
নক্ষত্র এবং চিরপথিকের আশ্চর্য বাইনাকুলার মোহনা মজুমদার
অন্ধকার এক স্রোতের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।এক নয় অজস্র হিমস্রোত। অকস্মাৎ একফালি রহস্যময় জ্যোৎস্না এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার অন্ধ নিরীক্ষণ। পিকাসো ‘পোট্রেট অফ ওয়াল্টার উইথ গারল্যান্ড‘ এঁকে চলেছেন কুয়াশার অন্তরালে। ঝাপসা দৃশ্য। সেই কুয়াশা অতিক্রম করার ক্ষমতা আমার নেই। ভেসে যেতে যেতে আশ্চর্য অলীক এক বাইনাকুলার আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি এবার দেখতে পাচ্ছি অবিস্মরণীয় মগ্নতায় গড়ে উঠছে একের পর অবয়ব। এ কি গ্যালাক্সি না কি অপেরা? দূরে একটি চেয়ারে বিনয় মজুমদার লিখে চলেছেন “এতকাল মনে হত তুমিও এসেছ অভিসারে-/ চাঁদের উপর দিয়ে স্বচ্ছ মেঘ ভেসে ভেসে গেলে/ যেমন প্রতীতি হয়, মেঘ হয়, চাঁদ চলমান।” এ দেখা আমায় দেখাচ্ছে সেই অলীক বাইনাকুলার, একটি গদ্যগ্রন্থ “স্তব্ধ রেখার পাশে“। পার্থজিৎ চন্দের কবিতা এর আগে আমি পড়েছি, তা যে কেবল মুগ্ধতার নয়, বাংলা সাহিত্যে ‘থেকে যাওয়া‘র দাবী রাখে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এবার তাঁর গদ্য আমায় চমৎকৃত করেছে, এ যেন পূর্বাপর হিরণ্ময় যাত্রা। আচ্ছা, কবির গদ্য ঠিক কেমন হয়? এবং সেই গদ্যকারের চোখে পৃথিবীর বরেণ্য শিল্পীদের চিত্রশৈলী যখন কবিতার মত অপার্থিব হয়ে ওঠে? সুররিয়াল ডাইমেনশনে গড়ে ওঠা সেই ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার ভাস্কর্যে কবি ফুটিয়ে তোলেন তার গদ্যের ক্যানভাস। অবশ্য ‘কবির গদ্য‘ এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করতে গিয়ে আমার মনে হল, এই মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে আমি কি আসলে একজন লেখকের লেখকসত্তাকে কোথাও অনুমেয় পরিধিতে বেঁধে ফেলার মত গর্হিত ভুল করে ফেললাম? শুরু থেকে দেখা যাক। গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে “স্তব্ধ রেখার পাশে“। এ বছর ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় শব্দ কলকাতা পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রকাশিত হয়েছে পার্থজিৎ চন্দের এই প্রবন্ধগ্রন্থটি। প্রচ্ছদ করেছেন চিত্রশিল্পী হিরণ মিত্র। এক অসিৎ অন্ধকারের ওপর ভেসে ওঠা একফালি আলোর মত চরে কৃশকায় কালো রেখা এঁকেবেঁকে যেন দিগন্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শিল্পী কি এমন করেই বিমূর্ত কোনো ধারনাকে মূর্ততার দিকে রেখার মতো টেনে নিয়ে যেতে চান? এই ‘অনেক কিছু বলতে চাওয়া‘ ছবিটিই যেন হয়ে ওঠে গ্রন্থটির নান্দনিক প্রচ্ছদ, যা পাঠককে কিছু সময়ের জন্য হলেও থমকে যেতে বাধ্য করে। উৎসর্গপত্রে আমরা পাই জীবনানন্দ দাশের সেই অমোঘ লাইন ‘সকালের নীলকণ্ঠ পাখি জল সূর্যের মতন‘। গ্রন্থটির গভীরে গেলে অনুধাবন করা যায়, জীবনানন্দের কবিতায় উঠে আসা জীবন্ত প্রতীকের ন্যায় লেখক নব নব মাত্রার স্ট্রোকে চিত্র, চিত্র থেকে কবিতা, কবিতা থেকে কল্পনা, দর্শন – কিভাবে ‘পরিক্রমা‘ করেছেন শিল্পজাত সুখ। যেন একক শিল্প ব্যাক্তিত্বের মধ্যে অনুরণিত হয়েছে একাধিক শৈল্পিক চেতনার অবিচ্ছিন্ন যোগ যা তিনি তাঁর কলমের মাধ্যমে সম্পাদনা করেছেন। পার্থজিতের গদ্যে অতিন্দ্রীয় আলো ছায়ার প্রতিসরনে অবগাহন করে শিল্পের এক ‘নতুন স্বর‘। কোথাও পল গগ্যাঁ, কোথাও কাৎসুরিকা হকুসাই, কোথাও মাঞ্চ, কোথাও পল ক্লি অথবা ফ্রিদা কাহলোর শিল্প ভাবনার ভেতর লেখক যেন তুলির টানে থুরি কলমের কালিতে মিলিয়ে দিয়েছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, দেবারতি মিত্র, বা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনার আঙ্গিক। আবার কোথাও কোথাও লেখাগুলি পড়তে পড়তে আপনার মনে হবে ভিন্নমাত্রার দুই শিল্পরেখা একে অপরের উপর প্রক্ষেপিত হতে হতেও যেন হঠাৎই বাঁক বদল করে তারা পাশাপাশি হেঁটে গেছে সমান্তরাল রেখায়। অনন্ত তার দিগন্তপথ। এগারোটি শিল্প বিষয়ক গদ্যের সংকলন এই বইটি। আমরা দেখতে পাই “পল গগ্যাঁ ও অন্তর্গত রক্তের খেলা” শীর্ষক প্রবন্ধটি শুরু হচ্ছে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা দিয়ে। ১৮৮৯ সালে পল গগ্যাঁর সৃষ্ট চিত্রের দিকে তাকিয়ে লেখকের ১৯৯১সালে অলোকরঞ্জনের প্রকাশিত কবিতার কথা মনে পড়ে। তিনি দেখাচ্ছেন উভয়েই ছবির জন্য ভেঙেচুরে দিচ্ছেন নির্ধারিত ফ্রেম। কবিতাও তো একপ্রকার ছবিই। গগ্যাঁর শিল্প ধারণার কথা পড়তে পড়তে আমরা পাই ভিনসেন্ট ভ্যান গগের বিখ্যাত ছবি “দ্য ইয়ালো ক্রাইস্ট“। তারপর এই যে সেজানের বিখ্যাত ছবি “দ্য মার্ডার“- এর পটভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পার্থজিৎ ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথের একখানি কথপোকথন টেনে আনলেন এবং নিজে লিখলেন “হত্যার আগেও কি হত্যাকারী আসলে নিজেকেই হত্যা করে না বারবার!” কিংবা “আত্মহত্যা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো গুপ্তহত্যা সফল ও সার্থক হয়নি আজ পর্যন্ত।” জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে এই দৃঢ় ধারণা পাঠককে বাধ্য করবে ‘রসবোধের মায়া‘য় আটকে পড়তে। পাঠক বা দর্শক তার মনের আলোকে উপলব্ধি করবেন ব্যাপ্ত আত্মচেতনা। চিত্রকলা ও সাহিত্যের বিকীর্ণ রসায়নে এ এক আশ্চর্য বই। কখনও পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ভেসে উঠবে চিঠির একটি খণ্ড ” Diego. Truth is, so great, that I wouldn’t like to speak, or sleep or listen or love. To feel myself trapped, with no fear of blood, outside time and magic, within your own fear, and your great anguish and within the very beating of your heart. All this madness, if I asked it of you, I know, in your silence, there would be only confusion. I ask you for violence, in the nonsense and you, you give me grace, your light and your warmth. I would like to paint you, but there are no colors, because there are so many, in my confusion, the tangible form of my great love…” কাহলোকে নিয়ে লেখা গদ্য ‘অস্তিত্বের ক্রন্দন ও কাহলো‘। পার্থজিৎ সূচনা করছেন তার দিয়েগোকে লেখা চিঠির অংশ দিয়ে। প্রলয়ের অন্ধকারে ডুবতে বসা স্বপ্নহত্যার ক্ষনে মানুষ কোথাও ভালবাসার খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে চায়।
