
গুচ্ছ কবিতা – দীপ্র দাসচৌধুরী
১. বহন
আমাকে করেছ বহন
নির্জন নগরের অতল ছায়ায়
ডাকেনি সহজে কেউ
তবুও বুকের কাছে পরিচিত নাম
হৃদপিণ্ডের মাঝে বিদ্যুৎ রাখে…
স্বভাবসিদ্ধ দোষে হাড়হিম দাবি
ভাসায় চন্দ্রলোক জ্যোৎস্নার জলে
বহন করেছ যেই
সেই থেকে হয়ে গেছি আদিম প্রবাদ
নতুন কাপড়ে মোড়া পুরাতন দেহ
ঘুরে মরে অবিরাম গলির বাঁকে
নির্জন নগরের অতল ছায়ায়।
২. পরিযায়ী
পরিযায়ী হয়ে বেঁচে আছি খুব
এক হাত মাটি ওঠে কবর ছাড়িয়ে
দেহের মধ্য দিয়ে জন্মের হাওয়া মিশে যায় আকাশের মরণ আলোয়।
চুপিসারে মুছে ফেলি অলস যাপন
কোথায় পদক্ষেপ? কোন ঘরে ধ্রুবতারা জ্বলে?
এ’ সব প্রশ্ন আজ অবান্তরের মতো লাগে।
তবু কিছু অসহায় বিরহ বিকেল
ভালবাসা ভেবে নিয়ে মোহতে ভাসায়
নিজের প্রতীকী দেহ,
আর কিছু বেহিসাবি চাহিদার কাছে
নতজানু মন মাতে পর্দা প্রথায়।
৩. জোনাকি
আদুরে খেয়াল ছিল রাখা
পথের দু’ধারে জাল বোনা,
আমার সময় থাকে ঢাকা
বৃথা হয়ে যায় দিনগোনা…
কেন যে অসঙ্কোচে থাকি
ভালবাসা বিরহ খেয়াল,
ক্যানভাস জুড়ে কাকে আঁকি?
সমাজ যে গড়েছে দেওয়াল।
জীবন পালায় ডানা মেলে
আমিও তোমার নাম ডাকি,
ঘুমঘোরে মৃত্যুকে ঠেলে
ফুলকিতে জ্বালাই জোনাকি।
৪. যন্ত্রণা
এই নিবিড় পথঘাট জুড়ে
যন্ত্রণা খেলা করে চোখের পাতায় রাখা জলে
শিশিরের বিন্দুরা বোঝে না তো অসম বিভেদ
কোন দেশে কারা পোড়ে? কার বাড়ি ভেঙে যায় রাতে?
সে’সব ঘটনা শুধু গল্পের মতো চোখে ভাসে
শেষ ট্রেন চলে যায় দূর পাহাড়ের দেশে স্টেশনের আদ্রতা মেখে।
তাকিয়ে কেবল দেখি-
ভালবাসা ডুবে মরে বিরাগের জলে
সে’ জল সামলে রাখি
যন্ত্রণা মেলে ধরি চোখের পাতায়,
পুকুরের মতো শোকে নিজেকে বিকিয়ে।
৫. আগুনমিতা
যেখানে কবিতা মেপে নেয় পথচলা
সেখানে আবেগ তুলে রাখি সিন্দুকে,
আমার প্রণয় শেখায় না কথা বলা
শোনাই যাপন। বোঝেনা যে নিন্দুকে।
ধ্বজা উড়ে যায় শান্তির দিশা কই?
আমিও দহনে পুড়ে মরি অবিরাম,
সময় দলিল রাখে আজ মুখ বই
অন্তরে খালি হয় রোজ কত গ্রাম।
নদী মেপে চলি, ভেসে যাই ঢেউ এলে
তুমিও নীরব, বালিচাপা হয় ক্ষত
পোড়াও আমায় অগ্নি দু’বাহু মেলে-
ছাই করে দাও আগুনমিতার মতো…
৬. শ্রাবণ সকাল
এ কাল বিলম্ব নয়
শরীর জড়িয়ে ধরে দেখা দেয় শোক
ঘিরে ধরে অতীতের দায়ভার গুলো।
মাথার ওপর ছাদ,
ভেঙে পড়ে কোটি কোটি টুকরোর রূপে
জীবন নিঃস্ব হয়
পড়ে থাকে জলে ভেজা শ্রাবণ সকাল
মানুষ থাকে না আর,
থেকে যায় জলে ভেজা শ্রাবণ সকাল।
৭. সন্ধ্যা
যেখানে তরুছায়া বুকের ভেতর
গড়ে তোলে অন্ধের বিষাদ তোরণ।
সেখানে নিরুদ্দেশ পথিক চলে
বোঝে না মরুর ভাষা
অস্তাচলে দিয়ে চলে নির্ভীক দান
অলস হৃদয়ে ভাসে সুনীল গগনে…
তবুও ব্যর্থ প্রাণ আমায় খোঁজো?
হারাবে আবার সেই সন্ধ্যা ঘনালে।
৮. রক্তপাত
অজস্র রক্তপাত হয় বুকের ভেতরে
কেউ ফিরে তাকায় না আর…
ফুরালে প্রয়োজন নিয়মমাফিক রাস্তা বদলে যায়
বসে থাকি রেলিং ধরে-
এই বুঝি বৃষ্টি নামলো কুয়োর তলায়।
ভেজা পায়ের ছাপে মেশা শিউলি ফুল
বিকেলের তীব্র বেদনাকে ধারণ করে
অজস্র রক্তপাত অগ্রাহ্য করেও হেঁটে চলে পথিক নিঃশব্দে।
যদি ফিরে পাই সে’ জীবন,
তাহলে বলাকার মতো উড়ে যাব সব স্বার্থ ভুলে!
৯. বৃষ্টি
রাতে বৃষ্টি পড়লে বাইরে বেরোই না আর
তবুও শরীর কেন ভিজে যায় জলে?
চুপচাপ ভিজে গায়ে বসে থাকি আমি
লেখার চেষ্টা করি ব্যর্থ কবিতা।
শীতল স্রোতকে ধরে ভেঙে দিয়ে আজ
কামাগ্নি ছড়ায় বুকে মৃদু উত্তাপ,
আমি পুড়তে পুড়তে পাই মৃত্যুর স্নেহ…
রাতে বৃষ্টি হলে বাইরে বেরোই না আর,
সিক্ত শরীরে শুধু লজ্জাকে মাখি
ঢেকে রাখা রিপু বোঝে অকাল দহন-
ছাই হতে হতে লিখি ব্যর্থ কবিতা।
১০. অভিলাষ
পেরিয়ে যায় অমূল্য যৌবন
নোংরা শরীর থেকে খসে পড়ে মাংসের স্তূপ
শেষের যাত্রা আজ মাইকের সুরে
ভেসে আসে মহাকাল সিন্ধুর ঘাটে।
মিশতে এসেছি আমি-
অনন্ত সন্ধ্যায় ডানা মেলে
ভিক্ষা চেয়েছি সেই স্বচ্ছ মুখশ্রীর কাছে
পাইনি কিছুই তাও বুঝেছি অকালে
অভিলাষ মিশে থাকে অতল সাগরে।

