স্ট্যালোনমুখো বাঁদরের উৎপাত নিয়ে কিছু ভাবনা  বিপ্লব নায়ক

স্ট্যালোনমুখো বাঁদরের উৎপাত নিয়ে কিছু ভাবনা বিপ্লব নায়ক

ভারতীয়ত্ব-ঐতিহ্যের ঢ্যাঁড়া পেটানো হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে ওই মনুবাদ আর ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের চরম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাগুলোর পক্ষে সওয়াল করা ছাড়া ঐতিহ্যের আর কোনো লেশ মাত্র নেই। ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্রের ও জাতীয়তাবাদের যে চরম হিংসাত্মক ও নিপীড়ণমূলক চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তীক্ষ্ণভাবে উন্মোচিত করেছিলেন তাঁর ‘Nationalism’ শীর্ষক বক্তৃতামালায়, তার বিপদ সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন, তার বিকল্প নিজেদের ঐতিহ্য থেকে খুঁজতে ও গড়ে তুলতে বলেছিলেন, আজকের এই ঢ্যাঁড়া-পেটানো হিন্দুত্ববাদীরা সেই জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদেরই অনুগামী ও প্রবর্তক একইসাথে। ফলে এই ভাঁড়ের মুখোশ পরা খুনীদের কাছ থেকে দেশীয় ঐতিহ্য শেখার কিছু নেই, বরং এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যই নিজেদের ঐতিহ্য-পরম্পরার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে নিজেদের আত্মশক্তি সংহত করতে হবে।

 

 

 

জোড়া-ইঞ্জিন বাগিয়ে হিন্দুত্ববাদী সরকার অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে কায়েম হয়েছে। ‘সুনার বঙ্গাল’ (হ্যাঁ, শোনা যাচ্ছে, ‘সোনার বাংলা’ কথাটির শুদ্ধ হিন্দু উচ্চারণ এটাই) গঠনের জন্য পাইক-বরকন্দাজ-বুলডোজার সব নামানো হয়েছে। ফতোয়া জারি হয়েছে: মুসলমানদের আজানের শব্দ যেন মুসলমান ছাড়া আর কারো কানে না পৌঁছয়, খোলা জায়গায় মুসলমানদের নামাজ পড়তে যেন না দেখা যায়, মুসলমানদের ঘর-বাড়ি-দোকান-ব্যবসা ষোলোআনা আইনমাফিক না হলে পাইক দাঁড় করিয়ে বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হবে, বাহাদুর ইলেকশন-কমিশনের দাপটে আগেই যাদের বাতিল-ভোটার করে দেওয়া গেছে সেই প্রায় পঞ্চাশ লাখের উপর মানুষকে এখন চেঁছে-পুঁছে জড়ো করে বাংলাদেশ সীমানায় নিয়ে গিয়ে ওপারে ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা করা হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি…।  তা তাতে নিতান্তই এড়ানো যায় না এমন কিছু ঝড়-ঝাপটা তো হিন্দুদের গায়েও লাগবে, সে আর কী করা যাবে! তাই সরকারি ফতোয়ার প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানরা বকরি-ঈদ-এর আগে গরু কেনা বন্ধ করে দিলে হিন্দু গো-পালকরা অবিক্রিত গরু এবং ধার-দেনা-র ঠেলায় পথে বসবে, মুসলমানদের সঙ্গে একইরকম পদবি (মল্লিক, মণ্ডল,…) ও মুসলমান-প্রধান এলাকায় বাস হওয়ায় অনেক হিন্দু-ও বাতিল-ভোটার-এ পরিণত হবে, ইত্যাদি। আর রাজাবাবু যখন এতো মনোযোগ সহকারে কাজ করছেন, তখন কি তিনি কানের কাছে কোনো মনোযোগ-নষ্ট-করে-দেওয়া ঘ্যানঘ্যানানি প্যানপ্যানানি আদৌ সহ্য করতে পারেন? তাই বোকা বাক্সে বা ইউ টিউবে বিবিধ বিশেষজ্ঞ সেজে বসা বিবিধ আমলা-কেরানি-শিক্ষক-প্রভাষক-অধ্যাপক-গবেষক-দের স্রেফ বলে দেওয়া হয়েছে যে সরকারের অনুমতি না নিয়ে কোনো ঘ্যানঘ্যানানি-প্যানপ্যানানি করা চলবে না, করলেই সরকারি বা আধা-সরকারি বা ঘুরপথে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেখানে রোজগারের ধান্দায় তাঁদের টিকি বাঁধা আছে সেখানে টিকি কেটে দেওয়া হবে। ফলে আমরা এখন ডিজে-তে ‘অ্যাংরি হনুমান’-এর তারস্বরে র‍্যাপ গান শুনবো, ‘জয় হনুমান’, ‘জয় শ্রীরাম’ বলে রণহুঙ্কার ছাড়বো, পারলে কোথাও মুসলমান মেরে এর ফলিত প্রয়োগ উপভোগ করবো, আর বাকিটা আমাদের হিন্দুত্ববাদী সরকারের যখন যা নির্দেশ তখন তা ভালোভাবে পালন করবো। নবযুগে এই হয়েছে হিন্দু হওয়ার সারমর্ম। আমার এক বন্ধু (না কোনো মুসলমান নয়, বরং পদবি থেকে বিচার করলে ব্রাহ্মণ-বংশীয়-ই বলতে হবে) সম্প্রতি আমায় বলেই ফেললো: ‘আমি হিন্দু এটা ভাবতে গেলেই আজকাল কেমন গা-ঘিন-ঘিন করে।’ ধর্মনির্বিশেষে এই পরিবেশে যাদের মনে এহেন ঘা-ঘিন-ঘিনে ঘেন্না নাছোড় হয়ে উঠছে, সেই সমগোত্রীয়দের সঙ্গে বর্তমানে হামলে-পড়া কিছু প্রসঙ্গ ধরে উপায়-বিচার উপলক্ষ্যে এই আলোচনার অবতারণা।

প্রসঙ্গ ১: আমি ভারতীয়? ভারতীয় মানে কি?

হিন্দুত্ববাদী সরকার ও আদর্শনীতিনির্ধারকরা হুকুম জারি করেছেন যে আমাদের প্রত্যেককে নিজেদের সর্বাগ্রে ভারতীয় বলে মনে করতে হবে। ভারতীয় হওয়ার একটা লিটমাস-টেস্ট হিসেবে তাঁরা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানটির প্রতিটি শব্দকে পবিত্র জ্ঞান করে স্কুলে-মাদ্রাসায়-কলেজে-দপ্তরে-অনুষ্ঠানে গাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তা এই ‘বন্দে মাতরম’ গানের জন্ম এই বাংলাতেই, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলমে, তাই শুধু এর শব্দাবলী নয়, এর জন্মসূত্র বিচার করেও এর মধ্যে নিহিত ভারতীয়ত্বের ধারণাটি বোঝার চেষ্টা করা থেকেই আমরা শুরু করতে পারি।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন বাংলায় উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা গদ্যভাষা সৃষ্টিতে ব্যাপৃত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)-এর আরেকটি সাধনার বিষয় ছিলো ভারতীয় জাতীয়তার নির্মাণ। তাঁর উপন্যাসে, তাঁর সমাজ-ব্যাখ্যায়, তাঁর ধর্ম-আলোচনায়, এমনকী তাঁর রসিকতাতেও এই জাতীয়তা-প্রতিষ্ঠা-চেষ্টা ঘুরেফিরে নানা রূপ ধরে হাজির ছিলো। যে কোনো জাতীয়তার প্রাথমিক লক্ষ্য একটি গোষ্ঠী-চেতনা তৈরি করা। আমরা যে আমরাই এবং ওরা যে ওরা, সেই কথা খোলা ক্ষতের মতো সর্বদা জেগে না থাকলে জাতীয়তাবোধ জোরদার হয় না। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের হিন্দুসমাজকে ‘আমরা’ মনে করেছিলেন। কিন্তু আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি হওয়ার সুবাদে বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজ মাঝেমধ্যেই এই ব্যাপকতর হিন্দুসমাজের স্থান নিতো। ঔপনিবেশিক সমাজে বসে আত্মসম্মানের তাগিদে নিজ জাতীয় আত্মপরিচয় সন্ধানী মানুষটির সাহিত্য-রচনায় তাই হিন্দুসমাজের আলোচনা, হিন্দুর ইতিহাস ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু তাঁর এই জাতীয়তা-নির্মাণও ভারতবাসীর ঐক্যবিধান করার বদলে ফাটলগুলোকেই চওড়া করেছে— কীভাবে তা দেখা যাক।

১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধের পর একশো বছরের উপর ধরে ইংরেজ শাসনের অভিঘাত বাংলার সমাজে রাজন্যবর্গকে নিরস্ত্র ও নিস্তেজ করেছিলো, কিন্তু নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি কিছুটা প্রতিপত্তি পেয়েছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত কলকাতার সমাজে যে মর্যাদা পেলো, মুর্শিদাবাদে সেকথা ভাবা যেতো না। ইংরেজের প্রয়োজনে নতুন ভাষা (ইংরেজি) এসেছিলো, তার ভিত্তিতে নতুন শিক্ষা প্রথাও চালু হয়েছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত নিজের মতো করে ইংরেজি শিখলো, ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনীতি-চিন্তকদের লেখাপত্র হজম (বা বদহজম) করে আধুনিকতার হদিশ করতে চাইলো। তার ফলে ইংরেজি-না-শেখা ‘অশিক্ষিত’ জনতা (কৃষকসমাজ যার বড়ো অংশটাই মুসলমান, জনজাতি সম্প্রদায়, হিন্দুসমাজের তলাকার কুঠুরিতে ঠেসে পুরে রাখা বিভিন্ন জাত সম্প্রদায়) ভদ্রলোক সমাজ থেকে আরো দূরে সরে গেলো, বিচ্ছিন্নতাটা বেশ পাকাপাকি ভাবে গেঁড়ে বসলো। উনিশ শতকের শেষ কটি দশকে, অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রধানত রাষ্ট্র-সংলগ্ন পেশাদারী গোষ্ঠীর রূপ নিয়েছিলো। জমিদারদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন সরিয়ে তারা তখন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন নামে আলাদা সমিতি তৈরি করেছে, জমিদার-শ্রেণির স্বার্থবিরোধী কিছু কথা উপস্থাপনা করার মতো ক্ষমতা ও সুযোগও পেশাদারী মধ্যবিত্তের হয়েছে। এই পেশাদারী মধ্যবিত্ত ইংরেজ শাসনকে মূলত সদর্থক রূপেই দেখছে, বঙ্কিমের সমাজচিন্তাতেও তাই সাম্রাজ্যবাদের দ্বিধাহীন কোনো প্রতিবাদ নেই। বরং ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্র-কেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদকেই তিনি সবল রাজনৈতিক রূপ হিসেবে দেখেছেন এবং সেই তাড়সেই জাতীয়তা-পরিচয় নির্মাণ করতে চেয়েছেন।

কিন্তু জাতীয়তা-পরিচয় নির্মাণে যেমন ‘আমরা’ লাগে, তেমনই ‘ওরা’-ও লাগে; জাতি-প্রতিষ্ঠার সন্ধানে যেমন নায়ক-গোষ্ঠী লাগে, তেমনই কাকে পরাভূত করে সে জয় হাসিল হবে, সেই শত্রু-গোষ্ঠীও চিহ্নিত করতে লাগে। নায়ক-চরিত্রগুলোকে বিজাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে হবে এবং সেই অবস্থায় নায়কের গুণকীর্তন করতে হবে, আত্মত্যাগের ফিরিস্তি লিখতে হবে বীরত্বের প্রশংসা করতে হবে। প্রত্যেক উদীয়মান জাতি এভাবেই ইতিহাস লেখে। নিরন্তর শত্রুসন্ধান ও শত্রু-নিকেশ-পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয়তাবাদী আবেগকে উথলে তোলা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুদের নায়ক-গোষ্ঠী করলেন, কৃষ্ণচরিত্রকে নতুনভাবে নায়ক চরিত্র হিসেবে পাঠ করলেন, কিন্তু শত্রু কে? ইংরেজরা তো শত্রু নয়, বরং অনুকরণীয় অগ্রগামী গোষ্ঠী, তাই ভারত-ইতিহাসের মুসলমান-শাসন-আমলের দিকে ফিরে তিনি মুসলমানকেই শত্রু বলে চিহ্নিত করে বসলেন। জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে যে হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত-দের তিনি বাংলার কৃষকসমাজের প্রতিভূ হিসেবে হাজির করেছিলেন, এখন জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে শক্ত করার জন্য তিনি সেই হাসিম সেখ ও রামা কৈবর্তকেই একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

যে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত শিক্ষিতসমাজ বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘সাহিত্যসম্রাট’ উপাধি দিয়ে পুজোর আসনে বসিয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্রের এই রাজনৈতিক জাতীয়তা নির্মাণও তাদের মধ্যে গভীরে শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে।

হিন্দুকে নায়ক ও মুসলমানকে শত্রু করে এহেন জাতীয়তা নির্মাণ (প্রায় দেড়শ বছর পর এখনও এ গরল আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি, অনেক হিন্দু বাঙালিই ‘বাঙালি’ বলতে কেবল হিন্দুদেরই বোঝে, বাংলার মুসলমানদের তারা ‘বাঙালি’ নয়, ‘মুসলমান’ বলে চিহ্নিত করে) হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ যতোই ফেনিল উচ্ছ্বাসে উতরোল করে তুলুক না কেন, তা সমাজের অন্য অংশের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও বিরূপতার বোধকেই আরো পোক্ত করে তোলে। বিশ শতকের প্রথম অর্ধে জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনকে (এবং সেই সুবাদে কংগ্রেসকে) অবিভক্ত বাংলার মুসলমান কৃষক ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের গরিষ্ঠ অংশই যে হিন্দুদের আন্দোলন হিসেবে দেখেছিলো (এবং কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদী জনসংঘের বিরুদ্ধে নয়, কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও মুসলিম লিগ বা প্রজা কৃষক পার্টির মধ্য দিয়ে নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব খুঁজেছিলো), তার পিছনে এই ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্মাণের বিরুদ্ধ-প্রতিক্রিয়া বড়োভাবে কাজ করেছিলো। আর এই হিন্দুকে নায়ক, মুসলমানকে শত্রু করে সাজানো জাতীয়তাবাদ উশকে দিয়েছিলো তার বিপরীত জাতীয়তাবাদ-নির্মাণকেও, যেখানে মুসলমান নায়ক আর হিন্দুরা সব শত্রু। এই দুই পরস্পর বিরোধী, অথচ একে-অপরকে উশকে দিয়ে পরস্পরের শক্তিবৃদ্ধিতে সহযোগী জাতীয়তাবাদ আমাদের এই উপমহাদেশে একের পর এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ঘটিয়ে গেছে, এখনও ঘটিয়ে চলেছে— জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার নাম করে তা এমন তিনটি জাতিরাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) পয়দা করেছে যেগুলো নিরন্তর শত্রুতার-অবিশ্বাসের-অসহযোগের বিষক্রিয়া করে চলেছে, দাঙ্গা-গণহত্যা-উৎখাতের খোলা ক্ষত বাড়িয়ে চলেছে। মানুষ ও মানবিকতা ক্রমশ ছোটো হতে হতে অণুবীক্ষণের আওতায় সেঁধিয়েছে, আর জাতিরাষ্ট্রের দমন-পীড়নের যন্ত্রগুলো বড়ো থেকে আরো বড়ো হয়ে উঠে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে।

বর্তমান হিন্দুত্ববাদীরা এই শত্রুতা-অবিশ্বাস-ভ্রাতৃহত্যা-র মানুষখেকো বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চায় বলেই বঙ্কিমচন্দ্রের বিভেদরোপণকারী গান তাদের এতো মনপসন্দ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ফলে তারা ‘ভারতীয়’ বলে যে পরিচয়টিকে দৃঢ়প্রোথিত করতে চাইছে তার মূল চরিত্রই হলো পাকিস্তানিদের শত্রু মনে করা, বাংলাদেশীদের শত্রু মনে করা, শত্রুদের নরাধম মনে করে সবসময় তাদের খুন করতে অবধি প্রস্তুত থাকা। তাদের ‘ভারতীয়’ আসলে ঔপনিবেশিক শাসনের আঁতুড়ঘরে জন্ম নেওয়া এক হিংস্র অপরবিদ্বেষী রাষ্ট্রকে স্ব-সত্তায় শুষে নিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে স্বপরিচয় করে তোলা হিংস্র মানুষ। সে সবসময় অপর শত্রু খুঁজে বেড়ায়, শত্রুনিধনের হুঙ্কারে মত্ত হয়ে থাকে, তাই রাষ্ট্রীয় হিংসার অনুঘটক হিসেবে সে খুবই কার্যকরী। হিন্দুত্ববাদীদের ডাকে নিজেকে ‘ভারতীয়’ বলা মানে হলো এক হিংস্র ঘাতক রাষ্ট্রের কাছে নিজের আত্মপরিচয় নির্মাণের অধিকারটুকু অবধি আত্মসমর্পণ করে নিঃস্ব হওয়া।

প্রসঙ্গ ২: ভারতীয় আত্মপরিচয় কি শুধু হিন্দুত্ববাদীদেরই পৈতৃক সম্পত্তি?

হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার এমন এক একটা ধারণা ছড়ায় যেন-বা আদি অনন্ত কাল ধরে ভারত নামক এক দেশ ছিলো, যেখানেসংস্কৃত ভাষায় তাক-লাগানো সব জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো, মনুবাদী বর্ণব্যবস্থা সবাই সুবোধ বালক-বালিকা-র মতো মেনে চলতো, গুটিকয় দস্যু বা রাক্ষস শান্তিতে বিঘ্ন ঘটালে বাহুবলী রামের মতো রাজারা তাদের নিমেষে ঠান্ডা করে দিতো। তাঁদের ‘ভারতমাতা কী জয়’ লেখা ব্যানারে বা পোস্টারে এই আদি-অনন্ত-কালের ভারত দেশের যে মানচিত্র মাঝেমধ্যে দেখা যায় তাতে বর্তমানের ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, এমনকি কখনও কখনও শ্রীলঙ্কা-ও ঢুকে বসে থাকে। তাঁরা বোঝাতে চান যে মুসলমান হানাদারদের চক্রান্তের ফলেই এই আদি-অনন্ত-কালীন ভারত টুকরো হয়েছে, তাই মুসলমান চক্রান্তকারীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আবার সেই আদি-অনন্ত-কালীন ঐক্যে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হবে। এভাবে তাঁরা তাঁদের হিংস্র অপর-বিদ্বেষী খুনী মানসিকতাকে অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের এক গা-গরম-করা গয়নায় সাজিয়ে হাজির করেন। কিন্তু সমস্যা হলো: যে অতীতকে গৌরবের পরাকাষ্ঠা বলে তাঁরা তুলে ধরছেন, সেই অতীত সম্পর্কে তাঁদের এই বক্তব্যগুলো পুরোটাই তাঁদের মনগড়া, প্রাচীনকালের যে নথিপত্র এখনো টিকে আছে তার কোনোটাই তাঁদের এই গল্পে সায় দেয় না।

যেমন ধরা যাক, ভারত বলে দেশের আদি-অনন্ত কাল জোড়া অস্তিত্বের গল্পটি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর হিস্টোরিকাল স্টাডিজ’-এর বরিষ্ঠ অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়-এর দীর্ঘকালীন গবেষণা ও বিশ্লেষণের সংগ্রহ হিসেবে ২০১৮ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘The Concept of Bharatavarsha and Other Essays’ বইটি দেখা যাক। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দেখাচ্ছেন: বেদ ও উপনিষদের কালে বিভিন্ন জনপদের নাম পাওয়া যায়, জনপদ হলো একটি ‘জন’ অর্থাৎ জনগোষ্ঠীর বাসভূমি, বিভিন্ন জনপদ মিলে কোনো একটি দেশ বা রাষ্ট্রের ধারণা পাওয়া যায় না; এর পরের পর্যায়ে এসে বৌদ্ধদের বেশ কিছু পালি পাঠ্যবস্তুতে ‘জম্বুদ্বীপ’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, সেখানে গোটা বিশ্বকে চারটি মহাদ্বীপ হিসেবে কল্পনা করে তার একটিকে জম্বুদ্বীপ বলা হয়েছিলো এবং এই জম্বুদ্বীপেই আমাদের অবস্থান ভাবা হয়েছিলো, সুতরাং এটিও কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা সামনে আনছে না, বরং বিশ্বের ভৌগোলিক গঠন সম্পর্কে একটা অনুমান সামনে আনছে; এরও পরের পর্যায়ে বিভিন্ন পুরাণে, যেমন বিষ্ণুপুরাণে ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটা আমরা প্রথম পাই, এখানে ভারতবর্ষ ও জম্বুদ্বীপ শব্দদুটোকে কখনও একই অর্থে, কখনো বা একটি আরেকটির অংশ এই অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, এখানে ভারতবর্ষ মানে সীমানাহীন একটি ভূখণ্ড যার ঠিক মাঝখানে রয়েছে আর্যাবর্ত যেখানেই কেবল মনুবাদী বর্ণব্যবস্থা ও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র অনুযায়ী সমাজ বিন্যস্ত ও অভিজাত ভাষা হিসেবে সংস্কৃত আধিপত্যমান, কিন্তু এই ছোট্ট মধ্যাঞ্চল ছাড়া বিস্তীর্ণ চারপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন ব্রাত্য-যবন-ম্লেচ্ছ-দের বাস যেখানে ভাষা-সমাজগঠন-প্রশাসন-সংস্কৃতি সবই আলাদা, ফলে এখানেও ভারতবর্ষ বলতে কোনো ঐক্যবদ্ধ দেশ বা রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে না (সূত্র: পূর্বোক্ত বই, পৃঃ ১-৩০)। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ইউরোপ থেকে আসা ঔপনিবেশিক শাসকরাই প্রথম ‘ইন্ডিয়া’ নামে একটি সুনির্দিষ্ট সীমানায় বাঁধা প্রশাসনিক অঞ্চল-এর ধারণা নিয়ে এসেছিলো তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের ভৌগোলিক ভিত্তি হিসেবে। আমাদের হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভারত’ সেই ঔপমিবেশিক শাসকদের ‘ইন্ডিয়া’ ধারণার একটি তর্জমা। ঔপনিবেশিক শাসকরা যেমন ইউরোপ থেকে বয়ে আনা ‘জাতি-রাষ্ট্র’-র ধারণার আদলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি রাষ্ট্রের অধীনে যতটা সম্ভব অঞ্চলকে নিয়ে এসে একটি কেন্দ্রীভূত শাসন-শোষণের রাজ কায়েম করার উপর-মোড়ক হিসেবে ‘ইন্ডিয়া’-র প্রশাসনিক ঐক্য সাধন করতে চেয়েছিলো, আমাদের আজকের হিন্দুত্ববাদীরাও হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের গেরুয়া মোড়কের তলে এমন এক কেন্দ্রীভূত শাসন-শোষণ কায়েম করতে চাইছে যেখানে তাদের দোস্ত আম্বানি-আদানি ও বহুজাতিক পুঁজির শোষণাধিপত্য নিরঙ্কুশ করা যাবে। ফলে এই হিন্দুত্ববাদীদের পরম্পরা-ঐতিহ্যের প্রতি অতি-ভক্তি আসলে চোরের লক্ষণ: পরম্পরা-ঐতিহ্য সম্পর্কে সুবিধামতো কিছু মনগড়া গল্প বানিয়ে নেওয়া ছাড়া তারা পরম্পরা-ঐতিহ্য কিছু জানে না, জানতে চায়-ও না, সোয়ার্জিনেগার-এর মতো চেহারার রাম আর স্ট্যালোনের মুখভঙ্গি করা হনুমানের পতাকা উড়িয়ে সেনা-গুণ্ডা-দের উপর মহত্ত্ব আরোপ করে ওরা আদিবাসীদের গ্রামের পর গ্রাম উচ্ছেদ করে হাজার হাজার বিঘা জঙ্গল ধ্বংস করে আম্বানি-আদানিদের খনি-বন্দরের ব্যবসার জায়গা করে দিতে চায়, দেশের কৃষকদের গলায় ফাঁস পরিয়ে তার অন্য প্রান্ত বহুজাতিক কৃষি-ব্যবসায়ীদের হাতে ধরিয়ে দিতে চায়।

ভারতীয়ত্ব-ঐতিহ্যের ঢ্যাঁড়া পেটানো হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে ওই মনুবাদ আর ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের চরম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাগুলোর পক্ষে সওয়াল করা ছাড়া ঐতিহ্যের আর কোনো লেশ মাত্র নেই। ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্রের ও জাতীয়তাবাদের যে চরম হিংসাত্মক ও নিপীড়ণমূলক চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তীক্ষ্ণভাবে উন্মোচিত করেছিলেন তাঁর ‘Nationalism’ শীর্ষক বক্তৃতামালায়, তার বিপদ সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন, তার বিকল্প নিজেদের ঐতিহ্য থেকে খুঁজতে ও গড়ে তুলতে বলেছিলেন, আজকের এই ঢ্যাঁড়া-পেটানো হিন্দুত্ববাদীরা সেই জাতি-রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদেরই অনুগামী ও প্রবর্তক একইসাথে। ফলে এই ভাঁড়ের মুখোশ পরা খুনীদের কাছ থেকে দেশীয় ঐতিহ্য শেখার কিছু নেই, বরং এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যই নিজেদের ঐতিহ্য-পরম্পরার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে নিজেদের আত্মশক্তি সংহত করতে হবে।

প্রসঙ্গ ৩: কপালে তিলক কেটে ওরা বাংলাকে উদ্ধার করতে এসেছে— আদৌ ওরা বাংলাকে চেনে?

আঠারো-উনিশ শতকের ইউরোপীয় ইন্ডোলজিস্ট-ওরিয়েন্টালিস্টরা এই ভূমিতে এসে গুটিকয় সংস্কৃত পণ্ডিতদের কাছে সংস্কৃত শিখে সংস্কৃত ভাষার কিছু প্রাচীন পাঠ্যবস্তু তর্জমা করে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে সেটাকেই গোটা উপমহাদেশের ঐতিহ্য ও ইতিহাস বলে দাবি করে পণ্ডিতি ফলিয়েছিলেন, এমন এক ভ্রম সর্বাত্মক করে তুলেছিলেন যেন-বা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রই সর্বত্র-বিরাজমান ছিলো, আর নিজেদের ‘Aryan’ জাতিগর্বকে আরো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলার জন্য এখানকার আর্যদেরও ‘Aryan’-ভুক্ত করে নিয়ে গরিমাগাথা রচনা করেছিলেন। তা তাঁদের পণ্ডিতির সংকীর্ণতা ও ভ্রম-সর্বস্বতারই পরিচায়ক। এমনকি সুপ্রাচীন তামিল ভাষার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিও পড়ার দেখার বা বিচার করার সময়-সুযোগ বা মুরোদ তাদের হয়নি। এই ভ্রমাত্মক নির্মাণের পা-ধোয়া চরণামৃত দিয়েই আজকের হিন্দুত্ববাদীরা তাঁদের আর্য-শ্রেষ্ঠত্বের কাহানি রচনা করে থাকেন। আজকে বাংলায় দাঁড়িয়ে তারা বলছেন যে বাঙালিদেরও নাকি হিন্দু (অর্থাৎ, আর্য) হয়ে উঠে অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হবে। বোঝা যাচ্ছে যে বাংলার অতীত সমাজ-পরম্পরা ও ইতিহাস সম্পর্কে অতি-মুর্খের দল আজ রাজার আসনে বসেছে এবং তাদের পারিষদবৃন্দের মাধ্যমে বাকিদেরও সেই পরম্পরা ও ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাইছে। এই নতুন রাজাদের সভায় স্থান পেয়ে গুড়াকু-সেবনের জন্য যাঁরা তদ্বির-তদারকের নানা পন্থা অবলম্বনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁদের বিরক্ত করবো না, আপনারা জাহান্নামে যান গে, বাকিদের এখন কিছু পুরোনো কথা ঝালাই করে নেওয়া দরকার।

আমরা সম্মান করে যাঁকে ভাষাচার্য নামে ডেকে থাকি, সেই সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়-এর পর্যবেক্ষণ মতে:

আর্য বচন যখন ১০০০ খৃস্টপূর্বাব্দের পরবর্তী কালে অধুনাতন বিহার অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে বসলো, তখন অ-বৈদিক অর্যদের কথ্যভাষা এইসব পুবের আর্য উপভাষাগুলোয় স্পষ্ট আলাদা কিছু উচ্চারণ-প্রবণতা ফুটে উঠেছিলো।

(সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, The Origin and Development of the Bengali Language, ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম প্রকাশিত, এখানে রূপা প্রকাশনী থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত সংস্করণ থেকে উদ্ধৃত, পৃঃ ৪৩, মূল ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা বর্তমান লেখকের করা।)

এখানে অ-বৈদিক আর্য মানে কারা? অনুমান করা যায় যে এরা হলো সেই ‘ব্রাত্য’-রা, যাদের বৈদিক আর্যরা ‘জাতিভ্রষ্ট’ বা ‘আচারহীন’ বলে দেগে দিয়েছিলো। বৈদিক আর্যরা এদের নিজেদের সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করেছিলো, একইসঙ্গে এরাও ক্ষমতার বেড়ি পরানো ধাপকাটা কাঠামোয় স্বেচ্ছাবন্দি হতে চায়নি। বৈদিক আর্যদের আধিপত্যে চলে আসা অঞ্চল ছেড়ে এদের অনেকে তাই আরো পুবে সরে এসে বাস গেড়েছিলো। তদানীন্তন মগধ-এই সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় তারা জড়ো হয়েছিলো। বৈদিক ভাষা বা জ্ঞানের সঙ্গে তারা পরিচিত হলেও পূর্বে বর্ণিত নির্বিকল্প রূপসাধনের ক্ষমতাখেলার শরিক তারা ছিলো না। এদের প্রভাবেই মগধের অভিজাত উপরমহলের ভাষায় আর্য ভাষার ছাপ ফুটে উঠলেও তা সংস্কৃত ভাষার তুলনায় ছিলো অনেক খোলামেলা, আঞ্চলিক লৌকিক ভাষাগুলোর সঙ্গে তার মিথষ্ক্রিয়া কখনোই স্তব্ধ হয়ে যায়নি। সুনীতিবাবু বলেছেন যে এই ভাষা, যাকে আমরা ‘পুবের ভাষা’ বা ‘পুবের বচন’ বলতে পারি, তা বিস্তারলাভ-ও করেছিলো। মৌর্য শাসনকালে, বিশেষত অশোক-এর রাজত্বকালে এই পুবের ভাষা ভারতীয় উপমহাদেশের বিরাট সিংহভাগ অঞ্চলে প্রশাসনিক ভাষা হয়ে উঠেছিলো এবং অন্য বিভিন্ন প্রাকৃত ভাষাগুলোর উপরও প্রভাব ফেলেছিলো। বুদ্ধ এবং মহাবীর এই ভাষাতেই তাঁদের ধর্ম প্রচার করেছিলেন। বুদ্ধের মৃত্যুর অনেক পরে, এমনকি অশোকের রাজত্বকালেরও পরে, বুদ্ধের বাণী ও শিক্ষাগুলোকে পশ্চিমী উপভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়, যে ভাষা ‘পালি’ নামে পরিচিত হয়। সম্রাট অশোক, বৌদ্ধ ও জৈন-দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যেভাবে মগধী প্রাকৃত, পালি, অর্ধমাগধী ভাষাগুলো রূপ নিয়েছিলো, তা তাদের সাধারণ আমজনতার মুখের ভাষা করে তোলেনি, বরং, অভিজাত-জন, অর্থাৎ, শাসক-প্রশাসক-ধর্মপ্রচারক-পণ্ডিত-দের সাধারণ ভাষা করে তোলার অভিপ্রায় দ্বারা চালিত হয়েছিলো। বলা বাহুল্য, সাধারণ আমজনতার মধ্যে অনার্য আদিবাসী জনজাতিদের বিভিন্ন ভাষা বহাল তবিয়তে প্রাণবন্ত অস্তিত্ব নিয়ে ছিলো।

অথর্ব বেদ-এর সময়কাল (মোটামুটি ১২০০ থেকে ১০০০ খৃস্টপূর্বাব্দ কাল) থেকেই মগধ-এর অভিজাতকুলের আর্যকরণ প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছিলো এই ব্রাত্য আর্যদের প্রভাব-প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। আর্যাবর্ত-এর মধ্যেই তখন মগধ পরিগণিত হতো। মগধের আরো পুবে ছিলো বঙ্গ, পুণ্ড্র বা লাধা, সেখানে তখনও আর্যপ্রভাব পৌঁছয়নি, সেখানকার বিভিন্ন জনজাতিদের ভাষাকে আর্য পণ্ডিতরা ভাষার মর্যাদা দিতো না, ব্যঙ্গ করে পাখির কিচির-মিচির বলতো (তাতে বঙ্গের জনজাতিদের ভাষাগুলো না-ভাষা হয়ে যায় না, তাদের মর্যাদারও কিছু হানি হয় না, বরং আর্য পণ্ডিতদের আত্মগর্বী মূঢ়তাই ব্যক্ত হয়)। মগধ রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার চেষ্টা বঙ্গে ছড়ানোর মধ্য দিয়ে আর্য ভাষা (পালি, অর্ধমাগধী প্রভৃতি প্রাকৃত ভাষা) বঙ্গে প্রবেশ করে। সুনীতিবাবু একে ‘Aryanization from the West’ (‘পশ্চিম দিক থেকে ঘটা আর্যকরণ’) বলেছেন। এই সমস্ত প্রাকৃত ভাষা থেকে বঙ্গের জনজাতিদের ভাষায় বিভিন্ন শব্দ চুঁইয়ে ঢুকতে থাকে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোটো একটি অভিজাত একটি অংশও তৈরি হয় যারা ওইসব আর্য ভাষার বাচকতা গ্রহণ করে সামাজিক-মান-বৃদ্ধির উপায় হিসেবে। বঙ্গে বৌদ্ধ রাজাদের রাজতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা হয়। শেষ বৌদ্ধ রাজতন্ত্র হিসেবে পাল রাজাদের রাজত্বের পতন ঘটে খৃস্টাব্দ বারো শতকে। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ ভারত থেকে আসা গোঁড়া হিন্দু রাজা বিজয়সেন-এর রাজতন্ত্র। এই সেন রাজাদের আমলে বঙ্গে অন্য সমস্ত কিছু উৎখাত করে পুনরুজ্জীবিত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্থাপন করার হিংসাত্মক প্রয়াস নেওয়া হয়, আর্যাবর্তের ব্রাহ্মন্য ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে গিলে নেওয়ার চেষ্টা হয়। এই আমলে আর্যাবর্ত থেকে ব্রাহ্মণদের নিয়ে এসে বঙ্গে প্রতিস্থাপন করে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের আচার-ব্যবহার এবং সংস্কৃত ভাষার কৌলীন্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ ছিলো অবিরত, ফলে আর্যভাষী আর্যআচারী একটা ছোটো অভিজাত অংশ তৈরি হয়। কিন্তু সিংহভাগ বঙ্গের মানুষজন, যারা প্রাক-আর্য সময় থেকে এখানকার অধিবাসী, তারা এই নয়া ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক শাসনের জাত-পাত কাঠামোয় সবচেয়ে নীচু জাতের অসম্মান-অনবস্থায় পতিত হলেও প্রতিরোধ জারি রেখেছে নানাভাবে। ব্রাহ্মণ্য আচারবিধির বাইরে লোকায়ত বিভিন্ন ধর্মের রূপ-ও এই প্রতিরোধ নিয়েছিলো। তেমনই এক লোকাচার হলো বৌদ্ধ-প্রভাব-সমণ্বিত ধর্মপুজো, যার আচার বর্ণনা করে রচিত হয়েছিলো ‘শূন্য-পুরাণ’। রামাই পণ্ডিত রচিত এই ‘শূন্য-পুরাণ’-এ বর্ণনা আছে কীভাবে ব্রাহ্মণরা মালদা অঞ্চলের মানুষদের উপর প্রাণান্তকর কর চাপিয়েছিলো এবং বৌদ্ধ-ধর্মীয় আচারপালনকারী ‘স্বধর্মী’-দের নির্বিচারে হত্যা করেছিলো। এর ফলে ‘ধর্ম’ ঠাকুর (অর্থাৎ, বিষ্ণু) বৈকুন্ঠে তাঁর আবাসে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং ‘খোদে’ (মুসলমানদের আরাধ্য ‘খোদা’)-র রূপ ধরে ধরায় অবতীর্ণ হন:

ধর্ম হৈল্যা যবন রূপী

মাথে তার কালো টুপি

হাতে শোভে ত্রিরুচ কামান।।

ব্রহ্মা হৈল্যা মহম্মদ

বিষ্ণু হৈল্যা পেকাম্বর

আদম্ফ হৈল্যা শূলাপাণি।।

গণেশ হৈল্যা গাজী

কার্ত্তিক হৈল্যা কাজী

ফকির হৈল্যা যথ মুনি।।

তেজিয়া আপন ভেক

নারদ হৈল্যা শেক

পুরন্দর হৈল্যা মলানা।।

আপনি চণ্ডিকা দেবী

তিঁহ হৈল্যা হায়া বিবি

পদ্মাবতী হৈল্যা বিবি নূর।।

যথেক দেবতাগণ

সভে হয়্যা একমন

প্রবেশ করিল জাজপুর।।

দেউল দোহারা ভাঙ্গে

কাড়্যা ফিড়্যা খাএ রঙ্গে

পাখড় পাখড় বোলে বোল।।

এখানে আমরা দেখছি যে সেন রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বাংলার আপামর মানুষদের এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের শাসন-নিপীড়ন প্রতিরোধের উপায় হিসেবে তারা আর্যধর্মের আধিপত্যের বদলে ইসলাম ধর্ম-প্রসার সমর্থন করছেন (আর্যধর্মের প্রধান আরাধ্য দেবদেবীরা রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের অধর্মমূলক কাজে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসলাম ধর্মের খোদা-মহম্মদ-পয়গম্বর-ইত্যাদি রূপ ধরে অন্যায়-দমনের জন্য আবার ধরায় এসেছে এই রূপক-এর মধ্য দিয়ে), এমনকি মুসলমান বাহিনীর হাতে দেব-দেউল ধ্বংস হওয়াকেও সমর্থনের চোখে দেখছেন (১৫৬৮ সালে সুলেইমান কাররানির সেনাপতি কালাপাহাড়ের হাতে জাজপুরের মন্দির তছনছ হয়েছিলো, যার উল্লেখ উদ্ধৃত অংশের শেষ ছয় পঙক্তিতে আছে)। আর্য ধর্মাচার ও সমাজশাসন বঙ্গে এমন বেখাপ্পা হয়ে ওঠার পিছনের কারণগুলো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে:

ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা ছিলেন, তাঁহারা সংস্কৃত পড়িতেন, স্মৃতির চর্চা করিতেন, বলিতেন, জাতি চারিটি— ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। এই চারি জাতির সংকর হইয়া অথবা ইহা হইতে পতিত হিয়া অপর সকল জাতির উৎপত্তি হইয়াছে। কথাটা বাংলার পক্ষে খাটে কিনা, সেটা ভাবিতেন না। ইতিহাস বলিয়া একটা জিনিস যে আছে, সেটাও তাঁহাদের ধারণা ছিল না। তাঁহারা জানিতেন, আবহমান কাল হইতে ঐ চারি জাতি, ঐ সংকর আর ঐ ব্রাত্য চলিয়া আসিতেছে। সুতরাং উহার মধ্যেই সকলের মীমাংসা করিযা লইবার চেষ্টা করিতেন।… (কিন্তু) আমাদের দেশে চারি জাতি বা চারি বর্ণ খুঁজিয়া বেড়ানো বোধ হয় ভুল। নন্দরাজার পর আমাদের দেশে ক্ষত্রিয় ছিল না, এখনো নাই। যাহা আছে তাহা বিদেশী আমদানি এবং বেশি দিনের নহে। ৩০০ বৎসরের মধ্যে বাংলা দেশ বৈশ্য-প্রধান দেশ। এখানে রেশম, ছালটি, তুলার কাপড় খুব হইত; অনেক লোক নৌকার ব্যবসা করিত, মাছ অনেক লোক ধরিত, জঙ্গলের মধ্যে মহল করিয়াও অনেক লোক জীবিকা নির্বাহ করিত, তাহাতেই গালার ব্যবসায় হরীতকী ব্যবসায় আরম্ভ হইয়াছে। খনি হইতে লোহা অভ্র তুলিয়া অনেক লোক দিন গুজরান করিত। লোহার ব্যবসায়ের ব্যাপার কতক কতক শুনিয়াছি। বীরভূমে এ বিষয়ে একটু অনুসন্ধানও চলিতেছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, লোহা আছে কিনা পরীক্ষা করিত এক জাতি। লোহা খুঁজিয়া বাহির করিত এক জাতি। লোহার মল বাহির করিয়া দিয়া খাঁটি লোহা লইত এক জাতি। লোহা হইতে ইস্পাত বাহির করিত এক জাতি। এইরূপে দশ-বারো জাতি পরস্পর সাহায্য করিয়া ইস্পাত বিক্রয় করিত। এইসব জাতিরই পরামাণিক, মেট পরামাণিক, খারিক, বারিক প্রভৃতি গভর্নমেন্টের সব সরঞ্জাম ছিল। এই-সকল জাতির অনেকেই এখন মুসলমান হইয়া গিয়াছে।… বাংলায় বৈশ্যবৃত্তিই অধিক ছিল। কিন্তু এই বৈশ্যেরা হিন্দু বৈশ্য ছিল না। অধিকাংশই বৌদ্ধ, জৈন, আজীবক প্রভৃতি ধর্ম আশ্রয় করিয়া (হিন্দু) চতুর্বর্ণ সমাজ হইতে তফাত হইয়া পড়িয়াছিল। একবার বৌদ্ধ হইয়া গেলে তাহাকে আবার যদি হিন্দু হইতে হয়, তবে তাহাকে শূদ্রই হইতে হইবে। এইরূপে সারা বাংলাই শূদ্র হইয়া গিয়াছিল। তাই রঘুনন্দন বলিয়া গিয়াছেন, বাংলায় ব্রাহ্মণ ও শূদ্র ভিন্ন অন্য বর্ণ নাই।

(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বাংলার সামাজিক ইতিহাসের মূল সূত্র, ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের ‘মাসিক বসুমতী’-তে প্রথম প্রকাশিত, নির্বাচিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০২, পৃঃ ২৭৯-২৮১)

সুতরাং, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-র বয়ান থেকে আমরা পাই: রাজ-রাজন্য-ব্রাহ্মণ-এর পাতলা আস্তরণটি তৎকালীন বঙ্গসমাজের উপর থেকে সরিয়ে নিলে পুরোটাই ছিলো বিভিন্ন বৃত্তিভিত্তিক মানুষদের নিয়ে গঠিত এমন এক গ্রামসমাজ যেখানে জাত-বর্ণ-ভিত্তিক ধাপবন্দি কাঠামো অনুপস্থিত; শাস্ত্রী মহাশয় সেই সর্বজনকে বৈশ্য আখ্যা দিলেও তা তাদের দেওয়া নিজ স্বপরিচয় নয়, তাদের বিবিধ বৃত্তিকে এই সাধারণ নামে শাস্ত্রী তাঁর নিজ অভ্যস্ত ভাষায় আখ্যায়িত করেছেন, বৈশ্য এখানে আর্য জাত-কাঠামোর ভিতরে কোনো অবস্থানকে বোঝাচ্ছে না; এই বিবিধ বৃত্তির মানুষজন একে অপরের সঙ্গে কর্মবিভাজন করে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে অভ্যস্ত ছিলেন (উদাহরণ: যারা লোহার কাজ করতেন) এবং ব্যবসা পরিচালনাও করতেন; আর্যাবর্ত থেকে আমদানি হওয়া ধাপবন্দি-কাঠামোয়-বাঁধা রীতি-নীতি-আচার-শাসন প্রত্যাখ্যান করে তাঁরা বৌদ্ধ-জৈন-আজীবক ও শেষাবধি ইসলাম ধর্ম অবলম্বনের মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আরো লক্ষণীয় যে, ওই উপরের তলার পাতলা ব্রাহ্মণ আস্তরণটি সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার ও চর্চাকেই তাঁদের করণীয় মনে করতেন। ফলে, শূন্য -পুরাণ-এর বয়ানে আমরা যে বাংলা ভাষার রূপ দেখতে পাচ্ছি, তার উৎস ও বিকাশ এই বঙ্গসমাজের অ-ব্রাহ্মণ অনার্য সিংহভাগ অংশের মুখের ভাষার মিশ্রণ ও মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। খ্রিস্টাব্দ তেরো শতকে এসে মুসলমান নবাবরা যখন বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করলো, তখন আধুনিক বাংলার কাছাকাছি বাংলার বহু আঞ্চলিক রূপ ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট চেহারা নিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন পল্লীগীতির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার সাহিত্য ভাণ্ডারও ভরে উঠেছে। এর আগের রাজতন্ত্র-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের জোট-শাসন এই ভাষা ও তার সাহিত্যকে কোনো গুরুত্বই দিতো না, মুসলমান নবাবদের আমলে এই বাংলা ভাষার পল্লী-কবিরাও রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করলেন, ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জাহির হয়ে উঠলো (যেমন, গৌড়ের নবাব রুকনুদ্দিন বরবক শা-র আদেশে ও পৃষ্ঠপোষণায় আনুমানিক ১৩৮১ থেকে ১৪৬১ খৃস্টাব্দের মধ্যে কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেন)। বৌদ্ধ-জৈন-প্রচারকদের বয়ে আনা মগধী প্রাকৃত, পালি, অর্ধমাগধী ভাষার বহু শব্দ আত্মসাৎ করে, পরবর্তীতে সুফি পীরদের বয়ে আনা ফারসি ভাষার বহু শব্দ গ্রহণ করে স্থানীয় লোকায়ত ভাষার কাঠামোর উপর ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিলো বাংলা ভাষা। তাই সংস্কৃত ভাষা কোনোমতেই বাংলা ভাষার উৎস বা ভিত্তি হতে পারে না। বরং, অনেক বেশি সম্ভবপর হলো ভাষাতাত্ত্বিক সুহৃদ কুমার ভৌমিক-এর এই মত:

বাঙলা ভাষার বিচারেও দেখা যায়— এটি দাঁড়িয়ে আছে খেরওয়াল গোষ্ঠীর ভাষার কাঠামোর উপর।

(সুহৃদ কুমার ভৌমিক, সাঁওতালি ছোটোগল্পের ভূমিকা, মারাংবুরু প্রেস, ২০০০, পৃঃ ১৩)

১৯০৯ সালে লেখা ‘শব্দতত্ত্ব’ নিবন্ধের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

…বলা বাহুল্য যথার্থ বাংলা ভাষা প্রাকৃত ভাষা, সংস্কৃত ভাষা নয়। প্রাচীন প্রাকৃতের মতোই বাংলা প্রাকৃতের বৈচিত্র্য আছে। চাটগাঁ থেকে আরম্ভ করে বীরভূম পর্যন্ত এই প্রাকৃতের বিভিন্নতা সুপ্রসিদ্ধ।…

(রবীন্দ্র রচনাবলী, ষোড়শ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০১৬, পৃঃ ২৭১)

ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ও এই মত ব্যক্ত করেছিলেন:

বাংলা ভাষাটা যে অনার্য ভাষার ছাঁচে ঢালা আর্য ভাষা, সেটাও ক্রমে ক্রমে লোকে মানবে, আচার্য মহাশয়েরা যতোদিন বাধা দিতে থাকবে, ততোদিন বাংলার ঠিক স্বরূপটি আমাদের বের করা কঠিন হবে।… কুক্ষণে এদেশে বিলেত থেকে নতুন করে ‘আর্য’ শব্দের আমদানি হয়েছিলো। ম্যাক্সমুলার-এর লেখা পড়ে আর নব্য হিঁদুয়ানি দলের বিজ্ঞান-ইতিহাস বদহজমের ফলে একটা নতুন গোঁড়ামি এসে আমাদের ঘাড়ে চেপেছে, সেটার নাম হচ্ছে ‘আর্যামি’। এই গোঁড়ামি আমাদের দেশে নানা স্থানে নানা মূর্তি ধরেছে— স্বাধীন চিন্তার শত্রু এই বহুরূপী রাক্ষসকে নিপাত না করলে ইতিহাস চর্চা বা ভাষাতত্ত্বের আলোচনা— কোনোটাই নিরাপদ হয় না।

(সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ১৯১৯ সালে বাংলা ভাষার কুলুজি, কৃষ্ণনগর নদিয়া সাহিত্য পরিষদের পঞ্চম বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত, ‘বাংলা ভাষা প্রসঙ্গে’ বইয়ে সংকলিত)

সুতরাং বাংলা ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষা থেকে নয়, বাংলা লোকসংস্কৃতিও বৈদিক আর্য বা ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিকদের সংস্কৃতি নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ নানা ধারা-উপধারায় ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও আর্য-শাসন-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী-প্রতিরোধী নানা স্রোত বয়ে চলেছে। স্ট্যালোন-মুখী হনুমানের পতাকা উড়িয়ে, রামভক্ত সোয়ারজিনেগারদের পল্টন লেলিয়ে দিয়ে, সরকারী হুমকি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করে আমলা-কেরানি-শিক্ষক-প্রভাষক-অধ্যাপক-গবেষক-দের বাবুসমাজকে আর্যায়িত করে তোলা যাবে হয়তো, কিন্তু এই বহুধারা বিশিষ্ট লোকসমাজকে অতো সহজে তা করা যাবে না, ফলে আমাদের স্বঘোষিত হিন্দু বীর-দের আঘাত-প্রত্যাঘাতের এক প্রলম্বিত হিংস্র অবদমনের চক্র হয়তো এখন শুরু হওয়ার মুখে।

প্রসঙ্গ ৪: আমাদের দুর্বলতার দিকগুলো নিয়ে কিছু কথা

হিন্দুত্ববাদের মোড়কে আগ্রাসী বিদ্বেষ ও কেন্দ্রীভূত জাতি-রাষ্ট্রের হিংস্র আধিপত্য আজ যে সর্বাত্মক চেহারা নিতে বসেছে তা অবশ্যই আমাদের সমাজ ও রাজনীতির বেশ কিছু দুর্বলতার কারণেই। এই দুর্বলতাগুলোকে আমি যেভাবে বুঝেছি তা দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— উপরিতলে ফুটে-ওঠা রোগচিহ্ন এবং গভীরে আড়ালে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা রোগমূল।

প্রথমে উপরিতলের রোগচিহ্নগুলোর কথায় আসা যাক। আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে বিদ্বেষী জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদ-এর বিকল্পগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। বামপন্থী, সমাজবাদী বা কম্যুনিস্ট নামধারী পার্টিগুলোও জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদ-এর প্রকল্পের বাইরে ভাবনা-চিন্তা-কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছে। পাকিস্তান-বাংলাদেশ-কে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘জাতীয় স্বার্থ’-র কথা যখন নিরন্তর ভীমগর্জনে ঘোষণা করা হতে থাকে, তখন এই বাম-সমাজবাদী-কম্যুনিস্টরাও (হয়তো বা নিজেদের চিন্তার দৈন্যের কারণে, ভিতরে ভিতরে নিজেরাও এই জাতীয়তাবাদের কর্কটরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে বা জাতীয়তাবাদের কড়া মদে মাতাল দঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে বিপরীত কিছু বলার সাহসের অভাবের কারণে) জাতীয় স্বার্থ, জাতির শত্রুদের নিধন, সেনার বীরত্বগাথা গাওয়া ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এই আক্রোশ ও অন্ধ হিংসার আবাদকে সার-জল যুগিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, এই হরেক বাম ছাড়া কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ অন্য দলগুলোও এই পরাক্রমী হিন্দুত্ববাদীদের আটকানোর জন্য সংবিধানকে একটা বিশাল হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরে। এ তো সাপকে রজ্জু ভ্রম করার মতো ব্যাপার। ভারতের সংবিধান যা হাজার হাজার ঔপনিবেশিক অগণতান্ত্রিক আইনকে বহাল তবিয়তে বজায় রেখেছে, রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা হ্রাস করে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়িয়ে ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীভবন করে রেখেছে, যার আধারেই জরুরী অবস্থা (ঘোষিত বা অঘোষিত) জারি থেকে শুরু করে UAPA-র মতো কালা আইন জারি হতে পারে, সেখানে নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতার কী আশ্বাস দেওয়া আছে বা ‘secular’ শব্দটি মুখবন্ধে ঢোকানো আছে, তা দিয়ে যে কী এসে যায় কে জানে! সংবিধানের জনক বলে যে আম্বেদকরের ছবি পোস্টার করে বাম-কং-অন্যান্যরা ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীভবন রুখতে চাইছেন সেই আম্বেদকরই যে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের কতো বড়ো সমর্থক ছিলেন এবং সে অনুযায়ী সংবিধানকে রূপ দিতে কী অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তা সংবিধান প্রস্তুতকারী কমিটির মধ্যে বিভিন্ন বিতর্কগুলো (যা কেন্দ্রীয় সরকারের ছাপাখানাই ছেপে বের করেছে, ফলে যা মোটেই দুর্লভ নয়) পড়লেই অতি স্পষ্ট হয়ে যায়।

ফলে বাম-কং-অন্যান্যদের এই জাতীয়তাবাদ-রাষ্ট্রবাদ-এর হিন্দুত্ববাদী স্তোত্রকে একটু সুর পাল্টে একটু মোলায়েম করে গাওয়ার ছল, এই সর্পকে রজ্জু ঠাউরানোর ভ্রম প্রকৃত অর্থে কোনো বিকল্পই হাজির করতে পারছে না। তাছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে তাঁরা বিকল্প কিছু বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন। হিন্দুত্ববাদীদের ক্রমশ নিখুঁত করতে থাকা এই হিংস্র অতি-কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র মূলগতভাবে পুঁজির অবাধ হিংস্র লুন্ঠনের থাবা হিসেবে কাজ করে। গোটা মধ্যভারতে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে জঙ্গল ধ্বংস করে বেদান্ত-টাটা-আম্বানি-আদানি-দের পাহাড় ধ্বংস করে খনিজ-ব্যবসা করার ব্যবস্থা করে দেওয়া আমরা দেখেছি, গোটা পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয় তৈরি করা আমরা দেখেছি, এখন গোটা নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে গিলে নিতে চাইছে, আরাবল্লী পর্বতমালাকে গিলে নিতে চাইছে, উচ্ছন্নে যাচ্ছে বিপুলাংশ জনতার জীবন-জীবিকা, ইকোলজিকাল সংকট হচ্ছে গভীরতর, এ ভয়ঙ্কর হিংস্র খেলা চলছে নিরন্তর। এ খেলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন’ (যেমন আপনাকে খুন করার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘স্বর্গের রথে তুলে দেওয়া’)। এ খেলায় হিন্দুত্ববাদীদের স্ট্রাইক রেট দুর্দান্ত। কিন্তু দুঃখের কথা যে আমাদের বাম-কং-তৃণমূল-অন্যান্যরাও এই খেলারই খেলোয়াড়, তাঁরাও নিজেদের স্ট্রাইক রেট বাড়াতে উন্মুখ, আর তাঁরাও চিল্লিয়ে একেই ‘উন্নয়ন’ বলে ঘোষণা করে চলেছে, কেবল হিন্দুত্ববাদীদের নয় তাদেরও ব্যাট করতে ক্রিজে পাঠাতে পুঁজিপতিদের কাছে দরবার করে যাচ্ছে। ফলে এই মূলগত দিক দিয়েও বিকল্প হাজির নেই।

এগুলো গেলো উপরিতলে ফুটে-ওঠা রোগচিহ্নের কথা। এবার আসা যাক গভীরে আড়ালে থাকা প্রাণঘাতী রোগমূলের কথায়। উপরে রাজনৈতিক পরিসরে যে খেলোয়াড়দের কথা বলা হলো, তারা সব পেশাদার রাজনীতিক। রাজনীতি তাদের পেশা: সুযোগ-সুবিধা, মান-সম্ভ্রম, সোনাদানা-শেয়ার-টাকা কামানোর উপায় (তার কোনটা দুর্নীতি আর কোনটা গঙ্গা-জলে-ধোয়া সুনীতি তা নিয়ে বেশ ভ্যাবাচ্যাকা লাগিয়ে দেওয়া ঝগড়াঝাটি কোস্তাকুস্তি চলে অহরহ)। ‘রাজনীতি করা’ নামক ক্রিয়াটি এখন এই পেশাদার রাজনীতিকদের একচ্ছত্র অধিকারের বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ কেবল সময়ে সময়ে ভোট দিয়ে তাঁদের মধ্য থেকে বেছে পঞ্চায়েতে/পুরবোর্ডে/সরকার-এ পাঠাবে, তারপর তাঁরা রাষ্ট্রের অন্যান্য শাখা-প্রশাখায় বসে থাকা অভিজাত বাবু সম্প্রদায়ের আমলা, বিশেষজ্ঞ, কোটাল, সেনাপতি-দের নিয়ে দেশ পরিচালনা করবেন, অর্থাৎ, বাড়ির পাশের মাঠটির কী হবে থেকে শুরু করে গাজায় হাজার হাজার মূতদেহ স্তূপীকৃত হলে সে মৃতদেহ মানুষের নাকি ছারপোকার তা ঠিক করে দেবেন। নতুন প্রজন্মের কাজ তাঁরা না ব্যবস্থা করে দিলে হবে না, পাড়ায় বা গ্রামে তীব্র জলের সংকট তাঁরা না সমাধান করে দিলে সমাধান হবে না, এলাকার কোনো সার্বজনীন ব্যবস্থা বা পরিষেবা তা-ও তাঁরা না ছক কষে দিলে হবে না। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা যে এই ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে গেছি, পেশাদার রাজনীতিকদের হাতে-পায়ে-ধরে চলা ছাড়া চলতে ভুলে গেছি, তার কারণ আমাদের সমাজটা শুকিয়ে গেছে। যখন সমাজ ছিলো, মানুষে-মানুষে চেনা-জানা-র ভরসা-করার আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো, তখন বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন ভাবনা-মতের মানুষরা এলাকার জনপদের নানা সার্বজনীন সমস্যা একে-অপরের বোঝাপড়া বা যৌথদায়িত্ব নেওয়া বা কাঁধে-কাঁধ দিয়ে সবার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সমাধান করে নেওয়া যেতো। পুকুর কাটা, পুকুর রক্ষণাবেক্ষণ করা, জমি-জিরেতের বিবাদ মেটানো, দুঃস্থের পাশে দাঁড়ানো নিজেদের জোরেই হয়ে যেতো, ফলে জীবনের একটা বড়ো অংশই নিজেরা যৌথভাবে পরিকল্পনা-পরিচালনা করা যেতো (শহরে এখন এসব কথা রূপকথার মতো শোনাবে, বহু প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে যদি কেউ যান, ধামসা-মাদল বাজিয়ে আদিবাসীদের নাচ দেখা বা ওই নাচের সারিতে ঢুকে ছবিতুলে এনে ফেসবুকে পোস্ট করা যদি আপনার উদ্দেশ্য না হয়, যদি আপনি তাদের মধ্যে তাদের মতো করেই অন্তত কিছুদিন কাটিয়ে তাদের জীবনধারা দেখার চেষ্টা করেন, তাহলে ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু রূপে হলেও এই যৌথতার কিছু আন্দাজ আপনি এখনও পাবেন)। যৌথ জীবনের পরিসর এই সমাজটাই শুকিয়ে গেছে (এমনকি যে আদিবাসী গ্রামগুলোর কথা বললাম সেখানেও SC/ ST-র সরকারী ভাতা ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বা আরো বর্ধিত হারে পাইয়ে দেওয়ার বা পড়শি জনজাতির চেয়ে বেশি পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে যৌথতা ভেঙে প্রতিযোগিতা-বিদ্বেষের আগাছা বোনা হচ্ছে, আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গেই কুরমিদের সঙ্গে সাঁওতাল ও ভূমিজদের যে দূরত্ব/অবিশ্বাস/ফাটল তৈরি হয়েছে তা এর একটি উদাহরণ)। যৌথ জীবনের পরিসরের উপরই গড়ে উঢ়তে পারে সর্বজনের অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবন-সমাজ-পরিবেশ সম্পর্কে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া, যৌথ পরিকল্পনা করা ও তা যৌথ উদ্যোগে লাগু করার রাজনৈতিক ক্রিয়া। এই রাজনৈতিক ক্রিয়া রাষ্ট্রীয় পরিসরের কেন্দ্রীকতার বাইরে দাঁড়িয়ে সর্বজনের আত্মশক্তির বিকাশ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের উদ্বোধন ঘটাতে পারে। ইউরোপে ও লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন গণআন্দোলনে বিপ্লবী অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষার কথা গত শতক থেকেই শোনা যাচ্ছে, তাও এই যৌথ সামাজিকতার পরিসরে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক স্বতঃক্রিয়ার একটি রূপ। সমাজ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এই প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ক্রিয়ার জমিটিও ক্রমশ অচাষযোগ্য হয়ে পড়ছে। ফলে বেশি বেশি করে মানুষরা যতো সমাজহীন একাকীত্বে ক্লিষ্ট অস্তিত্বে অবশ হয়ে উঠছে, ততোই তার রাজনীতির জগৎ হয়ে উঠছে প্রকৃত অর্থে তার নিজের নিষ্ক্রিয়তার জগৎ। সে নিজে নিষ্ক্রিয়, কেবল পেশাদার রাজনীতিকদের নাটুকেপনা দিয়ে রাষ্ট্রীয় মঞ্চে যখন যে নাটক তৈরি করা হচ্ছে, সে কেবল জমকদার প্রদর্শনী হিসেবে তা চেঁটেপুটে খাচ্ছে। এভাবে কেবল রাজনীতি-নাট্যের দর্শকে পরিণত হয়ে সে তার উপরে নামা আক্রমণগুলো প্রতিহত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। রাজনীতি যখন জমকদার এক প্রদর্শনী, যাকে ইংরেজিতে বলে spectacle, তখন মিথ্যা-ভাঁওতা-ভ্রম কী দিয়ে জমকটি তৈরি করা হলো তা অবান্তর, কেবল কতোটা জমক তৈরি হলো সেটাই বিবেচ্য। মিথ্যা-ভাঁওতা-জমক দিয়ে গড়া simulation-টাই তখন বাস্তবের চেয়ে বেশি বাস্তব। আর এই জমকদার বাস্তবকে মগজের ভিতরের দেওয়ালগুলোয় টাঙিয়ে নিয়ে একাকীত্বে ক্লিন্ন মানুষগুলো তখন নেশার উত্তেজনা খোঁজে জমকদার কোনো ইভেন্টে— যতো হিংসা-বিদ্বেষ রগরগে হয়ে উঠবে ততোই না ইভেন্ট জমকদার হয়ে উঠবে— ফলে উত্তেজক স্লোগান চিৎকার করতে করতে মস্তিষ্কে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষজন দঙ্গল (mob) হিসেবে জড়ো হবে, স্তালোনমুখী হনুমানের পতাকা পতপত করে উড়বে, হিংসা-হত্যা-দাঙ্গা পরিণত হবে উত্তেজক এক খেলায়।

উপসংহারের বদলে

আগেই বলেছি, ভাঁড়ের মুখোশ পরা দাঙ্গাবাজ রূপী ‘হিন্দু’ হতে যাদের গা-ঘিনঘিন করে তাদের জন্য আমার এই লেখা। এই লেখার মদ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থায় আমার বিপন্নতাবোধের কথা যেমন খুলেমেলে বলেছি, যে দুর্বলতার কারণে এখানে এসে আজ পৌঁছতে হয়েছে তা-ও যতোটা ভাবতে পারি বলেছি। বলেছি এই কারণেই যে আপনাদের ভাবনাগুলোও জানতে চাই, আপনাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতিতে উপশমকারী রাজনৈতিক স্বতঃক্রিয়া সম্পর্কে ভাবতে চাই, আপনাদের সঙ্গে যৌথভাবেই সক্রিয় হতে চাই। তাই আপনাদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes