বাংলা উপন্যাসে বাস্তব: সমস্যা ও সম্ভাবনা   সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়

বাংলা উপন্যাসে বাস্তব: সমস্যা ও সম্ভাবনা সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়

 

বাস্তব যে এক বহুতলিক নির্মাণ— একুশ শতকের এই উপদ্রুত সময়রেখায় দাঁড়িয়ে— এবং গত দুই শতকের বিশ্ব-উপন্যাসের দিগন্তে চোখ রাখলে— তা এখন প্রশ্নোর্ধ্ব। সাহিত্য দর্শন মনোবিশ্লেষণ ও ভাষাতত্ত্বের বিবিধ শাখায় অনলস গবেষণা ও নিরীক্ষা বাস্তবের একরৈখিক সংজ্ঞায়নকে ছিন্নভিন্ন করেছে এতদিনে। বাংলা উপন্যাসকে প্রথম থেকেই বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ ও সংঘাতের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে অজানিত ভবিষ্যতের দিকে— সেই বঙ্কিমের আমল থেকেই। যে কারণে ‘চন্দ্রশেখর’-এ আখ্যান বাস্তবানুগ হলেও সেখানে নাটকীয়তার পাশাপাশি ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শৈবলিনীর Delusion ও Dream Psychosis। কিন্তু উপন্যাস যে মুখ্যত তথ্য ও বাস্তবকে ঘিরেই নিজেকে গড়ে নিতে চায়— এই সরলীকৃত সমীকরণটি খুব বেশি ঔপন্যাসিক নস্যাৎ করেননি এই ভাষায়। এখন সেই চিরাগত প্রশ্নটির মুখে আবারও দাঁড়াতে হবে আমাদের— বাস্তবের অনুপুঙ্খ অনুকৃতি কি নির্দ্বন্দ্বে শিল্পোত্তীর্ণ বলে গৃহীত হবে? বাস্তবের অনুকরণে যে শিল্প গড়ে ওঠে— হৃদয়গ্রাহী হলেও সেই কারুনির্মাণ কি শিল্পপদবাচ্য? সহজে ভাবলে মনে হয় তা তো একটি ধ্রুপদী ফোটোগ্রাফ মাত্র। তার মধ্যে লেখকের যন্ত্রণার সাক্ষর কোথায়— অভিজ্ঞতার অনুক্ত ব্যঞ্জনা কোথায়? কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে— ইয়ুরোপের অনেক পরে— যখন এই বঙ্গদেশেও Realism-এর যুগ দৃশ্যত শেষ হল— তখনও দেবেশ রায়ের বৃত্তান্ত-সাহিত্যে যে Infinite Detailing-এর লক্ষণ দেখা যায়, তা তো বাস্তবের ভিত্তিকেই আরও সুদৃঢ় করে তোলে। যদিও এ-কথাও অনস্বীকার্য— সুদৃঢ় করলেও তা বাস্তবকে ভেদও করে যায় কখনো— এক-একটি মুহূর্ত এমন দীর্ঘায়িত হয়ে ওঠে যে স্থান ও সময়ের স্বতঃসিদ্ধ ধারণা চূর্ণ হয়। ফলস্বরূপ এই কথনক্রিয়া বাস্তবের scope-কে— অবস্থাকে— আরও প্রসারিত করে। এই Narrative style ইতিমধ্যে প্রসিদ্ধ— বৃত্তান্ত-সাহিত্যে প্রযুক্ত Novelization— যা নিয়ে বঙ্গদেশের তাত্ত্বিক পরিসরে আরও আলোচনা দরকার। তথ্য আহরণ ও অনুপুঙ্খ অনুকৃতি— Realism দাঁড়িয়ে আছে এই দুই সন্দেহদীর্ণ অথচ অপরিত্যাজ্য স্তম্ভের ওপর। সাধারণত, এমন ধারণা আমাদের রয়েছে, মহৎ লেখক বাস্তবকে ভেদ করে তার পরপারে পৌঁছাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন— বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধেও এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা দেখি। এবং দৃষ্টান্তও নেহাত কম নেই আমাদের হাতে।
ভেবে দেখলে— মনস্বী বাঙালী পাঠকের প্রধানত দুই ধারার উপন্যাসের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ। এক— যে উপন্যাস ভাষাকৃতির কারণেই উজ্জ্বল। যেমন কমলকুমার মজুমদার— বহু বিদগ্ধ কমলকুমার-আলোচক যদিও সতর্ক করে দিয়েছেন, পাঠক যেন ওঁর ভাষা-বলয় ভেদ করতে না-পেরে ভাষার স্তরপরম্পরায় হারিয়ে না যান, এবং বিশ্বাস না করে বসেন অন্তর্বস্তুহীন ওই ভাষাকৃতিই একমাত্র বিবেচ্য— কিন্তু তা-সত্ত্বেও পাঠক-সমাজে এখনো কমলকুমারের প্রসিদ্ধি প্রধানত ভাষাভঙ্গিমার কারণেই। কিন্তু এ-কথাও অনস্বীকার্য— অন্তর্বস্তু বিবেচনায় না-আনলেও কমলকুমারের ভাষা-ভাষ্কর্যের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অবিচল থাকবে— শুধু ওই গদ্যভাষার জন্যেও ওই উপন্যাসগুলি স্মরণীয়। শুধু কমলকুমারই বা কেন— অমিয়ভূষণ মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, এমনকি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কেও এই কথা বলা চলে। কমলকুমারের শ্রেষ্ঠ পাঁচটি উপন্যাসে— ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘গোলাপ সুন্দরী’, ‘সুহাসিনীর পমেটম’, ‘খেলার প্রতিভা’ ও ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’— ফর্ম ও ন্যারেটিভ স্টাইল নিয়ে যে অননুকরণীয় নিরীক্ষা চোখে পড়ে— কলাবৈভবের যে আশ্চর্য পরিচয় পাওয়া যায়— তা যদি অন্তর্বস্তুহীনও হয়— তা-ও আমাদের এক অনুপেক্ষণীয় সৌন্দর্যানুভূতির দিব্যতায় শিথিল করবে। এবং ভেবে দেখলে, ভাষাবিন্যাস যখন এই তুরীয় সংস্থান স্পর্শ করে— তখন সেই ভাষা স্বয়ং হয়ে ওঠে অন্তর্বস্তু— বিষয় থেকে সে আর পৃথক থাকে না। বাক-ভঙ্গি থেকে উদ্গত সৌন্দর্যচেতনাই তখন বিবেচ্য— অন্যকিছুর আগে।
এইবারে দ্বিতীয় ধারাটির প্রসঙ্গে আসা যাক। দ্বিতীয় ধারাটি হল যে উপন্যাস discourse-এর জন্ম দেয়। Discursive Space-কে সচেতনভাবে যে উপন্যাস তার শরীরে ধারণ করে রাখে। আলোচনা— তর্ক বিতর্ক প্রতর্ক— যে উপন্যাসের অংশ। প্রবন্ধকে আত্মসাৎ করে যে উপন্যাস নিজেকে গড়ে তুলেছে। এই ধারার প্রথম উজ্জ্বল উদাহরণ কি ‘গোরা’? না, তা নয়। কিন্তু ‘গোরা’-এ এই প্রবণতার এমন স্পষ্ট সাক্ষর দেখা গেল— তা যে ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবেই, তা নিয়ে সংশয় ছিল না। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘অন্তঃশীলা’-এর কথাও বলতেই হয় এই প্রসঙ্গে। চৈতন্যের উদ্ঘাটনক্রিয়া— ইয়ুরোপ-জুড়ে প্রসিদ্ধ ওই কথনক্রিয়ায় নির্মাণ করলেন ওঁর উপন্যাসটি ধূর্জটিপ্রসাদ— কিন্তু তবুও উপন্যাসের অনিবার্য অংশ হয়ে থাকলো Discussion— উপন্যাস-তত্ত্ব থেকে সাংখ্য দর্শন— বিবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা। এই আলোচনা ও তর্ক-প্রবণতার ক্বচিৎ স্ফূরণ জীবনানন্দের ‘সফলতা-নিষ্ফলতা’-এ রয়েছে— যে-উপন্যাসটি ১৯৩২ সালে লিখেছিলেন জীবনানন্দ— প্রথানুগ উপন্যাসের ধারণাকে অস্বীকার করেই। এই ধারা প্রকৃতপ্রস্তাবে এমনই ঐশ্বর্যময়— যে তা নির্ভাবনায় দীর্ঘতর আলোচনা দাবি করে। তবে সবচেয়ে অমোঘ নিদর্শন সম্ভবত— আমার মতে— অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘ক্রান্তদর্শী’। হ্যাঁ— ‘সত্যাসত্য’-এর বদলে আমি ‘ক্রান্তদর্শী-এর কথাই বলবো। অনন্ত আলোচনার অলঙ্কার— জন্মকবচ— অঙ্গে নিয়ে এই উপন্যাসের জন্ম হয়েছিল। ইন্টালেকচ্যুয়াল নভেলের যাবতীয় ধারণাকে মান্যতা দিয়েই হয়তো। স্বাধীনতা-সংগ্রাম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসের কাহিনি রচিত হয়েছে। কিন্তু কাহিনি নামমাত্রেই— আদতে এই উপন্যাস এক আলোচনা-মালা। রাজনীতিই তার মুখ্য বিষয়। ভাষা