বাংলা কবিতা বুঝবে না সহজে সে কী হারালো আজ
শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রিয় হিন্দোল,

মনে হয় না, বই নিয়ে আলাদা করে জলদ গম্ভীর যে প্রবন্ধ তুই চেয়েছিস, ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি সহ, সহজ হবে। এই অদ্ভুত অদেখা, আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব সময়ে দাঁড়িয়ে আর বোধহয় গ্রন্থগার্হস্থ পালন করা হল না। তাই, সেই ২০০২-০৩ সালের মত চিঠি লেখার চেষ্টা। বিশেষত যখন মে মাস, প্রখর গরম আমাকে মনে করাচ্ছে সেই গোর্কি সদনে এম এস সত্থুর গরম হাওয়ার শো, বেরিয়ে অদ্রীশদা আর তোর সঙ্গে সেই সমগ্র পৃথিবীর উদাস্তু সম্ভাবনা নিয়ে প্রবল গ্রীষ্ম যাপন, সেই দিনই কলকাতার তাপমাত্রা ৪২ ছুঁয়েছিল, আমাদের দেখা প্রথমবার, সেই ২০০২ সাল। আজ এই ১৮ বছর বাদে কেন মনে আসছে সেই দিনটার কথা? অদ্রীশদাকে আর কোনওদিন ফোন করা যাবে না বলে? না কি তোর সঙ্গে জুলাই মাসের কথা, তোর জন্ম হয়েছিল আজ দোসরা জুলাই লাইনটা নিয়ে আর কবে বসতে পারব জানি না বলে? আচমকাই ফিরে আসছে এন্টালির বন্ধুর বাড়িতে কাটানো আস্ত দিনটা আর সেই দিনের হাত ধরেই এই অসম্ভব মাথা গুঁজে পড়ে থাকা দিনগুলোয় সেদিনের বই মনে পড়ছে। মনে পড়ছে আমার বিশ্ব পর্যায়ের অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা প্রায় আবিষ্কারের ভঙ্গিতে পাঠ করে তোর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দের কথা। এবং সে আনন্দ তোর মধ্যেও প্রায় একই সময়ে ছড়িয়ে যাবার কথা জেনে নেওয়া। হ্যাঁ আমরা গুজরাতের ঘটনা নিয়ে বড় ক্লান্ত ছিলাম। বড় বেশি রক্ত ও চুপচাপ। আমাদের আশেপাশে ঘটে গেছে কেশপুর গড়বেতা। অথচ আমাদের বুদ্ধিজীবিরা চুপ। তখনও আমরা বুঝতে পারিনি সেই মে মাসের ৮ বছরের মধ্যে সিপিএম বিদায় হবে। আমরা আবিষ্কার করছি এখনও নামেনি বন্ধু নিউক্লিয়ার শীতের গোধূলি। আমরা দেখছি “মাতৃসত্তার মতন একাকী/ কিশোর মিশে গেল অতল আঁধারে”। আমরা দুজনেই তখন “দুষ্কৃতি ও শিকারের মাঝখানে অংশত বিঃশ্বাস নিয়ে কোন আস্পর্ধায় (আমি) বনিবনাবিহীন রয়েছি?” কথা বলছি। অনুভব করছি আমাদের সময়ে বোধহয় আর অমরত্ব মার্কা কোনও ছদ্ম ধারণার বশম্বদ হওয়া সম্ভব নয়। আমরা ভেবেছি অলোকদা কীকরে এই অস্থিরতাতে ছন্দের হাত ধরে থাকেন। তর্কও করেছি হয়ত। কিন্তু তাতে আরও বেশি করে মজে গেছি। আবার আবিষ্কার করেছি একটু পুরনো বই জ্বরের ঘোরে তরাজু কেঁপে যায়। সেখানে পাচ্ছি উত্তর “ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিবাহিনী/ বেয়নেট হাতে রক্ত মাখিয়ে/ খিন্ন আফ্রিকার দিকে রুটি ছুঁড়ে দিলে / ধ্রুপদী কবিতার কানাগলিতে আর কি ফেরা যায়?” । হ্যাঁ যেমন ছিল তাঁর কবিতার নখরাগ্র পর্যন্ত নিষ্ঠুর ইগলের কথা, তেমনই নখরাগ্র পর্যন্ত লিরিকমস্তিষ্ক নিয়ে অলোকরঞ্জন ধ্রুপদী কবিতাকে কানা গলি বলছেন। এই সেই সময়, যার কয়েক মাস পরেই কলকাতায় এসে তিনি যুদ্ধের ছায়ায় বইটি প্রকাশ করবেন, আমরা ম্যাক্সমুলার ভবনের সেই স্মারক সন্ধ্যায় জেনে নেবো যুদ্ধের বিশ শতক এবং একুশ শতক। আমরা জেনে যাব যুদ্ধক্ষত আমাদের শিল্পকে কোথায় নিয়ে যায়। আমরা জেনে নেব কবিতা কেন নেরুদার সময় থেকে অ্যাসিডে পোড়া হাতের কথাও বলতে যায় বারবার। হ্যাঁ হিন্দোল, হয়ত বা অলোকদার কবিতা আমাদের নতুন কবিতা লিখতে উশকে দেবে না যেমনটা বা অন্য কোনও মগ্ন চৈতন্যের কবি দেবেন। হয়ত বাংলা কবিতা চিরকাল বলবে অলোকরঞ্জন শেষ হয়ে গেছেন সেই কবে! কিন্তু আমার আর কোনও কানাগলিতে ফেরা হবে না। কয়েকদিন আগে মানববাবুর চলে যাবার পর লিখেছিলাম কীভাবে তিনি আমাকে আরও বেশি করে আন্তর্জাতিক কবিতায় ঠেলে দিয়েছিলেন। আজ বলব দ্বিতীয় জনের কথা। অলোকরঞ্জনের কথা।

বাংলা কবিতার প্রতিটা ধাপ মাপা। মূলধারার আরও বেশি করে। এবং সেখানে আরও বিপজ্জনক কবিকে তাঁর প্রথম দিকের বই দিয়ে চিহ্নিত করা। অর্থাৎ স্বভাবকবিতাকে গুরুত্ব দেওয়া। এবং পরিবর্তনকে মেনে না নেওয়া। অলোকরঞ্জনের ক্ষেত্রে একই ঘটনা। এখনও লোকে যৌবন বাউল নিয়েই কথা বলে। ছৌ কাবুকির মুখোশ থেকে যে বিশ্ব পর্যায় শুরু হল তাঁর, তা বাংলা কবিতার এক নিভৃত স্বতন্ত্রতা। যে দেখা আসলে শান্তিনিকেতনের, যে দেখা আসলে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের হাত ধরে অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা হয়ে অলোকরঞ্জনে মিশেছে। হয়ত বা সেখানেই শেষ। কী আছে সেই অংশে? সেই অংশ আসলে নিজের নির্মিতিকে ভেঙে ফেলা। যা বাংলা কবিতায় বিশেষ দেখা যায় না। যে গীতল ছাঁদ তাঁকে যৌবনেই খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেল তাকে তিনি অনায়াসে ভেঙে ফেললেন ছৌ কাবুকির মুখোশ থেকে। আমরা যদি তাঁর সেই সময়ের গদ্যগুলো পড়ি দেখব প্রকৃত প্রস্তাবেই তিনি ভ্রমণে নয় ভূবনে বেরিয়েছেন। পঙ্গুজনের ডিস্কো থেক হয়ে তিনি স্পর্শ করছেন বার্লিনের বিভক্ত স্বত্তা। তিনি প্রত্যক্ষ করছেন পুনর্গঠিত ইউরোপের মঙ্গলব্রত এবং লক্ষ্য করছেন নেটো নামক ছল। তিনি লিখে রাখছেন তাঁর খাতায় যুদ্ধ আর থামে না। বরং চলতেই থাকে। এবং সেই অবিরল অবিরত যুদ্ধের ক্ষত তিনি মাখিয়ে দিচ্ছেন আমাদের শান্ত সমাহিত কবিতার গায়ে ফলত তাঁর কপালে জুটছে একধরণের বাঙালির স্বভাব অবজ্ঞা। কারণ বাঙালি বুঝতেই চায় না বিশ্ব নামক বিশ্বাস ও বিশ্বাসভঙ্গের খেলা।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সেই কবি যিনি নিজেকে ভেঙে গীতিকবিতার নির্মাণে মিশিয়েছেন সংবাদভাষ্য। অস্বীকার করেননি সময় তাঁর উপরে যে দাগ রেখেছে। হ্যাঁ তিনি গীতিকবিতার মোড়ক ভেঙে দিলে হয়ত আমার আরও ভাল লাগত, কিন্তু এখানে তা বিচার্য নয়, বিচার্য তিনি সেফ খেলেননি। তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন, এবং হারিয়েছেন তাঁর প্রাক্তন পাঠকদের আস্থা। তিনি বারবার করে তাঁর কবিতা, যা তাঁর বোধের মূল স্তম্ভ ও বিশ্ববিক্ষার চোখ, তাকে বেঁধে দিয়েছেন তাঁর প্রবন্ধের জানলায়, ভবিষ্যতের পাঠক যাতে তাঁর কবিতার জগতে সহজে আসতে পারেন। তাঁর আপাত কিম্ভুত না লিরিক না লিরিক বিরোধি কবিতায় সরে না যান। তলিয়ে দেখেন সময় তাঁর কবিতাকে কোথায় নিয়ে গেছে। আর সে সময় আসলে সারা দুনিয়ার ক্রান্তিকাল। সে সময় আসলে প্রাচীন সমস্ত বিশ্বাসের শিকড় সমেত উপড়ে আসার বিকট আওয়াজ। সেই আওয়াজকের তিনি হয়ত সুরে ধরেছেন। যেমনটাবা তাঁর পূর্বসূরি অমিয় চক্রবর্তী, এবং একই রকমের অবজ্ঞা হয়ত তাঁর অলোকরঞ্জনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু স্থানিকতা কবিতার একমাত্র শর্ত হতে পারে না, কবিতা ছড়িয়ে যেতে পারে অভিজ্ঞতা লব্ধ জগতে, এবং সে অভিজ্ঞতা যুগসন্ধির হলে তার অভিঘাত হয় সাংঘাতিক, তাতে আর ধ্রূপদের কানাগলিতে ফেরা যায় না।

আমি তো পারিনি। কারণ আমি তাঁরই হাত ধরে বেরিয়ে এসেছি, অন্ততঃ একধরণের রাস্তার কথা দেখেছি। আমি তো তারপর আমার স্প্যানিশ ভাষার সঙ্গে পেয়েছি বিশ্ব।

বাংলা কবিতা বুঝবে না সহজে সে কী হারালো আজ।

শুভ্র

নয়ডা
১৮/১১/২০২০

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (1)
  • comment-avatar
    Prabhat mukherjee 11 months

    বিশ্বাস ও বিশ্বাসভঙ্গের খেলা, ন্যাটো আর ই ইউ নিয়ে গভীর উচ্চারণের উল্লেখ ভালো লাগল বেশ