
সম্পূর্ণ উপন্যাস
হাসানাবাদ লোকাল
সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়

১)
কোনও মতে হাঁপাতে হাঁপাতে লাইন পেরিয়ে ট্রেনটা ধরল অংশুমান। ঋদ্ধিকে মুখে কিছু বলতে হয় না৷ ও নিজেই বুঝে যায় সবটা। আজ যে ভয়ানক দেরি হয়ে গেছে সেটা আগে ভাগে বুঝেই টিফিন প্যাক করে ব্যাগে ঢুকিয়ে অবধি দিয়েছে। শেষ দুগাল মুখে জোর করে পুরে না দিলে ভাতটুকুও আজ পেটে পড়ত না৷ একটা সময় এই রোজ দেরি হয়ে যাওয়ার চক্করে অর্ধেকদিন না খেয়ে ট্রেন ধরেছে অংশুমান। কী করবে, ঘুমই ভাঙে না ঠিক সময়ে। কোনওমতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে চা বিস্কুট মুখে দিয়েই ছুট লাগাত স্টেশনের দিকে। এই কারনে বারাসাতে এসে প্রথম স্টেশন চত্বরেই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল অংশুমান। দেখতে দেখতে এতগুলো বছর হয়ে গেল। তবু স্বভাবটা পুরোপুরি বদলাতে পারল না। কী করে যেন দেরি হয়ে যায়! সিডিউল টাইমের মিনিট পাঁচেক আগে বাড়ি থেকে বেরোনোটাই অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত ভাবে এই টেনশনটা আর নেবে না, বয়স বাড়ছে, একটু হলেও তাড়াতাড়ি বের হবে, কী করে না জানি প্রতিদিন একই ঘটনা ঘটে চলে। অথচ তার কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠে ঋদ্ধি কী সুন্দর সবটা সামলে নেয়। মেয়ে বের হবে, তার টিফিন, খাওয়া, অংশুমানর ব্রেকফাস্ট, টিফিন সবটা করে নিজের কাজে বসে যায়। এ জন্মে আর এতটা ডিসিপ্লিনড হতে পারল না অংশু। ঋদ্ধিকে যত দেখে তত অবাক হয় মনে মনে। কী করে সব দিক এত সুন্দর করে সামলায়। নিজের ছোট্ট ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ সবকিছু করে হিয়ার পড়াশোনাটাও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে ঋদ্ধি। কোথাও নিজের বউয়ের জন্য একটু বেশি গর্ব হয় ওর। কিন্তু সেটা মুখে বলা যাবে না।
ট্রেনটা প্লাটফর্মে ঢুকতেই কোনওমতে কামরায় উঠল অংশুমান। আজ সুমিতদার ডাল পরোটা নিয়ে আসার কথা। ওই এক অদ্ভুত মানুষ। নিজে খান না, অথচ কম্পার্টমেন্টে ওদের এই বারো জনের গ্রুপটায় প্রত্যেককে খাওয়াতে ভালোবাসেন। ভীষণ ইচ্ছে নিজের হাতে রান্না করা বিরিয়ানি খাওয়াবে এবার শীতে। এর আগে যতবার ট্রেন পিকনিকের কথা উঠেছে ততবার স্যার ও ম্যাডামদের পরিবার মিলে কোনও বাগানবাড়িতে পিকনিক হয়েছে বেশ বড় করে। কিন্তু সুমিতদা গ্রুপে ঢোকার পর থেকে নিয়মের বদল ঘটেছে। উনি মোটামুটি কায়দা করেই ম্যাডামদের গ্রুপ থেকে স্যারদের আলাদা করে একটা গ্রুপ তৈরি করেছেন এবং যে প্ল্যানই করা হয় তাতে তিনি ম্যাডামদের খুব একটা রাখতে চান না। অংশুমান বিষয়টা লক্ষ করলেও মুখে কিছু বলেনি কখনও। বাড়িতে এক দুবার ঋদ্ধির কাছে গল্প করেছিল। ঋদ্ধির মতে মেয়েদের সঙ্গে হয়তো উনি ওতো কম্পফর্টবেল নন। অংশুও দেখেছে উনি মেয়েদের একটু এড়িয়ে চলেন। কোথাও গিয়ে ডমিনেটিং মনে করেন, তাই সেই সব ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চান। কার ব্যক্তিগত জীবন কী রকম বোঝা যায় না এই ট্রৈনিক জীবনে। অংশুমানের সঙ্গে খুব একটা ব্যক্তিগত কথা সুমিতের হয় না। যেটুকু বলে সেটুকুই শোনে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পেটের কথা বের করার অভ্যাস নেই। কর্মজীবন আর ব্যক্তিগত জীবনকে আলাদা করে রাখতে ও খুব ভালই জানে। কোথায় কার সঙ্গে কতটুকু মিশতে হবে — সে সম্পর্কে অংশুমান বরাবরই সতর্ক। ট্রেনের এই গ্রুপটার মধ্যে ও-ই সব থেকে ছোট ছিল এতদিন। বছর খানেক হল এক নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে। মেঘদূত আচার্য। পেশায় জজ। দমদম থেকে ওঠে, বসিরহাটে নামে। অংশুমানের স্কুলও বসিরহাট। ওখানে এক হাই মাদ্রাসায় আছে। নটা পাঁচের এই শিয়ালদা হাসানাবাদ লোকালে ওরা যারা যারা যায় ওদের গ্রুপে কম বেশি সবাই স্কুল টিচার। কেউ প্রাইমারির, কেউ কেউ সেকেন্ডারির। দুজন এক্স আর্মিম্যান আছেন, যারা হাড়োয়ায় এক প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। অন্য অফিস যাত্রীও আছে অবশ্য।
কোনওমতে দরজার সামনের ভিড়টা ঠেলে ঠুলে ওদের সিটের সামনে এসে দাঁড়াল অংশুমান। ঘোষদা শিয়ালদা থেকে বারাসাত পর্যন্ত বসে আসেন। অংশুমান উঠলে বারাসাতে ওকে জায়গা দেন। কিছুটা যাওয়ার পর আবার ওরা জায়গা অল্টার করে নেয়। প্রথম থেকে এভাবেই চলছে। ঘোষদার সঙ্গে অংশুমানের বয়সের অনেকটা বেশি ফারাক। কাকা বলে সম্মোধন করলেও কিছু ভুল হয় না। তবুও এই কর্ম জগতের সম্পর্কগুলো এমনই এখানে সবাই অভিভাবক থেকে কখন যেন বন্ধু হয়ে যায়। তাই ‘দাদা’ ডাকটাই সবার সঙ্গে ঠিকঠাক ভাবে চলে যায়।
অংশু সামনে দাঁড়াতেই সিট থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সুবর্ণ ঘোষ বললেন,
‘কী হে, আজ আবার নিশ্চয়ই দেরি করে বেরিয়েছ? হাঁপাচ্ছ তো পুরো। বসো বসো। একটু জল খাও।’
লাজুক চোখে আলতো মাথা নেড়ে অংশুমান নিজের ব্যাগটা ওপরে বাঙ্কারে রেখে বসে পড়ল সিটে। তিনজনের সিটে চারজন বসলে যা হয় আর কী। তবুও এই অফিস টাইমে ওটুকুই অনেক। বোতল থেকে এক ঢোক জল মুখে ঢেলে ঘোষদার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ওই আর কী! আসার আগে এমন একটা ফোন এল বাড়ি থেকে…কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল।’
সুমিত বলল, ‘চটজলদি পরোটা আর ডালটা বেড়ে দিই এবার, না হলে আজ যা ঠাণ্ডা, খাবারটা পুরো স্টিফ হয়ে যাবে।’
মেঘদূত বলল, ‘এই তো অংশুদার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা ছিল। আমি আজ বাড়ি থেকেও কিছু খেয়ে আসিনি। পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। তাড়াতাড়ি বাড়ুন।’
‘তুমি খাবে? তুমি ভাই জিম টিম করো। সারাদিন তো ডিম খেয়েই থাকো। এসব তো আনহেলদি।’
‘কী বলতে চান! আপনারা সামনে বসে খাবেন আর আমি…’
‘আরে ভাই, রাগ করো না। সুমিতের তো স্বভাব জানো লেগপুল করা। তাই কখনও হয় নাকি, আমরা খাব আর তুমি খাবে না…নাও, ধরো তো পাতাখানা।’ মেঘদূতকে রাগ করতে দেখে পরিস্থিতি সামাল দিল চন্দ্রভূষণ সেন। চন্দ্রভূষণকে এখানে সবাই চন্দ্রদা বলেই ডাকে। বয়সে সুবর্ণ ঘোষের চেয়ে সামান্য ছোট। উনি প্রাইমারি স্কুলে আছেন। আগে একটা ছোটখাটো ব্যবসাও করতেন পাশাপাশি। মাঝখানে একটা বাইক অ্যাকসিডেন্টে পাঁজরের হাড় ভেঙে বেশ কটা মাস শয্যাশায়ী। তারপর নানান অসুখ ধরা পড়াতে বাড়ি থেকে ব্যবসাটা আপাতত স্থগিত রাখার জন্য চাপ দিয়েছে। চন্দ্রদার ইচ্ছে রিটারমেন্টের পর আবার শুরু করবেন। মাথার ওপর দু-দুটো মেয়ে। বিয়ে থা দিতে হবে। চাপ তো আছেই। চন্দ্রদার ট্রেনে বেশ একটা খাতির আছে। সবদিক সুন্দর ব্যালেন্স করে চলতে পারেন। চটজলদি মেঘদূতের হাতে খাবারটা ধরিয়ে বলল, ‘নাও তুমি শুরু করো। একে একে সবাই ধরো তো এবার। সুমিত অনেক খাটুনি করে সাত সকালে নিয়ে এসেছে।’
‘শুধু তাই নয় চন্দ্রদা, সঙ্গে একটা করে নলিনীও আছে।’
‘কোথাকার?’
‘কোথাকার আবার, রসরাজের।’
‘মানে তুমি তো ওঠো বিরাটি। আর মধ্যমগ্রাম নামলে?’
হাসতে হাসতে সুমিত বলল, ‘আরে কাল রাতে এদিকে এসেছিলাম একটা কাজে। নিয়েই নিলাম।’
‘তুমি তো নিজে কিছুই খাবে না। কেন? বৌদির বারণ নাকি!’
সুমিত আর কোনও কথা বলল না। মুচকি হেসে মাথা নামিয়ে বলল, ‘আমার এতেই ভালো লাগে।’
অংশুমান লক্ষ করেছে বাড়ির কথা উঠলেই সুমিত কেমন চুপচাপ হয়ে যায়। যতবার ফ্যামিলি গ্যাদারিং এর কথা ওঠে নিজের বউ মেয়েকে আনতে চান না সুমিত। অংশুর কেন জানি মনে হয়, কোনও কিছু সমস্যা আছে। হয়তো ঋদ্ধি যেটা বলে তেমনই কিছু হবে। চন্দ্র দু আঙুল চিপে পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিয়েই বলল,
‘এমন ডাল, আহা…বাসব আজ মিস করল।’
‘কেন এল না আজ ও?’ বলল সুমিত।
‘আজ হয়তো ওর অন্য প্রোগ্রাম আছে।’ বলে একটা ব্যাঁকা হাসি দিলেন চন্দ্র।
‘ও বুঝেছি। ওদিকে ডিউটি চলছে।’
ওদের ভেতর কেমন এক চাপা হাসির রোল। অবশ্যই এদিকের সিটের। সকলের কানে গেলে চাপ আছে। বিষয়টা ওপেন সিক্রেট হলেও সবার সঙ্গে এই আলোচনা হয় না। অংশুকে চুপ থাকতে দেখে মেঘদূত বলল,
‘কি অংশুদা– আপনি রাগটাগ করলেন নাকি! আপনার তো প্রিয় বন্ধু আবার!’
‘কেন রাগাও বলো তো অংশুকে। বড্ড ভালো ছেলেটা। বাসব এত কপি করে অংশুকে কিন্তু স্বভাব চরিত্রটা কপি করতে পারল না।’ বলল সুমিত।
হাসতে হাসতে চন্দ্র বলল, ‘এত বয়স্করা সব দাঁড়িয়ে আছি, তোমাদের লজ্জাও নেই। এসব নিয়ে আলোচনা করো।’
‘আচ্ছা এখন চুপ করুন। ওদিকের সিটে ওদের কানে গেলে চাপ আছে।’ বলল অংশু।
বাসবের কথা উঠলে মনটা কেমন ভার হয়ে যায়। শ্রাবণী আর ঋদ্ধির ভেতর বেশ ভালো একটা সম্পর্ক আছে। শ্রাবণী বাসবের স্ত্রী। অথচ শ্রাবণী যে রুবিনার কথা জানে না তা নয়। ওদের সঙ্গে ঘুরতে টুরতেও যায়। তবুও কী করে যে মেনে নেয়!
একটা ঝাঁকুনিতে হুঁশ ফিরল অংশুর। বসিরহাট আসতে আর একটা স্টেশন বাকি। ফোনটা পকেটে বাজছে। ঋদ্ধি কল করেছে। ফোন ধরে অংশু বলল,
‘বলো, তাড়াতাড়ি, বসিরহাট ঢুকছে।’
‘হিয়ার জ্বরটা আবার বেড়েছে। তাড়াতাড়ি ফিরো। বিকেলে ডাক্তার দেখাতে যাব। আমি নাম লিখিয়ে দিচ্ছি।’

(২)
সুমিত চক্রবর্তী
সুমিত চক্রবর্তী থাকে বিরাটিতে। মেয়ে বউকে নিয়ে দু’কামরার একটা ফ্ল্যাটে তার সংসার। টু বিএইচকে হলেও বেশ বড়। নিজে প্রাইমারি স্কুলের টিচার হলেও তার ওয়াইফ কলেজে আছে। লাভ ম্যারেজ ছিল না ওদের। কীভাবে যে বিয়েটা হল সুমিত বুঝতে পারে না। সুমিতের স্ত্রী কেয়া অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে। বিয়ের সময় কেয়া কলেজ সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা দিয়েছিল। তখনও চাকরি পায়নি। মেয়ে উচ্চশিক্ষিত আর ছেলে প্রাইমারি স্কুলের টিচার এটা জেনেও কেয়ার বাবা সুমিতকে তার জামাই হিসেবে পছন্দ করেন। আসলে সম্পর্কটা হয়েছিল চেনা পরিচিতের মাধ্যমে। চক্রবর্তী বাড়ির একমাত্র ছেলে সুমিত। কলকাতায় নিজেদের বেশ বড় বাড়ি। তখন সুমিত কলকাতা থেকে জার্নি করত। ছেলে ভালো এটুকু জেনেই কেয়ার বাবা মেয়ের জন্য সুমিতকে পছন্দ করেছিলেন। বিয়ের দিন পর্যন্তও সুমিত বুঝতে পারেনি কেয়ার এই বিয়েতে বিশেষ মত ছিল না। রিসেপশনের দিন বিষয়টা খানিকটা টের পেল সুমিত। উচ্চশিক্ষিত সুন্দরী বউ পেয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির সুমিতের মধ্যে কেন না জানি একটু ভয় কাজ করছিল। অনেকটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে সেদিন রাতে ঘরে ঢুকেছিল সুমিত। দরজাটা বন্ধ করতেই কেয়া প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল। সুমিতকে ঘরে ঢুকতে দেখে কেয়া বলেছিল,
‘আপনি কি আজ থেকে এ ঘরে শোবেন?’
খানিকটা তোতলাতে তোতলাতে সুমিত উত্তর দিয়েছিল, ‘মানে?’
‘মানেটা বুঝতে পারছেন না? ঠিক আছে পরিষ্কার করেই বলি।’ একটু থেমে কেয়া আবার বলেছিল, ‘আমি এই একই বিছানায় আপনার সঙ্গে শুতে পারব না। আমার সময় লাগবে এই সবকিছু মানিয়ে নিতে। আমি বিয়েটা করতে চাইনি। বাবা নেহাত জোর করল তাই…’
আকাশ থেকে পড়ল সুমিত। এ কী সব বলছে কেয়া! তা হলে এ বিয়ের অর্থ কী! কেয়া আরও কিছু বলেছিল। ঠিক কানে ঢোকেনি সুমিতের। কী করা উচিত তাও বুঝতে পারছিল না। চেষ্টা করেছিল ধাতস্থ হতে। তারপর বলেছিল,
‘আজ খুব ক্লান্ত। আজ থাক। বিশ্রাম নাও। কাল কথা বলব। চিন্তা নেই তোমার। তুমি বিছানায় শোও। আমি এদিকে ম্যানেজ করে সোফাতে শুয়ে পড়ছি।’
সে রাতে আর ঘুম আসেনি সুমিতের। পছন্দ না হলে কেন জোর করে এই সম্পর্কে জড়ানো? সারাটা জীবন এ ভার বইবে কেমন করে যদি সত্যিই কিছু ঠিক না হয়— এমনই নানান চিন্তা ঘিরে ধরেছিল সুমিতকে। ভয়টা অবশ্য বৃথা ছিল না। কেয়া কলেজের চাকরিটা পাওয়ার পর যখন বিরাটিতে ফ্ল্যাট কিনে সিফ্ট করল ওরা, দূরত্বটা আরও ভালো করে বুঝতে পারল সুমিত। যতই হোক চক্ষুলজ্জার খাতিরে শ্বশুর শাশুড়ির সামনে কিছু কাজ বাধ্য হয়ে করতে হত কেয়াকে। সে অভিনয়ই হোক– সুমিতের ভালো লাগত। বন্ধ দরজার ভেতর কী ঘটছে তা নাই বা জানল কেউ। কিন্তু এই ফ্ল্যাটে দুজনের আলাদা দুটো ঘর। একমাত্র সুমিতের বাবা মা এলে বা কেয়ার মা বাবা এলে চিত্রটা অন্যরকম হয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালে মাম্মার জন্মটাও সুমিতের কেমন স্বপ্নের মতো লাগে। সেবার কেয়ার পক্স হল। শয্যাশায়ী। সুমিত সবটা দিয়ে সেবা যত্ন করে সুস্থ করে তুলল। সেসময় কী যে হল কেয়ার, সুমিতের সঙ্গে সম্পর্কটা একদম অন্যরকম। একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছে তখন কেয়া। সুমিতের স্পষ্ট মনে আছে আবাসানের নীচে পার্কে কেয়ার সঙ্গে বিকেলবেলা পায়চারি করছিল সুমিত। আচমকা কেয়া যেভাবে সুমিতের হাত ধরেছিল, অপলক কয়েক মুহুর্ত তাকিয়েছিল ওর দিকে, ওর কাছে সেই অনুভূতি সারাজীবনের। সেদিন কেয়া প্রথম সুমিতকে বলে ওর ঘরে এসে ওর পাশে শুতে। তারপর থেকে দুটো ঘরের মাঝের দেওয়ালটা আর ছিল না। মাম্মা হওয়ার পর পরও সবটা ঠিক ছিল। কেমন স্বপ্নের মতো লাগত সুমিতের। সমীকরণ আবার বদলাতে লাগল মাম্মার পড়াশোনা শুরু হল যখন। মাম্মার সবকিছু কেয়াই দেখে। যতদিন যেতে লাগল সুমিত যে কতটা পিছিয়ে পড়া সেটা কথায় বার্তায় হাবে ভাবে বুঝিয়ে দিতে শুরু করল কেয়া। মেয়েকে বলতে শুরু করল, ‘ভালো করে পড়াশোনা না করলে বাবার মতো ওই প্রাইমারি স্কুলের টিচার হয়ে সারাজীবন থাকতে হবে। বড় স্বপ্ন দেখো।’
কথাটা তিরের মতো গেঁথে যেত সুমিতের বুকে। মেয়ের চোখে চোখ রাখতেও কেমন লজ্জা। রোজ রোজ স্ত্রীর কথায় ছিন্নভিন্ন হতে হতে সুমিত এমন এক পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়াল যেখানে দাঁড়িয়ে ওর কনফিডেন্স পুরো জিরো। স্কুল থেকে বাড়িতে ঢুকতে বিরক্ত লাগত। কিন্তু কেয়ার মুখের ওপর কোনওদিনও কিছু বলতে পারেনি। আজও পারে না। এমনকি গাড়িটা যখন কিনল কেয়া, সুমিতের ড্রাইভিং শিখতে দেরি হচ্ছিল বলে নানান কটাক্ষ শুনতে হত। ঘেন্নায় গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিল সুমিত। কেয়া একজন ড্রাইভার ঠিক করেছে। প্রয়োজনে ডেকে নেয়। প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙতে ভাঙতে সুমিত চক্রবর্তী নিজেকে যে সময়টা ভুলতে বসেছিল প্রায় তখনই রোজকার স্কুল যাতায়াতের পথে এমন কিছু মানুষ ওর জীবনে আসে, যাদের সাহচর্যে ও নিজেকে আবার খুঁজে পেতে শুরু করে। যাদের কাছে সুমিতের গুরুত্ব আছে। ওর কথা শোনার মতো ধৈর্য আছে। চন্দ্রভূষণ সেনের সঙ্গেই ট্রেনে প্রথম আলাপ সুমিতের। সেদিন বিরাটি স্টেশন থেকে কোনওমতে হাঁপাতে হাঁপাতে ট্রেনটা ধরেছিল সুমিত। স্পষ্ট মনে আছে বাড়িতে বেরোনোর সময় ঠিক কেয়ার সঙ্গে তুমুল অশান্তি। প্রতিটা অশান্তির পেছনেই আসল বক্তব্য হল সুমিতের মতো ছেলে কেয়াকে ডিজার্ভ করে না। আগেতে সুমিতের সন্দেহ হত কেয়ার বাইরে কোথাও কোনও সম্পর্ক আছে কিনা। এখন আর সে সবেও কিছু যায় আসে না। যে মানুষটার প্রতি ইন্টারেস্টই কমে গেছে, জীবন বুঝিয়েছে ভালোবাসাই সবকিছু নয়, এখন শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে বাকি জীবনটা একসাথে কাটিয়ে দেওয়া, এছাড়া আর সুমিতের চাওয়া বলে কিছু নেই। সুমিত যাই করুক না কেন কেয়ার মন জয় করা যে অসম্ভব এত বছরে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। সেদিন ট্রেনে উঠে সুমিত বেশ অসুস্থ বোধ করছিল। হঠাৎ করে হয়তো প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল বলে শরীর আনচান করতে শুরু করে। হাত-পা ছেড়ে দেয়, ঘাম হচ্ছিল দরদর করে। ওরকম অবস্থা দেখে এগিয়ে আসেন চন্দ্র ভূষণ সেন। প্রথমত নিজের সিটটা ছেড়ে দিয়ে সুমিতকে বসার জায়গা দেন। তারপর যেটুকু সুশ্রূষা করা যায় ট্রেনের মধ্যে নিজের সাধ্যমত সেটুকু করে স্কুল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন চন্দ্র। সেই থেকেই কেমন অজানা একটা মানুষের সঙ্গে সুতোয় বাধা পড়ে সুমিত। ফোন নম্বর আদান প্রদান, কথাবার্তা তারপর চন্দ্রদার সঙ্গে একই কম্পার্টমেন্টে যাতায়াত করা শুরু। এখানে এসে একে একে অরিজিৎ, অংশুমানের বেশ কাছের মানুষ হয়ে ওঠে সুমিত। সুমিতের হারিয়ে যাওয়া ছোট ছোট ভালো লাগাগুলো ওদের কাছে কদর পেত। এখানে সুমিতের একটা গুরুত্ব আছে। নিজেকে একটু একটু করে খুঁজে পেতে শুরু করল সুমিত। যতক্ষণ এই বাইরের পরিমণ্ডলে থাকে ততক্ষণ সুমিতের ভালো লাগে। একটা মানুষের সঙ্গে দেখা না হলে এখন মনে হয় কোনও না কোনও ছুতোয় বাড়ি থেকে বের হয়ে ঠিক দেখা করে আসে৷ যদিও ব্যক্তিগত জীবনের কোনও কথাই সুমিত সেভাবে ওদের সঙ্গে শেয়ার করেনি। ইচ্ছেও করেনি। রোজকার জীবনে অপমানিত হতে হতে সেই ভাঙা মেরুদণ্ডটাকে সকলের সামনে দাঁড় করানোর ইচ্ছা সুমিতের হয়নি। তার থেকে নতুন করে সুমিতের যে ছবি এখানে তৈরি হয়েছে সেটা ওর কাছে অনেক বেশি উপভোগ্য। কেয়ার সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্যের এই তেতো স্বাদের জন্যই মেয়েদের প্রতিও কেমন একটু বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে সুমিতের মনে। মেয়েদের থেকে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে চলে সুমিত। যাতায়াতের পথে দুই দুই– চারঘণ্টার এই জার্নি টুকুই ওর রোজকার জীবনের অক্সিজেন। তাই ছুটি ছাটার দিনেও অরিজিৎ অংশুমান আর চন্দ্রদাকে সঙ্গে নিয়ে টুকটাক বেড়ানোর প্ল্যান করে ফেলে সুমিত। ওরাও যেন সুমিত ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেনা এসব ক্ষেত্রে। এটাই সুমিতের একমাত্র ভালোলাগার জায়গা। প্রায়োরিটি পেতে সবাই ভালবাসে।
খাবারের প্রতি সুমিতের এক অদ্ভুত টান আছে। নিজে যেমন ভাল রান্না করে, তেমনি নিত্যনতুন রান্না করা পদ বা বাইরের কেনা খাবার, যে দোকানের যা যা বিখ্যাত, তা নিজের প্রিয় মানুষদের খাওয়ানোটা সুমিতের এক কালের হবি। কেয়া আবার এসব একদম পছন্দ করে না। সুমিত এই সখগুলো আবার পূরণ করছে তার এই ট্রৈনিক জীবনে।
আজও ট্রেনের সকলের জন্য নলেন গুড়ের একটা বিশেষ মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছে সুমিত। তার জন্য গতকাল রাতে বাইক নিয়ে সোদপুর ছুটেছিল। ট্রেনে ওই ভিড়ের মধ্যে ওর প্রিয় মানুষগুলো যখন মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি হাসবে, আর বাহ বাহ করে বলবে, ‘সত্যি সুমিতদা, তুমিই পারো, এ তো অমৃত।’ —তখন কোথাও একটু হলেও বুকের ছাতিটা বেড়ে যায় সুমিতের। প্রিয় মানুষের কাছে গুরুত্ব আসলে এমনই এক বস্তু যা মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে দেয়।

(৩)
চন্দ্রভূষন সেন
খবর শুনে নীলিমা ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। চন্দ্র বাথরুম থেকে বের হয়ে নীলিমার ওমন ফ্যাকাশে মুখ দেখে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল প্রথমে৷ সবে পাঁচদিন হল নার্সিংহোম থেকে ফিরেছে নীলিমা। সুগার প্রেপার সব বেড়ে গিয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা করেছিল নিজের। এমন শ্বাসকষ্ট শুরু হল যে অ্যাডমিট করতেই হল। নিজেকে কোনওমতে সামলে প্রায় হুড়মুড়িয়ে নীলিমার দিকে এগিয়ে এসে চন্দ্র বলল,
‘কী হয়েছে?’
নীলিমা মুখ ঘুরিয়ে চন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘সুরেশ মামা আর বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কাল থেকে।’
‘মানে?’
‘মানে গতরাতে হিন্দুএলাকায় সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। মেরে ফেলেছে ধরে ধরে। মামা আর বাবু নিখোঁজ৷ কী হয়েছে কেউ জানে না।’
‘তোমায় কে খবর দিল?’ বেশ খানিকটা অবাক হয়ে জানতে চাইল চন্দ্র।
‘অপু মামা।’
‘মানে যিনি বালুরঘাটে থাকেন?’
মাথা নাড়ল নীলিমা।
চন্দ্র কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে কোন সান্ত্বনাও চলে না। কিছু মাস ধরে বাংলাদেশে যা শুরু হয়েছে, তাতে করে নিজের প্রাণ নিয়ে ওখানে বেঁচে থাকাটাই বিস্ময়। নীলিমাকে কী আর সান্ত্বনা দেবে। নিজেকেই রোজ চাকরি সূত্রে যেতে হয় হাসনাবাদের দিকে। আগে যে ভয় কখনও চন্দ্রকে তাড়া করত না, এখন দিনে দিনে যেন তা ক্রমশ চেপে বসছে নিজের অজান্তে। বাংলাদেশে ক্রমাগত যা ঘটে চলেছে সেই নিয়ে কিন্তু ওরা কখনও মুখ খোলে না। অথচ প্রতি কথায় ওদের মুখে হিন্দু বিদ্বেষের ঝলক এখন দেখতে পায় চন্দ্র। স্কুলটা যেন দিন দিন কেমন দুটো দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। নীলিমার কেমন এক দুঃসম্পর্কের মামা হয় সুরেশ দাস। গতকালই ওদেশে মুজিবরের স্ট্যাচু ভাঙ্গা হয়েছে। আন্দোলনের নামে যে ভয়াবহতা চলছে ওখানে, সেই ধর্ম বিদ্বেষের রেশ বর্ডার ছাড়িয়ে ক্রমশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে গোটা দেশটাকে নিজের আয়ত্তে করে নিচ্ছে। এখানকার রাজনীতির অবস্থাও শোচনীয়। প্রতিটা দল ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে নিজের মতো করে কাজে লাগায়। সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবে না। সুরেশ মামার একমাত্র ছেলে বাবু। মামি বহুদিন আগেই মারা গেছে। নীলিমার সঙ্গে ওদের সম্পর্ক বেশ ভালো। নীলিমার নিজের মামা থাকে বালুরঘাটে। দূর সম্পর্কের ভাই হলেও তার সঙ্গে সুরেশের বরাবরই যোগাযোগ ছিল। চন্দ্র আর নীলিমার বিয়েতেও সুরেশ মামা এসেছিলেন। ওদের বইয়ের ব্যবসা। অপু মামারও তাই। সেই সূত্রেই আরও দুজনের মধ্যে যোগাযোগ কখনও ছিন্ন হয়নি। তাই অপু মামা যখন খবর দিয়েছেন তখন নিশ্চয়ই খারাপ কিছুই ঘটেছে। না হলে উনি জানেন নীলিমার শরীর খারাপ। চন্দ্র নিজেকে শান্ত করে নীলিমার কাঁধে হাত রেখে বলল,
‘এত টেনশন করো না। তুমি সবে তো ফিরলে। শুনতে খারাপ লাগবে তবুও বলছি, এক্সট্রিম একটা কিছু ভেবে নাও, এরপর যদি ভালো কিছু হয় যা আমরা সবাই চাইছি, তা হলে তো ভালই। কিন্তু এ এক্সট্রিমের উপরে আর কিছু হওয়ার নেই। যা হবে সেটাকে ফেস করতে হবে। কারোর কিচ্ছু করার নেই।’
নিজের চোখ মুছে নীলিমা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি ঠিক আছি। তুমি বেরোবে, দেরি হয়ে গেল। তুমি আজ খাবারটা নিয়ে নাও, আমি টিফিনটা প্যাক করে দিচ্ছি।’
চন্দ্র আর মানা করল না। টুকটুক করে যেটুকু হোক কাজ করলে মনটা তাও অন্যদিকে ঘুরবে। না হলে খালি মস্তিষ্ক একেবারে দুশ্চিন্তার কাল কুঠুরি। নিজের কল্পনায় কোথা থেকে যে কোথায় পৌঁছে যায় নীলিমা—- শেষে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অ্যাংজাইটি ইস্যুস আছে, তার ওপর মনপোজের পর থেকে শরীরে নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। মেজাজটাও ঠিক থাকে না। চন্দ্রর রিটারমেন্ট যত এগিয়ে আসছে তত যেন দুশ্চিন্তা বাড়ছে নীলিমার। মাথার উপর দু-দুটো মেয়ে পিঠোপিঠি। চন্দ্র আগে একটা ব্যবসা করত। পুজোর মাল সাপ্লাই দিত কলকাতায়। বাইক এক্সিডেন্টে রিব ভাঙার পর থেকে শরীরটা তেমন আর জুতসই নেই। একা অত দৌড়াদৌড়ি করতে পারে না। নীলিমাই একরকম জোর করে ব্যবসাটাকে বন্ধ করতে বলেছিল। কে জানবে নিজের জন্যই প্রতিমাসে এত এত ওষুধ লাগবে। চন্দ্র মুখে কিছু বলে না সেরকম কিন্তু কতটা যে চাপে আছে সেটা নীলিমা খুব ভালো করে বোঝে। মানুষটা হাসি ঠাট্টায় ভালো থাকার চেষ্টা করে৷ কিন্তু দুশ্চিন্তা ওদের জীবন থেকে যেন আর যায় না। কোথাও কিছু নেই ছোট মেয়ে মিলি হঠাৎ করে বাড়িতে এমন কিছু আচরণ করতে শুরু করেছে, দুশ্চিন্তা না করে আর থাকা যাচ্ছে না। চন্দ্র আর নীলিমা ভেবেছে মিলিকে একটা কাউন্সিলিং করাবে। মোবাইল অ্যাডিকশন ভয়ানক রকম বেড়ে গেছে। ফোন না পেলে বাড়িতে ভাঙচুর শুরু করে দিচ্ছে। এই যে নীলিমার এত শরীর খারাপ তার মধ্যেও মিলি বাড়িতে অশান্তি করেছে। অথচ বড় মেয়ে পলি একেবারে উলটো স্বভাবের। পলি এখন কলেজে পড়ে কিন্তু নিজের পড়ার পাশাপাশি জমিয়ে টিউশন করে। নীলিমা যখন অসুস্থ হয় চন্দ্র আর পলি মোটামুটি বাড়ির সব কিছু সামলে নেয়। পলির বরং ব্যবসার প্রতি একটা বিশেষ ইন্টারেস্ট আছে। বারবার চন্দ্রকে বলে,
‘তোমার ব্যবসাটা আমাকে বুঝিয়ে দাও না, আমি করতে পারব না? বড় বাজারের দোকানগুলো আমাকে চিনিয়ে দেবে!’
চন্দ্র হেসে বলে, ‘দূর পাগলি, ওসব ছেলেদের কাজ। ছোটাছুটি করতে হবে। তুই কি ওসব পারিস! দুদিন পর বিয়ে করবি, শ্বশুর বাড়ি সামলাবি—-’ কথাগুলো বলে হো হো করে হাসতে থাকলেও বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে ওঠে চন্দ্রর।
চন্দ্র মনে মনে ভেবে রেখেছে রিটায়ারমেন্টের পর সংসারের দিকে তাকিয়েই ব্যবসাটা আবার শুরু করতে হবে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন বেশ ভালো পরিমাণ অর্থ। এখন যা অবস্থা তাতে করে চন্দ্রর পক্ষে ওতগুলো টাকা ইনভেস্ট করাও খুব মুসকিল। অংশু আর সুমিতকে বলেছিল। সুমিত তেমন আগ্রহ না দেখালেও অংশুর একটু একটু ইচ্ছে ছিল পার্টনারশিপে ব্যবসাটা করার। সেই আশাতেই আছে চন্দ্র, দেখা যাক কী হয়। এসব নানান চাপের ভেতর নীলিমার এই শরীর খারাপ। এত দুশ্চিন্তা নিয়ে বাঁচা যায়! এখন সুরেশ মামার কথা শুনে নীলিমা নিশ্চয়ই আপসেট থাকবে, তাতে যদি আবার অ্যাংজাইটি বাড়ে, এরপর কী করে সামলাবে চন্দ্র! পাঁচদিনে নার্সিংহোমে লাখের ওপর বিল হয়েছে। মেডিক্লেমটা ছিল ভাগ্যিস। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ডাল আলুসেদ্দ মাখা দিয়ে মাখা ভাত মুখে তুলছিল চন্দ্র। ভাত থেকে তখনও গরম ধোঁয়া উঠছে। মুখের ভেতর গ্রাস চালান দিতেই সেই গরম ভাপে যেন মিশে যাচ্ছে চন্দ্রর অনুচ্চারিত কথাগুলো। বুকটা ভারি লাগছে কেমন। আড় চোখে রান্নাঘরের দিকে তাকাতেই দেখে নীলিমা টিফিন বাক্স হাতে ওর টেবিলের দিকেই এগিয়ে আসছে। বাক্সগুলো টেবিলে রেখে নীলিমা বলল,
‘তোমরাও তো বর্ডার একালার দিকেই যাও। চারদিকে তো ওরাই ভরা। বলছি চুপ চাপ থেকো রাস্তাঘাটে। তুমি যা কথা বলো—’
‘এত চিন্তা করো না। এটা ভারত, বাংলাদেশ নয়।’
‘সত্যিই কি চিন্তার কিছু নেই বলছ? হাওড়া, বারাসাত, হাসানাবাদ, বসিরহাট সবই কি বিক্ষিপ্ত ঘটনা! কে কি নিরাপত্তা দেয় আমাদের? পুরো দেশটাই তো উত্তাল। কাশ্মীর বেড়াতে গিয়ে, বাড়ি ফিরল না আর— এই তো তোমার চারটে বাড়ি পরেই। অথচ ওই একই জায়গায় কত মানুষ ঘুরতে যায় রোজ। কখন কার সঙ্গে এখন কী হবে কেউ জানে না। সুরেশ মামা আর বাবু যখন রাতের খাবার মুখে দিয়ে ঘুমোতে গেছিল ওরাও কি জানত যে ওদের সঙ্গে কি হবে! কী জানি এখনও বেঁচে আছে কিনা!’ কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে একটা লম্বা শ্বাস ফেলল নীলিমা।
ততক্ষণে নিজের খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে ফেলেছে চন্দ্র। কী বলে নীলিমাকে সান্ত্বনা দেবে তার কোনও ভাষা নেই। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
‘সারাদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি, এত দুশ্চিন্তা করো না। সাবধানে থেকো। ওষুধ গুলো খেও। ফিরে এসে যেন তোমায় একদম সুস্থ দেখতে পাই।’

(৪)
কোনওমতে ট্রেনে উঠল চন্দ্র। মেঘদূত যবে থেকে এসেছে জায়গাটা মোটামুটি করে পেয়ে যায়। মেঘদূত বসিরহাট যায়। শুনেছে ওর পরিবার থাকে চাঁদপাড়ায়। মেয়ে, বউ, মা বাবা, ভাই, ভাইয়ের বউ, ছেলে একসঙ্গে থাকে। মেঘদূত থাকে দমদমে। আগে কলকাতায় যখন পোস্টিং ছিল, তখনই দমদমে ফ্ল্যাট কেনে। মেঘদূতের খুবই ভাল। অল্প বয়সে এত বড় চাকরি পেলেও অহং তেমন নেই। ট্রেনে ওদের সকলকেই সম্মান দিয়ে কথা বলে। এত দিনে শুধু একটা ঘটনা ছাড়া বাকি আর কোনওকিছুতে মেঘদূতকে কোনও সন্দেহ কাজ করেনি মনে। গতবছর কলকাতা বইমেলায় অংশু ওকে দেখেছিল অন্য এক মহিলার সঙ্গে। অংশুকে দেখে খানিক এড়িয়ে যায় মেঘদূত এবং পরের দিন ট্রেনে আর বিষয়টা উত্থাপনই করেনি। অথচ অংশুমানের মেশে হিয়া বা ঋদ্ধির সঙ্গে পরিচয় করার ইচ্ছে মেঘদূতের বহুদিনের। সেদিন অংশুর সঙ্গে ওরা থাকলেও মেঘদূত যে অস্বস্তিতে পড়েছে এবং এড়িয়ে যেতে চাইছে তা অংশু আর ঋদ্ধি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল। অংশু ঘটনাটা চন্দ্র আর সুমিতকে জানিয়েছিল। ইয়ং ছেলে, বাড়ি থেকে দূরে, আচরণে আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না কী ঘটে থাকবে। তবে ছেলেটার আচরণে কখনও কেউ কষ্ট পাইনি এতগুলো দিনে। সারাটা ট্রেন ওদের হাসাতে হাসাতে যায়। মেঘদূতের আজ নবদ্বীপের দই নিয়ে আসার কথা সকলের জন্য। চন্দ্রর মনটা তেমন ভালো নেই। মেঘদূত নিজের মতো নানান কথা বলে গেলেও সেভাবে কিছুই কানে ঢুকছে না চন্দ্রর। সুমিত এলে কামরাটা আরও জ্বলজ্বল করে। কিন্তু চন্দ্রর আজ কোনওকিছুতেই মন নেই তেমন। অংশু ওঠামাত্রই একটা আমলকির প্যাকেট ধরালো চন্দ্রর হাতে।
মুখ তুলে বলল,
‘এটা কি?’
‘আনতে বলেছিলেন যে? ভুলে গেলেন? ওই যে বলেছিলাম না বারাসাত স্টেশনে চার নম্বর প্লাটফর্মে একটা ভালো মুকসুদ্দির দোকান করেছে।’
‘ও হ্যাঁ, এনেছ? কাটো দেখি, একটা দাও।’
প্যাকেটের মুখটা ছিঁড়ে দুটো আমলকি চন্দ্রর হাতের তালুর ওপর রাখল অংশু। বলল,
‘কি হয়েছে বলুন তো? আপনি তো ভুলে যাওয়ার মানুষ নন!’
চন্দ্র অংশুকে নীলিমার মামার কথা জানাল। ‘কী যে অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি এখন আমরা, তার ওপর এত টাকা কোথা থেকে আসবে…’
‘আরে চিন্তা করছেন কেন, আমি তো বলেছি, কিছুটা ইনভেস্ট করব। আমার তো কবে থেকেই একটা কিছু করার ইচ্ছে! ঋদ্ধি প্রায়ই বলে। আরে আপনি তো জানেন, আমাদের ব্যবসার পরিবার। আগে মিস্টির দোকান ছিল, তারপর ইলেকট্রনিকস। রায়গঞ্জে সবচেয়ে বড়ো দোকান। একটা সময় কত যে চাঁদনি মার্কেটে এসে পড়ে থেকেছি। এখন ভাবলেও কেমন লাগে! এখানে একা একা আমি আর সাহস পাই না।’
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে থামল অংশু। ঋদ্ধির অনেকদিন থেকে একটা স্টার্টআপের ইচ্ছে। অনেক আইডিয়া আছে ওর কাছে। কিন্তু অংশু কোনটাতেই সেভাবে কান দেয়নি। একা একা কতটা কি পারবে সে নিয়ে নিজেই কনফিডেন্স পায় না অংশু। তবে ঋদ্ধিকে সেটা বুঝতে দেওয়া যাবে না। বরং কথা উঠলে ঋদ্ধিকে বলে, ‘তুমি ওসব পারবে না।’ কতবার যে এই নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছে। শেষমেশ নিজেই একটা ছোট্ট হাতের কাজের ব্যবসা খুলেছে। অংশু খুব ভালো করে জানে ঋদ্ধি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, ডেয়ারিং স্বভাবের। মনে মনে ভাবে ভাগ্যিস চাকরিটা এখন আর করে না, করলে হয়তো কবেই স্বাধীনভাবে একা থাকতে শুরু করত। মনে মনে হাসল অংশু। ও একটু ডিপেন্ডেন্ট মেয়ে পছন্দ করে। চায় ঋদ্ধিও সেভাবে থাকুক। সবকিছু ওকে জিজ্ঞাসা করে করবে। ঋদ্ধি দুতিন বার প্রথম প্রথম নিজের সিদ্ধান্তে কিছু কিছু কাজ করে। অংশু এমন অশান্তি করেছিল তারপর থেকে ঋদ্ধি অংশুকে জানিয়ে যা করার করে। এতে যেটা হয়, অনেককিছুতে অংশুর মত না থাকলে সেটা ঋদ্ধি আর করে না। অংশু এতে অনেকটা মানসিক শান্তি পায়। মনে করে স্ত্রী ওর কন্ট্রোলে আছে। একটু রাগারাগি করে ঠিকই কিন্তু তারপর অংশু যা চায়, আলটিমেটলি তাইই হয়। ওটুকু অংশু সহ্য করে নেয়।
নবদ্বীপের দইয়ের শেষ তৃপ্তিটুকু চেটে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করল, ‘ইস তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল, এই দ্যাখো ছবি।’
ছবিটা সেন্ড হওয়ার পরই দুটো নীল টিক। আর তারপরই পরপর ছটা মেসেজ ঢুকল অংশুর ফোনে।
‘লজ্জা করে না। মনে তো পড়েই না একবারও, আবার ছবি পাঠাও। এদিকে আমি যেখানে যাই, যা খাই, তোমার জন্য আনি।
কোনওদিনও বুঝলেই না কীসে আমি খুশি।
একদম ছবি টবি পাঠাবে না আমায়।’
অংশু চুপচাপ ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে বলল, ‘কাল বরং বসাকের কচুরি আর ঘোষের মালাইচপ হয়ে যাক। কচুরিটা চন্দ্রদা নেবেন আর মিস্টিটা আজ আমি ফেরার পথে নিয়ে নেব। সকালে পাব না নয়তো। ওকে?’
এককথায় রাজি হয়ে গেল সবাই।
চন্দ্র বলল, ‘কাল কি বাসব আসবে? আজ তো এল না।’
‘না আজ আসলে শ্রাবণীকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছে। গাইনো। কাল রাতে আমায় ফোন করেছিল। ঋদ্ধির কাছ থেকে ফোন নম্বর নিল। সে এক কাণ্ড, আমার ফোনে আমার বউয়ের সঙ্গে একঘণ্টা কাটিয়ে দিল গল্প করে। ঋদ্ধি বলছে ফোন কাটতেই পারছে না।’ অংশু বলল।
‘ওর আলাদা ক্ষমতা বাবা। না হলে পরপর এতগুলো ম্যাডাম পটিয়েই চলেছে…’
‘বলবেন না আর। আমার যে এসবে কী ভয় করে। ঋদ্ধি এসব একদম পছন্দ করে না। বলে তো, ওর কষ্ট হয় শ্রাবণীর জন্য। যতই হোক শ্রাবণীর সঙ্গে ওর একটা হেলদি ফ্রন্ডশিপ আছে। আর ঋদ্ধি তো খুব স্পষ্টবাদী, কোনও ভুলের সঙ্গে আপোস করে না। বাসবের কথা জেনেও ওকে চুপ থাকতে হয়– যেটা ওকে খুব অস্বস্তিতে রাখে।’
ঋদ্ধিকে নিয়ে কথাটা বলেই কেমন থম মেরে গেল অংশু। সত্যিই কি আপোস করে না ঋদ্ধি নাকি অংশু নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চায় এটা বলে যে অংশু সবরকম স্বাধীনতা দিয়েছে ঋদ্ধিকে। কিন্তু স্বাধীনতা দেওয়ার অংশুই বা কে? ঋদ্ধি একজন ইনডিপেনডেন্ট শিক্ষিত অ্যাডাল্ট। কিন্তু ঋদ্ধিকে হারিয়ে ফেলার যে ইনসিকিউরিটি অংশুর ভেতর সবসময় কাজ করে, তার কী! ঋদ্ধিকে হারাতে চায় না বলেই তো বাইরে থেকে ওরকম শক্ত থাকতে হয়।
চন্দ্র উঠে দাঁড়াল। মনটা আগের মতো ওতটাও ভার নেই। নামতে হবে। নামার আগে পিছনে তাকিয়ে অংশুকে বলল, ‘কাল তা হলে ফাইনাল। আমলকিটাও ভালো। কত হয়েছে বলো। ধার রাখা উচিত নয়।’
ওরা নেমে যাওয়ার পর বাকি চারপাঁচটা স্টেশন অংশু আর মেঘদূত যায়। একটা সূক্ষ্ম দূরত্ব রেখে কথা হয় দুজনের। গতবছর বইমেলার পর থেকে এই বদলটা লক্ষ করে অংশু। কী জানি এসব সম্পর্কগুলোকে অংশু কেমন ভয় পায়! কী করে যে মানুষ পরকীয়ায় জড়ায়! একদিক দিয়ে ভালো যে ঋদ্ধি খুব একটা বাইরে বের হয় না। প্রতিটা সংসারে না হলে আজকাল যা শুরু হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এসব সম্পর্ক ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায় অংশুকে। ঋদ্ধি সুন্দরী, বুদ্ধিমতী। যেকোনও ছেলে ওকে পছন্দ করে সেটা অংশু লক্ষ করে দেখেছে। কোথাও তাই নিজের স্ত্রীকে নিয়ে বেশ একটু ভয়ে থাকে অংশু। বাড়ি থেকে ঋদ্ধির কম বেরোনোটাকে কোথাও অংশু নিজের একটা কমফোর্টজোনে রেখেছে। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই হোক অংশু বারবার নিজেকে এটাই বোঝায়, আর যাই হোক ওদের জীবনে কখনও এমন কোনও অঘটন ঘটবে না।
ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে থামল বসিরহাটে। প্ল্যাটফর্মে পা রেখেছে কী রাখেনি সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে মানুষের শোরগোল। পিছন ফিরে তাকিয়ে অংশু দেখে প্লাটফর্মে এক জায়গায় বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে এক ভদ্রমহিলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই একজন বলল, ট্রেন থেকে নেমেই নাকি ভদ্রমহিলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সবাই তখন মুখে চোখের জলের ছিটে মারছে। দাঁতে দাঁত লেগে গেছে মহিলার। চট করে কোনও অচেনা মহিলার গায়ে ওভাবে হাতও দেওয়া যায় না। দু একজন মহিলা এগিয়ে এসে কোনওমতে ওনাকে তুলে প্ল্যাটফর্মেই একটা বেঞ্চে বসিয়েছে। অংশু চট করে জিআরপিতে ফোন লাগাল। কিন্তু লাভ কিছু হল না। কেউ এল না সাহায্যে। মেঘদূত অংশুকে বলে ওখান থেকে অনেক আগেই চলে গেছে। কিন্তু অংশু এই অবস্থায় মহিলাটিকে ফেলে যেতে পারল না। যতক্ষণ না একটা কিছু সুরাহা হয় অংশু সেখান থেকে যেতে পারবে না। অনেকক্ষণ এদিক-ওদিক চেষ্টা করার পর, ওখানে উপস্থিত সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আপাতত ওনাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে চিকিৎসার জন্য। স্টেশনের পাশে অংশু যেখানে সাইকেল রাখে, সেই খালা আর খালুকে গিয়ে বলল অংশু। ওরা চটপট একটা টোটো জোগাড় করে হসপিটাল যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। ওই অসুস্থ মহিলাটির সঙ্গে আরও দুজন মহিলা, আর দুজন ভদ্রলোক গেল হসপিটালে। মহিলাটির বাড়িতেও ফোন করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি বিড়াতে। ওখান থেকে বাড়ির লোক আসতে তো কিছুটা সময় লাগবেই। ততক্ষণে আশা করা যাচ্ছে উনি হয়তো সুস্থ হয়ে যাবেন। গ্যারেজ থেকে সাইকেল নিয়ে অংশু সাইকেলে উঠতে যাবে তখনই খালা বলল, ‘মাস্টার মশাই ভালো পাটালি এসেছে। আপনার জন্যি দুটি রাখসি।’
অংশু ঘাড় নেড়ে এগিয়ে গেল রাস্তায়। মনে মনে ভাবল, আজই চন্দ্রদার সাথে ট্রেনে কত কথা হল। বাংলায় আগে এত ধর্মীয় উত্তেজনা ছিল না। বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গকে কখনও আলাদা করে ভাবতে হয়নি যেন। দেশভাগের সময় বাংলাদেশ থেকে অংশুর পূর্বপুরুষ যখন এদেশে এসেছিল, অংশুর বাবা তখন ছোট। অনেক কম টাকায় জমি কিনে ছিটের বেড়া দিয়েছিল দাদু। সেই বাড়িতেই অংশুর জন্ম। বরাবরই ফরিদপুরের ওপর একটা অদ্ভুত টান অনুভব করে অংশু। আর মা চট্টগ্রামের মেয়ে। জেঠির কাছ থেকে ও দেশের অনেক গল্প শুনেছে অংশু। ভীষণ ইচ্ছা ছিল চাকরি পাওয়ার পর মাকে অন্তত একবার ঘুরিয়ে আনবে নিজের পুরনো ভিটে থেকে। সেটা হয়নি। এখন আর হবে বলেও মনে হয় না। অথচ যে মানুষগুলোর সঙ্গে রোজ ওঠাবসা করে অংশু তারাও সেই একই ধর্মের। এই গ্যারেজের খালা, খালু, বেশিরভাগ কলিগ, স্কুলের বাচ্চারা সবাই তো কত ভালোবাসে অংশুকে। তা বলে কি স্কুলে পলিটিক্স নেই? আছে! কিন্তু তার মধ্যেও কিছু মানুষ আছে যারা অংশুর ধর্ম দেখে না। হাই মাদ্রাসায় চাকরি করলেও অংশুদের স্কুলে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া হয়, পনেরোই আগস্ট পালন হয়। একদল যদিও এসবে ভুরু কুঁচকায়, তবুও বন্ধ হয়ে যায়নি এখনও। অংশু এবং আরও কিছু শিক্ষক শিক্ষিকার মিলিত প্রয়াসে বাচ্চারা হাতের কাজ থেকে শুরু করে, নাচ, গান, নাটক সবই এখনও শিখতে পারছে স্কুলেই।

(৫)
বাসব বিশ্বাস
বাথরুম থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরালো বাসব। রুবিনাকে এই অবস্থায় যেন আরও মোহময়ী লাগে। কী অনায়াসে এভাবে বাসবের সামনে শুয়ে থাকতে পারে রুবিনা। বিছানায় রুবিনার ঠিক পাশেই বসল বাসব। একটা করে টান দিচ্ছে আর বাসবের মনে হচ্ছে রুবিনার স্তন দুটো যেন আবার শক্ত হয়ে উঠছে। নিজের অজান্তেই বাসব ঘোরের মধ্যে তাকিয়ে আছে রুবিনার চোখের দিকে। বাসবের হাত থেকে ফট করে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে ঠোঁটটা কামড়ে ধরল রুবিনা। কানের কাছে ঠোঁটটা চেপে বলল, ‘জানো না আমার একবারে কিছু হয় না! তাড়াতাড়ি এসো!’
বাসবের জীবনে নারী কিছু নতুন নয়। অনেকবারই অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে বাসব। কারোর সঙ্গে বিছানা পর্যন্ত গড়িয়েছে, কারো সঙ্গে ওই যাতায়াতটুকুই। রুবিনার আগে তনিমার সঙ্গে একটা হালকা আদান-প্রদানের সম্পর্ক ছিল বাসবের। তনিমা ওর পাশের স্কুলে চাকরি করে। স্টেশন থেকে স্কুল পর্যন্ত তনিমা বাসবের বাইকে চেপেই যাতায়াত করত। ওই হালকা ছোঁয়া, ফোনে কথাবার্তা, আর দু একবার ঘুরতে যাওয়া। তনিমাদের স্কুলে যবে থেকে রাকিব ইসলাম জয়েন করেছে, তনিমা ওর সঙ্গে যাতায়াত করে। বাসবের থেকে তনিমা বয়সে বেশ খানিকটা বড়। দুই ছেলে। বর ব্যাঙ্কে চাকরি করে। যতদিন বাসবকে প্রয়োজন ছিল তনিমা সেটা বুদ্ধি করে কাজে লাগিয়েছে। রাকিব আসার পর থেকে কম্পার্টমেন্টাই চেঞ্জ করে ফেলেছে। এরকমই এক টলমলের সময়ে রুবিনা খাতুন জয়েন করল বাসবদের স্কুলে। এমনিতেই বাসব কথা বলতে ভালোবাসে, মেয়ে হলে তো কথাই নেই। টিচার্স রুমে ওই পাশাপাশি বসা, কথা বলা, পারস্পরিক নির্ভরতা আরেকটু বেশি সময় কাটানোর ইচ্ছা এসব কিছুই এখন বাড়তে বাড়তে বিছানা পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে। বাসবের বাড়ি বারাসাতে নয়। বারাসাত থেকে আরও পাঁচটা স্টপেজ যেতে হয়। কিন্তু রুবিনার সঙ্গে প্রতিদিন বাসব বাড়ি ফেরার পথে বারাসাতে নামে। তাই যাওয়ার সময় অংশুদের কম্পার্টমেন্টে উঠলেও ফেরার সময় অন্য কম্পার্টমেন্টে ওঠে বাসব। তাও দু চারদিন সুমিত আর অংশুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে প্লাটফর্মে। দূর থেকে দেখেই বাসব দাঁড়িয়ে পড়েছিল। যতদূর মনে হয় ওরাও বাসবকে দেখেছে। এই নিয়ে কেউ কোনও কথা তোলেনি আর পরের দিন। প্রথমদিকে পার্কে ক্যাফেতে আরও খানিকক্ষণ বসে একসাথে সময় কাটিয়ে সাতটার ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরত বাসব। এখন অবশ্য আর ক্যাফেতে যায় না। রুবিনার বাড়িতে আসে। বাড়িতে আসার জন্য অ্যাপ্রোচটা প্রথম রুবিনাই করে। বাসবের ইচ্ছা থাকলেও রুবিনাকে আগে থেকে বলতে পারেনি। কিন্তু রুবিনা যখন অ্যাপ্রোচ করেছিল, সুযোগটা একেবারে লুফে নিয়েছিল বাসব। আসলে সেদিন রুবিনার শরীর ভাল ছিল না। বাসবকে তাই বলেছিল,
‘আজ বরং বাড়ি চলো। গিয়ে একটু আদা দিয়ে চা করব। দোকান থেকে তোমার জন্য সিঙ্গারা কিনে নিচ্ছি, চা দিয়ে খেও। আমার মাথাটা ভীষণ ধরেছে। আর বাইরে বসতে পারছি না।’
কিন্তু বিষয়টা শুধু চা সিঙ্গারাতেই থেমে থাকেনি। ওইকম ফাঁকা ফ্ল্যাটে দুজন দুজনকে কাছে পেয়ে ঘটনাটা ঘটেই যায়। সেই থেকে শুরু। এখন রোজই রুবিনার সঙ্গে ওর বাড়িতে দুজন ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত কাটানোর পর বাসব বিশ্বাস সবজি মাছ কিনে বাধ্য স্বামীর মতো ঘরে ফেরে। বাসব বেরিয়ে গেলে রুবিনাও বাচ্চাদের টিফিন, বরের টিফিন রেডি করে। রুবিনার বাচ্চারা একটা ডে বোর্ডিং এ পড়ে। তাই বাড়ি ফেরে একটু দেরি করে। বাসবও বের হয়, ওরাও বাড়ি ঢোকে। আর রুবিনার স্বামীর চাকরি তো কলকাতায়। ফিরতে এমনিতেও রাত হয়। শুধু কাজের মাসিকে রুবিনা এখন বিকেল পাঁচটার বদলে সন্ধে সাতটার পর আসতে বলেছে।
শ্রাবণীর সঙ্গে বিয়ের পাঁচবছর হল বাসবের। শ্রাবণী ফুড কর্পোরেশনে চাকরি করে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মনের মতো মেয়ে পেয়ে বিয়ে করেছিল বাসব। বাসবের বিয়েতে তনিমা বেশ খাটাখাটনি করেছিল। তনিমাই সম্বন্ধটা আনে বাসবের জন্য। বিয়ের দুবছর পর ছেলে হয়। তনিমা দেখতেও আসে। শ্রাবণীর সঙ্গেও ভালো বন্ধুত্ব জমিয়ে ফেলেছিল। অংশু আর বাসবের বয়সটা কাছাকাছি বলে বাসব অংশুর সঙ্গে একটু বেশিই কথা বলে। ওদের বিয়েতে ঋদ্ধি অংশু দুজনের এসেছিল। তারপর নতুন বউকে নিয়ে বাসব অংশুদের বাড়িও আসে। ঋদ্ধি নিজের হাতে রান্না করে অনেক কিছু খাবার খাইয়েছিল। আগে থেকে শ্রাবণীর পছন্দের খাবার জেনে মেনু তৈরি করেছিল ঋদ্ধি। সেই থেকে দুজনের মধ্যে একটা বেশ ভালো বন্ডিং। ওদের ফোনেও যে যোগাযোগ আছে সেটা বাসব খুব ভালো করে জানে। বাসব নিজের ইমেজটা বাইরে এমন ভাবে তৈরি করে রেখেছে চট করে লোকে ওকে খুব একটা প্রশ্ন করতে পারে না। কারণ রুবিনার সঙ্গে যে ও মেলামেশা করে সেটা ও কখনও কাউকে লুকাইনি। এখন এই মেলামেশাটা কত দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে সেটা যে যার কল্পনায় ভেবে নিয়েছে। বাসব জানে এর কোনও উপযুক্ত প্রমাণ কারও কাছে কোনদিনও থাকবে না। কারণ রুবিনার পরিবারকে বাসব একরকম ফ্যামিলি ফ্রেন্ড বানিয়ে ফেলেছে এখন। ওদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার ঘুরতেও গেছে বাসব আর শ্রাবণী। শ্রাবণী নিজে মুখে যখন রুবিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সেসময় ঋদ্ধির বিষয়টা বেশ অন্যরকম লেগেছিল। শ্রাবণীর জায়গায় ঋদ্ধি থাকলে এত সহজে এই মেলামেশাটাকে মেনে নিতে পারত না। ঋদ্ধির সঙ্গে ওর অনেক রকম কথা হলেও সম্পর্কটা সেই ছোটবেলার বন্ধুর মতো তো নয়, যে কোনও কিছু খটকা লাগলে সেটা তার সঙ্গে শেয়ার করা যায়, ব্যক্তিগত জীবন হলেও। আসলে বড় বয়সে তৈরি হওয়া বেশিরভাগ সম্পর্কই খুব ফর্মাল। বাড়িতে বহু বার অংশু আর ঋদ্ধি এই বিষয়ে আলোচনা করেছে। হয় শ্রাবণী সব জেনেশুনে বিষয়টা মেনে নিয়েছে কিংবা ওর কিছু আসে যায় না। হয়তো ও-ও কোনও মুখোশ পরে আছে।
বাসব ইদানীং অংশুকে বেশ এড়িয়ে চলে। খুব একটা কথায় আর নিজেকে জড়ায় না। অংশুর দেখাদেখি একটা গাড়িও কিনেছে বাসব। কিন্তু মুশকিলটা ঘটেছে অন্য জায়গায়। ঋদ্ধি গাড়ি শেখার পর শ্রাবণী কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। যেন কিছুতে পিছিয়ে পড়ছে এমন একটা ভাব। বাসব প্রথমে গাড়ি কিনতে রাজি হয়নি। শ্রাবণীর ইচ্ছাতেই এক রকম জোর করে কিনতে হয়। বিপদটা ঘটেছিল সেদিন, যেদিন অংশুর গাড়ি করে ওরা চারজন দুটো বাচ্চাকে নিয়ে সায়েন্সসিটিতে একটা বড় কনসার্ট দেখতে যায়। ফেরার পথে ঋদ্ধি গাড়িটা চালিয়ে ফিরেছিল। অত রাতে বাড়ি ফিরেও শ্রাবণী সেদিন জোর করে বাসবকে গাড়ি বের করতে বলে প্র্যাকটিসের জন্য। বাসব পই পই করে বারণ করলেও, শোনেনি। শ্রাবণীর এত উত্তেজনা বাসবের পছন্দ হচ্ছিল না। ঠিক সেদিনই বিপদটা ঘটল। ব্রেক করতে গিয়ে ভুল করে অ্যাক্সিলেটরের বাটন প্রেস হয়ে গিয়ে নতুন গাড়ি সজোরে সামনের পাঁচিলে ধাক্কা মারে। সামনের বোনেটটা যে একেবারে দুমড়ে তুবড়ে যায় তাই নয় শ্রাবণীর যথেষ্ট আঘাত লেগেছিল বুকে। এতটাই যন্ত্রণা যে ডাক্তার দেখিয়ে পাঁচদিন রেস্টে থাকতে হয় অফিস ছুটি নিয়ে। বড় কিছু যে ঘটে যায়নি সেই ভাগ্য ভালো। বিষয়টা বাসব ট্রেনে শুধুমাত্র অংশুকেই বলেছিল। হয়তো নিজের ভেতর কোনও গিল্ট কাজ করছিল। এমনিতেই চন্দ্র আর সুমিত ওকে রাগায় এই বলে যে অংশুকে সবকিছুতে কপি না করলে বাসবের পেটের ভাত হজম হয় না। কথাটা কোথাও একটু হলেও সত্যি সেটা বাসব জানে এবং এই একই রোগ শ্রাবণীর মধ্যেও আছে। সেই কারণেই ঋদ্ধিকে ওভাবে ড্রাইভিং করতে দেখে ও নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। এতটা সখ্যতা ছিল একসময় কিন্তু নিজের এই অ্যক্সিডেন্টের কথা ঋদ্ধিকে শ্রাবণী জানায়নি। অংশুর কাছ থেকে জেনে ঋদ্ধি যখন শ্রাবণীকে মেসেজ করেছিল, শ্রাবণী বিষয়টাকে ভীষণ হালকা ভাবে উড়িয়ে দেয়। সেদিন বাড়িতে বাসবের সঙ্গেেও তুমুল অশান্তি করে কথাটা অংশুকে বলার জন্য। মানুষের মন বোঝা যদি এতই সহজ হত তা হলে জগতে আর অন্ধকার বলে হয়তো কিছু থাকত না, সবটাই আলো হত।
রুবিনার ঠোঁটটা চুষতে চুষতে বাসব বলল, ‘তুমি যদি আমার জীবনে না আসতে ভাবছি কী হত!’
‘কী আর হত? তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসতে।’ কথাটা বলেই হো হো হেসে উঠল রুবিনা।
রুবিনার এই ধরনের ইয়ারকি বাসবের একদম পছন্দ হয় না। ছ্যাঁক করে বুকে গিয়ে লাগল হাসিটা। জোরে রুবিনার ঠোঁটটা আবার কামড়ে ধরে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে রুবিনার দুটো উরুর মাঝে চাপ দিল বাসব।
মেয়েরা এমনিতে ভালো কিন্তু এত যে কেন কথা বলে! একদম পছন্দ হয় না বাসবের। ঘড়িতে টাইম দেখে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হল বাসব। আজ কেমন হালকা লাগছে ভেতরটা। রুবিনার গায়েও দুটো লাল দাগ। রুবিনা বলছে, ‘কী করলে বলো তো, আবার একটা গল্প বানাতে হবে।’
বাসব আজ আর কোনও উত্তর দিল না। মনে মনে হাসল দুবার।
বেরনোর আগে বলল, ‘কাল তো হাফ স্কুল। বাড়িতে বলে দিয়েছ নাকি?’
‘না এখনও না।’
‘তা হলে আর বলো না। কাল যাব ভেড়ির দিকে।’
ট্রেনে চেপে বাসব ফোন করল শ্রাবণীকে। কাল বাসবের ভাইয়ের জন্মদিন। শ্রাবণী লম্বা লিস্ট পাঠিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। সবজি, দুরকম মাছ। পায়েসের চাল, গুড়, দুধ, মিস্টি আর কেক। শ্রাবণী ফোন ধরলে বাসব বলল, ‘আরে এতকিছু আমি একা নিয়ে যাব কী করে। জানোই তো স্কুল থেকে টিউশন করে বাড়ি ফিরি। ক্লান্ত থাকি। এত কিছু আমি আনতে পারব না।’
‘তাহলে একটা কাজ করি, আমিও স্টেশনে চলে যাচ্ছি। একসাথে দুজনে কেনাকাটা করে ফিরব।’
‘হুম কথাটা মন্দ বলোনি। চলে এসো। অমলের দোকানের লেবু চাটাও খাওয়া যাবে। মনে আছে বিয়ের পর পর আসতাম!’
‘মনে থাকবে না?’ নিজের মনেই হাসল শ্রাবণী। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এখন কোথায়?’
‘তুমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ো। স্টেশন আসতে আসতে আমি পৌঁছে যাব।’
‘আচ্ছা’ বলে ফোন রাখল শ্রাবণী।
ছেলেটা ঠাকুমা দাদুর কাছে বেশ ভালই থাকে। না হলে কি আর চাকরিটা এত শান্তিতে করতে পারত শ্রাবণী। মা বাবাকেও নিজের কাছাকাছি এনে রাখার একটা পরিকল্পনা আছে। ওদের উলটো দিকের ফ্ল্যাটটাই ফাঁকা হবে। শ্রাবণী মনে মনে ভেবে রেখেছে কিনে নেবে মা বাবার জন্য। যেসব বাচ্চার মা-বাবা দুজনেই চাকরি করে তাদের কাছে ঠাকুমা দাদুর সান্নিধ্যটা ভীষণ জরুরি। শুধুমাত্র আয়ার ওপর ভরসা করে বাচ্চা বড় করা যায় না। এ দিকটাতে শ্রাবণী নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে করে। বাসবের মা যথেষ্ট শিক্ষিত এবং কালচারড মহিলা। ছেলেটাকে যেভাবে উনি আবৃত্তি শেখান, গান শেখান, শ্রাবণী নিজে বাড়িতে থাকলেও ওত কিছু ভালো করে শেখাতে পারত না। এখনও রিহান দাদু ঠাকুমার সঙ্গেই খেলছে। দেওর ফাল্গুনি বিশ্বাস, অবশ্য এখানে থাকে না। চাকরি করে কলকাতায় একটা প্রাইভেট কম্পানিতে। ওখানেই কাছাকাছি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। আজ আসার কথা জন্মদিন উপলক্ষে। বলেছে ঢুকতে রাত হবে। এই ফাঁকে বরং বাজারটা করে আনতে হবে। দুই ভাই একেবারে দুই মেরুর। শ্রাবণীর সঙ্গে ফাল্গুনির একটা ভালো বন্ড আছে। টুক করে হোয়াটসঅ্যাপে ফাল্গুনিকে একটা মেসেজ ড্রপ করেই স্টেশনের দিকে বেরিয়ে পড়ল শ্রাবণী। হাতে সময় থাকলে হেঁটেই যেত কিন্তু আজ একটা রিক্সা করে নিল। বাসব এখন রোজই টিউশন করে তারপর দেরিতে বাড়ি ফেরে। রুবিনা ম্যাডামও বাসবকে দুই ছেলেকে পড়ার জন্য বলেছিল। কথাটা রুবিনা শ্রাবণীর সামনেই বলেছিল। কিন্তু এই টিউশনিগুলোর জন্য বাসব সেটা করতে পারেনি। শ্রাবণী যতদূর জানে মাঝে মাঝে সময় পেলে রুবিনার বাড়ি গিয়ে বাচ্চা দুটোকে পড়িয়ে আসে। মানুষটা আসলে একেবারে পড়া পাগল। কেউ পড়তে চাইলে না করতে পারে না। রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে অপেক্ষা করতে লাগল শ্রাবণী। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না। মিনিট পাঁচেকের ভেতর ট্রেন থেকে নামল বাসব। এক গালে হেসে শ্রাবণী এগিয়ে গেল বাসবের দিকে। বলল, ‘চলো, আগে চা-টা খেয়ে নিই। তারপর বাজার হাট।’
শ্রাবণীর হাতটা ধরে বাসব এগিয়ে গেল অমলের চায়ের দোকানের দিকে। মনটা আজ সত্যি বড্ড হালকা। রুবিনার গায়ের দাগগুলো স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বাসব তাকিয়ে আছে শ্রাবণীর দিকে। রাতে শ্রাবণীকেও জমিয়ে আদর করবে আজ। অনেকদিন পর ইচ্ছে করছে হঠাৎ।
শ্রাবণী কিছু একটা বলছে বাসবের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছে না বাসব। একটা দূরপাল্লার ট্রেন শোঁ করে পেরিয়ে যাচ্ছে শীতের প্লাটফর্ম।

(৬)
অরিজিত পাল
মৌকে সমানে ফোন করে চলেছে অরিজিত। তেরোবারের শেষ রিংটুকু বাজার পর নিজের ফোনটা রাখল বেডসাইড টেবিলের ওপর। অরিজিত জানে মৌয়ের জেদ ঠিক কতটা বেশি। নিজের সিদ্ধান্তে যখন একবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ওকে ফিরিয়ে আনা এবার অম্তত ওতটাও সহজ হবে না। কিন্তু ওই বা কী করত! এত সহজে কি মা বাবাকে ছেড়ে আলাদা হওয়া যায়? যে বাবা মা ছোট থেকে এতগুলো বছর যত্ন করে বড়ো করল, দুবছর বিয়ের কাটতে না কাটতেই বউয়ের আব্দারে আলাদা হয়ে যাওয়াটা এক ধরনের স্বার্থপরতা বলেই মনে হয় অরিজিতের। বিয়ের পর থেকে মৌ এ বাড়িতে নিজেকে খুব একটা মানিয়ে নিতে পারেনি। অরিজিতের মা অসীমার সঙ্গে মনকষাকষি লেগেই থাকত। সেটা কমার বদলে বরং দিন দিন বাড়তে থাকে। অসীমা বা মৌ কাউকেও বুঝিয়ে উঠতে পারেনি অরিজিত৷ দুজনে সবসময়ই দুপথে হাঁটে। এসব সমস্যায় মৌয়ের সঙ্গে নিত্য অশান্তি শুরু হল অরিজিতেরও৷ মৌ জেদ ধরে বসল আলাদা না হলে ওর পক্ষে সংসার করা আর সম্ভব হচ্ছে না। অসীমার প্রতি কথায় ছেলে বউয়ের ভেতর ঢুকে পড়া, অযথাই ছেলে ছেলে করে মৌয়ের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা, এসব মৌয়ের অসহ্য হয়ে উঠছিল দিন দিন। আর অরিজিতও মায়ের মুখের ওপর কোনও কথা বলত না। উলটে মৌকে সবসময় মানিয়ে চলার কথা বলত। অসীমা ভুল হলেও অরিজিত মৌকেই চুপ করাত। যে মেয়েটা নিজের সবকিছু ছেড়ে একটা অচেনা ছেলের ভরসায় এক নতুন সংসারে এসেছে, কোনওভাবেই যদি সেই ছেলেটার কাছ থেকে কোনও সার্পোট না পায়, দিন দিন বাড়িটা তার কাছে থাকার অযোগ্য হয়ে ওঠে তা হলে সে কী করবে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল কেউ আর কারও অসুবিধাটাই বুঝতে চাইল না। তার ওপর অনুঘটক এর কাজ করল অরিজিতের বর্তমান পরিস্থিতি। অরিজিৎ এখন একটা প্রাইমারি স্কুলে আছে। কদিন আগেই হাইকোর্ট একটি নির্দিষ্ট সালের হাইস্কুলে শিক্ষক নিয়োগের প্যানেলকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করেছে স্ক্যামের জন্য। হাজার হাজার ছেলে মেয়ে এখন সরকারি চাকরি হারিয়ে রাস্তায় অনশনে বসে, যা কোনদিনও কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। সরকার কী করবে তা পরের কথা, এখন সব থেকে বড় সমস্যা তাদের সংসার চলবে কী করে। এই একই স্ক্যামে সন্দেহ করা হচ্ছে প্রাইমারিতে চাকরির পরীক্ষার আরেকটা প্যানেলেও। যে প্যানেলে অরিজিৎ চাকরি পেয়েছিল। শুধু অরিজিৎ নয় ট্রেনে যাতায়াত করে এমন অনেকে আছেন যারা ওই সালে প্রাইমারি স্কুলে জয়েন করে শিক্ষক হিসেবে। ওদের কেসটা এখন কোর্টে উঠবার কথা। রায় কী বেরোবে কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না। এই অবস্থাতে মৌ অবশ্য অরিজিতের পাশে ছিল। অরিজিৎ বলেছিল সমস্যাটা মিটলে পরে আলাদা হওয়ার কথা ভাববে। কিন্তু মৌ আর অরিজিতের সান্নিধ্য অসীমার খুব একটা ভালো লাগছিল না। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন নিজের ছেলের ওপর তার সম্পূর্ণ অধিকার অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ভাগ হতে দেখে তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলেন না। যদিও এখানেই মানুষ সব থেকে বেশি ভুল করে। কখনও কোন মানুষের ওপর কারও সম্পূর্ণ অধিকার কায়েম হতেই পারে না। সে মা-ই হোক, বাবাই হোক, স্বামী হোক বা স্ত্রী। প্রতিটা সম্পর্কের সীমারেখা তৈরি করতে না পারলে জীবন দুর্বিসহ হতে বাধ্য, ঠিক অনেকটা পাঁচমিশালী সবজির মতো। অতিরিক্ত সেদ্ধ সবজির স্বাদ যেমন তাদের নিজস্বতা নষ্ট করে, জীবনেও ঠিক তাই। সম্পর্কগুলো পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যবধানে সুতোয় গাথা থাকাটাই কাম্য। ভুলবশত এই ব্যবধান কমিয়ে সুতোয় গিঁট পাকিয়ে ফেললেই সমান্তরালে চলাটা বন্ধ হয়ে যাবে। অরিজিতের দুর্ভাগ্য যে সে এই ব্যালেন্সটা বজায় রাখতে পারল না। তখনই ঘটে গেল বিপদটা।
সেদিন অরিজিতের খুব মন খারাপ স্কুল থেকে ফিরে। সকলের সঙ্গে নানান আলোচনায় মনে চাপ পড়াটা খুব স্বাভাবিক। মাথার ওপর হোম লোন চলছে, বাড়িতে চাকরি করে একমাত্র অরিজিৎ। তিন তিনটে মানুষ ওর ওপর নির্ভর করে আছে সংসারে। হঠাৎ যদি কোন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ নেমে আসে তাহলে কী করবে সেই চিন্তা অরিজিৎকে শেষ করে দিচ্ছে দিন দিন। ইতিমধ্যে স্কুলে অনেকে শেয়ার মার্কেট নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছে। অরিজিতও একটু একটু করে শেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এটা কোনও পার্মানেন্ট সলিউশন নয়। সেই নিয়েই আজ স্কুলে নানান আলোচনা হয়েছে ওদের কলিগদের মধ্যে। অরিজিতের মতো স্কুলে আরও তিনজন আছে যারা এই একই চিন্তায় চিন্তিত। তার মধ্যে একজন গান-বাজনা করে। ভিডিও এডিটিং এর কাজ করে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এগুলোতে একটা ভালই ইনকাম আছে। আর একজন ইন্ট্রাডে ট্রেডিং এর কোর্সে ভর্তি হয়েছে। অরিজিৎ যদিও এতটা রিক্স নিয়ে ট্রেডিং করতে পারবে না। এই সমস্ত কিছু চিন্তা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। স্কুল থেকে ফেরার পর মৌ ওর মুখ দেখে বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে। অরিজিৎ ফ্রেস হতে গেলে ওর জন্য কফি বানিয়ে ওর পছন্দের চিকেন চাওমিন অর্ডার করেছিল সামনের দোকান থেকে। সেটা নিয়ে নিজের ঘরে একটু নিরিবিলিতে অরিজিতের সঙ্গে সময় কাটাতে চেয়েছিল মৌ। মৌয়ের এই আচমকা সারপ্রাইজটুকু অরিজিতেরও বেশ ভালো লাগেছিল। নানান গল্পে মনটা হালকা হচ্ছিল। তখনই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকলেন অসীমা। মৌকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘ছেলেটার চাকরি থাকবে কী থাকবে না সেই নিয়ে চিন্তা করছে আর তুমি এভাবে টাকা নষ্ট করছ? এতই যদি খাওয়ানোর সখ তা হলে বাড়িতে বানিয়ে খাওয়াও! খাবারটা নিয়ে সোজা এই ঘরে চলে এলে। আমরাও তো বাইরে বসে আছি কই একবারও তো বললে না।’
উদ্ধত অসীমার কথাগুলো শুনে ভীষণভাবে রিঅ্যাক্ট করল মৌ। বলল, ‘আপনি ভুল করছেন। আপনার ছেলেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বাজে কথা বলে চলেছেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনার সামনেই যে আপনারা খাবেন কিনা! আপনারা না বলেছেন!’
‘দেখলি বাবু কেমন করে আমাকে মিথ্যুক প্রমাণ করল? গোবিন্দর দিব্যি বলছি আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। তুই নিশ্চয়ই এই দু দিনের মেয়েটাকে বিশ্বাস করবি না? কিছু বল বাবু!’
অনেকক্ষণ থেকে এসব শোনার পর অরিজিতের আর কিছু ভালো লাগছিল না। কেন যে মাকে কোনদিনই কিছু মুখে বলতে পারে না অরিজিৎ। শুধু রাগের চোটে কফি আর খাবারের বাটিটা উলটে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অসীমা সেই সুযোগটারও সম্পূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করলেন। ছেলেকে শুনিয়ে শুনিয়ে মৌকে বলতে লাগলেন, ‘আজ তোমার জন্য আমার ছেলেটা মুখে কিছু দিতে পারল না। তুমি আসলে চাও না আমরা সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে থাকি। শুধু বরকে নিয়ে একলা ঘরে বসে গুজগুজ করা। কী আর করবে! কাজকর্ম তো নেই, শাশুড়ির নামে শুধু নিন্দে কর।’
মৌকে আর চুপ করানো যাচ্ছে না। হুড়মড় করে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এল অরিজিতের পিছু পিছু। অরিজিৎ তাকিয়ে দেখল মৌয়ের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। অরিজিত বুঝতে পারছে তার নিস্তব্ধতাই মৌয়ের দুচোখ ফেটে জল নিয়ে আসছে। অরিজিতের সামনে দাঁড়িয়ে মৌ শুধু ওকে একটা কথাই জিজ্ঞাসা করেছিল সেদিন। বলেছিল,
‘তুমি কবে আলাদা হচ্ছো আজকে আমায় জানাও! হয় তুমি আমার সঙ্গে সংসার করবে অন্য ফ্ল্যাটে উঠে… তা না হলে তুমি থাকো তোমার পরিবারের সঙ্গে। আজই আমার এ বাড়িতে শেষ দিন।’
মৌয়ের এই কথাগুলো শুনে অসীমা আরও বেশি নাটক তৈরি করলেন। অরিজিৎ শুধু একবার মৌকে বলেছিল, ‘মাথা ঠান্ডা করো মৌ আমরা এই বিষয়ে পরে কথা বলি!’
‘আমি তো মাথা ঠান্ডা করব আর তোমার মা? তুমি তাকে কিছু বলবে না।’
কোন উত্তর দেয়নি অরিজিৎ। শুধু আরেকটু গলা উঁচিয়ে বলেছিল, ‘তুমি চুপ না করলে আমি এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব।’
এসবের মাঝেও অসীমা নিজের নাটক চালিয়ে চলেছেন ক্রমাগত। অরিজিতের নিস্তব্ধতায় ক্রমাগত চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছিল মৌয়ের। অরিজিতের শেষ কথাটা শুনে মৌ সোজা ঘরে চলে যায়। সেদিন অরিজিৎ আর মৌ এর পেছনে পেছন ঘরে ঢোকেনি। কিছুক্ষণ পরে সুটকেস নিয়ে বেরিয়ে আসে লিভিং রুমে। অরিজিৎকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আমি বাড়ি যাচ্ছি বাবু, তুমি যদি এর মধ্যে ফ্ল্যাট দেখে উঠতে পারো, যদি মনে হয় আমার সঙ্গে সংসার করা তোমার উচিত, তাহলে ফোন করো। নয়তো এই বাড়িতে আমি আর কোনওদিন ফিরব না।’
মৌকে আটকানো তো দূর এই কথায় অসীমা আরও খানিকটা গলা তুলে বলতে শুরু করলেন, ‘কী অলক্ষ্মী নিয়ে এসেছি বাড়িতে। একেই তো ছেলেটাকে আমাদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। এতোটুকু লজ্জা নেই। তার মধ্যে এই ভর সন্ধ্যেবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে একাই। ছি ছি। লোক জানা জানি হলে কী কাণ্ডটাইনা হবে।’
মৌয়ের এই কাজকর্ম দেখে অরিজিতের মাথা আর কাজ করল না। মৌকে আটকানো তো দূর উলটে অরিজিৎ নিজেই মৌয়ের আগে ঘর থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল কোথায়। ফিরে এসে দেখল সত্যিই ঘরে মৌ নেই। অসীমাকে জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারল,
‘সে কী আর বলব রে বাবু, কী ডাকাত মেয়ে। ভয় ডর কিচ্ছু নেই। তুই বেরোলি তারপর সেও, তরতর করে বেরিয়ে গেল। তোর বাবাকে প্রণাম পর্যন্ত করল না। তোকে একটা কথা বলছি বাবু—- ও মেয়েকে আর ফিরিয়ে আনার দরকার নেই। তোর জীবন থেকে গেলে তুই বাঁচবি। আমি আবার তোর একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দেব।’
লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে অরিজিৎ চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। অসীমার শেষ কথাগুলোতে অরিজিৎ এর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। কিন্তু তার প্রকাশ কীভাবে করতে হয় তা অরিজিৎ জানেনা। এখন একমাত্র উপায় এই ঘর ছেড়ে বউ নিয়ে আলাদা থাকা। তবেই সংসার খানা বাঁচবে। কিন্তু নিজের সংসার বাঁচাতে গিয়ে দুটো অসুস্থ মানুষকে কোথায় একা ফেলে যাবে অরিজিৎ। সামনে আবার এত বড় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ভবিষ্যতে কী আছে কে জানে। বাবা তাও যেটুকু পেনশন পায়, তাতে করে দুটো ডাল ভাত জুটে যাবে ঠিকই, কিন্তু একটা জোয়ান ছেলে হয়ে বাবার টাকায় বসে বসে খাওয়ার মতো মানসিকতা অরিজিতের নেই। বাবা হার্টের পেসেন্ট, মায়েরও নানান রোগ। ওদেরকে একা ফেলে চলে যাওয়ার কথা অরিজিৎ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। ভেবেছিল মৌকে পরে ফোন করে রাজি করিয়ে নেবে। কিন্তু সেটা আর হল না। এবার আর মৌ কোনও কথাই মানতে রাজি নয়। সে নিজের পয়েন্টে স্টিক করে আছে। প্রথমবার ফোনটা মৌ ধরেছিল। ধরেই জিজ্ঞাসা করেছিল ফ্ল্যাট দেখা হয়েছে কিনা। যখনই বুঝেছে অরিজিৎ আবার তাকে ভোলানোর চেষ্টা করছে, ফোনটা কেটে দিয়ে আর ফোন ধরেনি মৌ। তবে কি চাকরির সঙ্গে সঙ্গে এই বিয়ের সম্পর্কটাও শেষ হওয়ার মুখে! শরীরটা কেমন ছেড়ে দিচ্ছে অরিজিতের। দুবছরে অনেক সমস্যা তৈরি হলেও সঙ্গে তো ছিল দুজন। কী করে এত সহজে একটা সম্পর্ক একটা মানুষ মিথ্যে হয়ে যায়। মৌকেই বা পুরো দোষ দেয় কী করে। কখনও তো ওকে এসব সইতে হয়নি আগে। বাবার ঘরে আদরে বড় হয়েছে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এ বাড়িতে এসেছিল। কোনটাই তো পূরণ করতে পারল না অরিজিত। চেয়েছিল সিরিয়ালের অডিশন দেবে। অরিজিত অসীমাকে বলেই উঠতে পারেনি। দুজনে আলাদা বসে দুটো কথা বলবে বাইরে যাবে তাতেও অসীমা যেভাবে সিন ক্রিয়েট করত, বলার নয়। অরিজিৎ এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে বিয়ে করাটাই ওর উচিত হয়নি। ভবিষ্যত ওর জন্য যে কী নিয়ে আসছে তার আন্দাজ করলেও ভয়ে কুঁকড়ে উঠছে অরিজিত।

(৭)
‘ও ডিভোর্স চাইছে জানো। আর পারলাম না।’
অরিজিৎ কথাটা বলল পাশে বসা চন্দ্রকে। দুপাশের জানলা দিয়ে হুড়হুড়িয়ে হাওয়া ঢুকছে। চোয়ালে এসে লাগলে অরিজিতের। শীতকালে একদিকে ভালো চোখ ছলছল করলে বলা যায় ঠাণ্ডা হাওয়। চন্দ্র বলল,
‘ওই জন্য আজ একটু অন্যমনস্ক। আর কী করবে ভাই এই তো জীবন। তুমি যেখানে মা বাবাকেই বেছে নিলে…’
‘তোমরা কি নিয়ে এত ফিসফাস করছ? কোনও গোপন কথা নাকি?’ কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠল সুমিত। চন্দ্র কথাটা হালকা করার জন্য বলল,
‘ধুর কী যে বলো! সামনে বড়োদিনের ছুটি। কোথাও গেলে হয় না?’
‘এটা ভালো প্রস্তাব! কী বলো অংশু?’
সুমিতের কথায় খানিকটা চমকে অংশু উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ ভালোই হবে।’
আসলে অংশুর মনটা একদম ভালো নেই আজ। গতকাল রাতে ঋদ্ধির সঙ্গে বড় অশান্তি হয়ে গেছে। এমন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা যা অংশু কোনওদিন ভাবতেও পারে না। নিজের ফোনে চার্জ না থাকায় ঋদ্ধির ফোন থেকে নিজের বাড়িতে মাকে ফোন করে অংশু। ফোনটা রাখার মুখে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ ঢোকে ফোনে। তাতে শুধু লেখা ছিল, ‘সকাল ১১.৩০’। ঋদ্ধিকে বিষয়টা জানাতে ও পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করে গেল। উলটে ঋদ্ধির ফোনটা নেওয়ার জন্য অংশুকে যা নয় তাই অপমান করল। ফোন একটা পার্সোনাল জিনিস তা ঠিকই কিন্তু অংশুর ধারণার বাইরে যে ঋদ্ধি আর ওর মধ্যে কিছু গোপনীয় থাকতে পারে। অংশু এসব প্রাইভেসি স্পেস-টেস বোঝেনা। ও শুধু জানে বিয়ে হয়েছে মানে দুজন দুজনের সবকিছু ভাগাভাগি করে নেবে। তার মধ্যে এসব কথার কোন দাম নেই। এমন কী গোপনীয়তা থাকতে পারে যার জন্য ঋদ্ধি এতটা রেগে গেল সেটাই অংশুর মাথায় ঢুকছে না। ঋদ্ধি শুধু বলে অংশু নাকি ভীষণ সন্দেহ প্রবণ। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসা, অধিকারবোধ জন্মানো এগুলো অংশুর কাছে সন্দেহ প্রবণতার মধ্যে পড়ে না। অংশু সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু বুঝতে পারেনা। ঋদ্ধির সমস্যাটা এখানেই। কাল অশান্তির জেরে এমন কিছু কথা ঋদ্ধি অংশুকে বলেছে যা অংশুকে নতুনভাবে সবকিছু নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। এতদিন ও ভাবত ওদের মধ্যে হয়তো তেমন কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ঋদ্ধির মনে অংশুর বিপরীতে এত অভিযোগ জমা হয়ে আছে গতকাল রাতে বিস্ফোরণের সময় সেসব লাভা গড়িয়ে এসেছে বন্ধ ঘরের সর্বত্র। ঋদ্ধির মতে অংশু খানিক কুয়োর ব্যাঙের মতো। ঋদ্ধিকে আটকে রেখে যে মানসিক শান্তি পায় তার পেছনে তার সন্দেহপ্রবণতাই প্রধান। ঋদ্ধির দম আটকে আসে। ঋদ্ধির মনে এত কিছু জমে ছিল অথচ এত বছরে অংশু কিচ্ছুটি টের পায়নি, এটাই সবথেকে অদ্ভুত। তা হলে কি বন্ধুত্বটাই নেই ওদের ভেতর! এখন তো তাই মনে হচ্ছে। তা হলে কেন ঋদ্ধির মনে কী চলছে অংশু টেরই পায়নি এত বছর। কিন্তু তবুও শুধু ফোন নিয়েছে বলে এতটা আউটব্রাস্ট কেন হল সেটা এখনও বোধগম্য হচ্ছে না। আর মেসেজটাই বা কার! ট্রুকলারে নাম্বারটা খুঁজে পেয়েছে অংশু। জনৈক মৃন্ময় বলে এক ব্যক্তির। কিন্তু সে কে! সবকিছু কেমন গুলিয়ে আছে। ট্রেনের শব্দ, মানুষের ভিড়ের মাঝে চিন্তাগুলো এমন ভাসা ভাসা ঘোরের ভেতর মাথার চারদিকে মেঘের মতো ঘিরে আছে, অংশুর কানে যেন আর কিছুই ঢুকছে না। সুমিত দুবার ডাকার পর খানিক নড়ে চড়ে বসল অংশু। কিছু না শুনলেও বলল, ‘যা আপনারা ভালো মনে করেন করুন।’
‘আরে কিছু হয়েছে নাকি অংশু?’
‘কই না তো!’ মুচকি হেসে মুখ নামিয়ে নিল অংশু। মনটা আজ অতিরিক্ত বিষণ্ন। কী হল কেন হল বোঝার বাইরে। শুধু ভাবাচ্ছে ওই একটা মেসেজ আর ওই নাম, মৃন্ময়। নামটা কি কোথাও শুনেছে অংশু! কিছুতেই মনে পড়ছে না এখন।
চন্দ্র মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তা হলে আমাদের মায়াপুরের প্ল্যানটা নিয়ে এগোই?’
‘কটা দিন যাক চন্দ্রদা। সামনে তো কোর্টের রায়। চাকরিটা থাকবে কি না তাও তো জানিনা। তার ওপর….মনে হচ্ছে ভেসে চলেছি দিশাহীন নদীজলে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো শেষ করল অরিজিৎ।
‘আজ মেঘদূত আসেনি। কী হল ওর?’ প্রশ্ন করলেন চন্দ্র আলোচনা কিছুটা অন্যদিকে ঘোরাতে।
সুমিত বলল, ‘ওর ছেলেটার শরীর ভালো নয়। বাড়ি গেছে। আর শুনেছেন তো, ওর ট্রান্সফার হয়ে যাবে উত্তরবঙ্গে— এই তো পরের মাসেই।’
‘যা, মনটা খারাপ হয়ে গেল। বড্ড মাতিয়ে রাখে ছেলেটা। আসলে একসঙ্গে এই ট্রেনে যাতায়াত করতে করতে কেমন যেন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপর হঠাৎ কোনওদিন হয়তো তার সঙ্গে আর দেখা হয় না। অন্য কোথাও চলে যায় তারা। এটাই খারাপ লাগে।’
‘আর কী! এই তো জীবন কালিদা।’
তখনই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল হিমাংশুদা। বহুদিন এই ট্রেনে চা বিক্রি করছে। অংশুকে দেখে বলল, ‘মাস্টার মশাই চা টা ধরুন, বলছি একটা কথা ছিল!’
অংশুসহ আরও বাকিরা এক এক করে চা নিতে শুরু করল। হিমাংশু বলে চলল, ‘বলছি ছেলেটার বিয়ে দেব ভাবছি। আপনি একটু বৌদির সেই ডাক্তার বান্ধবীকে বলবেন যে বিয়ে করাটা এখন ঠিক কিনা!’
অংশু বলল, ‘আচ্ছা বলে দেখব, কিন্তু তোমার ছেলে কি এখন পুরোপুরি সুস্থ?’
‘সেটাই তো একবার জিজ্ঞেস করতাম…আপনি যদি বৌদিকে একটু বলেন!’
অংশু শুধু মাথা নাড়ল হালকা করে আর কিছু উত্তর দিল না। হিমাংশু চলে যাওয়ার পর সুমিত বলল, ‘ওর ছেলের তো ক্যান্সার ছিল শুনেছিলাম। তাই না?’
অংশু বলল, ‘হ্যাঁ। টেস্টিকুলার ক্যান্সার। ঋদ্ধির এক বান্ধবীকেই দেখাচ্ছিল। তাই ঋদ্ধিকে বলেছিল, সবকিছু খরচাপাতি মিলিয়ে যতটা হেল্প করা যায় আর কী, সে বিষয়ে কথা বলতে। ঋদ্ধি ওর মতো করে সাহায্য করেছে। এখন যে আবদারটা নিয়ে এল, সেটাতে কতটা সাহায্য করবে আমি জানি না।’
‘সত্যিই এদের সংসারে এসব রাজ রোগ হলে, শুধু এদের নয়, আমাদের মতো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারেও, কী যে অবস্থা হয়! ঘটি বাটি বেচে দেওয়ার মতো হাল!’
‘আচ্ছা সাহেবের ওদিকটা কতদূর এগুলো?’
‘কিছু প্রেম ট্রেনেই শুরু হয়ে ট্রেনেই শেষ হয়ে যায়। সাহেব আর ওই যে ম্যাডাম পাশাপাশি বসত, তিন বছর ধরে চলল, এখন দুজনে দু’জায়গায় বিয়ে করছে।’
‘ভালো’
‘আমি শুধু ভাবি একে অপরকে ফেস করে কী করে। আজও দেখা হল কী সুন্দর দুজনে হাসতে হাসতে পাশের বগিতে উঠল।’
‘কেন জাবেদ স্যারেরটা ভাবো। একই দলে যাচ্ছে সুরাইয়া আর নন্দিনী। জাবেদ স্যার সেই নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়ার সময় সুরাইয়া যে ওকে দেখতে গেছিল, সেটা ওনার ওয়াইফ জানতে পেরে যায়। তারপর থেকে সম্পর্কটা শেষ। এখন তো নন্দিনী ম্যাডামের সঙ্গে বেশ মাখোমাখো। অথচ সুরাইয়া আর নন্দিনী কী অবলীলায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। জাবেদ স্যারও ওই একই বগিতে যায়। এসব সম্পর্কের জটিলতা আবার আমার মাথায় ঢোকে না। সেই বলে না— “তোমার কি মন নাই কুসুম?”’
কথা বলছে ঠিকই কিন্তু কোথাও মাথার ভেতর নামটা বারবার ঘুরে ঘুরে আসছে। ঋদ্ধির এই রূপ অংশুর কাছে নতুন। এত সহজে সবটা ভুলতে পারবে না। তাহলে কি ওরাও মুখোশ পরে আছে এতগুলো বছর বাকি সকলের মতো?
******* ********** ********* ******** ******** *******
স্টেশনে নেমে অংশু সাইকেলটা নিতে যাবে তখনই যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। মৃন্ময় নামটা শুনেছিল ঋদ্ধির মুখেই। হিয়ার স্কুলের কোনও বন্ধুর পেরেন্ট। কিন্তু সে ঋদ্ধিকে এমন একটা মেসেজ করবে কেন! সব ঘেঁটে যাচ্ছে অংশুর। তবে কি ঋদ্ধি কোনও গোপন সম্পর্কে জড়িয়েছে। শরীরটা কেমন ছেড়ে দিচ্ছে অংশুর। কোনওমতে স্কুল পৌঁছতেই হবে। শীতের কুয়াশা এসে ঢেকে দিচ্ছে অংশুর চোখ। শ্বাস রুদ্ধ করছে সম্পর্কের ধুলোবালি৷ এসব কি ভাবছ অংশু! তবে কি সবটাই মিথ্যে?

(৮)
বেল বাজতেই দরজা খুলে দিল ঋদ্ধি। গায়ে কালো শিফনের পোশাক। কী অদ্ভুত মহময়ী লাগছে ঋদ্ধিকে। কিন্তু যে অচেনা আগন্তুক দরজা পেরিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল তার মুখ ভীষণ অস্পষ্ট! কী অপূর্ব করে সাজিয়ে রেখেছে ঘরদোর। টেবিলে সাজানো খাবার৷ ঋদ্ধির পালকের মতন শরীরটাকে দুহাতে তুলে বিছানায় রাখল সে। স্বর্ণচাঁপা গায়ের রং, ঘর আলো করে আছে। কিন্তু তারপর আর যা সব ঘটছে, দরদর করে ঘামছে অংশু। অংশু চিৎকার করতে চাইছে কিন্তু কোনও শব্দ বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ঋদ্ধির গায়ের ওপর উপুর হয়ে শুয়ে থাকা শরীরটাকে দুহাতে ঠেলে সরিয়ে দেয় কিন্তু কিছুতেই এক পাও এগোতে পারছে না অংশু। কেউ যেন পেছন থেকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে শ্বাসরোধ করতে চাইছে অংশুর। চোখ ক্রমশ ঠিকরে বের হয়ে আসছে। আর এত যন্ত্রণা নিতে পারছে না অংশু। কী ভীষণ কষ্ট। ছটফট করতে করতে হাতটা গিয়ে লাগল চেয়ারের হাতলে। চমকে উঠল অংশু। এত ঠান্ডাতেও জ্যাকেটের ভেতর রীতিমতো ঘেমে উঠেছে শরীর। ইকবাল স্যার ডাকছেন পরের ক্লাসের জন্য। স্কুলে আসার সময় থেকেই শরীরটা এত খারাপ লাগছিল, কখন যে চেয়ারে বসে চোখ লেগে গেছে অংশু টের পায়নি। কিন্তু কেন এমন স্বপ্ন দেখল অংশু! তবে কি ঋদ্ধিই ঠিক বলে, অংশুই সন্দেহপ্রবন! সারাক্ষণ চারদিকে এত রকমের সম্পর্ক চোখে পড়ে নিজের অজান্তেই যেন সে সব ছায়ায় ভরে উঠছে অংশুর মন! চোখে জল দিয়ে ক্লাস করতে গেল অংশু। একটা ক্লাস টেস্ট নেওয়ার কথা। মনে যাই চলুক এবার সেদিকে মন দিতে হবে। বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বরং ঋদ্ধির সঙ্গে কথা বলা যাবে।
ক্লাস শেষ করে বেরিয়েই ফোনের নেটটা অন করল অংশু। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজগুলো পর পর ঢুকতে শুরু করেছে। ঋদ্ধির মেসেজ চোখে পড়তেই ওপেন করল অংশু। ছোট্ট একটা শব্দ। সরি লিখে পাঠিয়েছে। সম্পর্কে এটুকুই যে কতবড় প্রাপ্তি অংশু জানে। ঋদ্ধি তার পরের মেসেজে লিখেছে, বাড়ি এসো বলব। কদিন থেকে ডিপ্রেসড ছিলাম। তবুও তোমাকে ওভাবে বলা ঠিক হয়নি।
মনটা অনেক হালকা লাগছে অংশুর। চারপাশে যা ঘটে সেটাই সবসময় সত্যি নয়। তারও ওপরে অনেককিছু থাকে। কিছু ভালোবাসা, সম্পর্ক খাঁটিও হয়, অপেক্ষারও হয়। ছুটির সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতেও মনটা উতলা হচ্ছে অংশুর। মাঝে আর কথা হয়নি। শুধু ঋদ্ধির কোমল মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। ঋদ্ধি জানে অংশুর কতটা কষ্ট হয় সারাদিনের জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে দরজায় ঋদ্ধি না থাকলে। তাই তো অংশুর মনের সন্দেহকে মিথ্যে করে দিয়ে ঋদ্ধি নিজে থেকে মেসেজ করেছে। অংশু স্পষ্ট বুঝতে পারছে একটা তৃপ্তির অদৃশ্য তরঙ্গ সারা শরীরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ওর।
**** ***** ******* ******* ******* ******* ***** *****
মৃন্ময়ের ফোন থেকে ঋদ্ধির ফোনে মেসেজটা ভুলবশত আসে। ঋদ্ধির নাম্বার যদিও ভদ্রলোকের কাছে সেভ নেই। কিন্তু তার এক পরিচিতের নাম্বার আর ঋদ্ধির মোবাইল নাম্বার খুব কাছাকাছি। দুটো ডিজিট পরস্পর বদলে গিয়েই এই বিভ্রাট। অংশুর ওভার পজেসিভনেস অনেক সময়ে ঋদ্ধির বিরক্তির কারণ হয়েছে আগে। সেই পূর্ব অভিজ্ঞতার তিক্ততায় ঝড়ের পূর্বাভাসের ইঙ্গিত পেয়েছিল ঋদ্ধি সেদিন। তারওপর কিছুদিন ধরে নিজের কাজ নিয়েও নানান সমস্যায় ছিল। অনেক জায়গায় পেমেন্ট আটকে। মেয়েলি হরমোনাল ইস্যুস তো আছেই। অনেকদিন ধরে গাইনো দেখাবে মনে করেও হচ্ছে না। সব মিলিয়ে একটা বিস্ফোরণ ঘটেছিল আর কী! অংশু ফেরার পথে তাই সেদিন চন্দ্রকে দিলখুস আনতে বলেছিল। ঋদ্ধি খুব ভালোবাসে। চন্দ্রর স্কুলের পাশের দোকানে খুব ভালো দিলখুস পাওয়া যায়। চন্দ্র জিনিসটা অংশুর হাতে তুলে দিতে দিতে বলেছিল, ‘কীই! বউ রাগ করেছে বুঝি!’
অংশু কোন কথার উত্তর দেয়নি। চুপ করে হেসেছিল শুধু। মাঝে মাঝে মনে হয় ট্রেনে আলাপ হওয়া এই মানুষগুলো যেন ওর নিজের। কী করে ওরা যে অংশুর মুখ দেখে বুঝা যায় সবটা। অথচ ব্যক্তিগত স্তরে তেমন কোন কথাবার্তা আদান-প্রদান হয় না। বেশিরভাগটাই বাহ্যিক। তবুও সেই রূঢ় বাহ্যের ফাঁকফোঁকর দিয়ে ঠান্ডা হওয়ার মতো করে, জলের মতো করে এই মানুষগুলোর আন্তরিকতা মনের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কখনও অভিভাবক তো কখনো বন্ধু। এই ট্রৈনিক জীবনটা না থাকলে অনেক কিছু অদেখা হয়ে যেত। অজানা রয়ে যেত। সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবহীন নিজের শহর থেকে দূরে নতুন করে অন্য একটা শহরে এসে নিজের পরিচিতি তৈরি করা এতটাও সহজ নয়। চলার পথে কুড়িয়ে পাওয়া এই সম্পর্কগুলো সেখানে এক একটা রত্ন। অংশুর কাছে ভীষণ মূল্যবান। ওদের মতো অংশু সবসময় তাই চেষ্টা করে যতটা সম্ভব ওদের পাশে থাকার। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অংশু বলল,
‘ঘোষদার ছেলের বিয়েতে যাচ্ছো তো?’
‘আমার তো ড্রেস-ট্রেস সব রেডি। শুনলাম তো অনেককিছু করবে। ১২০০ টাকা পার প্লেট।’ সুমিত বলল।
‘আসলে মেয়ের বাবার বড় ব্যবসা। একমাত্র মেয়ে। লাভ ম্যারেজ। আর কী! ঘোষদার ছেলের কপাল খুলে গেল। ওরা তো জয়েন্টলি পুরোটা একই দিনে করছে। রেজিস্ট্রি সকালে, রাতে বড় করে খাওয়াদাওয়া।’ চন্দ্র বলল।
‘এটাই ভালো, জানো চন্দ্রদা। আমাদের বিয়ের সময় ঋদ্ধিও বলেছিল, বিয়ের জন্য লোন না নিয়ে ওই টাকায় নিজের ফ্ল্যাট নিতে। আর রেজিস্ট্রি করতে, দুজনে একসঙ্গে জয়েন্টে লোক খাইয়ে দিতে। কিন্তু ধরো আজ থেকে বারো বছর আগে, আমি তখন রাজি হইনি। বোঝোই তো আমাদের গ্রামের বাড়ি। ওখানে এসব চলে না, বুঝবে না। কি অসুবিধায় যে বিয়ে করেছিলাম। সে সব দিন মনে পড়লে ঋদ্ধি আর আমি এখনও অবাক হয়ে যাই।’ কথাগুলো বলে কেমন ভাবুক হয়ে গেল অংশু।
‘সবার জীবনেই কম বেশি এরকম একটা ফেজ আসে। কিন্তু জানো তো এই যে দুজন দুজনের অসময়ে পাশে থাকা, এটার মধ্যে একটা আলাদা মজা আছে। সবটা নিজের হাতে করা। আমি জানি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা শরণার্থী হয়ে প্রথম এদেশে আসি। তখন এই মধ্যমগ্রামে এক মাসির বাড়িতে শেলটার নিয়েছিলাম। আবার আমার এক মামা সেই মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। দেশটার এই অবস্থা দেখলে মনটা কেমন উপভোগ করে। শূন্য থেকে সবটা শুরু করেছি আমরা। মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মায়নি। নীলিমা প্রথম থেকে আমার সবটা দেখেছে। এই যে আজ ওর এত শরীর খারাপ, আমি ওকে বুঝতে দিই না আমি কতটা চিন্তার মধ্যে আছি, তবুও কিভাবে যেন সবটা টের পেয়ে যায়। আজকাল মেয়েদের বিয়ের কথা ভাবলেও কেমন ভয় করে। কোন বাড়িতে গিয়ে পড়বে— মানিয়ে নিতে পারবে কিনা! চারদিকে যা ডিভোর্স!’ কথাটা বলেই থমকে গেলেন চন্দ্র। পাশে তাকিয়ে দেখে অরিজিৎ ওর দিকে দেখছে। চন্দ্র আর কিছু বলতে পারল না।
অরিজিৎ বলল, ‘আমরা সবাই বরং প্রার্থনা করি যেন ওদের জীবন সুখের হয়।’
‘সে তো বটেই। ঘোষদার ছেলেও ভালো চাকরি করে। আজকের দিনে দুজনের চাকরি করাটা খুব জরুরি। মেয়েদের ফিন্যান্সিয়ালি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হওয়াটা এখন প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে। যা দিনকাল কখন কার সঙ্গে কী ঘটে যায় কেউ জানে না।’ সুমিত বলল।
আলোচনাগুলো শুনলে অরিজিতের মনটা আরও ভার হয়ে যায়। মৌকে ছাড়া বাড়ি ঢুকতে ও ইচ্ছা করে না। কিন্তু মা-বাবাকে ছেড়ে আলাদা হওয়ার মতন সিদ্ধান্ত অরিজিৎ নিতে পারবে না। তাই ঠিক করেছে মনে মনে ডিভোর্সের পর আর কখনো বিয়ে করবে না। এভাবে একটা মেয়েকে বাড়িতে এনে তার জীবনটা অর্থহীন করে দেবার কোন অধিকার নেই। হিমাংশু এসেছিল একটু আগে চা নিয়ে। মাটির ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে চোখ বন্ধ করল অরিজিৎ। বহুদিন ঘুম আসে না। চোখে যেন অসহ্য যন্ত্রণা করে। মাথার ওপর দুটো খাড়া ঝুলছে মনে হয়। এখন প্রভুই জানে কীভাবে এর থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে। তবে মন বলছে একটা মিটলে, আর একটাও মিটে যাবে। ভাঁড়টা জালনার ফাঁক দিয়ে লাইনের ওপর ছুঁড়ে ফেললো অরিজিৎ। টুকরো হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে গেল চারদিকে। পরিষ্কার শব্দ পেয়েছে অরিজিৎ। দেখার আগেই ট্রেনটা হু হু করে বেরিয়ে গেল। ওর নিজের জীবনটার মতো। পদে পদে ভাঙ্গনের শব্দ আসছে কানে তবুও একেকটা দিন পার হয়ে যাচ্ছে হু হু করে।
একটা ফোন আসার পর থেকে চন্দ্র বেশ চুপ করে আছে। অংশু জিজ্ঞেস করায় বলল, ‘নীলিমার শরীরটা খারাপ করেছে আবার। মেয়ে ফোন করেছিল। আসলে ওদের এখনও কোনও খবর পায়নি তো। আশা নেই মনে হয়।’
অরিজিত বলল, ‘এসব ওপেনলি আলোচনা করো না। সবাই গুম হয়ে আছে। কখন কী হয় কেউ বলতে পারে!’
বেশ উত্তেজিত হয়ে চন্দ্র বলল, ‘এরা কি নিজেরা নিজেদের ভাল বোঝে না? ‘বাংলাদেশেে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক, বিরোধী দল–সরকার দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে মানছি। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আসলে এত অসন্তোষ বাড়তে বাড়তে আজ এই অবস্থা। কিন্তু এতে তো আখেরে ক্ষতি ওদেরই।’
‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সূত্রে গভীরভাবে জড়িয়ে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ত্যাগ আর সহযোগিতার কথাও ওরা এখন অস্বীকার করছে। কিন্তু ওরা কি বুঝতে পারছে না যে ক্রমাগত এই ভারত বিরোধিতা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে?’ বলল অংশুমান।
‘আরে অতীতটা ভুললে কী চলবে! ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। সেই সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি শীতল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সেই সরকারের আমলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের মাটিতে সক্রিয়ভাবে আশ্রয় ও কার্যকলাপের সুযোগ পেয়েছিল বলে ভারতে অভিযোগ করেছিল। সেই সময় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের ঘটনাও ভারতের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের সাথে সম্পর্ক ছিল বেশ ভাল, বন্ধুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা সীমান্তবর্তী সমস্যা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব একটা সমাধানের পথ দেখে। ভারতের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু। ২০২৪ এও বাংলাদেশ নানা দিক থেকে লাভবান হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে সেটা জেনেও ওদের হুঁশ নেই। শুধু বাণিজ্য তো নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নির্ভরতার কথা বাদ দিলে হবে! বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া থেকে তেল পরিশোধিত হয়ে বাংলাদেশে যায়। যদি ভারত বিরোধিতার কারণে এই সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে?’ বলল চন্দ্র।
‘কী বলো তো, সম্পর্ক খারাপ হলে তার প্রভাব দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনেই পড়বে।
এই যে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত করার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তাতে ক্ষতি আাখেরে কাদের? পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের মাটিকে ভারত-বিরোধী জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) মতো গোষ্ঠীগুলো আইএসআইয়ের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাচ্ছে এবং তাদের আল-কায়েদা ও জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সাথে জোট বাঁধানোর চেষ্টা করছে।’ বলল অংশুমান।
সুমিত বলল, ‘আরে ২০০১-২০০৬ সালেও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়েও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে সক্রিয় ছিল, যার সুযোগ নিয়েছিল পাকিস্তান । সেই ইতিহাস রিপিট হলে মারাত্মক বিপদ! কত মানুষ যে মরছে। সব কি আর মিডিয়ায় উঠে আসে? আমরা তো সাধারণ মানুষ, গেলে তো সবার আগে এদেরই যায়। বাংলাদেশকে আগের ইতিহাস দেখে বুঝতে হবে এরা অস্থির প্রতিবেশী হিসেবে থাকতে চায় নাকি বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পথ বেছে নেবে।’
কথা শেষ হতেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল তিনজন মহিলা। হাতে একটি কাগজ। ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা সই নিচ্ছি কর্মস্থলে ধর্ষিত হয়ে খুন হওয়া মেয়েটির জন্য। দুটো বছর তো হতে চলল, কোনও শাস্তি হল না। আমরা আবার রাতজাগা মিছিল করব আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। মেয়েটির মা বাবাও থাকবেন। আপনারা সই দিতে ইচ্ছুক?’
বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল অংশুর। হিয়ার মুখটা মনে পড়ে যায় যখনই এমন কোনও বীভৎস ঘটনা ঘটে রাজ্যে বা দেশে কোথাও। কোথায় গেলে যে নিরাপত্তা দিতে পারবে বুঝতে পারে না। অংশু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই সুমিত বলল, ‘আমরা এখানে বেশিরভাগই সরকারি কর্মচারি। সরকারের তরফ থেকে প্রতিবাদ মিছিলে আমরা গেছি। কিন্তু আপনারা তো দেখছি বিপরীতমুখী কিছু কথা লিখেছেন। এসবের সত্যতা বিচার হোক তারপর না হয় সই করব।’
ভদ্রমহিলা তিনজন চলে যেতেই সুমিত বলল, ‘ভাল লোকের সামনেই কাগজ ধরিয়েছে। অংশু আর একটু হলেই সই করতে যাচ্ছিল।’
অংশু মুখ নিচু করে বলল, ‘ওরা তো এনজিও থেকে…’
‘তুমি আর কথা বলিও না তো…চুপ করো।’
মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল অংশুর। কোথায় আছে, কী করছে, দিশাহীন এই জগত সংসারে নিরাপত্তাটুকু অনিশ্চিত। চতুর্দিকে মানুষ ভুলে আছে নানারকম অদ্ভুত কার্যকলাপে। মিডিয়া হাউজগুলো পর্যন্ত পেইড। প্রয়োজনীয় খবরের বদলে এমন সব খবর ছাপে যা আজকের পরিস্থিতিতে আই ওয়াশই বলা যায়। অথচ সাধারণ মানুষ বোকা হতে হতে ভুলে গেছে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল। হাত পাতলেই টাকা ঢুকছে ব্যাঙ্কে। কাজ করার প্রবণতা শেষ। এক দল হাজার টাকা দেয় তো অন্য দল বলে আমরা ক্ষমতায় এলে আরও দু হাজার বেশি দেব। কেউ সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। কেউ ভাবে না ভিক্ষা নয় প্রকৃত কর্মসংস্থান চাই। স্কুলগুলোয় ছাত্রছাত্রী সংখ্যা দেখলে কান্না পায়। অথচ কারও কিছু করার নেই। অরিজিত বলল, ‘ও অংশুদা, চুপ করে গেলে যে! ছাড়ো, এসব তো চলতেই থাকবে। এই নিয়েই চলতে হবে। তুমি বরং সুমিতদার নলেন গুড়ের রসগোল্লায় কনসেনট্রেট করো।’
রসগোল্লায় রস চিপে মুখে ভরতে ভরতে অংশুর মনে হল মৃত মেয়েটিকেও এভাবেই গলা টিপে চোখ থেকে রক্ত বের করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর খাবার মনে করে না জানি কতজন খাবলে খুবলে খেয়ে অবশিষ্ট অংশ দান করে দিয়ে গেছে একটা স্কেপগোটকে। অংশু চোখ বন্ধ করল। দাঁতে পিষে চলেছে নরম ছানার শরীর, তারপর একসময় মুখের ভেতর মিলিয়ে গেল সবকটা দানা, আর কোনও চিহ্ন নেই খাবারের।

(৯)
হিমাংশু দাস
ভোরের আলো ফোটার আগে বিছানা ছাড়ল হিমাংশু। বয়স যত বাড়ছে আর যেন শরীর বয় না। কাকলির শরীরের দিকে তাকালে কেমন ভেতরটা হু হু করে হিমাংশুর। বুকের পাঁজরগুলো দিন দিন ওর ফাঁকা ভাঁড়ারের মতোই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জমানো টাকা পুরো তলানিতে। ছেলেটার এমন মারণরোগ ধরল— কী করলে যে কী হবে, মাঝে মাঝে মাথা কাজ করে না হিমাংশুর। কাকলির শরীরটা কদিন যাবৎ ভাল যাচ্ছে না। কিন্তু ছেলের জন্য এতটা খরচ, সে আর নিজের চিকিৎসার কথা আর ভাবে না। হিমাংশু বললেও কান দেয় না। ঘুম চোখে কাকলির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে হিমাংশু। হালকা হওয়া ঢুকছে একচিলতে জানলা দিয়ে। কাকলির গায়ের চাদরটা ঠিক করে গ্যাসে চায়ের জল চাপাল হিমাংশু। দুবছর হল গ্যাসটা নিয়েছে। কাকলির জেদের জন্যই হয়েছে একরকম। উনুনের ধোঁয়ায় ওর কাশি বেড়ে গেছিল চরম। নটা পাঁচের হাসানাবাদ লোকালটা ধরে হিমাংশু। তার আগে লোকাল দুটো দোকানেও চা সাপ্লাই দেয় বড় ফ্লাক্সের এক ফ্লাক্স করে। এ চত্বরে হিমাংশুদার স্পেশাল দুধ দিয়ে আদা চা, আর আদা গোলমরিচ দেওয়া লিকার চায়ের বেশ নাম আছে। স্কুল অফিস টাইমে হাসানাবাদ লোকালে তিল ধারনের জায়গা থাকে না। সিঙ্গল লাইন বলে চাপটা আরও বেশি। কত চেনা অচেনা মানুষের একত্র কন্ঠস্বর, কোলাহল, বিরক্তি, হৈ হল্লা সব কিছুকে ছাপিয়েও ঠাসাঠাসি ভিড়ের মাঝে চেনা মানুষগুলোর অপেক্ষা হিমাংশু দাসকে পরিচিতি দিয়েছে ভালবাসা দিয়েছে এই ট্রেনে। চরম ভিড়ের মাঝে একটু ভাঙা গলায় হিমাংশু কামরায় কামরায় নাম ধরে ডেকে খুঁজে নেয় তার অপেক্ষার মানুষগুলোকে।
সেদিন মনটা বড্ড খারাপ ছিল হিমাংশুর। অংশুমান চার কাপ চা দিতে বলেছে, আর হিমাংশু দিয়েছে দু কাপ। হিমাংশুর মুখে লেগে থাকা হাসি আর মাস্টারমশাই ডাকটাই সবার থেকে ওকে আলাদা করে। শরীর মন অভাব অভিযোগ সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় ওটুকু শান্ত হাসিমুখ। কিন্তু সেদিন বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল হিমাংশু। অংশুমান জানতে চেয়েছিল দু তিনবার কিন্তু উত্তর পাওয়া গেল না ওদের হিমাংশুদার কাছে। তারপর কটাদিন হিমাংশুদার আর দেখা পাওয়া গেল না। অংশুমান, চন্দ্র, সুমিত, অরিজিত রোজই প্রায় নানা গাল গল্পের ভেতরেও একবার করে হিমাংশুর নাম বলতে ভোলে না। এমনকি জাবেদ স্যারও স্টেশনে নামার পর দেখা হলে রোজই জেনে নেয় হিমাংশুদা ওদের কামরায় এসেছিল কিনা। কেটে গেল বেশ কিছু দিন। মাস খানেক পর হঠাৎ অংশুদের কামরায় এক চেনা গলার স্বর ভেসে এল দরজার দিক থেকে, ‘মাস্টারমশাইরা এসে গেছি।’
অংশু একরকম লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আরে কতদিন পর, তাড়াতাড়ি এসো এদিকে। চা দাও।’
ভিড় ঠেলে গরম চায়ের ফ্লাস্ক নিয়ে যিনি এগিয়ে এলেন তার চেহারার পরিবর্তন দেখে একরকম চমকে উঠল সকলে। হিমাংশুর বয়স ওই পঞ্চাশ উর্ধ্ব। চেহারা একেবারে হাড় গিলগিলে বলা যায় না। অর্থনৈতিক টানাপড়েন থাকলেও হাসিখুশি স্বভাবের আড়ালে সবটা চাপা পড়ে যায় কেমন। কিন্তু এতদিন পর ওকে দেখে সকলে একটু ঝটকাই খেল। চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। অংশুকে ডেকে হিমাংশু বলল, ‘কী মাস্টারমশাই লিকার চা দিই?’
‘সে তো দেবেন কিন্তু ছিলে কোথায় এতদিন?’
সুমিত বলল, ‘চেহারার এই অবস্থা হয়েছে কেন? কী হয়েছে?’
হিমাংশু তার নিজের স্বভাবসিদ্ধ হাসিটা মুখে বজায় রেখে চায়ের ছোট ছোট কাপগুলো এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘জীবন পরীক্ষা নিচ্ছে! আর কী!’
অরিজিৎ বলল, ‘আরে, তুমিও তো দার্শনিক হয়ে গেলে দেখছি।’
হিমাংশু কোনও কথার উত্তর দিল না। শুধু বলল, ‘আজ থেকে রোজই দুবেলা করে কাজে আসতে হবে। বাড়ির ও দিকটা আমার বউ সামনে নেবে। এই যে এই লোকাল ট্রেনে পাঁচ টাকা, দশ টাকায় চা বেচি এর ওপরেই এখন নির্ভর করছে ছেলেটাকে আদপে বাঁচাতেও পারব কিনা।’
সকলে প্রায় চমকে উঠল হিমাংশুর কথা শুনে। অংশু বলল, ‘দয়া করে পরিষ্কার করে বল কি হয়েছে! আমরা তো কিছু বুঝতে পারছিনা হিমাংশু দা! তোমার ছেলে অসুস্থ?’
‘কী বলে না ইংরেজিতে মনে পড়ছে না, অণ্ডকোষে ক্যান্সার হয়েছে। সমস্যা হচ্ছিল বেশ কমাস ধরে। ডাক্তার দেখালাম, ধরা পড়ল। রোজ সকালে কাজে বের হই ছেলেটার মাথায় হাত রেখে। ভয় হয় বাড়ি ফিরে আর দেখতে পারব কিনা।’
সুমিত বলল, ‘কি বলছ হিমাংশুদা, কোন ডাক্তার দেখাচ্ছ? এখন কেমন আছে!’
‘দেখাচ্ছি কলকাতায়, আর এন টেগরে। ডাক্তার ভাল, মীনাক্ষি কর্মকার। কদিন তো ছেলেকে নিয়ে যা ছোটাছুটি গেল ওই জন্য আর কাজে আসতে পারিনি। তার মধ্যে টাকার জোগাড় করা, কেমো, ওষুধ খরচা, সবই তো আছে। আমার যা আয় হয় তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। গরিবের ঘরে রাজ রোগ হলে যা হয়।’
হিমাংশু চলে যাওয়ার পর সকলে কেমন থম মেরে গেল। শোক দুঃখ রোগ যন্ত্রণা সমাজের উঁচু নীচু, ধনী গরিব এসব দেখে আসে না। জীবন যুদ্ধে লড়তে পারলে তুমি জয়ী, আর না হলে এক হেরে যাবার সৈনিক। উত্তর চব্বিশ পরগনার এক জীর্ণ চালাঘর থেকে উঠে আসা পঞ্চাশোর্ধ এক বাবার দৈনন্দিন লড়াইয়ের গল্পটা এতটাও সহজ নয়। হিমাংশুর ছোট্ট পৃথিবীটাতে এখন নতুন যুক্ত হয়েছে ট্রেনের এই কামরাগুলোর সঙ্গে হসপিটালের করিডোর, লম্বা লাইন, ওষুধ আর কেমোথেরাপি। টেস্টিকুলার ক্যান্সারটা প্রথম স্টেজে ধরা পড়েছে। ডাক্তার বলেছে সেরে যাবে, এটাই একটা বড় আশার আলো। অথচ এই যোদ্ধা মানুষটার মুখে হাসি কিন্তু অমলিন। প্রতিদিন নিজের সঙ্গে ওর ছেলেটাকে বাঁচানোর জন্য এক অসহায় বাবা যে লড়াইটা লড়ছে মুখ বুজে, সেটা বোধহয় শুধু বাবারাই পারে। অর্থমূল্যে এর বিচার হয় না। পিতৃস্নেহ এমন এক অনুভব তা এই জায়গাতে সকল পিতাকে একই শ্রেণিতে দাঁড় করায়। নার্সিংহোম চত্বরে লাইন দিতে দিতে হিমাংশু রোজ দেখে কত মানুষ কত সমস্যা নিয়ে এসেছে, অপেক্ষা করছে। তারা হতাশ হলেও নিরাশ নয়। প্রিয়জনকে বা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার মৃদু আশা তাদের কর্মক্ষমতা যোগায় এই যুদ্ধ জয় করার। মনের জোর অসম্ভব বাড়িয়ে দেয়। এখানে অবশ্য ডাক্তারেরও একটা বড় প্রভাব থাকে। ক্যান্সার এমন এক অসুখ যার সঙ্গে লড়াই করতে গেলে মনের জোর থাকার ভীষণ প্রয়োজন। ভিড়ের মধ্যে হিমাংশুদার চোখ হারিয়ে যায় দরজার বাইরে ছোট্ট আকাশটার দিকে। ছেলের মুখ মনে পড়ে। নতুন করে লড়াই করার ইচ্ছা অদম্য ইচ্ছা জন্মায়। তার পিতৃস্নেহ সব বয়স আর ক্লান্তি পেরিয়ে প্রতিদিন সকালে এই হাসনাবাদ লোকাল ধরার জন্য প্ল্যাটফর্মে এনে দাঁড় করায়। মনের ভেতর কোথাও অদম্য জেদ কাজ করে ছেলেকে কিছুতেই হারতে দেওয়া যাবে না। দরকার পড়লে নিজের রক্ত, কিডনি বিক্রি করে দেবে।
হিমাংশু চলে যাওয়ার পর সেদিন অংশুর ভেতরটা কেমন ছটফট করছিল। কত টাকাই এভাবে চাঁদা তুলে দেওয়া যায়। কতবারই বা দেওয়া যায়। হঠাৎ মনে পড়ল আরএন টেগোরে অনকোলজিস্ট মীনাক্ষি কর্মকার নামটা কোথাও শুনেছে অংশু। মনের ভেতর কথাটা খচখচ করতেই ঋদ্ধিকে ফোন লাগাল অংশু। ফোনটা ধরতেই বলল, ‘হ্যালো ঋদ্ধি, একটা কথা জানার ছিল। বলছি তোমার এক বান্ধবী আর এন টগরে আছে না! কী যেন নাম?’
‘মীনাক্ষি কর্মকার। অনকোলজিস্ট। কেন?’
‘হুম। কিছু না। একটু দরকার হতে পারে। বাড়ি গিয়ে বলব।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। যেমন বলবে।’ কথাটা বলে অল্প হাসল ঋদ্ধি। ‘পৌঁছে গেছ? না, পৌঁছে তো যাবে না, কোন স্টেশনে আছ?’
‘আর পাঁচটা স্টপেজ বাকি!’ ফোনটা রেখে সেভাবে আর কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতে পারল না অংশু। যতক্ষণ না ওর তরফ থেকে একটা কিছু সুবিধা করতে পারছে হিমাংশুর জন্য ততক্ষণ ভেতরের এই ঝড়টা থামবে না। অংশুর স্বভাবটাই তাই। ঋদ্ধি তো মাঝে মাঝে ইয়ার্কি করে বলে ‘কোন দিন দেখব বাড়িতে বউ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আর তুমি লোকের উপকার করতে ছুটেছ!’ অংশু অবশ্য জানে ঋদ্ধি যতই কথাগুলো ইয়ার্কি করে বলুক, অংশুর প্রত্যেকটা কাজের ঋদ্ধির সাপোর্ট না থাকলে কখনও এভাবে এগিয়ে যেতে পারত না অংশু। বরং ভালো কাজে বরাবর পাশে থাকার চেষ্টা করেছে ওর নিজের মতো করে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। মীনাক্ষী কর্মকার ওর স্কুল জীবনের বন্ধু। স্কুলের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দুজনেই আছে এইটুকুই। আলাদা করে দুজনের বহুদিন কোন কথাবার্তা হয়নি। স্কুলে থাকাকালীন ও যে ওদের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল এমনটা নয়। তবুও গ্রুপ থেকে নাম্বারটা দেখে মীনাক্ষীকে মেসেজ করল ঋদ্ধি। মেসেজ দেখে নিজে ফ্রি হয়ে মীনাক্ষী কল করতেই ওর পেসেন্ট হিমাংশু দাসের কথা জানাল ঋদ্ধি। ঋদ্ধি আবার কথা বলার সময় খুব একটা ভনিতা করতে পারে না। যেখানে যেটুকু যা বলার সোজাসাপটা বলে। তাতে হয়তো অনেকের ওকে ভালো লাগে না। মীনাক্ষীকে স্পষ্ট করেই ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল, ‘ওদের কাছে সরকারের একটা হেলথ সাপোর্ট কার্ড আছে। কেমোর খরচ গুলো, টেস্ট বা ওষুধের খরচাগুলো কোনও ভাবে সেটা দেখিয়ে কি কিছু কমানো যাবে?’
মীনাক্ষী বলল, ‘এটা এমন একটা ট্রিটমেন্ট যেখানে কোন হেলথ কার্ড খাটে না। তবে আমি দেখতে পারি, আমি বলে টলে একটু ব্যবস্থা করে দিতে পারি, অন্য এক জায়গায়।’
হিমাংশু পরে অংশুকে জানিয়েছিল, ‘মাস্টার মশাই আপনি আর বৌদি আমাদের অনেক সাহায্য করলেন! ছেলেটা আমার সুস্থ হয়ে উঠছে!’
কথাটা শুনে অংশুর ভেতরে কেমন একটা শান্তি এসেছিল। শুধু হিমাংশুর ক্ষেত্রে নয়, স্কুলেও যেকোন পরিস্থিতিতে যে কোনও জায়গায় অংশু নিজের সাধ্যমত সাহায্য করে মানুষকে। ঋদ্ধির ভয় শুধু একটা জায়গাতেই, যে জায়গায় অংশু চাকরি করে, সেখানকার মানুষের মধ্যে এতটাই কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে, যে ভালো কিছু করতে গেলে আজকাল তারই ক্ষতি হয়। ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অল্প বয়সে নিকা আটকানো থেকে শুরু করে কালচারাল প্রোগ্রামে, হাতের কাজে, সায়েন্স এক্সিবিশনে, খেলাধুলায় অংশু যেভাবে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসতে বলে, অনেকে সেটাকে গুনাহ বলে মনে করে। আগেতে স্কুলে রবীন্দ্রসংগীত গাইত না বাচ্চারা। এই জায়গায় অংশুর মনে অনেকটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল ঋদ্ধি সেটা জানে। কিছু কিছু মানুষের গোঁড়ামিটা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় নিজের দেশের থেকে প্রতিবেশী দেশ তাদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। কথাগুলো অংশু সহ্য করতে পারে না। মনে হয় মুখের ওপর উত্তর দিয়ে দেয়। কিন্তু কিছু বলা সম্ভব নয়। বরং বারবার সব কিছু ভুলে নিজের শিক্ষা সংস্কৃতি এবং রুচিকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে আসে বাচ্চাগুলোকে নতুন পথ দেখানোর আশায়। এমন অনেক মেয়ে অংশুর গাইডেন্সে বোর্ডের পরীক্ষার পর কলকাতায় ভালো কোন স্ট্রিম নিয়ে পড়াশোনা করতে গেছে। কেউ কেউ চাকরি পেয়েছে চাকরি করছে। তাদের বাবা-মাকেও অংশু নিজের মতো করে বুঝিয়েছিল। আবার এরকমও অভিজ্ঞতা হয়েছে, বাইরে পড়তে পাঠানোটাকে তারা গুনহা বলে মনে হয়। এতে নাকি আল্লাহ পাপ দেয়। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে অংশুর নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হয়। এসব নিত্যদিনের। এই নিয়ে থাকা, মন ভার, আবার কাজে মন দেওয়া।
হিমাংশুদার ছেলে সেরে উঠেছে শুনে আনন্দ হল অংশু। কিন্তু হিমাংশুদা যেভাবে, এখনই ছেলের বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, আর অংশুকে বারবার বলছে, ‘বৌদি যেন একবার বান্ধবীকে জিজ্ঞাসা করে ছেলেটার বিয়ে দেওয়ার যাবে কিনা’— তাতে অংশুর নিজেরই এখন বিরক্ত লাগছে। ঋদ্ধি কোনওভাবেই এই কথা মীনাক্ষীকে জিজ্ঞাসা করবে না সেটা অংশু ভালভাবে জানে। অংশু হিমাংশুকে কোনও উত্তর দেয়নি। বরং জাবেদ স্যারের কাছে আরেকটা কথা শুনে রীতিমত চমকে উঠেছে। ছেলেটির নাকি আরেকবার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সেটা টেকেনি। বউকে তাকে ছেড়ে পালায়। এর থেকে বেশি কিছু অংশু আর জানে না। জানার আগ্রহও নেই। এটুকু জানে এই অবস্থায় এত তাড়াহুড়ো করে অন্য একটা মেয়ের জীবনে বিপদ ডেকে আনার কোনও অর্থ হয় না। হিমাংশুকে যদিও অংশু বুঝিয়েছে আরও একটু অপেক্ষা করার কথা। হয়তো খারাপ লেগেছে হিমাংশুদার। কিন্তু যে কাজ অংশু করতে পারবে না তার মিথ্যে আশ্বাসও সে কাউকে দেয় না।

(১০)
ট্রেনটা পনেরো মিনিট লেট, মেসেজটা গ্রুপে দেখে একটু দেরি করেই বের হল অংশু। কম্পার্টমেন্টে উঠে দেখে সেদিন জাবেদ স্যার উঠেছে ওদের কামরায়। অবশ্য তার একটা বিশেষ কারণ ছিল। অংশুকে দেখে সিট ছেড়ে দিলেন সুবর্ণ ঘোষ। সিটে বসে জল খেতে খেতে অংশু ইশারায় বলল, ‘কী গো সুমিত দা জাবেদ স্যার আজ এখানে?’
‘ম্যাডাম মনে হয় আজ আসেননি!’ বলেই একটা চাপা হাসি হাসল সুমিত।
তবে ওদের কামরায় ওঠার কারনটা কিছুক্ষণের মধ্যেই জাবেদ স্যার নিজেই ফাঁস করলেন। জাবেদ স্যার সংস্কৃতি জগতের মানুষ। পাশের কামরায় উনি যাদের সঙ্গে যাতায়াত করেন, তাদের মধ্যে অনেকেই নাটক থিয়েটার, গান, আবৃত্তি, লেখালেখি, ছবি আঁকা এসব নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। ওদের একটা নিজস্ব পত্রিকাও আছে। সেই পত্রিকা সম্পাদনার কাজে আছেন জাবেদ স্যার আর আরেকজন স্যার প্রিয়তোষ বক্সি। প্রিয়তোষ স্যারের রিটায়ারমেন্ট এর সময় হয়ে গেছে। তাই ওদের গ্রুপটা চাইছে একটা গ্র্যান্ড ফেয়ারওয়েল দিতে। এতে যদি এই কামরার কেউ অংশগ্রহণ করতে চায় সেই কথা জানানোর জন্যই জাবেদ স্যারের আজকে এখানে ওঠা। ওরা একটা সারাদিনের পিকনিকের অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে। এই ট্রেন থেকেই যা শুরু হবে। নটা পাঁচের হাসনাবাদ লোকালে যে কামরায় ওরা এত বছর একসঙ্গে যাতায়াত করল, সেই কামরাতে উদযাপিত হবে প্রিয়তোষের ফেয়ারওয়েল। হিমাংশুর চা আর সঙ্গে বিখ্যাত মধ্যমগ্রামের এক দোকানের কচুরি, তরকারি, সঙ্গে ভালো একটা মিষ্টি — এই দিয়েই হবে জল খাবার। তারপর ট্রেনে করে গান কবিতা গল্প করতে করতে সোজা টাকি পর্যন্ত যাওয়া। টাকিতে একটা হোটেলের বড় হল ঘর ভোগ করা হয়েছে, এবারে ইছামতি নদীর ধারে। সেখানে গিয়ে ব্যাগ পত্র রেখে আগে নৌকা বিহারে যাওয়া। নৌকাতে বসেই কফির সঙ্গে চিকেন পকোড়া আর বেবি কন পকোড়া খাওয়া। তারপর ফিরে এসে যে যার কবিতায় গানে বক্তৃতায় প্রিয়তোষকে নিয়ে মন্তব্যে সময় কাটানো, হোটেলের এই ডাইনিং হলে মনের মতো মেনুতে দুপুরের খাওয়া, এবং শেষে হই হই করতে করতে যে ট্রেনে ওরা রোজ বাড়ি ফিরত সেই ট্রেনে করেই যে যার মতন বাড়ি ফিরে যাওয়া।
সবটা শুনে চন্দ্রদা বলল, ‘আইডিয়াটা খারাপ না তবে আমি থাকতে পারব না। আমার এস আই আর এর হেয়ারিং পড়েছে!’
‘কেন ২০০৫ এর তালিকায় তোমার নাম ছিল না!’ জানতে চাইল অংশু।
‘জানিনা কেন নাম পাওয়া যায়নি!’
‘তাহলে কি লিংক দিয়ে ফরম ফিলাপ করলে?’
‘বাবার লিংক দিয়েই করেছি কিন্তু তাতে একটা সমস্যা আছে। বাবা নিজের নামটা কোথাও প্রমোদেন্দ্র সেন, কোথাও আবার প্রমোদেন্দ্রনাথ সেন করে গেছেন। আমি কি করে প্রমাণ করব যে দুটো লোকই এক?’
‘ওতে কিছু হবে না! বিষয়টাকে যতটা হ্যারাসমেন্টের দেখানো হচ্ছে, ততটাও নয়, এসব রাজনৈতিক চাল বুঝলে?’ বলল সুমিত
‘এতবছর নিজের দেশে থেকে নিজের আইডেন্টিটি প্রমাণ করতে হবে! এটা মানা যায়?’ বলল চন্দ্র।
‘বিষয়টা মানা না মানার নয়। আমাদের কতটুকু জানানো হয় বলতো। জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এ দেশে কবে থেকে ধর্ম নিয়ে শুধু খেলে গেছে। এর ভেতর অনেককিছু আছে। ভারত সবসময় তো পাশে থেকেছে। কিন্তু আর কতদিন? বেকার সমস্যা, জনসংখ্যার চাপ, সঙ্গে আবার জঙ্গিহানা—- নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়েও তো ভাবা দরকার!’
‘এত ওপর ওপর আলোচনা করো না। এসব এখানে বসে হয় না। যাই হোক, ভোগান্তি আছে বুঝতে পারছি। আমরাও তো পুরোপুরি এ দেশের লোক নই। আমাদের মাথা তো ওপার বাংলায় আটকে। যা হবে দেখা যাবে।’
জাবেদ স্যার বলল, ‘আরে তমাল তো বিএলও হয়েছে, ওর থেকে কিছু যেন নিতে পারেন তো। আর এই যে মেঘদূত বসে আছে এখানে, তাও চিন্তা করছেন! ও সব বলে দেবে। তবে অনেককে কিন্তু ঝামেলায় ফেলছে। দেখুন শেষমেষ কি হয়। তা উনি তো যাবেন না, তোমরা কি কেউ যাবে? গেলে আমায় জানিও। চাঁদা তুলতে হবে যাবে। বুঝতেই পারছ এতগুলো লোকের অ্যারেঞ্জমেন্ট করা। হল ঘরটার ভাড়ায় কিন্তু অনেক।’
সবাই শুনে উত্তর দিল, ‘ঠিক আছে জানাব আপনাকে পরে!’
মেঘদূতকে চুপ থাকা দেখে অরিজিৎ বলল, ‘কী ভায়া, তুমি কি যাওয়ার কথা ভাবছ?’
মেঘদূত আজকাল কম যাতায়াত করে। অনেকদিন পর আজ এসেছে। ট্রান্সফারের আগে হয়তো এটাই ওর লাস্ট উইক। তাই সবাই ঠিক করেছে এই সপ্তাহের শেষের দিকেই একটা খাওয়া দাওয়া হয়ে যাবে ওর চলে যাওয়াকে সেলিব্রেট করে। কথাটা শুনতে খুব অদ্ভুত লাগে চলে যাওয়ারও সেলিব্রেশন হয়। চন্দ্র সব সময় বলেন, জীবনটাই একটা সেলিব্রেশন হওয়া প্রয়োজন। এত আনপ্রিক্টিবল, এতটা অনিশ্চয়তা, আজ আছি তো কাল নেই। কেনই বা সেলিব্রেট করে চলব না! চলে যাওয়া মানে তো শুধু চলে যাওয়া নয়, অনেক কিছু থেকে যাওয়া, নতুন যেখানে যাওয়া– সেখানে নতুন কিছু শুরু করা! একটা শেষ না হলে অন্যটা শুরু হবে কি করে। তাই সেলিব্রেশন একদম সঠিক। যে মেঘদূত সবসময় হাসিখুশি থাকে ওকে এভাবে চুপ দেখে অবাক তো হতেই হয়। মেঘদূত বলল, ‘আমারই এক পরিচিত খুব বাজে ভাবে ফেঁসেছে!’
‘তুমি তো জজ। তুমি তো সব সলভ করে দেবে।’
‘সেটা তো পরে। কিন্তু আজকাল কাকে যে মানুষ বিশ্বাস করবে, সেই নিয়ে খুব ধন্দে পড়ে যাই।’
‘বলা যাবে?’, বলল অংশু।
‘না বলার কিছু নেই! আমার চেনা একজন প্রফেসর, আমারই কমপ্লেক্সে অন্য এক ব্লকে থাকত, দুই বড় বড় ছেলের বাবা! এক ছেলের বিয়েও হয়ে গেছে! সেই প্রফেসর এই বয়সে এসে তার নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন! তাতে দোষের কিছু নেই আজকাল এটা খুব কমন। যাকে বিয়ে করেছেন সে ওনারই এক ছাত্রী ছিল একসময়। মানে বলা যেতে পারে তার ছেলেদের বয়সি। প্রথম দিকটায় তেমন কিছু বোঝা যায়নি। তারপর যেটা হল উনি প্রফেসরকে নিজের সম্পত্তি ওর নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। প্রফেসর লিখেও দেন। এই অবস্থায় উনি মারা গেছেন। এবার সেই মহিলা সবকিছুর মালিকানা দাবি করছে। শুধুমাত্র একটা বাড়ি ওই ছেলেদের নামে আছে। সেটা নিতে না পারায়, আপনাকে কি ব্যাপার বলতে পারব না, এই কেসটাই এখন চলছে এখন, মহিলাটির মতে প্রফেসরের ছেলেরা নাকি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে।’
‘সেকি এতো মারাত্মক অভিযোগ! দুই ছেলে কি বলছে!’
‘দুই ছেলেই সরকারি উঁচু পোস্টে চাকরি করে। ওরা বলছে ওইদিন নাকি ওরা বাড়িতেই ছিল না, যে বাড়ির কথা মহিলা উল্লেখ করেছেন সেই বাড়িটা অলরেডি ওনার দখলে। আর ওরা বাবা মারা যাওয়ার পর ওই বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে কবেই।’
‘এ তো ঘজোকটো কেস হয়ে আছে। তা তুমি কি সাজেশন দিলে?’ চন্দ্র বলল।
‘আমি আগ বাড়িয়ে সাজেশন দেব কেন! আমার কানে এল কথাটা। আমি ভাবছি এই যে মানুষ না জেনে ভালবেসে সম্পর্কে জড়ায়, কী হতে পারে ভাবে না– এতটা বিশ্বাস কি করা উচিত আজকালরদিনে!’ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল মেঘদূত।
মেঘদূতের নিঃশব্দ উচ্চারণ দ্বিধা সংশয় যেন কানে এসে পৌঁছোচ্ছে অংশুর। তবে কী সেদিন যে তরুণ হাওয়ার অচেনা সুবাসে সুবাসিত ছিল মেঘের শরীর মন, আজ কোথাও তাতে সংশয় জন্মেছে! আজকের দিনে কোথাও যেন সত্যিকারের ভালবাসা চোখেই পড়ে না অংশুর, অথচ চর্তুদিকে এত এত বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্ক। স্বকীয়া পরকীয়া এসব শব্দবন্ধ দিয়ে মনের সম্পর্ক আত্মার সম্পর্ককে জাজ করা অনুচিত বলে মনে হয় ওর। ঋদ্ধিও তাই বলে। ঋদ্ধি বলে প্রকৃত ভালবাসার জন্য নাকি সব করা যায়। কিন্তু যা অন্যের ক্ষতি করে, সেটা কী! এসব সম্পর্কের জেরে কত মানুষ খুন হয়ে যায় আজকাল। সেসব বীভৎস ঘটনার কথা খবরে শুনলে পেপারে পড়লে মনের ভেতরটা তোলপাড় করে। চেনা মানুষকেও সন্দেহ হয়। মনের অন্ধকার এতটা বেড়ে গেছে চিন্তা হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। অংশুর বারবার মনে হয় এই কারণেই চরিত্র ঘটন, আধ্যাত্মিকতা যার পথ দেখিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ তার এক গুরুত্বপূর্ণ সেশন রাখা দরকার ছাত্রজীবনে। ঋদ্ধির মত অবশ্য ওর থেকে আলাদা। ঋদ্ধি বলে আজকের প্রজন্ম অনেকবেশি প্র্যাকটিক্যাল। আবেগে ভেসে তারা নিজেদের ধ্বংস করে না। জানলা দিয়ে নরম আলো এসে পড়ছে অংশুর কোলে। অংশু জানলার সিট পেয়েছে। অংশু আর ঋদ্ধির তর্কটা ঠিক সবসময় তর্কের পর্যায়ে থাকে না, বরং জীবনের দুটো দর্শনের সংঘাতে রূপ নেয়। বর্তমান আর অতীতের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অংশুর চোখে যখন এক গভীর উদ্বেগের জন্ম নেয়, ঋদ্ধি তখন জোর গলায় একধাপ এগিয়ে রাখে নতুন প্রজন্মকে। অংশু বলে আজকের দ্রুতগামী জীবনে মানুষ বাইরের চাকচিক্যে ভেতরটা ক্রমশই ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। বিবেকানন্দের সেই অমোঘ বাণী— “Education is the manifestation of the perfection already in man.” যা তারা ছোট থেকে শিখে আসছে কোথায় গেল সেই শিক্ষা! তাদের বয়সী হাজার হাজার মানুষ স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে সাময়িক আনন্দের খোঁজে। কিন্তু তাতে আখেরে ক্ষতি নিজেদেরই। অংশু অনেকবার ভেবেছে ওর ছাত্রছাত্রীদের আধ্যাত্মিকতা আর নৈতিকতার কথা পড়ে শোনাবে না হলে যে মেধা কেবল স্বার্থপরতা বাড়াবে। এখানে আধ্যাত্মিকতা কোনও ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, বরং নিজের ওপর বিশ্বাস এবং ত্যাগের মহিমা। অংশু সত্যিই মন থেকে চায় প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন সেশন থাকুক যেখানে শেখানো হবে কী করে প্রতিকূলতায় স্থির থাকতে হয়। ”চরিত্র যদি ইস্পাতের মতো শক্ত না হয়, তবে মেধা দিয়ে সমাজ গড়া যায় না। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আমাদের এমন শিক্ষা চাই যা মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখায়, আত্মমর্যাদা দেয়।”
কিন্তু ঋদ্ধির মতামত মেলে না অংশুর সঙ্গে। ও মনে করে, আজকের প্রজন্ম অনেক বেশি স্বচ্ছ। তারা জানে কোথায় থামতে হয় এবং কীভাবে নিজের ক্যারিয়ার বা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হয়। ইন্টারনেটের দৌলতে সারা বিশ্বের জ্ঞান আহরণ করে তারা। তারা অন্ধ বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে বিশ্বাসী। তারা ‘Self-aware’ বা আত্মসচেতন। আধুনিক প্রজন্ম বরং পুরনো বস্তাপচা ধ্যানধারণা ভেঙে নতুন করে সবকিছু গড়ে তুলছে। নিজেদের শর্তে বাঁচছে। হয়তো সেটা করতে গিয়ে তারা ঠক্কর খাচ্ছে কিন্তু নিজেরাই উঠে দাঁড়িয়ে নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে। ঋদ্ধি বরাবরই নিজের শক্তপোক্ত মতামত রাখে। এই একটা জায়গাতেই শুধু ঋদ্ধিকে নিয়ে অংশুর সমস্যা।
‘কী ভাবছ এত মন দিয়ে?’ চন্দ্রর গলা শুনে চমকে উঠল অংশু। বলল,
‘আচ্ছা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আপনাদের কী মত?’
‘এই এসব নিয়ে ওপেনলি আলোচনা করো না। সনাতনি চিহ্নিত হয়ে যাবে।’ একটু ব্যাঙ্গের সুরেই হাসতে হাসতে বলল চন্দ্র।
অংশু বলল, ‘কে কী বলল সেই নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। আমি কি বিশ্বাস করি তাতে অনেক কিছু আসে যায়। এই যে আমাদের গঙ্গা নদী বা ধরো একটা বৃহৎ প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ, আপনাদের মনে হয় না আমাদের সনাতন ধর্মটাও ঠিক ওরকম! এর শেকড় অনেক গভীরে, কিন্তু এর ডালপালা প্রতিনিয়ত নতুন আকাশ খোঁজে। নতুন পথ খোঁজে। যাকে ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না। জল আকাশ মাটি গাছপালা এই প্রকৃতি। একে যারা শুধু আচার-সর্বস্ব ধর্ম মনে করে, তারা আসলে এর প্রাণভোমরাটা ধরতেই পারেনি বলে আমার মনে হয়।
অরিজিত কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, ‘কিন্তু সনাতন মানেই তো যা পুরনো, যা চিরকাল চলে আসছে। কিন্তু আজকের যুগে ওই প্রাচীন ভাবনাগুলো কি আদৌ টেকসই?’
অংশু শান্ত গলায় বলল, ‘সনাতন মানে শুধু পুরনো নয়, সনাতন মানে যা নিত্য-নতুন। যা আগে ছিল, আজও আছে এবং ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবে। এটা কোনও নির্দিষ্ট নবীর বা পয়গম্বরের তৈরি নিয়ম নয়; এ হল মহাজাগতিক সত্য বা Cosmic Law। তুমি যাকে প্র্যাকটিক্যালিটি বলছ, সনাতন ধর্ম তাকেই বলেছে ‘ধর্ম’— অর্থাৎ যা সমাজকে ধারণ করে রাখে। এখানে কেউ নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করে, কেউ আবার মাটির প্রতিমার চোখে দেবত্ব খুঁজে পায়। কর্মফলে বিশ্বাস করে। ঈশ্বর তো কোনও আর সিংহাসনে বসে বিচার করছেন না কারও, তিনি প্রতিটি অণুতে স্পন্দিত হন। উপনিষদ বলছে— ‘তত্ত্বমসি’ মানে তুমিই সেই। অর্থাৎ ব্রহ্ম আর জীব কিন্তু আলাদা নয়। এই ধর্ম কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করতে শেখায় না। বরং বলে, “একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”—সত্য এক, কিন্তু জ্ঞানীরা তাকে বিভিন্ন নামে ডাকেন।’
‘বাবা অংশু তুমি তো অনেককিছু জানো। তুমি কি খুব পুজোটুজো করো’ বলল সুমিত।
‘এতক্ষণ আমার কথা শুনে এটা মনে হল তোমার?’ একটু গম্ভীর হয়েই বলল অংশু।
‘আহ সুমিত, আলপটকা কথা বলো না। অংশু ভুল কিছু বলেনি। তোরও নিজের কিছু বিশ্বাস নিশ্চয়ই আছে। অন্যের ক্ষতি না করলেই হল। এত কঠিন কথা তোকে বুঝতে হবে না। আর অংশু এসব আলোচনার জায়গা এটা নয়। এখন চুপ করো। চারদিকে মহল ভাল নয়। ভাল কথা বললেও লোকে খারাপ ভাবে।’ বলল চন্দ্র।
****************************************************
স্কুলের শেষ পিরিয়ডের ঘন্টা বাজতেই প্রদীপদা অংশুকে বলল, ‘ও মাস্টারমশাই একটু দাঁড়াবেন। কথা আছে।’
প্রদীপ ঘোষ, এই স্কুলে অনেক বছর ক্লার্কের কাজ করে। অংশুকে ইশারায় এককোণে দাঁড়াতে বলে নিজের বসার ঘরে ঢুকল প্রদীপ। মিনিট পাঁচেকের ভেতর ফিরে এল হাতে দুটো বড় সাইজের তেল চকচকে সবুজ বেগুন আর একটা বড় প্যাকেটে মোড়া বেশকিছুটা সজনেফুল। ওগুলো অংশুর হাতে ধরিয়ে বলল, ‘সব আমাদের বাগানের। গিন্নি সব নিজের হাতে ফলায়। বৌমার জন্য নিয়ে যাও, বৌমা তো খেতে ভালোবাসে।’
প্রদীপদার অনেকরকম বদস্বভাব থাকা সত্তেও লোকটার অংশুর প্রতি একটা নরম কোণ আছে কোথাও। অংশু চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারে না৷ অংশু ‘ঠিক আছে’ বলে জিনিস দুটো ব্যাগে ভরে নিয়ে এগোতে যাবে ঠিক তখনই প্রদীপ বলল, ‘কী হয়েছে শুনেছেন তো?’
অংশু বুঝেও খানিকটা না বোঝার ভান করে বলল, ‘কাল তো আসিনি আসলে, তাই পুরোটা ভাল করে এখনও শুনিনি। শুনে নেব।’
‘এবার বড় কেসে ফাঁসবে। একদিন আমাকে চুরির দায় দিয়েছিল। আজ যে এতগুলো টাকা নয় ছয় হল, কোথাও কোন হিসাব নেই। সব তো স্কুলের টাকা হস্তগত…’
‘আঃ প্রদীপদা। না জেনে কেন কথা বলছেন শুধু শুধু। কি হয়েছে এখনো তো আমরা ঠিকমতো কেউই জানি না। বাদ দিন, এসব নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। ম্যানেজমেন্ট কমিটি আছে তারাই সব সিদ্ধান্ত নেবে।’
অংশু প্রদীপ ঘোষকে আর কোনওরকম কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সাইকেল নিতে গেল গ্যারেজে। স্কুলে গতকাল না এলেও জাবেদ স্যারের কাছ থেকে টাকা নয়ছয়ের একটা হালকা একটা আভাস পেয়েছে বৈকী। স্কুলেরই ইনচার্জ আর এক শিক্ষকের নাম উঠে আসছে গড়মিলে। কিন্তু এত সেনসিটিভ ইস্যুতে সবসময় মন্তব্যও করা যায় না। সবদিক বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আগামীকাল শিক্ষকদের আভ্যন্তরীন একটা মিটিং হওয়ার কথা আছে। সেখানে মিডডে মিলের টাকা, সাইকেলের টাকা, বিল্ডিং সংস্কারের টাকা, আর যে খাতে যত টাকা আসে তার আপডেটেড হিসাবের কথাও তুলতে হবে। ছাত্র ছাত্রীদের জন্য যতটুকু করা যায় অংশু বরাবর তার সর্বস্ব দিয়ে করে। স্কুলে এখনও অংশুর মতো আরও বেশকিছু শিক্ষক শিক্ষিকা আছে বলেই এখনও পর্যন্ত ওদের স্কুলে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যাও খুব কম নয়। যেখানে রাজ্যের সরকারি বাংলা মিডিয়ামগুলো বেশিরভাগই বন্ধ সেখানে ওদের স্কুলে প্রতিবছর ছাত্রছাত্রী সংখ্যা অল্প হলেও বৃদ্ধি পায়। সাধে কী আর অংশু ছাত্রছাত্রীদের এতকাছের। আগামীকালই কতজন যে তাদের প্রিয় অংশুমান স্যারের জন্য সিমুয়েই পায়েস, হালুয়া, লাচ্ছা সব নিয়ে আসবে শবেবরাত উপলক্ষে। প্রতিবছর ইদ আর এই সময় ওরা অংশুর জন্য বাড়ি থেকে নানারকম খাবার নিয়ে আসে। ওদের ভালবাসার কাছে মাথা নোয়ালেও টিচার্সরুমে একটু অপ্রস্তুত লাগে অংশুর নিজেকে। ওতজনের মাঝে থেকে থেকেই যখন ‘অংশুমান স্যার আছেন’ বলে খোঁজ পড়ে তখন বেশ লজ্জা লাগে বৈকী! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সাইকেলের লকটা খুলতে যাবে ঠিক তখনই জাবেদ হাসান স্যার আর বিলকিস ম্যাডাম এক গাল হেসে অংশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল কিন্তু শবেবরাতের নেমন্তন্ন! বড় পবিত্র দিন আমাদের! আসবেন সবাইকে নিয়ে।’
অংশু বলল, ‘নিশ্চয়ই যাব!’
সাইকেল নিয়ে স্টেশনের দিকে যেতে যেতে প্রতি বছরের ঈদ আর শবেবরাতের দিনটা অংশুর চোখে ভেসে উঠছে। নিজের বাড়ি থেকে মাইলমাইল দূরে এত বছর ধরে যে শহরটায় সংসার পেতেছে স্ত্রী সন্তান নিয়ে, কখন যেন এই মানুষগুলোই পরিবারের অংশ হয়ে গেছে। বিপদে আপদে আনন্দে শোকে বহুবার পাশে থেকেছে জাবেদ স্যার, আমিনুল স্যার, শঙ্কর স্যার, ভোলানাথ স্যার। তখন তো চন্দ্রদা, অরিজিত, বাসব বা সুমিতের সঙ্গে ওতটাও আলাপ হয়নি। কিন্তু এরা প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত নিজেদের যেকোনও অনুষ্ঠানে অংশুকে নেমন্তন্ন করতে ভোলে না। এমনও হয় কখনও যদি যেতে না পারে বাড়িতে খাবার দাবার উপহার সব পাঠিয়ে দেয়। অথচ চারদিকের অস্থিরতা এই সব কিছুকে যেন আজ মিথ্যে করে দিচ্ছে। অংশুর ভয় হয়, সম্পর্কগুলো যদি বদলে যায় হঠাৎ, ঠিক যেভাবে দেশভাগের সময় বদলে গিয়েছিল। আজও কি কিছু পাল্টেছে! হয়তো হ্যাঁ, আবার হয়তো বা না। জীবনটা এখন যেন কীরকম গা ঘিনঘিনে ডার্ক থ্রিলার ওয়েব সিরিজের মধ্যে আটকে গেছে। চারদিকে শুধু ক্রাইম, মানুষ আগেও ক্যানিবেল ছিল, এখনও আছে, তবু আমাদের আলোর সন্ধান করতে হয়। ভালোর সন্ধান করতে হয়।
****************************************************
জীবনটা সত্যিই উপন্যাসের মতোই। বৈচিত্র্যময়। হাজারও বিষণ্ননতা মতানৈক্য বিরোধিতার ভেতরেও জাভেদ স্যারের একটা মেসেজ– ‘এত দেরি কেন! তাড়াতাড়ি এসো। অপেক্ষা করছি।’ কেমন একটা মলম লাগিয়ে দিল যেন। ঋদ্ধি ভেতরে তৈরি হচ্ছে। অংশু তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মেসেজটা পড়ে মুখে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল অজান্তেই। উত্তরে লিখল, ‘এই বের হব।’
ইসলামে শবেবরাত বা ‘লাইলাতুল বারাত’ হল মুক্তির রাত। ঋদ্ধি একটা লাল রঙের সালোয়ার স্যুট পরেছে। অপূর্ব লাগছে ওকে। হিয়া পরেছে একটা লেহেঙ্গা। জাভেদ স্যারের পাড়ার অলিগলি তখন আগরবাতির গন্ধে ম ম করছে। সাদা পাঞ্জাবিতে সেজে ছোট ছোট ছেলেরা মসজিদের দিকে যাচ্ছে, চোখেমুখে এক পবিত্র আমেজ। জাভেদ ভাইদের পুরনো বাড়িটা এ পাড়াতেই ছিল। এখনও এই একালায় অনেক পুরোনো আমলের বাড়ি দেখা যায়। আজকের দিনে উঠোনে পা রাখলেই দেখা উঠোনের এক কোণে মোমবাতি জ্বালিয়ে বাড়ির বড়রা জায়নামাজে বসে তসবিহ গুনছেন। তাদের বিশ্বাস এই রাতেই আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। জাভেদ স্যাররা গত বছরই এ পাড়া ছেড়ে আরও একটু দূরে হিন্দু এলাকায় একটা বড় আবাসনে সিফট করেছেন। আজ অংশুমানরা ওখানেই যাবে৷
লিফটে করে দোতলায় উঠেই একেবারে সামনের ফ্ল্যাটের দরজাটাই ওদের। অংশু বেল বাজাতেই একগাল হেসে দরজা খুললেন জাভেদ। হিয়াকে দেখে বলল, ‘এত দেরি হল যে হিয়া ম্যাডাম। দেরি করলে খাবে কখন? এসো এসো আজ তো তোমাদের পছন্দের সেই নেসারি হালুয়া আর স্পেশাল মাংসের পদ, আর সাদা চালের রুটি হয়েছে।’
জাভেদ স্যারের ঘর দোর বেশ গোছানো সুন্দর করে। ওনার স্ত্রী বড়ই ঘরোয়া। জাভেদ স্যারের সব বিষয়ে পাণ্ডিত্য বরাবর মুগ্ধ করে অংশুমান আর ঋদ্ধিকে। ইলিনা বৌদি আবার একেবারে অন্যধারার মানুষ। সারাদিন ঘর সংসার রান্নাবান্না তার নিজস্ব জগত। ঋদ্ধি প্রতিবার এসে এই বিষয়টাই লক্ষ করে যখন অংশুমান, বা অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের সঙ্গে নানারকম বিষয় নিয়ে জাভেদ স্যার গল্প করেন ইলিনা বৌদি রান্না ঘরের এককোণে বসে যেভাবে তাকিয়ে থাকেন তা ঋদ্ধির চোখ এড়ায় না। ওনাদের ব্যক্তিগত জীবনের ফাঁকটা যেন ওই স্থির দুচোখের চাহুনিতে আগুনের মতো ঝলসে ওঠে, তাতে অনেকটা রাগ ক্ষোভ দুঃখ যন্ত্রনা মিশে আছে যেন। ঋদ্ধি তাই কথার মাঝে ইলিনার সঙ্গেও কমিউনিকেট করার চেষ্টা করে প্রতিবার। যতই ইলিনা নানাভাবে ঋদ্ধিকে এটা বোঝাতে চান যে ‘তার মতো সেজেগুজে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে থাকার মতো জীবন তার নয়। তার জীবনে অনেক লড়াই’, ঋদ্ধি তার শ্রদ্ধা জানায়। কখনও বোঝাতে যায় না এই সংসারে প্রতিটা মানুষের জীবন সংগ্রামটা আলাদা এবং একান্ত নিজের। এবারেও ঋদ্ধি ইলিনাকে বলল, ‘এই দিনটা তোমরা পালন করো কেন বৌদি?’
‘বাব্বা সামনে পণ্ডিত মানুষরা বসে থাকতে আমি বলব?’
খানিক অপ্রস্তুতে পড়ল জাভেদ। ঋদ্ধি সেই অস্বস্তিটুকু বুঝে বলল, ‘কে বলল তুমি জ্ঞানী নও! জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো কি তোমায় আমায় বা আমাদের সকলকে কম কিছু শিখিয়েছে?’
একটু চুপ থেকে ইলিনা বলল, ‘শবেবরাত মানে হল ক্ষমা চাওয়ার রাত। আমরা যেমন আল্লাহর কাছে মাফ চাই, তেমনি মানুষের কাছেও যদি কোনও ভুল করে থাকি, তা মিটিয়ে নেওয়ার রাত এটা।’
জাভেদ স্যার কেমন গম্ভীর হয়ে মুখ নামিয়ে নিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে মুখ ফুটে কজনই বা ক্ষমা চাইতে পারে। কজন স্বীকার করতে পারে নিজের দোষ। অভিযোগের বোঝা বাড়তে বাড়তে পাহাড় সমান হয়ে গেলে একই সংসারে দুজন মানুষ কেমন পরস্পরকে আর দেখতে পায় না যেন। একই উপত্যকার এপার ওপার অংশ হয়ে অভ্যাসবশে থেকে যেতে হয়। কিছুক্ষণের ভেতর টেবিল সেজে উঠল ঘি-য়ে ভাজা সুজি আর বুটের ডালের হালুয়ায়। সঙ্গে জর্দা পোলাও, লাচ্ছা সেমাই, মাংস, পায়েস, চালের গরম গরম রুটি।
খাবার মুখে তুলতে তুলতে অংশু ঋদ্ধিকে চাপা গলায় বলল, ‘সুমিতদা বলে দিয়েছে, কিছু খেতে না পারলে যেন ওর জন্য কালকে নিয়ে যাই। ভাবো।’
ঋদ্ধি বলল, ‘তোমার ছাত্রছাত্রীরা তো কতকী পাঠিয়েছে। ওগুলো সব নিয়ে যেও। আমি বাড়ির জন্য না হয় অল্প দূরে রাখব। সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে তো উৎসবের আনন্দ। না হলে আর উৎসব কী।’
কথাটা বলার পরে ঋদ্ধির মনে হল সকলেই তো অনেক কিছু জানে, তবুও কেন এত দ্বন্দ্ব এই সমাজে! ধর্ম মানুষকে বিনয়ী করে, দয়ালু, সহনশীল করে, সমাজকল্যাণের অংশ হতে বলে।
অনেকটাক্ষণ গান গল্প কবিতায় সময় কাটানোর পর অংশুমানরা বেরিয়ে আসার সময় ইলিনা ঋদ্ধিকে ডেকে বলল, ‘একটু খাবার দিলাম, এটা নিয়ে যাও।’
‘আবার কেন? এতকিছু তো খাওয়ালে।’
‘দূর কই আর ওতকিছু। তোমরা তো অনেককিছু পারো। আমি তো শুধু এটাই পারি। বছরে তো দুবার মাত্র আসো, এমনিতে তো আর সময়ই পাও না জানি। তোমার কথা তোমাদের স্যার খুব বলেন। আমি সবই জানি।’
ঋদ্ধি ইলিনার হাত থেকে টিফিন বক্সগুলো নিয়ে বলল, ‘কে বলল তুমি শুধু এটুকুই পারো! তুমিও অনেককিছু পারো যেগুলো বাইরে থেকে আমরা বুঝতে পারি, টের পাই। এত বড় সংসারটাকে নিজের ধৈর্য আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ধরে রেখেছ– আর তোমার লড়াই কি আমাদের অজানা?’
চোখ ভিজে এল ইলিনার। অনেক সময় কিছু মুহূর্ত চুপ থেকেও অনেক কিছু বলে দিয়ে যায়। ইলিনা আর কোনও কথা ঋদ্ধিকে বলতে পারল না ঠিকই কিন্তু ওর নীরব চোখ অনেককিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেল। জ্ঞান হওয়ার আগেই নিকা করে আসা একটা মেয়ে এতগুলো বছর ছেলে মেয়ে আত্মীয় কুটুম সকলকে নিয়ে মিলেমিশে করল ঠিকই কিন্তু নিজের আসল মানুষটার সঙ্গেই মনের একটা বড় ফারাক তৈরি হয়ে গেল। ইলিনা খুব ভাল করে জানে জাভেদ স্যারের অসম্পূর্ণতা তিনি কোনওদিনও মেটাতে পারবে না। কিন্তু তা বলে জেনে শুনে নিজের মানুষটার জীবনে অন্য নারীর উপস্থিতিও কি সহ্য করা যায় সহজে! তার চোখে যে আগুন প্রতিফলিত হয় তা তো সেই মানিয়ে নেওয়ার ফল! জাভেদ স্যারকেই বা পুরোপুরি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কি সঠিক? চারটে কথা বলার জন্য বোঝার জন্যও তো মনের মানুষ লাগে। ঋদ্ধি কোনওদিনও এসব জাজমেন্টে যায় না। সকলের জীবন আলাদা। সেখানে তাকে কি ফেস করতে হয় শুধু সেই বোঝে। তবে ভালবাসা আর বেলাল্লাপনার একটা তো তফাত থাকেই। বাসবকে যেমন কোনওদিনও সাপোর্ট করতেই পারে না ঋদ্ধি। বাসব সারাক্ষণ শ্রাবণীর নাম নিতে অজ্ঞান। সোশাল মিডিয়ায় সকলের কাছে নিজের ইমেজ তৈরি করেছে সুখী পরিবারের। অথচ দিনের পর দিন ঠকিয়ে চলেছে তার নিজের স্ত্রীকে। পোশাক বদলের মতো নারী বদলে যায় ওর জীবনে। গাড়িটা বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঋদ্ধি মনে করাল অংশুকে, ‘এই বিলকিস ম্যাডামকে ফোন করেছিলে?’
‘হ্যাঁ। ওনার বাড়িটা এতদূর আর কোনও বার যাওয়া হয় না। উনি সেটা বোঝেন। কাল আবার দেখো কত কী নিয়ে আসেন স্কুলে।’ বলল অংশু
‘যত খাবার আছে কাল তোমাদের ট্রেনের পার্টিটাও ভালোই হবে।’ কথাটা বলেই হাসল ঋদ্ধি।
অংশু বলল, ‘বাড়ি গিয়েই আমি গ্রুপে লিখে দিচ্ছি। সুমিত দা, চন্দ্র দা হেব্বি খুশি হবে!’

(১১)
হিয়া স্কুল চলে যাওয়ার পর একটা ঘন্টা মতো হাতে পায় ঋদ্ধি অংশুর টিফিন ব্রেকফাস্ট রেডি করার মতো। সকাল থেকে বেশ কয়েকবার ওয়াশরুমে যেতে দেখে ঋদ্ধি অংশুকে বলল, ‘ঠিক করে বলতো কাল ট্রেনে ঠিক কী কী খেয়েছিলে? এতবার ওয়াশরুম যাচ্ছো, আমি যা টিফিন দিয়েছিলাম তাতে তো শরীর খারাপ হওয়ার কথা নয়।’
অংশু সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, ‘কিছু খাইনি বিশ্বাস করো। একটু টেনশনে আছি। তাই হয়তো…’
‘কিসের টেনশন? আমায় বলোনি তো…’
‘কিসের আবার? ওই যে ছাত্রীরা সরকার থেকে একটা টাকা পায়, তার! তুমি তো জানোই আমি সবসময় চেষ্টা করি যাতে সঠিক মানুষ তার ন্যায্যটুকু পায়। কিন্তু…’
‘ওপর থেকে চাপ এসেছে নাকি ছেড়ে দিতে হবে কাউকে টাকা…?’
‘আরে মেয়ে দুটোর বিয়ে হয়ে গেছে, বাচ্চা আছে জানি সবাই, কতবছর স্কুলের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই হঠাৎ গার্জেনসহ এসে বলছে বিয়ে হয়নি। জলজ্ব্যান্ত মিথ্যে। এসব কেসে আমি একেবারে হায়ার অথারিটিকে জানাই। কিন্তু এবার বিষয়টা আলাদা। পার্টির চাপ…কিন্তু আমি তো পারব না এসব করতে। দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াব ভাবছি।’
‘তুমি সরে দাঁড়ালে এই ভার নেওয়ার জন্য বাকিরা তাগ করে আছে জানো তো। তখন কী হবে, বাচ্চাগুলোকে ফর্ম ফিলাপ করতে গিয়েও এক্সট্রা কুড়ি তিরিশ টাকা করে দিতে হবে, যেটা ফ্রিতে হয়।’
‘ঠিক এইজন্যই তো সরতে পারছি না। টেনশন হচ্ছে। কাজের জায়গায় কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেলে কী আর মন বসে গো!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অংশুমান। তারপর বলল, ‘অনেকসময় বড় কোনও লড়াই লড়তে গেলে ছোট ছোট বিষয়গুলো ছাড়তে হয়। এই আপোসটা আমি করতে পারব না। যদি সাময়িক দায়িত্ব থেকে বিরতি নিই, আমার জায়গায় অন্যকেউ থাকলে ওরা টাকাটা পেশে যাবে। কিন্তু আমি জানি ওই গুরুদায়িত্ব আবার আমাকেই অফার করা হবে। তখন আমি শর্ত রাখতে পারব যে কোনওরকম ভুল আবদার সুপারিশ আমি থাকলে হবে না।’
‘আর যদি দায়িত্ব না নিতে বলে…?’
‘তাতেও ক্ষতি নেই। তুমি তো জানো আমার একটা ছাত্রীদের গোপন দল আছে। স্পাই বলতে পারো। স্কুলের কোনও ছাত্রীর শাদীর খবর পেলেই ওরা প্রণবদা মানে প্রণব বোসকে খবর দেয়। ওই যে বিডিও যিনি। বিলকিস ম্যাডাম, জাভেদ স্যার, রুকসার ম্যাডাম ওনারাও আমায় যথেষ্ট সাপোর্ট করেন। রুকসার ম্যাডাম একেবার নতুন জয়েন করলেন। আগেতে মালদার একটা স্কুলে ছিলেন। ওনার স্ট্যাটাসটাই আলাদা। প্রকৃত শিক্ষিত বলতে যাকে বোঝায়। যেমন বিনয়ী, তেমনই স্পষ্টবাদী, প্রতিবাদী। ছাত্রছাত্রীদের ভালর জন্য সব করতে পারেন৷ এই যে আগের মাসে হাতের কাজের মেলা হল টাকীতে, সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে বাচ্চাদের তৈরি জিনিসপত্র নিয়ে বাচ্চাদের জন্য স্টল দিলেন। স্কুল থেকে নামমাত্র খরচ পেয়েছেন। কিন্তু রোজ উনি নিজে থেকে বাচ্চাদের যাতায়াতের খরচ, টিফিন সব নিজের খরচে করেছেন। এমনকি স্কুল থেকে যখন যে স্যার গেছেন তাদের জন্যও যথেষ্ট করেছেন। আমি তো নিজে ছিলাম, সচক্ষে দেখেছি। ইনফ্যাক্ট যা আমরা এত বছরে পারিনি, উনি করে দেখালেন। এবার প্রথম আমাদের স্কুলের বাচ্চারা একটা গান আর নাটকের কম্পিটিশনে অংশ নিয়েছিল, উনি রবীন্দ্রনাথের গান গাইয়েছেন। অনেকে অনেক কিছু বলেছে। কিন্তু ওনার যুক্তি একটাই দেশটা আমাদের, এই দেশের সকল সংস্কৃতি ঐতিহ্য সংস্কার সবটাই আমাদের। নজরুল যদি নিজেকে রবিঠাকুরের শিষ্য বলতে পারেন, তাকে গুরুর আসনে বসিয়ে পা ধরে প্রণাম করেন, তবে কী করে এত বিভেদ হয়। ওনার ব্যক্তিত্বের কাছে কেউ শেষ পর্যন্ত টিকতেই পারেনি। আমাদের স্বপ্নটা ওনি ওনি এলেন বলেই পূর্ণতা পেল। স্কুলে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হয় এখন। আসলে ওনার হাসব্যান্ড ওখানকার বেশ ক্ষমতাধর মানুষ। সেটা একটা বড় সার্পোট তো অবশ্যই। চট করে কেউ কিছু করার আগে দশবার ভাববে।’
অংশুর সবকথা মন দিয়ে শুনছিল ঋদ্ধি। বলল, ‘সকলের কাছেই তো শেখার কত কী আছে কিন্তু এখন রেডি না হলে যে তোমার ট্রেন মিস হবে, তার হুঁশ আছে?’
বের হতে একটু দেরিই হয়ে গেল অংশুর। ট্রেনটা ভাগ্যিস পাঁচটা মিনিট লেট করেছে। অংশুমান আজ বাইকে স্টেশন এসেছে। সঞ্জয়ের সেলুনের উলটোদিকের গ্যারেজে অংশুকে বাইক রাখতে দেখে সঞ্জয় বলল, ‘কী মাস্টারদা, আজ লেট, তাই বাইকে নাকি?’
কোনওরকমে হেসে মাথা নেড়ে হাত তুলে বলল অংশু, ‘পরে কথা বলব, একদম সময় নেই।’
সঞ্জয়ের সঙ্গে অংশুর সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত। সঞ্জয় আর অংশুর বয়স হয়তো কাছাকাছি। সঞ্জয়েরও একটা ছেলে তবে বয়সে হিয়ার চেয়ে দু বছরের বড়। অংশু খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও সপ্তাহে দুতিন বার স্কুল ফেরতা ওর সেলুন হয়ে আসে। সঞ্জয় ওকে দেখলেই প্রিয় মাস্টারদাকে এককাপ করে লিকার চা খাওয়াবেই। তারপর এটা সেটা গল্প করে ‘আসুন একটু ম্যাসাজ নিয়ে যান’— অংশুর দুর্বলতাটা সঞ্জয়ও খুব ভাল বোঝে। সেই পছন্দের জায়গায় অংশু এতটাই দুর্বল যে ওভাবে ডাকলে আর না বলতে পারে না। অংশুর জন্য অবশ্য স্পেশাল ডিসকাউন্টও রাখে। ঋদ্ধি এই নিয়ে বেশ মজাই করে। কিন্তু কীভাবে যেন একটা না বলা নির্ভরতা তৈরি হয়েছে সঞ্জয়ের অংশুর ওপর। অসম্ভব শ্রদ্ধা করে অংশুকে সঞ্জয়। নিজের ছেলে, সংসার বা নিজের শারীরিক মানসিক অবস্থার কথাও বহুবার শেয়ার করেছে অংশুর সঙ্গে। গতবছর ছেলে নতুন ক্লাসে ওঠার পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছিল বলে অংশু ওকে ফেলুদা সিরিজ কিনে দিয়েছিল। ভীষণ খুশি হয়েছিল ওটা পড়ে তা সঞ্জয় অংশুকে জানিয়েছে। সেরকমই পৌষ পার্বনে পিঠে থেকে শুরু করে জন্মাষ্টমীতে অংশুর পছন্দের তালের বড়া অবধি সঞ্জয় বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। মাঝে কথা হয়েছিল রেলের জমিতে যত দোকান আছে সব সরিয়ে নেওয়া হবে। খুব ভেঙে পড়েছিল সঞ্জয়। পরে একটা সেটেলমেন্ট হয়। তবে লোকাল পার্টিকে মোটা টাকাও দিতে হয় প্রতি মাসে নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। এসব নিয়ে মাঝে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে সঞ্জয়। সে সময় অংশুই এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। তবে ছেলেটার আত্মসম্মান বোধ মারাত্মক। অংশুর ছোট হয়ে যাওয়া একটা কোট ওকে ভালবেসে দিতে চেয়েছিল অংশু। কিন্তু সঞ্জয়ের হাবেভাবে বুঝেছিল নিজের জীবনের প্রথম কোট নিজের টাকা জমিয়েই কিনতে চায় সঞ্জয়। তাই আর কিছু বলেনি। সেলুনের পাশাপাশি মাঝে মাঝে দালালির কাজও করে। জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট। অংশুর এক পরিচিতের একটা ফ্ল্যাট বিক্রির দায়িত্ব অংশু সঞ্জয়কে দিয়েছিল। অংশুর সঙ্গে একসঙ্গে কলেজে পড়ত একসঙ্গে রেবা আর সুমিত, মালদা কলেজে। যদিও জুনিয়ার ছিল। দুজনেই পড়াশোনায় ছিল তুখর। পরে পিএইচডি করে কলেজের প্রফেসর হয়েছে। ওদের সঙ্গে সঞ্জয়ের কথা বলিয়ে দিয়েছিল অংশু এটুকুই। ওদের ভেতর যা কথা হয়েছিল তা অংশু সঞ্জয়ের কাছেই শোনে। বিক্রির টাকার দুই শতাংশ সঞ্জয়কে দেওয়ার কথা ছিল। ফ্ল্যাটটা এর আগে অনেকে বেচার চেষ্টা করেও পারেনি। কিন্তু সঞ্জয় সেই অসাধ্য সাধন করে দেখায়। সঞ্জয় বেশ খুশিও ছিল। অংশুকে জানিয়েছিল ওই মোটা টাকাটুকু পেলে কী কী কাজে খরচ করবে। ছেলের ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা ফিক্সড করবে, কিছুটা বউকে দেবে বাড়ি সারাইয়ের জন্য। প্রতি বর্ষায় চালা থেকে জল পড়ে ঘর ভেসে যায়। কিন্তু বড়লোকের ডিগ্রি শিক্ষা বড় হলেও মন বড় নাও হতে পারে। রেবা আর সুমিত কথা রাখেনি। মাত্র এক শতাংশ অর্থ ধরিয়ে ব্লক করেছিল সঞ্জয়ের নাম্বার। অংশুর সবটাকে বেশ খারাপ লেগেছিল কিন্তু সঞ্জয় বারবার বারণ করেছিল ‘এই নিয়ে মাস্টারদা আপনি কিছু বলবেন না। আপনার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হোক আমি চাই না। আমাকে ঠকিয়ে কি ওরা আরও বড়লোক হবে! গরীবের পাওনা মারলে সে টাকা থাকে না।’ কিছু বলতে পারেনি অংশু। শুধু বারবার এটাই মনে হচ্ছিল প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ দিন দিন বড় কমে যাচ্ছে।
ট্রেনে উঠে অংশু মনে মনে ভাবল কদিন ধরে যা চাপ চলছে ফেরার সময় বরং আজ একবার সেলুন হয়েই ফিরবে। ঘোষদা আজ আসেননি। সিটে বসতে বসতে অংশু বলল, ‘চন্দ্রদার সময় তো এগিয়ে এল তারপর? আর তো চারমাস পরেই রিটায়ারমেন্ট।’
সুমিত বলল, ‘ফেয়ারওয়েলটা আমার বিরাটির ফ্ল্যাটেই হবে। পরের মাসে ওরা থাকবে না চারদিনের জন্য। তখন প্ল্যান করে নেব। আমি রান্না করব মটন, চাটনি, বিরিয়ানি।’
‘আরে তাহলে আমি কি খাওয়াব?’ বললেন চন্দ্রদা।
‘আপনি শুধু মিস্টি আর দই আনবেন। তাহলেই হবে।’ বলল সুমিত। ইশারায় অংশুকে বোঝাল চন্দ্রদার থেকে কোনওরকম টাকা নেওয়া যাবে না। ইশারা বুঝে অংশু বলল, ‘আর বৌদিকে একবার জিজ্ঞেস করবেন কিচেনে মিক্সার নাকি ইনডাকসন কোনটা বেশি প্রয়োজন? সেটাই কিনব আমরা।’
চন্দ্র মজা করে বলল, ‘আমি ঘরে বসে যাব, আমাকে বিদায় জানাচ্ছ, আর গিফট পাবে ও। একি?’
অংশু বলল, ‘আপনিও পাবেন, সেটা সারপ্রাইজ।’
‘বাসবের কেসটা শুনেছ কি?’ বলল অরিজিত।
প্রত্যেকেই প্রায় অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কি?’
‘ওই যে ম্যাডাম, তার হাসবেন্ড কিছু আন্দাজ করে ওদের স্কুলে জানিয়েছেন। কিন্তু স্কুলই বা কি করবে, ওই বুঝিয়েছে এটুকুই। শুনলাম ভদ্রলোক নাকি ফুল ড্রাঙ্ক অবস্থায় স্কুলে গিয়ে ঝামেলা করেছে বাসবের সঙ্গে। বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার।’ বলল অরিজিত।
‘এ তো হওয়ারই ছিল। এত বাড়াবাড়ি ভাল না। কিন্তু তুমি কি করে জানলে?’ বলল চন্দ্র।
‘আরে ওদের স্কুলে আমার এক বন্ধু আছে তো। সে বলল।’
‘বাদ দিন তো ওদের কথা। এসবের পরিণতি এরকমই হয়। এখন যদি ওই ভদ্রলোক কোনও স্টেপ নিয়ে নেন এই ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে! সবাই মেনে নেবে, মানিয়ে নেবে এমন তো নাও হতে পারে। আজকাল যেদিকে তাকাই সেদিকেই নোংরামি চলছে। ভাল লাগে না। এরা স্কুলে ছাত্র ছাত্রীদের তৈরি করতে যায় নাকি ধ্বংস, ভগবান জানে?’ বলল অংশু।
‘ভগবান আছে বলে এখনও মনে হয় তোমার?’ বলল সুমিত।
অংশু কোনও উত্তর দিল না। কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না। একটা পজিটিভ শক্তিকে মনে জাগিয়ে রাখতে সাহায্য করেন ঈশ্বর বলে মনে করে অংশু। কিন্তু এত কথা বোঝানোর ইচ্ছেটা নেই নিজের ভেতর। মনে হয় যে যা বিশ্বাস করে সেই নিয়ে খুশি থাক।


(১২)
প্রিয়তোষ স্যার বেশ কমমাস হল আর ট্রেনে যাতায়াত করেন না। ওনার ফেয়ারওয়েলটা সবাই আনন্দ করে সেলিব্রেট করেছে। অংশু নিয়ে অবশ্য গেছিল। জাভেদ স্যারের ইনভিটেশন অংশু না করতে পারে না। অংশুদের দলের আর কেউ অবশ্য ওই পিকনিকে যায়নি। খুব একটা যে ভালো লেগেছিল অংশ ঠিক তা নয় তবু কিছু কিছু ফরমালিটি করতে হয়, এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেদিন যখন ওখানে সকলে আনন্দে গান-বাজনা করছিল এক কোণে বসে অংশু মনে হচ্ছিল, এই মানুষটা এরপর থেকে আর ওদের ট্রেনে যাতায়াত করবে না। কখনও আর দেখা হবে কিনা কেউ জানে না। হয়তো ওদের কিছু প্রিয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়ে যাবে। রোজকার জীবনে মানুষ যেখানে দিন দিন ব্যস্ত হয়ে উঠছে সেখানে কতটুকুই বা ফোন করে কেউ কারো খবর নেয়। নিজের আত্মীয়দের ভেতরেই এখন কারো সাথে কারো যোগাযোগ নেই। বন্ধন গুলো কেমন যেন সব আলগা হয়ে গেছে। আত্মকেন্দ্রিকতার স্বার্থপরতার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে সকলেই দিন দিন। একটা ট্রেনের জন্যই কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল একদিন। তারপর একে একে কতজন ছেড়ে গেছে কত নতুন মানুষ এসেছে। কতজনেরই বা খবর রেখেছে কেউ। অবশ্য এই উপলব্ধি অংশুর শুধু সেদিন হয়নি। প্রতিদিন যখন ট্রেনে করে স্কুল যায় স্কুল থেকে ফেরে কোথাও এই কথাগুলো মনের মধ্যে বারবার ঘুরঘুর করে। কদিন পর চন্দ্রদাও চলে যাবে। মেঘদূত তো আগেই চলে গেছে। মেঘদূত যাওয়ার পর অবশ্য ওর সাথে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। চন্দ্রদার সঙ্গেও কি তাই হবে! সবটাই সময়ের হাতে! অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও খবর নেওয়া হয়ে ওঠে না। রোজ দেখা হলেও যাদের সঙ্গে রোজ দেখা হচ্ছে সেই মানুষগুলো সত্যিই ভালো আছে কিনা! চন্দ্রদার স্ত্রীর সেই আত্মীয়, যিনি বাংলাদেশের দাঙ্গায় মারা গেলেন, কেমন আছে তার পরিবার— আর তো খবর নেওয়া হয়নি! খবর নেওয়া হয়নি চন্দ্র দার স্ত্রী এখন কেমন আছেন! খবর নেওয়া হয়নি ব্যবসার জন্য টাকা জোগাড় করতে পারলেন কিনা চন্দ্র দা। অংশুমান প্রথমে ভেবেছিল ঠিকই কিন্তু এখন মনে হয় না এই মুহূর্তে কোনও কিছু চন্দ্রদাকে দিয়ে সাহায্য করতে পারবে। হিয়া বড় হচ্ছে। ঋদ্ধি নতুন ফ্ল্যাট দেখা শুরু করেছে। একটু বড়। সেখানে একটা বড় ইনভেস্টমেন্ট হবে অংশুমানের। কোনটা আগে, চন্দ্রদাকে দেওয়া কথা নাকি ঋদ্ধি আর হিয়ার প্রয়োজনীয়তা। কী করতে পারে অংশুমান। অনেক সময় প্রায়রিটি কমিটমেন্ট এর ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসে পড়ে। তাই নতুন করে আর কোনও কিছু কথা উত্থাপনই করে না অংশু। এও কী স্বার্থপরতা নয়! জেনে শুনে এড়িয়ে যাওয়া। অংশু জানে চন্দ্রদা বুদ্ধিমান মানুষ। অংশু চুপচাপ থাকলে চন্দ্রদা ঠিক বুঝে যাবে যে আশ্বাস সে একদিন দিয়েছিল তা আর এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় না অংশু। অংশুমান এও জানে চন্দ্রদা নিজে থেকে এই সংক্রান্ত কোনও প্রসঙ্গে কথা বলবে না আর অংশুর সঙ্গে। ট্রেনের এই সম্পর্কগুলোকে দেখলে অনেক সময় অংশুর মনে হয় ওই টিফিন বক্সে রাখা ভাগাভাগি দু কামড় স্যান্ডউইচ এর মতো। একজন অনেক যত্ন করে টিফিন বাঁচিয়ে কিংবা বানিয়ে পাশের নিত্যযাত্রী জন্য একটাই স্যান্ডউইচ নিয়ে আসে। হয়তো এটাও ইচ্ছে করে। এক কামড় সে নিজে খায় অন্য কামড় তার সঙ্গীটিকে দেয়। কারণ জানে পরে স্টপেজে নেমে গেলে কিংবা অন্য কোথাও বদলি হয়ে গেলে কোনওদিন আর তার সঙ্গে দেখা হবে না। তাই যতদিন আছে মুহূর্তগুলোকে বাঁচতে চায় হয়তো। এই থেকেই তৈরি হয় বন্ধুত্ব, কারোর মধ্যে প্রেম, কারোর মধ্যে টান, কারোর মধ্যে ভালোবাসা। আবার কেউ শুধু সুযোগের অপেক্ষা খোঁজে। আসলে সকলেই হয়তো ভালো থাকার জন্য মুহূর্তের সন্ধান করে। রোজকার জীবন থেকে একটু মুক্তির স্বাদ এনে দেয় এই ট্রেনের মুহূর্তগুলো। আবার হিমাংশু দার কাছে ট্রেনটা হল তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। এর ওপর ভরসা করেই ছেলের জীবনযুদ্ধের জন্য টাকা রোজগার করছেন তিনি। যার কাছ থেকে রোজ অংশুমান ফল কেনে, সে কখনও হিয়াকে চোখেও দেখেনি। অথচ, ভালো ফল এলেই আগে মাস্টারমশাইয়ের খোঁজ করে হিয়ার জন্য সরিয়ে রাখে। অরিজিত ভাল ড্রাইফোর্স নিয়ে আসে অংশুমানের মেয়ের জন্য। সুমিত বাড়িতে কোন নতুন রান্না করলেই অংশুমানকে ফোন করে। সেরকম নতুন কোন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে নতুন কোনও খাবার ট্রাই করলেও অংশুমান সুমিতকে সঙ্গে সঙ্গে জানায়। এভাবেই তো তৈরি হয় একেকটা বন্ধন। এই ছোট ছোট মুহূর্ত গুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে লড়াই করার জন্য অনেকটা শক্তি ও পাওয়া যায়। চাকরি পাওয়ার পর থেকে এতগুলো বছর এই হাসনাবাদ লোকালে যাতায়াত করছে অংশুমান। এই পথটা এখন ওর জীবনের একটা প্রধান অংশ। এ পথে আলাপ হওয়া প্রতিটা মানুষ, তার গন্তব্যের প্রতিটা মানুষ প্রত্যেকেই অংশুর জীবনের একেকটা অংশ হয়ে উঠেছে। হয়তো বাড়িতে ঢুকলে তাদের প্রত্যেককে নিয়ে রোজ কথা হয় না। বলারও প্রয়োজন হয় না। তবু তারা আছে, তারা থাকবে। ওদের স্কুলের মিডডে মিলের রান্না করে যে দিদি অংশুমানের জন্য মনে করে রোজ আদা চা বানিয়ে দেয় স্পেশাল। ওর স্কুলের প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রী অংশুমান স্যার বলতে অজ্ঞান। গার্জেনদের কাছ থেকে কতটা ভালোবাসা পায় অংশুমান। আর জুড়ে যায় কত গল্প। ট্রেন থেকে শুরু করে ওর স্কুল পর্যন্ত প্রতিদিন যাওয়া-আশার মাঝে তৈরি হয় নিত্য নতুন গল্প। কদিন আগেই প্রমিলের বিয়ের কার্ড এসেছে ওদের গ্রুপে। প্রমিল ছেলেটা কামরায় আসছে মাস কয়েক হল। একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে। যে স্টপেজ থেকে ওঠে তার পরের স্টপেজ থেকে অহনাও ওঠে। অতটা রাস্তা দুজনে দরজার ঠিক পাশে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অংশু লক্ষ্য করে দেখেছে, ওরা এতটাই পরস্পরের চোখে ডুবে থাকে কোথায় কি ঘটছে তা আর কারোর নজরে আসে না। সেই বিয়ের কার্ড দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিল অংশু। কারণ প্রমিলের বিয়ে ঠিক হয়েছে অন্য এক মেয়ের সাথে। সে খবর অবশ্যই অহনা জানে। তবুও ওরা কি সাবলীল। প্রতিদিন একই রকমভাবে দেখা করে। হয়তো অহনার জীবনেও ঠিক এরকমই কোন ঘটনা আছে। এইসব সম্পর্কের গভীরতা অংশু বোঝেনা। সাহেবও তো তাই করেছে। ওর ভীষণ অবাকই লাগে। ও নিজের জীবনের ঋদ্ধি ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারেনা কখনও। ঋদ্ধি ওকে এতটা পূর্ণতা দিয়ে রেখেছে অন্য কেউ কখনও ওকে আর প্রভাবিতই করতে পারেনি। ও যেটুকু মেশে নিজের কলিগদের সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। সেটা কেউ না জানুক ঋদ্ধি খুব ভালো করে জানে। অংশুর তাই বারবার মনে হয় প্রকৃত ভালোবাসা পেলে সত্যিই কি কেউ তার রিপ্লেসমেন্ট চায়! তা বলে কি ঋদ্ধির সঙ্গে ওর সমস্যা হয় না? মনোমালিন্য হয় না? সম্পর্কটা তো নুন চিনি মসলা পাতি সবকিছুর মিশেল। সবকিছুই থাকতে হয় না হলে বিষাদ লাগে। সমস্যা হলে মিটিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দুজনকেই আবার নতুন করে ভাবতে শেখায়। মানুষ পাল্টানোটা কোন সমস্যার সমাধান নয় বলেই মনে হয় অংশুর। সবারই মধ্যে দোষ গুণ থাকে। তবে এতকিছু ও কখনও কারো সঙ্গে শেয়ার করে না। সবটাই শুধু লক্ষ করে যায়।
মনটা সকাল থেকেই বড় অস্থির অংশুর। খবরের কাগজেও ঠিকমতো মন দিতে পারছে না। ঋদ্ধি অনেকক্ষণ আগে কফি দিয়ে গেছে। রবিবারের সকালটা অনেকদিন পর বড় আলিসে লাগছে। না হলে সপ্তাহে একটা ছুটির দিনেই সবচে বেশি কাজ থাকে। তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল অংশুর। প্রণব তলাপাত্র ফোন করেছে। নামটা দেখে একটু চমকেই গেছিল অংশু। ছেলেটির সঙ্গে আলাপ হয় করোনার পর। ট্রেনে করে আরও দুতিনটে ছেলেকে নিয়ে নানান স্টেশনে যেত। পথ শিশুদের কখনও খাবার কখনও পড়াশোনার সরঞ্জাম কখনও আবার জামাকাপড় বিলি করত। সেও এক আলাদা গল্প। ফোনটা ধরে অংশু হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে প্রণব বলল, ‘কেমন আছো অংশুমানদা? অনেকদিন পর তোমার গলা শুনলাম।
অংশু বলল, ‘হ্যাঁ, সেই যে তুমি ট্রেন ছাড়লে তারপর তো আর এদিকে এলেও না, যোগাযোগ হলো না! তার প্রায় দু’বছর তো হয়ে গেল বলো?’
‘হ্যাঁ, সেটা ঠিকই! আমরা সকলেই নিজেদের নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে গেছি শুধু শুধু হয়তো কাজ ছাড়া ফোন করাই হয়ে ওঠে না। শুনতে খুব খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি আজও তোমাকে ফোন করেছি একটা কাজের জন্যই।’
কথাটা শুনে অংশু একটু অবাকই হল। বলল, ‘আমার সঙ্গে তোমার কি কাজ আবার?’
‘আছে অংশুদা, আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না। জীবন আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছে তারপর খুব ভেবেচিন্তেই মানুষের উপর বিশ্বাস করি! তুমি তো জানোই আমার সব কথা, নতুন করে আর কি বলব! অনেক কিছু হয়েছে এই জীবনে। এখন যে কাজটা করি সেটাই আমাকে নতুন করে বাঁচার আশা যোগায় প্রতিদিন। এমনকি ওটার জন্য চাকরিটাও মন দিয়ে করতে পারছি।’
‘তোমার ভেতর এই পজিটিভিটিটাই আমার সবথেকে ভালো লেগেছিল। বলা ভালো লাগে। এতকিছু হওয়ার পরেও তুমি হেরে যাওনি। নতুন ভাবে ফিরে এসেছ আবার। তোমার ভালোবাসাকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে রেখেছো তোমার কাজের মধ্যে দিয়ে। ক’জন পারে এভাবে ভাবতে! আজকের দিনের সম্পর্ক গুলো যখন এতটাই ঠুনকো, সেখানে তোমার মত মানুষ তো বিরলই।’
‘তুমি আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসো বলে কথাগুলো বলতে পারলে, সবাই বলে না!’
প্রণবের কাছ থেকে কথাটা শুনে অংশু একটু চুপ করে থাকল। ঠোঁটে একটু চাপা হাসি ফুটে উঠছে। হাসিটা খানিকটা নিজের ওপর। নিজের জন্য। সত্যি মানুষের প্রশংসা করতে সকলে পারেনা, যতটা সহজে নিন্দে করতে পারে। ভাগ্যিস ঈশ্বর অংশুকে অন্তত সেইটুকু গুণ দিয়েছেন যে ভালোটাকে ভালো বলার উদারতা ওর ভেতর আছে। প্রণবের জীবনটা বড্ড কঠিন। করোনার ঠিক পর পর ছেলেটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তখনই শুনেছিল ওর অতীত নিয়ে। পাশের বাড়ির একটা মেয়ে, বলা যায় ওর সঙ্গেই প্রায় বড় হয়েছে, ঋধিমা মনে হয় মেয়েটার নাম, ছেলেবেলার বন্ধুত্ব কখন যেন রূপ নিয়েছিল ভালোবাসায়। দুজনে বিয়ে করল। প্রণব তখন চাকরি করে কলকাতায়। ঋধিমা চাকরি পায়নি। বিয়ের দু বছরের মাথায় ঋধিমা সরকারি চাকরি পেল ঠিকই কিন্তু পোস্টিং হল বীরভূম। বছর ঘুরতে না ঘুরতে এই প্রণব টের পেতে থাকল রিধিমার মধ্যে পরিবর্তন আসছে। কিন্তু পরিবর্তন যে ঝড়ের আকার নিয়ে ওর সংসার তোলপাড় করে দেবে তার আঁচ প্রণবের কাছে পৌঁছায়নি তখনও। ঋধিমা প্রায় দুমাস কলকাতা আসেনি। প্রণব আসতে বললে কাজের বাহানা দেখায়। প্রণব যেতে চাইলে বলে গার্লস পিজিতে সমস্যা চলছে, অফিসে নানান চাপ, কদিন পরে আসতে। একদিন অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে প্রণব। ঋধিমা তখন বীরভূমেই। সকাল সকাল ফোন করল। যেদিন এই কথাগুলো প্রণব অংশুমানকে শেয়ার করেছিল অংশ স্পষ্ট মনে আছে প্রণবের গলা কেঁপে উঠেছিল পুরো। সেদিন ঋধিমার কথা শুনে তার থেকে ওর মোবাইল ফোন পড়ে ভেঙে গিয়েছিল। অবশ্য বুঝতে পেরেছিল ঠিক কতটা আঘাত পেলে এরকম ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে ঋধিমার প্রতি এত বছরের অন্ধ বিশ্বাস, ভরসা সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে গেল শুধু একটা কথায়, ‘প্রণব আই অ্যাম প্রেগনেন্ট।’ ওদের অফিসেরই এক কলেজের সঙ্গে সংসার পাতলো ঋধিমা। যে স্বেচ্ছায় যেতে চায় প্রণব তাকে আটকানোর কোনওরকম চেষ্টাও করেনি। ডিভোর্সের পর প্রণব সিফট করল পুনাতে। সেই সময়ও কাজের মধ্যে থাকলেও ডিপ্রেশন পিছন ছাড়েনি। এভাবে কাটল বেশ কয়েকটা বছর। তারপর হঠাৎ স্কুলের এক পুরনো বান্ধবীর সঙ্গে কথা হতে শুরু করল নতুন করে। সেই কথাবার্তা চলতে চলতে দুজনেরই ভেতর একটা নির্ভরতার জায়গা তৈরি হল। দুজনেই সিদ্ধান্ত নিল বিয়ে করবে। প্রণব ট্রান্সফারের চেষ্টা করতে শুরু করল কলকাতায়। তখন দেশে করোনার দাপাদাপি চলছে। সবাই ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে প্রায়। ওদের বিয়েটাও ঠিক হল ওই সময়ের মধ্যেই। বিয়ের দুদিন আগে প্রণব কলকাতা ফিরল। যার সঙ্গে বিয়ের ঠিক হয়েছিল সেই মেয়েটি পারমিতার অ্যাজমার সমস্যা ছিল। খুব ছিমছাম করে বাড়ির কয়েকজনকে নিয়ে বিয়েটা হয়েছিল ওদের। কিন্তু তারপরেই পারমিতার জ্বর। আর বেশি সময় নেয়নি মেয়েটা। ছয় দিনের মাথায় পারমিতা সবাইকে ছেড়ে চলে গেল। প্রণব নিজের মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলল। চোখের জল তো দূরের কথা কোন কিছু বোঝার ক্ষমতাও বোধহয় ওর সে সময় ছিল না। নিজেকে দোষী মনে হতে লাগল প্রনবের। পুণা থেকে যেহেতু কলকাতায় এসেছিল বারবার মনে হতে লাগল যদি একবার ওর টেস্টটা করাত তাহলে হয়তো আজ পারমিতা পৃথিবীতে থাকত। নিজেকে পুরোপুরি ঘর বন্দী করল প্রণব। বাড়ির লোকেরা একেবারে অসহায়। প্রণবের বেশ কিছু বন্ধু এগিয়ে এলো সাহায্য করার জন্য। তাদের মধ্যে একজন ছিল ডাক্তার। জোর করে ফোনে কন্টাক করে প্রণবকে ঘর থেকে বের করা, ঠিকমতো চিকিৎসা করানো, কাউন্সিলিং করানো কোন কিছুর ত্রুটি রাখেনি তারা। সেই সময় প্রণব কোনও এক আশ্রমে যেতে শুরু করে। নানান সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে সে বুঝতে পারে এই যে প্রকৃতির ভেতর সে সুস্থভাবে শ্বাস নিচ্ছে, মানুষের জন্য কাজ করছে– এটাই একমাত্র জীবনের সত্য। নিত্যদিন মানুষের দুঃখ যন্ত্রণাগুলো দেখতে দেখতে মনে হল অন্যের কষ্টের কাছে তার যন্ত্রণা বড়ো তুচ্ছ। সে যে সুযোগ পাচ্ছে নতুনভাবে জীবনটাকে দেখার— এটাই বা কজন পায়! নিজের মৃত স্ত্রী নিজের ভালবাসা পারমিতার নামে খুলল লাইফ ইজ বিউটিফুল বলে একটা সংস্থা। সেই সংস্থা দুঃস্থ বাচ্চাদের জন্য কাজ করতে শুরু করল। প্রণব আর ওর বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে প্রথম ওরা হাওড়ায় একটা বস্তি এলাকায় প্রায় দুশ বাচ্চাকে প্রথম খাবার আর পড়াশোনার সামগ্রী দিয়েছিল। তারপর থেকে নানা জায়গায় ওদের ক্যাম্পেন চলতে থাকে। পারমিতার জন্মদিন বড় করে সেলেব্রেশন কর সেলিব্রেট করে ওই দুস্থ বাচ্চাদের সঙ্গেই। নানান অনাত আশ্রমেও যায়। বিনামূল্যে কোচিং দেওয়া থেকে শুরু করে নানান প্রয়োজনীয়তা মেটানো ওদের সংস্থার উদ্দেশ্য। পারমিতা বাচ্চা ভীষণ ভালোবাসত। প্রণব তাই এভাবেই তার ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রেখেছে আজ পর্যন্ত। অংশুর সঙ্গে যখন ওর আলাপ হয় সেই সময় ওদের সংস্থা কাজিপাড়া, হাড়োয়া, বসিরহাট, হাসানাবাদ, টাকী এইসব নানান জায়গায় যোগাযোগ করে দুস্থ বাচ্চাদের সাহায্য করতে যেত। অনেক বছর পর প্রণবের কথা শুনতে শুনতে কেমন ভাবুক হয়ে গেল অংশু।
‘ও অংশু দা ফোনে আছো?’
‘হ্যাঁ, বলো শুনছি।’ সম্বিত ফিরে এল অংশুর।
‘বলছি যে আমাকে একটা বিষয়ে একটু খোঁজ দিতে পারবে? তোমার স্কুলের আশেপাশে আর ক’টা কোয়েড স্কুল আছে একটু আমাকে জানাও— আমরা নতুন একটা ক্যাম্পেন শুরু করেছি। কোয়েল স্কুলগুলোতে গিয়ে আমরা বয়ঃসন্ধির সতর্কতার ওপরে একটা দুটো করে ক্লাস নিচ্ছি। তোমাদের স্কুলে একটু জিজ্ঞাসা করে দেখো যদি যার তারা ইন্টারেস্টেড থাকে।’
‘তুমি তো জানো প্রণব আমি হাই মাদ্রাসায় চাকরি করি! যদিও সিনিয়র মাদ্রাসা নয়— তবুও এইসব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি খুব একটা আলোচনা এখনো অব্দি স্কুলে হয়নি কখনও। আমি অবশ্যই কথা বলে দেখব চেষ্টা করব যদি কোন ভাবে এটা করা যায়।’
‘এরা স্কুলে মেয়েদেরে ইকো ফ্রেন্ডলি প্যাড ডিস্ট্রিবিউট করব। যেগুলো রিইউজেবল। আর মেনস্ট্রুয়াল কাপ সম্বন্ধেও আলাদা করে বোঝানো হবে। আমাদের দলের ফিমেল মেম্বাররা এই কাজগুলো করে। যদিও আমরাও থাকি। তুমি প্লিজ একটু কথা বলে দেখো।’
‘উদ্যোগটা ভীষণই ভালো! কিন্তু এখানে এক্সিকিউট করা খুব চাপ! বুঝতেই পারছ, ওত খোলাখুলি নাইবা বললাম। আমি আমাদের হেড স্যারের সঙ্গে কথা বলব অবশ্যই তবে তোমাকে আমাদের দুজন স্কুলের ম্যাডামের নাম্বার দেব। আমিও বলে রাখব, তুমি সরাসরি তাদের সঙ্গে কথা বলো। আমার থেকে ওরা আরও বেশি তোমাকে সাহায্য করতে পারবে বলে আমার মনে হয়। কারণ ওনারাও অনেক দিন থেকে মেয়েদের সঙ্গে এই নিয়ে একটা ক্লাসের কথা ভাবছেন।’
‘ঠিক আছে অংশুদা। তুমি আমায় নাম্বার দুটো হোয়াটসঅ্যাপ করে দিও। আর কি কথা হল সেটা দুদিনের ভেতর অবশ্যই জানিও। আমাদের স্কেডিওল ঠিক করতে হবে এলাকাভিত্তিক।’
‘একদম।’
ফোনটা রাখার পর মনটা ভাল লাগছে অংশুর। পজিটিভ মানুষদের সঙ্গটা এমনই চারদিকটা কেমন আরও বেশি উজ্জ্বল লাগে। জীবনটাকে জলের মতো। ঢাল পেলেই গড়াতে চাইবে যেদিকে খুশি। কিন্তু নদী ভাবলে সঠিক পথ সে নিজেই খুঁজে নেবে।
আর দেরি না করে হেডস্যারকে ফোন করল অংশু। শুভ কাজে দেরি করতে নেই। মনে সদিচ্ছা আর ভাল কিছু করার জেদ থাকলে অসাধ্যও সাধন হয়।

(১৩)
অরিজিতের ডিভোর্সটা পরের মাসে। আপাতত একটা বিষয়ে বেশ স্বস্তি— কোর্টে ওদের প্যানেলটা বাতিল হয়নি। অতএব কারও চাকরি যায়নি৷ খবরটা পাওয়ার পরই সুমিত মায়াপুর যাওয়ার প্ল্যানটা বানিয়ে ফেলেছে। শীতের ছুটিতেই করে ফেলতে হবে। ঠিক হল প্রথমে সুমিতের গাড়িতে যাওয়া হবে। কিন্তু সুমিত কেয়াকে শেষমেশ আর বলে উঠতেই পারল না কথাটা৷ কোথাও বারবার মনে হতে লাগল আবার যদি কোনও কটূক্তি ধেয়ে আসে। তার চেয়ে কোনও কথা না জানানোই ভালো। তাই শেষমেশ অংশুর গাড়িতেই চারজন মিলে যাবে এমনই ঠিক হল।
সকাল সকাল অংশু তৈরি হয়ে হিয়াকে স্কুলে ড্রপ করে সোজা চলে গেল ওদের তুলতে। কথা আছে একেবারে কৃষ্ণনগরে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সারবে। গাড়িতে অরিজিৎ বেশ চুপচাপ। চন্দ্রই প্রথম কথা শুরু করল,
‘মায়াপুর যে কতবার গেছি— একবারও ভেতরে যাই না। আমার বাইরেই গাছ ফুল দেখতে বেশি ভালো লাগে।’
‘কেন চন্দ্রদা?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল সুমিত।
‘জানোই তো এই ইসকন একটা আন্তর্জাতিক হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন, যা গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন অনুসরণ করে কৃষ্ণকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর হিসেবে পুজো করে। এটাও জানো নিশ্চয়ই একটা সময় যুক্তরাজ্যে হরে কৃষ্ণ আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ছিল নানা রকম— কখনও অনুকূলে, কখনও প্রতিকূলে। শুরুর দিকে তরুণদের মধ্যে এই নতুন উপসংস্কৃতির আচরণ, নতুন ধর্মীয় আন্দোলনের প্রভাবে তাদের জীবনধারণের ধরণ অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ অ্যান্টি-কাল্ট আন্দোলন ইসকনকে নতুন “কাল্ট” হিসেবে বিবেচনা করে। আসলে যুক্তরাষ্ট্রে হরে কৃষ্ণ আন্দোলন আশির দশকের শেষভাগ পর্যন্ত গুরু-সংক্রান্ত সংকট ও সদস্যদের সরে যাওয়ার কারণে ক্রমশ দুর্বল হয়ে গেছিল। আরও নানান কারণ, ঠিক মনেও নেই। তবে নব্বইএর দিকে আবার সাধারণ ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে প্রচার ও সংযোগ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়। অনেক গবেষক মনে করে, গত কয়েক দশকে ইসকনের মধ্যে এক ধরনের “হিন্দুকরণ” প্রক্রিয়া ঘটেছে। প্রভুপাদ কৃষ্ণভাবনাকে হিন্দুধর্ম থেকে আলাদা করে দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেন ওটা কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং একটা সার্বজনীন শিক্ষা।’
‘কিন্তু এতে ক্ষতি কি চন্দ্র দা? হিন্দুরা নিজেদের ধর্ম নিয়ে কথা বললেই যত সমস্যা! আর ওদিকে ওরা তো সবসময়…..’
‘তুমি অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছ সুমিত। তাহলে ওদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়? শিক্ষা, সংস্কৃতি এদেশের ঐতিহ্য সব মিথ্যে? এ কি চৈতন্য দেবের আদর্শ? এসব কারণে আমি যে কোনও ধর্মীয় স্থান থেকে দূরেই থাকি।’
‘আমি ওত শত জটিলতা বুঝি না। আমরা সাধারণ মানুষ, অতি সাধারণ চিন্তা। কৃষ্ণ মানি, জগন্নাথ মানি। ঈশ্বর মানি…’
আলোচনা গম্ভীর দিকে যাচ্ছে দেখে অংশু বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। কথাতেই তো আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কেন!’ কথাটা বলেই অংশুর মনে হল, তা হলে ঋদ্ধির ইচ্ছেগুলো কী দোষ করল! ঋদ্ধির স্বাধীনতাতেও ওর হস্তক্ষেপ করা তো অনুচিত।
সারাটা রাস্তা অরিজিৎ বেশ চুপ। চন্দ্র তা লক্ষ করে বলল, ‘কিছু বলছ না যে ভাই? মন খারাপ নাকি!’
‘না তেমন কিছু না। আসলে শেষ এসেছিলাম মৌকে নিয়েই। সেটাই…’
‘এগুলোই তো লড়াই। থামলে চলবে?’
কথার মোড় ঘোরাতে অংশু বলল, ‘কৃষ্ণনগর কিন্তু আর পনেরো মিনিট। কে কী খাবেন ভেবে রাখুন। খুব বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না ওখানে। যতদূর জানি মন্দির কিন্তু একটার পর বন্ধ হয়ে যায়। ওই টাইমে ঢুকতে না পারলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।’
কৃষ্ণনগরে ব্রেকফাস্ট সেরে, বিখ্যাত সরপুরিয়া আর সরভাজা কিনে গাড়িতে উঠল ওরা। মায়াপুরের বিরাট মন্দিরের চূড়ো বেশ দূর থেকে দেখা যায়। কুয়াশা কাটিয়ে রোদের নরম ছোঁয়া লেগেছে তখন। গাড়ি পার্কিং এ বেশ ভিড়। হাতে খুব বেশি সময় নেই। অনেকটা হেঁটে মন্দিরে ঢুকতে হবে। তাড়াতাড়ি পা চালাল ওরা। চন্দ্র যেহেতু বাইরে বসবে তাই ব্যাগ, মোবাইল, জুতো ওর তদারকিতে রেখে তিনজন লাইনে দাঁড়াল। অংশু লক্ষ করল অরিজিৎ আরও চুপ করে গেছে। মন্দিরের ভেতরটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা। ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে প্রভুর সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। দুপাশে চোখ যেতেই অরিজিৎ আর সুমিতকে দেখে অবাক হয়ে গেল অংশু। গোবিন্দর দিকে নিষ্পলক চেয়ে ঝরঝর করে কাঁদছে অরিজিৎ। আর সুমিত সষ্টাঙ্গ প্রণাম সারছে মহাপ্রভুর সামনে। এত বছরের আলাপে কখনও কোনওদিনও ওদের এই রূপ সামনেও আসনি। ওদের ভক্তিভাবে হতবাক অংশু। অরিজিতের হুঁশ নেই চারপাশে কে আছে। সামনে শুধু প্রভু কৃষ্ণের ছটা। সেই আলোয় চোখ ছলকে উঠছে ওর। সুমিত গোটা মন্দিরটা প্রদক্ষিণ করল করজোরে। দুচোখ বন্ধ। ওর প্রার্থনার তৃপ্তি মুখে চোখে ফুটে উঠছে স্পষ্ট। কত নতুন ভাবে মানুষকে চেনা যায় নতুন নতুন পরিস্থিতিতে। নতুন দৃশ্য কতকী চিনিয়ে দিয়ে যায়। জীবনের বহুদিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখে যা দেখে, তাই সর্বদা সত্যি নয়। তারও ভেতর আরও কত স্তর। প্রভু চৈতন্যও তো সেই স্তরকে আবিষ্কার করতেই ছুটে গিয়েছিলেন ঈশ্বর সন্ধানে। চৈতন্যের ভেতর তো কৃষ্ণরাধা দুই ভাবই বিদ্যমান৷ তবেই তো ঈশ্বরের লীলা তিনি একজন ভক্তের চোখ দিয়ে মন দিয়ে অনুভব করেছেন। ভক্তি মানুষকে বিশ্বাস করতে শেখায় জীবন বড় সুন্দর। ঈশ্বরের অস্তিত্ব হল ভক্তের বিশ্বাসে। কিন্তু আমরা কতটুকু বুঝি। বাহ্যিক আড়ম্বর আর চাপিয়ে দেওয়া ধর্মের বুজরুকিকে সত্যি ভেবে ভক্তির নামে প্রহসন দেখি। অংশু আজ যা উপলব্ধি করল সেই উপলব্ধি ওদের নাও হতে পারে। সকলের মনন গভীরতা যে এক হবে তার তো কোনও মানে নেই। কিন্তু ঈশ্বর প্রেম তো কোনও বিশেষ ধর্ম মানে না। তা সব ধর্মের জন্য এক। অংশুর কাছে ঈশ্বর মানে আলো। জীবনের প্রতি পজিটিভ থাকা। মুখে বললেও কতটুকু মানতে পারে! ভেতরটা কেমন ছটফট করছে অংশুর। কত ভুল। রোজ কত কত ভুল করে চলেছে। কী করে শুধরাবে নিজেকে। অংশু চুপচাপ বের হয়ে এল মন্দির থেকে। অরিজিৎ এখন অনেক হালকা। নিজে থেকেই বলতে লাগল ওরা প্রতিবছরই দুটো দিন এখানে এসে থাকে। মন্দিরের ভোগ গ্রহণ, সন্ধের আরতি দেখা, তহবিলে দান সবই করে। প্রভুর পুজো ছাড়া অরিজিৎ বাড়ি থেকে বের হয় না কখনও। ওর বিশ্বাস প্রভুর আর্শীবাদ ওর নিত্য চলার সঙ্গী। চাকরিটাও প্রভুর কৃপায় রক্ষা পেয়েছে। আর সুমিতের গল্পটা একটু অন্যরকম। সুমিতের মা বাবা জগন্নাথ ভক্ত। সুমিত সেই পরিমণ্ডলেই বড় হয়েছে। সেই প্রভুর আলোই ওর জীবনের পথরেখা। সেই টানেই প্রতিবার পুরী যায়। মায়াপুর দর্শনে আসে। চৈতন্য ওকে টানে। পকেট থেকে মহাপ্রভুর ছবিখানা বের করে চোখ বন্ধ করে কপালে ঠেকাল সুমিত। অংশুর সামনে অচেনা পর্দাগুলো কেমন এক এক করে খুলে যাচ্ছে। মানুষকে চেনা কতটা কঠিন। যাকে রোজ দেখে সেও কোথাও গিয়ে অচেনা। সত্যিই হয়তো তাই কেউ কারও অধিকারস্থ নয়। বন্ধু, স্ত্রী, স্বামী, মা, বাবা, প্রতিটা সম্পর্ক সতন্ত্র। তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা আছে। নিজস্ব আলো আঁধার আছে। যতক্ষণ না সেই আলো বা আঁধার সে নিজে অপরের সামনে এনে রাখে ততক্ষণ তা অধরা অজানা। ঋদ্ধি হয়তো এটাই বোঝাতে চেয়েছে বারবার। এটাই হয়তো সেই স্পেস, যেখানে প্রতিটা মানুষ শুধু তার নিজের।
চন্দ্র বলল, ‘চলো ওদিকে। একটু পেট পুজো করি।’ ওরা বেরিয়ে এসে সোজা চলল গোবিনদাসের পথে। সুস্বাদু ভোজন না হলে সুমিত আবার অস্থির হয়ে ওঠে। জিভের স্বাদকোরকগুলোকে চাঙ্গা করে নিয়ে আবার ফিরে চলল গাড়ির দিকে। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে কী মনে হল, অংশু বলল, ‘আপনারা এগোন, আমি আসছি।’
ওরা গাড়ির কাছে পৌঁছে গেছে বেশ খানিকক্ষণ হল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখল অংশু ফিরছে হাতে করে একটা প্যাকেট নিয়ে। ওটা দেখে অরিজিৎ জিজ্ঞেস করল, ‘কী কিনলে?’
‘যে অরেঞ্জ কেকটা খেলাম, ওটাই নিয়ে যাচ্ছি বাড়ির জন্য! ঋদ্ধির পছন্দ হবে।’
ওরা ফিরে চলল বাড়ির পথে। মনটা সত্যিই কেমন ফুরফুরে সকলের। ট্রেন থেকে শুরু হওয়া পরিচয়ের ঘাট পেরিয়ে চারটে আলাদা মানুষ হয়ে উঠেছে একে অন্যের জীবনের একটা অংশ। ছোট হলেও সে অংশের গুরুত্ব অনেক। চারটে চার ধারার জীবন, তবুও কোথাও গিয়ে তোয়ার মতো মিশেছে মূলস্রোতে। সুমিতের চোখের কোণে জল, আনমনে বলল, ‘মেয়েটাকে আনব পরের রবিবার। ওকে ছাড়া এলাম তো….’
‘শুধু মেয়ে সুমিতদা? বৌদি…?’ বলেই হেসে উঠল অরিজিৎ।
সুমিত ঘাড় নেড়ে বলল, ‘কেয়াকে আনব। সবাই মিলে আসব।’
চন্দ্র অরিজিৎকে বলল, ‘তুই তোর প্রভুর ওপর বিশ্বাস রাখ। যেভাবে একটা বিপদ কাটিয়েছে অন্যটাও কেটে যাবে।’
অংশু আড় চোখে একবার দেখে নিল চন্দ্রকে। চন্দ্র জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। আসলে যারা ঈশ্বর বিশ্বাস করে, তাদের নিজেদের হালকা করার একটা জায়গা থাকে। যে জায়গাটা চন্দ্রদার নেই। তাকে নিজেকে কতটা শক্ত করতে হয়েছে যে জীবনের লড়াইয়ের দায়ভার সে কখনও কাউকে দিতে পারে না। শুধু হাসিমুখে সবটা সামলে নেওয়ার মতন মনের জোর রাখে। তাইতো চন্দ্রর মতন মানুষরা যেন বটগাছ। আর অংশু? অনেক কিছু এখনও শেখা বাকি। ঈশ্বরে বিশ্বাস করুক বা না করুক জীবনই যে প্রধান শিক্ষক সেটা অংশুর কাছে পরিষ্কার। রোজকার ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে শেখার মতো ভালো দিক আর নেই। ঈশ্বরকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার ক্ষমতা ওর নেই। অংশু কখনও চন্দ্রর মতো হতে পারবে না। আবার সুমিত বা অরিজিৎ এর মতোও না। অংশু ওরই মতো, স্বতন্ত্র। ঠিক যেমন ঋদ্ধি, স্বতন্ত্র। এতদিন অংশু যা ভেবে আসত, ঋদ্ধি কেন অন্য মেয়েদের মতো নয়, কেন এত বেশি স্বাধীন যা অংশুর অপছন্দ, সেই চিন্তাটা কতটা ভুল। আসলে অংশুকে নয় ঋদ্ধিকে মানিয়ে নিতে হয়েছে অনেক কিছু শুধুমাত্র অংশুকে খুশি করার জন্য।
সকলকে বাড়ির পথে নামিয়ে দিয়ে অংশু ফিরে গেল নিজের ঠিকানায়। গ্যারেজে গাড়িটা রাখার পর ফোনটা বের করল পকেট থেকে। নেটটা অন করতেই টুংটুং করে ঢুকতে শুরু করল হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ। সবার আগে চোখে পড়ল বাসবের মেসেজ। বহুদিন পর বাসব মেসেজ করেছে। ওর ছেলের জন্মদিনের পার্টি। ঋদ্ধিকে নিয়ে আসার জন্য নিমন্ত্রণ করেছে। এও লিখেছে শ্রাবণী ঋদ্ধিকে ফোন করে নেবে। এরপরেই চোখ পড়ল ওদের ট্রৈনিক গ্রুপে। ছবিগুলো পরপর পোস্ট করছে সুমিত। অংশুর বেশ কয়েকটা ভালো ছবি তুলেছে অরিজিৎ। সেগুলোতে পরপর রিঅ্যাক্ট করে অংশু ফোনটা পকেটে ঢোকাতে যাবে তখনই সুমিতের আরেকটা মেসেজ চোখে পড়ল। সুমিত লিখেছে, ‘আজকের এই সাকসেসফুল ট্রিপটার আনন্দে আগামী তিরিশ তারিখ বরং কড়াই শুটির কচুরি আর নলেন গুড়ের পায়েস হয়ে যাক। আমি নিয়ে যাব বানিয়ে। তারপর চন্দ্রদার ফেয়ারওয়েলও দিতে হবে। এবার তো মানুষটাকে ছেড়ে দিতে হবে, কষ্ট হলেও কিছু করার নেই। এটাই তো আমাদের ট্রৈনিক জীবন।’
উত্তরে ছোট্ট একটা ‘হুম’ লিখে ফোনটা পকেটে ভরল অংশু। এটুকু অক্সিজেন আছে বলেই ভিড় ঠেলে রোজকার ট্রেন জার্নিটা এতটা ভাল লাগার। বাড়ি ফিরে এসে হয়তো সেসব নিয়ে খুব একটা আলোচনা করা হয় না। কিন্তু মনের ভেতর তার যে রেশ রয়ে যায় তা একেবারে রূপকথার মতো।



সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়ের “হাসানাবাদ লোকাল” উপন্যাসটি মূলত ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের জীবন নিয়ে লেখা। শিয়ালদহ-হাসানাবাদ লোকাল ট্রেনের একটি নির্দিষ্ট কামরার বারোজন যাত্রীর একটি গ্রুপকে কেন্দ্র করে কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। প্রধান চরিত্র অংশুমান, যিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক এবং বারাসাত থেকে প্রতিদিন এই ট্রেনে যাতায়াত করেন। অংশুমানের স্ত্রী ঋদ্ধি একজন স্বনির্ভর এবং গোছানো নারী। তিনি ঘর সামলানোর পাশাপাশি নিজের ছোট ব্যবসা এবং ফ্রিল্যান্সিং কাজও সামলান। অংশুমান মনে মনে তার স্ত্রীর এই দক্ষতার জন্য অত্যন্ত গর্বিত। এই গ্রুপে বিভিন্ন পেশার মানুষ আছেন—যেমন সুমিতদা (যিনি একটু নারীবিদ্বেষী বা রক্ষণশীল মনোভাবের), মেঘদূত (একজন বিচারক), ঘোষদা এবং অন্যান্য স্কুল শিক্ষকরা। ট্রেনের এই প্রাত্যহিক যাতায়াতের মধ্যে দিয়ে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব ও সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়েছে।
উপন্যাসটিতে যে বিষয়গুলি উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে :
মধ্যবিত্তের প্রাত্যহিক সংগ্রাম: প্রতিদিনের অফিস বা স্কুল যাওয়ার তাড়াহুড়ো, ট্রেন ধরা এবং যান্ত্রিক জীবনের বাস্তব চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে।
ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন: গল্পে দেখা যায় সময়ের সাথে সাথে মানুষ বদলে যায়, ট্রেনের সাথীরা বিদায় নেয় (যেমন মেঘদূত বা চন্দ্রদা), এবং মানুষের মধ্যে এক ধরণের আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি হয়।
নৈতিক দ্বন্দ্ব: উপন্যাসের এক পর্যায়ে অংশুমানকে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি (বন্ধু চন্দ্রদাকে আর্থিক সাহায্য করা) এবং নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তার (নতুন ফ্ল্যাট কেনা) মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়।
এটি মূলত মানুষের সম্পর্কের পরিবর্তনশীলতা এবং প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট আনন্দ-বেদনার একটি সুন্দর প্রতিফলন। আপনি যদি প্রতিদিন ট্রেনে যাতায়াত করা বা মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট গল্প পছন্দ করেন, তবে এই উপন্যাসটি আপনার ভালো লাগবে। তবে উপন্যাসটির বিশেষত্ব কেবল একটি ট্রেন যাত্রার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমকালীন জীবনের কিছু সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দিকও উন্মোচন করে। যেমন লোকাল ট্রেনের যাত্রীরা একে অপরের খুব কাছের হলেও, সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে সেই বন্ধনগুলো কীভাবে আলগা হয়ে যায়, তা এখানে খুব সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। মেঘদূত বা প্রিয়তোষ স্যারের বিদায়ের পর তাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াটা আমাদের সমাজের “ব্যস্ততা ও আত্মকেন্দ্রিকতার” এক নির্মম দর্পণ।