মার্ক্‌সের কবরে দু’মুঠো মাটি নাকি একগোছা ফুল?  <br /> অরুণাভ ঘোষ

মার্ক্‌সের কবরে দু’মুঠো মাটি নাকি একগোছা ফুল?
অরুণাভ ঘোষ

 

 

প্রথমেই স্বীকার করে নিতে কোনো লজ্জা নেই যে মার্ক্‌স বা  মার্ক্‌সবাদ সম্বন্ধে আমার পাণ্ডিত্য নিতান্তই সীমিত। লেখার যোগ্যতা নিয়ে আমার নিজেরই সংশয় গভীর। তবু কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে সাধ যায় এই আপ্তবাক্য সত্য করতে কয়েকটা কথা লিখে ফেললাম। লিখে ফেললাম আমার কিছু ভাবনা। মার্ক্‌সবাদে যাঁদের অপরিসীম জ্ঞান তাঁরা নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন এই আর্জি জানিয়ে রাখি।

কার্ল মার্ক্‌স ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ মারা গেলেও আজ ১৪৩ বছর পরে প্রশ্নটা জেগে থাকে – মার্ক্‌স কি মৃত? বিশ শতকের প্রথম সাতটি দশক জুড়ে মার্ক্‌সের ভাবধারা পৃথিবীর সব মহাদেশেই রইরই করে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে একটা আশার আলো জ্বলেছিল। শোষণ নিপীড়নের নাগপাশ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মার্ক্‌সবাদ তখন যেন একটা জপমন্ত্র। আশির দশকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই স্বপ্ন ক্রমশ মিলিয়ে যেতে লাগল নবতর পুঁজিবাদের আক্রমণে। পুঁজিবাদ আসলে এক অতি ধুরন্ধর প্রাণী। পুঁজি, শ্রম এবং কাঁচামালের পারস্পরিক সম্পর্কটা গুলিয়ে দিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়ায় পুঁজিবাদ আশ্রয় করল প্রযুক্তিকে। আরও ছোট করে বলতে গেলে ইন্টারনেটকে। এই প্রযুক্তি, সকলেই জানে, প্রাথমিকভাবে তৈরি  করেছিল আমেরিকার Defense Advanced Research Projects Agency (DARPA) তাদের ARPANET প্রকল্পের মাধ্যমে এবং তাদের সহযোগী ছিল  National Science Foundation (NSF)। এই প্রকল্পে কত খরচ হয়েছিল সেটা আজ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ১৯৬৬-তে ১ মিলিয়ন ডলার নির্দিষ্ট করা হয়েছিল আর্পানেট গড়ে তুলতে। ১৯৮৫ পর্যন্ত ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল বলে অনুমান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৈজ্ঞানিক বা গবেষণা সংস্থার আর্থিক আনুকূল্যে প্রথম যুগের ইন্টারনেট অ-বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছিল। ফলে ঠিক কত বিনিয়োগ হয়েছিল বলা একটু কঠিন। আটের দশকের মাঝামঝি থেকে এই প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি বিনিয়োগ করতে শুরু করলে এর ব্যাপক প্রসার ও প্রভাব লক্ষ্য করা গেল।

না, প্রযুক্তি নিয়ে আপত্তি করার মানে হয় না। প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে সেটা বিজ্ঞানের অগ্রসরতা তবে মানব কল্যাণে সে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে নাকি অকল্যাণে সেটা অন্য প্রশ্ন। এবং রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিজ্ঞান – প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে আধুনিক যুগকে কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু লক্ষ্য করুন আরেকটি বিষয়। The General Agreement on Tariffs and Trade (GATT) নামে যে চুক্তিটি ১৯৪৭ সালে সম্পাদিত হয়েছিল ২৩টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যকে অবাধ করার জন্য, শুল্ক হ্রাসের জন্য, কোটা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সেটি সম্প্রসারিত রূপে ফিরে এল ৪৮ বছর পরে ১৯৯৫ সালে। নাম হল World Trade Organisation (WTO) যার সদস্য সংখ্যা ১২৫টি দেশ। বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্যের লক্ষ্যে শুল্ক হ্রাস নয় যুক্ত হল আরও নানান বিধি যার মধ্যে শুধু পণ্য নয় চলে এল পরিষেবা এবং মেধা সম্পদ। ভুবনজোড়া বাজার উন্মুক্ত হয়ে গেল। ভুবনজোড়া এই বাজার কিন্তু ভুবনজোড়া অন্তর্জাল ছাড়া সম্ভব হতো না। প্রযুক্তি আর বাজারের মাখোমাখো সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ অমূলক।

সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের সময় থেকে প্রায় সত্তর বছর ধরে মার্ক্‌সবাদী পন্থায় উৎপাদন এবং বন্টনের একটা ছাঁচ তৈরি হয়েছিল। ভারতের মতো মিশ্র অর্থনীতির দেশও শিল্পে, কৃষিতে বিনিয়োগে রাষ্ট্রের ওপর ভরসা রেখেছিল। সমস্ত বিতর্ক সরিয়ে রেখেও এ কথা বলা অনুচিত হবে না যে সোভিয়েত মডেল অনুসরণ করে পুঁজিবাদী বহু রাষ্ট্রই ওয়েলফেয়ার স্টেট বা কল্যাণকারী রাষ্ট্রের কিছু জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সোজা কথায় গত শতকের আটের দশক পর্যন্ত মার্ক্‌স কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান। তারপরের ঘটনাপ্রবাহ কিঞ্চিৎ গোলমেলে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, গ্লাসনস্ত ও পেরেসত্রয়িকার মতো রাজনৈতিক সংস্কারের বিপর্যয় এবং সংঘের জাতিসমূহের অভ্যন্তরীণ বিবাদের আঘাত সইতে না পেরে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়া ছিল পুঁজিবাদের কাছে একটা সংকেত – পুঁজির যোগানের কোনো বিকল্প নেই। এর সঙ্গে যোগ করে দেখতে হবে নিকটবর্তী সময়ে চিনের সর্বাধিনায়ক দেন জিয়াও পিং-এর ঐতিহাসিক মন্তব্য – ইঁদুর ধরতে পারলে বিড়ালের রং সাদা না কালো দেখে লাভ নেই। সেই একই কথা – পুঁজি চাই। মোদ্দা কথা চিন বলল তোমরা আমাকে পুঁজি দাও, আমরা তোমাদের শ্রম দেব। খাতায় কলমে কম্যুনিস্ট চিনের এই অবস্থান মার্ক্‌সবাদের আসন টলিয়ে দিল কারণ সেখানে রাষ্ট্রই সস্তা শ্রমের ফেরিওয়ালা। সোভিয়েতের রাজনৈতিক পতন আর চিনের মতাদর্শগত পতন খাল কেটে পুঁজিবাদের কুমীরকে দুনিয়ার আঙ্গিনায় এনে ফেলল। পুঁজির শাসন একচ্ছত্র আধিপত্য লাভ করল প্রযুক্তির হাত ধরে। নতুন শতকের মানে একুশ শতকের বিশ্ব দেখছে তার দাপট।

ধ্রুপদী মার্ক্‌সবাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে – সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চিনের রাজনৈতিক অথবা নৈতিক পতনের সঙ্গে মার্ক্‌সের মৃত্যুর কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা খুব সহজ। মার্ক্‌স পূর্ববর্তী প্রায় সমস্ত দার্শনিক তত্ত্বই মনন ও শীলন নির্ভর। মার্ক্‌সের দর্শনই প্রথম প্রায়োগিক দর্শন। অর্থাৎ প্রয়োগের বিচ্যুতি হলে মার্ক্‌সের কবরে আরও কয়েক বেলচা মাটি পড়ে যায়। ফিরে যাই প্রযুক্তির প্রসঙ্গে। বিশ্বব্যাপী অন্তর্জালের আবিষ্কার এবং প্রসার মধ্য-নব্বই থেকে পুঁজিকে আর শ্রমকে – বিশেষ করে মেধাশ্রমকে – ভৌগোলিক সীমানার নিগঢ় থেকে মুক্ত করে সহজলভ্য করে তুলতে পেরেছে। পুঁজি পৌঁছে গেছে সেখানে যেখানে আছে সস্তার শ্রম কিংবা কাঁচামাল। তার জন্য কোনো দেশে প্রত্যক্ষভাবে উপনিবেশ গড়ে তোলার মতো পরিশ্রমসাপেক্ষ, রক্তক্ষয়ী অভিযান করবার আর দরকার নেই। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মেধাশ্রমের সহজ অধিগম্যতা। ফলে বেড়ে উঠেছে নানাবিধ পরিষেবা তা সে আর্থিক কর্মকাণ্ডজনিত হোক বা প্রযুক্তিগত। যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতির ফলে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে সস্তার পরিযায়ী শ্রমিক।  একই সঙ্গে শুল্কের আগল খুলে যাওয়ায় পণ্যের আদান-প্রদান হয়েছে সহজতর। পণ্যায়ন হয়ে উঠেছে প্রগতির অভিজ্ঞান। ছোট কিংবা বড় যে কোনো সামগ্রীর নির্দিষ্ট বাজার আছে। অপ্রয়োজনীয় জিনিসকেও দরকারি করে তুলতে ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ছলাকলা। একটা বাটি আর একটা চামচই যথেষ্ট ছিল ডিম ফেটানোর জন্য। কিন্তু না, সেকথা বললে চলবে কেন? ডিম ফেটাবার জন্য চাই যন্ত্র – হস্তচালিত এবং বিদ্যুতচালিত। আপনি বেছে নেবেন কোনটা আপনার দরকার। উপভোক্তাকে বেশ একটা নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া গেল! উপভোক্তাই প্রভু – এই ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে পুঁজিবাদ। এই পণ্য সংস্কৃতির ফলে মানুষের পরিচয় উপভোক্তায় সংজ্ঞায়িত হয়েছে। তথ্য হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ উপভোক্তার সম্পর্কে যত তথ্য হাতে থাকবে পুঁজিবাদের ততই লাভ। তথ্যকে তাই এখন নতুন পেট্রোলিয়াম নামে ডাকা হচ্ছে, কেউ কেউ আরও একটু এগিয়ে তথ্যকে সোনার সঙ্গে তুলনা করছেন। উপভোক্তা কি শুধুই উপভোক্তা থেকে যাচ্ছে? বোধহয় না। উপভোক্তাকে উৎপাদনকারী হিসেবেও আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিচ্ছে প্রযুক্তি। অন্যত্র এর ব্যবহার থাকলেও আমাদের  সহজেই যা চোখে পড়ে তা হল বিনোদনের জগতে। প্রযুক্তির সাহায্যে – এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্রয়ে – বিনোদনের উপভোক্তাই উৎপাদনকারী হিসেবে ইউটিউবে চ্যানেল খুলে ফেলতে পারেন। বলবেন, সে সব তো সমাজ-মাধ্যমের ব্যাপার। অবশ্যই। কিন্তু মনে রাখা ভালো যে ইন্টারনেট ছাড়া সমাজ-মাধ্যম টোটা ছাড়া বন্দুক। এই উৎপাদনকারী উপভোক্তার জন্য একটা নতুন শব্দ নজরে এল। Consumer থেকে Ponsumer (productive/professional consumer)। এর বাংলা এখনো হয়নি বলেই মনে হয়।

এই পণ্য-প্রধান বিশ্বে যেখানে সর্বস্তরের, সর্ব শ্রেণির মানুষ পরিণত হয়েছে উপভোক্তায়, যেখানে সর্বক্ষণ আরও আরও পণ্যসম্ভারে সজ্জিত হওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে সে বিশ্ব মার্ক্‌সের অজানা ছিল। এই বিশ্বে উৎপাদন ব্যবস্থার চেহারাটাই পালটে গেছে। অর্ধ শতাব্দীর আগের ধ্যান ধারণাই বদলে গেছে। আর মার্ক্‌স তো মারাই গেছেন প্রায় দেড়শ বছর আগে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। নবতর প্রযুক্তি হুড়মুড়িয়ে এসে পড়েছে বিশ্বের আঙ্গিনায়। পুঁজিবাদের নবতর হাতিয়ার – কৃত্রিম মেধা বা এ আই। দুনিয়ার অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলিতে অনেকদিন ধরেই শিল্পে, এমনকি কৃষিতে, যন্ত্রের ব্যবহার চালু হয়ে গেছে। এর একটা কারণ যদি হয় মানবসম্পদের অপ্রতুলতা তাহলে অন্য কারণটি হল উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শ্রমিক নামক প্রাণীটিকে যথাসম্ভব  কমিয়ে দেওয়া। এখন এই কাজটি দায়িত্ব নিয়ে করতে এসে গেছে এ আই। বছর কুড়ি আগে প্রকাশিত Madeline Bunting-এর বই Willing Slaves – How the overwork culture is ruling our lives বইটি পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম। বুঝেছিলাম সাদা কলারের কর্মীরা, তথাকথিত এগজিকিউটিভরা কীভাবে ব্যক্তিসুখ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের গোলাম বানিয়ে তুলেছেন, দৌড়ে চলেছেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার তাগিদে। সেই সর্বস্ব নিংড়ে দেওয়া ম্যানেজমেন্ট কর্মীরাই আজ খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। আগেই বলেছি ইন্টারনেটের দৌলতে তথ্য-প্রযুক্তিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিয়োজিত হয়েছেন, বেড়ে গেছে পরিষেবা ক্ষেত্রের পরিসর। এই মেধা-শ্রমিকদের সামাজিক অবস্থান কিন্তু শ্রমিকের নয়, ক্রমান্বয়ে স্ফীত মধ্যবিত্তের শ্রেণিতে তাঁরা বিরাজ করেন। কিন্তু এ আই থাবা বাড়িয়েছে শুধু আর্থিক ও বাণিজ্যিক পরিষেবা ক্ষেত্রে নয়, নানা ধরণের কম্পিউটিং-এ নয়, তার আগ্রাসী অভিযানের মধ্যে চলে আসছে শিক্ষা, চিকিৎসা এমনকি ভ্রমণ ও বিনোদনও। এসব ক্ষেত্রে নিয়োজিত মেধা কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা তাই অমূলক নয়। ইতিমধ্যেই সংগঠিত ক্ষেত্রের চেয়ে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগ বেশি হচ্ছে। যাকে আমরা চাকরি বলে চিনতাম – যেখানে বেতন, ছুটি, পেনশন এবং নানাবিধ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ছিল – সে সবের বদলে ফুরনের কাজ, স্বল্প-মেয়াদী কাজ ইত্যাদির জোয়ার এসেছে। তাকে বলা হচ্ছে ‘গিগ’ ওয়ার্ক। আলাদা করে গিগ অর্থনীতিই তৈরি হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার জন্য, ভেসে থাকার জন্য মানুষ অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ভাগ্যিস মার্ক্‌সকে শ্রমিকের এই দুরবস্থা দেখে যেতে হয়নি। শ্রমিক শ্রেণিকে এমন অসহায় অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়েছে যেখানে তাঁদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে কারণ দিনের শেষে একজন শ্রমিক নিজেও উপভোক্তা এবং শ্রেণি পরিচয়ে নয় উপভোক্তা পরিচয়ে বেঁচে থাকাই তাঁর ভবিতব্য।

বিনা চ্যালেঞ্জে পুঁজি, শ্রম এবং কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণের ফলে পুঁজিবাদ আজ অবিসংবাদীভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ। পুঁজির কামড় দিনে দিনে বিশ্ব অর্থনীতিতে চেপে বসেছে। পরিসংখ্যান বলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট ইকুইটির ৯৫ শতাংশ ছিল পরিবার কেন্দ্রিক। আজ সেখানে ৬৮ শতাংশ ইকুইটি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর দখলে। বিশ্বের বাণিজ্যিক সম্পদের ৯৭ শতাংশ এবং ব্যবসায়িক বিক্রয়ের ৮১ শতাংশ মাত্র ১ শতাংশ কর্পোরেটদের দখলে। এমন দুনিয়া কিন্তু একভাবে মার্ক্‌সের সময়কালেও বিদ্যমান ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, সাউথ সী কোম্পানি প্রভৃতি রাষ্ট্রের দ্বারা একচেটিয়া অধিকার প্রাপ্ত কোম্পানিগুলি আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের এবং সমুদ্র-পথের বাণিজের বৃহদাংশ নিয়ন্ত্রণ করতো। ১৯ শতকের শেষ প্রান্তে ১ শতাংশ কোম্পানি ব্রিটেন এবং আমেরিকার রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ছিল। ১৮ শতকে যদি একচেটিয়া বাণিজ্যিক সংস্থার রমরমা থাকে ১৯ শতকে তা সরে যায় মূলধন-নিবিড় শিল্পে, খনিতে, রেল লাইন স্থাপন প্রভৃতিতে। এই ব্যবস্থাটাই এখন নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে এমন সন্দেহ করার অবকাশ কি নেই? বাষ্প-চালিত জলযান, বাষ্প-চালিত রেল  সেই বিগত সময়ের নব্য-প্রযুক্তি যার কাঁধে ভর দিয়ে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে। আর যার অমানবিক বহিঃপ্রকাশের বিরুদ্ধে মার্ক্‌সবাদ তুলে ধরে এক বৈপ্লবিক প্রতিপ্রশ্ন। পুঁজিবাদকে পরাস্ত করে শ্রমিকের নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আজকের নব প্রযুক্তির আক্রমণে বিপর্যস্ত। পৃথিবীর সম্পদের ওপর পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণের বিশেষ হেরফের হয়নি। রাষ্টের ওপর তার নিয়ন্ত্রণও শিথিল হয়নি। যা হয়েছে তা হল মার্ক্‌সবাদ থেকে শিক্ষা নিয়ে কিছু জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের রূপায়ণ যাতে জনরোষ প্রচলিত ব্যবস্থাকে তছনছ না করে দেয়। একুশ শতকে এসে পুঁজিবাদ অনেক সতর্ক, অনেক চতুর, অনেক কুশলী। উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শ্রমের এবং শ্রমিকের ভূমিকা হ্রাস করে দেবার এক বৃহৎ চক্রান্ত ক্রিয়াশীল বলেই মনে হয়। সেই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ সফল হলে মার্ক্‌সের কবরে নতুন করে মাটি পড়বে। কার্ল মার্ক্‌সের আরও একবার মৃত্যু হবে।

কিন্তু এখানেই কি সব শেষ? পথের শেষ কোথায় কে-ই বা বলবে? তবু ভরসা রাখতে ইচ্ছা হয় মার্ক্‌সের ডায়লেকটিক্‌সে, তাঁর দ্বন্দ্ববাদে। তার মূলে আছে তাঁর সেই বিখ্যাত ত্রি-স্তরীয় মতবাদ যা খ্যাত হয়েছে থিসিস – অ্যান্টিথিসিস – সিনথেসিস নামে। আজকের প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদী স্থিতাবস্থা যদি থিসিস হয় তাহলে একদিন কি শ্রমজীবী মানুষ এই ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলে অ্যান্টিথিসিসের প্রতিষ্টায় অগ্রণী হবেন না? হয়তো নতুন ব্যবস্থা কায়েম হবে যেখানে দুনিয়ার সম্পদ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতেই কুক্ষিগত থাকবে না। সম্পদের ন্যায্য বন্টন সম্ভব হবে। সেই সুদূর পরাহত ভোরে দু’মুঠো মাটির বদলে মার্ক্‌সের কবরে আমরা হয়তো একগোছা ফুল রেখে দেব।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes