মার্কসবাদ এবং লুই আলথুসার <br /> শ্যামল ভট্টাচার্য

মার্কসবাদ এবং লুই আলথুসার
শ্যামল ভট্টাচার্য

 

 

মার্ক্সীয় দর্শনে আলথুসারের একটা বিরাট বড় অবদান হলো, Ideology বা মতাদর্শকে ব্যাখ্যা করা। আলথুজারের কাছে Ideology বা মতাদর্শ রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি রাষ্ট্র এবং মতাদর্শের ধারণাকে মিলিয়ে একটি পরিভাষা তৈরি করেছিলেন যাকে সংক্ষেপে বলা যায় ISA অর্থাৎ Ideological State Apparatus। তিনি বলতে চেয়েছেন যে রাষ্ট্রীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠান তা শিক্ষামূলক বা ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বা মাস মিডিয়া যা কিছু হতে পারে সবই শাসক শ্রেণীর  অচলায়তনকে সমর্থন করে এবং বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থাগুলির পুনরাবৃত্তি বজায় রাখে। রাষ্ট্র আইন শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবার ব্যবস্থা শিল্প গল্প বিভিন্ন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিছুই নিরপেক্ষ নয়। এইসবই রাষ্ট্রের ভাবাদর্শগত অ্যাপারেটাস বা যন্ত্রপাতি  যেগুলি ব্যবহার করে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র এই সবই সামাজিক বাস্তবতাকে এবং তার ভিতরে ঘটে চলা শ্রেণী সম্পর্কের দ্বন্দ্বগুলিকে আড়াল করে চলে। আদর্শগত নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ারই হল সংস্কৃতি। একটি নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রে তাই সংস্কৃতি জনগণকে সচেতন করে তোলার বদলে অচেতন এবং অনুগত বিষয় হিসেবে গড়ে তোলে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা পুঁজিবাদী সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

 

তবে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে আলথুজার ইডিওলজি বা ভাবাদর্শকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তার মতে ইডিওলজি বা ভাবাদর্শ সামাজিক ব্যক্তির চেতনা আচরণ এবং পরিচয় গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে যা সেই সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলে তা বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্কে সঙ্গেও জড়িত। অর্থাৎ আলথুজারের কাছে ইডিওলজি বা ভাবাদর্শ কেবল ধারণা মাত্র নয় বরং একটি বস্তুগত অনুশীলন যা প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমগুলির ভিতর দিয়ে সমাজের ব্যক্তিদের অন্তর্নিহিত বা interpellate করার জন্য পরিচালিত হয়। এই ইন্টারপেলেশন (Interpellation) হল আলথুজারের নির্মিত আরো একটি পরিভাষা। সাদা বাংলায় এই ইন্টারপেলেশনকে অধীনস্থ করে তোলার পদ্ধতি হিসেবে বোঝা যেতে পারে। এই ইন্টারপেলেশনের ধারণাটি আলথুজারের তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি যুক্তি দেন যে ইডিওলজি বা মতাদর্শ সমাজের ব্যক্তিদের অনুগত হিসেবে ইন্টারপেলেট করে যার অর্থ এটি তাদের একটি সামাজিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে এবং তাদের পরিচয় ও উদ্দেশ্যের একটা বিভ্রান্ত চেতনা তৈরি করে। এইভাবে ইন্টারপেলেসনের মাধ্যমে ব্যক্তিরা নিজেদেরকে স্বাধীন হিসেবে বিবেচনা করতে থাকেন যারা স্বেচ্ছায় চলমান সামাজিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে তারা এই বিদ্যমান সমাজের অন্তর্নিহিত কাঠামোর ভিতরে স্বেচ্ছায় শোষিত হওয়ার সম্মতি দিতে থাকেন। অর্থাৎ আলথুজারের কাছেই এই ভাবাদর্শগুলি নিরপেক্ষ বা বস্তুনিষ্ঠ নয় বরং তা কাল্পনিক এবং এই ভাবাদর্শগুলিকে সুকৌশলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের নিয়ম নীতি এবং আচরণগুলির মধ্যে দিয়ে রহস্যময় হিসেবে মানুষের মনের ভিতরে বজায় রাখে কেননা এই ভাবেই এই ভাবাদর্শগুলি সমাজে চলমান শোষণ এবং নিপীড়নের বাস্তব সম্পর্কগুলিকে বিকৃত এবং আড়াল করে। অর্থাৎ ইডিওলজি বা ভাবাদর্শগুলির প্রধান কাজ হল অন্তর্নিহিত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকে অস্পষ্ট করে রাখা। শেষ কথায় ইডিওলজি বা ভাবাদর্শ মূলত শোষণমূলক সমাজে শ্রেণী আধিপত্যের একটি হাতিয়ার। এই ইডিওলজি বা মতাদর্শ শোষণ ও নিপীড়নের সম্পর্ককে রহস্যময় করে তোলে যা শাসক শ্রেণীকে তার ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

