
ইলোরা ভট্টাচাৰ্য-র কবিতাগুচ্ছ
১
প্রেম
তোমাকে ভালোবাসি, হ্যাঁ তোমাকেই
বলেছি কতবার, বাস্তবিকে
শুদ্ধ সন্ধিতে নিয়ম নীতি
রাতের নির্ঘুম ডাহুক বুকে।
তোমাকে ভালোবাসি, হ্যাঁ শুধু তুমি
মোহন জনপদ বৃন্দাবনী
তোমার জন্যেই অসংবৃতা
গোপন গুঞ্জনে কলঙ্কিনী।
তোমার কারণেই কত না রাতে
অলীক পিওনের অপেক্ষাতে
আগুন-চোখ-শূল বিঁধেছি দেহে
রেশম চিঠি তবু পাইনি হাতে।
তোমাকে ভালোবেসে , শুধু তোমারই
ছুঁয়েছি পেলবতা পাখির মতো
জলের নমনীয় করুণ ছুঁয়ে
যেমন জবাফুল নগ্ন নত।
২
যাত্রা
এখন নদীটি শীর্ণা বালুচরী
ওপার মিলেছে এপারে সংকোচে
অদূরে আগুন ডেকেছে তাকে, আয়
দুধারে বাতাস গহন তরুময়।
কাঠামো খাচ্ছে আয়ুর পরিসর
বালির পিঁজরে দাঁড়ের হাড় কাঁটা
লোলুপ রাত্রি ছিঁড়ছে কররেখা
সন্তানবতী, দুচোখে মায়াজল।
৩
ঘোর
ঘুমের প্রতিস্বরে তোমার খোঁজে
দু’বাহু ডানা মেলে প্রথম রঙে
বেআক্কেলে এক তরুণমতি
ব্যস্ত প্রজাপতি
.
কেউ তো হতে পারে বড়ো সাধের
বুকের নীল- কুঠি, পারিজাতের
প্রথম সুঘ্রাণ, গাহন-ভূমি
স্পষ্টতর তুমি
.
৪
প্রেম হলে
প্রেম হলে গাছে গাছে মুকুলের রস চুয়ে পড়ে
পাখিদের রতি স্তব ভেসে আসে মিটিং মিছিলে
আলোচনা সভাঘরে টানা পাখা প্রণয় বাতাস
প্রেম হলে আধপোড়া ভাত পাতে বেশি দুই গ্রাস
প্রেম হলে নদী হয় মায়াবতী কালো কোলো নারী
প্রেম হলে পুরুষের কেজো হাত খোলা তরবারি
প্রেম হলে বাজি রেখে দেহঘরে মোম গলা রাত
প্রেম হলে অনুপম মাছরাঙা ভোরের বরাত
এইসব জানো তুমি প্রেম হলে প্রকৃত নিয়ম
জানো তুমি এইসব শুভ্রতা হ্রদের উড়ান।
৫
চারুপাঠ
আকাশের মগ্ন চারুপাঠে
মেঘেদের বর্ণ সারি সারি
সোহাগের বৃষ্টি নেমে আসে
ভিজে যায় হলদে ধনেখালি
মুখে তার লাজুক ছিল আঁকা
গোধূলির রক্ত লাগা টিপে
কপালের গড়ন খানি আহা
সীমানায় আগুন জ্বলে ওঠে
যুবকের বোতাম খোলা বুকে
ত্রিভুবন অপার হয়ে থাকে
সিগারেট দগ্ধ অনুতাপে
আগ্নেয় শিলার দুটি ঠোঁটে
কত যুগ পেরিয়ে ওরা আসে
আরো কত জীবন করে পার
হেঁটে যায় ধূসর ছায়াপথে
বন্দিনী সময় নিয়ে ধার
কোনো এক অলীক গ্রহ নীলে
রেখে যায় তারিখ ভাঙা জেদ
রমণীর নরম তিসিক্ষেতে
যুবকের তীব্র বেয়নেট।
৬
ভ্রম
তিনটে আদুরে নরম রুপোলি বেড়াল
পিকাসোর তুলি কামড়ে নিয়েছে দাঁতে
তুলোটে থাবায় বৃন্ত-স্তনের খোঁদল
কাগুজে মাংস ছিঁড়ে খায় চেটেপুটে।
৭
তবু রয়ে যায়
মৃত্যুর কোনো আবহবিকার নেই
নেই কোনো বোবা হাসনুহানার ঝারি
ঘুমহীন ভোরে ঘুমিয়ে যাবার ভয়
অগভীর তবু টেনে নেয়া তালসারি।
যে জীবন বাঁধে বাবুই পাখির বাসা
তৃণ আর কুটো ঠোঁটে রেখে সুতো গাঁথা
জীবনের পরে নোনা জল বালিয়ারি
ধুয়ে মুছে নেয় ভালোবাসা ভাব আড়ি।
তবুও সকালে রোদের সীমানা ঘেঁষে
মিতভাষী ছায়া জড়াজড়ি করে হাসে
দেবদারু গাছে রাতের বেদনা জমে
অমল পুরুষ অদেখা নদীতে নামে।
৮
কোলাজ
সন্ধ্যার নরম নীলে চরাচর শ্রান্ত চোখ মেলে
প্রান্তিক নারীর মতো এলোমেলো কোলাজ-আঁচলে
শুয়ে থাকে, অতীতের ব্যথাতুর নবীন কথক
তোমার গভীর ছুঁয়ে উড়ে যায় নীলাভ চাতক।
৯
অবেলা
হিমঝরা বৃক্ষের মতো কাছে এলে পড়ন্ত বিকেলে
প্রান্তরে সানাই বাজে বেনারসী গোধূলির তালে
নিভন্ত নারীর বুকে অমৃতের ছলোছলো বোল
দীঘল চোখের কোণে ঘন নীল প্রেয়সী কাজল।
১০
আখের
নন্দিত বনের বাঘ উঁকি মারে আতুর নয়নে
বাহ্যিক আচার শেষে স্বঘোষিত স্খলিত স্বভাবে
আন্দোলিত করে বন গোঙানীতে
শিথিল স্বনন
খসখসে জিভের নালে চেটে দেয় রাজার আসন।

