
আলোকের সাধনা (টমাস আলভাা এডিসনের জীবন কাহিনি) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস (১৬)
কাইনেট’স্ক’প থেকে সিনেমায়
এডিসনের এই সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনি আরম্ভ করা হয়েছিল তার মেন্লো পার্কের বিরাট গবেষণাগারটা অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার মাত্র কিছুদিন আগে এডিসন নিউ জার্সি রাজ্যের ওয়েস্ট ওরেঞ্জ নামের জায়গায় একটি নতুন গবেষণাগার স্থাপন করেছিলেন।মেনলো পার্কের গবেষণাগারটির চেয়ে এই নতুন গবেষণাগারটি ছিল অনেক বড়ো। এডিসন যদি ওয়েস্ট ওরেঞ্জে নতুন গবেষণাগার স্থাপন করে সেখানে বসবাস করতে শুরু না করতেন, তাহলে হয়তো মেনলো পার্কের গবেষণাগারটিতে আগুন লাগার সময় তিনি সেখানে গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকতেন। কে জানে তখন তার দশা কী হত! সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যদি গবেষণাগারটির সঙ্গে এডিসনকেও গ্রাস করত, তাহলে তার আরও একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার থেকে পৃথিবী বঞ্চিত হত।
সেই আবিষ্কারটাই ছিল চলচ্চিত্র ক্যামেরা,অর্থাৎ মানুষ, জীবজন্তু এবং বস্তু চলন্ত অবস্থায় ফোটো নিতে পারা ক্যামেরা।
ক্যামেরার আবিষ্কার এবং ক্রমোন্নতি উনিশ শতকের ঘটনা। কিন্তু তার আগেও প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ইউরোপে বিভিন্ন সময় এই বিষয়ে নানা ধরনের জল্পনা চলছিল। রোজার বেকন (১২১৪-১২৯৬ খ্রিঃ) নামের একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব বিখ্যাত ইতালিয়ান চিত্রকর লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২- ১৫১৯ ) তাদের রচনায় এই বিষয়ে কিছু আগাম চিন্তার ইঙ্গিত রেখে গিয়েছেন। উনিশ শতিকায় ক্যামেরা আবিষ্কার হল যদিও তার কৃতিত্ব কোনো একজন বিশেষ মানুষের প্রাপ্য নয়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মানুষ ক্যামেরা উদ্ভাবন করার জন্য এবং নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা তাকে নিঁখুত করে তোলার চেষ্টা করেছিল। সেই সমস্ত চেষ্টার সুফল একত্রিত করে আধুনিক ধরনের উন্নত ক্যামেরা নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল।
এই ক্যামেরা কেবল স্থিরচিত্র গ্রহণ করতে করতে পারত। অর্থাৎ ক্যামেরা এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা একজন মানুষের চিত্র ধরে রাখতে পারত, কিন্তু তার হাত পা নাড়ানো বা দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরে রাখাটা ক্যামেরার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
একদিন হঠাৎ এডিসনের মাথায় অদ্ভুত প্রশ্নটা উঁকি দিল–’ক্যামেরার চলন্ত অবস্থায় মানুষের চিত্র ধরে রাখা সম্ভব হবে না কেন?’’
এডিসনের মাথায় এই প্রশ্নটি উঁকি দেওয়ার বেশ কিছুদিন আগের কথা ।একদিন তিনি একজন বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেই সময় বন্ধুটি হাতে একটি সুন্দর পুতুল নিয়ে খেলছিল। এডিসন বন্ধুর হাত থেকে পুতুলটা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন। একটি ছোটো কালো বাক্স। বাক্সটার একদিকে একটি ছোটো ফুটো। অন্যদিকে হাতে ঘোরাতে পারা একটা চকড়ি। এডিসন যখন বন্ধুর নির্দেশ মতো ফুটোটা দিয়ে বাক্সের ভেতর দিকে তাকালেন তখন তিনি একটি অতি আশ্চর্য দৃশ্য দেখতে পেলেন। তিনি দেখলেন বাক্সটার ভেতরে একটি ছোট্ট ভালুকের বাচ্চা নেচে উঠা ভঙ্গিমায় নাচছে।এডিসন বিষ্ময়ে হতবাক হলেন।একটা ছবি কীভাবে নাচতে পারে বা প্রশ্নটি উল্টো ভাবে জিজ্ঞেস করতে হলে ক্যামেরার পক্ষে একটি নাচতে থাকা ভালুকের বাচ্চার ছবি নেওয়া কীভাবে সম্ভব হতে পারে? এটা কোনো ভেল্কি বাজি,না আমি নিজের চোখে ভুল দেখছি?
অন্য কোনো মানুষ হলে তার মনে এই ধরনের বিস্ময়ের অনুভূতি কিছুক্ষণ স্থায়ী হত; তারপরে তিনি কথাটা ভুলে যেতেন।
কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা এডিসন কেবল বিষ্ময় অনুভব করে ক্ষান্ত হয়ে থাকলেন না। বাড়িতে ফিরে এসে তিনি পুরো কথাটা খুব গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলেন। এভাবে চিন্তা করতে করতে একটা সময় তিনি অনুভব করলেন যে সেই কালো বাক্সটা তিনি যেন কিছুটা বুঝতে পারছেন। এটা কোনো ভেলকিবাজি নয়,বৈজ্ঞানিক নীতি প্রয়োগ করেই ভালুকের নাচতে থাকা ছবি দেখানো সম্ভব হয়েছে।
সমগ্র জিনিসটার মধ্যে তিনি একটি অভিনব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। কিন্তু সেই সময় তিনি অন্যান্য জরুরি গবেষণার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নৃত্যরতা ভালুককে দিতে পারার মতো তার হাতে সময় ছিল না। কিন্তু নিজের অভ্যাস অনুযায়ী এডিসন তাঁর নোট বইয়ে’জীবনের চকড়ি’(পুতুলটার নাম ছিল জীবনের চকড়ি’)সবিশেষ বৃত্তান্ত লিখে রাখলেন ।
ওয়েস্ট ওরেঞ্জের নতুন গবেষণাগারে ভালোভাবে বসতি স্থাপন করার পরে একদিন এডিসন তার চিরসঙ্গী নোট বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলেন। তখনই’জীবনের চকড়ি’বৃত্তান্ত লিখে রাখা পৃষ্ঠাটিতে তাঁর চোখ পড়ল। কথাটা তিনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। অনেকদিন পরে তার নোট বইয়ে নিজেই লিখে রাখা কথাটা পড়ে এডিসন হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। একটি নতুন আবিষ্কারের স্পষ্ট সম্ভাবনা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিলমাত্র সময় নষ্ট না করে তিনি নিজের গ্রন্থাগারে থাকা ক্যামেরা এবং ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রতিটি বই গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়তে লাগলেন। বই থেকে আহরণ করা তথ্য এবং তত্বের সঙ্গে যোগ হল তাঁর নিজের চিন্তা এবং পরিকল্পনা। তিনি কী করতে চান সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা ধীরে ধীরে তার মনে গড়ে উঠল।
কাজটা আরম্ভ করার জন্য এডিসন যখন মানসিকভাবে প্রস্তুত হলেন তখন তিনি একদিন ডিকসন নামের তার প্রধান এবং বিশ্বস্ত সহকারীকে ডেকে পাঠালেন। এডিসন ডিকসনকে বললেন–’ডিকসন , আমরা চলন্ত ছবি তুলতে পারা একটি ক্যামেরা উদ্ভাবন করব। তার জন্য তোমাদের প্রস্তুত হওয়ার সময় হল।’
ডিকসন প্রথমে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না।চলন্ত ছবি তুলতে পারা ক্যামেরা? এটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে? কিন্তু পরের মুহূর্তে তিনি নিজে নিজেকে এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন– যে মানুষটি কথা বলতে পারা এবং গান গাইতে পারা যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, তার পক্ষে চলন্ত ছবি তুলতে পারা ক্যামেরা উদ্ভাবন করাটা অসম্ভব কেন হবে?
এডিসন এ বিষয়ে কী কথা বলেন সেটা শোনার জন্য ডিকসন কান খাড়া করে রইলেন।
এডিসন ডিকসনকে ‘জীবনের চকড়ি’র কাহিনি শোনালেন। যে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অবলম্বন করে কালো বাক্সটির ভেতরে নাচতে থাকা ভালুকের ছবি দেখানো সম্ভব হয়েছে সেই তথ্যটি তিনি ব্যাখ্যা করে শোনালেন। তারপরে তিনি বললেন–’ এই ক্ষেত্রে কিছু কিছু কাজ ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। আমি সেই সমস্ত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ভালোভাবে পড়েছি। উদাহরণস্বরূপ মাই ব্রিজ নামের একজন ফটোগ্রাফার একটি দৌড়ে যাওয়া ঘোড়ার ফোটো নেবার জন্য চব্বিশটি ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন। ঘোড়াটি দৌড়ে যাওয়া পথে একটু দূরে দূরে ক্যামেরাগুলি রাখা হয়েছিল। ঠিক একই দূরত্বে রাস্তায় পাথাল করে চব্বিশটি রশি বেঁধে রাখা হয়েছিল। রশি গুলির একটি প্রান্ত যুক্ত করা হয়েছিল ক্যামেরাগুলির শাটার কন্ট্রোলের ( Shutter Control) সঙ্গে। ঘোড়াটি দৌড়ে যাবার সময় তার পায়ের আঘাত লেগে রশিগুলি ছিড়ে যায়; সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায় ক্যামেরার শাটার।ফলে দৌড়ে যাওয়া ঘোড়াটির চব্বিশটি ফোটো চব্বিশটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ফোটোগুলি একত্রিত করলে একটি দৌড়ে যাওয়া ঘোড়ার দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু আমরা যে নতুন কাজ করতে চাই। সেটা হল এই যে চব্বিশটি ক্যামেরার পরিবর্তে আমরা ব্যবহার করতে চাই একটি মাত্র ক্যামেরা। না বললেও হবে যে একটি ক্যামেরা চব্বিশটি ক্যামেরার কাজ করতে হলে তা নিশ্চয় হতে হবে একটি বিশেষ ধরনের ক্যামেরা। এখন সেই বিশেষ ধরনের ক্যামেরাটা কীভাবে নির্মাণ করা হবে সে কথা চিন্তা করে আবিষ্কার করাটাই হল আমাদের সামনে এক নাম্বার প্রত্যাহ্বান।
মানুষের বিভিন্ন সংজ্ঞা আছে। যেমন– মানুষ হাসতে পারা এক ধরনের প্রাণী। মানুষ এক ধরনের রাজনৈতিক প্রাণী। মানুষ কল্পনা করতে পারে এক ধরনের প্রাণী ইত্যাদি। এরকম অনেক সংজ্ঞার ভেতরে একটি বিশেষ সংজ্ঞা হল এই যে মানুষ সমাধান করতে পারা প্রাণী। বস্তুত মানুষ এবং ইতর প্রাণীর মধ্যে একটি প্রধান পার্থক্য এই যে সমস্যা সমাধান করতে করতেই মানুষের মস্তিষ্কের অনুশীলন হয়, বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশ ঘটে , এবং তার জোরেonZdike somsZa মানুষ উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে বর্তমানের অবস্থায় উপনীত হয়েছে ,অন্য দিকে সমস্যার সমাধান করতে না পেরে বা সমাধান করার কোনো চেষ্টা না করে বাকি সমস্ত প্রাণী কোটি কোটি বছর ধরে একই অবস্থায় রয়ে গেছে। মানুষ যতই বুদ্ধিমান হয় ততই তার সমস্যার সমাধানের শক্তি বৃদ্ধি পায়। অথবা কথাটা এভাবে ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে যে মানুষ যতই সমস্যার সমাধান করার জন্য অহোপুরুষার্থ করে ততই তার বুদ্ধি বিকশিত হয়। পাথরে শান দিলে যেভাবে দা কটারির ধার বৃদ্ধি পায় ঠিক সেভাবে সমস্যার সমাধান করার জন্য চেষ্টা করলে মানুষের মগজ ধারালো হয়।
কোনো সন্দেহ নেই যে এডিসন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ ছিলেন। কিন্তু সমগ্র জীবন অজস্র সমস্যার সমাধান করার জন্য চেষ্টা করতে করতে তার মগজ ক্রমশ বেশি ধারালো হয়ে গিয়েছিল।তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে সমস্যা থাকলে তার সমাধানও নিশ্চয় থাকবে। কিন্তু সেই সমাধান বের করার জন্য মগজ খাটাতে হবে, ধৈর্য ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
চলচ্চিত্র ক্যামেরা উদ্ভাবন করার চিন্তা এডিসনের মাথায় ঢোকার মুহূর্ত থেকে তিনি অন্য সমস্ত চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল একটি কাজেই মনোনিবেশ করতে লাগলেন। বলা বাহুল্য মাত্র যে খুব দ্রুত তিনি সেই কাজের কৃতকার্য হলেন। ১৮৯৭ সনে ৩১ আগস্টের দিন এডিসন তার চলচ্চিত্র ক্যামেরার ( Motion picture Camera) কারণে পেটেন্ট লাভ করলেন।
ক্যামেরা হল, কিন্তু সেই ক্যামেরা দিয়ে তোলা অভিনব ছবিগুলি মানুষকে কীভাবে দেখানো যাবে? এবার এডিসন আরও একটি উপায় বের করতে চেষ্টা করলেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি যে সরঞ্জাম তৈরি করলেন সেটি হল জীবনের চকড়ির কালো বাক্সটির একটি উন্নত রূপ।এডিসন তার নাম দিলেন কাইনেট’স্ক’প (Kinetoscope)’জীবনের চকড়ি’র ভালুকের নাচ দেখার জন্য মানুষ যেভাবে কালো বাক্সটির ফুটো দিয়ে উঁকি দিয়ে তাকাতে হয়,কাইনেটস্কে[তেও সেভাবে ফুটো দিয়ে উকি দিয়ে দেখার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু দুটি যন্ত্রের মধ্যে বড়ো পার্থক্য ছিল এই যে জীবনের চকড়ি নাচতে থাকা ভালুকটা ছিল চিত্রকরের হাতে আঁকা ছবি, অন্যদিকে ‘কাইনেট’স্কপে মানুষ দেখতে পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র ক্যামেরা দিয়ে তোলা সত্যি সত্যি মানুষ এবং জীবজন্তুর ছবি।
‘জীবনের চকড়ি’র কালো বাক্সটি এবং কাইনেটস্কপ এর মধ্যে এরকম একটি বড়ো অমিল ছিল যদিও একটি বড়ো মিলও ছিল। সেটা ছিল এই যে দুটি সরঞ্জামে একবারে মাত্র একজন মানুষের ছবি দেখা যেত। আশ্চর্যের কথা যে একসঙ্গে অনেক মানুষ ‘কাইনেটস্কপের ছবি দেখতে পারার ব্যবস্থা করার জন্য এডিসন কোনো চেষ্টা করেন নি। তার অবশ্য একটি কারণও ছিল। তিনি চলচ্চিত্র ক্যামেরা উদ্ভাবন করতে চাওয়ার কয়েকটি কারণের ভেতরে একটি ছিল এই যে এরকম একটি ক্যামেরা সাহায্যে ফনোগ্রাফের বিক্রি বাড়াতে পারা যাবে বলে তিনি আশা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে ফনোগ্রাফে গান গেয়ে থাকা মানুষটির কণ্ঠস্বর শোনার সঙ্গে তাঁর ছবিটা যদিমানুষ দেখতে পায় তাহলে ফনোগ্রাফের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে। ফলস্বরূপ বাজারে তার চাহিদা ও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কাইনেটস্কপ উদ্ভাবন করার পরে তিনি ফনোগ্রাফের স্বর এবং কাইনেটস্কপের ছবির সময় মেলাতে চেষ্টা করে সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হলেন। তখন তার মন কিছুটা দমে গেল। কাইনেটস্কপের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল নয় বলে তার মনে একটা ভুল ধারণা হল। এই ভুলের জন্য এডিসনকে কিছু মূল্য দিতে হল। তিনি যখন কাইনেটস্কপের পেটেন্টের জন্য আবেদন করলেন তখন তিনি পেটেন্টের অধিকার কেবল আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ করে রাখবেন বলে ঠিক করলেন। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে পেটেন্টের আবেদন করলে তাকে আবেদনটির সঙ্গে ১৫০ ডলার বেশি করে দিতে হত। অতিরিক্ত সেই সামান্য ধনটুকু তিনি দিতে চাইলেন না। ১৮৯৪ সনে লুমিয়ের নামের একজন ফরাসি ফটোগ্রাফার এই কাইনেটস্কোপ কিনে তার ছেলেদেরকে সেটি উপহার হিসেবে দিলেন। লুমিয়ের ছেলেরা কাইনেটস্কপে কিছুটা অদল বদল ঘটিয়ে তাতে একটি প্রজেক্টর লাগানোর ব্যবস্থা করলেন। এর ফলে কাইনেক্টস্কপের ছবিগুলি পর্দায় দেখানো সম্ভব হয়ে উঠল। ১৮৯৫ সনে লুমিয়ের প্যারিসের প্রথমবারের জন্য সিনেমা প্রদর্শন করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হল আধুনিক সিনেমার যুগ।
এডিসন যদি মাত্র ১৫০ ডলার বেশি করে দিয়ে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে তাঁর কাইনেটস্কপের পেটেন্ট নিয়ে নিতেন তাহলে লুমিয়ের বা অন্যান্য ইউরোপীয় সিনেমা ব্যবসায়ীরা তাকে প্রচুর ধন দিতে হতো। নিজের সামান্য ভুলের জন্য এডিসন সেই প্রাপ্য ধনটুকু হারালেন। অবশ্য অর্থ রোজগার করা এডিসনের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল না। অর্থের তার বিশেষ প্রয়োজনও ছিল না, কারণ ইতিমধ্যেই তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থের অধিকারী হয়েছিলেন।কাইনেট’স্ক’প দ্বারা এডিসন অর্থ যোগাড় করতে না পারলেও এই কথাটি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে তার উদ্ভাবন করা এই অভিনব যন্ত্রটি ছিল সিনেমার ক্ষেত্রে প্রথম বৃহৎ পদক্ষেপ। সেই অর্থে এডিসনকেই সিনেমার জন্মদাতা বলা যেতে পারে।
লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর দ্বাজেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।
অনুবাদক পরিচিতি- ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর রা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ছেচল্লিশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

