মার্ক্সের মৃত্যু  <br /> অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

মার্ক্সের মৃত্যু
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

চারকোল ড্রইং: লেখক

 

 

 

মার্ক্স প্রথমবার মারা গিয়েছিলেন ১৮৮৩ সালের মার্চ মাসে। লন্ডনের ধূসর আকাশের নীচে, হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে, যেখানে মৃতেরা নিজেদের নীরবতা দিয়ে ইতিহাসকে শিক্ষা দেন। কিন্তু সেই মৃত্যু ছিল কেবল জৈবিক। তাঁর চিন্তার মৃত্যু হয়নি। চিন্তার মৃত্যু কখনও সরল নয়—এটি ধীরে ধীরে ঘটে, যেমন একটি ভাষা মারা যায়, একটি বিশ্বাস ফিকে হয়ে যায়, অথবা একটি স্বপ্ন বাজারে বিক্রি হয়ে যায়।

কিন্তু আমি যে মৃত্যুর কথা বলছি, তা দ্বিতীয় মৃত্যু।

এটি ঘটেছিল আমাদের সময়েই।

ঘটনার শুরু হয়েছিল এক বর্ষার রাতে। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট তখন প্রায় বন্ধ। বইয়ের দোকানগুলো তাদের ধুলোকে ভাঁজ করে রেখেছে, যেন পুরোনো চিন্তারাও ঘুমোতে গেছে। আমি তখন একটি পুরোনো সংস্করণের Das Kapital খুঁজছিলাম। বইটি নয়—বরং বইটির প্রেতাত্মা।

দোকানদার, যাঁর বয়স নির্ণয় করা অসম্ভব—তিনি যেন বিদ্যাসাগরের সময় থেকে বসে আছেন—হঠাৎ আমাকে বললেন, ‘আপনি কি জানেন, মার্ক্স আবার মারা গেছেন?’

আমি হেসে ফেলেছিলাম। ‘মার্ক্স তো আগেই মারা গেছেন।’

দোকানদার মাথা নাড়লেন। ‘না। এবার সত্যিই মারা গেছেন।’ তাঁর চোখে এমন এক নিশ্চয়তা ছিল, যা যুক্তির বাইরে।

সেই রাতেই প্রথম লক্ষ করলাম—বইগুলো বদলে যাচ্ছে। আমি The Communist Manifesto খুললাম। সেখানে লেখা—‘Workers of the world, you have nothing to lose but your chains.’ কিন্তু শব্দগুলো ধীরে ধীরে বদলে গেল—‘Workers of the world, you have nothing to lose but your passwords.’ আমি ভয়ে বইটি বন্ধ করে দিলাম। এ কি কোনও কৌতুক? না কি কোনও সতর্কবার্তা?

পরদিন সকালে স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটি লাইব্রেরিতে দাঁড়িয়ে আছি। লাইব্রেরিটি অসীম। সেখানে বোরহেস হাঁটছেন, তাঁর অন্ধ চোখ দিয়ে সবকিছু দেখছেন। তিনি বললেন—‘মার্ক্স মারা গেছেন, কারণ ইতিহাস তার পাঠক হারিয়েছে।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু ইতিহাস তো শেষ হয়নি।’

বোরহেস হেসে বললেন, ‘ইতিহাস কখনও শেষ হয় না। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাস শেষ হয়ে যেতে পারে।’

 

সেই দিন থেকেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। আমি লক্ষ্য করলাম, মার্ক্সের মূর্তি যেসব জায়গায় ছিল, সেগুলোর মুখ বদলে যাচ্ছে। একদিন দেখি, তাঁর দাড়ি ছোট হয়ে গেছে। আরেকদিন দেখি, তাঁর চোখে ক্লান্তি। যেন তিনি নিজেই নিজের উপর বিশ্বাস হারাচ্ছেন। আমি তখন ফুকোর কথা মনে করলাম। তিনি লিখেছিলেন, মানুষ একটি সাম্প্রতিক উদ্ভাবন, এবং একদিন এটি মুছে যাবে, সমুদ্রের ধারে বালিতে আঁকা একটি মুখের মতো। মার্ক্স কি সেই বালির মুখ?