 

আলথুজার তার এই Ideological State Apparatus বা রাষ্ট্রের ভাবাদর্শগত যন্ত্রপাতি বা হাতিয়ারগুলোকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই প্রতিটি হাতিয়ারই হল এক একটা অজবরদস্তি মূলক প্রতিষ্ঠান যারা সরাসরি বল প্রয়োগের পরিবর্তে আদর্শের মাধ্যমে কাজ করে এবং সমাজের ব্যক্তিদের বিদ্যমান সামাজিক শৃংখলার ভিতরে সংগতিপূর্ণ আনুগত্যে অন্তর্ভুক্ত করে।

 

এই Ideological State Apparatus এর শুরুতেই আছে, শিক্ষা ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী সমাজে বিদ্যালয়গুলি সবসময়ই শাসক শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যবোধ নিয়ম এবং জ্ঞান উপস্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ, পাঠক্রম প্রায়শই ব্যক্তিবাদ, প্রতিযোগিতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারার যোগ্যতার উপরে জোর দেয় এবং একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, এইসবই পুঁজিবাদের মূল আদর্শিক উপাদান। স্কুলের দৈনন্দিন রুটিন যেমন উপস্থিতি গ্রেডিং এবং পরীক্ষা এই সবই বস্তুগত অনুশীলন যা শৃঙ্খলা শ্রেণীবিন্যাস এবং কর্তৃত্বের গ্রহণযোগ্য তাকে শক্তিশালী করে। এই অনুশীলনগুলি ব্যক্তিদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিতর বাধ্য এবং অনুগত কর্মী হিসেবে কাজ করবার জন্য প্রস্তুত করে। বিদ্যালয়ে ইতিহাসের যে শিক্ষা দেওয়া হয় তাও মূলত জাতীয়তাবাদ নামক ধারণাকে পরিপুষ্ট করবার জন্য ব্যবহার করা হয় এবং এইভাবে সুকৌশলে শ্রেণী সংগ্রাম বা ঔপনিবেশিক শোষণের ব্যাখ্যা গুলোকে উপেক্ষা করে যাওয়া হয়।

 

এই Ideological State Apparatus এর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, গণমাধ্যম। সংবাদপত্র টেলিভিশন এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ সমস্ত রকমের মিডিয়া আসলে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রের মতাদর্শই প্রচার করে এবং সেইভাবে সেই মতাদর্শের সমর্থনে জনগণের সম্মতি আদায় করবার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সমস্ত গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই একটি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য ব্যবস্থা হিসেবে চিত্রিত করে এবং বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে প্রান্তিক অবস্থায় রেখে দেয়। এর পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলি বিজ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে ভগবান এবং দৈনন্দিন জীবনের পণ্যীকরণকে নিরন্তর উৎসাহিত করে চলে যা পুঁজিবাদী সমাজের চালিকাশক্তি।

 

