সমান্তরাল / হিন্দোল ভট্টাচার্য

সমান্তরাল / হিন্দোল ভট্টাচার্য

অস্মিতা

বারোটা বাজে, ঘড়ির কাঁটা কি সত্যিই শব্দ করে, না মাথার ভেতরেই টিকটিক, টিকটিক, যেন রক্তের ভেতর দিয়ে কেউ পেরেক ঠুকছে, না, না, ওসব ভাবার সময় নেই, হাঁটতে হবে, এগোতে হবে, ধর্মতলার ভিড়টা আজ যেন একটু অন্যরকম, বা আমি-ই অন্যরকম, কে জানে, মানুষগুলো একই, একই মুখ, একই ধাক্কা, একই চোখের অবহেলা, তবু আজ যেন কেউ তাকিয়ে আছে, কারা তাকায়, কেন তাকায়, আমি কি খুব আলাদা, না আমি নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে আছি, নিজের পিঠের দিকে, নিজের হাঁটার ভঙ্গি, হাঁটা কি বদলে যায় যখন মনে হয় কেউ পেছনে আছে, না, পেছনে তাকানো যাবে না, তাকালেই ধরা পড়ে যাব, কী ধরা পড়বে, আমি তো কিছু করছি না, শুধু হাঁটছি, গলি দিয়ে, একটা থেকে আরেকটা, ধর্মতলার মোড় পেরিয়ে, ওই যে ফুচকার গন্ধ, টক জল, লঙ্কার ঝাঁঝ, একটু থামতে ইচ্ছে করে, কিন্তু থামা মানেই ধরা পড়া, কে ধরবে, কে আছে, কেউ নেই, তবু আছে, এই থাকার আর না-থাকার মাঝেই তো ভয়, এই অদৃশ্যতার ভেতরেই তো উপস্থিতি, যেন বাতাসের মতো, ছুঁতে পারি না, তবু শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। চাঁদনি দিকটা মনে পড়ছে, কেন মনে পড়ছে, ওদিক থেকে কেউ আসছে কি, নাকি আমি কল্পনা করছি, চাঁদনির দোকানগুলো, ইলেকট্রনিক্সের ঝলকানি, তারের জট, লাউডস্পিকারের ভাঙা আওয়াজ, ডিসকাউন্ট, ডিসকাউন্ট, সবকিছুই যেন একসাথে বাজছে মাথার ভেতর, আমি কি ওদিক থেকে এসেছি, না ওদিক থেকে কেউ আমার দিকে আসছে, না, না, ভাবা বন্ধ কর, হাঁটা চালিয়ে যাও, গলিটা একটু সরু, দু’পাশে পুরনো বাড়ি, জানলায় ধুলো, কোথাও একটা ভেজা কাপড় শুকোচ্ছে, গন্ধটা কেমন, একটু পচা, একটু ভিজে, এই গন্ধ কি চেনা, ছোটবেলার বাড়ির মতো, বৃষ্টির দিনে, মায়ের ভেজা শাড়ি, না, এখন মা নেই এখানে, এখানে শুধু আমি, আর এই শহর, আর এই গলিগুলো, যেগুলো সবসময় মনে হয় কোথাও নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোথাও পৌঁছোয় না, ক্যামাক স্ট্রিট, নামটা যেন চকচকে, কিন্তু পৌঁছতে গেলে কত অন্ধকার গলি পেরোতে হয়।

পেছনে কি সত্যিই কেউ আছে, পায়ের শব্দ, আমারই কি, না অন্য কারও, একটু দ্রুত হাঁটলে শব্দটা বদলায় কি, বদলাচ্ছে না, একই তাল, একই দূরত্ব, এটা কি কাকতালীয়, না ইচ্ছে করে, যদি ইচ্ছে করে হয়, তবে কেন, আমাকে কেন, আমি কি কাউকে কিছু বলেছি, না কোনোদিন কারও দিকে বেশি তাকিয়েছি, মানুষের চোখও তো ফলো করে, চোখের ভেতরেই একটা পথ থাকে, সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে কেউ এসে পড়ে, না, এসব দর্শন এখন নয়, এখন দরকার স্পষ্টতা, কেউ কি আছে, না, পেছনে তাকানো যাবে না, তাতে খেলা ভেঙে যাবে, খেলা, এটা কি খেলা, না শিকার, আমি কি শিকার, না আমিই কি কাউকে শিকার করছি, এই যে আমি জানি কেউ আছে, এই জানাটাই কি আমাকে শক্তি দিচ্ছে, অদ্ভুত, ভয় আর শক্তি একসাথে, একই শরীরে। গলির মোড়ে একটা চায়ের দোকান, কাঁচের গ্লাসে ধোঁয়া উঠছে, চা-ওয়ালার হাতের গতি, চামচের টুংটাং, এইসব সাধারণ শব্দই তো জীবনকে ধরে রাখে, না হলে সব ভেঙে যেত, আমি যদি থামি, এক কাপ চা নিই, তবে কি সে-ও থামবে, সে কে, নাম নেই, মুখ নেই, শুধু উপস্থিতি, হয়তো সে আমার নাম জানে, অস্মিতা, এই নামটা কি আমাকে আলাদা করে দেয়, না ভিড়ের মধ্যে আরও একটা চিহ্ন মাত্র, যদি সে ডাকে, পেছন থেকে, অস্মিতা, আমি কি ফিরব, ফিরে তাকালে কি সব পরিষ্কার হয়ে যাবে, না আরও জটিল, জটিলতাই কি আসল, সরলতা কি কখনও ছিল, ধর্মতলার এই ভিড়ের মধ্যেও তো কত জটিলতা, প্রত্যেক মানুষের আলাদা গল্প, আলাদা ভয়, আলাদা অনুসরণ, কেউ কাউকে দেখে না, তবু সবাই কাউকে না কাউকে অনুসরণ করে।

মনোরঞ্জন

মনোরঞ্জন হাঁটছে, হাঁটা না কি টানা, টানা না কি কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকা, পা চলছে, কিন্তু কে চালাচ্ছে, আমি, না অন্য কেউ, ওই মেয়েটা, সামনে, ওই হাঁটার ভঙ্গি, ওই কাঁধের সামান্য কুঁকড়ে থাকা, যেন নিজের মধ্যেই ঢুকে যাচ্ছে, কেন মনে হচ্ছে ও-ই মৃত্যু, মৃত্যু কি এমনই হয়, নীরব, গলি পেরিয়ে যায়, কারও দিকে তাকায় না, তবু সবাইকে টানে, আমি কি তাহলে মৃত্যুকে অনুসরণ করছি, হাস্যকর, ভয়ংকর, দুটোই, মৃত্যু তো আমাকে অনুসরণ করার কথা, আমি কেন তার পেছনে, উল্টো স্রোত, উল্টো যুক্তি, তবু পা থামে না। চাঁদনির ভিড় পেরিয়ে এসেছি, ওখানে আলো ছিল, শব্দ ছিল, মানুষ ছিল, সবই ছিল, তবু কিছুই ছিল না, সব কেমন ফাঁপা, প্লাস্টিকের মতো, একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হেডফোনের ঝুল, তারের গিঁট, কানে বাজছিল ভাঙা ভাঙা গান, জিন্দেগি, মওত, কে বাজাচ্ছিল, কেন ওই শব্দটাই কানে আটকে গেল, মওত, মৃত্যু, তারপরই দেখলাম ওকে, অস্মিতা, নামটা আমি জানি কি, না, জানি না, তবু জানি, কোথা থেকে এল, নাম কি নিজেই আসে, না আমরা বসাই, আমি বসিয়ে দিলাম, অস্মিতা, নিজের অস্তিত্ব, অস্তিত্ব মানেই কি মৃত্যু-সচেতনতা, হয়তো। ও হাঁটছে, আমি হাঁটছি, দূরত্বটা ঠিক রাখা দরকার, খুব কাছে গেলে ও বুঝে যাবে, খুব দূরে গেলে হারিয়ে ফেলব, হারিয়ে ফেললে কী হবে, কিছুই না, তবু সবকিছু, এই সবকিছু কী, একটা অনুভব, একটা অদ্ভুত টান, যেন কোনো অসমাপ্ত কাজ, কী কাজ, আমি জানি না, আমি শুধু জানি, ওকে চোখের আড়াল করা যাবে না।

