
সন্দেহ প্রকাশ কি রাষ্ট্রদ্রোহ?
অভিরূপ সেন
এই জায়গায় গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের মুক্তির প্রশ্ন—যদি তাঁকে অনেকের চোখে একটি বৃহত্তর প্রতিবাদী প্রতীকের রূপে দেখা হয়—একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক তাৎপর্য পায়। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, রাষ্ট্র যখন কোনও ব্যক্তি-প্রতীককে দমন করে, তখন প্রকৃত লড়াইটি ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে কণ্ঠস্বর বনাম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। কোনও ভাষিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে ঘিরে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান অনেকের কাছে এই আশঙ্কা তৈরি করতে পারে যে, ভাষা ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলাও কি ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে? যদি এমন ধারণা সমাজে জন্মায়, তবে তা শুধু একজনের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; বৃহত্তর নাগরিক পরিসরে আত্ম-সেন্সরশিপ বা ভীতির পরিবেশও তৈরি করতে পারে। তবে এখানে একটি সতর্ক ভারসাম্য জরুরি। গণতন্ত্রে আন্দোলনের অধিকার মৌলিক, কিন্তু যে কোনও আন্দোলনকেই আইনের কাঠামোর মধ্যে থাকতে হয়। ভাষা, সংস্কৃতি বা জাতিসত্তা রক্ষার দাবি বৈধ; কিন্তু যদি কোনও বক্তব্য সরাসরি বিদ্বেষ, সহিংসতা, বা সাংবিধানিক কাঠামো ভাঙার আহ্বানে রূপ নেয়, তবে রাষ্ট্রের প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকে। অর্থাৎ, আন্দোলনের অধিকার অপরাধ নয়—কিন্তু আইনত মূল্যায়ন নির্ভর করে বক্তব্য ও কর্মপদ্ধতির প্রকৃতির উপর। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা যেমন সীমাহীন হওয়া উচিত নয়, তেমনই “আন্দোলন” শব্দটিও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু যদি মূল বিষয় হয় বাংলা ভাষা, বাঙালি অধিকার, সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা বা জাতিসত্তা নিয়ে সাংবিধানিক পরিসরের মধ্যে আন্দোলন, তবে সেই অধিকারকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা অবশ্যই উদ্বেগজনক। কারণ তা গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতিকে দুর্বল করতে পারে—অর্থাৎ নাগরিকের নিজের পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা। যে রাষ্ট্র নাগরিককে নিজের ভাষা বা সংস্কৃতি নিয়ে সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেয় না, সে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক কাঠামো বহন করলেও তার ভিতরে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা শক্তিশালী হতে পারে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই যে, সেখানে বাঙালি বাংলা নিয়ে কথা বলবে, তামিল তামিল নিয়ে, অসমীয়া অসম নিয়ে—এবং এই বহুত্ব রাষ্ট্রকে দুর্বল না করে বরং সমৃদ্ধ করে, যদি তা সাংবিধানিক ন্যায়ের ভিতরে থাকে।
ভারতের সংবিধানে বাক্স্বাধীনতা এমন এক মৌলিক অধিকার, যা গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিকে সচল রাখে এবং নাগরিকের ব্যক্তিসত্তাকে মর্যাদা দেয়। স্বাধীন দেশে মানুষ শুধু ভোট দেবে, সরকার গঠন করবে—এতেই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না; গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ তখনই বাস্তবায়িত হয়, যখন নাগরিক নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, সরকারের সমালোচনা করতে পারে, সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারে এবং চিন্তা, বুদ্ধি ও সৃজনশীলতার স্বাধীন চর্চা করতে পারে। ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতারা এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করে অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ক)-এ প্রত্যেক নাগরিককে বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেছেন। এই অধিকার ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, কারণ নাগরিকের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। বাক্স্বাধীনতা তাই শুধু কথা বলার অধিকার নয়; এটি মানুষের চিন্তা প্রকাশ, লেখালেখি, সংবাদপত্র, সাহিত্য, শিল্প, নাটক, চলচ্চিত্র, প্রতীক, এমনকি নীরবতার মাধ্যমেও নিজের অবস্থান ব্যক্ত করার স্বাধীনতা। একজন কবি তাঁর কবিতায়, একজন সাংবাদিক তাঁর প্রতিবেদনে, একজন শিল্পী তাঁর ছবিতে, একজন সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে তাঁর মতামতে—সব ক্ষেত্রেই এই অধিকার কার্যকর।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বাক্স্বাধীনতার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার বহুবার সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করেছে, লেখকদের শাস্তি দিয়েছে, দেশদ্রোহ আইনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী কণ্ঠস্বর দমন করেছে। ফলে স্বাধীন ভারতের নির্মাতারা বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সাংবিধানিক সুরক্ষা পাওয়া জরুরি। ড. বি. আর. আম্বেদকর, জওহরলাল নেহরু, সরদার প্যাটেল প্রমুখ সংবিধান প্রণেতারা মনে করতেন, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ব্যতীত গণতন্ত্র কেবল বাহ্যিক কাঠামো হয়ে থাকবে। সেই কারণেই সংবিধান নাগরিককে কেবল রাষ্ট্রের অনুগত প্রজা হিসেবে নয়, বরং সচেতন ও সমালোচনামূলক অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে ভারতীয় সংবিধান বাক্স্বাধীনতাকে সীমাহীন বা নিয়ন্ত্রণহীন করে দেয়নি। কারণ সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। অনুচ্ছেদ ১৯(২)-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্র যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে যদি তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধে প্ররোচনার প্রশ্নে প্রয়োজনীয় হয়। অর্থাৎ নাগরিক সরকারের তীব্র সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু সহিংসতা উস্কে দিতে পারেন না; মতপ্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু বিদ্বেষ ছড়াতে পারেন না। এই সীমারেখা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য অপরিহার্য। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—দুইয়ের সমন্বয়েই একটি সুস্থ গণতন্ত্র গড়ে ওঠে। ভারতের বিচারব্যবস্থা বাক্স্বাধীনতার ব্যাখ্যা ও সুরক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতার পরপরই ‘রোমেশ থাপার বনাম স্টেট অফ মাদ্রাজ’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক শর্ত। ‘ব্রিজ ভূষণ বনাম স্টেট অফ দিল্লি’ মামলায় সংবাদপত্রের উপর পূর্বনিয়ন্ত্রণকে গণতন্ত্রবিরোধী বলা হয়। ‘বেনেট কোলম্যান বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলায় আদালত স্পষ্ট করে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল ব্যবসায়িক অধিকার নয়, জনগণের তথ্য জানার অধিকারও বটে। ডিজিটাল যুগে ‘শ্রেয়া সিংহল বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬এ ধারা বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন আইন অনলাইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক। এইসব রায় প্রমাণ করে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থা বহুক্ষেত্রে নাগরিক স্বাধীনতার প্রহরী হিসেবে কাজ করেছে।সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বাক্স্বাধীনতারই সম্প্রসারিত রূপ। যদিও সংবিধানে আলাদা করে “Freedom of Press” বলা নেই, আদালত একে অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ক)-এর অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, কারণ এটি সরকারের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে, দুর্নীতি উন্মোচন করে, জনমত গঠন করে এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবে সংবাদমাধ্যম নানা চাপের সম্মুখীন হয়—রাজনৈতিক প্রভাব, কর্পোরেট স্বার্থ, ভুয়ো খবর, ট্রোল সংস্কৃতি ইত্যাদি এর স্বাধীনতাকে জটিল করে তোলে। ফলে শুধু আইনি স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক সততা ও পেশাগত দায়িত্ববোধও।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে বাক্স্বাধীনতার ধারণা আরও বিস্তৃত ও জটিল হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম সাধারণ মানুষকে মতপ্রকাশের অভূতপূর্ব সুযোগ দিয়েছে। আগে যে কণ্ঠস্বর সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে স্থান পেত না, এখন তা সরাসরি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে এসেছে ভুয়ো তথ্য, ঘৃণাভাষণ, অনলাইন হয়রানি ও নজরদারির সমস্যা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কোথায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শেষ হবে এবং কোথা থেকে জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণ শুরু হবে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কখনও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, আবার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই গণতন্ত্রে সতর্ক ভারসাম্য অপরিহার্য। ভারতে দেশদ্রোহ আইন নিয়েও দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগের ১২৪এ ধারা বহু সময়ে সরকারের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও দেশের মধ্যে পার্থক্য আছে—সরকারের সমালোচনা দেশদ্রোহ নয়। সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন রায়ে বলেছে, যতক্ষণ না বক্তব্য সরাসরি সহিংসতা বা সশস্ত্র বিদ্রোহে প্ররোচিত করছে, ততক্ষণ তা দেশদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা যায় না। এই অবস্থান বাক্স্বাধীনতার মূল চেতনাকেই রক্ষা করে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বাক্স্বাধীনতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি উপন্যাস, চলচ্চিত্র বা নাটক সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারে, অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরতে পারে। বহু সময় ধর্মীয় বা রাজনৈতিক চাপে শিল্পের উপর সেন্সরশিপ আরোপের দাবি ওঠে। কিন্তু গণতন্ত্রে মতের অমিল বা আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেই মতপ্রকাশ বন্ধ করা যায় না। কারণ শিল্পের কাজই অনেক সময় প্রশ্ন তোলা, চেতনা জাগানো এবং চিন্তার সীমানা প্রসারিত করা। বাক্স্বাধীনতা ভোগ করার জন্য নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তথ্য যাচাই না করে গুজব ছড়ানো, বিদ্বেষমূলক প্রচার, অন্যের মর্যাদা নষ্ট করা—এসব স্বাধীনতার অপব্যবহার। সুস্থ গণতন্ত্রে ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিকতা জরুরি। আপনি কারও মতের বিরোধিতা করতে পারেন, কিন্তু তার মত প্রকাশের অধিকার অস্বীকার করলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়। অতএব, ভারতের সংবিধানে বাক্স্বাধীনতা শুধু একটি আইনি অধিকার নয়; এটি নাগরিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই স্বাধীনতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, নতুন চিন্তা সৃষ্টি করতে শেখায়। তবে স্বাধীনতার সুরক্ষা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনই এর সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নাগরিকের কর্তব্য। বাক্স্বাধীনতা তখনই সত্যিকার অর্থে মূল্যবান, যখন তা কেবল নিজের কথা বলার জন্য নয়, অন্যের বলার অধিকার রক্ষার জন্যও ব্যবহৃত হয়। ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই—বহু মত, বহু ভাষা, বহু বিশ্বাসের মধ্যে থেকেও সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে এই আশ্বাস দেয় যে তার কণ্ঠস্বরের মূল্য আছে। সেই মূল্য রক্ষা করাই গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত।
ভারতের নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (Bharatiya Nyaya Sanhita, 2023 বা BNS) সরাসরি “বাক্স্বাধীনতা” নামের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়নি, কারণ বাক্স্বাধীনতা এখনও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ক)-এর অধীনেই সুরক্ষিত। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হল—BNS-এর কিছু ধারা কি এমনভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে? এই বিতর্কই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) 124A ধারার দেশদ্রোহ আইন বহুদিন ধরেই সমালোচিত ছিল, কারণ এটি প্রায়শই সরকারের সমালোচনাকে দমন করতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। BNS-এ এই “sedition” শব্দটি সরানো হলেও তার পরিবর্তে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কার্যকলাপ সম্পর্কিত নতুন বিধান আনা হয়েছে (সাধারণভাবে BNS Section 152 হিসেবে আলোচিত)। এই ধারায় এমন কাজ, বক্তব্য, লেখা, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ বা প্রতীকী প্রকাশ শাস্তিযোগ্য হতে পারে, যদি তা বিচ্ছিন্নতাবাদ, সশস্ত্র বিদ্রোহ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বা সার্বভৌমত্ববিরোধী কার্যকলাপ উস্কে দেয়।
এখানেই মূল বিতর্ক: সমর্থকদের মতে, এটি রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয়; সমালোচকদের মতে, “subversive activities” বা “endangering sovereignty” ধরনের বিস্তৃত ভাষা ভবিষ্যতে সরকারের সমালোচনাকেও সন্দেহের চোখে দেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদি অপব্যবহার হয়। অর্থাৎ আইনটির ভাষা ও তার বাস্তব প্রয়োগ—দুইই গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুযায়ী, সরকারবিরোধী মত, প্রতিবাদ, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক সমালোচনা—এসব নিজে থেকে অপরাধ নয়, যতক্ষণ না তা সরাসরি সহিংসতা, সশস্ত্র বিদ্রোহ বা জনশৃঙ্খলা ধ্বংসে প্ররোচিত করে। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নীতিও বলেছে: “সরকারের বিরোধিতা” আর “রাষ্ট্র ধ্বংসের উস্কানি” এক জিনিস নয়। ফলে BNS-এর ধারা সাংবিধানিকভাবে টিকতে হলে আদালত সম্ভবত এই পার্থক্য বজায় রাখবেই। এছাড়া BNS-এ ঘৃণাভাষণ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, ভুয়ো তথ্য দ্বারা জনশৃঙ্খলা নষ্ট, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি সম্পর্কিত ধারাগুলিও রয়েছে, যেগুলি পূর্ববর্তী আইনের উত্তরসূরি বা পুনর্গঠিত রূপ। এগুলির উদ্দেশ্য জনশান্তি বজায় রাখা হলেও, সমালোচকেরা বলেন—অস্পষ্ট ব্যাখ্যা বা অতিরিক্ত পুলিশি ক্ষমতা থাকলে এগুলিও মতপ্রকাশে “chilling effect” তৈরি করতে পারে; অর্থাৎ মানুষ শাস্তির ভয়ে আত্ম-নিয়ন্ত্রণে বাধ্য হতে পারে। সুতরাং, আইনি কাঠামো দেখে বলা যায়—BNS সরাসরি সংবিধানপ্রদত্ত বাক্স্বাধীনতা বাতিল করেনি, কিন্তু কিছু ধারা এমনভাবে গঠিত যে তাদের প্রয়োগের ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যাখ্যা, পুলিশি ব্যবহার, এবং বিচারব্যবস্থার নজরদারি।
সহজ করে বললে: বাক্স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার বহাল আছে, কিন্তু BNS-এর কিছু নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ধারা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে—বিশেষত যদি সেগুলি বিস্তৃত বা রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্টভাবে প্রয়োগ করা হয়। অতএব, উদ্বেগের জায়গা আইনটির অস্তিত্বে যতটা, তার চেয়েও বেশি তার সম্ভাব্য অপব্যবহারে। গণতন্ত্রে নাগরিকের অধিকার রক্ষার মূল ভরসা তাই আদালত, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, এবং সচেতন নাগরিক সমাজ।