এই Ideological State Apparatus এর  তৃতীয় অবস্থানে আছে, ধর্ম। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি শাসক শ্রেণী স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিক মূল্যবোধ প্রচার করে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ধর্ম প্রদেশ এবং সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ হলো এমন বস্তুগত অনুশীলন যা শোষণমূলক পুঁজিবাদী সমাজের সংহতিকে শক্তিশালী করে। এই ধর্মগুলি ঐশ্বরিক ইছা বা পূর্ব নির্ধারণের ধারণাটি ব্যবহার করে সামাজিক বৈষম্যগুলিকে ন্যায্যতা দেয়। এবং পরামর্শ দেয় যে সম্পদ এবং দারিদ্র্য এই সবই একটি ঐশ্বরিক ব্যবস্থার অংশ।

 

এই Ideological State Apparatus এর   চতুর্থ অবস্থানে আছে, পরিবার। পরিবার প্রথা ঐতিহ্যগত লিঙ্গ ভূমিকা এবং শ্রমবিভাজনকে টিকিয়ে রাখে। খাবার তৈরি এবং যত্ন নেওয়ার মতো দৈনন্দিন পারিবারিক রুটিন পুঁজিবাদী শ্রম বিভাগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নারীদের পরিচর্যার ভূমিকায় এবং পুরুষদের উপার্জনকারীর ভূমিকায় স্থির করে রাখাই পুঁজিবাদী পরিবার প্রথার প্রধান বৈশিষ্ট্য। টেন কমান্ডমেন্টের মত পরিবার প্রথার একটা অলিখিত কমান্ডমেন্ট হল, পুরুষদের বাইরের কাজ করবে এবং নারীরা ঘরোয়া দায়িত্ব পালন করবে। আসলে নারীদের ঘরোয়া কাজে অবৈতনিক শ্রম নিশ্চিত করে এই  এই পরিবার প্রথা আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সমর্থন করে।

 

Ideological State Apparatus এর পঞ্চম  অবস্থানে আছে, বিভিন্ন সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। শিল্প সাহিত্য চলচ্চিত্র ইত্যাদি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এমনভাবে কাজ করে যা প্রচারণামূলকভাবে শাসক শ্রেণীর মতাদর্শকে প্রতিফলিত এবং শক্তিশালী করে। এই সংস্কৃতিক মাধ্যমগুলি বেশিরভাগ সময়ই সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে স্বাভাবিকভাবে যাতে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে সেই ব্যাপারে কাজ করে।

 

Ideological State Apparatus এর ষষ্ঠ  অবস্থানে আছে, রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলগুলি বুর্জোয়া কাঠামোর মধ্যে থাকা পুজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে এমন নীতি এবং মতাদর্শ প্রচার করে। রাজনৈতিক দলগুলি সব সময়ই বিদ্যমান রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা কে বৈধতা দেয় যা আসলে শাসক শ্রেণীর অবস্থানকেই সুদৃঢ় করে। রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য প্রায়শই মুক্তবাজার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির গুরুত্বের উপর জোর দেয় যা পুঁজিবাদী মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

Ideological State Apparatus এর  সপ্তম  অবস্থানে আছে, আইনি ব্যবস্থা। একটি নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রের আইন সবসময়ই সম্পত্তির অধিকার এবং শোষণমূলক চুক্তি গুলি কে কার্যকর করে যা পুঁজিবাদী সম্পর্কে কেন্দ্রবিন্দু। এই আইন গুলি নিশ্চিত করে যে উৎপাদন থেকে প্রাপ্ত মুনাফা যেন শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণের পরিবর্তে শুধুই মালিকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

 

Ideological State Apparatus এর  অষ্টম  অবস্থানে আছে, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। পুলিশ ও সামরিক বাহিনী জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের মতাদর্শ প্রচার করে।। যুদ্ধকালীন জাতীয়তাবাদী প্রচারণা পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে জাতির মূল্যবোধ রক্ষাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যা শাসক শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

আলথুজার এইভাবে দেখিয়েছেন কিভাবে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রের ভিতরে ভাবাদর্শের বস্তুনিষ্ঠ অস্তিত্ব কাজ করে চলে।

 