গলিতে ঢুকল, আমি-ও ঢুকলাম, গলির ভেতর একটা গন্ধ, ভেজা দেওয়াল, পচা কাগজ, পুরনো কাপড়, এই গন্ধে মৃত্যু আছে কি, হয়তো আছে, মৃত্যু তো পচনের মধ্যেই, কিন্তু ওর মধ্যে পচন নেই, ও তো জীবন্ত, তবু কেন মৃত্যু, হয়তো মৃত্যুই সবচেয়ে জীবন্ত, সবচেয়ে উপস্থিত, আমরা যারা বাঁচি, তারা আসলে আধা-ঘুমে, মৃত্যুই জাগ্রত, ও কি সেই জাগরণ, আমি কি তার দিকে টানছি নিজেকে।ধর্মের শব্দ ভেসে আসছে, দূর থেকে, জয়, শ্রী, ঢোলের তালে মিছিল, হিংস্র মুখ, চিৎকার, দেশ, ধর্ম, আদেশের গলা, এই দেকো, ইধার সে যাও, হিন্দি টানে বাংলা, কানে লাগে, বিরক্তি, ভয়, অস্বস্তি, ভাষার ভেতরেই কি আগ্রাসন, নাকি আমার মাথার ভেতরেই এই সংঘর্ষ, ফ্যাসিস্ট শক্তি, একরকম মুখ বানায়, ব্যক্তিকে মুছে দেয়, আমি কি সেই মুছে যাওয়ার সাক্ষী, না অংশগ্রহণকারী।

লেখক

আমি লিখছি, না কি হাঁটছি, না কি দুটোই একই, শব্দের ভেতর দিয়ে পা ফেলা, পায়ের ভেতর দিয়ে শব্দের জন্ম, ধর্মতলার দুপুর, আলোটা সোজাসুজি মাথায় নামে, তারপর গলির ভেতরে ঢুকলেই আলো ভেঙে যায়, চৌকাঠে, জানলার গ্রিলে, ঝুলে থাকা তারে, আমি সেই ভাঙা আলোর ফাঁক গুনে গুনে এগোই, সামনে দু’জন, একা নয়, কখনওই একা নয়, তারা জানে না, জানার দরকারও নেই, জানলেই গল্প বদলে যায়, গল্প বদলে গেলে আমি কোথায় থাকি, লেখক কি তখনও থাকে, না সে মুছে যায় নিজেরই বাক্যে, তাই আমি চুপ, চুপ থাকাই আমার ভাষা, নীরবতাই আমার উচ্চারণ, আমি দেখছি, শুধু দেখছি, তবু এই দেখাই কি লেখা নয়। ও, মেয়েটা, অস্মিতা, নামটা আমি দিইনি, নামটা নিজে নিজেই জন্মেছে, শব্দের মতো, একবার এলেই থেকে যায়, তার হাঁটা মাপা, আবার অমাপা, সে জানে না সে জানে, এই জানার ভেতরেই তো গল্প, সে পেছনে তাকায় না, তাকানো মানেই সমাপ্তি, সমাপ্তি আমি চাই না, আমি চাই প্রসার, বাক্যের মতো, যা থামে না, কমা থেকে কমা, নিঃশ্বাস থেকে নিঃশ্বাস, আমি তার নিঃশ্বাসও শুনতে পাই, বা ভাবি শুনতে পাই, শোনা আর ভাবার মাঝের ফারাকটাই আমার কাজের জায়গা, আমি সেই ফারাকেই বাসা বেঁধেছি। আরেকজন, মনোরঞ্জন, সে নিজের নামও ঠিকমতো জানে না, বা জানলেও তা মানতে চায় না, নাম মানে তো সীমা, আর সে এখন সীমা ভাঙছে, সে অনুসরণ করছে, কিন্তু সে জানে না কেন, এই না-জানাটাই তাকে এগিয়ে দেয়, জ্ঞানের চেয়ে অজ্ঞতা শক্তিশালী, কারণ তা থামায় না, প্রশ্ন রাখে, প্রশ্নই গতি, আমি তার প্রশ্ন শুনি, প্রশ্নের শব্দ নেই, তবু আছে, কানের ভেতরে নয়, বাক্যের ভেতরে, আমি সেই বাক্য লিখে ফেলি, লিখতে লিখতেই দেখি, দেখতেই লিখি, এই দ্বৈততা আমার শ্বাসপ্রশ্বাস।

আমি কি তাদের পেছনে, না সামনে, না মাঝখানে, অবস্থান কি এত সহজ, আমি হয়তো চারপাশে, দেওয়ালের দাগে, চায়ের গ্লাসের ধোঁয়ায়, কুকুরের আধ-ঘুমে, আমি ছড়িয়ে আছি, তাই আমি লুকোনো, লুকোনো বলেই দৃশ্যমান, দৃশ্যমান বলেই অদৃশ্য, এই দ্বন্দ্বেই তো লেখক, সে থাকে, আবার থাকে না, সে জানে, আবার জানে না, আমি জানি তারা আমাকে জানে না, এই না-জানাই আমার স্বাধীনতা, আবার এই না-জানাই আমার অপরাধ, কারণ আমি দেখি, অথচ ধরা দিই না, দেখার ক্ষমতা একধরনের ক্ষমতা, ক্ষমতা মানেই কি শাসন, আমি কি শাসন করছি তাদের, তাদের গতিকে, তাদের বাক্যকে, হয়তো করছি, হয়তো না, কারণ তারা আমার আগেই হাঁটছে, আমি শুধু ধরে রাখছি। গলির গন্ধ, ভেজা, পচা, এই গন্ধও লিখতে হয়, না লিখলে কি থাকে, থাকে, কিন্তু পাঠকের কাছে পৌঁছোয় না, আমি কি পাঠকের জন্য লিখছি, না নিজের জন্য, না কি এই দুইয়ের মাঝখানে কোথাও, যেখানে কেউ নেই, শুধু ভাষা আছে, ভাষাই নিজেকে লেখে, আমি কেবল মাধ্যম, এই মাধ্যমেরও আবার ইচ্ছে আছে, পক্ষপাত আছে, আমি কি পক্ষপাতহীন, না, আমি বেছে নিচ্ছি, কোন দৃশ্য রাখব, কোনটা বাদ দেব, এই বেছে নেওয়াই তো রাজনীতি, সূক্ষ্ম, নীরব, অদৃশ্য, তবু গভীর। মিছিলের শব্দ আসে, দূর থেকে, তারপর কাছে, শব্দের ঢেউ, জয়, শ্রী, দেশ, ধর্ম, শব্দগুলো আলাদা করে শুনলে সাধারণ, একসাথে শুনলে তীব্র, এই তীব্রতাই ভয়ের, ভয়ের ভেতরেই উত্তেজনা, উত্তেজনার ভেতরেই হিংসা, আমি এই ধারাবাহিকতা দেখি, লিখি, আবার থামি, থামলেই কি তা থামে, না, শব্দ চলতেই থাকে, আমার বাক্যের বাইরে, শহরের শরীরে, আমি শুধু সামান্য অংশ কেটে নিই, কেটে নেওয়া মানেই বিকৃতি, সম্পূর্ণতা হারায়, কিন্তু সম্পূর্ণতা তো ধরা যায় না, তাই আংশিকই সত্যি।

