রিনি গঙ্গোপাধ্যায়-এর গল্প

রিনি গঙ্গোপাধ্যায়-এর গল্প

 নাগরিক পরিচয়

দুটো বাস পাশাপাশি যেতে পারে না এতো সরু রাস্তার অর্ধেকটা আটকে পথসভা হচ্ছে। বিরোধী পক্ষের লোক মাইক উঁচিয়ে ধমকে চমকে বোঝাচ্ছে এস আই আর কেন জরুরি। তার মোদ্দা কথাটা হলো ‘হিন্দু ক্ষতরেমে হ্যা’! মুসলমানরা ঘাপটি মেরে রয়েছে এ দেশে। যখন তখন আতঙ্কবাদী হামলা করতে পারে তারা। সেই পুলওয়ামা থেকে সাম্প্রতিক দিল্লি মেট্রো ব্লাস্ট – এসব তো তারই প্রমাণ। বিপরীতক্রমে হাজার প্রমাণ থাকলেও প্রচারের মহিমা সর্বত্র!

ওদিকে সরকারি দলটিও মাইক হাতে নেমে পড়েছে। সে বোঝাচ্ছে কীভাবে এস আই আর এর মোকাবিলা করতে হবে। কীভাবে এনুমারেশন ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। বাঙালিকে বাঁচাতে তার আপ্রাণ গলা ফাটছে!

অটোর ভেতরে বসে বসে এদিকে অনুপর্ণা টের পাচ্ছে পাশের কনুইটা ক্রমশ ঘষে যেতে চাইছে তার অপুষ্ট বুকের ডানদিকটায়। অনুপর্ণা প্রথম থেকেই বিষয়টা খেয়াল করেছে। কিছু বলতে গেলে এখন আবার চারটে কথা বলতে হবে! চেপেচুপে বসে এটুকু রাস্তা পার করে নেবে ভেবেছিল। যে রাজ্যে নারীদেরই সুরক্ষা নেই, সেখানে তাদের সুরক্ষা আশা করা তো বাতুলতা! কিন্তু অটো, বাস, মোটরসাইকেল, রিক্সা সব যেন নড়তে ভুলে গেছে! দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই! এক পাও এগোচ্ছে না। বসে থেকে থেকে এই নভেম্বরের সন্ধেতেও ঘামতে শুরু করেছে অনুপর্ণা! এবার একটা কিছু না বললেই নয়! বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলছে! অনুপর্ণা তার স্বাভাবিক কর্কশ গলায় বলে ওঠে, এই যে দাদা! হাতটা সোজা করে রাখুন তো!

চরম অবাক হয়ে পাশের জন বলে ওঠে, সোজাই তো আছে। কী হলো!

সোজা মানে সামনের রডটা ধরে বসুন। অনুপর্ণা লোকটার হাতটা আচমকা টেনে সামনের রডের ওপর ফেলে দেয়!

এটা কী হলো! এভাবে গায়ে হাত দিচ্ছ কেন! রাস্তা পেয়েছ না কি!

আর আপনি কি বাড়ি পেয়েছেন! অচেনা মানুষকে ‘তুমি’ বলছেন! ঠিক করে বসুন। নইলে মুশকিল আছে।

লোকটার চোখমুখ দেখে মনে হলো একটু থমকেছে। এতোটা বোধহয় ভাবতে পারেনি! আর কোনো কথা বলল না।

আরো পনেরো মিনিট পার করে তবে অনুপর্ণা অটো থেকে নামতে পারল। নামতে নামতে শুনল লোকটা বলছে, হুঁ ছক্কার আবার ইজ্জত!

অনুপর্ণা ঘুরে তাকাতে তাকাতে অটোটা এগিয়ে গেল। রাগটা হজম করতে করতে বিল্ডিং এ ঢুকতে না ঢুকতেই মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল ১৪র ঘড়াই মাসিমার সঙ্গে। অন্য সময় মুখোমুখি হলে অন্যদিকে তাকিয়ে না দেখার ভান করে। আর অনুপর্ণা উঠে এলেই সিঁড়িতে গঙ্গাজল ছেটায়। আজ কিন্তু দেখেই সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে বলতে আরম্ভ করল, তোমাদের তো বাস উঠল গো! আমার ছেলে বলছিল, তোমাদের আর এদেশে থাকতে দেবে না!

আমাদের এদেশ থেকে তাড়িয়ে দিলে আপনার খুব আনন্দ হবে মাসিমা!

মাসিমা খনখনে গলায় বলে উঠলেন, না আমার আনন্দের কি আছে! ভালো কথা বলতে গেলুম! বলতে বলতে মাসিমা দরজায় গঙ্গাজল ছেটাতে লাগলেন!

মুখের ভেতরটা তেতো হয়ে আছে অনুপর্ণারও। যবে থেকে এ রাজ্যে এস আই আর এর দামামা বেজেছে তবে থেকে ভয় করতে শুরু করেছে অনুপর্ণার। বাপ মা তো কবেই ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে! এবার কি তবে রাষ্ট্রও ঝেড়ে ফেলবে! নাগরিক পরিচয়টুকুও কেড়ে নেবে! চার তলায় উঠে দরজার তালা খুলতে খুলতে দৃশ্যটা আবার মনে পড়ে গেল অনুপর্ণার। সেই কবেকার কথা! তবু আজও মনে পড়লে ভেতরটা অস্থির হয়ে ওঠে। পুড়ছে, তার সব পুড়ছে! প্রিয় কবিতার খাতা, একমাত্র বন্ধু বইগুলো, পুরনো জীবনের যা কিছু অর্জন সব পুড়ছে! বাবা উন্মাদের মতো তার ঘরের সর্বস্ব এনে ঢালছে আগুনে! আর সর্বগ্রাসী আগুন সবটাই গিলে নিচ্ছে! মায়ের সেই আকুল কান্না… অনুপর্ণা জোরে জোরে মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল। ভাববেনা, সে কিছুতেই ভাববেনা এসব কথা! তার অতীত নেই! ভবিষ্যতও নেই! আছে শুধু বর্তমান! আজ আছে! বাকি কথা কালের গর্ভে দিয়ে রেখেছে সে!

কিন্তু এই এস আই আর নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে পাক খাচ্ছে। যদিও তার ট্রান্সজেন্ডার কার্ড আছে। তার চিন্তা কম। কিন্তু বাকিদের!

পরদিনই অনুপর্ণা ছুটল অঞ্জলিদির কাছে। একমাত্র অঞ্জলিদিই পারে এ বিষয়ে কি করণীয় জানাতে! গেট দিয়ে ঢোকার মুখে গোল হয়ে বসে আছে রজনী, গুড়িয়া, রাজু আরো কয়েকজন। সবাইকে চেনেনা অনুপর্ণা। তাকে দেখেই রজনী হাতে তালি মেরে বলে উঠল, এই যে গো! আমাদের মিষ্টি বোন এসে গেছে গো! এবার আমাদের মায়ের ভাবনা দূর হবে গো!

অনুপর্ণা দাঁড়িয়ে পড়ল। অঞ্জলিদির কী হয়েছে মাসি?

আর বলো না গো দিদি! ওই যে গো কে এক বাবু, কি বিও না কি…

বিএলও?

হ্যাঁ গো হ্যাঁ! বিএলও! বিএলও! সে এসেছিল! তারপর থেকেই মা ভুরু কুঁচকে বসে আছে। দেখো গো দেখো!

বিএলও এসেছিল!

হ্যাঁ গো হ্যাঁ! ওই যে কি যেন! জনগণনা হবে! রজনী হোঁচট খেতে খেতে কোনোক্রমে উচ্চারণ করে।তারপর সে গান ধরে…

জনগণনা হবে গো আবার

বিএলও ছোটে বাড়ি বাড়ি

ভয়ে থরহরি দেশবাসী

উৎসব এবার এস আই আর… গেয়ে সে জোরে জোরে ঢোল বাজাতে লাগল।

অনুপর্ণা গানটা শুনে আবারও দাঁড়িয়ে গেল। কে লিখেছে রজনী মাসি এই গানটা?

আমাদের মা গো! অঞ্জলি মা! গান গেয়ে সুর করে দিয়েছে গো!

অনুপর্ণার আর বুঝতে বাকি থাকল না অঞ্জলিদিও কতটা চিন্তায় আছে এস আই আর নিয়ে!

অঞ্জলি তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই বিরাট ডাইনিং হলটার একদিকে রাখা সোফাটায় বসে আছে। অনুপর্ণাকে দেখে তার পুরুষালি কণ্ঠে বলল, ভাবছিলাম তোর কথা! কী খবর বল!

অন্য খবর আর কি দেব অঞ্জলিদি! এখন তো একটাই খবর! এস আই আর!

হ্যাঁ রে! বড়ো চিন্তায় আছি। মিনিস্ট্রি অব সোশ্যাল জাস্টিস এ মেল লিখলাম পরপর দুটো। কোনো উত্তর নেই!

বিএলও এসেছিল শুনলাম!

হ্যাঁ রে! আমার ফর্মটা দিয়ে গেছে। কিন্তু কী ফিল- আপ করব তাই ভেবে পাচ্ছি না। আর বাকিদের তো কোনো হদিসই নেই! কোথায় খুঁজব বল দেখি!

অনুপর্ণা উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে।

অঞ্জলিদিই আবার বলতে লাগল, আমাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের মিলিয়ে দেখার ব্যাপারটা যে কতটা কঠিন তা তো বিএলও বুঝতেই চাইল না। আমার তো টিজি কার্ড রয়েছে। হোমের অনেকেরই রয়েছে! সেসব এই বিএলওরা জানেনা! এ বিষয়ে ওদের কোনো ট্রেনিংই হয়নি বলল। কী করি বলতো!

যে ১১টা নথি চেয়েছে তার মধ্যে টিজি কার্ড নেই?

না রে! সেটাই তো বলছি। ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্মেন্টের টিজি বোর্ডও তো এখনো অব্দি কিচ্ছু জানায়নি।

অনুপর্ণা একটু চিন্তা করে বলল, অঞ্জলিদি পার্টির ছেলেদের বলবে? ওরা যদি কিছু বলতে পারে?

পার্টির ছেলেরা ভোট ব্যাঙ্ক নিয়ে ভাবছে অনু! আর আমরা তো ওদের ভোট ব্যাঙ্ক নই! এগারোর গণনায় আমরা ছিলাম তিরিশ হাজার। যদিও ওটা সরকারি হিসেব! সংখ্যাটা তখনও অনেক বেশি ছিল! এবারে তো মনে হচ্ছে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে!

কী হবে অঞ্জলিদি! আমার খুব ভয় করছে! ভোটাধিকার না থাকা মানে তো…

সেটাই তো! কিন্তু দেখ, আমরা এতো ভেবে মরছি! আর ঠেকগুলোতে কারো কোনো হেলদোলই নেই! ওরা জানেই না এস আই আর খায় না মাথায় দেয়! বলে, পেটের ভাত জোগাড় করব না কি কাগজ!

ওরা বোধহয় এস আই আর এর গুরুত্বটাই বুঝতে পারছে না! আসামে তো এভাবেই শুরু হয়েছিল। তারপর তো…

এরা কি করে বুঝবে অনু! এতো কিছু বোঝার মতো লেখাপড়া করার সুযোগ ওরা পেয়েছে বল তো!

অনুপর্ণা চুপ করে যায়! তাহলে! আমাদের আর ভোটাধিকার থাকবে না! পরিবার, সমাজ সবাই তো নানাভাবে হিংস্রতা করে আমাদের সঙ্গে! সব সয়ে তবু অন্তত রাষ্ট্রের অধিকারটুকু ছিনিয়ে আনতে পেরেছিলাম আমরা! কিন্তু এবার! এবার কি সেই অধিকারটুকুও আর থাকবে না!

খুব চিন্তা হচ্ছে রে! আমাদের বেশিরভাগের বাবা মায়েরাই তো আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখে না, বল! কাগজ চাইতে গেলে দেবে না কি! আর সেখানে যাবই বা কেন! যারা মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয় তাদের কাছে আর কোন্ মুখে যাব!

অনুপর্ণা বুঝল অঞ্জলিদির কাছেও এই বিপদের আশু কোনো সমাধান নেই! তার দুশ্চিন্তা আরো বাড়ল। অঞ্জলিদির তবু তো একটা স্থায়ী ঠিকানা আছে! তার তো সেটাও নেই! ভোটার আই কার্ড, আধার কার্ড বাবা পুড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর আর নতুন করে অ্যাপ্লাই করা হয়নি! তখন যে অবস্থায় বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল তাতে ওসব আর মাথায় ছিল না। একেবারে রাস্তায় এসে পড়েছিল অনুপর্ণা! মাথার ওপর ঠাঁই নেই! অঞ্জলিদিকে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেছিল। সেদিন অঞ্জলিদি আশ্রয় না দিলে কি যে হতো! তারপর তো কত ভাড়া বাড়ি ঘুরে এই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে! কোনো বাড়িতেই ছ’মাসের বেশি টিকতে পারেনি অনুপর্ণা! কুমন্তব্য তো আছেই… জল বন্ধ করে দেওয়া থেকে গেটে অন্য তালা লাগিয়ে দিয়ে সারা রাত বাড়ির চৌকাঠে বসে থাকতেও বাধ্য করা হয়েছে অনুপর্ণাকে! একে নিজেকে নিয়ে অস্বস্তি তার ওপর এই সমবেত আক্রমণ! কোথায় যাবে অনুপর্ণার মতো মানুষরা! নিজেকে তার কিরকম সমাজ বিবিক্ত মনে হয়! কী করবে এবার অনুপর্ণা! পুরনো পাড়ায় গিয়ে খোঁজ খবর করা ছাড়া তো গতি নেই! পুরনো পাড়া! ভাবতেই কেউ যেন একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল অনুপর্ণাকে! সেদিন বাবা তাড়িয়ে দেওয়ার পরও অনুপর্ণা আরো একবার চেষ্টা করেছিল মার সঙ্গে দেখা করার। বাবার অফিসের সময়টায় বাড়িতে গিয়ে মার সঙ্গে একবার দেখা করতে চেয়েছিল অনুপর্ণা। একবার শুধু দেখবে মাকে… আর… আর কিছু নয়! কিন্তু নিজের বাড়ির তালা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার গোটা পৃথিবীটাকেই শূন্য মনে হয়েছিল। সেই শূন্যতা আজও একইরকম রয়ে গেছে! একে তো নিজের শরীরটাকে তার নিজের বলে মনেই হয় না! কাঙ্ক্ষিত শরীর পাওয়া তার পক্ষে কি কোনোদিন সম্ভব! টাকা কোথায়! যে চাকরি সে করে তাতে ওই খরচ সে এফোর্ট করতে পারবে না! অন্য খোপে নিজের মনটাকে কোনোক্রমে আঁটিয়ে উঠতে পারে না আর অনুপর্ণা! ক্লান্ত লাগে তার! সত্যিই যারা নিজেদের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারে তারা ভাবতেও পারবেনা কি যন্ত্রণা ভোগ করে অনুপর্ণার মতো মানুষেরা! এসব ভাবতে ভাবতে সারারাত ঘুম এলো না অনুপর্ণার!

পরদিন পুরনো পাড়ার গলির মুখে দাঁড়িয়েও অনুপর্ণা ভাবছিল যাওয়াটা ঠিক হবে কি না! পার্টি অফিসটায় যেতে হবে! যাব? দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অনুপর্ণা! পেছন থেকে শম্পা ডাকল, তুমি বিজিতদা…

অনুপর্ণা ঘুরে শম্পার মুখ দেখে বুঝতে পারল ও একটু থতমত খেয়েছে… কী বলে ডাকবে ভেবে পাচ্ছে না!

অনুপর্ণা সহজ করে নেওয়ার জন্য হেসে এগিয়ে গিয়ে বলল, কেমন আছিস?

শম্পা হালকা করে মাথা নাড়ল। তুমি এখানে?

হ্যাঁ রে, আসতে হলো! এস আই আরের খোঁজ খবর করতে এসেছি।

ও। তুমি তমালদাদের সঙ্গে দেখা করোনা! ওরা বলে দেবে! ওই তো পার্টি অফিসে আছে! চলো।

শম্পা এতো স্বাভাবিক ব্যবহার করবে অনুপর্ণা আশা করেনি। শম্পা, সেই শম্পা! যে তার বিজিতদাকে কিছুতেই ভাইফোঁটা দিতে রাজি হয়নি! তার যাবতীয় খেলা ছিল তার বিজিতদার সঙ্গে। আর অনুপর্ণার ওর সঙ্গে পুতুল খেলতে ভালো লাগত। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলার চেয়ে পুতুল বেশি টানত অনুপর্ণাকে! শুধু মেয়ে পুতুলটা শম্পা নিজের করে নিলে মনখারাপ করত অনুপর্ণার! সেই শম্পা! যাকে প্রথম অনুপর্ণা বলেছিল নিজের অস্বস্তির কথা! আর তার কথা শুনে শম্পা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে দূরে চলে গেছিল অনুপর্ণার কাছ থেকে! যাকে ছোটোবেলার প্রিয় বন্ধু ভাবত অনুপর্ণা সে এক নিমেষে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল অনুপর্ণার দিক থেকে।

শম্পার সঙ্গে পার্টি অফিসের দিকে এগোতে এগোতে অনুপর্ণা এসবই ভাবছিল। চমক ভাবল তমালদার কথায়। তমাল পার্টি অফিসে একদল ছেলের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। ওদের দেখে একটা ঠ্যাং আরেকটা ঠ্যাং এর ওপর চাপিয়ে পা নাড়তে নাড়তে শম্পার দিকে ফিরে বলল, কী ব্যাপার?

তমালদা, বিজিতদা…বলেই শম্পা আবার একবার অনুপর্ণার দিকে তাকালো! তারপর বলল, ও এসেছে এস আই আরের জন্য!

তমালদা রুক্ষ গলায় বলে উঠল, হ্যাঁ, এসেছে! তো!

না মানে… শম্পা তোতলাতে শুরু করেছে।

মানে ফানে কিছু নয়! তুই এখানে কি করছিস! যা বাড়ি যা!

শম্পা তারপরও কিছু বলতে গিয়ে হোঁচট খেল।

তমাল ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, বললাম তো বাড়ি যা! শুনতে পেলিনা!

শম্পা একবার অনুপর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল!

তমাল ধীরে সুস্থে একটা দেশলাই কাঠি নিয়ে বিশ্রী ভঙ্গি করে দাঁত খোঁচাতে শুরু করল!

অনুপর্ণা গলাটা একটু পরিস্কার করে নিয়ে বলল, আমি তো একসময় এই পাড়াতেই থাকতাম! এখানেই হয়তো আমার এস আই আরের ফর্মটা পাব! সেটার জন্য এসেছি আর কি!

ভোটার কার্ড আছে?

না, সেটা নষ্ট হয়ে গেছে।

জিডি আছে?

অনুপর্ণা বুঝতে পারল না তমাল কি বলছে! জিডির কথা শুনে অবাক হলো!

তমাল খানিকটা ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল, ভোটার কার্ড নষ্ট হলে থানায় জিডি করাতে হয়! আছে?

অনুপর্ণা তমালের বিরক্তিটা বুঝতে পারছে। সংক্ষেপে উত্তর দিল, না।

তাহলে ফর্ম পাওয়া যাবে না।

তাহলে কী করব?

কি আবার করবে! এসব যখন করেছিলে তখন মনে ছিল না! বলতে বলতে তমাল অনুপর্ণার গোটা শরীরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।

অনুপর্ণা শাড়ি পরে আছে। গলায়, কানে জাঙ্ক জুয়েলারি। চোখে কাজল। চুলটা চুড়ো করে বেঁধেছে মাথার ওপর। তার অপুষ্ট বুকের ওপর আঁচলটা আঁটে না কখনোই। সরে সরে যায়। তমাল তার শরীরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আড়চোখে বুকের দিকে দেখছে।

অনুপর্ণা সব বুঝতে পারছে। কথা ও নজর যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে না এগোতে দেওয়াই ভালো। সে শুধু বলল, ফর্মটা না পেলে কী করণীয়?

কিচ্ছু করার নেই! নাম কাটা যাবে ভোটার লিস্ট থেকে! সোজা বাংলাদেশ! বলে তমাল অন্যদের দিকে তাকিয়ে ফিচেলের মতো হাসল!

অনুপর্ণা আর দাঁড়াল না। বেরিয়ে আসতে আসতে শুনল, বাঁড়া, হিজড়ের আবার এস আই আর!

অনুপর্ণা এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো ঘুরে দাঁড়ায়! বলে যে, আপনি তো পুরুষ সিংহ!  আপনাকে যদি বলা হতো সারাজীবন একটা মেয়ে হয়ে থাকতে হবে আপনার কেমন লাগতো! মেয়েদের মতো পোশাক পরতে হবে! মেয়েদের মতো কথা বলতে হবে! বাচ্চা বিয়োতে হবে! পারতেন! পারতেন না তো! আমিও পারিনি! একটা মেয়ের মন নিয়ে একটা পুরুষ মানুষের শরীরটাকে নিজের বলে ভাবতে পারিনি! বুঝেছেন!

কিন্তু অনুপর্ণা জানে এসব বললে আরো খানিকটা ঐলিক জুটবে! যারা হিজড়ে আর রূপান্তরকামীদের মধ্যে পার্থক্য জানে না তাদের মতো অশিক্ষিতের কাছ থেকে আর কি প্রত্যাশা করা যায়! অনুপর্ণা বেরিয়ে এলো পাড়া থেকে! অবশ্য চলে আসতে পা সরছিল না তার! এতোক্ষণে বাড়িতে নিশ্চয়ই খবর পৌঁছে গেছে! মা কি একবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসবে তার কাছে! অনুপর্ণা যেন এগোতেই পারছে না! প্রতিমুহূর্তে তার মনে হচ্ছে এই বুঝি মা বিজু বলে পেছন থেকে ডেকে উঠল! অনুপর্ণা একটু করে এগোচ্ছে আর পিছন ফিরে দেখছে! কিন্তু না, কেউ এলো না! অনুপর্ণা একসময় বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়াল!

আশেপাশের পুরনো দোকানগুলোতে কিছুটা খোঁজ খবর করে কাছেই একটা হেল্প সেন্টারের সন্ধান পেল। এস আই আর সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য খোলা হয়েছে। সেখানে পৌঁছে দেখল, অনেক মানুষের ভিড়। সকলেই কিছু না কিছু সমস্যা নিয়ে এসেছে! অনুপর্ণা সুযোগ মতো তার কথা বলল। জানাল, ভোটার কার্ড নষ্ট হয়ে গেছে। ২০০২ এ তার নাম ছিল বিজিত মণ্ডল। বাবা, মার নামও জানাল। সহায়তা কেন্দ্রের ভদ্রলোক বাবার নাম দিয়ে সার্চ করে সব ইনফরমেশন বের করলেন। তারপর অনুপর্ণার দিকে তাকিয়ে বললেন আপনার তো কিছুই মিলবে না! নাম, সেক্স, ছবি…

হ্যাঁ, মানে সেক্ষেত্রে কী করণীয়!

অন্য কোনো পরিচয়পত্র আছে?

ট্রান্সজেন্ডার কার্ড আছে।

ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে বললেন, কি আছে!

অনুপর্ণা চোয়াল শক্ত করে বলল, টিজি কার্ড।

ওসব কার্ড ফার্ডে কিছু হবে না। হিয়ারিং হবে। হিয়ারিং এ আসতে হবে।

মানে?

মানে আপনার ফর্মে কোনো তথ্য ২০০২ এর সঙ্গে না মিললে হিয়ারিং এ যেতে হবে!

আচ্ছা, তারপর!

তারপরে যদি প্রমাণ দেখাতে পারেন তাহলে ভোট দেবেন, নইলে নেই! বলে ভদ্রলোক মুখ বেঁকিয়ে হাসলেন!

অনুপর্ণা ধন্যবাদ বলে বেরিয়ে এলো। সহায়তা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে দুপুরের চড়া রোদে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে অনুপর্ণা হাঁটতে শুরু করল।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes