
বৃষ্টিতে একটি বিড়াল মূল গল্প- আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে অনুবাদ- পার্থজিৎ চন্দ
তারা শাদা ঘোড়াটার পায়ে আঘাত করতেই সে উঠে দাঁড়িয়েছিল। ষাঁড়ের লড়াইয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ষাঁড়কে খোঁচানোর কাজ করে পিকাডোর। তেমনই এক পিকাডোর রেকাবে পা দিয়ে লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছিল।
ঘোড়ার তলপেটের কাছে এক দলা মাংস ঝুলছে। ঘোড়াটা নিজের ছন্দে ছুটতে শুরু করেছে আর নীল হয়ে যাওয়া সেই মাংস গতির তালে তালে সমানে দুলছে। অন্য একজন সওয়ারি রড দিয়ে তার পিছনের পায়ে খোঁচা দিল। ঘোড়া ঝাঁকুনি দিয়ে একটা কাঠের ঘেরাটোপে ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়ার পর সওয়ারি লাগাম টেনে তাকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
পিকাডোর রেকাবে পা দিয়ে সামনের ঝুঁকে ষাঁড়ের দিকে তীক্ষ্ণ বর্শা নাড়াচ্ছে। ঘোড়ার সামনের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে। সে থরথর করে কাঁপছে, ভয়ে। ষাঁড় তখনও আক্রমণ করবে কি না ঠিক করে উঠতে পারেনি।
দুজন আমেরিকান এই হোটেলে রয়েছে। সিঁড়িতে ওঠার সময়, হোটেলের ঘরে ঢোকা আর বেরোনোর সময় অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কিন্তু তারা দুজন কাউকেই চেনে না।
হোটেলে তাদের রুম তিনতলায়, সমুদ্রের দিকে মুখ করা। সেদিকে সমুদ্র ছাড়া একটা বাগান আর যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভও আছে। বাগানে বড় বড় পাম আর সবুজ বেঞ্চ। আবহাওয়া ভাল থাকলে সেখানে ইজেল নিয়ে চিত্রকর বসে থাকে। শিল্পীরা বাগানের পাম, বাগানের দিকে মুখ করে থাকা ঝকঝকে হোটেল আর সমুদ্র বেশ পছন্দ করে।
ইতালিয়ানরা অনেক দূর থেকে এই যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে আসে। ব্রোঞ্জের তৈরি স্তম্ভ বৃষ্টিতে ভিজে ঝকঝক করে। পামগাছ থেকে গড়িয়ে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা। বাগানে নুড়িপাথরের ফাঁকে জমে থাকে বৃষ্টির জল। পাশেই বেশ লম্বা আর চওড়া বালুতট। বৃষ্টিতে ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ে বালুতটে। একবার আছড়ে পড়ে সরে যায়; সরে গিয়ে আবার আছড়ে পড়ে।
যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে একটা ফাঁকা চত্বর, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরগাড়িগুলি চলে গেছে। চত্বরের উলটো দিকে একটা ক্যাফের সামনে দাঁড়িয়ে একজন ওয়েটার সেই ফাঁকা চত্বরের দিকে তাকিয়ে ছিল।
হোটলের রুমে যে দুজন আমেরিকান ছিল তারা স্বামী-স্ত্রী। মহিলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে।
বাইরে, তাদের জানালার নিচে একটা বিড়াল সবুজ টেবিলের তলায় কুঁকড়ে বসে। বৃষ্টি হচ্ছে, সবুজ টেবিলের গা বেয়ে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির জল। বিড়ালটি নিজেকে যতটা সম্ভব কুঁকড়ে নিতে চাইছিল, যাতে গায়ে জল না-পড়ে।
মহিলা পুরুষটিকে বলল, ‘আমি নিচে গিয়ে ওই বিড়ালছানাকে নিয়ে আসি।’
পুরুষটি বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে উত্তর দিয়েছিল, ‘না, না, তোমার যাওয়ার দরকার নেই। আমিই নিয়ে আসছি।’
‘না না, আমিই নিয়ে আসছি। বেচারা বিড়ালছানাটা টেবিলের নিচে কুঁকড়ে বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচতে চাইছে।’
পুরুষটি আসলে পায়ের নিচে দুটো পাশবালিশ দিয়ে গা এলিয়ে একটা বই পড়ছিল। এক্ষেত্রে কিছু বলার থাকে না, তবু সে বলেছিল, ‘বিড়ালছানাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি যেন ভিজো না!’
সিঁড়ি দিয়ে নেমে হোটেল-মালিকের অফিস পার হয়ে বাইরে বেরোতে হবে। মালিক বয়স্ক, কিন্তু বেশ লম্বাচওড়া। ভদ্রমহিলাকে দেখে তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে নমস্কার করেছিলেন।
হোটেল-মালিক বেশ ভাল, অন্তত দেখে তাই মনে হয়, ভদ্রমহিলা বলেছিল, ‘বেশ বৃষ্টি নেমেছে।’
স্প্যানিশ আর ইতালিয়ান ভাষার অদ্ভুত মিশ্রণে ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, ম্যাডাম, বেশ বাজে আবহাওয়া।’
হোটেল-মালিকের ডেস্ক যেখানে সে জায়গাটা বেশ অন্ধকার। ডেস্কের পিছনে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ভদ্রলোক যে কোনও অভিযোগ এলে অত্যন্ত গুরুত্ত্ব দিয়ে শোনেন। বেশ ভদ্রসভ্য মানুষ। মানুষটি তার স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর রেখেছেন আসা থেকে। একজন আদর্শ হোটলে মালিকের এমনই হওয়া উচিত। এই বয়স্ক ভদ্রলোকটির গোলগাল ভারি মুখ, চওড়া হাতের পাঞ্জা তার বেশ পছন্দের।
ভদ্রমহিলা হোটেলের দরজা খুলে সামনে তাকাল। বৃষ্টির জোর বেড়েছে। মাথায় রবারের টুপি পরে একজন চত্বর পেরিয়ে ক্যাফের দিকে যাচ্ছে।বিড়ালটি মনে হয় ডানদিকে। কোনও গর্তের মধ্যেও ঢুকে থাকতে পারে।
হোটেলের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার সময়েই তার মাথার ওপর ছাতা খুলে দিয়েছে একজন। তাদের ঘর ঝাড়পোঁচ করা মেয়েটিকে হোটেল-মালিক পাঠিয়েছেন। সে হাসতে-হাসতে ইতালিয়ান ভাষায় বলেছিল, ‘আপনার ভেজা একদম উচিৎ নয়।’
হোটেলের পরিচারিকা মাথায় ছাতা ধরে রয়েছে, আমেরিকান মহিলা নুড়িপাথরে সাজানো রাস্তা দিয়ে কিছুটা হেঁটে তাদের জানালার নিচে এসে দাঁড়াল। টেবিলটি এখানেই। বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেন আরও সবুজ হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হল, বিড়ালটি ইতিমধ্যে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেছে। ভদ্রমহিলা বেশ বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। হোটেলের পরিচারিকা একবার তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনি কি কিছু হারিয়েছেন, ম্যাডাম?’
‘এখানে কিছুক্ষণ আগেও একটা বিড়াল ছিল…,’ আমেরিকান ভদ্রমহিলা উত্তর দিয়েছিল।
‘একটা বিড়াল?’ মেয়েটা বেশ মজা পেয়েছে মনে হয়।
‘হ্যাঁ, একটা বিড়াল।’
‘এই বৃষ্টিতে একটা বিড়াল?,’ মেয়েটা ফিক করে হেসে ফেলেছিল।
‘হ্যাঁ, বিড়ালটা টেবিলের নিচেই ছিল। আমি খুব করে বিড়ালছানাটাকে চেয়েছিলাম,’ ইংরেজিতে কথাগুলি বলেছিল আমেরিকান ভদ্রমহিলা। পরিচারিকার মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল। সে বলেছিল, ‘আসুন, ম্যাডাম, আমরা হোটেলে ঢুকে পড়ি। না-হলে আপনি ভিজে যাবেন।’
‘আমারও তাই মনে হয়,’ এই কথা বলে দুজনে নুড়িপাথর বিছানো পথ ধরে হেঁটে সামনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছিল।
পরিচারিকা বাইরে ছাতা বন্ধ করছে, আমেরিকান ভদ্রমহিলা ডেস্কের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হোটেল-মালিক ভদ্রলোক সামনে ঝুঁকে তাকে নমস্কার করেছিলেন। ভদ্রমহিলা নিজের ভেতর নিজে বেশ কুঁকড়ে যাচ্ছে। এই হোটেল-মালিক তাকে একই সঙ্গে অকিঞ্চিৎকর ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়েছিল এই পৃথিবীতে সেই সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মহিলা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গিয়েছিল। রুমের দরজা খুলেছিল। জর্জ তখন বিছানায় শুয়ে একটা বই পড়ছে। বইটা পাশে রেখে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বিড়ালটাকে পেলে?’
‘বিড়ালটা পালিয়েছে।’
চোখ তুলে জর্জ বলেছিল, ‘আশ্চর্য, বিড়ালটা গেল কোথায়?’
ভদ্রমহিলা বিছানায় বসে পড়েছিল, ক্লান্ত গলায় বলতে শুরু করেছিল, ‘বিড়ালটাকে আমি বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে খুব চেষ্টা করেছিলাম। বেচারা… বৃষ্টিতে বিড়ালছানার এভাবে ভেজা বেশ কষ্টকর।’
জর্জ ততক্ষণে আবার বই পড়তে শুরু করেছে।
ভদ্রমহিলা উঠে গিয়ে ড্রেসিং-টেবিলের সামনে বসেছিল। তার হাতে একটা ছোট্ট আয়না। আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রথমে মুখের দু’পাশ দেখার পর সে মাথার পিছন দিক আর ঘাড় দেখেছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
‘আচ্ছা, আমি যদি মাথার চুল বড় করে ফেলি বেশ ভাল হয়, তাই না!,’ ভদ্রমহিলা জর্জকে বলেছিল।
জর্জ একবার বই থেকে মাথা তুলে দেখেছিল তার স্ত্রীর চুল ছেলেদের মতো, ছোট-ছোট করে কাটা, ‘আমার তো এটাই ভাল লাগছে।’
‘আমার কিন্তু বিরক্ত লাগছে, ছেলেদের মতো এরকম চুল আমার ভাল লাগে না,’ ভদ্রমহিলা উত্তর দিয়েছিল।
জর্জ বিছানায় একবার নড়েচড়ে শুয়েছিল, কথা বলার শুরু থেকে সে একবারও স্ত্রীর থেকে চোখ সরায়নি।
‘তোমাকে বেশ মিষ্টি লাগছে, কিন্তু,’ জর্জ বলল।
ভদ্রমহিলা হাতের আয়নাটা ড্রেসিং-টেবিলে রেখে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাইরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।
‘আমি আমার চুল বড় করে পিছন দিকে একটা খোঁপা বাঁধতে চাই। শুধু তাই নয়, আমি চাই একটা বিড়ালছানাকে কোলে নিয়ে বেশ আদর করব আর সে মাঝে মাঝে মিউমিউ করবে।’
জর্জ বিরক্ত হয়ে বলেছিল, ‘এবার চুপ করো; কিছু একটা পড়তে শুরু করো।’
তার স্ত্রী তখনও জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে। পামগাছের মাথার ওপর বৃষ্টি ঝরে পড়ছে আর বাইরে অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে।
ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করেছিল, ‘যাই হোক, আমার একটা বিড়াল চাই-ই চাই। এক্ষুনি চাই। আমার চুল বড় না-হলেই চলবে, কিন্তু বিড়লটা এক্ষুনি চাই।’
জর্জ সে কথায় কান না-দিয়ে বই পড়ে চলেছিল। তার স্ত্রী জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে; এক টুকরো আলো এসে পড়েছে সামনের চত্বরে।
দরজায় কেউ কড়া নেড়েছিল।
‘ভিতরে এসো,’ বই থেকে মুখ তুলে জর্জ বলেছিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল সেই কাজের মেয়েটি। তার বুকের কাছে শক্ত করে ধরা একটি কালো কুচকুচে বিড়াল।
মেয়েটি বলেছিল, ‘একটু বিরক্ত করলাম, আসলে মালিক এটাকে দিদির জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