এক রাতে, আমি স্বপ্নে নয়—বাস্তবে—মার্ক্সকে দেখলাম। তিনি কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে বসে আছেন। তাঁর হাতে একটি স্মার্টফোন। তিনি স্ক্রল করছেন। তাঁর চোখে বিস্ময়।

আমি কাছে গিয়ে বললাম, ‘আপনি এখানে?’

তিনি মাথা তুললেন। ‘আমি ফিরে এসেছি,’ তিনি বললেন। ‘কিন্তু আমি আর কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘কেন?’

তিনি ফোনটি দেখালেন। ‘মানুষ এখন নিজেকে বিক্রি করছে, কিন্তু তারা জানেই না যে তারা বিক্রি হচ্ছে।’

আমি বললাম, ‘আপনি তো এটি আগেই বলেছিলেন—commodity fetishism।’

তিনি মাথা নাড়লেন।

‘না। এটা অন্য কিছু। তখন মানুষ পণ্যকে পুজো করত। এখন মানুষ নিজেই পণ্য।’

আমরা হাঁটতে থাকলাম। কলেজ স্ট্রিটের আলো নিভে গেছে। শহর যেন একটি মৃত গ্রহ।

মার্ক্স বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, ইতিহাস একটি সরলরেখা। কিন্তু এটি একটি বৃত্ত। অথবা, আরও খারাপ—এটি একটি গোলকধাঁধা।’

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি হতাশ?’

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

বললেন, ‘হ্যামলেট একবার বলেছিল, ‘Time is out of joint.’ সময় তার সংযোগ হারিয়েছে। আমি এখন বুঝতে পারছি, সে ঠিক ছিল।’

 

আমরা একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে ঢুকলাম। সেখানে একজন মানুষ বসে আছেন। আমি তাঁকে চিনতে পারলাম—লেনিন। তিনি একটি বই পড়ছেন। বইটির নাম—Capitalism and Schizophrenia। লেনিন আমাদের দিকে তাকালেন।

‘তুমি ফিরে এসেছ,’ তিনি বললেন।

মার্ক্স মাথা নাড়লেন।

লেনিন বললেন, ‘তুমি কি দেখেছ, ওরা তোমাকে কী বানিয়েছে?’

মার্ক্স বললেন, ‘হ্যাঁ। ওরা আমাকে একটা টি-শার্ট বানিয়েছে।”

লেনিন হেসে ফেললেন। ‘এটাই দ্বিতীয় মৃত্যু।’

 

আমি তখন বুঝতে পারলাম, মৃত্যু মানে শরীরের শেষ নয়। মৃত্যু মানে অর্থের শেষ। একজন চিন্তাবিদ তখনই সত্যিকার অর্থে মারা যান, যখন তাঁর চিন্তা আর বিপজ্জনক থাকে না। মার্ক্স এখন নিরাপদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে আছেন। তিনি টি-শার্টে আছেন। তিনি কফি মগে আছেন।

কিন্তু তিনি আর বিপ্লব নন।

মার্ক্স আমাকে বললেন, ‘তুমি কি জানো, সবচেয়ে ভয়ংকর কী?’

আমি মাথা নাড়লাম।

তিনি বললেন, ‘ওরা আমাকে ভুল বোঝেনি। ঠিকই বুঝেছে। এবং তারপর ওরা আমাকে গ্রহণ করেছে।’

আমি বললাম, ‘গ্রহণ করা কি খারাপ?’

তিনি বললেন, ‘গ্রহণ করা মানে নিরস্ত করা।’

হঠাৎ দেখি, তাঁর শরীর স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ‘আপনি কি আবার মারা যাচ্ছেন?’

তিনি হাসলেন। ‘হ্যাঁ। এবার সত্যি।’

‘কেন?’

‘কারণ আমি আর প্রয়োজনীয় নই।’ তিনি বললেন।

আমি চিৎকার করে বললাম, ‘না! আপনি এখনও প্রয়োজনীয়!’

তিনি মাথা নাড়লেন। ‘না। মানুষ এখন আর মুক্তি চায় না। তারা কেবল আরাম চায়।’

তাঁর শরীর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। শেষে শুধু তাঁর দাড়ি রয়ে গেল। তারপর সেটিও বাতাসে মিলিয়ে গেল।

 

পরদিন সকালে আমি কলেজ স্ট্রিটে ফিরে এলাম। সবকিছু স্বাভাবিক। বইয়ের দোকান খোলা। মানুষ বই কিনছে। জীবন চলছে। আমি একটি বই খুললাম—Das Kapital। শব্দগুলো আবার স্বাভাবিক। কিন্তু আমি জানি, কিছু বদলে গেছে।

সেই দিন থেকে আমি ভাবছি—মার্ক্স কি সত্যিই মারা গেছেন? না কি তিনি আবার ফিরে আসবেন? সম্ভবত, চিন্তাবিদরা কখনও পুরোপুরি মারা যান না। তাঁরা কেবল অপেক্ষা করেন—একটি নতুন সংকটের জন্য, একটি নতুন পাঠকের জন্য, একটি নতুন বিশ্বাসের জন্য। হয়তো, মার্ক্স এখন কোথাও বসে আছেন। কোনও লাইব্রেরিতে। কোনও স্বপ্নে। কোনও ভবিষ্যতে। অপেক্ষা করছেন। তাঁর তৃতীয় জন্মের জন্য।

 

মার্ক্সের মৃত্যু: একটি ভূতাত্ত্বিক প্রতিবেদন

(The Death of Marx: A Geological Report)

 

. মৃত্যুর শব্দতত্ত্ব

মৃত্যু একটি ঘটনা নয়। মৃত্যু একটি ব্যাকরণগত বিপর্যয়। যখন একটি নাম তার ক্রিয়াপদ হারায়, তখন সে মারা যায়। যখন একটি ধারণা তার বিপজ্জনকতা হারায়, তখন সে দ্বিতীয়বার মারা যায়। মার্ক্সের সঙ্গে এটাই ঘটেছে।

প্রথম মৃত্যু:

১৮৮৩, লন্ডন, একটি চেয়ারে বসা শরীর, থেমে যাওয়া স্নায়ু, অসমাপ্ত বাক্য।

দ্বিতীয় মৃত্যু:

তারিখ অনির্ণেয়।

স্থান: সর্বত্র।

 

. কলেজ স্ট্রিট: একটি ভূতের বাজার

কলেজ স্ট্রিটে বই বিক্রি হয় না। এখানে মৃতদের পরিত্যক্ত চিন্তা বিক্রি হয়। একদিন, একটি বইয়ের পৃষ্ঠা খুলতেই দেখলাম, অক্ষরগুলো স্থির নেই। তারা সরে যাচ্ছে। যেমন পিঁপড়ে মৃত পোকাকে টেনে নিয়ে যায়। ‘পুঁজির উৎপত্তি শ্রম থেকে’—এই বাক্যটি ধীরে ধীরে বদলে গেল—

‘পুঁজির উৎপত্তি দৃষ্টির থেকে।’ আমি বইটি বন্ধ করলাম। বইটি ভেতর থেকে শ্বাস নিচ্ছিল। দোকানদার বললেন, ‘আপনি দেরি করে ফেলেছেন।’

‘কিসের জন্য?’

‘তাঁর মৃত্যুর জন্য।’

‘কার?’

দোকানদার উত্তর দিলেন না।

তিনি কেবল একটি আয়না এগিয়ে দিলেন। আয়নাতে আমার মুখ নয়—একটি দাড়িওয়ালা ছায়া।

 

. প্রেতাত্মার অর্থনীতি

পুঁজিবাদ বস্তু উৎপাদন করে না। সে প্রেত উৎপাদন করে। এই প্রেতেরা বস্তুতে বাস করে। একটি স্মার্টফোন = একটি প্রেতের আবাস। একটি ব্র্যান্ড = একটি প্রেতের নাম। একটি প্রোফাইল = একটি প্রেতের ছদ্মবেশ। মার্ক্স এই প্রেতদের চিনতেন না। তিনি পণ্যের fetishism দেখেছিলেন, কিন্তু algorithmic possession দেখেননি। এখন মানুষ পণ্য কেনে না। পণ্য মানুষকে কেনে। আপনি যখন স্ক্রল করেন, তখন আপনি শ্রম দিচ্ছেন। আপনি যখন থামেন, তখন আপনি মৃত। এই নতুন অর্থনীতিতে, শ্রমিকের শরীর প্রয়োজন নেই। তার মনোযোগই যথেষ্ট। মনোযোগ = নতুন শ্রমশক্তি।

 

. একটি স্বপ্নে, মার্ক্স

গতরাতে, মার্ক্স আমার ঘরে এসেছিলেন। তিনি দরজা দিয়ে ঢোকেননি। তিনি একটি নোটিফিকেশন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। Karl Marx sent you a message. আমি খুললাম।

তিনি লিখেছেন,

‘আমি ভুল করেছিলাম।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম—

‘কোথায়?’

তিনি লিখলেন—

‘আমি ভেবেছিলাম, মানুষ শৃঙ্খল ভাঙতে চাইবে। কিন্তু মানুষ এখন তাদের শৃঙ্খলকে customise করে।’

 

. ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের দেবদূত

ইতিহাসের দেবদূত পিছনের দিকে তাকিয়ে উড়ে যায়। সে ধ্বংসস্তূপ দেখে। সে থামতে চায়। কিন্তু ঝড় তাকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। এই ঝড়ের নাম—প্রগতি। এখন সেই ঝড় একটি সার্ভার। সার্ভারের ভেতরে বাতাস নেই। শুধু ফ্যানের শব্দ—একটি অন্তহীন, যান্ত্রিক শ্বাসপ্রশ্বাস। যেন ইতিহাস নিজেই লাইফ-সাপোর্টে বেঁচে আছে। ডেটা = নতুন ধ্বংসস্তূপ। ডেটা = পুড়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের ঠান্ডা ছাই, যেখানে বই আর জ্বলে না, শুধু unread থাকে। প্রতিটি ক্লিক একটি ধ্বংসাবশেষ। কারণ ক্লিক মানে নির্বাচন, এবং নির্বাচন মানে—অসংখ্য সম্ভাবনার মৃত্যু। প্রতিটি লাইক একটি ক্ষুদ্র মৃত্যু। একটি অনুভূতির, একটি জটিলতার, একটি অমীমাংসিত দ্বিধার মৃত্যু। কারণ লাইক সবকিছুকে flatten করে দেয়—যেন পাহাড়কে মাটির সমতলে নামিয়ে আনা হয়েছে। দেবদূত এখন ক্লাউডে আটকে গেছে। তার ডানা compressed file হয়ে গেছে। সে unzip হতে চায়। কিন্তু প্রতিটি extraction একটি error message: Access denied. ইতিহাস এখন read-only। দেবদূত তার নিজের cache memory ঘাঁটে। সেখানে জমে আছে—একটি শিশুর প্রথম কান্না, একটি বিপ্লবের প্রথম গুলি, একটি প্রেমপত্রের শেষ শব্দ: ‘থাকো।’ কিন্তু cache auto-clear হয়ে যায়। কারণ system optimize করতে হবে। কারণ speed is everything. কারণ latency = sin. দেবদূত এখন latency। সে পৌঁছতে পারে না। সে সবসময় দেরি করে ফেলে। একটি concentration camp খোলার আগে সে পৌঁছতে পারেনি। একটি বই নিষিদ্ধ হওয়ার আগে সে পৌঁছতে পারেনি। একটি মানুষ নিজের ভিতরে ভেঙে পড়ার আগে সে পৌঁছতে পারেনি। সে শুধু logs পড়ে। logs never bleed. সার্ভারের ভিতরে রাত হয় না। কারণ রাত মানে অনিশ্চয়তা। কারণ রাত মানে স্বপ্ন। এখানে শুধু uptime। ৯৯.৯৯% uptime। বাকি ০.০১% — সেইখানে দেবদূত কাঁদে। কিন্তু তার কান্না একটি corrupted audio file। play করা যায় না। ইতিহাস এখন একটি infinite scroll। শেষ নেই। শুরু নেই। শুধু refresh। refresh। refresh। প্রতিবার refresh মানে— ভুলে যাওয়ার একটি নতুন সুযোগ। দেবদূত এখনও পিছনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে এখনও ধ্বংসস্তূপ দেখছে। কিন্তু এখন ধ্বংসস্তূপ pixelated। ধ্বংসস্তূপ buffered। ধ্বংসস্তূপ monetized। এবং ঝড় এখনও বইছে। এখন সেই ঝড়ের নাম— algorithm।

 

. ভাষার পতন

মার্ক্স একটি ভাষায় লিখেছিলেন, যে ভাষা বিশ্বাস করত। এখন ভাষা বিশ্বাস করে না। এখন ভাষা perform করে। বিপ্লব শব্দটি এখন একটি aesthetic। Che Guevara এখন একটি filter। Lenin এখন একটি meme। Revolution এখন একটি hashtag।

#Revolution
#Resistance
#Aesthetic

কোনওটিই বিপজ্জনক নয়। কারণ বিপদ algorithmically suppressed।

 

. কাফকার আদালত

আদালতটি কোনও স্থানে ছিল না। অথবা, বলা ভালো, এটি এমন এক স্থানে ছিল যা নিজেকে স্থানের মতো ভান করছিল। দেওয়ালগুলি ছিল কাগজের—কিন্তু সেই কাগজে কোনও ভাষা লেখা ছিল না, শুধু চুক্তির সম্ভাবনা। বাতাসে ভাসছিল শর্তাবলি। Accept না করলে শ্বাস নেওয়া যাবে না।

আমি লক্ষ্য করলাম, বিচারকের হাত নেই। তার জায়গায় ছিল অসংখ্য ফাইল। ফাইলগুলি নিজেরাই খুলছে, নিজেরাই বন্ধ হচ্ছে। প্রতিটি ফাইলের ভেতর থেকে বেরোচ্ছে একটি করে অসমাপ্ত বাক্য—‘মানুষ তার শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন—’

ফাইলটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। বাক্যটি সম্পূর্ণ হতে দেওয়া হল না।

বিচারক বললেন,
‘অভিযুক্ত, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ—আপনি obsolete.’

মার্ক্স মাথা তুললেন না। তাঁর মুখে ছিল এমন এক নীরবতা, যা শব্দের পূর্বপুরুষ।

আদালতের পেছনে বসে ছিল কিছু অদ্ভুত দর্শক। তারা মানুষ নয়, কিন্তু মানুষের অভ্যাস বহন করছে। একজনের শরীর সম্পূর্ণ তৈরি পণ্যের দামে। আরেকজনের চোখে জ্বলছে notification light। একজনের গলায় ঝুলছে QR code—যাকে স্ক্যান না করলে তার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না।

হঠাৎ একজন সাক্ষীকে ডাকা হল।

নাম: History.

সে হেঁটে এল না। সে নিজেকে replay করল।

তার শরীরের উপর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে, কারখানা উঠছে, কারখানা ভাঙছে, পতাকা উঠছে, পতাকা নামছে। সে নিজেই নিজের contradiction।

বিচারক জিজ্ঞেস করলেন,
‘আপনি কি অভিযুক্তকে চেনেন?’

History কিছুক্ষণ buffering করল। তারপর বলল,
‘সে আমাকে লিখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন আমাকে লেখা হয় না। আমাকে curated করা হয়।’

আদালতের ভেতর একটি হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সেটি ছিল algorithm-এর হাসি—যা কোনও মুখ থেকে বেরোয় না, শুধু আচরণ থেকে অনুমান করা যায়।

দ্বিতীয় সাক্ষীকে ডাকা হল।

নাম: Commodity.

সে কথা বলল না। সে নিজেকে প্রদর্শন করল। তার ত্বকে ছিল discount। তার আত্মা ছিল unavailable।

বিচারক বললেন,
‘এই অভিযুক্ত কি আপনাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন?’

Commodity উত্তর দিল,
‘হ্যাঁ। সে আমাকে উন্মুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন আমি encrypted.’

আদালতের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। প্রতিটি শ্বাস ছিল একটি microtransaction।

আমি লক্ষ্য করলাম, আদালতের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একজন কেরানি। তার মুখ নেই। তার জায়গায় একটি আয়না। যে-ই তার দিকে তাকাচ্ছে, সে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে—কিন্তু সামান্য পরিবর্তিত, সামান্য বেশি compliant।

কেরানি একটি কাগজ পড়তে শুরু করল:

‘সত্য এখন একটি subscription service. Basic plan: illusion. Premium plan: despair. Truth itself is behind an additional paywall.’

বিচারক এবার সরাসরি মার্ক্সের দিকে তাকালেন। অথবা, তাকানোর ভান করলেন।

‘আপনি কি নিজেকে প্রাসঙ্গিক বলে দাবি করেন?’

মার্ক্স এবার ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

তাঁর চোখে কোনও উত্তর ছিল না। শুধু একটি প্রশ্ন, যা এখনও formulate হয়নি।

তিনি বললেন না, কিন্তু আমি শুনলাম—

কারণ এই আদালতে শব্দ উচ্চারণ করা হয় না, শব্দ এখানে leaked হয়।

আমি শুনলাম, তিনি বলছেন:

‘প্রাসঙ্গিকতা কার currency?’

হঠাৎ আদালতের আলো নিভে গেল। অথবা, আলো তার subscription renew করতে ব্যর্থ হল।

অন্ধকারে শুধু একটি শব্দ শোনা গেল—
processing…

তারপর একটি ঘোষণা:

‘Trial paused due to insufficient engagement.’

সবাই স্থির হয়ে গেল। বিচারক freeze হয়ে গেলেন। History rewind হতে পারল না। Commodity নিজেকে display করতে পারল না।

শুধু মার্ক্স বসে রইলেন। যেন তিনি জানতেন, এই pause-ই আসল verdict।

কারণ যেখানে বিচার স্থগিত থাকে, সেখানেই সত্য সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে জীবিত থাকে।

আমি বেরিয়ে আসতে চাইলাম। কিন্তু দরজা আমাকে চিনল না।

দরজা বলল, ‘Please log in to continue.’

আমি বুঝলাম, এই আদালত থেকে বেরোনোর জন্যেও একটি account প্রয়োজন।

আর আমার কাছে শুধু একটি শরীর ছিল।
যার password আমি ভুলে গেছি।

 

. শরীরের বিলুপ্তি

মার্ক্সের শরীর ধীরে ধীরে ডেটায় রূপান্তরিত হচ্ছে। তাঁর দাড়ি = pixels

তাঁর চোখ = code
তাঁর কণ্ঠ = archived audio

তিনি আর flesh নন।
তিনি metadata।

Metadata মারা যায় না।
সে endlessly reproducible।

এটাই তাঁর অভিশাপ।

তিনি এখন সর্বত্র।
এবং তাই, কোথাও নেই।

 

. একটি ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি

আমি স্বীকার করছি—আমি মার্ক্সকে হত্যা করেছি। আমি যখন তাঁকে পড়েছি aesthetic pleasure হিসেবে—আমি যখন তাঁকে quote করেছি intellectual ornament হিসেবে—আমি যখন তাঁকে অনুভব করিনি threat হিসেবে—তখন আমি তাঁকে হত্যা করেছি। আমরা সবাই করেছি। আমরা তাঁকে neutralise করেছি understanding দিয়ে। বোঝা = একটি হত্যার কৌশল।

 

 

১০. শেষ সাক্ষাৎ

আজ সকালে, কলেজ স্ট্রিটে, আমি তাঁকে আবার দেখলাম। তিনি একটি পুরোনো বইয়ের ভিতর বসে আছেন। তিনি ক্লান্ত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি সত্যিই মারা যাচ্ছেন?’

তিনি বললেন, ‘না।’

আমি স্বস্তি পেলাম।

তিনি বললেন, ‘আমি ইতিমধ্যে মারা গেছি।’

‘তাহলে আপনি কে?’

তিনি উত্তর দিলেন—‘আমি আমার নিজের প্রেত।’

 

১১. প্রেতের তত্ত্ব

একটি প্রেত কী? একটি প্রেত হল—না উপস্থিত, না অনুপস্থিত। না জীবিত, না মৃত। না সত্য, না মিথ্যে। প্রেত হল suspension। মার্ক্স এখন একটি suspension। তিনি আমাদের ভিতরে suspended। আমাদের guilt হিসেবে। আমাদের nostalgia হিসেবে। আমাদের অসমাপ্ত বিপ্লব হিসেবে।

 

১২. সমাপ্তি নয়

আজ, আমি একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার মুখ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। একটি দাড়ি গজাচ্ছে। একটি ক্লান্তি জন্ম নিচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি—মার্ক্স মারা যাননি। তিনি distribute হয়েছেন। তিনি এখন একটি virus। একটি linguistic virus। একটি ontological virus। তিনি সংক্রমিত করেন—যখন আপনি প্রশ্ন করেন। যখন আপনি অস্বীকার করেন। যখন আপনি অস্বস্তি অনুভব করেন।

 

১৩. একটি অসমাপ্ত বাক্য

মার্ক্সের মৃত্যু ঘটেছে। মার্ক্সের মৃত্যু ঘটছে। মার্ক্সের মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু—মৃত্যু এখানে একটি ঘটনা নয়, একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাকরণ। একটি অসমাপ্ত বাক্য, যার ক্রিয়াপদ বারবার স্থগিত হয়ে যায়। যতদিন একজন শ্রমিক তার নিজের শ্রমকে চিনতে পারবে না, যতদিন তার হাত তার নিজের থেকে আলাদা হয়ে যাবে, যেন হাতটি কেবল একটি যন্ত্র—আর যন্ত্রটি কেবল একটি সংখ্যা—
আর সংখ্যাটি কেবল একটি রিপোর্টের ভিতরে বন্দি—ততদিন—মার্ক্সের মৃত্যু কেবল একটি গুজব।

যতদিন একটি মানুষ আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে চিনবে না, শুধু দেখবে একটি ভূমিকা—একটি পেশা—একটি বেতন—একটি পরিচয়পত্র—কিন্তু দেখবে না তার নিজের অনুপস্থিতি—ততদিন—মার্ক্স একটি ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াবেন কারখানার ভেতরে, ডেটা-সার্ভারের অন্ধকারে, একটি ক্লান্ত চোখের নীচের কালো বৃত্তের ভিতরে। তিনি কথা বলবেন না। কারণ ভাষা এখন পণ্য। শব্দ এখন বিনিময়মূল্যের অধীন। একটি শব্দ যখন উচ্চারিত হয়—তার আগেই তার দাম নির্ধারিত হয়ে গেছে। তবু—কখনও কখনও একটি শব্দ ভুল করে ফেলে। সে তার নিজের অর্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সে তার অভিধান থেকে পালিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে—মার্ক্স শ্বাস নেন। কারণ মার্ক্স কোনও ব্যক্তি নন। তিনি একটি অস্বস্তি। একটি ত্রুটি। একটি সিস্টেম-ক্র্যাশ। তিনি জন্মান না, তিনি প্রকাশিত হন—যখন একজন শ্রমিক প্রথমবার ভাবে: ‘আমি যা তৈরি করি, তা আমার নয় কেন?’ তিনি ফিরে আসেন— যখন একটি মানুষ প্রথমবার অনুভব করে তার জীবন তার নিজের নয়। তিনি অপেক্ষা করেন না ভবিষ্যতের জন্য। তিনি অপেক্ষা করেন স্বীকৃতির জন্য। একটি নতুন ভাষার ভিতরে— যেখানে ‘আমি’ শব্দটি আবার বিপজ্জনক হবে, যেখানে ‘আমরা’ শব্দটি আবার নিষিদ্ধ হবে, যেখানে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আবার তার নিজের শরীর ফিরে পাবে। ততদিন—মার্ক্স মারা যাবেন না। তিনি লুকিয়ে থাকবেন—একটি অসমাপ্ত বাক্যের মধ্যে, একটি প্রত্যাখ্যাত স্বপ্নের মধ্যে, একটি মানুষের নীরব ক্রোধের মধ্যে। এবং একদিন—হঠাৎ—কেউ একটি শব্দ উচ্চারণ করবে, যা আগে কখনও উচ্চারিত হয়নি। সেই শব্দের ভিতর থেকে— মার্ক্স আবার জন্ম নেবেন না—কারণ তিনি কখনও মারা যাননি। তিনি কেবল ভাষা পরিবর্তন করছিলেন।

 

 

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (1)
  • comment-avatar
    Anindita Mandal 18 hours

    গল্প বলব? নাকি একটি পরম সত‍্যকে আবরণ দেওয়া হয়েছে? লেখাটি মগজে রয়ে যাবে। 🙏

  • demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes