
এয়ারপডে কাম্যু / অরিজিৎ লাহিড়ী
ঘরের ডিম-আলোকিত নিস্তব্ধতাটা ভারি, প্রায় আর্দ্র। কেষ্টপুরের এই ভাড়ার ফ্ল্যাটের সিলিংটা যেন একটা বিশাল সাদা ক্যানভাস, যেখানে তুই রাতের পর রাত তোর সমস্ত অনিদ্রা আর ব্যর্থতার প্যাটার্ন এঁকে যাস অবিরত। তোর বাঁ কানে এয়ারপড, সেখান থেকে ভেসে আসছে আলব্যের কাম্যুর ‘দ্য আউটসাইডার’-এর আনঅফিশিয়াল বাংলা অনুবাদ—‘আজ মা মারা গেছেন। অথবা গতকাল, মনে নেই’। তুই শোনবার ভান করছিস। তুই জানিস, এই ইন্টারটেক্সুয়ালিটি শুধুই তোর হ্যাপেনিং অনলাইন অউরার জন্য জরুরি, বিছানার জন্য নয়।
তোর আসল মনোযোগ তোর হাতের ফোনে। ফোনটা গরম, যেন ক্ষুদ্র কোনো জীবন্ত হৃদয়, যার স্পন্দন কেবল নোটিফিকেশনের ভাইব্রেশনেই টের পাওয়া যায়। এই ভাইব্রেশনটা থেমে গেলেই বুঝি তোর অস্তিত্বের সব প্রমাণ লোপ পাবে। তুই স্ক্রল করছিস—আঙুলের সামান্য চাপেই সময় দ্রুত এগিয়ে যায়, যদিও শরীর একই জায়গায় স্থানু।
তোর গুগল সার্চ ডাম্প থেকে আগের সপ্তাহের চব্বিশ ঘণ্টার আমি যে সার্চ হিস্ট্রি পাচ্ছি ( সর্টেড বাই টাইম স্ট্যাম্প ), সেটা মোটামুটি এরকম –
কেউ কি সত্যিই দুপুর বারোটার আগে বিছানা ছাড়ে?
ক্যাপিটালিজ্যমকে ঘেন্না করা লিব্যারাল আর্ট গ্র্যাজ্যুয়েটদের জন্য কি আবশ্যিক?
কিছু না লিখেও কিভাবে একটা উপন্যাস লিখে ফেলা যায়?
gemini.pro.api.key.free (মানে তোর ফ্রিল্যান্সিংয়ের একটা ফেইল্ড এটেম্পট)
কাছাকাছি ক্যাফে
নিহিলিজ্যম না সারকাজ্যম কোনটা ইনস্ট্যাবায়োর জন্য বেশি ক্যুল ?
আনপেইড ইন্টার্নশিপের সুবিধা
তুই ঘুম থেকে উঠলি দুপুর বারোটা পঁয়ত্রিশে। উঠেই তোর প্রথম কাজ ছিল আলো-আঁধারি ঘরে একটি ফিল্টার-দেওয়া সাদাকালো সেলফি তোলা।তোর চোখে ছিল এক অনির্দিষ্ট বিষাদ ( অথবা ডেলুলু ) এবং বুদ্ধিদীপ্ত অবহেলা।
আপলোড করলি ফটোটা। ক্যাপশনে লিখলি—At the edge of existence, the real truth reveals itself. To observe is the only way to live.