ভাবাদর্শের বিপরীতে আলথুসার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কথা বলেন যা পূর্ব নির্ধারিত জ্ঞানের আনুগত্য করে না বরং সেই সব জ্ঞান বিশ্লেষণ করে তাকে নতুন জ্ঞানে রূপান্তরিত করে। এই পদ্ধতিকে তিনি Epistemological break বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিরতি বলেছেন। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিরতি সমস্ত পূর্বনির্ধারিত আদর্শগত জ্ঞানকে রহস্য মুক্ত বা demystify করতে পারে। অস্তিত্বগত সমস্ত কিছুর অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়াকে বুঝে তাকে উন্মোচন করবার চেষ্টা করাই আলথুজারের মতে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান। এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তার নিজস্ব নিয়ম অনুসারে পরিচালিত হয়, এটি আদর্শ বা অন্যান্য সামাজিক অনুশীলনের দ্বারা সংকুচিত হয় না, যদিও তা শ্রেণী সংগ্রাম দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। এক কথায়, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাস্তবতার বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান তৈরি করে।

 

মার্কসীয় দর্শনে আলথুসারের আরো একটি বড় অবদান হলো মার্কসবাদের হেগেলীয় ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করা বিশেষ করে যখন দ্বান্দ্বিক সম্পর্কগুলিকে একটি পূর্বনির্ধারিত বা টেলিওলজিক্যাল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হতো। আলথুসার জোর দিয়ে বলেন মৌলিকভাবে মার্কসের দ্বান্দ্বিকতা হেগেলের দার্শনিক চালচিত্রের থেকে আলাদা। মার্ক্সের কাছে ইতিহাসের বস্তুবাদী প্রকৃতি কোন‌ও টেলিওলজিক্যাল পূর্ব নির্ধারিত বিষয় নয়।

 

আলথুসার যুক্তি দেন যে প্রতিটি চিন্তাধারা তার নিজস্ব ‘সমস্যামূলক’ বা ধারণার ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ। এই ধারণাগুলির যেকোনো একটিকে যে সমস্যাযুক্ত বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা অসম্ভব। এর অর্থ হল মার্ক্সের প্রাথমিক রচনা সম্পূর্ণরূপে বা এমনকি আংশিকভাবে মার্ক্সবাদী নয়, বরং মার্ক্সবাদের সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন একটি সমস্যাযুক্ত বিষয়, অর্থাৎ মানবতাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। ১৮৪৫ সালে, মার্ক্সের চিন্তাধারায় একটি এপিস্টেমোলজিক্যাল বা ব্রেক ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক বিরতি’ দেখা দেয়, যেখানে মার্ক্স তার প্রাথমিক রচনার মানবতাবাদী মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিজ্ঞান আবিষ্কার করেন যা আর হেগেলের মতো কাল্পনিক বা অনুমানমূলক প্রকল্প ছিল না।

 

এই Epistemological break-এর পর মার্ক্স অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কেননা তা চিন্তা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক  কাল্পনিকভাবে ধরে নেয়। আলথুজারের মতে এই Epistemological break এর পর মার্কসের লেখায়  Structural Causality-এর ধারণার বিকাশ হয় যা সামাজিক সামগ্রিকতার কাঠামো এবং তার উপাদানগুলির মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে।   আলথুজার Structural Causality-এর ধারণা ব্যবহার করে দেখা যে বিভিন্ন অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্তরে জটিল এবং বিভিন্ন রকমের স্তরযুক্ত দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়েই সামাজিক পরিবর্তন পরিচালিত হয়, তা কখনো খুব সরল হ্রাসবাদী এবং টেলিওলজিক্যাল বা পূর্ব নির্ধারিত হয় না।

 

এই প্রসঙ্গে বলাই যায়, মার্ক্সীয় দর্শনে আলথুজারের আরো একটি বড় অবদান হলো, তিনি ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস প্রদত্ত মার্ক্সীয় দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কের ব্যাখ্যাকে পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত করেছিলেন।

 

