
অনশনের সামনে নীরব রাষ্ট্র: সোনম ওয়াংচুক এবং আমাদের গণতন্ত্রের আয়না হিন্দোল ভট্টাচার্য
একজন মানুষ অনশনে বসেছেন। তাঁর হাতে অস্ত্র নেই। তাঁর সঙ্গে সেনাবাহিনী নেই। তাঁর পাশে ক্ষমতার অট্টালিকাও নেই। তাঁর কাছে আছে শুধু একটি ক্ষীণ হয়ে আসা শরীর, একটি দৃঢ় বিশ্বাস এবং কয়েকটি প্রশ্ন। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই প্রশ্নগুলিকেই ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। কারণ বন্দুকের গুলিকে আটকানো যায়, কিন্তু বিবেকের প্রশ্নকে বন্দি করে রাখা যায় না। সোনম ওয়াংচুককে ঘিরে আজ যে বিতর্ক, তা কোনও একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের চরিত্র নিয়ে বিতর্ক। একজন নাগরিক, যিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে শিক্ষা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁর বক্তব্যের জবাব কি সংলাপ দিয়ে দেওয়া হবে, নাকি নীরবতা দিয়ে? গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই পরিমাপ করা হয়।দেশের তরুণ প্রজন্ম বহু বছর ধরে একটি ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছে। পরীক্ষার আগে উদ্বেগ ছিল নিজের প্রস্তুতি নিয়ে। এখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর-একটি প্রশ্ন—পরীক্ষা আদৌ সুষ্ঠুভাবে হবে তো? প্রশ্নপত্র নিরাপদ থাকবে তো? পরিশ্রমের মূল্য শেষ পর্যন্ত থাকবে তো? এই উদ্বেগ কেবল পরীক্ষার নয়; এটি একটি প্রজন্মের রাষ্ট্রের উপর আস্থা হারানোর উদ্বেগ।
যখন একজন ছাত্র বা ছাত্রী বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, পরিবার অর্থনৈতিক কষ্ট সয়ে তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তখন সেই পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কারণ পরীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি মাধ্যম। দরিদ্র ও ধনী, শহর ও গ্রাম—সবাইকে একই নিয়মে বিচার করার যে প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র দেয়, তার অন্যতম ভিত্তি একটি সুষ্ঠু পরীক্ষা ব্যবস্থা।এই কারণেই শিক্ষা নিয়ে মানুষের ক্ষোভকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারেরও নিজস্ব ব্যাখ্যা থাকতে পারে—তদন্ত চলছে, সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, নতুন আইন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেই যুক্তিগুলিও গণতান্ত্রিক আলোচনার অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে নাগরিকদের উদ্বেগ যদি দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই। সেই প্রশ্নকে দেশবিরোধিতা বা শত্রুতা হিসেবে দেখা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল এর পদ্ধতি। তিনি সহিংসতার ভাষা বেছে নেননি। তিনি মানুষের বিবেকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। অনশন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনোত্তর ভারত—অসংখ্য মানুষ অনশনকে নৈতিক প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কেউ তাঁদের সঙ্গে একমত হতে পারেন, কেউ নাও হতে পারেন। কিন্তু অনশন একটি রাজনৈতিক বক্তব্য, এবং তার জবাবও রাজনৈতিক ও নৈতিক স্তরেই হওয়া উচিত।
একটি পরিণত রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস থাকে। সেই আত্মবিশ্বাস তাকে সমালোচনা শুনতে শেখায়। কারণ সমালোচনা গণতন্ত্রের শত্রু নয়; বরং গণতন্ত্রের সংশোধন প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ। যে সমাজে প্রশ্ন করার জায়গা ছোট হয়ে আসে, সেখানে ভুল বড় হতে থাকে। আর যে রাষ্ট্র কেবল নিজের সাফল্যের গল্পই শুনতে চায়, সে একসময় নিজের ব্যর্থতার শব্দও শুনতে পায় না। আজ শিক্ষা নিয়ে যে বিতর্ক, তা কোনও একটি পরীক্ষা বা কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বৃহত্তর আস্থার প্রশ্ন। ছাত্ররা জানতে চায়, নিয়ম কি সবার জন্য সমান? দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি যথেষ্ট কার্যকর? ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা ঠেকাতে কী দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার হবে? এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর পাওয়া তাদের অধিকার।রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব কম নয়। তাকে শুধু অপরাধীদের খুঁজে বের করলেই চলবে না; এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের আস্থা ফিরে আসে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, স্বচ্ছ প্রশাসন, স্বাধীন তদারকি, দ্রুত তদন্ত এবং নিরপেক্ষ জবাবদিহি—এসব ছাড়া সেই আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন ক্ষমতা এবং প্রতিবাদ একে অপরকে ধ্বংস করার চেষ্টা না করে, পরস্পরকে শুনতে শেখে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, কিন্তু সেই সঙ্গে নাগরিকের কণ্ঠস্বর শোনাও তার দায়িত্ব। অন্যদিকে, আন্দোলনের শক্তিও শান্তিপূর্ণ, তথ্যভিত্তিক এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আরও অর্থবহ হয়। সোনম ওয়াংচুকের অনশন শেষ হবে—আজ, কাল অথবা কয়েক দিন পরে। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলি সামনে এনেছেন, সেগুলি অনশনের সঙ্গে শেষ হবে না। শিক্ষা কি সত্যিই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার? ছাত্রদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা কী করছি? মতভেদকে আমরা কি আলোচনার সুযোগ হিসেবে দেখছি, নাকি সংঘাতের কারণ হিসেবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনও এক ব্যক্তি বা এক সরকারের জন্য নয়; এগুলি সমগ্র দেশের জন্য। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার উচ্চতায় নয়, মানুষের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় দমন নয়, সংলাপ; নীরবতা নয়, জবাবদিহি; অবিশ্বাস নয়, স্বচ্ছতা। সোনম ওয়াংচুকের অনশন আমাদের সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র বন্দুক নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র তার নীরবতা। বন্দুক মানুষকে হত্যা করে, নীরবতা হত্যা করে বিবেককে। আর যখন একটি রাষ্ট্র এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে একজন অনশনরত মানুষের শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট, কাঁপতে থাকা শরীর, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা নাড়ির স্পন্দনও তার বিবেককে স্পর্শ করতে পারে না, তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল একজন মানুষের নয়—সংকট সমগ্র গণতন্ত্রের।সোনম ওয়াংচুক আজ কোনও ব্যক্তির নাম নয়। তিনি এক প্রশ্নের নাম। সেই প্রশ্ন—এই দেশের ছাত্রদের ভবিষ্যৎ কি সত্যিই রাষ্ট্রের কাছে মূল্যবান? যদি মূল্যবান হয়, তবে কেন একের পর এক পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা, প্রশ্নফাঁস, অব্যবস্থা ও আস্থাহীনতার বিরুদ্ধে একজন মানুষকে নিজের শরীরকে বাজি রাখতে হয়? কেন তাঁকে অনশনে বসতে হয়? কেন রাষ্ট্রের দরজা খুলতে একজন নাগরিককে নিজের জীবনকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে হয়? ক্ষমতা সবসময় উচ্চকণ্ঠ। সে মাইক্রোফোনে কথা বলে, বিজ্ঞাপনে কথা বলে, বিশাল মঞ্চে কথা বলে। কিন্তু প্রতিবাদ কথা বলে ক্ষীণ কণ্ঠে। সেই কণ্ঠকে শোনার জন্য দরকার সংবেদনশীলতা। দুর্ভাগ্য এই যে, আমাদের সময়ে রাষ্ট্র যেন কেবল নিজের কণ্ঠস্বরই শুনতে শিখেছে। নাগরিকের কণ্ঠ তার কাছে তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা প্রশংসা করে। প্রশ্ন তুললেই তাকে সন্দেহ করা হয়, অস্বস্তিকর বলে মনে হয়, কখনও কখনও উপেক্ষা করা হয়। এই উপেক্ষাই আজকের ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভাষা।
সোনম ওয়াংচুকের অনশনকে কেবল একজন ব্যক্তির কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর উদ্বেগের প্রতীক। যারা বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়, তারা জানতে চায়—তাদের পরিশ্রম কি সত্যিই নিরাপদ? নাকি কোনও অদৃশ্য দুর্নীতির বাজারে তাদের স্বপ্নেরও দাম নির্ধারিত হয়ে গেছে? একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার আকাশছোঁয়া মূর্তিতে নয়, তার দ্রুতগতির এক্সপ্রেসওয়েতেও নয়। তার পরিচয় নির্ধারিত হয়, সে তার সবচেয়ে দুর্বল অথচ সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত প্রশ্ন তোলা নাগরিকের সঙ্গে কী আচরণ করে। একজন অনশনকারীকে শত্রু হিসেবে নয়, সতর্কসংকেত হিসেবে দেখতে শেখাই গণতন্ত্রের পরিণত রূপ। আজ প্রয়োজন ক্ষমতার অহংকার নয়, সংলাপের সাহস। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—যে রাষ্ট্র প্রশ্নকে ভয় পায়, সে একদিন উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। সোনম ওয়াংচুকের শরীর ক্ষীণ হতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন ক্ষীণ হবে না। কারণ এই প্রশ্ন একজন মানুষের নয়; এই প্রশ্ন ভারতের ভবিষ্যতের। লাদাখের বিস্তীর্ণ শুষ্ক পাহাড়ে বহু শতাব্দী ধরে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা নিয়ে বেঁচে আছে। সেই পাহাড় থেকেই উঠে এসেছে এক বিজ্ঞানী, এক শিক্ষাবিদ, এক পরিবেশ-সংরক্ষণ আন্দোলনের মুখ—সোনম ওয়াংচুক। তিনি কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী নন, কোনও ক্ষমতা দখলের রাজনীতিক নন, কোনও হিংসাত্মক আন্দোলনের নেতা নন। তিনি বারবার বলেছেন, তাঁর দাবি ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই লাদাখের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের অধিকার রক্ষা করা। অথচ তাঁর আন্দোলনের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এমন এক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যা শুধু লাদাখের নয়—সমগ্র ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করার ক্ষমতায় নয়; বরং সেই কণ্ঠস্বরকে শোনার সক্ষমতায়। রাষ্ট্র যদি কেবল প্রশংসাই শুনতে চায়, সমালোচনাকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হতে থাকে। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল রাস্তা, টানেল, সেনা ঘাঁটি বা পর্যটন প্রকল্পের নাম নয়; উন্নয়ন মানে মানুষ, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাও। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠনের পরে লাদাখকে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়। প্রথমে বহু মানুষ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুতই সামনে আসে অন্য বাস্তবতা। বিধানসভাহীন একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত হয়ে যায়। জমি, চাকরি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এই উদ্বেগ থেকেই লাদাখের বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন একত্রিত হয়ে চার দফা দাবি তোলে—সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষা, পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা, পৃথক লোকসভা প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং সরকারি নিয়োগে ন্যায্য অংশগ্রহণ। এই দাবিগুলি সাংবিধানিক পরিসরের মধ্যেই ছিল।
সোনম ওয়াংচুক এই দাবির মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর আন্দোলনের ভাষা ছিল অনশন, পদযাত্রা, শান্তিপূর্ণ সভা এবং পরিবেশ রক্ষার আবেদন। তিনি বারবার বলেছেন, লাদাখের হিমবাহ ভেঙে পড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দ্রুত বাড়ছে, নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণ এবং খনিজ আহরণ এই অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর প্রশ্ন ছিল—দেশ যদি সীমান্ত রক্ষার জন্য লাদাখকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তবে সেই সীমান্তের মানুষের মতামত কি গুরুত্ব পাবে না? কিন্তু এই প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘ নীরবতা দেখা যায়। বারবার আলোচনার প্রতিশ্রুতি এসেছে, আবার তা ভেঙেও গেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের কথা শোনার পরিবর্তে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, আটক, সমাবেশে বাধা এবং নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। রাষ্ট্র অবশ্য যুক্তি দেয় যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য কিছু ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল। গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গাটি এখানেই—রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যুক্তি এবং নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়? গণতন্ত্রে বিরোধিতাকে যদি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রই। ইতিহাস বলছে, যে সমাজে সংলাপের দরজা বন্ধ হয়, সেখানে অবিশ্বাসের দেয়াল উঁচু হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিজেই অহিংস প্রতিবাদের ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে জয়প্রকাশ নারায়ণ—প্রতিবাদের অধিকারই ভারতীয় গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবেই সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনকে দেখা উচিত।
আজ প্রশ্ন কেবল লাদাখের নয়। প্রশ্ন হল, একজন নাগরিক যদি শান্তিপূর্ণভাবে পরিবেশ রক্ষার দাবি তোলেন, সংবিধানসম্মত সাংবিধানিক সুরক্ষার কথা বলেন, তবে রাষ্ট্রের প্রথম কাজ কি তাঁকে শোনা, নাকি তাঁকে থামানো? একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায় না। সমালোচনা থেকেই নীতি উন্নত হয়, ভুল সংশোধিত হয়, মানুষের আস্থা বাড়ে। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন আমাদের আর একটি বড় শিক্ষা দেয়। জলবায়ু সংকট কোনও ভবিষ্যতের বিপদ নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। লাদাখে হিমবাহ গলছে, জলসঙ্কট বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। এমন সময় পরিবেশ রক্ষার কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে উপেক্ষা করা। উন্নয়নের নামে যদি প্রকৃতির ভারসাম্য ধ্বংস হয়, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করবে।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি আরও বেশি প্রয়োজন। নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সংলাপের মাধ্যমে। কোনও সরকারই চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি স্থায়ী। তাই বিরোধী মতকে দমন নয়, তার সঙ্গে যুক্তিযুক্ত আলোচনাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয়। সোনম ওয়াংচুক হয়তো একদিন আন্দোলন শেষ করবেন। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলি তুলেছেন—প্রকৃতি বনাম উন্নয়ন, কেন্দ্র বনাম প্রান্ত, ক্ষমতা বনাম নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতা—সেগুলি থেকে যাবে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর শক্তি দিয়ে নয়, সংলাপ দিয়ে খুঁজতে হবে। আজকের ভারতে শিক্ষা আর কেবল জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র নয়; তা এক বিশাল বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। কোচিং শিল্প, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরীক্ষাকেন্দ্রিক অর্থনীতি, প্রকাশনা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে শিক্ষাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার। এই বাজারের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। সেই প্রশ্নের সব উত্তর হয়তো আমাদের জানা নেই, কিন্তু এটা স্পষ্ট যে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বিপুল অর্থনৈতিক কাঠামোকে নাড়া দেওয়া কোনও সরকারের পক্ষেই সহজ নয়। ফলে যখন কেউ এই ব্যবস্থার গভীরে হাত দিতে চান, তখন তাঁর সামনে শুধু প্রশাসনিক জটিলতাই নয়, একটি শক্তিশালী স্বার্থজালেরও মুখোমুখি হতে হয়। সোনম ওয়াংচুকের অনশন কি তবে সেই বিপুল স্বার্থজালেই আঘাত করেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের ক্রমবর্ধমান শিক্ষা-বাজার? এই প্রশ্ন আজ অমূলক নয়। কারণ শিক্ষা যখন হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনীতিতে পরিণত হয়, তখন সেই ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের দাবি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রতিষ্ঠিত স্বার্থকে অস্বস্তিতে ফেলে। রাষ্ট্রের বর্তমান নীরবতা কি কেবল প্রশাসনিক কৌশল, নাকি সেই অস্বস্তিকর স্বার্থসমীকরণেরই প্রতিফলন? এর নিশ্চিত উত্তর আজও অজানা। কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে যায়। আর গণতন্ত্রে কোনও প্রশ্নকে অযৌক্তিক বলা যায় না, যদি তা জনস্বার্থের ভিত্তিতে ওঠে।
সোনম ওয়াংচুক, আপনার আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক।