একা সমুদ্র বুকে নিয়ে একা পাঠক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন স্রোতের পর স্রোত ভেঙে যন্ত্রণাকাতর এক আত্মা খুঁজে চলেছেন অগ্নিপথ। আর এখানেই গদ্যগুলি হয়ে উঠছে সেরিব্রাল, শক্তিশালী এক তন্ত্রী। রক্তপাত, যৌনতা, হিংসা, উল্লাস, রহস্যময়তা, হত্যা, ডিসটর্শান, মৃত্যু – সাবলীল ও সযত্ন দক্ষতায় পার্থজিৎ এনে বসালেন তাঁর দৃশ্য প্রবন্ধগ্রন্থে। চিন্ময় গুহ বলছেন “শিল্প এক জীবনবেদ“। আমরা দেখতে পাই পিকাসো হোক, ফ্রিডা কাহলো হোক, গুস্তাভ ক্লেমট হোক, কিংবা মার্ক শাগাল– প্রত্যেকেরই বিশ্ববিখ্যাত ছবিগুলি সৃষ্টির আড়ালে গূঢ় স্তরে রয়েছে তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া যন্ত্রণা,নৈরাশ্য, হতাশা, অবসাদ, প্রেম, কিংবা অভিসার। যাবতীয় আবেগ অনুভূতি, তারা শিল্পের মাধ্যমে ক্যানভাসে প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। আবার কখনও ব্যাক্তিগত সংকট অতিক্রম করে শুধুমাত্র শিল্পের প্রতিই নির্মোক দৃষ্টিপাত রেখে গড়ে তুলছেন বহুমাত্রিক সব কাঠামো। দর্শক ছবির দিকে এগোলে ছবি থেকেও কিছু একটা এগিয়ে আসে দর্শকের দিকে বিভ্রমের মত। ‘হয়ে ওঠা‘ এবং ‘অবভাস‘-এর দ্বৈরথে ব্যাক্তিসত্তাকে দুমড়ে মুচড়ে পার্থজিৎ লিখে চলেন শিল্পের দর্শন, ইঙ্গিতময়তা। একটি শিল্পের বিমূর্ততাকে তিনি অনায়াসে উদ্ভাসিত করলেন অন্য একটি শিল্পের নিহিত মানচিত্রে। “মৌল দর্শনের পল ক্লি” শীর্ষক প্রবন্ধে আমরা দেখতে পাচ্ছি , পল ক্লি বলছেন “I and you, the artist and his object, sought to establish optical-physical relations across the invisible barrier between the ‘l’ and the ‘you’.” অর্থাৎ ‘তুমি‘ এবং ‘আমি‘র মধ্যে যে অদৃশ্য সীমারেখা সেটিকে অতিক্রম করে সম্পর্ক স্থাপন করাই শিল্পীর উদ্দেশ্য (লেখকের ভাষায়)। লেখক এখানে পল ক্লি‘র দর্শনের সাথে কোথাও জেন দর্শনের সাদৃশ্য ইঙ্গিত করছেন। পার্থজিতের গদ্যে যে বিপর্যাস আমরা স্তরে স্তরে দেখতে পাই, তা শুধু মোটিফের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শীৎকার নয়, এ যেন ভাস্করের অন্বেষণ। সাবলীল নির্মেদ চলমানতায় পাঠক খুঁজে পান ভাবনার খোরাক। এখানে লক্ষ্য করার বিষয়, যৌন দৃশ্য হোক বা হত্যা দৃশ্য, প্রতিটি ছবির আড়ালে যে জটিল মনস্তত্ত্ব মহাজাগতিক আলোর সামনে প্যারাডক্স সৃষ্টি করছে, তা এই ম্যাজিশিয়ান লেখকের কলমে আলাদা মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়েছে দাপটের সঙ্গে। দু–মলাটের মোড়কে দুইশ পাতার পরিসরে গূঢ় প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে ধূসর মেঘের ভেতর খেলা করে ‘চিন্তা‘ এবং ‘উচ্চারণ‘। এক নির্মম আত্মনগ্নায়নের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র এক শিল্পজগৎ রূপে পাঠকের সামনে স্পন্দিত প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় ‘স্তব্ধ রেখার পাশে‘। লেখককে ধন্যবাদ ও প্রকাশককে সাধুবাদ এমন একটি গ্রন্থ নির্মাণের জন্য, যা পাঠকের কাছে শুধুমাত্র সুখপাঠ্য নয়, আচ্ছন্নের। যেন অনাবিষ্কৃত অন্তরীপে অন্ধের ‘অস্তিত্ব‘কে খোঁজার গোপন ‘পরিক্রমা‘।
‘স্তব্ধ রেখার পাশে‘ – পার্থজিৎ চন্দ
প্রকাশক– শব্দ কলকাতা পাবলিশিং হাউজ
প্রচ্ছদ – হিরণ মিত্র
মুদ্রিত মূল্য – ৫৫০/-

