ফাঁদ  কৃষ্ণালক্ষ্মী সেন

ফাঁদ কৃষ্ণালক্ষ্মী সেন

তাকেও কি ভূতে ধরল নাকি? নাহলে কেন রূপসী সেখানে যাচ্ছে— যেখানে বিপদ!

 

কার্তিকের ধান ওঠার পরে মাঠগুলো রূপ হারিয়ে আকাশের তলায় পড়ে আছে পিশাচিনীর মতো। সাঁ সাঁ শব্দে খোলা মাঠে হাওয়া উঠেছে— কানে এসে লাগে— খিলখিল হাসি যেন। ডাকিনীর হাসি।

 

হাওয়ায় বেশ হালকা ঠান্ডার আমেজ। আলরাস্তা কেটে কেটে আর হাওয়া ঠেলে রূপসী হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে খড়ি নদীর ধারে পুরোনো বন্ধ হয়ে যাওয়া ইটভাটার দিকে। হেমন্তের বেলা, কখন যে টুক করে ফুরিয়ে যায়। এই আছে তো এই নেই। কিন্তু কাজটা তো তাকে সারতে হবে। লোকটাও এসে যাবে। তার পেট কাপড়ে একটা দেশি মদের বোতল।

 

হ্যাঁ, ভূতে ধরেছিল! গাঁয়ের লোক সবাই বলে  ভূতে ধরেই বাসন্তী মরল। তারা দু’জন তো সেই কবেকার বন্ধু। ছোটবেলায় একসঙ্গে গাঁয়ের ইস্কুলে পড়ত। বাসন্তী দৌড়তে পারত খুব জোরে। ইস্কুলের দৌড় খেলায় ওকে কোনওদিন কেউ হারাতে পারেনি। রূপসীর মনে পড়ে জোর শীত পড়লে এইরকম বিকেল বিকেল সময়ে ইস্কুল থেকে ফিরে তারা মাঠের ধারে আলের উপর খড় আর ঘাস জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে আলু পুড়িয়ে খেত। কাগজে মুড়ে সেই একটু নুন নিয়ে যেত, কখনও সখনও দুটো লঙ্কা। পোড়া আলুর খোসা ছাড়িয়ে নুন লাগিয়ে তাতে কামড় বসিয়ে বাসন্তী বলত, ‘বুঝলি রুপু, বিয়ে আমি এই গাঁয়েই করব, গাঁ ছেড়ে যাব না। এখানকার সবকিছু আমার এত চেনা, হাতের চেটোর মতো চিনি। অন্য কোনও গাঁয়ে আমার একটুও ভালো লাগবে না। ভিন গাঁয়ে যদি আমাদের গাঁয়ের মতো নদী না থাকে!’

 

এই মেয়েটাই রোগে পড়ার পর বসে থেকে থেকে হা হা হা হা করে উঠত আর বুকের মধ্যে ধাঁই ধাঁই করে কিল মেরে কী সব বলত বিড় বিড় করে। শরীরখানা দিন দিন শুকিয়ে প্যাঁকাটি হয়েছিল।

 

ওর বরটা ছিল বড় বজ্জাত। মাতাল, মাগীবাজ লোক। মেয়েটার হাড়-মাস কালি করে খেটে আনা পয়সায় বাবুর কত ফূর্তি! গেদে গেদে তাড়ি গেলা, মেয়েমানুষ নিয়ে মোজ করা, তার উপর আবার নবাবী মেজাজ! বাসন্তীকে মেরে মেরে রোজ রাতে আধমরা করত। মেয়েটাকে ভূতে ধরবে না তো কাকে ধরবে! সাধে কি রূপসী পুরুষ জাতকে চোখে দেখতে পারে না! ঘেন্না, ঘেন্না! সে বাসন্তীর জায়গায় থাকলে কবে হেঁসোর চোপ মেরে কুপিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ঘরের শেকল তুলে দিয়ে চলে যেত।

 

জোরে হাঁটতে গিয়ে কাপড়টা বারবার রূপসীর পায়ের ফাঁকে ঢুকে যাচ্ছে। এবার সে কাপড়খানা হাঁটুর কাছ পর্যন্ত তুলে বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে থাকল। নেচেকুঁদে হাঁটার তার জো নেই । দিনের আলোর গায়ে মরাটে ক্ষয়াটে রং লাগা শুরু হয়ে গেছে।

