
পার্বতী রায়-এর গুচ্ছ কবিতা
তর্জমা
সময় কি ঘুণপোকা, প্রিয়ম—
কুরে কুরে খায়!
তোমাকে বন্ধনীতে রেখে বেড়াতে যাবো।
এখনও রাতের ট্রেন বাড়ি ফিরলে
কেন মনে হয় তুমি আসবে?
নিরপেক্ষ কলতলা, উঠোন—
ডানার শব্দ এসে মিলিয়ে যায়।
এই প্রতিবাদ ক্ষণিকের,
এই প্রতিসরণ ক্ষণিকের।
নিভে আসা নৌকোর বুকে
কিছু তর্জমা জমে আছে।
অন্ত্যমিল
বাতাসের মন ভারী আজ,
আনত চোখের পাতায় বৃষ্টির রেণু।
সহজিয়া গান রেখে চলে গেছে পাখি—
অন্ত্যমিলে যেতে পারছি না।
আমি কি তবে ফিরে যাব, প্রিয়ম?
বসন্তের চোখে চোখ মেলাতে পারছি না।
এই আকস্মিক ওঠা-পড়ায়
বন্দর গেছে সরে,
পুবের মিশেল-রোদ
ডানা ফেলে কোথায় চলে গেছে!
কুসুম
এসো, আরও কিছু কুসুম জড়ো করি।
দিনের উপরিভাগে সেতু নেই,
মনখারাপ হেঁটে যাচ্ছে
ফাগুনবউ-এর শিরা-উপশিরায়।
যদি থেমে থাকি, তবে কী বলবে?
নৌকো কেনা বারণ!
খুব ভোর থেকে উৎসব মেলছে পাখিরা—
উন্মন সংগীতের ভেতর
ধানের শিশির দুলে উঠছে।
উপমা
ঠিক কোনখান থেকে চলা শুরু করবো, প্রিয়ম!
রোদের চিবুক খুব ব্যতিক্রমী—
পলাশ ফুলের রিচ কমে গেছে বলে
আজ আর আমাকে দোষ দিও না।
ঝাড়বাতির উপমা টেনে বলছি,
এই সকাল আমাকে অস্থির করছে।
সন্তাপ
এবার আমি জ্যোৎস্না জড়িয়ে নেবো।
একরত্তি ফাল্গুন কিছুতেই কাছে আসছে না।
অহর্নিশ বিশ্বাস ভাঙছো—
নিরাশার সন্তাপে জড়িয়ে নিচ্ছি বুক।
আজ আর কোনও মিথ্যে কথার নূপুর বাজিও না।
একটি আকাশ পেতেছি মনে মনে…
ঠিক কোনখান দিয়ে সকাল আসবে, বলে যেও।
পরশ
পাতা ঝরার শব্দ আসছে
রাতের চোখ কি ঈশ্বরের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে যায়, প্রিয়ম!
স্বপ্নেরা কী ভীষণ পাশুটে করে তুলছে মন।
মেদ ঝরছে পরশের।
আর কি অস্থিরভাবে তাকানো ঠিক হবে জানলার দিকে?
বালির হৃদয়ে নিরন্তর কেঁপে উঠছে ভালোবাসার তুলো—
তাকে কি আর সামলে রাখা যাবে, প্রিয়ম?
হাতঘড়ির হার্টবিট বেড়েই চলেছে।
সাজিয়ে রাখছি প্রেমের প্রেক্ষাপট
এ-ফোর পেপারে।
অপ্রতুল
অনেক তো হলো, প্রিয়ম।
এবার না-হয় ফিরিয়ে দাও হারমোনিয়াম—পৃথিবীর বৃহত্তম বাঁকা চোখ, চশমার
অতিক্রম একটি চলমান রেখা—
তার পাশে পঙক্তি সাজানো কি ঠিক হবে?
সাবানের লজ্জা বাড়ছে ক্রমাগত।
ভয় পাচ্ছি বাতাস নির্বাচনে।
এসো, দুকলি সায়েরি হয়ে যাক।
আলো নিভলে নিভুক না-হয়,
ঢেউকে অপ্রতুল রাখি।


দারুণ সব কবিতা পড়ে মুগ্ধ হলাম
প্রতিটি কবিতাই অসাধারণ,খুব ভালো লাগলো
পার্বতী রায়— ‘তর্জমা’, ‘অন্ত্যমিল’, ‘কুসুম’, ‘উপমা’, ‘সন্তাপ’, ‘পরশ’ ও ‘অপ্রতুল’— কবিতাগুলিতে এক গভীর সংবেদনশীল এবং অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শনের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে ‘প্রিয়ম’ নামক এক সম্বোধন, যা হতে পারে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ অথবা কবির নিজেরই অন্তরাত্মার এক প্রতিচ্ছবি।
পার্বতী রায়ের দর্শনে সময় এক ক্ষয়িষ্ণু সত্তা। তিনি সময়কে ‘ঘুণপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন যা নিঃশব্দে জীবনকে কুরে কুরে খায়। স্মৃতির ভার এবং প্রিয়জনের প্রতীক্ষা তাঁর কাব্যমননের এক বড় অংশ। তিনি লিখেছেন :
”সময় কি ঘুণপোকা, প্রিয়ম— / কুরে কুরে খায়! / তোমাকে বন্ধনীতে রেখে বেড়াতে যাবো।” এখানে ‘বন্ধনীতে রাখা’র উপমাটি চমৎকার— স্মৃতিকে আটকে রেখেও তিনি মুক্তি খুঁজছেন, কিন্তু ট্রেনের শব্দে আজও প্রিয়জনের ফেরার পদধ্বনি শোনেন। এটি তাঁর দর্শনের এক অসহায় ও চিরন্তন অপেক্ষা।
কবির চিন্তনে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, বরং মনের অবস্থার এক রূপক। ফাগুন, পলাশ বা ধানের শিশির তাঁর কবিতায় মানবিক আবেগের বাহক হয়ে ওঠে। তখন তিনি উল্লেখ করেন :
”মনখারাপ হেঁটে যাচ্ছে / ফাগুনবউ-এর শিরা-উপশিরায়।” কিংবা—
“পলাশ ফুলের রিচ কমে গেছে বলে / আজ আর আমাকে দোষ দিও না।” এখানে প্রাকৃতিক উপাদানের অভাব বা পরিবর্তনকে তিনি নিজের মনের রিক্ততার সাথে একীভূত করেছেন। তাঁর দর্শন বলে, মানুষের আবেগ প্রকৃতির ঋতুচক্রের মতোই পরিবর্তনশীল ও অবাধ্য।
পার্বতী রায়ের কবিতায় আধুনিক মানুষের একাকিত্ব ও বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা প্রকট। তিনি মিথ্যে আশ্বাস বা কৃত্রিমতার চেয়ে সত্যের ‘সন্তাপ’ বা কষ্টকে বেছে নিতে চান। তাই তার শব্দস্বরের অভিক্ষেপ :
”অহর্নিশ বিশ্বাস ভাঙছো— / নিরাশার সন্তাপে জড়িয়ে নিচ্ছি বুক। / আজ আর কোনও মিথ্যে কথার নূপুর বাজিও না।” এই পঙক্তিগুলো কবির ঋজু এবং সত্যনিষ্ঠ মানসিকতার পরিচয় দেয়। তিনি ‘মিথ্যে কথার নূপুর’ শুনতে চান না, বরং শূন্য আকাশকে মনে গেঁথে নিয়ে ভোরের প্রতীক্ষা করতে চান।
তাঁর দর্শনে ‘রাত’ বা ‘অন্ধকার’ এক আধ্যাত্মিক উত্তরণ। তিনি জাগতিক পরশ এবং ঈশ্বরের নৈকট্যের মধ্যে এক সংযোগসূত্র খোঁজেন। কবিতাই উল্লেখ করেন সে কথা:
”রাতের চোখ কি ঈশ্বরের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে যায়, প্রিয়ম! / স্বপ্নেরা কী ভীষণ পাশুটে করে তুলছে মন।” একদিকে ঈশ্বরের নৈকট্য, অন্যদিকে ‘হাতঘড়ির হার্টবিট’— অর্থাৎ সময়ের তীব্র গতি এবং প্রেমের অস্থিরতা কবিকে বিচলিত করে। ভালোবাসাকে ‘বালির হৃদয়ে কাঁপতে থাকা তুলো’র মতো ভঙ্গুর মনে হওয়া তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ।
কাব্যগুচ্ছের শেষ কবিতাটিতে কবির দর্শন এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যায়। তিনি তথাকথিত ‘পারফেকশন’ বা পূর্ণতার চেয়ে অসম্পূর্ণতাকে বেছে নিতে চান।—
”এসো, দুকলি সায়েরি হয়ে যাক। / আলো নিভলে নিভুক না-হয়, / ঢেউকে অপ্রতুল রাখি।” পৃথিবীর ‘বাঁকা চোখ’ বা সমালোচনার ভয়ে তিনি পিছিয়ে না গিয়ে বরং নিজের ছোট ছোট অনুভূতি বা ‘সায়েরি’তে বাঁচতে চান। সবকিছু পর্যাপ্ত হওয়ার চেয়ে কিছু জিনিস ‘অপ্রতুল’ থাকাই যে জীবনের সার্থকতা, এটাই তাঁর কবির মননের মূল কথা।
পার্বতী রায়ের কাব্যদর্শন মূলত প্রতীক্ষা, দহন এবং উত্তরণের এক সমন্বিত রূপ। তিনি খুব তুচ্ছ উপমা (যেমন— সাবান, হাতঘড়ি, এ-ফোর পেপার) ব্যবহার করে জীবনের গভীর দর্শনকে স্পর্শ করেন। তাঁর চিন্তনে প্রেম কেবল মিলন নয়, বরং এক নিরন্তর ‘তর্জমা’ বা অনুবাদের প্রক্রিয়া, যেখানে প্রিয়মকে পাশে নিয়েও মানুষ শেষ পর্যন্ত একাকী এবং নিজের ভেতরের আকাশের সন্ধানী।