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস চিন্তা ও বাস্তবতাকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন এই নীতির মাধ্যমে যে বস্তুনিষ্ঠ জগৎ এবং মানুষের চিন্তাভাবনা উভয়ই একই দ্বান্দ্বিক নিয়ম দ্বারা পরিচালিত। এই নীতিটিই ছিল তার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু, যা তিনি কার্ল মার্ক্সের ধারণার সম্প্রসারণ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। এঙ্গেলস যুক্তি দিয়েছিলেন যে হেগেলের আবিষ্কৃত দ্বান্দ্বিক নিয়ম, যেমন নেতিবাচকতার অস্বীকার, পরিমাণের গুণে রূপান্তর এবং বিপরীতের আন্তঃপ্রবেশ,  এসব এমন সার্বজনীন নিয়ম যা কেবল মানুষের চিন্তাভাবনাকেই নয় বরং প্রাকৃতিক ও সামাজিক জগৎকেও নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই নিয়মগুলি বাস্তবতার মধ্যেই অন্তর্নিহিত এবং মানুষের চিন্তাভাবনা এই নিয়মগুলিকেই প্রতিফলিত করে। অর্থাৎ এঙ্গেলস বলেছিলেন যে মানুষের চিন্তাভাবনা বস্তুগত জগতের‌ই প্রতিফলন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে চিন্তার কাঠামো বাস্তবতার কাঠামোর সাথে মিলে যায় কারণ চিন্তাভাবনা বস্তুগত জগতের সাথে মানুষের মিথস্ক্রিয়া থেকে উদ্ভূত হয়। তার বিশ্বাস ছিল, এই সঙ্গতি বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতার নিশ্চয়তা দেয়।

 

এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানেও সম্প্রসারিত করেছিলেন, জোর দিয়ে বলেছিলেন যে সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলিকে একই নিয়ম নিয়ন্ত্রণ কারে যা কিনা প্রাকৃতিক জগতকেও  করে থাকে। এর ফলে প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতার ধারণাটি তৈরি হয়েছিল, যা দাবি করে যে বস্তুজগৎ দ্বান্দ্বিক নীতি অনুসারে কাজ করে এবং মানব চিন্তাভাবনা, এই বস্তুগত অবস্থার‌ একটি  অংশ হিসাবে, এই নীতিগুলিকেই প্রতিফলিত করে। এঙ্গেলস বিশ্বাস করতেন যে ১৯ শতকের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলি, যেমন ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব, শক্তি সংরক্ষণের নীতি এবং কোষ আবিষ্কার, বাস্তবতার দ্বান্দ্বিক প্রকৃতি এবং চিন্তাভাবনা এবং বস্তুজগতের মধ্যে এই ঐক্য নিশ্চিত করেছে।

 

কিন্তু লুই আলথুসার যুক্তি দেন যে এঙ্গেলসের পদ্ধতি সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলির জটিলতাকে একগুচ্ছ সার্বজনীন নিয়মে পরিণত করার ঝুঁকি নেয়, যার ফলে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নির্দিষ্টতা হ্রাস পায়। আলথুসার যুক্তি দেন যে এই পদ্ধতিটি চিন্তাভাবনা এবং বাস্তবতার স্বতন্ত্র অনুশীলনগুলিকে একত্রিত করে, উভয়ের মধ্যে একটি পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত সামঞ্জস্য ধরে নেওয়ার অভিজ্ঞতাবাদী ফাঁদে পড়ে গেছে। পরিবর্তে, আলথুসার তাত্ত্বিক অনুশীলনের স্বায়ত্তশাসন এবং জ্ঞান উৎপাদনকে একটি প্রক্রিয়া হিসাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন যা সম্পূর্ণরূপে চিন্তার মধ্যেই ঘটে।

 

লুই আলথুসার দর্শনকে “তত্ত্বের শ্রেণী সংগ্রাম” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে দর্শনকে শ্রেণী সংগ্রামের সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে দর্শন একটি নিরপেক্ষ বা সম্পূর্ণ বৌদ্ধিক কার্যকলাপ নয় বরং এমন একটি অনুশীলন যা সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে আদর্শিক এবং তাত্ত্বিক লড়াইগুলিকে প্রতিফলিত করে এবং  নিয়ন্ত্রণ করে। আলথুসার দাবি করেন যে দার্শনিক অবস্থানগুলি শেষ পর্যন্ত সামাজিক শ্রেণীর স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হয়। বস্তুবাদ এবং আদর্শবাদের মতো দার্শনিক প্রবণতাগুলি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর অবস্থানের সাথে মিলে যায়।