 

ডানদিকে বেশ খানিকটা দূরে গড়ানদিঘির পাড়ে সার বাঁধা তালগাছের গা থেকে রোদ নেমে গিয়ে চারপাশে এখন ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব। দিঘি পাড়ের রাস্তাটা দিয়ে গেলে ইটভাটা কাছে পড়ে, রূপসী ও দিকে যেতে পারত। কিন্তু না, ওদিক পানে লোক বেশি, চোখ বেশি। সাধে কী আর সে মাঠ পেরিয়ে, বড় বার-নালার লড়ঝড়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে, কেষ্ট শরের আমবাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। কারণ আছে। আজ একটা খুনখারাপি হবে। কোমরের ডানদিকে কাপড়ের উপর দিয়েই হাত বুলিয়ে হেঁসোটা একবার দেখে নেয় রূপসী।

 

আমবাগানের ভেতরটায় ধোঁয়াটে ভাব যেন বেশি। ঘন বাগান। এমনিতেই রোদ আলো বড় একটা ঢোকে না। এখন, এই পড়ন্ত বেলায় তো দেখে মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যেবেলার কুয়ো জমতে শুরু করেছে। হঠাৎ কী একটা পাখি চুয়াক চুয়াক চুয়াক করে ডেকে উঠল। রূপসীর সারা শরীরটা মোচড় দিল যেন। ভয় পেল নাকি সে?

 

রূপসীর মনে পড়ে তার দিদি বিলাসীর মরা শরীরটাকে দেখে তার শরীরে কী কাঁপুনি আর ঝিমুনি ধরেছিল। এই খড়ি নদীর জলেই ধানপাট ফোলা একটা ন্যাংটো শরীর ভেসে উঠেছিল। নোড়া দিয়ে আদা থ্যাতলালে যেমন হয়, তেমনি ভারী কিছু দিয়ে নাক আর ঠোঁটের কাছটা ঠুকে ঠুকে থ্যাতলানো ছিল। সারা শরীরে ছুরির দাগ। পেট তো মাঝ বরাবর ফালা করে কাটা। যেমন বীভৎস, তেমনি পচা গন্ধ সে শরীরে। ভিতরের সব নাড়ি যেন ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে ওঠে। রূপসী নিজের অজান্তেই বাঁ হাতটা নাকের কাছে নিয়ে আসে। সে গন্ধ যেন আজও তার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।

 

দিদি পোয়াতি ছিল। আইবুড়ো পোয়াতি। এ কাজ ওই হারামখোর বিকাশ নাগের। একথা দিদি মরার দিনকতক আগেই জানতে পেরেছিল সে। নরমসরম গোছের বিলাসীকে এ কথা সে কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে শাড়ি দিয়ে নাকছাবি দিয়ে কত জায়গায় যে নিয়ে গেছিল লোকটা! তারপর পেটে বাচ্চা আসতে এই পুরোনো ইটভাটার কাছে ডেকে এনে খুন করেছিল। গোটা গাঁয়ের লোক বুঝেছিল এটা বিকাশ নাগের কাজ, রূপসীও বুঝেছিল। কিন্তু বুঝে কী হবে? ওই লোকটার তল পায় কে? গায়ে ওর ছাপ মারা রাজনীতির ঢোলা ঢোলা আদ্দির পাঞ্জাবি। এই গোটা এলাকা জুড়ে লোকটা জুলুমের রাজত্ব চালায়। হাফ ইঞ্চি হাঁ করে এখানে বিকাশ নাগের বিরুদ্ধে কথা বলার লোক প্রায় নেই বললেই চলে। যে দু’একজন প্রতিবাদী চরিত্র, যারা থানায় কি বিডিও অফিসে লোকটার নামে অভিযোগ জানিয়েছিল, তাদের জীবনে এখন বিস্তর অশান্তি। সেইসব অশান্তির ঠ্যালা সামলাতে সামলাতে তারা এখন বিকাশ নাগের দিকে ঘুরে দেখারও সময় পায় না। সবখানে লোকটার নেতাগিরি আর দুর্দান্ত দাপট। পার্টির অনেক উপরতলা পর্যন্ত ওর খাতিরদারি। আশেপাশের পাঁচ ছ খানা গাঁয়ের সবখানে ওর পা, আর যত লোক সেই পায়ের তলায় গুটি মেরে পড়ে আছে।

