
প্রত্যূষা সরকার-এর কবিতাগুচ্ছ

মৃত্যু এক আশ্চর্য উৎসব
[উৎসর্গ: ঠাকুমা রেনুকা সরকারকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ক্রিমাটরিয়াম থেকে ফিরে…]
ছুটি
শুধু একটা ধবধবে বিচ্ছেদ পড়ে রয়েছে। বহুদিন ঝগড়া না করার মতো, বহুদিন আদর করে না ডাকার মতো। আমাদের থাকা বা না থাকা সবটাই কীরকম আগুন কেন্দ্রিক, সবটাই ফুরিয়ে যাওয়ার জন্য। মাদুর বিছানো ঘুম পাড়ানি রাত, তালপাতার পাখায় নরম হাওয়া, বিষাদের রজনীগন্ধায় সেজে কী এক ধুন্ধুমার হরিনাম। এমনভাবে কতদিন অঝোরে কাঁদতে দেখিনি কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে, কোনো শীতস্তব্ধ সন্তানকে! আমাদের গঙ্গাজল ধুয়ে যায়। দু-ঢোক মিনারেল ওয়াটার চিবিয়ে গুটিগুটি পায়ে রাত ঘরে ফেরে। আমার যে সমস্ত মনখারাপের স্কুলবেলা টিফিন বক্স খুলে আচমকা মিটিমিটি হেসেছিলো— আমি তাকে ছুটি দিলাম
১৪.০২.২০২৬। রাত ১২টা ১৭।
গুমনামি
খসখসে তালুর রেখা ফুরিয়েছে। ভয়েজ-ওভারে পাড়াতুতো কান্নার বোল। খুঁটিয়ে পড়ে ফেলা বইগুলো বারান্দা বালিশ আর চশমায় লেপ্টে আছে, সোঁদা গন্ধ দূর থেকে বসন্তে… এ এক প্রকট ধূপ-সন্ধে, নিরাময়ের পর স্থির শরীর। গুটিগুটি পায়ে পূর্বজন্ম ফিরে আসে। কতবার মিছিমিছি অক্ষর, কতবার ভুলে গেছি বাড়িপথ, করবী গাছ— শীত শেষে আরও শীতল আরও গুমনামি
১৪.০২.২০২৬। রাত ১২টো ৪০।
ক্যান্টিন
কোনোদিনই কোনো ক্যান্টিন ছিলো না আমার। স্কুলের পাশের বাড়িটায় বন্ধুরা ছুটে যেতো, ঘুগনি আলু কাবলি কটকটি ভাজা আরো কত কী। আমার একটা কাঠগোলাপ ছিলো, তেল আর জলের মধ্যে মিলেমিশে থাকতো। সলতে শক্ত হতে হতে নিভন্ত তেল। একদিন মিথ্যে ভয়ের মতো এগিয়ে এলো জ্বর। স্কুল ফুরালো, টিফিনবাক্সে মরচে ধরা তালা। ধবধবে কাঠগোলাপ কোন্ পাপড়িটাকে কতটা আদর করবে, ঠিক ভেবে পেলো না। সে তখন নদীর আদিম চর, দুমরে মুচড়ে চুরমার হয়ে গেছে।
যে পাপড়িতে প্রথম খয়েরি ধরেছিলো, সে পাপড়ির খোঁজ কাঠগোলাপও নেয়েনি। চিনি ছাড়া কালো চা আর বাসি রুটি খেতে খেতে সে একটা ক্যান্টিন খুলে ফেলেছে।
১৫.০২.২০২৬। রাত ১টা ৬।
শোক
যারা হারিয়ে যায় কাঙাল করে রেখে যায় স্পর্শ। আত্মাহুতি দেয় এক চিলতে আগুনরাঙা হাসি, মুখোমুখি শীতকাল, কত সংযত। লেপ-কাঁথা ছেড়ে জুড়ে থাকা মৃত্যু আলপনা। আমাদের জুঁই-বেলি রবীন্দ্র-সন্ধে ম্লান হয়ে আসে। ধুয়ে যাওয়া ব্যর্থ স্লোগানের মতো যে চেহারা খিলখিল লুটোপুটি, তাকেও তো একদিন বয়ে যেতে হবে। নদীর মতো… একা! শরীর গন্ধ প্রকট হলে যেভাবে আদিরং বিছিয়ে রাখেন যমদূত
১৫.০২.২০২৬। রাত ১টা ৫৫।
স্বাধীনঘর
বিলি কাটা চুলে বিকল্প হাত খুঁজি। গন্ধ খুঁজি বিছানায়। ব্যর্থতার উচ্চতা মাপতে মাপতে বারান্দা থেকে উঁকি মারে সময়। সময় এক অদ্ভুত মেটাফর। দীর্ঘতম সাদা শাড়ির উষ্ণতায় বৃক্ষের মতো স্বাধীনঘর। আমি আবদার ছুঁড়ে দিই, নিজেকে মস্ত ভেবে গুঁড়িয়ে দিই দারুচিনি দ্বীপ।
সেই সব নারকেল নাড়ু সন্ধে, ধুনুচি ধোঁয়ার উঠোন, ট্রাঙ্কের ভেতর সোঁদা হয়ে যাওয়া পেট্রাপোল, তুলসী পাতায় ঘুম এঁকে দেয়
১৫.০২.২০২৬। রাত ২টো ১৮।
উৎসব
খই ছড়ানো চেনা ফুটপাত যেন দীর্ঘ বলিরেখা, অন্তর্দ্বন্দ্বে কিশোরীবেলার পদাবলী। প্রথম সমুদ্র, প্রথম ঝিনুক, বালি, রান্নাবাটি খেলা, চৌকির নিচে আবোলতাবোল পড়া— এক ঝটকায় আমি নদী হয়ে যাই। অজস্র ডাকনামে এলিয়ে রাখি জীবন। জীবনের আর যাই হোক, পরাজয় নেই। হরিনাম, সংকীর্তন, তীব্র হাসাহাসি, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাঝে হুট করে মনে পড়ে, দীর্ঘক্ষণ একটা উৎসব চলছে। ঘি, শুক্তো, মুগের ডাল, পাবদার ঝাল, শেষ পাতে মিষ্টি দই আর মশলা পান— সাম্রাজ্যের আধুনিকীকরণ কেবল
১৫.০২.২০২৬। রাত ২টো ৪৫।
গঙ্গা
অনুপস্থিতির বিজ্ঞাপন লিখছিলাম। লিখতে লিখতে চিঠি হয়ে গেছে সন্ধে। নামগান শুরু হওয়ার পর নরক থেকে স্টেশন, স্টেশন থেকে হাইওয়ে একনাগাড়ে স্যানিটাইজার মেখে চলেছি। পাপ আর অবচেতন আরও একটু বুদ্ধিদীপ্ত হতে পারতো। আজ খারাপ শব্দের ভেতর আমি এক বিন্দু গঙ্গা দেখছি।
১৫.০২.২০২৬। ভোর ৫টা ৮।
বিষ
একটা আধ খাওয়া প্রজাপতি-বিস্কুট ঠাকুমার বিলুপ্ত সিঁথিতে কিছুটা মন খারাপ রেখে গেছিলো। সেদিন থেকেই থেমে গেছিলো আবিষ্কার। বাবার ন্যাড়া মাথায় একটা দুটো করে চুল ধরছিলো আস্তে আস্তে।
একদিন এক-পা দু-পা করে আগুনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ঝিনুক-বাটির দিন শুরু হতে না হতেই কাটা নাভিতে শুরু হলো বিপ্লব। সাড়ে একত্রিশ বছর আমি শুধু বিপ্লব করে গেলাম
“সমাজ” আর “লোকে কী বলবে”-এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি অবাক হবো না, যদি কোনোদিন খুন করে ফেলি। রক্তে বিষ নিয়ে জন্মানোর আশীর্বাদ সবার জোটে না!
১৫.০২.২০২৬। দুপুর ২টো ৪।
পিতৃপরিচয়
স্বাধীনতার গল্পে মধুমতি নদী ও তুমি। মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে হেলিকপ্টার, মাইকে মাইকে পদ্মাপাড়ের কাঁটাঝোপ। ভিটেমাটি ঠাসাঠাসি আর পীড়িত মাছেদের হাহাকারে চূলার আঁচ নিভে গেছে। রৌদ্রস্নান সেরে বাসা থেকে ঘর হয়ে গেছে ঘোমটা টানা ফুটফুটে শ্রাবণ। গোটা সংসার সংখ্যায় দাপুটে। মাছের পেটি থেকে মধ্যদুপুর ধবধবে নুন। জরায়ু বেজে ওঠে। থকথকে কাদার ভেতর আঁচড় কাটে ধোঁয়া ওঠা ফ্যান। আত্মীয় বদল হয়, অনাত্মীয় আকাশ। সেই অকাল বৃষ্টির ছমছমে ভ্রূণ আমার জন্ম সাক্ষী, আমার এ জন্মের পিতৃপরিচয়
১৫.০২.২০২৬। দুপুর ৩টে ২৫।
পরলোক
অক্সিজেন বিলুপ্ত হওয়ার পর আরও একবার জন্মদিন, আরও একবার ভ্রূণ স্থানান্তর। শিকড় আর শরীর ক্রমশ এক হয়ে যায়। সেই জানলায় অ্যাম্বুলেন্সের বাঁশি। ভয় ভয় মুহূর্ত ও ভগবৎ গীতা। সেখানে আমি বা তুমি, তুমি বা ওরা সাবান মেখে দীর্ঘ সংলাপ বলে না। কেউ কেউ কুঁচকেও থাকে। সমুদ্রের বুকের ওপর উড়ে যায় অস্থির ডানা। অভিযোজন পুড়ে ছাই হবার পর কখনো জিজ্ঞেস করেছো, যে পাখি এখনও সাইবেরিইয়া চেনে না, সে কি আদৌ পরলোক চেনে?
১৫.০২.২০২৬। বিকেল ৪টে।


Pratyusar sobguli kobitai khub sundor. Tarmodhhr পরলোক kobitati aamar sobcheye vaalo legechhe,,,,