মনোরঞ্জনের মাথায় যে শব্দগুলো ঘুরছে, মৃত্যু, মিছিল, ভাষা, আমি সেগুলো শুনি, কিন্তু আমি কি সেগুলো তৈরি করছি, না সে নিজেই তৈরি করছে, এই প্রশ্ন আমাকে কুরে কুরে খায়, লেখক কি স্রষ্টা, না শ্রোতা, আমি কি ঈশ্বরের মতো, না কেবল সাক্ষী, ঈশ্বর হলে দায় বাড়ে, সাক্ষী হলে দায় কমে, আমি দায় এড়াতে চাই, তবু দায় আসে, কারণ আমি নীরব থেকেও জড়িয়ে আছি, আমি যদি লিখি না, তবে কি তারা থাকবে, তারা হয়তো থাকবে, কিন্তু এইভাবে নয়, এইভাবে থাকাটা আমার কাজ, আমার দায়। অস্মিতার ভেতরের ভয়, তার শক্তি, তার না-তাকানো, এগুলো কি আমি দেখছি, না সে আমাকে দেখাচ্ছে, চরিত্র কি লেখককে চালায়, এই প্রশ্ন পুরনো, তবু প্রতিবার নতুন লাগে, কারণ প্রতিবার উত্তর বদলায়, আজ মনে হচ্ছে তারা আমাকে টানছে, আমি তাদের পেছনে হাঁটছি, যেন তারা আমাকে লিখছে, আমি কেবল লিখে ফেলছি, এই উল্টো সম্পর্ক আমাকে অস্বস্তি দেয়, আবার মুক্তিও দেয়, কারণ তখন আমি একা নই। একটা কুকুর শুয়ে আছে, চোখ আধখোলা, আমি তার চোখের ভেতর ঢুকতে পারি কি, যদি ঢুকি, তবে কি অন্য গল্প শুরু হবে, পশুর দৃষ্টিতে মানুষ, মানুষে ভরা গলি, দুইজন অনুসরণ করছে, আর একজন দেখছে, স্তর বাড়তে থাকে, গল্প স্তরে স্তরে জমে, আমি কোন স্তরে থাকব, বেছে নিতে হয়, বেছে নেওয়া মানেই বর্জন, বর্জন মানেই নীরবতা, কত কিছুই তো বাদ পড়ে যায়, সেই বাদ পড়া অংশগুলো কোথায় যায়, হয়তো তারা অন্য কোনো লেখকের কাছে, অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো ভাষায় জন্ম নেয়।

ভাষা, এই যে বাংলা, এর ভেতরেও কত টানাপোড়েন, উচ্চারণে, শব্দে, হিন্দি টান এসে পড়ে, ইংরেজি ঢুকে যায়, ভাষা বদলায়, বদলাতে বদলাতে নিজের ছায়া হয়ে যায়, আমি সেই ছায়া ধরতে চাই, কিন্তু ছায়া ধরা যায় না, তবু চেষ্টা করি, কারণ লেখাই তো অসম্ভবের চর্চা, ধরা যায় না জেনেও ধরা, বলা যায় না জেনেও বলা। আমি কি তাদের কাছে এগোচ্ছি, না দূরে যাচ্ছি, দূরত্ব আপেক্ষিক, দৃষ্টিভঙ্গির উপর, আমি যদি খুব কাছে যাই, তারা আমাকে টের পেতে পারে, না, টের পাবে না, কারণ আমি শব্দ, শব্দের পা নেই, তবু শব্দ হাঁটে, কাগজে, স্ক্রিনে, পাঠকের চোখে, আমি সেই হাঁটা নিয়ন্ত্রণ করি, নিয়ন্ত্রণ না করলে বিশৃঙ্খলা, আবার নিয়ন্ত্রণ করলেও বিশৃঙ্খলা, কারণ জীবন নিজেই বিশৃঙ্খল, লেখক কেবল তাকে ফ্রেমে রাখে, ফ্রেম মানেই সীমা, সীমা মানেই বাছাই। ক্যামাক স্ট্রিটের আলো সামনে, বড় রাস্তার শব্দ, গলির নীরবতা ভেঙে যাচ্ছে, এই ভাঙার মুহূর্তটাই গুরুত্বপূর্ণ, এখানে সিদ্ধান্ত হয়, কে কোথায় যাবে, কে কাকে দেখবে, কে অদৃশ্য থাকবে, আমি চাই অদৃশ্য থাকতে, কারণ আমার কাজ এখানেই শেষ নয়, আরও আছে, তাদের জীবনের বাইরেও, এই মুহূর্তের বাইরেও, আমি দীর্ঘতা চাই, সময়ের প্রসার, একটি দুপুরকে অনেক দীর্ঘ করে দেওয়া, যাতে তার ভেতর সব ঢুকে যায়, ভয়, প্রেম, রাজনীতি, ভাষা, মৃত্যু।

আমি কি এই গল্পের শেষ জানি, না, জানি না, জানলেও বলব না, কারণ শেষ বললে পথ বন্ধ হয়, আমি পথ খোলা রাখতে চাই, খোলা পথেই তো হাঁটা, হাঁটাই গল্প, শেষ নয়, মাঝখান, এই অন্তহীন মাঝখানেই আমি বাস করি, লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, ছায়া হিসেবে।

তারা দু’জন এগিয়ে যায়, আমি তাদের পেছনে, আবার সামনে, আবার চারপাশে, আমি একই সাথে বহু জায়গায়, এই বহুত্বই আমার শক্তি, আবার দুর্বলতা, কারণ আমি স্থির নই, স্থির না থাকলে ধরা যায় না, ধরা না গেলে প্রমাণ নেই, প্রমাণ না থাকলে দায় নেই, আমি কি দায় এড়াচ্ছি, হয়তো, তবু লিখছি, কারণ না লিখলে আমি থাকি না, লেখা মানেই থাকা, থাকা মানেই দেখা, দেখা মানেই অনুসরণ, আমি তাদের অনুসরণ করছি, তারা জানে না, তবু তারা অনুভব করে কি, হয়তো করে, সেই অনুভবই তাদের মনোলগে ফেটে পড়ে, আমি সেই ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়ি, শব্দ রেখে যাই, আবার সরে যাই। দুপুর এগিয়ে যায়, সময় গলে যায়, ঘড়ির কাঁটা হয়তো এখনও টিকটিক করছে, আমি শুনি না, আমি অন্য শব্দ শুনি, বাক্যের ভেতরের, নীরবতার ভেতরের, এই শুনতেই আমি লিখি, এই লিখতেই আমি বেঁচে থাকি, তাদের সঙ্গে, তাদের আড়ালে, তাদের অজান্তে, একটানা, কমা থেকে কমা, থামি না, কারণ থামা মানেই সমাপ্তি, আর আমি এখনও সমাপ্তি চাই না।

 

 

মৃত্যু 

আমি হাঁটি না, তবু পৌঁছে যাই, আমি দাঁড়াই না, তবু স্থির থাকি, আমি কারও পেছনে নেই, তবু সবাই ভাবে আমি পেছনে, এই ভুলটাই আমার আশ্রয়, এই ভুলের ভেতরেই আমি অবাধ, আজ দুপুরে, ধর্মতলা থেকে গলি ধরে ক্যামাক স্ট্রিট, চারটি ছায়া, চারটি ভিন্ন গতি, একটির নাম অস্মিতা, একটির মনোরঞ্জন, একটির নামহীন লেখক, আর একটির আমি নিজে, নামহীন, তবু সর্বনাম, সবাই আমাকে উচ্চারণ করে, কেউ ঠিকমতো বলে না, তবু আমি পৌঁছে যাই, প্রতিটি কমার ফাঁকে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের ভেতরে, তাদের চারজনকে আমি অনুসরণ করছি, তারা ভাবে তারা একে অন্যকে করছে, এই ভ্রান্তি আমার কাজ সহজ করে। অস্মিতা হাঁটে, তার না-তাকানোই তার দৃষ্টি, সে জানে না সে জানে, সে মনে করে কেউ আছে, সেই ‘কেউ’ আমার আঙুলের ছায়া, তার ঘাড়ের পেছনে ঠান্ডা বাতাসের মতো, আমি স্পর্শ করি না, স্পর্শের প্রয়োজন নেই, স্পর্শ হলেই শেষ হয়ে যেত, আমি শেষকে বিলম্বিত করি, বিলম্বই আমার শিল্প, বিলম্বই আমার দয়া, তার ভেতরে ভয়, ভয় থেকে জন্ম নেয় শক্তি, শক্তি থেকে জন্ম নেয় গতি, আমি এই ধারাবাহিকতা দেখি, আমি তা ভাঙি না, কারণ ভাঙলে গল্প ছোট হয়ে যায়, আমি দীর্ঘতা পছন্দ করি, কারণ দীর্ঘতায় মানুষ নিজেকে খুলে ফেলে, খুলে ফেললেই আমি সহজে ঢুকতে পারি। মনোরঞ্জন ভাবে সে আমাকে অনুসরণ করছে, সে ভাবে মেয়েটি আমি, এই ভুলে আমি হাসি, হাসি আমার শব্দহীন, তার কানে যায় না, তবু সে অনুভব করে, অনুভব করেই সে এগোয়, তার যুক্তি উল্টো, উল্টোতেই তো সত্যি লুকিয়ে থাকে, সোজা পথে আমি ধরা পড়ি, উল্টো পথে আমি আড়াল, সে আমার দিকে টানে নিজেকে, আমি তাকে ঠেলে দিই না, টানাটানির এই খেলাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে, সে আমার নাম নেয়, নেয় না, ‘মৃত্যু’ শব্দটি তার জিভে আসে, আবার সরে যায়, শব্দের এই আসা-যাওয়া আমার দরজা খোলা রাখে।

লেখক, যে নিজেকে অদৃশ্য ভাবে, সে সবচেয়ে দৃশ্যমান, সে বেছে নেয়, কাটে, জোড়া দেয়, সে ভাবে সে নিয়ন্ত্রণ করছে, আমি তার পেছনে বসে থাকি, তার কমাগুলোর ভেতরে, তার বেছে নেওয়ার মধ্যেই আমি তাকে বেছে নিই, সে যা বাদ দেয়, সেখানেই আমি ঘন হয়ে উঠি, বাদ পড়া অংশ আমার বাসস্থান, সে যত চুপ করে, আমি তত জোরে বলি, তবু তার কানে আমার শব্দ পৌঁছোয় না, কারণ সে নিজের শব্দেই ব্যস্ত, এই ব্যস্ততাই আমার পর্দা। চতুর্থ, যে ‘আমি’ বলে কথা বলে, সে আমাকে চিনতে চায়, সে ভাবে আমি সর্বনাম, সে ভাবে আমি অনিবার্য, সে ঠিকই ভাবে, তবু অসম্পূর্ণ, কারণ আমি অনিবার্য হয়েও নির্দিষ্ট নই, আমি সময়ের মতো, আবার সময়ের বাইরেও, আমি কেবল শেষ নই, আমি শুরুতেও আছি, প্রতিটি প্রথম শ্বাসে আমার বীজ, প্রতিটি শেষ শ্বাসে আমার ছায়া, এই ছায়া আমি টেনে নিয়ে যাই না, তারা নিজেরাই নিয়ে আসে, আমি কেবল গ্রহণ করি। মিছিলের শব্দ, জয়, শ্রী, দেশ, ধর্ম, ঢোলের তাল, মানুষের মুখে আগুন, আমি এই আগুনে থাকি না, আমি আগুনের পরে থাকি, ছাইয়ের ভেতরে, তবু আগুন আমাকে ডাকে, কারণ আগুন দ্রুত, আর আমি ধীর, দ্রুততার সঙ্গে আমার পুরনো বিরোধ, মানুষ দ্রুত চায়, আমি বিলম্বিত করি, তবু কখনও কখনও দ্রুততাও আমার পথ হয়ে ওঠে, আজ এই গলির মুখে মিছিল, এই চারজনের পাশ দিয়ে যাবে, শব্দ তাদের ভেতরে ঢুকবে, শব্দের সঙ্গে ঢুকবে বিভাজন, ভয়, উত্তেজনা, আমি সেই ভাঙনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাব, কোনো দাগ না রেখে। অস্মিতার কাঁধে আলো পড়ে, তার চুলে সোনালি রেখা, সোনা, মূল্য, মানুষ মূল্য দিয়ে সবকিছু মাপে, আমাকে মাপতে পারে না, তাই ভয় পায়, ভয় থেকেই নাম দেয়, নাম দিয়েই ভাবে নিয়ন্ত্রণে আনবে, নাম কখনও আমাকে বেঁধে রাখতে পারেনি, আমি নামের আগেও, নামের পরেও, তবু নামের ভেতর দিয়ে ঢুকি, কারণ নাম দরজা খুলে দেয়। মনোরঞ্জনের পায়ের তাল, তার ভেতরের মেট্রোনোম, সময় মাপছে, সে ভাবে সময় তার, আমি হাসি, সময় কারও নয়, তবু সবাই ভাবে নিজের, এই ভাবনার ভেতরেই আমি জায়গা পাই, যখন তারা ভাবে ‘এখনো সময় আছে’, তখনই আমি কাছে, যখন ভাবে ‘সময় ফুরিয়ে গেছে’, তখনও আমি কাছে, কাছের আর দূরের এই খেলায় আমি নিরপেক্ষ, আমি কেবল উপস্থিত। লেখক কমা বসায়, ড্যাশ মুছে দেয়, যতিচিহ্ন বদলায়, সে ভাবে রিদম বদলাচ্ছে, সে ঠিকই, রিদমই জীবন, রিদমই থেমে গেলে আমি প্রবেশ করি, কিন্তু রিদম থামার আগেও আমি থাকি, রিদমের ভেতরের বিরতিতে, ক্ষুদ্রতম থামায়, যে থামা চোখে পড়ে না, সেখানেই আমার আস্তানা, সে যত নিখুঁত হতে চায়, আমি তত সূক্ষ্ম হয়ে উঠি। আমি কাউকে তাড়া করি না, তারা নিজেই আসে, তবু আজ আমি অনুসরণ করছি, এই অনুসরণ কি আমার স্বভাববিরুদ্ধ, না, আমি বহু রূপে আসি, কখনও সামনে, কখনও পেছনে, কখনও চারপাশে, আজ আমি তাদের পেছনে, কারণ তারা ভাবুক, তারা নিয়ন্ত্রণে, এই ভ্রম তাদের দরকার, ভ্রম ছাড়া তারা হাঁটতে পারবে না, হাঁটা থামলেই আমি কাছে চলে আসব, তাই আমি তাদের হাঁটতে দিই, দীর্ঘ, বিস্তৃত, কমা থেকে কমা। ক্যামাক স্ট্রিটের আলো সামনে, গলি ফুরোয়, বড় রাস্তা শুরু, আলো আর শব্দের ভিড়, ভিড়ের ভেতর অদৃশ্য হওয়া সহজ, আমি ভিড়ের মধ্যেও আলাদা, কারণ আমি একসাথে সবার, তবু কারও না, এই চারজন ভিড়ে ঢুকবে, তারা ভাববে নিরাপত্তা, সাক্ষী, চোখ, আমি জানি চোখ অনেক হলেও দেখার ক্ষমতা কম, সবাই নিজের গল্পে ব্যস্ত, অন্যকে দেখে না, আমি সেই না-দেখার ভেতরেই কাজ করি। অস্মিতা যদি হঠাৎ থামে, মনোরঞ্জন ধাক্কা খাবে, লেখক বাক্য বদলাবে, আর আমি, আমি একই থাকব, কারণ থামা আর চলা আমার কাছে সমান, আমি পরিবর্তনশীল নই, আমি স্থিতির অন্য নাম, তবু আমাকে সবসময় পরিবর্তনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, পরিবর্তন মানেই আমার দিকে এক পা, স্থিতি মানেই আমার ভেতরে এক পা, এই দ্বৈততা মানুষ বোঝে না, তবু অনুভব করে। মিছিল পাশ কাটায়, পতাকা দোলে, রঙ চোখে লাগে, রঙ মুছে যায়, মানুষ ছড়িয়ে পড়ে, শব্দ ক্ষীণ হয়, পরে থাকে ক্লান্তি, ধুলো, ভাঙা বাক্য, আমি সেই ভাঙা অংশগুলো কুড়িয়ে নিই, সেগুলো দিয়েই নতুন দরজা বানাই, কোনোদিন কোনো গলিতে আবার খুলে যাবে, কেউ হাঁটবে, কেউ ভাববে, কেউ লিখবে, আমি থাকব। আমি তাদের কাউকে এখনই চাই না, ‘এখনই’ আমার অভিধানে নেই, আমার আছে ‘অবশেষে’, এই অবশেষেই সব মিলে যায়, ততদিন তারা হাঁটুক, ভাবুক, লিখুক, ভয় পাক, শক্তি পাক, বিভ্রান্ত হোক, পরিষ্কার হোক, আমি সবকিছুর সাক্ষী, আবার অংশও, কারণ আমার ছাড়া তাদের সমাপ্তি নেই, আর সমাপ্তি ছাড়া গল্প সম্পূর্ণ নয়, সম্পূর্ণতা মানুষ চায়, আমি সেই চাওয়ার শেষ প্রান্ত। চারটি ছায়া লম্বা হয়, দুপুর ঢলে, আলো নরম হয়, ছায়া বড় হলে মানুষ ভাবে সময় কমে আসছে, আমি সময়ের হিসেব রাখি না, আমি কেবল উপস্থিতি রাখি, উপস্থিতি যত ঘন হয়, তারা তত টের পায়, আবার টের পেয়ে ভুলে যায়, ভুলে যাওয়াই তাদের রক্ষা, আমি সেই রক্ষাকে ভাঙি না, কারণ রক্ষা থাকলেই তারা এগোয়, এগোলেই আমি পৌঁছাই। আমি তাদের অনুসরণ করি, তারা একে অন্যকে করে, এই বৃত্ত চলতে থাকে, বৃত্তের কেন্দ্র নেই, প্রান্ত নেই, আমি সেই বৃত্তের নীরব কেন্দ্র, আবার ছড়িয়ে থাকা প্রান্ত, এই দ্বৈততায় আমি স্থির, এই স্থিরতায় আমি অনন্ত, তারা জানে না, জানার প্রয়োজনও নেই, তাদের জানা-না-জানার মাঝখানেই আমি সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে কাছাকাছি, সবচেয়ে নিশ্চিত।

