
মৌ চক্রবর্তী-র কবিতাগুচ্ছ
ঋক ও হলুদপাতার মন
১
ঋক …
গুচ্ছ গুচ্ছ তুচ্ছ লেখা আচমন সন্ধ্যা পুকুর
যেখানে ছিল যা সেখানেই তার জলে
দুটো শুকনো বকুল
অতল না বলা সেই কথা
অবিচল কথার পাশে একটা দাঁড়ি
নিঃশর্ত দিয়ে থাকে পাড়ি
তেমনই শীতঘুমে বুড়োবুড়ি
আমি কি তোমায় ভুলতে পারি
দাঁড়ির জন্যে
শাড়ির জন্যে
দুপুরের পর দুপুর হন্যে
আনাাড়ি আমি মন-কন্যে
ব্যালকনিতে ধুলোর তুলো-ছন্দ
ভুল মন্দ মন্দ পতনে কবিতার এক আনাড়ি
বেমালুম আলপিন এঁটে আরেকটা দিন
বৈশাখী ঋণ হলুদপাতার বুকে …
সেই আলপিন ঝরা কান্নায় মেতেছে
শেষ দিন উপমাহীন
২
মন…
উতকোচহীন
কেইবা ফেরে বিচারকের আসনে মুদ্রণ করে
ঋতুরঙ্গের ছেঁড়া পাতা বানভাসিতে অভয়ার ছাতা
এসেছে ভেসে শেষবেলায়
ছেঁড়া ডায়রির পাতার ভেলায়
নিভে যাচ্ছে কোপাইয়ের সিঁড়ি
এপারে ওপারে কোন পারে মরি
প্রিয় বন্ধু,
ছায়ার গভীরে আলো নেই চাঁদের
নেই পুকুর জলে ছায়াগাড়ির আলাপন
আঙুলে নখের বোধের ভিতর ছায়া নেই
খুঁজছি, হাসপাতালের
সেই এক কবির জন্যে হন্যে
খেলা তার কলারে এখনও বুঝি
খোলা জানলায় দুপুর
সেই এক কবি-কবির ফুটনোটে
মাছির মিছিল চলে ঋতু পেরিয়ে রাতদিন
দিনরাত লাশঘরে রয়ে যায় কে যেন জন্মহীন
তাকেও জিজ্ঞেস করি ছায়ার কথা
ছায়া বড়ো হয় তাড়াতাড়ি
যেমন বিশুদ্ধ দুপুরে এক কবি আর একা বাড়ি
ছায়া সে কবির ছায়া, নিষ্ঠুর তার কায়া
নেই মায়া ঘুমের ওষুধে এক কবি ভেসে ওঠে
আরেক কবির নাম হারায় স্বপ্নের মতন
হারায় সুখী ছাতার মতন হারায় সেই কবির মতন,
রাত আসে কবির কাছে জমা এমন কত রাত
চিঠির সুরে লেখালেখির সেই সুপ্রভাত
বেগুনের ক্ষেতে বসে পটল কুমড়ো
শূন্য সরণ হয় না পূর্ণ
তার অসুখের কাছে বসে থাকে শহরের সব লাশ
গলিময় রক্ত আজ
তাতেই ফুটছে বসন্তের লালফুল
কাকে যেন সোহাগে প্রশ্ন করে আরও ঘুমোবে?
নাকি এখন যাবে লাশঘরে যেখানে
বৃত্ত শেষে গিয়ে মেশে নালার রাজপথে
বাঁক শেষে নদীর জলে বসে বিকেল একদিন
সরণ শূন্য পাখি আর কবি কবেকার আদি কলকাতা
আমার ব্যাগে উদ্বৃত্ত শহরটা
থেমে যেন লতানে গাছের পরে
সারি সারি ওষুধের কড়াকড়ি
সেখানে ঘুমায় কত জুয়াড়ি
সেখানে গায় বেসুরো কাকের সুরে সুরে
ফুলের পাতারা খোলে এমন কাঁটার নিবিড়ে
শিয়রে দাঁড়ায় সাদা ঘাসফুল কানে
ঝুলছে মাধবীলতা অভয়ার গায়ে শিশিরের জামা
জামা জুড়ে হলুদপাতা
বুকের ভিক্ষাপাত্র জুড়ে …
উন্মাদের মতো বুক চাপড়ে কাঁদছিল যে মা
ভীষণ দুঃখ পেলে বুঝি এভাবেই কাঁদতে পারেন জননী
এরপর যে বুক কাছে লাগে টান,
এখনও দুলছে অপেক্ষার ঘণ্টাগুলো
দ্রোহের উল্কি গায়ে আগুনময় রাস্তা শহর ফুটপাথ
যত ফুল পাতা ডাল বৃক্ষ শাখা
আগুন ফাগুন ফাগুন আগুন
অশেষ আগুনে আমাদের দেশ …
৩
ঋক …
সে দুঃখ এমন উল্কি
দুঃখের ভিতর পুড়ছি দহনের শেষ নেই
সময় থেকে দূরে যে জানে কোনও পথে
এক আগুন লেগেছিল বস্তিতে
এক আগুন উন্মাদ ফুটছিল শ্রমিকের মাংস
কিছু মানুষ বুক চাপড়ে কাঁদলে বৃষ্টি হয় শীতে?
হয়তো বা আরও আরও আগুন লাগছে এই প্রহরে
হয়তো প্রলাপের মতো
হয়তো রক্তকরবীর মতো
মেঘের সঙ্গে ঠিকানা হারানি জন্মগুলো অভিশাপ বুকে
ডাকে খরা_ আমাদের অবকাশ নেই
তিরের মতো বিঁধছে সূচের ছলনা।
সন্ধের পর আগুন জ্বেলে রুটির গন্ধ
তার সঙ্গে ভাতে ভাতে পাতারা চেয়ে থাকে এমন,
যেমন বৃষ্টি চেয়ে বসেছিলাম… তোমার ভালবাসা
তার চেয়েও কয়েক লক্ষ কোটি বেশি চাই বিদ্রোহ
ইচ্ছে তাই, এখানেই অপেক্ষা করি চিরকাল কবরের মতো
অসমাপ্ত হয়ে তাই অপেক্ষা
হাসপাতালের চেনা গন্ধ থেকে অপেক্ষা থেকে ছুটি।
হয়তো তুমি থাক ছায়ার সঙ্গে, হয়তো বা তাও না
কলসীর অন্ধকারের মতো জ্বলজ্বলে
চেনা ছবির পুরনো ফ্রেমে অপেক্ষার কবিতায়
লিখবে অযুত কবি নিযুত আগুন কথা।
৪
মন ওরে মন,
প্রিয় বন্ধু,
জলে ছায়া গাড়ির গায়ে লেপে থাকা আঙুলে
নখের বোধের ভিতর ছায়া নেই। খুঁজছি, হাসপাতালের খোলা জানলায় দুপুর
সময় এসে বসলে, তাকেও জিজ্ঞেস করি ছায়ার কথা
তারপর …
গাড়ির শব্দ শবদেহের ফুল
ফিরে তাকানিয়া কান্নারা শুধু জাগে এই পূর্ণিমা
৫
ঋক _
তারপর …
সকালের সেই জেগে ওঠা
পৃথিবীর বারান্দায় একের সঙ্গে অন্যের হয় দেখা
ছাতুমাখা খেয়ে যাওয়া অচেনা পথিক
নিরালায় বসে থাকা কৌতুকের বুড়ো শালিখ
সুর হাঁক পাড়ে ডাক মাছ নিয়ে গাড়িওলা
চুনোপুঁটি গুটিগুটি মরে থাকে রুপোলি রঙদার
মসৃণ পোনোর দল মরেও সফল হয় খিদের পেট
ভরান শখের ডিম। একটা সকাল খেয়ে আমার কবিতা খাতা
গলায় তুলসীমালা পায়ের বুটজুতো
খটখট রাস্তায় ভিড় কি কেন এত … অফিসপাড়ামুখো
যত যত চাকাগাড়ি ঝুলন্ত দরজা দেখে দাঁড়ান
সওয়ারি — এসব ছবি গিলে শহর দিব্যি চলে
রিকশায় বসে থাকা ছোট ছোট জুতো
ইংরেজি কবি সব পড়তে পড়তে চলে আরও কত
হিসেবে বেহিসেবি কথা বলে, এ শহর অফিসে চলেছে
কি দ্রুত …
হাওয়াই চটিটা যেন মরমের চেয়ে
মরে বেশি শরমে, তার চেয়েও হবে বুঝি গরমে
বাজার দোকান ফেলে কাঁধব্যাগ ঘাড়ে ফেলে
একা আমি হারাই যে ছুঁতে — নিঃশ্বাস তাজা ধেয়ে
আসছে সেই নদী বেয়ে গঙ্গাধারে ঘাট কতশত
নিপাটই নদীর ছেলে নদীবুকে কথা চলে
কীর্তনে ঢোলে তাল মেলে তালে
আজও কত ঘাটে ফুল ভেসে ঠেসে ভাসে
গঙ্গা তুমি নদীই তো — কিছু ফুল জড়ো করে
কিছু পয়সা ছুঁড়ে কিছু দান খয়রাতে
দল ছুট ছেলে সব ঝাঁপ দেয় হাসে
আর ভেজা শরীর থেকে বরাতে
এভাবেই ঢেউ আসে ফুল সরিয়ে নিয়ে
ঘাটের আগাছায় শ্যাওলার গায়ে সেই
জোয়ারের জল … আর ফল কিছু সিকি
জলময় তুলতুলে মৎস্যপুত্ররা সব ঝলকে
তুলতে থাকে ক্যামেরার মতন কে দেখে কাকে
এই ঘাটে সকাল দুপুর বিকেল সাইকেল
আর আমি ব্যস্ত বেকার সেজে
উৎসব দেখে যাই … বিচারের ফল ফলে
দু-একটা আম আপেল পেঁপে কলা জলে
আমাকেও দিয়ে যায় মৎস্যপুত্র এক নাম তার
জানিনি কোনকালে …
গতজন্মের যত ছিল ঋণ সেসব ব্যাগের ভেতর
অমর ঘোষণা করে — পাউরুটি চায়ে চলে দুপুর …
না মন না … আমার ঘাটে জীবন কাটে না
আমার ঘাটে মরণ আসে আশনাই জাদুদণ্ড কান্না
যে ঘাটে আছি বসে সেখানে জীবন অনন্য গয়না
ঘাটের পর ঘাট গাছের অগম্য দশায় কুণ্ডলী সীমানা
ছেড়ে আকাশ ছোঁয়া — সেজে আসে বৈশাখ বসন্তে
বসন্ত সন্ধিহীন বর্ষার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে
সাজে অগরু চন্দনে
যত রাগ দুঃখ সুখ ভালবাসের আশ ছুঁয়ে ফেলে আগুনে
মনে পড়ে তার মুখ
ঘি মাখন নিয়ম খণ্ড বসনও পৃথিবীর এপারে মেনে
— এখানে জীবন মানে নির্বাণ ও আগুনে সত্য
কোন এক মানব নাকি মানবী বুক জলে বলে চলে … ক্ষমা করো ক্ষমা করো
৬
কথার সঙ্গে কথা
ঋক ঃ সে ঠোঁটে উন্নাসিক সন্ন্যাসী পোড়ে ।।
মন ঃ তারপরে …?
ঋক ঃ জোছনাকে আড়ি করে যাব
ভালবাসা আজ সুদখোর ।।
মন ঃ এ দুপুরে ?
ঋক ঃ জান মন, মন মরেছে মনে মনে …
গোপনে
কলাপাতার ছাতায় ভিজতে
আড়ি করে যাব
এ শহর … ।।
মনঃ ধূসর … এ প্রশ্রয় নাকি কৌশল
ঋকঃ অযথাই যত্ন করি স্বপ্ন
বসত করি বাসি করি
ভবঘুরে ঘুরে মরি
হে মন .. তোমার স্বপ্ন
মন ঃ সমুদ্রে নাকি আকাশে ঘুমোবে তোমার মন …
ঋক ঃ ফিরিঙ্গি জ্যোৎস্না ফিরে যা আজ বাড়ি
আমি ফিরব না এত তাড়াতাড়ি
ফেরার হব নদীর চিতায় যেমন মরে চাঁদ
ফেলে যাব সব অবসাদ
আঁচলে বেঁধে রেখেছিলে তো তুমুল কোনও পণে
উজাড় করা দুপুরে যেমন রোজা উপবাসী প্রতিক্ষণ
নদী দেখে যায় তেষ্টার জিভে জল প্রয়াস
উড়িয়ে দেয় আকাশ হাওয়ায় একফোঁটা স্বাদ
সেই সেতু পারে অপেক্ষায় ফিরব না বাড়ি
ফিরে যা জ্যোৎস্না এরপর ছেড়ে যাবে
তোর রেলগাড়ি …
মন ঃ অযথাই পাই ব্যথা অগোছাল সব আতিশয্য
নদীর দুপুরে জলে রোদ পোষ্য যেমন
ওগো রূপ তোমার ভেতর আমারই মনকেমন
লুকানো সব গ্রহরত্ন কলজের শিরা রক্ত বয়ে
কেবলই ব্যথা পাই অকারণ কেউ করে না বারণ
কে জানে কার মনে এক পা জল পায়ে খেলা
আমারও তো নদীর মতই বয়ে যায় বেলা
নদীতে কৃপণ পানসি রোদের আরশিতে দেখে মুখ
উৎস্যুক সুখের কে এক খোলা চুলে যাই মেলে
অসংখ্য শাখা প্রশাখা রোদেলা প্রসাধনে বাদল ছাতায়
মাথাভাঙা গাছডালে কে যেন দোলে দোলায়
নূপূর এমন
প্রশ্রয় দিল মন … আরও আরও সর্বভুখ কচুপাতা ঘন
আ¨োলনের ভূমিকায় যেন মাথা নাড়ে সর্বক্ষণ
আমার কেন হও না তুমি মন? ঘন নিঃশ্বাস গরুর পায়ের
ছাপ গোধূলিবেলার ঘাসে একমুঠো আত্মকথা লেখে অকারণ
তারও চোখ ভেজে কার ডাকে মন ডেকে ওঠে
ওদিকে যেও না অমন … কে যেন ছুঁয়োছুঁয়ি খেলে
আনমনে বেড়া দিয়েছে ভেঙে … ওই দেখ কালোমেয়েটার আঁচলে
বিশ্বাস রেখে সূয্যিডোবা বেলা সাইকেল থেকে নেমে যায়
দূরে কেন একলা … বাঁশবনে গাঢ় হয় অনড় ছায়ামন
কে জানে কার খোঁজে খোঁপায় ফুল গুঁজে রতি সাজে
সেজেছে পুকুরজল , ঘাটে ঘাটে নামে পেঁচা গন্ধ
জোনাকির কাজ হয় শুরু এদিকে মেঘের গুরুগুরু
সন্ধ্যা ভাবে মিতালি হোক আজ — বাকি থাক সব কাজ
পরবাসী বিদ্যুৎ খেলে আকাশে গন্ধ ওড়ে বৃষ্টির
শাড়ির খুঁটে শাঁখার সুখে অদ্ভুত যে মন
তাকে তুমি খুঁজতে থাক — এও তো মন কেমন
যাযাবরী সেই মনের ঘরে কত জোনাকির শরীর
মরে গেলেও হয় না মৃত ফসিল হয়ে বেঁচে থাকে
এ বুকের ভেতর … তরতর তড়িঘড়ি রেলগাড়ি
ছেড়ে যাচ্ছে স্টেশন মাঠের আলে আলেয়া দেখে
নেমেছে কে এক শাড়ি জড়িয়ে অন্ধকার মেখে
এ মাস জ্যৈষ্ঠ বটে তবুও বৃষ্টি ডাকে মন
চিঠি লেখো যে ঠিকানায় অস্থির কবেই
ছেড়ে গেছি সে উঠোন
ফিরব না কিছুতেই কৃপণের মতন
মনের চাই না মন শুধু অযতনের খাতায়
বৃষ্টির বিকেলে ময়দানের ঘাসে ভিজতে এস
এক সমাসে …