 

ঘটনার পর যদিও পুলিশ এসেছিল, বডি ময়নাঘরে নিয়ে গেল। দু’দিন খুব খানিকটা হই হই হুড়োহুড়ি, জেরা, হম্বিতম্বির পর সবই কেমন যেন গড়ানদিঘির জলের মত শান্ত হয়ে গেল। বিকাশ নাগের কিছুই হল না, সে আগের মতোই পাঞ্জাবিতে পারফিউম ঢেলে ঘুরে বেড়াতে লাগল। ওর টিকি কেউ ছুঁতে পারে না, শুধু হাওয়ায় দোলে।

 

আমবাগানের রাস্তা থেকে বেরিয়ে রূপসী দেখল বাইরে তখনও আলো আছে। এ আলোয় শুধু কনে কেন, যে কোনও মানুষকে দেখা যায়, মানুষের মুখ দেখা যায়। শয়তানেরও মুখ দেখা যায়।

 

তার এই পঁয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত একনাগাড়ে বাপের সংসার টানতে টানতে কম লোকের নোংরামি তো রূপসী দেখল না, কিন্তু তার আর নিজের সংসার হল কই! ঘর হল না, বর হল না। সে কিন্তু চেয়েছিল একেবারে নিজের একটা  সংসার— গুছিয়ে-বাগিয়ে সে সব পরিপাটি করে রাখবে, রাঁধবে, বাড়বে, খেতে দেবে, বাচ্চা মানুষ করবে। গাঁয়েরই সনৎ মাঝি বিয়ে করবে বলেছিল, দিন ঠিক হল। বিয়ের জন্যে রূপসীর দুটো ভালো কাপড়ও কেনা হয়ে গিয়েছিল। অথচ বিয়ের দিন দশেক আগে লোকটা বলা নেই কওয়া নেই পাশের গাঁয়ের একটা মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেল। তলায় তলায় অনেকদিন থেকেই নাকি ওর সঙ্গে সাঁট। রূপসীই জানতে পারেনি। লোকটাকে রূপসী বিশ্বাস করে যে হাজার সাতেক টাকা দিয়েছিল, সঙ্গে সেটাও গেল।

 

রূপসীর মা ছিল চিরকেলে রুগ্ন। অনেক ধুঁকে ধুঁকে যেদিন মরল, রূপসীর বাপ উঠোনে ছেড়া চাটাইয়ের উপর বসে মাথায় হাত দিয়ে হাপুস হুপুস করে কেঁদেছিল খুব। অথচ বেঁচে থাকতে কোনও একদিন ভালো করে ডাক্তার দেখায়নি। দেখাবে কী করে! হারু বাগদির টাকা কোথায়? হারু বাগদির টাকা হবে কী করে! সে তো হদ্দ কুড়ে এক লোক। কোনও কাজ সে একঠাঁই কোনওদিন করলে না। রাস্তার ধারে চায়ের দোকান দিল কিছুদিন, তারপর বাজারে ধানের আড়তে কাজ নিল। সে সব চুকিয়েবুকিয়ে একদিন বাড়ির উঠোনের কিছুটা কুপিয়ে শাক বেগুন লাগিয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি বেচল। সবই ওই দিন কতকের নেশা।

 

মরার আগের শেষ কয়েকটা বছর মাঠে ধান কুড়িয়ে আর খালে বিলে ছিপ ফেলে মাছ ধরে কাটিয়ে হারু বাগদি কোনও এক ভাদর মাসের দুপুরবেলায় ড্যাং ড্যাং  করে বিদায় নিলে।

 

রূপসী কিন্তু অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিল কাজ না করলে ভাত নেই। ইস্কুল ছেড়ে লোকের বাড়ি বাড়ি তার কাজ করে টাকা রোজগারের সেই শুরু। বাইরেটা সামলাতো সে, বিলাসী করত সংসারের ভাত-জল। ওদের দুই বোনের ভিতরে  বিরোধ ছিল না কোনওদিনই। অবশ্য বিরোধ করার মতোও তো কিছু ছিল না। বিলাসী ছিল চিরকালের সাদাসিধে, ভিতু ভিতু মানুষ। গুছিয়েগাছিয়ে কথাও ঠিক ঠিক বলতে পারত না। কিন্তু মানুষটা ছিল বড় ভালো, মনটা সাদা ধবধবে। রূপসীর উপর তার একবুক ভরসা। রূপসীর কাজ থেকে ফিরতে বেলা গড়িয়ে গেলে না খেয়ে ভাত আগলে বসে থাকত। নাছকপাট পেরিয়ে রূপসীকে বাড়ি ঢুকতে দেখলে তার মুখে হাসি ফুটে উঠত।

 

দিদির কথা ভেবে চোখদুটো কি ভিজে উঠল রূপসীর?

 

না, না, কিছুতেই কাঁদবে না, সে শুধু চোখে আগুন জিইয়ে রাখতে চায়।

 

বিকাশ নাগকে খুন করবে বলে আজ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রূপসী। এই দিনটার জন্যেই তার বহু অপেক্ষা। দু’আড়াই বছর ধরে অনেক খেলিয়ে খেলিয়ে — চ্যাঙ ছিঙুরি মাছ খেলানোর মতো — লোকটাকে সে বাগে এনেছে। লোকটা বিশ্বাস করে না— ওর ডান হাত বাঁ হাতকে বিশ্বাস করে না, রূপসীকে করবে কেন?

 

অনেকদিন পর্যন্ত তাকে ওর চারপাশে ঘেঁষতে দিত না। তারপর কত ঠমক ঠামক, বুকের খাঁজ, হাঁটুর ভাঁজ যে রূপসীকে দেখাতে হয়েছে, তার গোনা গুনতি নেই। পাক্কা শরীরখেকো বদমাস লোকটা। একদিন তো সোহাগ শেষে গলার কাছে ছুরি ঠেকিয়ে বলেছিল, ‘তোর এত পিরীত কেনে রে রূপসী?  মাজে মাজে কেমনধারা গন্ধ পাই, দিদির খুনের বদলা নিবি ভাবিস বুজি? একদম ভাবিস না, তোর গলাটাও কুচ কুচ করে কেটে নিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেব। কী জানি কোথা ভেসে যাবি!’ কেন কে জানে রূপসী সেদিন একটুও ভয় পায়নি। বিকাশ নাগের ছুরি ধরা হাতটাকে আসতে করে সরিয়ে দিয়ে হালকা হেসে বলেছিল, ‘মরণ আমার, তুমি কি আমায় দিদির মতো বোকা ভাব নাকি!’

 

হালশাল রূপসীর উপর লোকটার একটা বিশ্বাস জন্মেছে, রূপসীর তো তাই মনে হয়। গতমাসে বিলাসীর মতো তাকেও একটা শাড়ি এনে দিয়েছে বিকাশ নাগ। লাল রঙের। রূপসী আজ সেটাই পরেছে।

 

আজ রূপসী খুব সাবধানী। একটু এদিক ওদিক হলেই বিপদ। জানে ও । লোকটা বড় সেয়ানা, ঘাগু। খেলিয়ে খেলিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাতিয়ে মাতিয়ে ওকে মারতে হবে। সেই জন্যেই তো মদের বোতলটা নেওয়া। বোতলটা ওর মুখে ধরিয়ে, বেশ করে মদ গিলিয়ে নেশায় যখন লোকটার চোখ মুখ টলমল করবে, তখন বুকের কাপড়টা ধীরে ধীরে নামাবে সে। তারপর খানিকটা অঙ্গভঙ্গি করে এপাশে ওপাশে ঘুরে ফিরে কাপড়ের কুঁচিটা নাই – এর উষ্ণতা থেকে তলপেটের আরও উষ্ণতায় নামিয়ে ব্লাউজের হুকগুলো একটা একটা করে হালকা হাতে খুলবে। লোকটার যা স্বভাব, সেসব দেখে বুকের তলতলে নরম মাংসের মধ্যে মুখ গুঁজে দিতে চাইবে। হেঁসোর প্রথম চোপটা সে তখনই তার পিঠের উপর দেবে।

 

দৃশ্যটা ভাবতেই রূপসীর শরীরে দারুণ শিহরন খেলে গেল। তার রক্ত যেন শরীরের সবগুলো শিরার ভিতর দিয়ে হুড়হুড়িয়ে ছুটছে। না, একদম বেশি ছটফটালে চলবে না, ভয় পেলে তার চলবে না, কিছুতেই না।

 

হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে ইটভাটার একেবারে সামনে এসে পড়েছে রূপসী। জায়গাটায় একটা রা-বোল নেই, একেবারে শুনশান। মানুষের গন্ধ নেই, মানুষের শব্দ নেই কোনও। কেবল নদী বইছে, তার একটা কলকল আওয়াজ আর হাওয়ার শনশনানি।

 

বাতাস এখানে আরও জোরালো। নদীর ধারের বিশাল বটগাছটা দৈত্যের মতো হেমন্তের হাওয়ায় মাথা নাড়ছে। হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাগুলোর আর কোনও দর নেই, কদরও নেই, একটা দুটো করে ঝড়ে পড়ছে মাটিতে। একটা তক্ষক খর খর করে শুকনো পাতার উপর দিয়ে চলে গেল। সূর্য তখন বিলের মাঠ কে মাঠ পেরিয়ে ওই অনেক দূরে একটা ঝাপসা দাগের ভিতরে ঢুকে গেছে। আকাশের গায়ে তখন কোথাও লাল, কোথাও বেগুনি, কোথাও কমলা রঙের ছোঁয়া। সব রং মিলেমিশে এই নিঃশব্দ পরিবেশের ভিতরে যেন এক রহস্য তৈরি হয়েছে।

 

নদীর জোলো হাওয়ায় রূপসীর শরীরটা বেশ শিরশিরিয়ে ওঠে। না! লোকটাকে তো সে কোথাও দেখছে না। চারপাশটা একবার সরু তীক্ষ্ণ চোখে দেখল রূপসী। আসবে তো? তার বুকের ধুকপুকুনি বেড়েই চলেছে। থেকে থেকে ভিতরটা যেন নিতাই কামারের কামারশালার হাপরের মতো ওঠানামা করছে। বাইরে থেকে এটা যেন কোনমতেই বোঝা না যায়। একটু সচেতন হয়ে জোরে একটা শ্বাস নেয় রূপসী। রোজদিনের মতোই আজও তাকে সহজ থাকতে হবে।

 

রূপসীর সাত পাঁচ নানা ভাবনার মাঝেই জোরে মোটরবাইক চালিয়ে হাজির হয়ে যায় বিকাশ নাগ। মেঠো হাওয়ায় ইটভাটার ধুলো ঘূর্ণি ঝড়ের মতো পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠে। লালমাটির দেশে বড় ধুলো।

 

তাকে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে যায় রূপসী। বাহন দাঁড় করিয়ে ডান হাত দিয়ে রূপসীকে কাছে টেনে নিয়ে মাটির উঁচু টিলার পিছনের দিকে হাঁটতে থাকে বিকাশ নাগ।

 

লোকটার বুকের কাছে আরও একটু ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে রূপসী বলে, ‘আমি ভাবচেলাম তুমি আসবে না।‘

‘ কেনে?’— নির্বিকার স্বরে জিজ্ঞেস করে লোকটা।

রূপসীর বুকের ভিতরটা কেমন ঢিপ ঢিপ করছে। কী জানি লোকটা শুনে ফেলবে না তো তার বুকের আওয়াজ! বেশ জোর করে ঠোঁটের ডগায় হাসি ঝুলিয়ে সে উত্তর দেয়,  ‘ না, এমনিই। দেরি দেখে মনে হচ্চিল।‘ সে আরও বলে, ‘তোমার জন্যে শম্ভু মুচির ইস্পেশাল মদ এনিচি।‘

  • ‘ভালো করেচিস।‘ — এটুকুই বিকাশ নাগের উত্তর। লোকটা কথা কয় কম, খুব কম।

 

এরপর ইটভাটার পিছন দিকে নিয়ে গিয়ে রূপসীকে সে মাটির টিলার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করায়। দেখে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে বিকাশ নাগ রূপসীর সারা শরীর দেখে। লোকটার দুই চোখে কী যেন আছে। চারপাশে তখন আরও খানিকটা আলো মরে এসেছে। গোধূলির রহস্যময় আলো আঁধারিতে বিকাশ নাগের চোখ দুটো যেন ধুমসো বনগাবড়ার চোখের মতো জ্বলছে। রূপসী বুঝতে পারে লোকটার ভিতরে ভিতরে গেজিয়ে উঠছে বিষ, লকলক করছে জিভ, ও এখন বিষধর সাপের মতো ছোবল দিতে চায় — এক ছোবল, দুই ছোবল, তিন ছোবল।

