
মার্ক্স, তোমার জন্য দুঃখ হয়
বেবী সাউ
আমাদের কুঁজো হয়ে যাওয়া বাবা
চটকল থেকে ফেরার সময়
তোমাকে বিশ্বাস করতেন, মার্ক্স!
আমাদের যৌবন
উদ্ধত কিন্তু নিশ্চিন্ত স্বপ্নের ভেতর বসবাসকারী
স্বপ্ন দেখতে দেখতে
সবার জন্য সমান একটা আকাশের
ছবি দেখত মার্ক্স!
আমাদের মা
অন্যের এঁটো-বাসি
বাসন মাজতে মাজতে
ভাবতেন
খাদ্য আসলে কতপ্রকার?
আমাদের জনজাতি
আমাদের নারী
আমাদের বেকারত্বময় জীবন
সব তোমাকেই পরিবর্তন ভাবত, মার্ক্স!
তোমাকেই বিশ্বাস করতে চাইত…
এবং তোমাকেই ভেবে নিত ঈশ্বর
আর কে না জানে—
ঈশ্বরই পারেন পরিবর্তন করতে এই দুনিয়াকে
সেদিন তোমার মূর্তির সামনে ধূপ
তোমার দাড়িময় মুখের সামনে ধুঁয়ো ওঠা ভাত
তোমার অস্পষ্ট ছবির সামনে ম্যানিফেস্টো…
সেদিন বাবা তাঁর ভাঙা পুরানো সাইকেলটিকে
তুলে রাখতেন
বেড়ার বাড়ির ভাঙা দেওয়ালে
চাকায় ঘামের গন্ধ
সিটের ওপর লেগে আছে শ্রমক্লান্ত সূর্যাস্তের রক্ত…
পতাকার মতো লাল
টকটকে এবং লবণাক্ত, মার্ক্স…
মানুষ ভালোবাসে স্বপ্ন
মানুষ ভালোবাসে রাজা এবং রানীর গল্প
হীরে জহরৎ
কিংবা
একটা বিরাট রাজপ্রাসাদের লুকানো সিন্দুকের চাবি…
নুন-পান্তা খেতে খেতে অসহায় বস্তিজীবনে
মা আমাদের শোনাতেন
পায়েস এবং বিরিয়ানির মধ্যে
বাস করা
জীবাণু বীজাণুদের কথা
মার্ক্স, আমার বাবা তোমাকে বিশ্বাস করতেন
আমাদের মা তোমাকে ঈশ্বর রূপে কল্পনা করতেন
বস্তিবাসীরা অভুক্ত পেটে
বুঝতে চাইত মার্ক্স, আসলে কোন অবতার?
আর ছোট বেলা থেকেই বুঝে যাওয়া ‘আমরা গরিব’
লাল ঝান্ডা দেখলেই বুঝতাম
পরিবর্তন আসবেই
কী পরিবর্তন?
কীসের পরিবর্তন?
ভাত ডালে পরিপূর্ণ খিদের?
বনজঙ্গল, মাটি এবং জলের সমবণ্টন?
পরিশ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা?
কিংবা…
কিংবা…
শ্রমের সঠিক বিনিময় মূল্য?
এতকিছু জেনেও
না জানার ভান করতে করতে
স্বপ্ন মুছে গেল
ঘাম বইতে লাগল
আরও জোরে
আমাদের রক্তের রং পাতলা হতে হতে
একদিন হয়ে উঠল মালিকের কালো হাত
আমাদের কান্না থেকে সংগৃহীত হল লবণ
আমাদের দুঃখ বেচে তৈরি হল ঋণের সংস্থান
আমাদের বুভুক্ষা, অনিদ্রা এবং অনিশ্চয়তা ঘিরে
তৈরি হল রাষ্ট্রের আগ্নেয়াস্ত্র
গিগ-এর কাছে বেচে দিলাম নিজেদের সত্ত্বা
আর
অ্যালগরিদমের জালে বন্দি হতে হতে
আমাদের শেখানো হল
‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’…
এখন যখন গুদামঘরে নিশ্বাস আটকে যায়
যখন দেখি জ্ঞাতিভাইরাই
মালিকের হাতে তুলে দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা
তবুও মাঝে মাঝে একেকটি মিথ্যা চেতনার ফাঁদে
পা দিতে দিতে
চেয়ে বসি সমানাধিকার…
তখন হো হো করে হেসে ওঠে
তামাম বিশ্বের দরবার
শ্যাম্পেনের তুফানে ডাক পড়ে
আর আমাদের উঠোনে দাঁড়ানো
আদিকালের ঝরঝরে পুরানো সেই সাইকেল
নড়তে নড়তে যায় নৈশভোজের আমন্ত্রণে
রাজার ভোজ! চাট্টিখানি কথা নাকি!
মার্ক্স, তোমার জন্য দুঃখ হয়,
কিন্তু কান্না নয়…