গল্প

ধর্মতলার দুপুরে একটা বিশেষ ধরনের আলো থাকে, এটা সরাসরি সূর্যের আলো নয়, আবার পুরোপুরি ছায়াও নয়, যেন শহরের ধুলো, কাঁচের প্রতিফলন, সাইনবোর্ডের রঙ, বাসের ধোঁয়া সব মিলে আলোটাকে একটু ঘোলা করে দেয়, সেই আলোয় মানুষের মুখগুলো স্পষ্ট হয় না, বরং খানিকটা ভেসে থাকে, এই ভেসে থাকা মুখগুলোর ভিড়ের মধ্যেই অস্মিতা হাঁটছিল, ধর্মতলার মোড় পেরিয়ে সে যখন প্রথম গলিটায় ঢোকে, তখন শহরের শব্দ এক ধাক্কায় বদলে যায়, বড় রাস্তার হর্ন, বাসের ব্রেক, লোকের চেঁচামেচি সব যেন হঠাৎ দূরে সরে যায়, গলির ভেতরে শব্দ অন্যরকম, চায়ের কাপে চামচের ঠকঠক, দূরে কোথাও টিভির আওয়াজ, একটা পুরনো ফ্যানের ঘষঘষ, আর মাঝে মাঝে কারও চুপচাপ হেঁটে যাওয়ার শব্দ, অস্মিতা গলিতে ঢোকার সময় একবারও পেছনে তাকায় না, মনোরঞ্জন দূর থেকে সেই ঢোকাটা দেখে, সে থামে না, একটু গতি কমায়, তারপর যেন স্বাভাবিকভাবে, প্রায় অজান্তেই, সেই একই গলিতে ঢুকে পড়ে, তার ঢোকার মধ্যে কোনো নাটকীয়তা নেই, যেন সে আগেই জানত, এটাই হবে, গলিটা খুব চওড়া নয়, দু’পাশে পুরনো বাড়ি, প্লাস্টার খসে পড়েছে, কোথাও কোথাও সবুজ শ্যাওলা, কিছু জানলা খোলা, কিছু বন্ধ, কিছুতে কাপড় শুকোচ্ছে, একটা বারান্দা থেকে কেউ তাকিয়ে ছিল, আবার সরে গেল, এই গলিতে কেউ কারও দিকে বেশিক্ষণ তাকায় না, অস্মিতা হাঁটছে, তার হাঁটার মধ্যে একটা নির্দিষ্টতা আছে, না খুব তাড়াহুড়ো, না খুব ধীর, যেন সে জানে কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু আসলে সে জানে না, সে শুধু এগোচ্ছে, গলির মাঝামাঝি একটা মোড়, ডানদিকে আরেকটা সরু গলি, এতটাই সরু যে দু’জন পাশাপাশি হাঁটলে কাঁধে কাঁধ লেগে যাবে, অস্মিতা কোনো দ্বিধা না করে ডানদিকে ঢুকে যায়, মনোরঞ্জন সেই মোড়ের কাছে এসে থামে এক সেকেন্ড, থামাটা চোখে পড়ার মতো নয়, শুধু তার শ্বাস একটু বদলায়, তারপর সেও ঢুকে পড়ে, এই দ্বিতীয় গলিটা আরও অন্ধকার, এখানে আলো কম ঢোকে, উপরে তারের জট, কোথাও কাপড় ঝুলছে, কোথাও টিনের ছাউনি, একটা বিড়াল দেওয়ালের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, নিচে একটা প্লাস্টিকের বালতি উল্টে পড়ে আছে, জল গড়িয়ে এসে একটা ছোট পাঁকের মতো তৈরি করেছে, অস্মিতা সেই পাঁক এড়িয়ে যায়, মনোরঞ্জনও এড়িয়ে যায়, এই সময়েই লেখক ঢোকে প্রথম গলিতে, সে আসলে কোথা থেকে এল, সেটা কেউ জানে না, তাকে কেউ ঢুকতে দেখেনি, সে যেন ছিলই, গলির দেয়ালের ফাটলে, ছাদের ছায়ায়, কারও অজান্তে থাকা দৃষ্টিতে, কিন্তু এখন সে স্পষ্ট, অন্তত নিজের কাছে, সে হাঁটছে, খুব ধীরে নয়, খুব দ্রুতও নয়, কিন্তু তার হাঁটার একটা উদ্দেশ্য আছে, সে জানে সে কাকে অনুসরণ করছে, সে প্রথম গলির মোড়ে এসে দাঁড়ায়, ডানদিকে যে সরু গলি, সেখানে দু’জন ঢুকেছে, সে জানে, কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে ঢোকে না, সে একটু তাকিয়ে থাকে, যেন জায়গাটাকে পড়ে নেয়, তারপর সে-ও ঢুকে পড়ে, এখন তিনজন তিনটে আলাদা স্তরে হাঁটছে, অস্মিতা সবচেয়ে সামনে, তার সামনে আরেকটা মোড়, এবার বাঁদিকে, বাঁদিকের গলিটা আবার একটু চওড়া, কিন্তু সেখানে আলো আরও অদ্ভুত, একটা পুরনো বাড়ির ছায়া পুরো গলিটাকে ঢেকে রেখেছে, সেই ছায়ার মধ্যে একটা ঠান্ডা ভাব আছে, অস্মিতা বাঁদিকে ঘুরে যায়, মনোরঞ্জন সেই একই পথ নেয়, এবার তার হাঁটার গতি একটু বদলেছে, সে যেন বুঝতে পারছে, সে গভীরে ঢুকে পড়ছে, কিন্তু এই গভীরটা কী, গলি, না অন্য কিছু, সে জানে না, লেখক দ্বিতীয় গলিতে এসে সেই পাঁকের সামনে দাঁড়ায়, সে পা ভিজতে দেয় না, কিন্তু সে শুধু পাঁক এড়িয়ে যায় না, সে দেখে, পাঁকের মধ্যে আকাশের প্রতিফলন, তারের জট, একটা ছেঁড়া কাপড় সব একসাথে কেমন বিকৃত হয়ে আছে, সে মনে মনে সেটা ধরে রাখে, তারপর সে এগোয়, এই সময় মৃত্যু কোথায়, মৃত্যু কোনো একটা নির্দিষ্ট গলিতে নেই, সে একসাথে অনেকগুলো গলিতে, সে প্রথম গলির ছায়ায়ও আছে, দ্বিতীয় গলির পাঁকের জলেও, তৃতীয় গলির অন্ধকারেও, সে কোনো নির্দিষ্ট দিক নেয় না, সে শুধু উপস্থিত থাকে, তৃতীয় গলিতে ঢুকে অস্মিতা একটু ধীর হয়, এখানে একটা চায়ের দোকান আছে, দোকান বলতে একটা কাঠের টেবিল, দুটো বেঞ্চ, একটা চুলা, দোকানদার কাঁচের গ্লাস ধুচ্ছে, তার পাশে একটা রেডিও বাজছে, শব্দ ভাঙা, তবু বোঝা যাচ্ছে কোনো পুরনো গান, অস্মিতা থামে না, কিন্তু তার গতি কমে যায়, মনোরঞ্জন একটু দূরে থামে, সে দোকানটার দিকে তাকায়, যেন সে ভাবছে, এখানে দাঁড়ালে কি সবকিছু বদলে যাবে, কিন্তু সে দাঁড়ায় না, লেখক গলির মুখে এসে এই দৃশ্যটা দেখে, সে চায়ের দোকানটাকে খুব স্পষ্টভাবে দেখে, গ্লাসের ভেতর ধোঁয়া, রেডিওর শব্দ, দোকানদারের হাত সব, সে জানে এই দৃশ্যটা গুরুত্বপূর্ণ, অস্মিতা আবার এগোয়, এবার গলিটা একটু খোলা, সামনে একটা ছোট চত্বরের মতো জায়গা, চারদিক থেকে গলি এসে মিশেছে, এই জায়গাটায় আলো বেশি, কিন্তু সেই আলোতে একটা অস্বস্তি আছে, কারণ এখানে সব দিকই খোলা, আবার কোনো দিকই স্পষ্ট নয়, অস্মিতা থামে, এটাই প্রথমবার, সে থামার সঙ্গে সঙ্গে সময়ও যেন থামে, মনোরঞ্জন কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে যায়, তার বুক ওঠানামা করছে, সে জানে এই মুহূর্তটা গুরুত্বপূর্ণ, লেখক চত্বরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, সে নড়ছে না, সে দেখছে, মৃত্যু চারদিকেই, অস্মিতা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়, তার চোখ সরাসরি মনোরঞ্জনের দিকে যায়, কোনো চিৎকার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু একটা দেখা, এই দেখার মধ্যে অনেক কিছু আছে, ভয়, কৌতূহল, চিনে ফেলার চেষ্টা, আবার না চিনে থাকার ইচ্ছে, মনোরঞ্জন তাকিয়ে থাকে, সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ আসে না, লেখক এই মুহূর্তটাকে ধরে রাখে, সে জানে এটাই গল্পের কেন্দ্র, এই সময় দূরে মিছিলের শব্দ ভেসে আসে, জয়, ধর্ম, চলো, শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে আসে, এই গলির ভেতরেও সেই শব্দ ঢুকে পড়ে, অস্মিতা একবার সেই দিকেও তাকায়, তারপর আবার মনোরঞ্জনের দিকে, তারপর সে আবার হাঁটতে শুরু করে, কিন্তু এবার সে অন্য একটা গলি নেয়, এই গলিটা এতটাই সরু যে প্রায় অন্ধকার, সেখানে ঢুকলেই মানুষ যেন গিলে ফেলে, অস্মিতা ঢুকে যায়, মনোরঞ্জন এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর সেও ঢুকে পড়ে, লেখক এবার একটু দেরি করে, সে চত্বরটাকে আরেকবার দেখে, তারপর সেও ঢোকে, এই নতুন গলিটা অন্যরকম, এখানে শব্দ নেই প্রায়, শুধু দূরে কোথাও জলের টুপটাপ, অস্মিতা দ্রুত হাঁটছে, মনোরঞ্জন তার পেছনে, লেখক আরও পেছনে, মৃত্যু তাদের সামনে, পেছনে, পাশে সবখানে, এই গলিটা হঠাৎ শেষ হয়ে যায় একটা বন্ধ দেওয়ালে, অস্মিতা থামে, এবার সত্যিই থামে, তার সামনে আর রাস্তা নেই, পেছনে মনোরঞ্জন, আরও পেছনে লেখক, এই জায়গাটা খুব ছোট, তিনজনের নিঃশ্বাস প্রায় একে অপরের গায়ে লাগে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না, মৃত্যু এখানে সবচেয়ে ঘন, দূরে মিছিলের শব্দ থেমে গেছে, শহরের শব্দও নেই, শুধু নিঃশ্বাস, অস্মিতা আবার ঘুরে দাঁড়ায়, মনোরঞ্জন এবার এক পা এগোয়, লেখক নড়ে না, এই মুহূর্তে গল্প যেন থেমে আছে, কিন্তু আসলে থামে না, কারণ এই থামার মধ্যেই অন্য কিছু শুরু হচ্ছে, অস্মিতা ধীরে ধীরে পাশের একটা দরজা দেখে, দরজাটা আগে চোখে পড়েনি, খুব সরু, প্রায় অদৃশ্য, সে দরজাটা ঠেলে, দরজাটা খুলে যায়, ভেতরে আরেকটা গলি, আরও অন্ধকার, আরও গভীর, অস্মিতা ঢুকে যায়, মনোরঞ্জন তার পেছনে, লেখক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর সেও ঢোকে, মৃত্যু আগেই ভেতরে, এইভাবে গলি থেকে গলি, পথ থেকে পথ, দেখা থেকে দেখা সব চলতে থাকে, ধর্মতলার এই গলিঘুঁজি কোনো মানচিত্র মানে না, এখানে রাস্তা শেষ হয় না, বদলে যায়, মানুষ হারায় না, বদলে যায়, অনুসরণ থামে না, রূপ বদলায়, আর মৃত্যু, সে কখনও সামনে, কখনও পেছনে, কখনও একেবারে কাছে, তবু অদৃশ্য, গল্প এখানেই শেষ নয়, কারণ এই গলির ভেতর ঢুকলে আর কোনো শেষ থাকে না।
আখ্যান