সরল— সাদামাটা— কখনো সংলাপে Melodrama-ও লক্ষিত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে— শুধু ঔপন্যাসিক নয়— অন্নদাশঙ্কর ওই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকদের একজনও বটে। কিন্তু আরেক তৎকালীন প্রাবন্ধিক— বুদ্ধদেব বসু— তাঁর গদ্যভাষার জন্যে যতো-না মনোযোগ দাবি করেন পাঠকের— অন্নদাশঙ্কর তা করেন না। অন্নদাশঙ্করের সমগ্র ঐশ্বর্য তাঁর ভাষায় নয়— চিন্তায়। কথনে নয়— তর্কে। ন্যারেটিভে নয়— ডিসকোর্সে। উপন্যাসের এই ধারাটি যে আমাদের চেতনা ও মেধাকে যুগপৎ প্রশ্ন ও প্রসারিত করে— তা বলাই বাহুল্য।
এখন ফিরে আসি সূচনাবিন্দুতে— যে প্রশ্ন থেকে অনুসন্ধান শুরু করেছিলাম আমরা— বাস্তবের নিপাট সরল অনুকরণে যদি রচিত হয় শিল্প, তা কি বর্জন করবে মনস্বী পাঠক? ‘অন্তর্জলী যাত্রা’-এর পাশে কি বিভূতিভূষণের ‘অনুবর্তন’ বস্তুত অনুজ্জ্বল? ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে— ‘ইছামতী’-কে সর্বান্তঃকরণে প্রত্যাখ্যান করে আধুনিক পাঠক নির্দ্বিধায় গ্রহণ করবেন অমিয়ভূষণের ‘চাঁদবেনে’-কে? না। Realism-এর যুগ ফুরিয়ে যেতে পারে— কিন্তু আবেদন নিঃশেষিত হয়নি এখনো। বিভূতিভূষণ— একজন প্রকৃত Realist লেখকের মতোই ‘পথের পাঁচালী’, ‘ইছামতী’, ‘অনুবর্তন’— এমনকি তার ভিন্নধর্মী উপন্যাস ‘অথৈ জল’-এ— বাস্তবের পরপারে সজ্ঞানেই পৌঁছতে চাননি। বরং বাস্তবের বিবিধ বাঁকে, খাদে, যে মর্মন্তুদ মজা— যে অননুকরণীয় ট্রাজেডি— তারই শিল্পিত রূপায়ণ চেয়েছেন। নিপাট সরল সাদামাটা ঘটনাবিহীন জীবনকেই অন্তর্ভেদী মনোযোগে লক্ষ করেছেন বিভূতিভূষণ— ইংরেজরা যাকে বলেন meticulously— এবং আবিষ্কার করতে চেয়েছেন সেই সারল্যের রহস্য— দৈনন্দিনতার আবেগই ওঁকে আচ্ছন্ন করেছে— নির্জ্ঞানের সংকেত নয়। এক গভীর আধ্যাত্মিক বোধ চালিত করেছে বিভূতিভূষণকে— এই বোধই ছিল ওঁর সৌন্দর্যচেতনার উৎসে— প্রজ্ঞা নয়, বোধ— এই বোধের হদিস পাওয়া যায় ওঁর জার্নালে, ডায়রিতে। বিভূতিভূষণের সৌন্দর্যচেতনাও একরৈখিক নয়— সামগ্রিক বাস্তবের যে মায়া— পরিহাস ও বিপন্নতা, দুইই যে মায়ার অংশ— তা-ই বিভূতিভূষণের বিষয়। ওঁর Realism প্রমাণ করে একটি নৈর্ব্যক্তিক ডায়রির পৃষ্ঠাও রসোত্তীর্ণ— যদি তার মধ্যে অনুধাবনশক্তির সাক্ষর থাকে। বাস্তবের বাঁকে-বাঁকে যে ট্রাজেডি— তাকে বোঝার তাগিদ ও ধৈর্য থাকে যদি। ফলত, Realism-এর আবেদন প্রকৃতপ্রস্তাবে অনিঃশেষ— এবং খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় বঙ্গসাহিত্যে তার যুগও শেষ হয়নি। এই বক্তব্যের পক্ষে সর্বোৎকৃষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে সম্ভবত শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শেষ ও অসমাপ্ত উপন্যাস— ‘আলো নেই’। ইতিহাসাশ্রয়ী— ‘ইছামতী’-ই ছিল এই উপন্যাসের মডেল— এবং কেবল বাস্তবকে অনুসরণ করেই— বাস্তবানুগ তথ্য ও চিহ্নসমূহের প্রভাবেই— এই উপন্যাস অগ্রসর হয়েছে। অথচ তা অন্তর্দৃষ্টির আলোয় প্রোজ্জ্বল। এক আগ্নেয় কালখণ্ডে খুলনার একটি সাধারণ পরিবারের কাহিনি পাঠকের মর্ম আক্ষরিক অর্থে স্পর্শ করে— সংবেদনে নাড়া দেয়— Realism-এর অভ্রস্পর্শী পতাকা সগৌরবে ঊর্ধ্বে উড়িয়ে।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes