
অন্ধেরা, নির্বোধেরা
রাহুল দাশগুপ্ত
১
হ্যালো…
কে বলছেন?
আমি কার্ল মার্কস বলছি…
কী নাম?
কার্ল মার্কস।
কার্ল মার্কস। ও আচ্ছা। কী চান আপনি?
সম্পাদক আছেন?
আছেন। ব্যস্ত আছেন।
আমি ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
ওই যে বললাম, উনি ব্যস্ত আছেন।
আপনি কে বলছেন?
আমি? আমি কেউ না।
মানে?
এই অফিসের একজন সাধারণ কর্মচারী।
আপনার নামটা জানতে পারি কি?
আমার নাম? আমার আবার নাম কি? যে যেমন ডাকেন। আমি কর্মচারী। আমার আর কোনও পরিচয় নেই।
সম্পাদক মশাইকে কখন পাওয়া যাবে, বলতে পারেন?
দাঁড়ান, একবার জিগ্যেস করে আসি…
কয়েক সেকেণ্ড চুপচাপ।
হ্যাঁ, শুনছেন?
বলুন।
কী যেন আপনার নাম?
কার্ল মার্কস।
ও হ্যাঁ। কী যে খটমট নাম! আপনি মশাই আধ ঘন্টা পরে ফোন করুন। সম্পাদক মশাইকে আমি বলে রেখেছি।
আচ্ছা।
২
হ্যালো।
বলুন।
সম্পাদক মশাই আছেন?
বলছি।
আমার নাম কার্ল মার্কস।
কী নাম?
কার্ল মার্কস।
হ্যাঁ, বলুন।
আমি একটা আর্টিকল লিখেছি…
কী ব্যাপারে? অঙ্ক-টঙ্ক নয় তো?
অঙ্ক? না তো…
ওসব আবার আমাদের কাগজে চলে না…
ও, তাই বলুন।
আপনার নামেই আবার মার্কস, টার্কস আছে কী না। তাই ভাবলাম….
না, না। আমার আর্টিকলটা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে…
কী নাম আপনার আর্টিকলের?
এইট্টিন্থ ব্রুমেয়ার অফ লুই বোনাপার্ত…
ওঃ! যেমন খটোমটো নাম আপনার, তেমনই আপনার আর্টিকলের! এই এদিকে শোন তো…
হ্যাঁ, স্যার।
সকালে যে অর্ডারটা দিয়েছিলাম…
জানিয়ে দিয়েছি, স্যার।
ডেটটা বলে দিয়েছিস তো? একদিনও দেরি হলে কিন্তু চলবে না…
হ্যাঁ, স্যার।
এটাই কিন্তু আমার স্ট্যান্ডিং অর্ডার। সম্পাদকের গলায় এবার কর্তৃত্বের সুর ফুটে উঠল। বলে দিস…
নিশ্চয়ই স্যার।
লেখাটা কি একবার দেখবেন? কার্ল মার্কস বিনীতভাবে জানতে চাইলেন।
তা আনতে পারেন।
কবে আসব?
কালই আসুন না। শুভস্য শীঘ্রম…
কখন আসব?
এই ধরুন, সকাল এগারোটা।
ঠিক আছে।
৩
খবরের কাগজের অফিস। মার্কস বাইরের একটা ঘরে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন। তাঁর হাতে একটা ফাইল। দু-হাত দিয়ে আঁকড়ে ফাইলটাকে তিনি বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে আছেন। ভেতর থেকে খুব হইহল্লার আওয়াজ ভেসে আসছে।
একটি সুন্দরী মেয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। মার্কস সসংকোচে বলে উঠলেন, সম্পাদক মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?
আছে।
অপেক্ষা করুন। উনি ব্যস্ত আছেন।
মেয়েটি চলে গেল।
আধ ঘন্টা পরে তাঁর ডাক এল। একটি কাচ দিয়ে ঘেরা ঘরে মার্কস প্রবেশ করলেন। সম্পাদক বসে আছেন। অল্প বয়স। দাড়ি-গোঁফ কামানো নিখুঁত চেহারা। রূপবান যুবক। মার্কসকে দেখে মিষ্টি হেসে বিনীত স্বরে বললেন, স্যরি, একটু দেরি হয়ে গেল।
মার্কস লাজুক হেসে বললেন, না, না, তাতে কী?
আসলে কী জানেন…
মার্কস মুখ তুলে তাকালেন।
হরিদাস পাল এসেছেন। ওঁকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম না। ওই দেখুন…
কাচের ফাঁক দিয়ে মার্কস দেখলেন। হরিদাস পাল দাঁড়িয়ে আছেন।
তাঁর মাথায় টাক। শীর্ণ চেহারা। গায়ের পাঞ্জাবিটি জমকালো। তাঁকে গোল হয়ে ঘিরে আছে সুন্দরী যুবতিরা। তারা অনর্গল কথা বলে চলেছে। হেসে গড়িয়ে পড়ছে এ ওর গায়ে। সকলের মধ্যেই কেমন যেন একটা বর্তে যাওয়া ভাব। আর হরিদাস পাল মাঝে মাঝে কথা বলছেন, কখনও হাসছেন, আর এইভাবে তিনি যেন ভিড়টাকে একেবারে ধন্য করে দিচ্ছেন। যুবতিরা কেউ তাদের খোলা পিঠ এগিয়ে দিচ্ছে, কেউ খোলা কাঁধ, কেউ গলা, কেউ গাল, কেউ বগল, কেউ স্তনসন্ধির ওপরের খোলা অংশটা। হরিদাস পাল অকাতরে সেসব জায়গায় সই বিলিয়ে চলেছেন।
কার্ল মার্কস মুচকি হাসলেন।
সম্পাদক বললেন, লেখাটা এনেছেন?
কার্ল মার্কস ফাইল খুলে লেখাটা বার করে সম্পাদকের দিকে এগিয়ে দিলেন।
সম্পাদক বললেন, দেখুন, আমার হাতে তো কিছু নেই। লেখাটা আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমাদের একটা এডিটোরিয়াল বোর্ড আছে। ওরাই যা ডিসিশন নেবার নেবে…
এটা একটা জরুরি লেখা। মার্কস একটু সংকোচ নিয়েই বললেন।
আচ্ছা। সম্পাদক মার্কসের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বললেন, আপনি আর কিছু লিখেছেন? নাকি এটাই প্রথম লেখা?
না। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমি লিখেই থাকি। একটা বই-ও লিখেছি।
কী নাম?
ডাস ক্যাপিটাল।
ও।
লেখাটা সিলেক্টেড হল কী না…
আপনি ফোন করে জেনে নেবেন…
কবে?
অন্তত এক বছর পর। আমাদের এখানে এত লেখার চাপ…
আচ্ছা।
8
গলির পর গলি। ডানদিকে বাঁদিকে সরু সরু গলি। মার্কস অনেক খুঁজেপেতে শেষপর্যন্ত বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কলিংবেল বাজালেন।
তুমিই কাল?
হ্যাঁ। তবে কাল নই, কার্ল…
ও আচ্ছা।
তুমিই ডাস ক্যাপিটাল লিখেছো?
হ্যাঁ।
তোমার পি এইচ ডি আছে?
হ্যাঁ।
ভেতরে এসো।
ছেলেটি সামনে ছিল। কার্ল মার্কস তার পিছন পিছন যেতে লাগলেন। একটার পর একটা ঘর পেরিয়ে ছেলেটি এগোচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত একটা ঘরে এসে ছেলেটি বলল, এখানে বসেই তোমাকে কাজ করতে হবে।
মার্কস ছেলেটির দিকে ভালো করে তাকালেন। ওঁরই বয়সি হবে। নাঃ, বয়সে আরও ছোটোই হবে। অথচ কী অবলীলায় ওঁকে ‘তুমি, তুমি’ করে কথা বলছে!
কার্ল মার্কস বললেন, ঠিক কী কাজ করতে হবে আমাকে?
প্রুফ দেখতে হবে। আর…
মার্কস চোখ তুলে তাকালেন।
দেরি করলে চলবে না। এক মিনিটও না। সময়টা ঠিক রাখতে হবে।
আমি দেরি করি না।
আজ কিন্তু দেরি হয়েছে।
তা ঠিক। জায়গাটা আমি চিনি না। অনেক খুঁজতে হয়েছে। এত গলি….