 

রূপসী তাড়াতাড়ি তার বাঁ দিকের করচ থেকে মদের বোতলটা বের করে বিকাশ নাগকে দিতে যায়। লোকটা দূর থেকেই হাত নেড়ে ইশারায় তাকে মদের বোতলটা মাটিতে নামিয়ে রেখে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বলে।

 

সে কী! লোকটা মদ খাবে না নাকি! রূপসীর কপালে একটা ভাবনার ভাঁজ পড়ে। অথচ এই মুহূর্তে লোকটার কথা না শোনা ছাড়া তার কোনও উপায়ও নেই।

 

আর সময়ও নেই, রূপসী বোঝে এবার তাকে দ্বিতীয় চাল চালতে হবে। সে একটু মৃদু হাসি হেসে নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে বুকের কাপড়টা একটানে নিচে ফেলে দেয়। বাগদি মেয়ে রূপসীর বুক-ভর্তি টলটলে যৌবন বন্দি বাঘিনীর মতো ব্লাউজের ভিতর জেগে ওঠে, ছটফটায়। এই বাঘিনীর সঙ্গে খেলা চায় লোকটা। রূপসীকে দুই হাত বুকের কাছে এনে ব্লাউজের প্রথম হুকটা খুলতে দেখে বিকাশ নাগ হাঁক দিয়ে ওঠে, ‘রূপসী, থাম।‘ গলাটা ভারী, গম্ভীর। হাঁক শুনে রূপসী চমকে ওঠে, শরীরটা তার একটু টাল খেয়ে যায়।

 

এবার লোকটা তার পানমশলা খাওয়া দাঁতগুলো বের করে খ্যাঁ খ্যাঁ করে খানিক হেসে বলে ওঠে, ‘ ওগুলো তোকে খুলতে হবে না, আমি খুলে নেব। ওতে মজা বেশি রে।‘ কথাগুলো শেষ করেই লোকটা রূপসীর দিকে এগোতে থাকে।

 

রূপসী ডানহাত দিয়ে নিজের পুরো মুখটা একবার মুছে নেয়। তার বেশ গরম লাগছে। এই ঠান্ডা হাওয়াতেও তার কপালে, কানের পাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম। পা দুটো তার হঠাৎ কেমন পাথরের চাঁইয়ের মতো ভারী হয়ে গেছে। লোকটা কী চায়? তার চোখ মুখ দেখে সে কিছুই বুঝতে পারছে না।  সে বিলাসীর মতো মরতে চায় না।

 

বিকাশ নাগ কি তার সব চাল ধরে ফেলেছে? কিন্তু লোকটার হাবভাব চালচলন তো শান্ত। দারুণ শান্ত। সেটাতেই তো রূপসীর ভিতরে ভিতরে গভীর সংশয়ের মেঘ তৈরি হচ্ছে। ঝড় আসার আগে চারপাশটা যেমন থম মেরে যায়, এ যেন কতকটা তেমনই ।

 

লোকটা তো গিরগিটি। রং বদলাতে ওস্তাদ।

 

লোকটা অমন শিকারী বিড়ালের মতো এগোচ্ছে কেন?

 

রূপসী কী করবে এখন? ছুটে পালাবে? না। সে আর কতদূর ছুটে যেতে পারবে? তবে সে কি হেঁসোটা বের করে এখনই লোকটার বুকের মাঝে বসিয়ে দেবে? বিকাশ নাগ এখন তার হাতের নাগালের মধ্যে এসে পড়েছে।

 

লোকটা চোখের পলক না ফেলে এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছে রূপসীর দিকে আর কেউটে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। জমাট নিঃশ্বাস।

 

বিকাশ নাগ কি তবে উলটো চাল চেলে দিয়েছে? শত্রুর শেষ রাখবে না বলে বড় একটা ফাঁদ পেতেছে হিসেব কষে?

 

রূপসী ঘামছে, দরদর করে ঘামছে। পাকা তালের মতো তার বুক ওঠানামা করছে জোর গতিতে। মাটিতে লুটোচ্ছে আঁচল। তারপর হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল রূপসীর মাথার ভিতরে। জোর একটা ঝাঁকুনি লাগল শরীরে এবং কী ভেবে ডান কোঁচড় থেকে হেঁসোটা তাড়াতাড়ি বের করতে গিয়ে কাপড়ের পাকে জড়িয়ে গেল তার হাতটা।

 

বিকাশ নাগ ঝানু লোক, গন্ধ পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে তার লোমশ সবল বাঁ হাত দিয়ে রূপসীর ডানহাত জোরে চেপে ধরে। সে জানে এ থাবার ভিতর অনেককিছুই ছটফট করে। যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে রূপসী। তার হাতটা উল্টোদিকে মোচড়াতে মোচড়াতে বেঁকিয়ে দিয়েছে লোকটা।  লোকটা আর মানুষ নেই, তার চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে,  দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনও দানবের চোখ। দাঁতে দাঁত ঘষে কিড়মিড় শব্দ তুলে সে তাকিয়ে আছে রূপসীর দিকে। রূপসী এখন ফাঁদে পড়া এক পলকা পাখি। লোকটা তাকে খেলার ছলে মুঠোয় পুরে পিষে মেরে দেবে।

 

দিল। লোকটা এক ধাক্কায় রূপসীকে ফেলে দিল মাটিতে। মেয়েটার কাপড় আলুথালু হয়ে ধুলোয় লুটোচ্ছে। ঘামের উপর চাপ চাপ ধুলো লেগে শরীরটা তার চ্যাটচ্যাটে কাদা কাদা হয়ে গেছে। থরথরিয়ে কাঁপছে রূপসী।

 

বিকাশ নাগ হিংস্র বুনো জন্তুর মতো এক হাঁটু মুড়ে উপুর হয়ে মাটিতে বসে। এখনও সে চুপ। একটাও কথা বেরোচ্ছে না তার মুখ থেকে। কেবল তার শরীরের সমস্ত আক্রোশ ফুটে বেরোচ্ছে দুই চোখ দিয়ে। এই চোখ খুনির চোখ।

 

মদের বোতলটা পাশেই মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। লোকটা এবার হাত বাড়িয়ে বোতলটা নেয়। বোতলের মুখটা ভাঙে রূপসীর হাত মুচড়ে ছিনিয়ে নেওয়া হেঁসোটা দিয়ে — ধীরে সুস্থে— কোনও তাড়া নেই।

 

রূপসী চোখ বন্ধ করেছে। ভয়ে। হতাশায়। এবার বিকাশ নাগ ভাঙা বোতল থেকে মদ ঢালে রূপসীর বুকের উপর সরু স্রোতে, হালকা হাতে। যেন সুদৃশ্য কাচের গ্লাসে সে মদ ঢালছে। মেয়েটার বুক ভিজে উঠছে। বুকের বিভাজিকা বেয়ে  ভিতরে স্রোত নামতে থাকে রূপসীর। ধীরে ধীরে ভিজে জবজবে হয়ে যায় তার গলা, পেট। জল নামতে থাকে আরও নিচে। ভিজে ব্লাউজ ফুঁড়ে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে রূপসীর ভয়ার্ত দুটি স্তন।

 

বোতল এখন ফাঁকা। এক আছাড় মেরে বিকাশ নাগ বোতলটা ভাঙে। লোকটার মুখ এখন আরও ভয়ানক। কপাল ভরে উঠেছে ঘামে। এবার সে তার মোটা লোমশ বাঁ হাত দিয়ে রূপসীর টুঁটি চেপে ধরে ডান হাতে একটা ছুঁচলো ভাঙা কাচের ফলা নিয়ে সুনিপুণ ভঙ্গিতে রূপসীর ঘাড় আর গলার মাঝে ঢুকিয়ে দেয়। চাপ দেয়, জোরে, গায়ের জোরে। আর একটু জোরে।

 

লালমাটির দেশ আরও একটু লাল হয়ে ওঠে। এটুকুই।

 

বিকাশ নাগের গায়ের পাঞ্জাবি ঘামে সপসপে হয়ে গেছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে চেপে মাথার চুলগুলো পেছনে ঠেলে দেয়। একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে ভাবে, শত্তুরের শেষ রাখতে নেই।

 

নদীর ওপারে, নদীর এপারে তখন ফুরিয়ে গেছে হেমন্ত গোধূলি।

 

নেমে আসছে সন্ধ্যের গাঢ় অন্ধকার।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes