
মার্চে, মার্কস-সন্ধানে
পার্থজিৎ চন্দ
টমাস পিকেটির চমৎকার একটি গ্রন্থ আছে, বেশ বিখ্যাত। একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি নিয়ে চুলচেরা সব বিতর্ক ও পর্যবেক্ষণ। সেখানে পৃথিবীব্যাপী বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লিখছেন, ‘Concretely, the wealthiest 0.1 percent of people on the planet, some 4.5 million out of an adult population of 4.5 billion, apparently posses fortunes on the order of 10 million euros on average, or nearly 200 times average global wealth of 60,000 euros per adult, amounting in aggregate to nearly 20 percent of total global wealth, The wealthiest 1 percent- 45 million people out of 4.5 billion- have about 3 million euros apiece on average(broadly speaking, this group consists of those individuals whose personal fortunes exceed 1 million euros). This is about 50 times the size of the average global fortune, or 50 percent of total global wealth in aggregate’
পিকেটি যে খুব ‘আশ্চর্যজনক’ কোনও তথ্য আমাদের কাছে তুলে ধরেছেন তাও নয়। এই অসাম্যের কথা আমাদের সকলেরই কম-বেশি জানা। কিন্তু আমাদের বারবার স্তম্ভিত করে দেয় একটি ‘শতাংশ’।
এ-গ্রহের মাত্র দশমিক এক শতাংশের হাতে গচ্ছিত রয়েছে দশ মিলিয়ন ইউরো করে অর্থ! আপাত শান্তিকল্যাণ ও নিস্তরঙ্গ জনজীবনের ভার্চুয়াল বাস্তবতার কোলে দুলে চলেছে আমাদের গ্রহ। প্রায় প্রতিদিন নতুন- নতুন তত্ত্ব আছড়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্যের ভিত পোক্ত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। আর কোন সে এক ইনফার্নোর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ছে মানুষ। কালেকটিভের ছায়া অপসৃত হয়ে গাঢ় হচ্ছে ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমের কবন্ধ শরীর। প্রশ্ন জাগে, এই দৈত্যের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ বা প্রতিরোধের ন্যূনতম পরিসর ‘আবিষ্কার’ না-করতে পারার কারণেই কি অনেকটা অজান্তে ব্যক্তি-মানুষ গণের কাছে আশ্রয় না-নিয়ে ক্রমাগত ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমের ককুনে লাশকাটা ঘরের শান্তি ও কল্যাণ খুঁজে চলেছে?
ঠিক এ-প্রসঙ্গে না-হলেও এর সঙ্গে সংযুক্ত একটি বিষয়ে পিকেটি চমৎকার আরেকটি পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি তুলে ধরেছেন ২০০৭-২০০৮ সালে সারা পৃথিবী জুড়ে ঘনিয়ে ওঠা অর্থনৈতিক সংকটকের চিত্র। যদিও এটি উনিশ’শো তিরিশের মহা-মন্দার থেকে চরিত্রে কিছুটা আলাদা তবুও ইতিহাস তো মুচকি হাসেই। সে মুচকি হাসির পথ ধরেই একবিংশ শতাব্দীর সব থেকে বড় রিসেশন ঘনিয়ে ওঠে দুহাজার আটে।
ইতিহাস আরও জোরে হেসে ওঠে যখন উনিশ’শো তিরিশের অর্থনৈতিক মন্দা ও ‘টোটাল-কোলাপ্স’-এর কারণগুলির অনুপস্থিতিই দুহাজার আটের অর্থনৈতিক মন্দাকে কিছুটা ‘নমনীয়’ করে রিসেশনে পর্যবসিত করে।
এখানেই পিকেটি দুটি অব্যর্থ শব্দ ব্যবহার করেন- ‘সুপ্রান্যাশানল-লেভেল’।
এই দুটি শব্দের অভিঘাতে আমাদের কাছে ঝুরঝুর করে খসে পড়তে থাকে ‘রাষ্ট্র’ ও তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে চলা নানা ধারণা। কর্পোরেট, বহুজাতিক পুঁজি, ক্রমশ অদৃশ্য থেকে অধিকতর ‘অদৃশ্য’ হয়ে ওঠা ক্ষমতাতন্ত্র ও তার আকর্ষগুলি।
১৮৪৮ সালে কার্ল মার্ক্স ও এঙ্গেলস যে ম্যানিফেস্ট নিয়ে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়লেন ইতিহাস ও সময়ের কারণেই তাকে খোলা চোখে দেখা ও বিচার করা উচিত। এই প্রশ্ন বা সংশয়ের কাছে এসেও খড়্গহস্ত হবার কোনও কারণ নেই যে, ‘মার্ক্স-এর মৃত্যু’ ঘটেছে? না কি এটি একটি ভ্রম, যা সুকৌশলে নির্মিত!
এমনকি মার্ক্সের বাণী ‘বিজ্ঞান’-ইত্যাদি বলে ধরে নিলে এটিও স্বীকার করে নেওয়া দরকার তাঁর দর্শন কোনও ঐশী-কথনের পথ ধরে আমাদের কাছে আসেনি। ফলে, মার্ক্স আজও জীবিত, না ‘মৃত’ তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
২
আমাদের পৃথিবীতে পোস্ট কলোনিয়াল রিটার্ন অফ রেলিজয়ন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে কি মার্ক্স ‘মৃত’ হয়ে গেলেন? উনিশ-শতকের মাঝামাঝি পর্ব থেকে মার্ক্সের হাত ধরেই রাষ্ট্র-কাঠমো থেকে ‘ধর্ম’কে (রেলিজয়ন-অর্থে) ধীরে হলেও বিযুক্তকরণের ধারা শুরু হয়েছিল। অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাংস্কৃতির পরিসর কী প্রবলভাবে কৌমকে প্রভাবিত করতে পারে এবং করে তার একটি নির্দিষ্ট ‘চিত্র’ মার্ক্স উপহার দিয়েছিলেন পৃথিবীকে। মানবতাবাদের জরায়ু যে শুধুমাত্র বর্তুলাকার ‘ভাববাদ’-দ্বারা নির্মিত নয় তার ‘নগ্ন-প্রকাশ’ মার্ক্সের হাত ধরেই।
এখানে একটি সতর্কীকরণ প্রয়োজন। অনেকেই মার্ক্সের মতবাদের সঙ্গে আদিম-সাম্যবাদী সমাজ বা কোনও-কোনও ‘মানবতাবাদী’ দার্শনিক ও ধর্ম-প্রচারকের দর্শনকে পাশাপাশি বসিয়ে মার্ক্সের মতবাদের ইউনিকনেসকে খর্ব করে দেখেন। সেখানে খুব সূক্ষ্মভাবে অনুচ্চারিত থেকে যায় তাঁর হাত ধরে শ্রম, সম্পদের ‘উৎপত্তি’ ও বন্টন থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের ‘মুক্তি’র বিষয়টি। এখন, মার্ক্সের এই তত্ত্ব ও মানবতাবাদী দর্শনকে সে সবের সঙ্গে একাত্ম করে ‘ধরে’ নিতে হলে যিশুর আবির্ভাবের আগে ক্রিশ্চানিটির ‘বাস্তবতা’ও মেনে নেওয়া দরকার। যদিও এটি পৃথক এক সন্দর্ভের বিষয় হতে পারে। কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের বারবার তাড়া করবেই তা হল, মার্ক্স এবং তাঁর শ্রেণীহীন সমাজের ধারণার কি ‘মৃত্যু’ ঘটেছে?
ব্যক্তিমানুষ যত ‘একাকী’ হয়ে পড়ছে, যত তার সত্তার সংকট তীব্র হচ্ছে, এই গ্লোবালাইজড দুনিয়ায় যত ‘অ্যলিয়েনেটেড’ হয়ে পড়ছে মানুষ ততই কি ‘মৃত’ হয়ে উঠছেন মার্ক্স? আমাদের কি এটি মেনে নেওয়ার সময় হয়েছে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ থেকে শুরু করে শ্রেণীহীন সমাজ, শ্রমীকশ্রেণীর চূড়ান্ত বিজয়, পুঁজির বণ্টন ইত্যাদি বিষয়গুলি আজ আর দর্শনের কেন্দ্রে অবস্থান করার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে? গণের মুক্তির থেকেও ব্যক্তির মুক্তিই সভ্যতার এই স্তরে বেশি প্রাসঙ্গিক?
এখানে এসে আমার কাছে মার্ক্সের বেঁচে থাকা ও ‘মৃত্যু’ সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যে গণ-বিচ্ছিন্নতা বা কৌম/সমাজ বিচ্ছিন্নতার ধারা আজ ছায়া ফেলে রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে তার ‘উৎপত্তি’ ও ঘাতক রূপটিকেও তো চিহ্নিত করেছিলেন মার্ক্সই। তাঁর সূত্রেই পৃথিবী পেয়েছিল সেই স্তম্ভিত করে দেওয়া অক্ষর, ‘Alienated labour therefore turns the generic being of man, both Nature and the intellectual being, his human nature. A direct consequence of the fact that man is alienated from the product of his labour, from his life activity from his generic being is the alienation of man from man.’
ঠিক এইখানে তাঁর দ্বারা উল্লেখিত চার ধরনের ‘বিযুক্তি’র কাছেও একবার আসা জারুরি। মার্ক্স শ্রম থেকে বিযুক্তি, শ্রমের দ্বারা উৎপন্ন বস্তুর থেকে বিচ্যুতির পাশাপাশি একজন মানুষের ‘আত্ম’র থেকে বিযুক্তি ও বৃহত্তর অর্থে সমাজ ও গণের অপরাপর অংশের (অপর মানুষ) থেকে বিচ্যুতিকেও নির্ধারণ করেছিলেন।
মার্ক্সে যে দর্শন তা ধারণ করতে পেরেছিল ক্রমশ ফুলেফেঁপে ওঠা পুঁজির সংকটকেও। শুধুমাত্র শ্রম ও শ্রমিকের সংকটের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর তত্ত্ব, একদিন যে পুঁজির দানব অখিল ক্ষুধায় নিজেকে নিজেই খেতে শুরু করবে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে তাঁর তত্ত্বে।
কিন্তু এত এত ধনাত্মক বিষয় থাকার পরেও কেন আজ সংশয় দানা বেঁধে উঠছে আমাদের মনে? যে দর্শন ও তত্ত্ব গত প্রায় পৌনে দু-শতক ধরে সারা পৃথিবীর কোণে কোণে আলোড়ন তুলল, যাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলা হল গ্যালিলিও, নিউটন, ডারউইন ও আইনস্টাইনের মতই (বা তার থেকেও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন) প্রভাববিস্তারকারী, যাঁর মত ও পথ একই সঙ্গে হাজার হাজার বছর ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচারণকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল তিনিই আজ ‘মৃত’ কি না সে সংশয় আমাদের গ্রাস করছে?
আর কে না জানে এই সংশয় গ্রাস করার অর্থ, তাঁর জীবিত সত্তার থেকে প্রকাশ্য-মৃত সত্তা বেশি ছায়া ফেলেছে নিশ্চিতভাবে।
তা হলে কি তাঁর তত্ত্ব ও দর্শনের ভেতর বাসা বেঁধে থাকা কবজকুণ্ডলের মধ্যেই রয়েছে মারণাস্ত্র? সমাজকে শুধুমাত্র শোষণ ও শোষিতের মধ্যে বিভক্ত করে ফেলার অতি-সরলীকৃত ব্যাখ্যাই কি শেষ পর্যন্ত তাঁর কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছে?
মার্ক্স যদি আমাদের কাছে ‘মৃত’ হয়ে উঠতে শুরু করেন তার পেছনে সব থেকে বড় কারণ ও ব্যাখ্যা এটিই। মার্ক্সবাদ যেহেতু একটি আদ্যপান্ত রাজনৈতিক্ বিষয় তাই তার প্রয়োগই শেষপর্যন্ত তাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। প্রাসঙ্গিক করে তোলে। মার্ক্সবাদের তথাকথিত অ্যকাডেমিক-চর্চা যত বাড়বে এবং প্রয়োগ যত কমবে মার্ক্স তত বেশি ‘মৃত’ হয়ে উঠবেন আমাদের কাছে।
বারবার যে ভ্রম ও ত্রুটির ভেতর দিয়ে আমরা হেঁটে গেছি তা হল ওই শোষণ ও শোষিতের বাইনারিকেই একমাত্র সত্য মনে করা ও মার্ক্সবাদের সমনাম করে তোলা। এর বাইরেও মার্ক্স-দর্শন ও তত্ত্বের আরও বেশ কয়েকটি অতি-আকর্ষক মাত্রা রয়েছে তাকে সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে দিনের পর দিন। শ্রেণী-চরিত্রের পাশাপাশি ব্যক্তির যে ব্যক্তিগত সংকট থাকতে পারে এবং তা যে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ব্যক্তির কাছে তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
মাঝে মাঝে মনে হয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন পৃথিবীতে মার্ক্সের আগমন সময়ের আগেই ঘটেছে। ঘটেছে এবং তিনি এতটাই ইউনিক হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর কাছে যে উল্কার মতো তাঁর প্রভা ও প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমাদের স্মরণে ছিল না হাজার হাজার বছরে ধরে প্রবাহিত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও ‘বিশ্বাস’-এর স্বাভাবিক প্রতিরোধ আছে। প্রাথমিক বিরুদ্ধতার পর সেগুলি নিজস্ব বর্ম তুলে ধরবেই। ক্রমশ তৈরি হবে তীব্র বিরুদ্ধতা। এক-দেড়শো বছরের দর্শনের প্রাণশক্তির আসল পরীক্ষা হয়তো তখনই।
এই পরীক্ষা সব থেকে কঠিন স্তর অতিক্রম করছেন মার্ক্স, এখন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের মনে হয়েছিল উগ্র-দক্ষিণপন্থা হয়তো আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু মাত্র তিরিশ বছরের ব্যবধানে সে বাস্তবতা বদলে যেতে শুরু করে। উগ্র-জাতিসত্তার মেরুকরণ ঘটতে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকা ও আফ্রিকায়। এ-প্রসঙ্গের অবতারণা একটিই কারণে- হলোকাস্ট ও তার বিভৎষতাকে অতিক্রম করে আরও একটি ‘বাস্তবতা’র সন্ধান পেয়েছে পৃথিবী।
উত্তরসত্য থেকে শুরু করে হলোকাস্ট-ডিনায়াল- শুধুমাত্র শোষক ও শোষিতের বাইনারির বাইরে পৃথিবীতে এখন আরও অনেক মাত্রা। অস্বীকার করার উপায় নেই মার্ক্সবাদের প্রয়োগ সংক্রান্ত নানা বিষয়ের সব থেকে সার্থক পরীক্ষাগার ছিল উপনিবেশগুলি। তার সব থেকে বড় কারণ- উপনিবেশগুলি ছিল শ্রম, পুঁজি, মুনাফা থেকে শুরু করে অবরুদ্ধ আতিসত্তার লক্ষণ বহনকারী ভূখণ্ড। মার্ক্স এখানে যে অতিজীবিত হয়ে উঠবেন তা কিছুটা নির্ধারিত ছিল।
এই নির্ধারিত এবং অনিবার্য বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত ঘাতক হয়ে উঠেছিল। কারণ, উত্তর উপনিবেশিক পর্বে ধর্ম ও জাতিসত্তার আগমন (Post-Colonial Return of Religion) ক্রমাগত পরীক্ষা নিচ্ছে মার্ক্স ও মার্ক্সবাদের।
বহুজাতিক ও কর্পোরেট-পুঁজি, ‘সুপ্রান্যাশানল’-স্তরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রিক কাঠামো বদলে যাওয়া, সাংস্কৃতির স্তরে এক ধরণের স্থবিরতা গ্লোবালাইজড দুনিয়ায় মানুষের কাছে এক ধরণের সংকট নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। আত্মপরিচয়ের সংকট তাকে তাড়া করতে শুরু করেছে। যে ‘Empirical Truth’-এর সন্ধান তাকে মুক্তির ইশরা দিয়েছিল তাই-ই তার সত্তার সংকটে দিনে সব থেকে বেশি প্রতারক হয়ে ওঠে।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন উঠবেই, মার্ক্সবাদ মানবতার দর্শন, সন্দেহ নেই তাতে। সারা পৃথিবীর সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষের সব থেকে বেশি ভাল জীবনযাপনের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর সন্ধান দিয়েছিলেন মার্ক্স। আবার এতেও সন্দেহ নেই যে একটি শতাব্দী পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র, পুঁজি, শ্রেণীর ধারণাও পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। তত্ত্বের বৈপ্লবিক প্রয়োগ ছাড়া মার্ক্সবাদের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু গত একশো বছরে রাষ্ট্র এতই ‘এমপাওয়ারড’ হয়েছে এবং ব্যক্তির ক্ষমতা সেই নিরিখে এতই হ্রাস পেয়েছে, ‘শোষক’ এতটাই মেঘনাদ হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্রের সারভিল্যান্স এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে ট্র্যাডিশনাল মার্ক্সবাদ ও তার পথ ধরে ঘনিয়ে ওঠা বিপ্লব-ধারনা দিয়ে একে ‘কাউন্টার’ করা অসম্ভব। সশস্ত্র বিপ্লবের পথ তো আরও আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আরও অবাক করা বিষয়- এ লক্ষণগুলি যখন প্রায় ভ্রূণ-অবস্থায় তখনই ধুরঝুর করে ধসে পড়েছিল মার্ক্সবাদ-প্রয়োগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলি।
সর্বহারার আধিপত্য একটি সম্ভাবনা নয়, রীতিমতো ইতিহাসের বিধান- এই ধারণাই কি শেষপর্যন্ত মার্ক্সবাদ ও মার্ক্সের ‘কল্পমৃত্যু’র সব থেকে বড় কারণ হয়ে উঠল? ঐশী মতবাদের বিরুদ্ধ অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করে শেষপর্যন্ত মার্ক্সও কি আমাদের কাছে হয়ে উঠলেন ঐশী-ব্যক্তিত্ব? এমনই এক বৈপ্লবিক মতবাদের উদ্গাতা ও প্রচারক যে বিপ্লব এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁর নির্ধারিত পথে আর হওয়াই সম্ভবপর নয়!
কিন্তু এই অসম্ভবের পথ ধরে একমাত্র সত্য হয়ে উঠবে ‘ফোর্বস ম্যাগানিজ’-এ প্রকাশিত মিলিওনিয়ারের তালিকাই? আর কিছুই থাকবে না পৃথিবীতে? থাকবে না কোনও বিকল্প পথের সন্ধান, যেখান থেকে এই চূড়ান্ত অসাম্য ও অদৃশ্য-শোষণের ধারাটিকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া সম্ভবপর হবে? জন্ম নেবে না কোনও গণ-সংস্কৃতি যার ভেতর তীব্র হতে শুরু করবে নন-পারফর্মিং রেলিজিয়স আইডেন্টিটি সন্ধানের বিপ্রতীপে এক যাত্রা! এই ভার্চুয়াল রিয়ালিটির যুগে এই গণ-সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখাও রীতিমতো দুঃসাহস। কিন্তু এটিও অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে কার্ল মার্ক্সই হতে পারেন সেই লঞ্চিং-প্যাড যেখান থেকে মানুষের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন-মহাকাশযান যাত্রা শুরু করতে পারে।
বেশ কিছুক্ষণ চিন্তার করার পর ‘হতে পারেন’ শব্দ দুটি কেটে দিই। কারণ এই শব্দ দুটির মধ্যে মৃদু হলেও সংশয় লুকিয়ে রয়েছে। গত দু-শতকে এর থেকে অধিকতর সার্থক লঞ্চিং-প্যাড আর প্রত্যক্ষ করেনি মানবসমাজ। ফলে এই মুহূর্তে তাঁকে যতটা ‘মৃত’ মনে হচ্ছে আসলে তিনি তার থেকেও বেশি জীবিত।