কাল থেকে কিন্তু…
একটা কথা ছিল…
হ্যাঁ, বলো।
আমাকে প্রফেসর গিরিধারী নস্কর পাঠিয়েছেন….
উনি আমার বাবা।
জানি।
আমার একটা পি এইচ ডি আছে। ডক্টরেট।
হুম। বায়োডাটায় দেখলাম।
একটা বই লিখেছি। ডাস ক্যাপিটাল।
সেটাও তো বায়োডাটায়…
গিরিধারী বাবুকে আমি বলেছিলাম, যদি রিসার্চের কোনও কাজ-টাজ থাকে…
তাহলে তুমি এক কাজ করো।
হ্যাঁ, বলুন।
বাবাকে একটা ফোন করে নাও।
তাই ভালো।
পাশের ঘরটা ফাঁকা আছে।
একটু পরে কার্ল মার্কস ফিরে এলেন। তারপর সসম্ভ্রমে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাকে মাফ করবেন। আমি ঠিক এই কাজের উপযুক্ত নই…
৫
আমি একটু ক্ষেমলতা দেবীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?
না।
তাহলে তো সম্ভব নয়।
আমার খুব দরকার।
নাঃ, অসম্ভব।
মাত্র পনেরো মিনিট হলেই চলবে।
উনি এইভাবে কারও সঙ্গে দেখা করেন না।
একটা বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার…
কী নাম আপনার?
কার্ল মার্কস।
ওঁর সঙ্গে যে কেউ দেখা করতে পারে না। তার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি দরকার। যিনি ওঁর সম্পর্কে জানেন। ওঁর লেখা পড়েছেন। ওঁর সঙ্গে কথা বলার যোগ্যতা যার আছে…
আমি ওঁর সব লেখাই পড়েছি।
আপনার নাম, কী যেন বললেন…
কার্ল মার্কস…
আমি আপনার নাম শুনিনি।
৬
স্যার নিমাই মাঝি বসে আছেন।
কার্ল মার্কস বিনীতভাবে বললেন, তাহলে স্যার আইডিয়াটা কেমন লাগল?
দুর্দান্ত।
আপনি রাজি, স্যার?
নিশ্চয়ই।
আপনি প্রোজেক্টের দায়িত্বটা আমাকেই দিতে পারেন।
আচ্ছা।
কথাটা মাথায় রাখবেন।
ঠিক আছে।
ঠিক সেই সময় একদল মেয়ে হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। স্যার নিমাই মাঝির মুখ হাসিতে ভরে উঠল।
যে মেয়েটি সবথেকে সুন্দরী, তার বুকের দিকে তাকিয়ে স্যার নিমাই মাঝি বলে উঠলেন, আমার কাছে একটা প্রপোজাল এসেছে। কাজটা করবে, মায়া?
মায়া বলল, কি স্যার?
নিমাই মাঝি বিস্তারিতভাবে বললেন। তারপর যোগ করলেন, আমার খুব ইচ্ছা…
মায়া বলল, করব।
বাকি মেয়েরা সজোরে হাততালি দিয়ে উঠল।
স্যার নিমাই মাঝি কি কার্ল মার্কসের কথা ভুলে গেলেন? অথচ তিনি যে প্রপোজালটা নিয়ে আলোচনা করছেন, সেটা তো একটু আগে ওঁরই দেওয়া। কার্ল মার্কসের আইডিয়া। এতক্ষণ ধরে সেটাই তো উনি স্যার নিমাই মাঝিকে বোঝাচ্ছিলেন।
স্যার নিমাই মাঝির টেবিলের ওপর একটা মোটা বই রাখা। ডাস ক্যাপিটাল। সেদিকে তাকিয়ে মায়া বলে উঠল, কী মোটা বই রে বাবা! এত মোটা বই কেন যে কেউ লেখে! আজকালকার দিনে কারও পড়ার সময় আছে?
এতক্ষণে স্যার নিমাই মাঝির আবার কার্ল মার্কসের দিকে চোখ গেল। তিনি বললেন, ঠিক আছে, আপনি এখন যেতে পারেন।
কার্ল মার্কস উঠে দাঁড়ালেন।

