
গুচ্ছ কবিতা – কৌশিক বড়াল
১. বাঁশি
বৃষ্টি নেমেছে রাতে।
আমাকে জায়গা করে দাও
তোমার বুকের অনন্ত গভীরে।
নির্জন সেই নক্ষত্রের ভিতর
সদ্য উঠে আসা শামুকের মতো
ছড়িয়ে যাব।
প্রাচীন পদাবলির ইতিহাস জুড়ে লেখা থাকবে
নৈনিতাল থেকে ফিরে আসা সেই চিৎকার,
কার্শিয়াং এর অন্ধকার রাত,
সাহারার জীর্ণ প্রেমের পত্রাবলি।
দূরে বর্ষায় অভিসার।
এত সুর ধরা থাকবে।
শুধু একবার ঠোঁট ছুঁয়ে দ্যাখো।
২. সানাই
বহু যুগ ধরে ফেরেনি সে ঘরে।
শুকনো মাছের মতো গন্ধ নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে কেবল।
অদূরে কাকের চিৎকার –
দূরে ফেলে আসা প্রেমিকার ঠোঁটের মতো
অস্থির হয়ে আসে।
নাভিতলে জমা হয় ক্ষোভ।
আজ ফিরেছে হরিৎবর্ণ মেখে।
কবেকার জল কবেই ফুরিয়েছে,
শেষবেলায় নতুন আয়োজন তার।
সুতরাং বসেছে দরবার।
৩. সারেঙ্গী
অলকানন্দা থেকে গঙ্গাসাগর
একটা দীর্ঘ পথ রচনা করেছে সে।
দুই চোখের কাছে বসিয়েছে নদীপথ…
কতদূর! ঠিক কতদূর গেলে ফিরতে হয় বাড়ি…
একা পড়ে আছে সাহারার বুকে
তাই রচনা করেছে দীর্ঘ এক নদী।
দীর্ঘ এক কান্নার অনুবাদ।
বিষাদ।
সুর দেবে তাতে?
৪. একতারা
ভিতরে বিষাদ তবু যেন বাইরে আষাঢ়। মেঘ।
চোখে নেই জল। হরিণের পথ ধরে
ঘুরে ফেরে বনে বনে। মফস্বল। মহল্লায়।
কে যেন আদিম গ্রন্থি এঁকে রেখেছে শরীরে –
চলন্ত ঘুর্নির ট্রেন এসে থামে সেই সব স্টপেজে।
আসে-যায়। আসে-যায়। চলে যায়।
পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। শুধু,
সারারাত জেগে থাকে একা এক নক্ষত্র।
৫. মৃদঙ্গ
ছুঁয়ে যায় কথা তবু স্থবির নীরবতা।
কেউ এঁকে রাখে কেউ নামাই বর্ষা।
জুড়ে থাকে শব দেহ। অসুর বা দেবতা।
কাহিনি বরাত পায়। বৃষ্টির ফোঁটা।
আদর মেপে রাখে জলের ইতিহাস।
ছুঁয়েছে নব্যতা প্রাচীন সন্ত্রাস।
এঁকে বেঁকে চলে যায় রূপকের পাখি,
ছুঁয়ে যায় এই দেহ। তান্ডব সমাহার।
৬. শেষ সীমান্ত
দুমড়ে মুচড়ে আসার পর এ পৃথিবী কিন্নর
জলজ তন্তু গায়ে মেখে ঘুমিয়ে আছে সমুদ্র
বিপন্ন রাক্ষসেরা উন্মত্ত হয়ে ফিরছে
গ্রিক মাইথোলজি থেকে সীমান্ত বরাবর
গান গাইছে একাকী চাঁদ
শান্ত অথচ হিংস্র
তারপর মেঠো রোদ, দশচক্র
এ মাটিতে একদিন মানুষ বাস করতো।
৭. ক’দিনের ট্যুর
পুরাতত্ত্ব মাখিয়ে রেখেছি গা-এ
সাঁতার কাটছি বৈষম্যহীন জলে,
গণিতের আঁকা রেখা। হিসেবের কুঁড়ে ঘর
ছৌ নাচ ছেটাই চোখে
ভর দুপুরে কিনে আনি বিষ
নিজের ভিতরে আজ প্রদর্শনী
ছাব্বিশ বছর। হস্তমৈথুন। প্রেম। চুমু
বিচ্ছেদ। আঠা। হিংসা। রাত। লুকোচুরি
চমৎকার প্যাকেজ এই জীবন
মাত্র কয়েক দিনের ট্যুর।
৮. ভ্রমরপথ
‘কী বুঝলে কোথায় হেঁটে গেল উদয়ন পন্ডিত?’
তারপর রাত ঝরে পড়ল
শীতের কারচুপি নেমে আসল
বাক্স খুলে বেরিয়ে পড়ল দাঁত-নখ
ঘরের ভিতর এসে ঘাপটি মেরে রইল কুয়াশা
ফোনের ডায়ালপ্যাডে স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলা
প্রেমিকার ঠোঁটে কালো ভ্রমর
ঘুমের ভিতর ঘুম
ব্যাগের ভিতর রক্ত
এখনও আমি শুনিনি কিছু
এখনও আমার চোখ অন্ধ
বলব না বলে বধির হয়েছি
দেখব না বলে মঞ্চে সেজেছি ধৃতরাষ্ট্র
কৃষ্ণের বাণ থেকে বাঁচার জন্য
এসে দাঁড়িয়েছি যিশুর সামনে
করবে ক্ষমা আমার গণতন্ত্র?
৯. জোকার ব্যূহ
কী ভয়ানক জ্বালামুখ
অথচ ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে,
চোখের ভিতর লম্বা হাইওয়ে ধরে
উলম্ব রেখায় ঝুলছে জোকার।
ও কিচ্ছু জানে না।
রিংমাস্টার এসে বলেছে,
হাসি থামলে বিপরীতে একটা দীর্ঘ খিদের রাক্ষস।
ও সব জানে। ওর ভিতর বইছে কান্নার হ্রদ।
ও সব জানে। ও হাসছে। কি ভীষণ অট্টহাস!
এই মৃত কান্নার হ্রদের পাশে বসেছে মেলা। উৎসব।
১০. সাতজন্মের মোহ
প্রতিটা জন্মের পাশে আমি ক্ষত বিক্ষত
শুয়ে থাকি ঘাসে মাথা রেখে।
আমার গত জন্ম থেকে হাওয়া আসে রোজ।
ডিঙিয়ে যাই কুরুক্ষেত্রের গলি।
কী পাপ! কী পূণ্য!
সাঁতরে আসি। হাবুডুবু খাই।
ওহ! মাঘ কি এল?
আমার কেন লাগে না শীত?
মৃত এ শরীর! নাকি জন্মাইনি এখনও!
ঠান্ডায় পুড়ে যাচ্ছি। শীতে যাচ্ছি ঝলসে।
হে সূর্য। হে বাতাস। করুণা করো।
শুয়ে আছি ঘাসে মাথা রেখে।
আমায় ডিঙিয়ে যাচ্ছে সাতজন্মের মোহ।