#loneliness #existentialcrisis #urbanbong #genzeneration
এই লাইনটা আসলে এ আই লিখে দিয়েছে। ‘পর্যবেক্ষণ করাই প্রকৃত বাঁচা’—কী হাস্যকর! তুই শুধু স্ক্রল করিস, বাঁচিস না। তুই জানিস ভালকরেই। তোর ফলোয়ার এবং এই গল্পের পাঠকরাও জানে যে এই দর্শনটা সাজানো, সিউডো। কিন্তু পারফর্ম করতেই হবে। তুই যদি স্ক্রিনে তোর শূন্যতা বিক্রি না করিস, তবে সমাজ তোর বাস্তবের শূন্যতা মেনে নেবে না। এই উত্তর-আধুনিক বিনিময় প্রথা তো তোকে এবং অনেককেই মানতে হয়।
তোর ফ্রিল্যান্সিং কাজটা এক ধরনের ডিজিটাল ভিক্ষা। যেমন আজ তুই লোগো ডিজাইন করলি যে ক্লায়েন্টের জন্য, তারা দাবি করে তারা অরগ্যানিক টেকসই ফিউচারিস্টিক সবজির রস বিক্রি করে।
একটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ ইমেলটা ঢুকল।
সাব্জেক্ট: রে: লোগোর ফিডব্যাক—প্রোজেক্ট ‘জুসি ফিউচার’
প্রিয় অমুক,
এমনিতে দারুণ! লোগোটা কি আর একটু ‘প্রাণবন্ত এবং জেন-জেড-সুলভ’ বানানো যায়, আবার একই সাথে ‘সাবেকী আর বিশ্বাসযোগ্য’ও লাগবে? আর, আমাদের মিলেনিয়াল প্রজন্মের কাছেও পৌঁছাতে হবে। এটাকে একটু পপ করে দাও! বাজেট পঞ্চাশ ডলার চূড়ান্ত। অনেক ধন্যবাদ।
— শ্যারন ! সোশ্যাল বাজ হেড।
তোর প্রথম ড্রাফ্ট,যেটা তুই ডিলিট করে দিলি—
ম্যাম, জেন-জেড সুলভ এবং সাবেকী—এই দুটি ধারণাই ডিজাইন-বিরোধী। আপনি একই সঙ্গে জ্যাঠামশাই আর ইনস্ট্যা ইনফ্লুয়েন্সার হতে চাইছেন। আর পঞ্চাশ ডলার আমার শিক্ষার এবং ইউটিউবে দেখা পঞ্চাশ ঘণ্টা টিউটোরিয়ালের অপমান। এই টাকা দিয়ে আপনি স্রেফ আমার হতাশাটা কিনতে পারেন, ডিজাইন নয়।
তোর ফাইনাল রিপ্লাইতে দু’লাইন শান্তিনিকেতনের কায়দায় ভ্যান্তারা করে তুই যা লিখলি—
নতুন ফাইলটা দিনের শেষে পাঠিয়ে দেব। আপনার ফিডব্যাকের অপেক্ষায় থাকলাম!
ডিজিটাল অউরা ভাঁড় মে জায়ে। ভবিষ্যতের কনটেন্ট কিং হওয়ার স্বপ্ন বিক্রি করতে এসেছিস। আর্ট কলেজের মাস্টারমশাই বলেছিলেন—বাস্তবে কিছু বিক্রি করলে, আদর্শগুলো মরে যায়। কিন্তু তুই জানিস আদর্শগুলো ছোটবেলায় আর্ট পেপারের মার্জিনে ছিল, এখন ক্যাপশনের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
এবার বিকেল চারটে দুই’তে তোর সাথে এক বান্ধবীর ওয়টস্যাপ চ্যাট একটু দেখছি। বড় বহুজাতিক কোম্পানিতে ‘কমপ্লায়েন্স অফিসার’ সে।
কি করছিস? কেমন আছিস? (ও সর্বদা হাসি দিয়ে শুরু করে, যা তোর কাছে একটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া মাত্র)
তুই — শূন্য। ভেতরে কিচ্ছু নেই। (স্কাল ইমোজির পরিবর্তে শূন্যতার সরাসরি উল্লেখ )
আমি তো ভাবলাম কোনো বইটই পড়ছিস।
তুই বইয়ের ইমোজি দিলি। আসলে মিথ্যে কথা।
ও বলল — মাথা পুরো হ্যাং করে আছে ব্রো! কালকেই ফোর্থ কোয়ার্টারের রিভিউ মিট। তুই তো ইন্ডিপেন্ডেন্ট…
তুই — চাকরি করিস ভাই! এগুলো মেনে নিতে হয়।
ও— আমার জন্য একটা ক্যাপুচিনো পাঠা তো।
তুই— (অট্টহাসির ইমোজি দিলি) আমার অ্যাকাউন্টে পঞ্চাশ ডলার আছে। ওটা আমার এক্সিস্টেনশিয়াল ক্যাপিটাল। খরচ করা যাবে না।
তোদের মধ্যে হাজার হাজার শব্দের দূরত্ব শুধু সংক্ষিপ্ত টেক্সট আর আবেগের যান্ত্রিক উল্লেখ দিয়ে পার হয়ে যায়। তুই জানিস এই আবেগের সরাসরি উল্লেখ এখানে কেবল একটা ঢাল–যাতে গভীর কোনো অনুভূতি প্রকাশ করতে না হয়। তোরা একে অন্যের পার্সোনার সঙ্গে কথা বলছিস না আসল মানুষটার সঙ্গে…সে প্রশ্ন এখন অবান্তর।
এখন তোর একা থাকার বদ্ধ ঘর থেকে মুক্তি দরকার। অন্তত একটি ঘণ্টা ‘বাস্তব পৃথিবীর’ মানুষের মধ্যে বসে, ফোন স্ক্রল করা যেতে পারে। এইটাকেই তোর এই ডিজিটাল ব্যক্তিত্বে ‘ডিপ ওয়র্ক’ বলে চালানো সম্ভব।
ক্যাফেটা তোর ফ্ল্যাট থেকে পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ। ল্যাপটপ, নোটবুক এবং ‘দ্য আউটসাইডার’ ( অডিওবুক নয়, আসল বইটা ) নিয়ে চলে এলি নিউটাউনের এই ক্যাফেটায়। টেবলে বসার পর তুই দেখলি, বইটি টেবলের এক কোণে এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে এটা ইন-ফোকাসে না থেকেও ব্যাকগ্রাউন্ডে তোর এই বুদ্ধিজীবী ইমেজটাকে সাপোর্ট করে।
পাশের টেবলে বসা একদল কলেজের ছেলেমেয়ে হাসি-মস্করা করতে করতে রিল বানাচ্ছে। তুই দ্রুত ল্যাপটপে তোর ক্লায়েন্টের ‘প্রাণবন্ত এবং জেন-জেড-সুলভ’ লোগোটা খুললি। দেখাতে চাইছিস, তুইও কিছু একটা ‘তৈরি’ করছিস। তুই জানিস, তুই ল্যাপটপে কাজ করছিস না, কেবল পারফর্ম করছিস। এই দৃশ্যটা যেন একটা সাইলেন্ট ফিল্ম। এই ক্যাফেটা কোনো বিশেষ স্থান নয়, এটা তোর পার্সোনাকে রিচার্জ করবার একটা স্টেজ।
কফির প্রথম চুমুকটা ঠান্ডা। ঠিক তোর এই মনের মতো। তুই ল্যাপটপ স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে পাশের দেওয়ালের দিকে তাকালি। সেখানে ঝোলানো পুরনো, কিন্তু খুব পরিচিত চিত্রকর্মের পোস্টার। একটা পাইপ আঁকা, নিচে লেখা: Ceci n’est pas une pipe (এটা কোনো পাইপ নয়)। রেনে ম্যাগ্রিটের ‘ ‘দ্য ট্রেচারি অফ ইমেজেস্ ’।
তোর মনে হলো, এই মুহূর্তটা সেই ছবির মতো—যা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে নেই। এই ক্যাফে কোনো কর্মস্থল নয়, এ এক জনবহুল কারাগার। এই কফিতে চুমুক আসলে কোনো ক্লান্তি দূর করা নয়, এ একটা সামাজিক আচার।
তুই একটা দার্শনিক গদ্য লেখার চেষ্টা করলি, কিন্তু লিখতে পারলি কেবল—ওয়র্ড ডক্যুমেন্ট শিরোনাম: আমি কি? আমি কি কেবল আমার সার্চ হিস্টরি?
তারপর কয়েকটা পয়েন্ট—
১. আমি যা দেখছি, তা যদি না হয়, তাহলে আমি যা লিখছি তা কি আমি? ২. আমি যদি Observing Person হই, তাহলে কে আমাকে Observe করছে? (আমি?) ৩. উত্তরানিক শূন্যতা হল—তুমি জানো সবই অর্থহীন, তবুও তোমাকে ক্যাফেতে বসে ল্যাপটপ খুলতে হবে।
শেষ পর্যন্ত তুই লোগোটা ডেলিভার করলি। তোর কাছে ক্লায়েন্টের রিপ্লাই মেল এল—
তুমি তো বস! এইটাই চাইছিলাম। এত দ্রুত কাজ! ফিউচার কনটেন্ট কিং তুমি। একটা বোনাস টিপস পাঠালাম দশ ডলার। কী দারুণ ফ্লেক্স !
এই ষাট ডলার দিয়ে তোর বাড়ি বাড়ি ভাড়ার টাকাও তো উঠবে না রে ভাই! টাকাটা রেখে দিলি। কিছু কিনলিও না। স্রেফ ক্লায়েন্টের পাঠানো মেলটার একটি স্ক্রিনশট নিলি তুই।
এই স্ক্রিনশটটিই তোর আসল অর্জন—অর্থ নয়, তোর ডিজিটাল সাফল্যের প্রমাণ। এই ছবিটা দিয়েই তোর লিঙ্কডইন প্রোফাইলে একটা নতুন গল্প ফাঁদবি, যার ক্যাপশন হবে: Persistence pays off. Small wins, big lessons।
রাত এখন এগারোটা বেজে এগারো মিনিট। বড় আলোটা নিভিয়ে তুই বিছানায় শুয়ে পড়লি। সিলিংটা আবার সেই সাদা ক্যানভাস। ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে শেষবার চেক করলি। কোনো নতুন কাজ আসেনি। কোনো জরুরি বার্তা নেই।শুধু তোর ক্লায়েন্টের পাঠানো ‘ ফিউচার কনটেন্ট কিং তুমি ’ — এই প্রশস্তি।
তুই ফোনটা ছুঁড়ে ফেললি না, অতি যত্নে বালিশের পাশে রাখলি, যেন ওটাই আত্মার একমাত্র বিশ্বস্ত বন্ধু।
রাত দুটো বেজে পঞ্চান্ন মিনিটে তোর ফোন স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে উঠল। কোনো বন্ধু বা ক্লায়েন্ট নয়। ফোনের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমের একটি লাল সতর্কতা বার্তা জানান দিচ্ছে যে তোর স্ক্রিন টাইম এই সপ্তাহে ৪৭% বেড়েছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সময় হয়েছে।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন? কার সঙ্গে? ফোনের সঙ্গে, নাকি তোর নিজের সঙ্গে? তুই জানিস তুই ফোনটা সাইলেন্ট করে আবার শোনবার ভান করবি। কাম্যুর অডিওবুক আবার চলবে। সিলিং ফ্যান ঘুরবে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কি পড়ছে না, সেটার কোনো সত্যতা তোর কাছে অন্তত নেই।
তোর অস্তিত্বের প্রমাণ এখন ডিজিটাল স্ক্রল-বার্গের বরফের মতো গলে যাচ্ছে। এবং সেই গলে যাওয়াটুকুও তোকেই ডক্যুমেন্ট করে যেতে হবে, হয়তো আগামীকাল সকালের ইনস্ট্যাগ্র্যাম ক্যাপশনের জন্য।
পরের দিন। এই ‘পরের দিন’ হলো শুধু সময়ের রৈখিক ভ্রম। তোর জীবনে দিন বা রাত নেই, আছে কেবল ব্যাটারির চার্জ এবং নোটিফিকেশন সেশন। আজ দুপুরে ক্যাফেতেই গেলি আবার। সেই একই টেবল। এবার কফি আনার পর মেয়েটা—যাকে তুই মনে মনে ‘বারকোড গার্ল’ বলে ডাকিস, কারণ তার নাম কখনও জানতে চাওয়া হয়নি তোর—টেবলে কফির কাপটা রাখল। তুই স্ক্রিন থেকে চোখ সরালি না।
মেয়েটা মৃদু স্বরে বলল—আপনার ওই লোগোর কাজটা… কালকেও করছিলেন, আজও করছেন। ওটা…ফিনিশ হয়নি এখনো?