 

একমাত্র বস্তুবাদ জ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতা দাবি করে এবং সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী স্বার্থকে প্রতিফলিত করে। আদর্শবাদ, যা সত্তার চেয়ে চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেয়, শাসক শ্রেণীর স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ এটি বাস্তবতাকে রহস্যময় করে তোলে এবং শোষণের প্রক্রিয়াগুলিকে অস্পষ্ট করে।

 

আলথুসারের মতে, দর্শন বৈজ্ঞানিক ও আদর্শিক ধারণার মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে। দর্শন সত্য (বৈজ্ঞানিক) এবং মিথ্যা (আদর্শিক) কী তার সীমানা নির্ধারণ করে, যার ফলে মতাদর্শের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।

 

দর্শন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী তাত্ত্বিক অবস্থানগুলিকে  ব্যাখ্যা করে শ্রেণী সংগ্রামে একটি ব্যবহারিক ভূমিকা পালন করে। এটি বিপ্লবী অনুশীলনের তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলিকে স্পষ্ট করতে সাহায্য করে এবং শাসক শ্রেণীর স্বার্থ পরিবেশনকারী আদর্শিক বিকৃতিগুলিকে উন্মোচিত করে। আলথুসার জোর দিয়ে বলেন যে মার্কসীয় দর্শন খোলাখুলিভাবে তার রাজনৈতিক প্রকৃতি স্বীকার করে, কেননা পূর্ববর্তী দর্শনগুলি ষ গোপনে শ্রেণী স্বার্থ  রক্ষা করার সময় প্রতারণামূলকভাবে নিরপেক্ষতা দাবি করেছিল। আলথুসার দর্শনকে “তত্ত্বে শ্রেণী সংগ্রাম” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতিফলন এবং হস্তক্ষেপের ভূমিকার উপর জোর দিয়েছেন। দর্শনের আদর্শিক বিকৃতির বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে। এটি বৈজ্ঞানিক এবং আদর্শিক ধারণার মধ্যে বিভাজন রেখা আঁকবে, জ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করবে এবং বিপ্লবী অনুশীলনকে সমর্থন করবে।

 

এই  দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে আলথুজার negation of negation বা নেতিবাচকতার অস্বীকার ধারণাটিকে যেভাবে পরিমার্জিত ও  পরিবর্ধিত করেছিলেন, তা অনিবার্যভাবে এসে পড়ে। এই negation of negation বা নেতিবাচকতার অস্বীকার ধারণাটি হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতায় একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এটি প্রক্রিয়া এবং দ্বন্দ্বের বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে একটি মূল ধারণা। নেতিবাচকতার অস্বীকারটিকে মূলত দ্বন্দ্ব সমাধানের এবং অগ্রগতি অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। “নেতিবাচকতার অস্বীকার” বলতে এমন একটি প্রক্রিয়া বোঝায় যেখানে একটি প্রাথমিক থিসিস (প্রত্যয়) তার বিরোধী প্রত্যয় (দ্বন্দ্ব) দ্বারা অস্বীকৃত হয় এবং এই এক‌ই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে উক্ত অস্বীকারকারী বা বিরোধী প্রত্যয় নিজেই অস্বীকৃত হয়ে যায়, যা একটি সংশ্লেষণের দিকে বা একটি নতুন প্রত্যয়ের দিকে পরিচালিত হয়। এই সংশ্লেষণ কেবল মূল থিসিসে ফিরে আসে না বরং একটি উচ্চতর, আরও উন্নত ঐক্যের প্রতিনিধিত্ব করে যা থিসিস এবং অ্যান্টিথিসিস উভয়ের উপাদানগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ হেগেলের দ্বান্দ্বিকতায়, “নেতিবাচকতার অস্বীকার” হল ঐতিহাসিক এবং ধারণাগত বিকাশের চালিকাশক্তি। এটি ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে একটি ব্যবস্থার মধ্যে দ্বন্দ্বগুলি তার রূপান্তরের মাধ্যমে আরও উন্নত পর্যায়ের দিকে পরিচালিত হয়।

 

তবে “নেতিবাচকতার অস্বীকার” হেগেলের ইতিহাসের টেলিওলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে বিকাশের প্রক্রিয়াটিকে একটি পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে দেখা যায় – পরম ধারণার বাস্তবায়ন, অথবা চিন্তা ও সত্তার পরম ঐক্য।

 

মার্কস হেগেলের এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু হেগেলের “নেতিবাচকতার অস্বীকার” (negation of negation) এর আদর্শবাদী এবং টেলিওলজিক্যাল দিকগুলিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মার্ক্সের মতে, দ্বান্দ্বিকতা বস্তুগত পরিস্থিতি এবং শ্রেণী সংগ্রামের মধ্যে নিহিত, পরম ধারণার আত্ম-উপলব্ধিতে নয়। মার্ক্সের দ্বান্দ্বিকতা সামাজিক গঠনের মধ্যে বস্তুগত দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হিসেবে দেখে।

আলথুসার‌ও “নেতিবাচকতার অস্বীকার” কে একটি টেলিওলজিক্যাল কাঠামো হিসেবে সমালোচনা করেন যা দ্বন্দ্বের স্বতন্ত্রতাকে দমন করে এবং ইতিহাসকে একটি পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরিণত করে।

 

হেগেলের ব্যবস্থায়, “নেতিবাচকতার অস্বীকার” হল একটি অনুমানমূলক বিভাগ যা ইতিহাসের আদর্শবাদী ধারণাকে প্রতিফলিত করে যা একটি আধ্যাত্মিক সারাংশের উদ্ঘাটন। এটি আত্ম-উপলব্ধির একটি প্রক্রিয়া যেখানে দ্বন্দ্বগুলি একটি উচ্চতর ঐক্যে সমাধান খুঁজে পায়। এর বিপরীতে আলথুজারের মতে, মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদ “নেতিবাচকতার নেতিবাচকতা”-এর আদর্শবাদী এবং টেলিতাত্ত্বিক দিকগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। পরিবর্তে, এটি সমাজের মধ্যে বস্তুগত দ্বন্দ্বের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, শ্রেণী সংগ্রামের ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক বিকাশের উন্মুক্ত প্রকৃতির উপর জোর দেয়।

 

হেগেলের দর্শনে, সামগ্রিকতাকে একটি প্রকাশ্য সামগ্রিকতা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি অংশ সমগ্রকে প্রতিফলিত করে এবং সমগ্রকে একটি ঐক্যবদ্ধ অভ্যন্তরীণ নীতি হিসাবে দেখা হয় যা এর সমস্ত উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ করে।

হেগেলের সামগ্রিকতা টেলিওলজিক্যাল, একটি পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে, যেখানে সামগ্রিকতার মধ্যে দ্বন্দ্বগুলি পরম ধারণার আত্ম-উপলব্ধিতে সমাধান করা হয়।

 

আলথুসার সামগ্রিকতার হেগেলীয় ধারণার সমালোচনা করেন এবং যুক্তি দেন যে মার্কসীয় সামগ্রিকতা মৌলিকভাবে ভিন্ন। মার্কসবাদে, সামগ্রিকতা একটি প্রকাশ্য ঐক্য নয় বরং একটি জটিল কাঠামোগত ঐক্য। মার্কসীয় সামগ্রিকতা স্বতন্ত্র, তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত। উদাহরণ যেমন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক ইত্যাদি নিয়ে গঠিত যা একটি কাঠামোগত শ্রেণিবিন্যাসে একে অপরের উপর প্রতিষ্ঠিত। মার্কসীয় সামগ্রিকতা আধিপত্যের একটি কাঠামো দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে একটি উদাহরণ যেমন, অর্থনীতি, একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, যখন অন্যান্য উদাহরণ (যেমন, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক) অধীনস্থ কিন্তু তবুও আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ধারণ করে।

 

এই প্রসঙ্গে (Overdeterminism) অতি-নির্ধারণের ধারণাটি এই সামগ্রিকতার ঐক্যের সঙ্গে অপরিহার্যভাবে সম্পর্কিত। ধারণাটি হলো, নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সংমিশ্রণের উপর নির্ভর করে একটি দ্বন্দ্ব অন্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে।

 

আলথুজার Reductionism বা হ্রাসবাদ (যা সামগ্রিকতাকে একটি একক দৃষ্টান্তে হ্রাস করে, যেমন অর্থনীতি) এবং expressive causality বা প্রকাশক কার্যকারণ (যা সামগ্রিকতাকে একটি একক সারাংশের প্রকাশ হিসাবে দেখে) উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবর্তে, তিনি সামগ্রিকতার মধ্যে দৃষ্টান্তগুলির মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা এবং নির্দিষ্টতার উপর জোর দেন।

 

লুই আলথুসারের মতে মার্কসীয় দর্শনে সামগ্রিকতার ধারণা একে অপরের উপর  সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াগত একটি কাঠামোগত এবং জটিল ঐক্য। এটি হেগেলীয় টেলিওলজি এবং হ্রাসবাদী পদ্ধতিগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসনের উপর জোর দেয়।

 

লুই আলথুসার Structural Causality বা কাঠামোগত কার্যকারণকে এমন একটি ধারণা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে চান যা একটি সামাজিক গঠনের কাঠামো এবং এর মধ্যে থাকা সম্পর্কগুলো ব্যাখ্যা করে। মার্কসীয় কাঠামোর মধ্যে কার্যকারণের একটি অ-রৈখিক, অ-যান্ত্রিক বোঝাপড়া স্পষ্ট করার জন্য আলথুসারের প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হল এই Structural Causality বা কাঠামোগত কার্যকারণ।

 

অর্থাৎ আলথুসার কার্যকারণের দুটি ঐতিহ্যবাহী ধারণার সমালোচনা করেছেন:

প্রথমটি, Linear Causality বা রৈখিক কার্যকারণ: একটি যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে কারণ এবং প্রভাব সরাসরি একটি সরল, এক-এক সম্পর্কের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে (যেমন, বিলিয়ার্ড বলের সংঘর্ষ)।

দ্বিতীয়টি, Expressive Causality বা প্রকাশক কার্যকারণ: একটি আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা হেগেলের সাথে যুক্ত, যেখানে সমগ্রের সারাংশ তার প্রতিটি অংশে প্রকাশ হয়, যা সামগ্রিকতার জটিলতাকে একটি একক অন্তর্নিহিত নীতি বা সারাংশে হ্রাস করে।

 

আলথুসার যুক্তি দেন যে কাঠামোগত কার্যকারণতা মানে হল যে কাঠামো তার প্রভাবে অন্তহীন, এবং এর অস্তিত্ব তার উপাদানগুলির মধ্যেকার নির্দিষ্ট সম্পর্ক এবং মিথস্ক্রিয়ার বাইরে কিছুই নয়। আলথুসার সামাজিক সামগ্রিকতাকে একটি জটিল কাঠামোগত সমগ্র হিসাবে বর্ণনা করার জন্য কাঠামোগত কার্যকারণতা ব্যবহার করেন যা স্বতন্ত্র কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক এইসবের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কিত।

এই দৃষ্টান্তগুলি তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আধিপত্যের কাঠামোর মধ্যে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় যেখানে শেষ  বিচারে, অর্থনীতিই নির্ধারক (Overdetermining)।।

 

গ্রন্থ সূত্র

Althusser, L. (1969) For Marx, trans. B. Brewster.

Althusser, L. and Balibar, É. (1970) Reading Capital, trans. B. Brewster.

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes