পারস্যে গোলাপ নেই  <br />  চিরশ্রী দেবনাথ

পারস্যে গোলাপ নেই
চিরশ্রী দেবনাথ

রাতের কি ছায়া হয়?  অথবা আলোর হাতে ধরা একাকী এক আলো?  নাহিদের কবিতাগুলোর অনুবাদ করতে করতে অনির্বাণের তাই মনে হচ্ছিল। স্যার বলেছিলেন কবিতা অনুবাদ করার আগে নাহিদের সঙ্গে কিছু কথা বলে নেবার জন্য। অবশ্য ফোন নাম্বার নেই। একটি ইমেল এড্রেস শুধু।

অনির্বাণ প্রথমে বিরক্ত হয়েছিল স্যারের প্রতি। আরো অনেক ইরানি  কবি আছে যাদের কবিতাগুলোর অনুবাদ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হতো তার কাছে। কিন্তু এমন এক কবির কবিতা তাকে প্রজেক্ট হিসেবে ধরিয়ে দিলেন যার সম্বন্ধে আগে বা পরে কোন ব্যক্তিগত ধারনা তৈরি করা অসম্ভব।

নাহিদ নাকি ভয়ঙ্করভাবে আধুনিক একজন ইরানি কবি। যার নিভৃত অন্তরালে আলোক ফেলতে একমাত্র অনির্বাণকেই মনে হলো স্যারের।

 

“এখন শব ঘোরাফেরা করছে।

ঘোড়াদের দৌড়ে দুজন মেয়ে চাবুক হাতে

গোলাপের কবিতা লেখা বন্ধ করো ইরান

শবের মেহফিলে আমি প্রেমে পড়েছি”

 

এরকম খাপছাড়া অনুবাদ করে অনির্বাণ হেসে ফেলল।  বিরক্ত লাগছে । এই মহিলার সঙ্গে কথা বলার কোন মানে হয়?

ইন্টারনেট ঘেঁটে ইরানি কবি নিহাদের কবিতা সম্পর্কে বেশি কিছু তথ্য পায়নি অনির্বাণ। দুটো কবিতা পেয়েছে,  যেগুলো সুফি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত,  কিছুটা ঈশ্বর , বিশ্বাস, প্রেম ইত্যাদি । তেমন সাংঘাতিক নয়। তবে স্যার ওকে বেশ কিছু কবিতা দিয়েছেন নিহাদের , ফারসিতে লেখা। সামনের লিট ফ্যাস্টিভ্যালে অনির্বাণকে বলতে  হবে সুফি কবিতায় ইরানের মহিলা কবিদের পদচারণা অনেকটা এরকম বিষয়ে , যদিও এর সঙ্গে ইরানের লিরিক্যাল পোয়েট্রিতে পুরুষ ও মহিলা কবিদের তুলনা আসতে বাধ্য  । এখনও যুতসই নাম কিছু মনে আসেনি ।

 

“ দুধ চা না লিকার চা ? “

 

এই প্রশ্নটা টুইঙ্কল প্রত্যেকদিন করবেই।

 

সুফি কবিতা,  নাহিদ …এসব গুরুগম্ভীর বিষয় থেকে অনির্বাণকে নেমে আসতে হলো টুইঙ্কলের মতো একটি নরম ও গরম বিষয়ে । আপাতত  ভেজা চুল থেকে জল ঝরছে, সুন্দর একটি সকালের মতোই উজ্জ্বল লাগছে ওকে ।

  পুজো , বারান্দার টবে জল দেওয়া ইত্যাদি কাজ সেরে টুইঙ্কল বেরোবার জন্য তৈরি হবে এখন।    বেশ অনেকটা দূরে ওর স্কুল। প্রায় দেড়ঘন্টা আগে বেরিয়ে যেতে হয় ।

–তুমি যা দেবে তাই পান করিব , বিষ অথবা অমৃত?

–বলছি যে শুয়ে শুয়ে ল্যাদ খাচ্ছো?  কলেজ যাবে না?

..নাহ্। আজ আমার বিষয় ইরানি কবি  ‘ নিহাদ ‘ অনির্বান একটু অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিল।

–ইরানি কবি!  ইরান আর ইসরায়েল  যুদ্ধ বাঁধবে , নিউজগুলো দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।

সকালবেলা ব্র্যাকফাস্ট  বানাতে বানাতে টুইঙ্কল পৃথিবীর সব ভয়ঙ্কর খবর গুলো দেখে ফেলে, আর অনির্বানকে শোনাতে থাকে।

 

হোক যুদ্ধ , তাই বলে কি কবিতা হবে না?  যুদ্ধের দেশ থেকে যে কবি উঠে আসে তাকে প্রণাম।

 

— আমাকে এসব কবিতা শোনাবে না । টেবিলে সব রেডি করেছি,  এসো চট করে খেয়ে নেবে।

–কিন্তু দুধ চা না লিকার চা ? এই সমস্যার তো সমাধান হলো না প্রিয়ে?

—এই শোন তুমি আমার কথা শুনছোও না, ভাবছও না,  আপাতত তোমার মাথায় ঘুরছে ইরানি কবি নিহাদ এটা আমি বেশ বুঝতে পারছি ।

—লিকার চা,  লেবু দিয়ে,  এটাই খেতে হবে ,ঘোষনা দেয় টুইঙ্কল।

 

—তাহলে জিজ্ঞেস করা কেন?

 

টুইঙ্কলের এখন উত্তর দেওয়ার সময় নেই, আলমারি ঘাঁটছে,  মনে হয় শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ পাচ্ছে না।

 

“ তুমি নিহাদকে পড়োনি অনির্বাণ। ও কিন্তু বেশ অল্পবয়সেই ইউনিভারসিটিতে কম্পারেটিভ লিটারেচারের প্রফেসর। ‘

“এটা মানতে পারলাম না স্যার। ইউনিভার্সিটিতে কম্পারেটিভ লিটারেচার পড়ালেই কেউ মহান কবি হয়ে যায় না বা তার কবিতা নিয়েই আমাকে আলোচনা করতে হবে এমন কোন মানে নেই। আপনার কথায় আমি কবি নিহাদ সম্পর্কে আরো হতাশ বোধ করছি। “

 

অনির্বাণ ফোনটা কেটে দিল। এরকম সটান উত্তর দিতে সে কখনোই ভয় পায় না। অনির্বাণের বয়সও অল্প। সেও কলেজে বাংলা পড়ায়।

পি এইচ ডি করছে। সাহিত্য সমালোচক হিসেবে বেশ নাম ডাক রয়েছে। এখানে ওখানে বক্তৃতা তো লেগেই আছে।স্যারের কথায় সে বাউন্ড নয়।

 

ইরান, কবিতার দেশ। পার্সীয় সাহিত্যের হাজার বছরের লিরিক্যাল ঐতিহ্য — হাফিজ, রুমি, ওমর খৈয়াম — তাদের কবিতায় যে প্রেম, তা ঈশ্বরকে প্রবলভাবে বিশ্বাস করে । সেখানে নারী অনেকটা  প্রার্থনার মতোই , সহজলভ্যা নয়  সে,

নারীর হৃদয় অতিক্রম করে ঈশ্বরের কাছে নীরবতার কামনা করে সুফি কবিরা। এসব ভারী ভারী কথা মনে আসছে। অনির্বাণ নাহিদকে ইমেল করলো। আশা করা যায় উত্তর আসবে। লেখক মানেই কিঞ্চিৎ লোভী । সে অবশ্যই চাইবে তার কবিতা ইংরেজি ,বাংলায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ুক দিকে দিকে।

মনে মনে হাসল অনির্বাণ। আসলে কেউ বিশ্বাস করবে না,  বাংলা সাহিত্যের তরুণ প্রফেসর ও সামান্য খ্যাতিমান সাহিত্য সমালোচক অনির্বাণের এখন সাহিত্যে অরুচি , তার চেয়েও বেশি বিতৃষ্ণা লেখকদের প্রতি। কি হবে লিখে ?

 

 কি হবে ইরানি কবি নাহিদের নারীবাদী কবিতা অনুবাদ করে যেখানে ইউনিভার্সিটিতে ইরানি মেয়েরা অন্তর্বাস পরে ঘুরে বেড়ায় ,সিস্টেমের গালে চড় মারতে চায় ,  ধরা পরে জেলে যায়,   এই তো এক পৃথিবী,  সেখানে পাপ কি ফুলের মতো হতে পারে না?

 

শিরাজ শহরের উপকন্ঠে নাহিদের ছোট্ট পুরনো দোতালা  বাড়ি । জুন মাস চলছে,  গনগনে আগুনে পোড়া   দুপুর  ।

নাহিদ জানালার রঙিন কাচে পাতলা পর্দা টেনে দেয় — তবু আলো যেন তার কবিতার কাগজে পড়ে থাকে সাদা আগুনের মতো।

VPN কানেক্ট করতে করতে বাদামি কপাল ঘেমে ওঠে।

বাইরে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপগাছ, আর ছাদের ওপর ছড়িয়ে রাখা পুরোনো কাবুলি কার্পেট —

সবকিছুই  যেন পুড়ছে ।

নাহিদ যখন লেখে, তখন ঘর এক ধরণের গুহা হয়ে যায়—বাইরের মিলিশিয়ার বুটের শব্দ মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধ হয়তো আসন্ন । দূরে মসজিদের আজান , সবকিছুর মাঝে একটি জিনিসকেই নিহাদের সঙ্গীত বলে মনে হয়, অসহ্য গরমেও যখন ফলের ঠেলা নিয়ে ফেরিওয়ালারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় । শিরাজ ইউনিভার্সিটি গত সপ্তাহ থেকে বন্ধ । ভালো লাগছে না কিছুই,

 নিহাদ নিচে নেমে আসে, কিছু আঙুর, দুটো  তরমুজ  কিনে নেয় ।

মাঝেমাঝে পেছনের গলিতে শোনা যাচ্ছে তীব্র মোটরবাইকের গর্জন—ভয় ধরায় শুধু ।

নাহিদের ডেস্কের পাশে রাখা গোলাপজলের পুরনো শিশি, যার গায়ে এখনও বাজারে নিষিদ্ধ “Sa’di Essence” নামটি লেখা, তা থেকে উঠে আসে একধরনের তীব্র সুমিষ্ট গন্ধ — যা নাহিদকে তার মায়ের আলনায় শুকনো গোলাপ পাপড়ির গন্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই ঘরে সে প্রথম পড়েছিল হাফিজ, আর প্রথম লুকিয়ে লিখেছিল নিজের শরীর ও ঈশ্বরকে ঘিরে কবিতা।

শিরাজ একসময় ছিল কবিতার শহর। যেখানে মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া যেত কয়েকজন  বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা যারা দিনের শেষে ক্লান্ত সন্ধ্যায়   বিক্রি করতে আসত  পুরোনো পার্সিয়ান কবিতার বই, রাবিয়া বা হাফিজের সংকলন । নিহাদের শখ ছিল সেসব সংগ্রহ করা। এখন ওরা আসেনা। হারিয়ে গেছে কোথাও।

 ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড়ের পাদদেশে   সবুজ উপত্যকায় এই শিরাজ শহর । চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জাগরোস পর্বতমালার ঢেউয়ের মতো উঁচুনিচু রেখাগুলো যেন শিরাজের প্রতিটি শ্বাসকে গভীর করে তোলে। এই শহর ছিল একসময় পার্সিয়ান সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু, আজও এখানে হাফিজের কবরের পাশে দাঁড়ালে মনে হয় শব্দেরা বাতাসে ভেসে আছে স্বাধীনতা নিয়ে ।

তেহরান থেকে প্রায় ৯৩০ কিলোমিটার দূরে  শহরটি যেন রাজধানীর চেয়ে কিছুটা নীরব ও ধ্যানমগ্ন। কিন্তু এখানে এখন মোড় ঘুরলেই মিলিশিয়া, আর ঘরের দেয়ালে ক্যামেরার চোখ  —  সৌন্দর্যের আড়ালে  শুধুই অস্থিরতা ।

 

ল্যাপটপের কীবোর্ডে আঙুল চলার সময় নিহাদের বুক ঢিপ ঢিপ করে।

নিহাদ মৃত্যুকে ভয় পায়। মরে গেলে তো আর কিছু থাকে না। সব শেষ হয়ে যাবে। তার আরো অনেক কিছু লেখার আছে। সামনে দুটি উদ্দেশ্য,

বন্দিত্ব অথবা মৃত্যু দুটোর হাতে কিছুতেই নিজেকে সমর্পন করবে না নিহাদ।

পালাবে, রিফিউজি হলেও তো লেখা যাবে। বেঁচে থাকার শর্তই হচ্ছে লেখা ।

VPN কানেক্টেড, তাই ভয় হয়।

মাঝেমাঝে হঠাৎ WiFi সিগন্যাল পড়ে যায় — তখন নিহাদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকায় , শুকনো কাটা-ডাল, ফাঁকা আকাশ, একটি ছেঁড়া কাইট —সব যেন লেখকদের মতোই ছিন্ন, অথচ বেঁচে আছে।

নিহাদ লিখতে থাকে , আহত শব্দেরা ভিড় করে আসে নিহাদের চারদিকে। পায়ের পাতা থেকে শব্দগুলো যেন শিরশির করে তার জঙ্ঘা ছুঁয়ে,  নাভি স্পর্শ করে বুকের নিচে পেলব অন্ধকারে জমা হয়। সেখান থেকে তুলে নিতে হবে তাদের।

 চোখে জল আসে না নিহাদের , শরীরের ভিতর প্রবাহিত হয় ধাতব ঠান্ডা।

এই কবিতা সে পরে Tor ব্রাউজারে ঢুকে “Shab-e-Khamoosh” নামে এক গোপন ব্লগে পোস্ট করবে।

তারপর… বসে থাকবে নিঃশব্দে,

যেন অপেক্ষা করছে —

কে জানে, কেউ পড়বে কিনা?

 

নিহাদ ইমেলশুলো  সার্চ করে। ইন্ডিয়া থেকে কিছুদিন আগে একজন বাংলাভাষার প্রফেসর  তাকে ইমেল করেছিল,  তার সাম্প্রতিক কবিতা গ্রন্থ থাকলে সেটার পি ডি এফ বা ফটো তুলে যদি পাঠানো যায়। ওরা এবিষয়ে কাজ করছে।

নিহাদ বিস্মিত হয়নি। এসবই তো স্বাভাবিক। পারস্যের গোলাপ ও কাঁটা ভারতে তো পৌঁছুবেই কোন না ভাবে , হিস্ট্রি তো তাই বলে ।

 

 অনির্বাণের ই-মেল নিহাদের কাছে পৌঁছেছে।

 

অনির্বাণকে খুব একটা অপেক্ষা করতে হলো না।

নিহাদ তো বেশ প্রফেশনাল !

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশুদ্ধ ইংরেজিতে  জানিয়েছে তার কোন সাম্প্রতিক কবিতা গ্রন্থ সে প্রকাশ করতে পারেনি। আগে যে দুটো বই প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলো বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। কবিতার বইয়ের ওপর ব্যাপক নজরদারী। তবে বই না থাকলেও সে তার সমস্ত কবিতাগুলোই পি ডি এফ করে অনির্বাণকে পাঠাবে।

তবে  একটি অনুরোধ করেছে শেষে, “ আমাকে না বুঝে কবিতার অনুবাদ করবেন না প্লিজ।”

 

অনির্বাণ আবারো বিরক্ত , এই ইরানি মহিলাকে সে কি করে বুঝবে । তারা কি হাফিজের সমাধিক্ষেত্রে,  গোলপবাগানে  হেঁটে বেরিয়েছিল নাকি কোনদিন?  ধূর্!

 

টুইঙ্কল অনির্বাণের মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল।

হাসছ কেন?

তোমার চিন্তিত মুখ দেখে , আচ্ছা নিহাদ মেয়ে না ছেলে?

কেন?

এমনিই জানতে চাইছি। নামটা উভলিঙ্গ কিনা।

 

বিখ্যাত ইরানি মহিলা কবি। তার কবিতায় নাকি অনেক  তেজ , অন্তত আমার স্যারের মতে ।

তাহলে তো হয়েই গেল , দশ পনেরদিনের একটি প্রেমপর্ব করে নাও নিহাদের সঙ্গে, ওর কবিতা তোমার মর্মস্থলে ঢুকে কিবোর্ডে ঝলকাবে।

আর ইরানি মেয়েরা তো বেশ সুন্দরীও দেখেছি ছবিতে। ছবি আছে  নিহাদের?

 

না নেই।

 

নিহাদ শব্দের অর্থ কি?

 

নিহাদ শব্দের নির্দিষ্ট কোন অর্থ নেই টুইঙ্কল,  গভীরতা,  শান্ত বা জেদের আর এক নাম হতে পারে নিহাদ ।

 

টুইঙ্কল স্কুলে কেমিস্ট্রি পড়ায়। সাহিত্যবোধ কম। কিন্তু যে কারণে টুইঙ্কলকে অনির্বাণের ভালো লাগে তা হলো ওর যেকোন কিছু নিয়ে মজা করার স্বভাব। অনির্বাণের অরিজিনাল প্রেমিকার বান্ধবী হলো টুইঙ্কল। প্রেমিকার দমবন্ধ শাসনে বিরক্ত হয়ে অনির্বাণ টুইঙ্কলকে বিয়ে করেছে আর বুঝতে পেরেছে সে কোন ভুল করেনি।

বাপরে কি শ্বাসরোধকারী সন্দেহপরায়ণ প্রেমিকা ছিল কস্তুরী !

সম্পর্কে স্পেশ তৈরি করে সেখানে খোলা বাতাস ঠুকিয়ে দেওয়ার অনবদ্য ক্ষমতা টুইঙ্কলের আছে। টুইঙ্কল বেশ খুশি অনির্বাণকে নিয়ে।

সহজ গর্ব, আমার হাজবেন্ড একজন বিখ্যাত কবি। অনির্বাণ বোঝাবার চেষ্টা করে আমি কবিতা সমালোচক,  কবি নই।

টুইঙ্কল চোখ গোল গোল করে ওর  চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলে , তাই বুঝি ?

 

“হে টুইঙ্কল তুমি যেও নাকো কোনদিন কবিতার কাছে” —মনে মনে বলল অনির্বাণ, যদিও সুন্দরী ইরানি কবির প্রেমে অনির্বাণ হাবুডুবু খাবে এটা সে এখনও কল্পনা করেনি —টুইঙ্কল করেছে।

আর তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছে তুমি নিহাদের সঙ্গে আই মিন ওর কবিতার সঙ্গে থাকো,  দুদিন পর সন্ধ্যায় আমাদের পাড়ায়  নতুন যে রেস্তোরাঁ খুলেছে ,  সেখানে কফি খেতে যাবো আমরা।

 

টুইঙ্কল ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরে এসি চলছে। মৃদু আলো। হালকা আকাশি রঙের পর্দা।

কোথাও যেন কোন দুঃখ নেই, প্রতিবাদ নেই ।

 

অনির্বাণ নিহাদের কবিতা খুলে বসেছে । ধুলো,  ধোঁয়া আর বন্দুকের শব্দ শোনা যাচ্ছে কি?

কি রকম কবিতা লেখে নিহাদ?

নারীবাদী কবিতা অনির্বাণ একদম পছন্দ করেনা । খুব দুর্বল সাহিত্য বলে মনে হয়।

 

অনির্বাণ  প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়েছে । MA-তে Comparative Literature নিয়েছিল। তখনই ফরাসি ও ফারসি টুকরো টুকরো শব্দ শেখা শুরু। মূলত অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে কাজ  করতে গিয়েই রুমি-হাফিজ-নাহিদ তার কাছে এক ধারায় এসে দাঁড়ায়।

কলকাতায় ইরান কালচারাল হাউসে, ফারসি ভাষা ও পার্সিয়ান সাহিত্য শেখানো হয় স্নাতকোত্তর স্তরে। নিজের আগ্রহেই  অনির্বাণ সেখানে নিয়মিত ক্লাস করত একসময়।

কলকাতায় মেসে থাকার সময়,  সে একবার পড়ছিল হাফিজের কবিতার অনুবাদ,

“Even after all this time, the sun never says to the earth, ‘You owe me.’”

এই অনুবাদটা ভালো লেগেছিল, কিন্তু একটা অস্বস্তিও তৈরি করেছিল।মন যেন বলছিল, এই শব্দগুলোর মধ্যে কিছু একটা হারিয়ে গেছে।

তারপর থেকেই এইসব প্রচেষ্টা। নিয়মিত ক্লাশ,

 YouTube থেকেও ফারসি অক্ষর শেখা —

Alef, Be, Pe, Te…পরে Duolingo, কিছু ইরানিয়ান স্টুডেন্টের Instagram page,

VPN ঘুরিয়ে Irani poetry forum —

ধীরে ধীরে অনির্বাণ সেই অচেনা ভাষার চোখে চোখ রাখার সাহস পেল। আজ নিহাদের কবিতা তার কাছে পরীক্ষার মতো ।

কিছুক্ষণ পড়ার পর মনে হলো প্রচুর মেটাফর নিহাদের কবিতায় । ভাষার ছায়ায় ঢুকে পড়েছে কবিতা।

ভোর হয়ে গেছে।

অনির্বাণ ক্লান্ত চোখে দেখল, সে , নিহাদের কবিতার একটি লাইন শুধু অনুবাদ করেছে ,

 

“তারা চায় আমি প্রেম না লিখি।

কিন্তু আমি লিখি—

একজন নারীর প্রতি আরেক নারীর স্পর্শ,

একজন পুরুষের চোখে ভেসে ওঠা প্রশ্ন,

আর নিজের জঙ্ঘায় রক্তপাতের দিনে

আমি লিখে ফেলি..

ঈশ্বরও তো রক্ত দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন প্রেম।”

 

কিন্তু নিহাদের কবিতা তো  এটা নয়। অনির্বাণের অনুবাদ মাত্র । কিছু দুর্বল লাইন ।

 

“কিন্তু আমি জানি—

যে শরীর ঈশ্বর বানিয়েছে,

সে নিজেই একটি ছন্দ।

আমি আমার স্তনের ঢেউ দিয়ে

রচনা করব ঈশ্বরের বাগানের একটি ফুল “

 

অনির্বাণ টাইপ করছে আবার ডিলিট করছে। এসব স্তন সংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপারকে ঠিক কি করে লিখলে ঠিক অনুভবটা আসবে। নিহাদের কবিতাগুলো শুধু কিছু ফারসি কবিতার আক্ষরিক অনুবাদ নয়। অনির্বাণ এতোটা স্থূলভাবে লিখতে পারেনা। সে খুঁজছে স্তনের পরিবর্তে অন্য শব্দ। তারপর হঠাৎ মনে হলো এই যে সে প্রতিশব্দ  খুঁজছে এটা ভয়ঙ্কর অশ্লীল একটা ব্যাপার ।

নিহাদের কবিতায় শরীর আছে তীব্র আনুষঙ্গিক নিয়ে,  এই প্রথম অনির্বাণ সেটা অনুবাদ করতে পারছে না,  মনে হচ্ছে নিহাদের কিছু একটা হয়ে যাবে। একজন অযোগ্য সাহিত্য সমালোচকের মতো অনির্বাণ ভাবছে ওরা ওদের মতো থাক।

ইরানি মেয়ের কবিতার অনুবাদ দিয়ে আমাদের কি দরকার। এই তো আমাদের মেয়েরা বেশ লিখছে ।

আচ্ছা এই মেয়েগুলো এরকম কেন?  এরা কি মৃত্যুকে , ফতোয়াকে ভয় পায় না।

স্নিগ্ধ রোমান্টিক লাইন লিখুক না , বেঁচে থাকুক পৃথিবীর বুকে ।

আলোর জন্য কি কোন অংশ রাখেনি নিহাদ ?

নিহাদের সেইসব কবিতার জন্য নিহাদকে জানতে হবে। জানতে হবে তার বয়স , দীর্ঘ  ক্ষীণ শারীরিক গঠন,   বাদামি গায়ের রঙ আর অদ্ভুত দৃষ্টিকে। কথা বলতে হবে।

ওর গলার স্বর কি ফ্যাঁসফ্যাসে না সতেজ?

অনির্বাণ ঝুঁকে আছে ল্যাপটপের ওপর ,  পারস্যে এখন গোলাপ ফোটে না,  নিহাদের মতো মেয়েদের সামনে কেউ কি দাঁড়ায় ফুল নিয়ে?

তবে তারা হয়তো অন্য কোন কবিতা লিখত ?

কিন্তু আপাতত ঘুমোতে হবে, টুইঙ্কলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ ভাবছে নিহাদকে কাল দীর্ঘ  ই – মেল পাঠাবে।

 

একবার মোবাইলটা খুলল অনির্বাণ,  আজ ১৩ জুন,২০২৫   । আনন্দবাজার আপডেট দিয়েছে ইসরায়েলের হামলার জবাবে মসজিদে লাল  পতাকা উড়িয়ে ইরান ঘোষণা দিয়েছে যুদ্ধের।

তেহরান থেকে ৯৩০ কিমি দূরে শিরাজ শহরে নিহাদের বাড়ি , সেখানে কি এতো দ্রুত যুদ্ধ চলে আসবে?

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes