
গুচ্ছ কবিতা – দেবর্ষি সরকার
১. রাষ্ট্রের আগে যে শরীর
জন্মের আগে কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি
আমি কোন দিকে হেঁটে যাব।
একটি শরীর মাত্র ছিলাম- রক্ত, হাড়, নিঃশ্বাস,
আর মায়ের ভিতরে অন্ধকারে
ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি অনুবাদ-অযোগ্য বাক্য।
জন্মের পর আমার শরীরের উপর
প্রথম যে আইনটি লেখা হল,
তার নাম-
পুরুষ।
তারপর একে একে আমার হাঁটার ভঙ্গি, কণ্ঠের স্বর,
চোখ নামানোর সময়, হাত রাখার পদ্ধতি,
এমনকি কান্নারও
একটি অনুমোদিত ব্যাকরণ বানিয়ে দেওয়া হল।
আমি যখন একটু অন্যরকম হলাম,
তারা বলল- ভুল।
আমি যখন নিজের মতো হলাম,
তারা বলল- অসুস্থ।
আমি যখন প্রতিবাদ করলাম,
তারা বলল- অশোভন।
কেউ বলেনি-
সম্ভবত পৃথিবীটাই একটি অসমাপ্ত অভিধান,
আর মানুষ তার সবচেয়ে ভুল বানানটি নিয়েই বেঁচে থাকে।
আজ আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আমার শরীরটিকে বলি-
তোমার কোনও অপরাধ নেই।
তুমি শুধু রাষ্ট্রের চেয়ে পুরোনো।
২. প্রেমের কোনও নাগরিকত্ব নেই
তুমি বলেছিলে, প্রেম মানে পাশাপাশি থাকা।
আমি বলিনি- প্রেম কখনও কখনও
দুইটি অসম্ভব দেশের মধ্যে নির্মিত
একটি অদৃশ্য সেতু।
তুমি তোমার দিকে, আমি আমার দিকে-
মাঝখানে কত আইন,
কত পরিবার, কত সামাজিক উচ্চারণ,
কত অনুচ্চারিত ভয়।
তবু রাতে
যখন সমস্ত পৃথিবী নিজের দরজা বন্ধ করে,
আমার ভিতরে তোমার জন্য
একটি জানলা খোলা থাকে।
সেখানে কোনও পতাকা নেই। কোনও ধর্ম নেই।
কোনও শংসাপত্র নেই।
শুধু তুমি আছ, আমি আছি,
আর আমাদের মাঝখানে একটি দীর্ঘ নীরবতা-
যার ভিতর দিয়ে দুজন মানুষ
পরস্পরের দিকে ধীরে ধীরে হাঁটে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে- তোমার ঠিকানা কী?
আমি বলব-
যেখানে তোমাকে মনে পড়ে, সেখানেই আমার
সবচেয়ে বৈধ নাগরিকত্ব।
৩. আয়নার বিরুদ্ধে একটি সাক্ষ্য
আয়না কখনও মিথ্যে বলে না- এই কথাটি
সবচেয়ে বড় মিথ্যে।
আয়না শুধু দেখায় যে মুখটি সমাজ দেখতে অভ্যস্ত।
সে দেখায় না রাত তিনটেয়
বালিশের ভিতর মুখ লুকিয়ে কতবার একজন মানুষ
নিজেকে ক্ষমা করেছে।
সে দেখায় না একটি হাসির পিছনে
কত পুরোনো অপমান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।
সে জানে না কোনও ছেলের
নিজের কোমলতাকে কত বছর ধরে লুকিয়ে রাখতে হয়
যাতে তাকে পুরুষ বলে মনে হয়।
তাই আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি না।
আমি দেখি আমার ভিতরে যে শিশুটি এখনও
অকারণে গান গায়,
যে মানুষটি এখনও স্পর্শকে ভয় পায়,
যে প্রেমিকটি এখনও বিশ্বাস করতে চায়,
আর যে মানুষটি সব হারিয়েও
নিজের নামটি ভুলে যায়নি।
আয়না, তোমাকে দরকার নেই
আজ আমি নিজেকেই সাক্ষী রাখলাম।
৪. শহর জানে না কারা রাতে কাঁদে
দিনের শহর খুব ভদ্র।
দোকান খোলে, বাস আসে,
মানুষ অফিস যায়,
চা ফুটে,
সংবাদপত্রে দেশের ভবিষ্যৎ ছাপা হয়।
কিন্তু রাত নামলেই শহরের অন্য একটি মুখ
ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে।
একটি জানলায় একজন ছেলে
কারও পুরোনো ছবি দেখে।
অন্য একটি ঘরে একজন মেয়ে
নিজের নামটি মুছে ফেলে আবার লেখে।
কোনও ছাদের উপর কেউ ফোনের আলোয়
শেষবারের মতো একটি মেসেজ পড়ে।
তারপর
কোনও শব্দ না করে ফোনটি উল্টে রাখে।
শহর এসব জানে না।
শহর শুধু জানে আজ বৃষ্টি হয়েছে,
আজ যানজট হয়েছে,
আজ বাজারে আলুর দাম বেড়েছে।
শহর জানে না একটি মানুষ
আজ সারাদিন
নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর অভিনয় করেছে।
তাই রাতের শহরকে আমি ভালোবাসি।
কারণ অন্ধকার কাউকে স্বাভাবিক হতে বলে না।
৫. যে ঈশ্বরকে আমি প্রশ্ন করি
ঈশ্বর,
তোমাকে আমি অস্বীকার করি না।
শুধু তোমার কাছে কিছু প্রশ্ন আছে।
যে শিশুটি জন্মেই বঞ্চিত হয়,
তার অপরাধ কী?
যে মানুষটি ভালোবাসতে চেয়েছিল,
কেন তাকে
নিজের ভালোবাসার জন্য ক্ষমা চাইতে হয়?
যে শরীরটি নিজের মতো করে বাঁচতে চায়,
কেন সমাজ তার চারপাশে এতগুলো দেয়াল তোলে?
তুমি যদি সত্যিই সর্বত্র থাকো,
তবে কি
একজন নির্বাসিত মানুষের ঘরেও তুমি থাকো?
তুমি কি থাকো তার বিছানার পাশে যখন সে একা?
তার কাঁধে যখন কেউ হাত রাখে না?
তার ভাঙা আত্মসম্মানের শেষ প্রান্তে?
আমি জানি না।
তবু প্রতিরাতে ঘুমোনোর আগে
তোমাকে একটি কথা বলি-
মানুষকে সৃষ্টি করার পরে তার উপর
মানুষের তৈরি নিয়মগুলো আরোপ কোরো না।
তাহলে সৃষ্টি আর স্বাধীন থাকে না।
৬. স্মৃতিরও মৃত্যু হয়
একদিন তুমি আমাকে ভুলে যাবে।
প্রথমে
আমার কণ্ঠস্বর।
তারপর
আমার হাতের স্পর্শ।
তারপর
কোন বিকেলে আমি তোমার পাশে বসেছিলাম
আর কী বলেছিলাম সেটাও।
মানুষ আসলে
একদিনে কাউকে হারায় না।
হারায় একটু একটু করে-
একটি গন্ধে,
একটি রাস্তায়,
একটি গানে,
একটি পুরোনো জামায়,
একটি অসমাপ্ত বাক্যে।
তারপর একদিন
হঠাৎ বুঝতে পারে-
যে মানুষটিকে সে এতদিন
নিজের ভিতরে বহন করছিল,
তারও মৃত্যু হয়ে গেছে।
শুধু শরীরের নয়, স্মৃতিরও।
তখন আমি কী করব?
সম্ভবত তোমাকে আর ফিরিয়ে আনব না।
শুধু আমার ভিতরে
একটি ছোট ঘর রেখে দেব-
যেখানে কোনও আলো থাকবে না,
কোনও কান্নাও না।
শুধু জানালার পাশে
একটি চেয়ার থাকবে।
তুমি কখনও ফিরলে
বসে পড়বে।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করব না।
৭. বৃষ্টির ভিতর যে বাড়িটি ছিল
বৃষ্টি নামলে পুরোনো বাড়িগুলো
হঠাৎ কথা বলতে শুরু করে।
দেয়ালে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে
কোনও এক বিস্মৃত দুপুরের খবর দেয়।
জানালার কাঠ মনে রাখে
কারা একদিন এখানে দাঁড়িয়ে বিদায় নিয়েছিল।
বারান্দা জানে কোন পায়ের শব্দ
কত বছর আগে শেষবার এসেছিল।
মানুষ ভাবে বাড়ি জড় বস্তু।
আমি জানি বাড়িও স্মৃতি রাখে।
তাই বৃষ্টির রাতে আমি কোনও ছাদে দাঁড়ালে
মনে হয়-
আমার ভিতরেও একটি বাড়ি আছে।
সেখানে আমার শৈশব থাকে,
আমার সমস্ত ভয় থাকে,
আমার হারিয়ে যাওয়া মানুষ থাকে,
আর থাকে একটি ছোট ঘর-
যেখানে আমি কাউকে ঢুকতে দিই না।
কিন্তু বৃষ্টি হলেই দরজাটি নিজে থেকেই খুলে যায়।
আর তখন পুরোনো সব মানুষ
জলের মতো ঘরে ঢুকে পড়ে।
৮. শেষ পর্যন্ত মানুষ
শেষ পর্যন্ত আমরা কেউই
আমাদের পরিচয় নই।
না পুরুষ, না নারী, না প্রেমিক
না পুত্র, না কবি, না নির্বাসিত।
শেষ পর্যন্ত আমরা একটি মানুষ-
যে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে
কাউকে মনে করে,
যে একদিন ভুল করেছে
যে ক্ষমা চেয়েছে, যে ক্ষমা করতে পারেনি
যে কিছু মানুষকে অতিরিক্ত ভালোবেসেছে
যে নিজের শরীরের ভিতর
একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী লুকিয়ে রেখেছে।
মৃত্যুর পরে আমাদের নাম হয়তো থাকবে না।
কেউ হয়তো মনে রাখবে না আমরা কী লিখেছিলাম,
কী চেয়েছিলাম,
কাকে ভালোবেসেছিলাম।
তবু কোথাও
একটি মানুষের স্মৃতিতে আমাদের জন্য
এক ফোঁটা আলো থেকে যেতে পারে।
সেই আলোই যথেষ্ট।
কারণ পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার আগে
মানুষকে একবার একজন মানুষের কাছে
মানুষ হয়ে উঠতে হয়।
আর হয়তো-
সমস্ত দর্শন, সমস্ত ধর্ম
সমস্ত রাজনীতি, সমস্ত কবিতা
শেষ পর্যন্ত এই একটি বাক্যের কাছেই এসে থামে-
আমি তোমাকে দেখেছি। তুমি একা নও।

