
গুচ্ছ কবিতা – হিমাংশু রায়
১. মাথা
হাতের উপর মাথাটা রেখে শুয়েছিলাম কিছুক্ষণ
আকাশ দেখছিলাম
আকাশের স্বপ্ন আর মাথার চাপে হাতটা ভারী হয়ে গেল ক্ষণিকে।
হাতটা অলস হয়ে গেল, নড়তেই চায় না আর।
তারপর মাথাটা পায়ের কাছে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম
অনেকক্ষণ চেষ্টার পর বুঝলাম
সবার মাথা পায়ে নামে না, অনেক কষ্ট করে মাথা পায়ে আনতে হয়, মাটিতে আনতে হয়।
পুকুরের জলে মাথাটা রেখে দেখলাম সহজেই ডুবে যায় মাথাটা
ভেসে থাকতে জানে না, ভেসে থাকতে প্রবল অনীহা তার
এখন ওজন না করেও বুঝতে পারি
মানুষের মাথাটা প্রচন্ডরকম ভারী এবং ভারী হতেই থাকে আমৃত্যু।
২. সুতো
যখন হাওয়া দেয়
হাওয়ায় সুতো ওড়ে কিছু
লাল নীল হলুদ সবুজ সাদা
হাওয়ায় জোর আসতেই সুতোগুলো জট পাকায়
হাওয়া থেমে গেলে জটিল হয় জটগুলো
জোর করে ছাড়িয়ে নিলে ছিঁড়ে যায় মাঝখানে।
লাল সুতোর দুই আঙ্গুল ছিঁড়ে বাসা বাঁধে সবুজের মাথায়।
সবুজের দুই আঙ্গুলও নিঁখোজ হয় কারো কাছে।
মানুষের মনও সুতোর মত, হাওয়ায় ভাসে,জট পাকায়
তারপর কার সুতো কোথায় যায়, কোথায় আটকে থাকে
জানো কি? খবর আছে?
৩. জানালা
একটা জানালা দেখেছি
লোহার রড দিয়ে ঘেরা
তার পিছনে দুটো কালোচোখ
একটা ভাবলেষহীন সুন্দর মুখ
চুলগুলোকে বাতাস নাড়িয়ে দিচ্ছে আনন্দে
ভাবলেষহীন চোখে কি খোঁজে মেয়েটা
জানালা?
৪. খিদে
যাদের ভাত আছে, তারা ভাত খায়
কাঁঠাল চিংড়ি দিয়ে,ইলিশের ভাপা বানিয়ে
কষা মাংসের ঝোল দিয়ে
কখনো ভাত খাওয়ার ইচ্ছে না হলে বিরিয়ানি,
ফ্রাইড রাইস নতুবা পোলাও ও চলে আসে পাতে।
কিন্তু যাদের ভাত নেই
তারা কি খায়?
শুকনো মুড়ি,গাছের লঙ্কা
ফলের গাছ থাকলে দু চারটে ফল
চা পাতার ফুল,জঙ্গলের শাক
ধার করে আনা আলু
আর যদি তাও না থাকে, কি খায়?
কয়জন খবর রাখে?
৫. অর্ধশিক্ষিত গাছটা
গাছটার সিলেবাসের পড়া শেষ হয় একদিন
গাছটা অর্ধশিক্ষিত এখন
মাটিগুলি হারিয়ে যায় ধূলো হয়ে
কিছু মাটি বালি হয়ে চকচক করে শুধু
শুধু কয়েক চাপাটি মাটি লেগে থাকে তার গায়
আর বাকি সব ভেসে যায় বন্যায়
নগ্ন শেকড়েরা বেরিয়ে আসে পথ চেয়ে
গাছটা কি এই শিক্ষাই চেয়েছিল?
৬. মাকড়সা
মাকড়সা জাল বিছিয়ে রাখে চারিদিকে।
খুব ভালো শিকারী সে, অন্যদের আটকে রাখে
কিন্তু মাকড়সা কি সারাজীবনেও বুঝতে পারে,
নিজের জালে সে নিজেও আটকে থেকে যায়?
৭. শুন্য
শুন্য বললে চোখের সামনে ভেসে আসে একটা গোল চিহ্ন
চারিদিক মসৃণ আর সমান
অথচ শুন্যতা বললেই বুকের মধ্যে চেপে বসে
একটা বক্ররেখার ফাটল
যাকে মসৃণ বলা যায় না কখনোই।
৮. আঙুল
ছোটোবেলায় মা বলতো
হাতের আঙুলের ফাঁক যার যত কম, তার টাকা আটকে রাখার ক্ষমতা তত বেশি।
তাই মাঝেমধ্যেই হাতের আঙুলগুলোর ভিতর দিয়ে সূর্য দেখতাম।
ফাঁক কম ছিল,
টাকাও জমিয়ে রাখতে পারতাম।বিশ্বাস ছিল।
এখন হাতের আঙুলের মাঝে বড় বড় ফাঁকগুলো দেখি।
সন্দেহ হয়, এসে মানিব্যাগের টাকা গুণি। ঠিকঠাকই থাকে সব।
তারপর হঠাৎ মনে হয় মানুষগুলোকেই হারিয়ে ফেলছি বোধহয়
পালিয়ে যাচ্ছে আঙুলের ফাঁক দিয়ে।
৯. বটগাছ
বটগাছের ফুল খুবই কম, ফল ও দেরি করে আসে।
ছত্রছায়া আর বিশ্বাসের ঝুরিতেই জীবন শেষ হয়ে যায়
কিছু কিছু মানুষ বটগাছ।
১০. বিগ্রহ
যখন চারপাশটা কুমেরু, সুমেরুর অধ্যায়ে চলে গেছে
শীতল সব গ্রাম
তখন একটা কুটিরে দেখি কয়েকটা মানুষ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে
উষ্ণ বাতি নিয়ে
যখন চারপাশটা কালাহারির মত কালো, ভয়ংকর
দিন রাতের তীব্র তফাৎ, আবহাওয়ায় ভরসা নামে কিছু বেঁচে নেই
তখনও দেখি একটা কুটির আমার নাম ধরে ডাকছে।
মনোরম পরিবেশ তখনও।
আবহাওয়ায় পরিবর্তন লেগেই থাকে, মানুষে গ্রহণ লাগতেই থাকে।
তবু কুটিরটা মনোরমই থাকে কেন কে জানে!
যে মানুষগুলো আমাকে আমার মত করে গ্রহণ করেছে, আমি তাদের বিগ্রহ বলে মানি।