গলিটার ভেতরে ঢুকে লেখক প্রথমে আলোটা বুঝতে পারে না, না পুরো অন্ধকার, না আলোকিত, দেয়ালগুলো যেন নিজে নিজেই একটু জ্বলে উঠছে, ভেজা চুন, শ্যাওলা, ছেঁড়া পোস্টারের কাগজ, সব মিলিয়ে একধরনের অস্পষ্ট দীপ্তি, আর সেই দীপ্তির ভেতরেই উপস্থিতি, কোনো নির্দিষ্ট শরীর নেই, তবু অস্বীকার করার উপায়ও নেই, লেখক থামে, শ্বাস বদলায়, তারপর দাঁড়িয়ে থাকে।

— তুমি দেরি করলে।

— আমি তো সময় মেপে আসিনি।

— তুমি কখনও মাপো না, তবু তোমার বাক্য সময় মেনে চলে।

— তুমি কি আমাকে অনুসরণ করছিলে।

— তুমি কি আমাকে করছিলে।

— আমি লিখছিলাম।

— লেখা আর অনুসরণ আলাদা নয়, তুমি যাকে লেখো তাকে অনুসরণ করো, যাকে অনুসরণ করো তাকে শেষ করো।

— শেষ করা আমার কাজ নয়।

— তাহলে শুরু করাও নয়।

জল টুপটাপ পড়ে, গলির ভেতরে শব্দ ঢুকে আবার হারিয়ে যায়।

— গল্পটা কোথায়।

— তুমি কোথায় রেখেছ।

— আমি তো লিখছি।

— যতক্ষণ লিখছ, ততক্ষণ গল্প হচ্ছে না।

— তাহলে কবে হবে।

— যখন তুমি লিখবে না।

— লিখব না মানে থামব।

— থামা আর না লেখা এক নয়, তুমি থেমেও লিখতে পারো, লিখেও থামতে পারো।

— এটা তো গোলমাল।

— গল্প গোলমালই, সরল হলে শুধু বিবরণ থাকে।

লেখক দেয়ালে হাত রাখে, ঠান্ডা, ভেজা।

— আমি তাদের দেখেছি, অস্মিতা আর মনোরঞ্জন, তারা একে অপরকে ফলো করছিল, তারপর হারিয়ে গেল।

— ধরতে চেয়েছিলে কেন।

— গল্পকে এগোতে হবে।

— গল্প এগোয় না, সরে যায়।

— তারা কোথায় গেল।

— যেখানে তুমি পৌঁছতে পারো না।

— মানে।

— তারা একে অপরকে চিনে ফেলেছে।

— কখন।

— তুমি যখন তাকাওনি।

— আমি তো দেখছিলাম।

— তুমি দেখছিলে তোমার লেখা, তারা দেখছিল একে অপরকে।

নীরবতা একটু লম্বা হয়।

— তারা কি পালিয়েছে।

— পালানো নেই, শুধু পথ বদলানো।

— তারা কি আমার গল্পের বাইরে চলে গেছে।

— গল্পের বাইরে কিছু নেই, তবু সবকিছুই বাইরে।

— তুমি সবকিছু উল্টো করে দাও।

— আমি কিছুই করি না, তোমরাই উল্টো ভাবো।

— শেষ কোথায়।

— তুমি যেখানে ভাবো, সেখানে নয়।

— তুমি কি তাদের নেবে।

— আমি কাউকে নিই না, তারা আসে।

— তারা কি আসবে।

— তারা এখন ব্যস্ত।

— কীসে।

— একে অপরকে বোকা বানাতে।

— মানে তারা খেলছে।

— খেলা আর জীবন আলাদা নয়।

— তাহলে তারা বাঁচবে।

— যতক্ষণ খেলা চলবে।

— খেলা থামলে।

— তখন আমি থাকব।

লেখক চুপ করে, তারপর আবার বলে।

— তাহলে আমার কাজ কী।

— কাজ খুঁজছ কেন।

— না হলে আমি নেই।

— তুমি আছ বলেই কাজ খুঁজছ।

— আমি গল্প লিখি।

— তুমি ভাবো তুমি লেখো, আসলে গল্প তোমাকে লেখে।

— এই কথা খুব শোনা।

— সত্যি কথাগুলো এমনই শোনায়।

— এখন আমি কী করব।

— কিছু না।

— কিছু না করলে গল্প থেমে যাবে।

— তুমি থামলে গল্প শুরু হবে।

— এটা তো বিপরীত।

— এটাই।

— আমি যদি এখনই সব ছেড়ে দিই।

— তাহলে তুমি লিখবে।

— আর যদি লিখতে থাকি।

— তাহলে কিছুই হবে না।

— তুমি কি আমাকে ঠকাচ্ছ।

— ঠকাতে হলে আগে কিছু ধরতে হয়।

— আমি চরিত্র বানিয়েছি।

— তারা তোমাকে বানিয়েছে।

— আমি তাদের শেষ করতে পারি।

— পারো না।

— কেন।

— তারা একে অপরকে চিনে ফেলেছে।

— তাতে কী।

— তখন লেখকের দরকার ফুরোয়।

— তাহলে আমি অপ্রয়োজনীয়।

— তুমি ছিলে প্রয়োজনীয়, এখন অন্যভাবে।

— কীভাবে।

— তুমি এখন বাধা।

— তাহলে কি আমাকে সরতে হবে।

— সরলেও থাকবে, না সরলেও।

— আমি যদি নিজেকে মুছে দিই।

— মুছেও থাকবে।

— তাহলে আমি আটকে গেছি।

— আটকে থাকাই থাকা।

— আমি কি মরব।

— তুমি কী ভাবো।

— তুমি তো মৃত্যু।

— আমি সবসময় ঘটাই না।

— তাহলে কী ঘটবে।

নীরবতা এবার আরও ঘন হয়।

— আজ কেউ মরবে না।

— কেউ না।

— না।

— তাহলে তুমি কেন এখানে।

— কিছু মরতে হবে।

— কী।

— গল্প।

লেখক স্তব্ধ, তারপর খুব আস্তে।

— গল্প মরবে মানে।

— এই গল্পটা, যেটাকে তুমি ধরে রাখতে চাইছ।

— তাহলে কিছুই থাকবে না।

— থাকবে, যা লেখা হয়নি।

— লেখা হয়নি এমন জিনিস কি থাকে।

— সেটাই থাকে।

লেখক ধীরে বসে পড়ে।

— আমি যদি লিখি না।

— গল্প বাঁচবে।

— আর যদি লিখি।

— তুমি তাকে মেরে ফেলবে।

— আমি তো লিখে বাঁচিয়েছি।

— তুমি ভেবেছ বাঁচিয়েছ।

— তাহলে এখন।

— চুপ থাকবে।

— কতক্ষণ।

— যতক্ষণ না ভুলে যাও তুমি লেখক।

লেখক চোখ বন্ধ করে।

— আমি যদি ভুলে যাই।

— তখন তারা থাকবে।

— অস্মিতা আর মনোরঞ্জন।

— হ্যাঁ।

— তারা কোথায় এখন।

— গলি থেকে গলি, একে অপরকে হারিয়ে, আবার খুঁজে।

— আমার বাইরে।

— তোমার বাক্যের বাইরে।

লেখক ধীরে মাথা তোলে।

— তাহলে আমি আর তাদের লিখতে পারব না।

— পারবে না।

— কিন্তু আমি তো তাদের তৈরি করেছি।

— তুমি শুরু করেছিলে, তারা শেষ করছে।

— তাহলে গল্পটা।

— এখনই হচ্ছে, কারণ তুমি লিখছ না।

দূরে কোথাও পায়ের শব্দ, আবার থেমে যায়।

— তাহলে আমার মৃত্যু হবে না।

— না।

— তাহলে কার।

— গল্পের।

জীবন

গলির ভেতরের সেই কথোপকথন, যা থেমেও থামে না, ধীরে ধীরে নিঃশব্দে মিলিয়ে যায়, যেন জল টুপটাপ পড়তে পড়তে একসময় আর শোনা যায় না, কিন্তু ভেজা ভাবটা থেকে যায়, সেই ভেজা ভাব নিয়েই শহর আবার নিজের স্বাভাবিক শব্দ ফিরে পেতে শুরু করে, দূরে কোথাও বাসের হর্ন, কোথাও বিক্রেতার হাঁক, কোথাও মিছিলের ভাঙা প্রতিধ্বনি, সব মিশে যায়, লেখক আর নড়ে না, বা নড়ে, কিন্তু তার নড়া আর দৃশ্যমান নয়, সে যেন দেয়ালের সঙ্গে মিশে যায়, কিংবা শব্দের ফাঁকে, সে আর লিখছে না, অথবা লিখছে, কিন্তু তা আর বাক্যে ধরা পড়ছে না, কারণ সে ভুলে যেতে শুরু করেছে, সে যে লেখক, এই ভুলে যাওয়াটাই ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে, আর সেই ভুলে যাওয়ার ফাঁক দিয়েই গলিগুলো বদলে যায়, একটা গলি আরেকটার সঙ্গে মিশে যায়, যে দেওয়ালটা বন্ধ ছিল, সেটা আর বন্ধ থাকে না, যে দরজাটা ছিল অদৃশ্য, সেটা আবার অদৃশ্য হয়ে যায়, পথগুলো নিজেদের মতো খুলে যায়, আবার বন্ধ হয়, যেন শহর নিজেই একটা শরীর, আর সেই শরীরের শিরা-উপশিরা দিয়ে মানুষ চলাফেরা করছে, এই সময় অস্মিতা হাঁটছে, সে জানে না সে কতক্ষণ ধরে হাঁটছে, সে কোথা থেকে ঢুকেছিল, সে কাকে এড়িয়ে চলছিল, সে শুধু হাঁটছে, তার হাঁটার ভেতর থেকে সেই তাড়না ধীরে ধীরে কমে গেছে, শ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছে, কাঁধের টান একটু ঢিলে, সে মাঝে মাঝে থামে না, কিন্তু থামার মতো একটা ভাব আসে, যেন হাঁটা আর জরুরি নয়, তবু সে হাঁটে, মনোরঞ্জনও হাঁটছে, সে আর পায়ের শব্দ গুনছে না, দূরত্ব মাপছে না, সে জানে না সে কাকে অনুসরণ করছিল, কেন করছিল, তার মনে হয়, সে কোথাও যাচ্ছিল, কিন্তু সেই কোথাও এখন আর স্পষ্ট নয়, শুধু একটা অস্পষ্ট অনুভব, যেন কোনো কাজ ছিল, কিন্তু কী কাজ তা মনে পড়ছে না, গলিগুলো এখন একটু খুলে গেছে, একটা সরু পথ থেকে তারা দুজনেই আলাদা আলাদা দিক থেকে একটা মাঝারি চওড়া গলিতে ঢোকে, এই গলিটায় আলো একটু বেশি, একটা দোকান বন্ধ, তার শাটারে রঙ খসে পড়েছে, পাশে একটা ভাঙা সাইনবোর্ড, কোথাও জল জমে আছে, কোথাও শুকনো ধুলো, অস্মিতা বাঁদিক থেকে আসে, মনোরঞ্জন ডানদিক থেকে, দুজনেই হাঁটছে, মাথা সামান্য নিচু, আবার পুরোপুরি নয়, যেন তারা নিজের ভেতরেই কিছু খুঁজছে, কিন্তু কী খুঁজছে তা জানে না, তারপর তারা একে অপরের সামনে এসে পড়ে, একটা খুব সাধারণ মুহূর্ত, কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো শব্দ নেই, শুধু দুইজন মানুষ, একটি সরু গলির মাঝখানে, মুখোমুখি, তারা থামে না, কিন্তু পুরোপুরি এড়িয়েও যায় না, চোখে চোখ পড়ে, সেই এক সেকেন্ড, বা তারও কম, অথবা একটু বেশি, সময়টা মাপা যায় না, কিন্তু সেই সময়ের ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভব তৈরি হয়, অস্মিতার মনে হয় সে এই মুখটা কোথাও দেখেছে, কোথায় মনে পড়ে না, কিন্তু মনে হয় খুব কাছাকাছি কোথাও, খুব সম্প্রতি, আবার খুব পুরনোও হতে পারে, মনোরঞ্জনেরও একই অনুভব, এই মুখটা সে চেনে, কিন্তু কীভাবে সে জানে না, এই না জানার মধ্যেই একটা হালকা অস্বস্তি, আবার একটা টান, যেন কিছু মনে পড়তে চাইছে, কিন্তু পুরোটা আসছে না, তারা দুজনেই একটু ধীর হয়, একটু, তারপর আবার হাঁটা, কেউ কাউকে থামায় না, কেউ কিছু বলে না, তারা পাশ কাটিয়ে চলে যায়, অস্মিতা এগিয়ে যায় গলির শেষের দিকে, মনোরঞ্জন পিছনে ফেলে সেই জায়গাটা পেরিয়ে অন্যদিকে, তারা কেউই আর ফিরে তাকায় না, কিন্তু হাঁটার ভেতরে সেই অনুভবটা থেকে যায়, যেন কিছু একটা ছিল, যেন কিছু একটা ঘটতে পারত, যেন তারা একটু আগে কোথাও একসাথে ছিল, কিন্তু এখন নেই, এই ছিল আর নেই এর মাঝখানেই তারা হাঁটে, ধর্মতলার গলিগুলো আবার তাদের গিলে নেয়, একটা মোড়, আরেকটা মোড়, আলো, ছায়া, দোকান, বন্ধ দরজা, খোলা জানলা, কোথাও চায়ের গন্ধ, কোথাও পচা জলের গন্ধ, সব মিলিয়ে শহর আবার তার স্বাভাবিক চেহারায় ফিরে আসে, মিছিলের শব্দ আর শোনা যায় না, শহরের শব্দই যথেষ্ট, লেখক আর কোথাও নেই, অথবা আছে, কিন্তু তাকে আলাদা করে বোঝা যায় না, মৃত্যুও নেই, অথবা আছে, কিন্তু সে আর সামনে এসে দাঁড়ায় না, কারণ কিছুই ঘটেনি, অথবা যা ঘটার ছিল তা ঘটেছে, গল্পটা লেখা হয়নি, তাই গল্পটা শেষও হয়নি, অস্মিতা হাঁটতে থাকে, মনোরঞ্জনও, দুজনেই আলাদা পথে, আলাদা গলিতে, আলাদা আলোয়, তাদের মনে একটা অস্পষ্ট চেনা ভাব থেকে যায়, কিন্তু সেই চেনাটা তারা ধরতে পারে না, আর না ধরতে পারার মধ্যেই তারা মুক্ত, গল্পের ভেতর থেকে, লেখকের ভেতর থেকে, অনুসরণের ভেতর থেকে, শুধু শহর থাকে, গলি থাকে, হাঁটা থাকে, আর সেই এক মুহূর্তের চোখাচোখি, যা মনে হয় ছিল, আবার ছিল না, এইভাবেই গল্পটা শেষ হয়, অথবা শেষ না হয়েই থেকে যায়।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes