! পাণ্ডবদের বনবাসের গল্প। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ আর শ্রীকৃষ্ণের কথা। তন্ময় হয়ে শুনত ছন্দা। রাতুল ছাদে শুয়ে হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। শ্রীকৃষ্ণকে খুব ভাল লাগত ছন্দার। দিদা লাজুক মুখ করে বলত, “তোদের দাদুকে অল্পবয়সে একদম শ্রীকৃষ্ণের মতো দেখতে ছিল।” রাতুল তর্ক করত, “তুমি কী করে বুঝলে কৃষ্ণের মতো? তুমি কখনও দেখেছ কৃষ্ণকে?” দিদা আরও লজ্জা পেত, “তোর দাদুকে তো দেখেছি। ভালবাসার চোখটাই আসল। ভালবাসার চোখে তাকালে মনের মানুষ আর শ্রীকৃষ্ণের কোনও তফাৎ নেই।” রাতুল এসব বুঝত না, ছন্দাকে খ্যাপাত, “তুইও কি তোর বরের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণকে দেখবি?” ছন্দা রেগে গিয়ে বলত, “তুই চুপ কর। বেশি পাকা পাকা কথা বলবি না একদম। মাসিমণিকে বলব?” ব্যাস! শুরু হত মারপিট। দৌড়োদৌড়ি। ছাদটা যে কত অত্যাচার সহ্য করেছে ওদের। সেসব কথা ভেবে নিজের মনেই হাসল ছন্দা। সুজনকে অবশ্য কখনওই শ্রীকৃষ্ণ বলে মনে হয়নি তার। গভীর প্রেমের মুহূর্তে বড়জোর কখনও শাহরুখ খান, কখনও টম ক্রুজ বলে মনে হয়েছে। দিদা অবশ্য দাদুকে কখনওই শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কোনও নজরে দেখেনি। দিদাই ছিল ছন্দা আর রাতুলের গল্পের খনি। তারপর এক বৃষ্টির রাতে সেই ঘটনাটা ঘটেছিল। যা ভাবলে এখনও শিউরে ওঠে ছন্দা। সাক্ষী ছিল মামাবাড়ির ছাদটা।
সেন্টার থেকে লোক নিয়ে সোজা মামাবাড়ি গিয়েছিল রাতুল। সব দেখেশুনে রুফ ট্রিটমেন্ট
সেন্টারের সঞ্জয় আগরওয়াল বলেছেন, ওই ছাদ ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। মনটাই বিগড়ে গেছে রাতুলের। খেতে খেতে বারবার আনমনা হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করল তনয়া। ধোকলার বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “রান্না ভাল হয়নি, তাই না?” রাতুল অন্যমনস্কভাবে বলল, “হুমম।” তনয়া বুঝল, কিছুই শোনেনি রাতুল। টেবিলের উল্টোদিকের সিটে বসে জিজ্ঞেস করল, “একটা কথা বলো, তোমরা একটা ছাদ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করছ কেন? ছাদটা নতুন করে বানালে কী হবে? বাড়িটা তো থাকছেই। ঘরই তো আসল।” মাথা নিচু করে খাচ্ছিল রাতুল। চোখ তুলে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “ছাদটা দিদার খুব প্রিয় ছিল।” তনয়া বলল, “কিন্তু দিদা তো আর নেই। ছাদটা না ভাঙলে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। দিদার যেমন আয়ু শেষ, ছাদটার আয়ুও শেষ হয়ে এসেছে। এটা তোমাদের মেনে নিতে হবে। হ্যাঁ, দিদা ছাদটা খুব ভালবাসত, সেটা আমিও জানি, তাও বললাম।” রাতুল খেপে উঠল, “না। তুমি জানো না। আমি আর ছন্দা ছাড়া কেউই পুরোটা জানে না।” ভ্রু কুঁচকে গেল তনয়ার, “কী এমন ঘটনা, যা আমাকেও বলা যায় না? ছন্দা তো আমার ছোটবেলার বন্ধু। এত গোপনীয়তা কীসের? সবচেয়ে বড় কথা, আমি তোমার বেটারহাফ। আমাকে অন্তত তোমার বলা উচিত।” তনয়ার কথায় মুষড়ে পড়ল রাতুল, বলল, “আমি বুঝতে পারছি। সত্যিই তোমাকে বলা উচিত। তুমি সেটা ডিজার্ভ করো। কিন্তু… এসব বলা মানে… আচ্ছা ঠিক আছে, শ্রাদ্ধটা মিটতে দাও।”
শ্রাদ্ধশান্তির কাজকর্ম আজ খুব ভাল ভাবেই মিটল। শান্তি পেল কে? ফুল আর ধূপের গন্ধে আর মনকেমন করা সুরে একটা মজে যাওয়া নদীর স্রোতে নতুন ঢেউ লাগল কি? পায়ে নূপুর পরে নবান্নের মাঠ পেরিয়ে ছুটে গেল কি কিশোরীবেলার মেয়েটা? গান গাইতে গাইতে সে কি লুকিয়ে পড়ল বিলের ধারে সেই উঁচু টিলার আড়ালে? জানা যাবে না। এসবের কিছুই কখনই জানা যাবে না। তাহলে শান্তি পেল কে? নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না রাতুল। পিছনেই বসে ছিল তনয়া। চোখ জল এল তারও। সে হাত ধরল রাতুলের। সে বিশ্বাস করে, শ্রাদ্ধকালীন শান্তিকামনা জীবিত মানুষের মনের চাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। রাতুল নিজের চোখের জল মুছল। তার চোখে জল দেখলে দিদাও কেঁদে ফেলত। সে বড় নাতি বলে কথা! মামার এক ছেলে, এক মেয়ে। আর রাতুল আর ছন্দা। চার ভাইবোন। কিন্তু দিদার নয়নের মণি ছিল রাতুল। সেই ভালবাসাও কি তবে অতীত হয়ে গেল? না। ভালবাসা কখনও অতীত হয় না। এটা তো দিদাই শিখিয়েছে। দিদার সঙ্গে শেষ হয়ে গেল একটা প্রজন্ম, একটা যুগ। কত অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছে। দেশভাগের সময় বরিশাল থেকে কলকাতা আসার বছর পাঁচেকের মধ্যেই চিরঘুমে ডুবে গিয়েছিল দাদু। বাড়িটা বানানোর এক বছর পরেই। তারপর শুরু হয়েছিল দিদার লড়াই। এক হাতে মানুষ করেছে তিন ছেলেমেয়েকে। শ্বশুরবাড়ির কেউ এতটুকু পাশে দাঁড়ায়নি দিদার। শুধু পাশে ছিল একজন। তিনি কে?
ছাদটা আগামীকাল ভাঙা শুরু হবে। এত বড় ছাদ একদিনে ভাঙা যাবে না। পুরনো স্মৃতিকে খণ্ড বিখণ্ড করে মানুষের মনও কি এক দিনে নতুন হয়ে উঠতে পারে? পারে না। কখনও কি আদৌ পুরোপুরি হতে পারে মানুষ? বিছানায় গা এলিয়ে ছোটবেলার মতো মামাবাড়ির জানলার রডে পা তুলে দিয়ে এসবই ভাবছিল রাতুল। তখনকার দিনে গ্রিল দেওয়া হত না। থাকত রড। সেই রড ধরে কত খেলেছে সে। মনে মনে ভেবেছে, এই জানলার রডগুলো আসলে জেলের গরাদ। বাইরে মুক্ত পৃথিবী। বড় হয়ে জেনেছে গড়পড়তা মানুষের জীবন গরাদের মতোই। বাইরে একটা গাড়ি থামার শব্দ হল। ছন্দা বলল, “মনে হয় এসে গেছে।” জানলা থেকে পা নামিয়ে উঠে বসল রাতুল। খানিক পরে সুজন এল ঘরে। এসেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে তাকে বলল, “কী রে? শুয়ে আছিস কেন? আমি তো ভাবলাম, তোরা ছাদে আছিস।” হাসল রাতুল। মুখে কিছু বলল না। মা, মাসি আর মামা গিয়েছে বোলপুর। সেখানে দিদার কোন এক দূর সম্পর্কের ভাই থাকে, তাঁদের বাড়িতে। ছেলেমেয়েকে নিয়ে মামি গিয়েছে বাপের বাড়িতে। ঘরের সব জিনিসপত্র সরিয়ে রাখা রয়েছে কাছের একটা গোডাউনে। একটা ঘরে শুধু একটা খাট আছে, আর আছে টেবিল ফ্যান। এই ঘরেই আজ থাকবে ঘাঁটি গেড়েছে রাতুল, তনয়া, ছন্দা আর সুজন। ছাদ ভাঙার আগে শেষবার রাত কাটিয়ে যাওয়া। সুজন রাতুলকে চোখ মেরে বলল, “একটু খাবি নাকি? বিয়ার বা হুইস্কি?” রাতুল হাসল, বলল, “না রে, আজ ইচ্ছে করছে না।” ফোড়ন কাটল তনয়াও, “না না সুজনদা। আজ ওসব নয়। আমি আর ছন্দা ঠিক করেছি, সন্ধের পর ছাদে বসে চপ মুড়ি আর চা খেতে খেতে ভূতের গল্প করব।” পাশ থেকে ছন্দা বলল, “হ্যাঁ, ওটাই বেস্ট। সেই ভাইফোঁটার সময় আমরা সবাই মিলে অন্ধকারে ছাদে বসে ভূতের গল্প করতাম। তাই না রে দাদাভাই?” রাতুল কিছু বলল। সবার অলক্ষ্যে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে।
অনেকক্ষণ চেপে রাখা শ্বাস ধীরে ধীরে ছাড়তে শুরু করলে যেমনটা হয়, ঠিক তেমনই হঠাৎ ফুরফুর করে হাওয়া বইছে। আড্ডায়, গানে কেটে গিয়েছে অনেকটা সময়। ছাদে কার্পেট পাতা। সেখানে শুয়ে গুনগুন করে গাইছে সুজন। পাশে বসে আছে রাতুল আর তনয়া। একটু দূরে রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছন্দা। ভূতের গল্প পেরিয়ে আড্ডা মোড় নিয়েছে আরও নানা দিকে। রাত ১০টা বাজে। তনয়া উসখুস করতে করতে উঠে গিয়ে ছন্দাকে বলল, “কী রে? ডিনার করবি কখন? অর্ডার করতে হবে তো।” হাওয়ার দাপট বেড়েছে আরও। সেই হাওয়ায় ছন্দার মাথার চুলগুলো উড়ছে। আধো আলো, আধো অন্ধকারে ভূতগ্রস্তের মতো দেখতে লাগছে তাকে। হঠাৎ সে চিৎকার করে রাতুলকে বলল, “অ্যাই দাদাভাই, দেখ, পুরো সেই রাতের মতো ওয়েদার।” রাতুলও চিৎকার করে বলল, “হ্যাঁ রে। সেটাই দেখছি। অদ্ভুত!” ছন্দা বলল, “খেলবি?” রাতুল ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। বলার সঙ্গে সঙ্গেই ছাদের ঠিক মাঝখানে গিয়ে হাঁটু মুড়ে আসন করে বসল দু’জনে। চোখ বুজল। ওদের মন স্মৃতির সুরঙ্গ দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে গেল অতীতে। শুনতে পেল দিদা বলছে- “চোখটা ভাল করে চেপে বন্ধ করে রাখ। হাত দুটো দুই হাটুর উপর উঠিয়ে রাখ। হাতের তালুটা আকাশের দিকে করে রাখ।” দুই ভাইবোন ঠিক তেমনটাই করল। দু’জনেই টের পেল, দিদা নিজের আঙুল দিয়ে ওদের কপালের ঠিক মাঝখানটাই জোরে চাপ দিল। ভিতরটা কেঁপে উঠল ওদের। নাভির কাছে কেমন সুড়সুড় করতে লাগল। তারপর দিদা কীসব মন্ত্র বলতে শুরু করল। তারপর… দিদার গেয়ে উঠল সেই গানটা- “বাসো মেরে নয়ন মে নন্দলাল…” মীরাবাঈয়ের গান। আমার নয়নে তুমি বাস করো, হে নন্দলাল! কী অপূর্ব কণ্ঠ দিদার। সেই প্রথম দিনের মতো। চোখ খুলেছিল দুই ভাইবোন। দেখেছিল, অল্পবয়সী দিদা রজনীগন্ধার মালা পরে গান করছে, পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে অল্পবয়সী দাদু, মাথায় ফুলের মুকুট, হাতে বাঁশি। খুব ভয় পেয়েছিল রাতুল আর ছন্দা। কিন্তু কিছুতেই উঠে পালাতে পারেনি। যে আসনে বসেছিল, সেখানেই আঠার মতো লেগেছিল ছাদের গায়ে। দিদা বলেছিল, “তোদের বলেছিলাম না, যে ভালবাসে, তার চোখে ভালবাসার মানুষই হল শ্রীকৃষ্ণ। প্রাণের মানুষ নয়নে থাকে। হৃদয়ে থাকে। সে কখনও হারিয়ে যায় না। এই দেখ, তোদের দাদু। আর এই ছাদটা আমাদের ভালবাসার কুঞ্জবন।” দুই ভাইবোন দেখেছিল, গোটা ছাদে ফুল ছড়িয়ে রয়েছে। অচেনা অথচ অদ্ভুত এক সুগন্ধ ভাসছিল হাওয়ায়। বাঁশির মৃদু সুরও যাচ্ছিল। নুপূরের রিনিঝিনি আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। দাদু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল দিদার দিকে। আর দিদা তাদের বলেছিল, “আমি যতবার গান করি, ততবার তোদের দাদু চলে আসে। ভালবাসার সুর হাজার স্বর্গ আর লক্ষ নরক পেরিয়ে পৌঁছে যায় হৃদয়ের মানুষের কাছে।” রাতুল আর ছন্দার মন ভরে গিয়েছিল সেদিন। তারপর আরও কয়েকবার দিদা ওদের দু’জনকে দেখিয়েছে এই অপার্থিব দৃশ্য। আজ আবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল দু’জন। দেখতে পেল, আবার দিদা এসেছে। দু’চোখ জলে ভরে আছে। কাঁদো কাঁদো গলায় দিদা বলছে, “কীরে দাদুভাই, কী রে দিদিভাই, আমাদের এই ছাদটাকে তোরা দু’জন রক্ষা করতে পারলি না? এবার আমরা কোথায় যাব? কোথায় গান গাইব? ভালবাসাবাসি কোথায় করব আমরা? আমি আর আমার শ্রীকৃষ্ণ…” বলতে বলতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল দিদা। হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল রাতুল আর ছন্দা। সঙ্গে আকাশ ভেঙে তুমুল বৃষ্টি নামল। রাতুল আর ছন্দার পাশে স্তব্ধবাক হয়ে বসে রয়েছে তনয়া আর সুজন। ওদেরও দু’চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। এমন দৃশ্য ওরাও যে কখনও দেখেনি। অকালে হারিয়ে যাওয়া দাদুর সঙ্গে এভাবে দেখা হত দিদার? দেখা হত গানে গানে। দেখা হত ফুলের গন্ধে, নুপূরের আওয়াজে। দেখা হত ভালবাসার কুঞ্জবন এই মামাবাড়ির ছাদে।