চমকে গেলি তো ?
কেউ তোর এই ঢপের কন্টেন্ট পারফরম্যান্সের বাইরে গিয়ে তোর বাস্তব কাজ নিয়ে মন্তব্য করেছে। এই প্রথম।
তুই বেশ ফাঁপা গ্র্যাভিটি নিয়েই বললি—না, হয়নি। ক্লায়েন্ট জেন জেড আর সাবেকী দুটোই চাইছে। এই প্যারাডক্সের সমাধান খোঁজা চলছে।
মেয়েটা হাসল। সেই হাসিটা ফিল্টারহীন, কোনো দাঁত বা আলোকসজ্জা নেই। সম্পূর্ণ অরগ্যানিক, তোর ক্লায়েন্টের বিজ্ঞাপনের মতই।
—ঠিক বলেছেন। কফির কাপে চুমুক দেওয়ার সময় কেউ চায় না তার কাপটা একই সঙ্গে কনটেম্পরারি আর ভিন্টেজ দুটোই হোক।
এইটুকু কথা। তুই উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলি, কিন্তু বারকোড গার্ল ততক্ষণে অন্য টেবলে চলে গেছে। তুই বুঝতে পারলি, ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য তোর কাছে কোনো স্ক্রিপ্ট ছিল না, কোনো ক্যাপশন ছিল না, কোনো পূর্বনির্ধারিত হ্যাশট্যাগও ছিল না। ফলে তুই ধিনিকেষ্ট হয়ে বসে রইলি। তোদের এই হঠাৎ সংযোগ ছিল একেবারে ক্ষণস্থায়ী,কিন্তু এই অসম্পাদিত কথোপকথন তোর ডিজিটাল প্রাচীরে একটি সামান্য ফাটল তৈরি করে দিয়ে গেল।
তোর সেই গদ্যের ডক ফাইল খুলে তুই লিখলি—নতুন দার্শনিক প্রশ্ন: একটা ফিল্টারবিহীন হাসি কি একটা লাইক-ভরা পোস্টের চেয়ে বেশি মূল্যবান?
উত্তরও নিজেই দিলি—না। কারণ হাসিটা বিক্রি করা যায় না।
হতাশা ঢাকতে তুই তোর সবচেয়ে প্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার যোগানন্দ ব্যানার্জীর প্রোফাইলে ডুব দিলি—যার ইনস্ট্যাতে নাম @Digital_Jogi। যোগানন্দ নিজেকে ‘Zen Master, Mindful Capitalist, and Life-Sculptor’ বলে পরিচয় দেন মেটা বায়োতে।
যোগানন্দ তোর জীবনের যাবতীয় সমস্যার সফল উত্তরদাতা। যোগানন্দ ব্যর্থতা বা শূন্যতা দেখান না; তিনি কেবল তার সমাধান বিক্রি করেন।
লেটেস্ট পোস্টে বিলাসবহুল সুইমিং পুলের ধারে, পদ্মাসনে বসে আছেন যোগানন্দ। হাতে একটা ম্যাকবুক প্রো।
ক্যাপশনে লেখা—নিজের ভেতরের শান্ত সমুদ্রকে খুঁজুন। অশান্তি আসে বহিরাগত ডেটা স্ট্রিম থেকে। নিজের মনোযোগের অ্যালগরিদম আপনি নিজেই লিখুন। আজই আমার ‘ডিজিট্যাল ডিটক্স ই-বুক’ কিনুন, মূল্য একহাজার টাকা।
যোগানন্দ তাঁর হতাশা বিক্রি করেন না। তিনি হতাশা থেকে মুক্তি বিক্রি করেন, যা আরও অনেক লাভজনক। তুই শূন্যতাকে আর্ট বলে পারফর্ম করিস, আর যোগানন্দ সেই শূন্যতাকে প্রোডাক্ট বানিয়ে বাজারে ছাড়েন। তুই এক ব্যর্থ নিহিলিস্ট। যোগানন্দ একজন সফল পুঁজিবাদী ,শূন্যতা বিক্রি করেন।
রাত গভীর হলো। তুই অনুভব করছিস, এই দুই বিপরীত মেরু—তোর অথেন্টিক মিথ্যে এবং যোগানন্দের সিম্যুলেটেড সত্যি—আসলে একই বৃত্তের দুটি বিন্দু।
তোর কাছে এখন দুটো পথ, হয় যোগানন্দের মতো নিজের হতাশা-মুক্তির পণ্যায়ণ করা, নয়তো বারকোড গার্লের মতো সেই ফিল্টারবিহীন বাস্তবকে গ্রহণ করা।
কিন্তু তুই সেয়ানা মাল! কোনোটাই তুই করবি না। তুই দুটোকেই মিক্স করবি। এটাই পোস্ট ট্রুথ যুগের শেষ চাল: মিথ্যের সাথে সত্যির ফিউশন।
লোগো ক্লায়েন্ট তোকে যে টিপস দিয়েছিল, সেই অর্থের একটি ভগ্নাংশ দিয়ে তুই আজ তোর ক্যাফের বিল মিটিয়েছিস—সেই বিলের একটি অস্পষ্ট, ঝাপসা ছবি তুললি।
তোর নতুন ইনস্ট্যা আপলোড।
Truth at the edge of existence: a bill. ₹370.
তুই আরও লিখেছিস,অস্তিত্বের প্রান্তে সত্যি একটা ক্যাফের বিল। এর ভেতরে কোনো গভীরতা নেই, কোনো শিল্প নেই। পাঁচ শতাংশ জি এস টি, আর কয়েক সেকেন্ডের একটা সংক্ষিপ্ত, অপ্রত্যাশিত কথোপকথনের রেশ। এই বিলটিই তোর আজকের মাইন্ডফুল ক্যাপিটাল।
পুনশ্চতে লিখেছিস—কালকে আর একবার কফি শপে যেতে হবে। হয়তো বিলটা বাড়বে। #accounting_of_nulity #NoFilter
সাথে ব্র্যাকেটে লিখলি—এই পোস্টটা কোনো ই-বুক বিক্রি করবার জন্য নয়।
তুই শূন্যতাকে ডক্যুমেন্ট করা থেকে সরে এসে শূন্যতার হিসাব ডকুমেন্ট করতে শুরু করেছিস আজকাল। তুই ডিকোড করে ফেলেছিস তোর প্রজন্মের কাছে এই কন্টেন্ট মানে হল—কন্টেন্ট তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করা, কিন্তু তবুও কন্টেন্ট তৈরি করে যাওয়া।
তুই ফোন রেখে দিলি। ফোনটা গরম। যেন তোর ক্ষুদ্র জীবন্ত হৃদয়টা আবার স্পন্দিত হচ্ছে। কালকে সকাল হবে দুপুর বারোটা পঁয়ত্রিশে। এবং তুই আবার ক্যাফে যাবি। এটা পারফর্মেন্স নয়, বরং একটা অনিবার্য রুটিন, যেটা এখন তোর নিজেরই লেখা একটা নতুন স্ক্রিপ্ট।
আপাতত ঘুমোতে যা ব্রো! ভোর হতে আর মাত্র এক ঘন্টা বাকি।

