
পর্ণশবরীর কথকতা ১৪ প্রাপ্তি চক্রবর্তী
ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে অপেক্ষা করতে করতে তন্দ্রা ভাঙলে যখন দেখি আকাশ ঘন হয়ে নেমে ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে তখন মনটা বেশ একপ্রস্থ স্নান সেরে নেয়। বিকেল অনেক আগেই হয়ে আসে এমন দিনে। আমি কাজের পড়াটুকু সেরে একখানা বইয়ের রিভিউ লেখার ভাবনাকে সাকার করার দিকে এগোই। রিভিউ বলা ভুল, বইটাকে ঘিরে আমার নির্ভেজাল অনুভূতিটুকু উজার করে দেওয়াটাই উদ্দেশ্য। পরিভাষাগতভাবে একে কী বলা যেতে পারে মনে পড়ে না।
মনে আনন্দ থাকলে আমি অকাজে হাত দেই। অকাজ, অর্থাৎ যার থেকে আমার অথবা অন্য কারো কিংবা বিশ্ব সংসারের ‘লাভ’ বলতে কিছ নেই। এই যে গোটা তিনেক বই নিয়ে দু-কলম লিখব বলে খসড়া লিখছি, এর জন্য তো কেউ তাগাদা দেননি! আমি নিজের আনন্দে লিখব, আর সময়ে সে লেখা হারিয়েও যাবে। তা যাক না! বছরের এরকম এক আধটা দিন আমার মন ফুরফুরে হলে রিঠা ফলে মাথা ঘষে পড়া বই তৃতীয় কিংবা চতুর্থবারের জন্য পড়তে বসি। ছাদ ছোঁয়া বইয়ের তাক থেকে নামিয়ে আনি ‘অ্যাণ্ডারসনের রূপকথা’ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছুটির বাঁশি’। বুকের নিচে টি-রেক্স বালিশ গুঁজে ছোটবেলার মতো পা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ি ছেলেবেলাকে।
চিনি ছাড়া লাল চা আর শুকনো ফল-বাদামের সিলেবাস ছেড়ে ঘন দুধ চিনি দিয়ে নতুন কাপে কফি খেতে ইচ্ছে হয়। কাপের মধ্যে কফি আর বহুবহুদিন বাদে চিনি মেলাতে মেলাতে সুগন্ধ আর ফেনা তুলে আনি, ছোট গ্যাসে ঢিমে তালে ঘন হয়ে আসে দুধ। সামনের বাড়ির পুরুষ্টু কাঁঠালগাছটার গহীন পাতা থেকে বৃষ্টির জল গড়ানো দেখতে দেখতে আধ ইঞ্চি মতো লম্বা দারুচিনি লচকার থেকে তুলে আনা পাথরে থেতো করে ফেলে দেই তাতে, সুগন্ধ এসে মেশে বৃষ্টির ছাঁটে। এসব মশলার গুঁড়ো সহজেই ঠাণ্ডা ঘরের দোকানে মেলে আজকাল, আমি তবু দাদার পাঠানো কেরলের মশলাগুলো মায়ের থেকে নিয়ে আসি চেয়েচিন্তে। লজ্জা লজ্জা মুখে ছোটবেলার মতো চানাচুরের থেকে মশলা লাগা মিষ্টি মিষ্টি কিশমিশগুলো খুঁজে জিভে রাখি। নিজের ঘরে নিজের চুরি ধরা পড়ার মতো একলা হাসি। বৃষ্টি ঘন হয়ে আসে।
এক আধটা দিন নিজের মনকে ছুটি দেওয়া খুব দরকার, এই কথাটা বুঝি খুব বেশি করে আজকাল। সমানে কলের গাড়ির মতো চলতে থাকলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনাস্রোত শুকিয়ে যাবেই। নিজের আনন্দেই পড়া বই তৃতীয় কিংবা চতুর্থবারের মত পড়া আর তাকে ঘিরে উঠে আসা ভাবনা চিন্তাকে মুক্তি দেওয়া দরকার একসময়ে।
এখন ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ নতুন করে, নিজের করে বুঝতে পারি ক্লাসের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে।

