
মতবাদ ও সিদ্ধসিদ্ধান্ত লেভ শেস্তভ তর্জমা– বিপ্লব নায়ক
লেভ শেস্তভ (১৮৬৬–১৯৩৮) ছিলেন রুশ-ইহুদি দার্শনিক, যাঁকে বিশ শতকের অন্যতম মৌলিক অথচ সবচেয়ে অস্বস্তিকর চিন্তকদের একজন বলা যায়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ইয়েহুদা লেইব শোয়ার্জমান। তাঁকে কোনও একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক মতবাদের মধ্যে সহজে আটকে রাখা যায় না। তিনি অস্তিত্ববাদী, কিন্তু প্রচলিত অর্থে নন; তিনি ধর্মীয় চিন্তক, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্বের অনুসারী নন; তিনি যুক্তিবাদের তীব্র সমালোচক, কিন্তু নিছক অযৌক্তিকতার প্রবক্তাও নন। তাঁর সমস্ত দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই যুক্তি, নিয়তি এবং ‘অপরিহার্য সত্য’-এর কাছে বন্দি? শেস্তভ মনে করতেন, পাশ্চাত্য দর্শন বহু শতাব্দী ধরে মানুষকে এমন একটি ধারণার কাছে আত্মসমর্পণ করতে শিখিয়েছে যে বাস্তবতার কিছু নিয়ম চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয়। দুই আর দুই চার হয়, মৃত্যু অনিবার্য, প্রকৃতির নিয়ম বদলানো যায় না, যা ঘটে গেছে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়—এই ধরনের বক্তব্য আমাদের কাছে এত স্বাভাবিক যে আমরা এগুলিকে আর প্রশ্নই করি না। কিন্তু শেস্তভের দর্শনের সূচনা হয় ঠিক সেই প্রশ্ন থেকে—কেন? কেন মানুষকে মেনে নিতে হবে যে বাস্তবতা অবশ্যই যুক্তির নিয়ম অনুসরণ করবে? তাঁর কাছে দর্শনের কাজ প্রতিষ্ঠিত সত্যকে আরও সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা নয়, বরং যে সত্যকে আমরা চূড়ান্ত বলে মেনে নিয়েছি তার বিরুদ্ধেও মানুষের বিদ্রোহের সম্ভাবনা আবিষ্কার করা। এই কারণেই তাঁর চিন্তায় ‘অপরিহার্যতা’-র বিরুদ্ধে ‘সম্ভাবনা’ এত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন বলে, ‘এটা অসম্ভব’, ‘এটা হতেই পারে না’, ‘এটাই নিয়ম’, শেস্তভ তখন সেই নিশ্চয়তার ভিতেই প্রশ্নের বীজ খুঁজে পান। তাঁর কাছে মানুষের বর্তমান পরিস্থিতিই তার চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়; যে জিনিস আজ অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তা আগামীকাল সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। শেস্তভের এই চিন্তার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-অভিজ্ঞতার গভীর সম্পর্ক ছিল। মৃত্যু, যন্ত্রণা, অসহায়তা এবং মানবজীবনের ট্র্যাজেডি তাঁকে বুঝিয়েছিল যে দর্শন যদি কেবল মানুষকে তার দুর্দশার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়, তবে সেই দর্শনের সীমা রয়েছে। দস্তয়েভস্কি তাঁর চিন্তার অন্যতম প্রধান সঙ্গী ছিলেন। বিশেষ করে দস্তয়েভস্কির ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’-এর মধ্যে শেস্তভ এমন একজন মানুষকে দেখতে পেয়েছিলেন, যে যুক্তি ও স্বার্থের নির্ধারিত পথ মেনে চলতে অস্বীকার করে। মানুষ যে সবসময় নিজের যুক্তিসঙ্গত স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবে, এই ধারণার মধ্যেই দস্তয়েভস্কির চরিত্রটি বিদ্রোহ করে। সে কখনও নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে, কেবল প্রমাণ করার জন্য যে সে একটি হিসেবযোগ্য যন্ত্র নয়। শেস্তভের কাছে এই আপাত-অযৌক্তিকতা আসলে মানুষের স্বাধীনতারই চিহ্ন। কারণ যদি মানুষের সমস্ত আচরণকে আগে থেকেই যুক্তি, প্রকৃতি, সমাজ কিংবা মনস্তত্ত্বের নিয়ম দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে মানুষের স্বাধীনতার অর্থ কোথায়? নীৎসের সঙ্গেও শেস্তভের গভীর বৌদ্ধিক সম্পর্ক রয়েছে। নীৎসের মতো তিনিও প্রচলিত নৈতিকতা, সত্য এবং যুক্তির সর্বময় কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের পথ শেষ পর্যন্ত আলাদা। নীৎসে ঈশ্বরের মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান, আর শেস্তভ মানুষের যুক্তির সীমা অতিক্রম করে ঈশ্বরের দিকে ফিরে তাকান। তবে শেস্তভের ঈশ্বর কোনও সহজ ধর্মীয় সান্ত্বনার ঈশ্বর নন। তাঁর ঈশ্বর এমন এক ঈশ্বর, যাঁর কাছে মানুষের ‘অসম্ভব’ বলে নির্ধারিত জিনিসও সম্ভব হতে পারে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আথেন্স অ্যান্ড জেরুজালেম’-এ এই দ্বন্দ্বটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘আথেন্স’ সেখানে গ্রিক দর্শন, যুক্তি ও জ্ঞানের প্রতীক, আর ‘জেরুজালেম’ বাইবেলীয় বিশ্বাস, প্রত্যাদেশ এবং ঈশ্বরের প্রতি আস্থার প্রতীক। শেস্তভ মনে করতেন, এই দুই পথের মধ্যে একটি মৌলিক সংঘাত রয়েছে। আথেন্স মানুষকে বলে যুক্তির সাহায্যে সত্যকে আবিষ্কার করতে; জেরুজালেম মনে করিয়ে দেয়, সত্য হয়তো মানুষের যুক্তির চেয়েও বৃহত্তর। শেস্তভ দ্বিতীয় পথটির দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাঁর কাছে বিশ্বাস কোনও মতবাদকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া নয়; বরং এমন এক অস্তিত্বগত সাহস, যেখানে মানুষ যুক্তির নিশ্চয়তা না থাকলেও অসম্ভবের সম্ভাবনাকে একেবারে বাতিল করে দেয় না। এই জায়গাতেই তাঁর সঙ্গে কিয়ের্কেগার্দের গভীর সাদৃশ্য দেখা যায়। কিয়ের্কেগার্দের মতো শেস্তভও মনে করতেন, মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্বগত প্রশ্নগুলির উত্তর কেবল যুক্তি দিয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্বাসের যে ‘লাফ’, যেখানে মানুষ সম্পূর্ণ বৌদ্ধিক নিশ্চয়তা ছাড়াই এক গভীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেটি তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী অস্তিত্ববাদী দর্শনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও এখানেই। শেস্তভকে তাই কেবল ‘যুক্তিবিরোধী’ দার্শনিক হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্ব বোঝা যায় না। তাঁর প্রকৃত প্রশ্ন আরও গভীরে—মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটলে যা অসহনীয়, যেমন মৃত্যু, অন্যায়, যন্ত্রণা বা প্রিয়জনের বিচ্ছেদ, তখন দর্শন কি কেবল বলে যাবে, ‘এটাই বাস্তবতার নিয়ম, এটাই অনিবার্য’? যদি দর্শনের একমাত্র উত্তর হয় বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ, তাহলে মানুষের যন্ত্রণা ও বিদ্রোহের মূল্য কোথায়? শেস্তভ এই আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধেই দাঁড়ান। তাঁর দর্শন যেন বলে, মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হল এমন কিছুকেও প্রশ্ন করার ক্ষমতা, যাকে সবাই অপরিবর্তনীয় বলে ঘোষণা করেছে। এই অর্থে শেস্তভের দর্শন মূলত বিদ্রোহের দর্শন—কিন্তু সেই বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক নয়, অস্তিত্বের গভীরতম স্তরে। তিনি মানুষকে মনে করিয়ে দেন যে যুক্তি আমাদের পৃথিবীকে বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা দিলেও, মানুষের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করার ক্ষমতা তার নেই। আজকের পৃথিবীতে, যেখানে বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, অ্যালগরিদম, জৈবিক প্রবণতা এবং সামাজিক নিয়মের সাহায্যে মানুষের আচরণকে ক্রমশ ব্যাখ্যা ও পূর্বানুমান করার চেষ্টা চলছে, শেস্তভের প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে—মানুষকে কি সত্যিই সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? যদি মানুষের ভবিষ্যৎ তার অতীত, পরিবেশ, শরীর, সমাজ এবং পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাহলে তার স্বাধীনতার জায়গাটি কোথায়? শেস্তভ সেই শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করতে চান—মানুষের ‘না’ বলার ক্ষমতা। তাঁর কাছে দর্শনের কাজ সবসময় উত্তর দেওয়া নয়; কখনও কখনও দর্শনের সবচেয়ে জরুরি কাজ হল সেই প্রশ্নটিকে বাঁচিয়ে রাখা, যেটিকে পৃথিবী ইতিমধ্যে ‘অসম্ভব’ বলে বাতিল করে দিয়েছে। তাই শেস্তভের দর্শনের সারকথা হয়তো এই—যুক্তি যেখানে বলে ‘এখানেই শেষ’, মানুষের স্বাধীনতা সেখান থেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে, ‘সত্যিই কি শেষ?’
কোনো নতুন চিন্তাকে যদি আপনি নষ্ট করতে চান, চেষ্টা করুন যাতে তা যতটা সম্ভব ব্যাপকভাবে প্রচার করে দেওয়া যায়। লোকে তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা শুরু করবে, নিজেদের প্রাত্যহিক প্রয়োজনের সাপেক্ষে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে, তা থেকে সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা করবে, এক কথায় বললে, নতুন চিন্তাটিকে তারা তাদের তৈরি-থাকা যুক্তি-যন্ত্রে ঠেসে-গুঁজে পোরার চেষ্টা করবে; বা, আরো যা সম্ভবপর, নতুন চিন্তাটিকে তারা তাদের অভ্যাসগত সুবোধ্য ধ্যানধারণার ধ্বংসাবশেষ দিয়ে একেবারে ঢেকে ফেলবে, আর তার মধ্য দিয়ে নতুন চিন্তাটি যুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত সমস্তকিছুর মতোই একেবারে কাঠ-মড়া-য় পরিণত হবে। বোধহয় এই জন্যই দার্শনিকদের মধ্যে নিজেদের ভাবনাকে এমন পোষাক পরিয়ে উপস্থিত করার প্রবণতা দেখা যায় যাতে সেই চেহারার ঠেলাতেই লোকজন তার কাছে ঘেঁষতে বাধা পায়। দার্শনিক ভাবনাতন্ত্রগুলোর অধিকাংশ অতি বিশৃঙ্খল ও দুর্বোধ্য ভাবে উপস্থাপিত, যার জন্য প্রতিটা শিক্ষিত মানুষই যে তা বুঝতে পারবে এমন নয়। নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে, আর তাই প্রত্যেকেই যতোটা পারে চেষ্টা করে যাতে নিজ সন্তানের অকালমৃত্যু না হয়। যে-কোনো চিন্তার সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রুরা হলো সেই চিন্তা থেকে টানা সিদ্ধসিদ্ধান্তগুলো, যেনবা সেই সিদ্ধসিদ্ধান্তগুলো আপনা-আপনি-ই সেই চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই মূল চিন্তা মোটেই ওই সিদ্ধদিদ্ধান্তগুলোকে আগের থেকেই নিজের মধ্যে ধারণ করে না, সাধারণত ওই সিদ্ধসিদ্ধান্তগুলোকে তার ঘাড়ে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রায়শই লোকে বলে: ‘চিন্তাটি একদম ঠিক, কিন্তু তা এমন সব সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় যেগুলো মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তাছাড়া, কতো-না দার্শনিককে এই করুণ জাঁকজমকের মুখোমুখি হতে হয়েছে যে তাঁর শিষ্যরা তাঁর সমস্ত চিন্তাভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে কেবলমাত্র তা থেকে সিদ্ধ সিদ্ধান্তগুলো চর্বিতচর্বণ করে যাচ্ছে। নিজ জীবিতাবস্থাতেই সাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করার দুর্ভাগ্য যে চিন্তকদের হয়েছে, নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছে ‘সিদ্ধসিদ্ধান্ত’ কী বস্তু! তবু এমন দার্শনিক অতি বিরল যিনি তাঁর ভাবনাকে সম্প্রসারিত-করে-নিয়ে-যাওয়ার-দাবিদারদের বিরুদ্ধে সাহসভরে খোলাখুলি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন; আর এমন দার্শনিক তো আরো বিরল যিনি সোজাসাপটা বলে দিয়েছেন যে তাঁর ভাবনা-চিন্তা-কাজ-এর কোনো সম্প্রসারণ দরকার নেই, সম্প্রসারণ হলে তা আর টিকবে না, তাঁর ভাবনা-চিন্তা-কাজ যে রূপ ধারণ করে যে সত্তায় আবির্ভূত হয়েছে কেবলমাত্র তার মধ্যেই টিকে থাকতে পারে, তা স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদি কেউ এ-কথা বলে, তাকে কী কোনও প্রত্যুত্তর দেওয়া যায়? যে মানুষ তর্ক করে কিছু খণ্ডন করতে চায় না, বা কাউকে কিছু প্রমাণ করে দেখিয়ে দিতেও চায় না, তাকে কি লোকে কোনও প্রত্যুত্তর দিতে পারে, এমনকি দেওয়ার চেষ্টাটুকুও কি করতে পারে!
একমাত্র প্রত্যুত্তর তখন জনগণের রায় বা গণপিটুনি-আইনের দরবারে আবেদন করা। জনগণ এতোই দুর্বল ও সাদাসিধে যে যে-কোনো দার্শনিকের মধ্যে তারা যে-কোনো-মূল্যে একজন শিক্ষক (প্রথাগত অর্থে)-কে দেখবেই দেখবে। অন্যভাবে বললে, তারা আসলে চায় সেই ব্যক্তিপ্রবরের উপরে তাদের নিজেদের কর্ম-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছুর দায় চাপিয়ে দিতে, তাদের গোটা নিয়তির দায় আরোপ করতে। সক্রেতিস-কে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো, তা তাঁর দেওয়া শিক্ষার জন্য নয়, বরং এই জন্য যে আথেনবাসীরা মনে করেছিলো আথেনস-এর জন্য তিনি বিপজ্জনক। সব যুগেই মানুষরা সত্যের দিকে এগোতে চেয়েছে এই মাপকাঠি ধরে নিয়ে যেনবা সত্য তাদের কাজে আসবে ও তাদের রক্ষা করবে। সবচেয়ে বড়ো শিক্ষাতন্ত্রগুলোর একটি, খৃস্ট-ভাবনাকেও দমন করা হয়েছিলো যেহেতু তা তার স্বনিযুক্ত অভিভাবকদের কাছে বিপজ্জনক বলে মনে হয়েছিলো, বা, এভাবেও ধরতে পারেন, যেহেতু তা রোমের আদর্শবিধির পক্ষে সত্যিই খুব বিপজ্জনক ছিলো। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সক্রেতিস-এর মৃত্যু বা হাজার-হাজার প্রারম্ভিক যুগের খৃস্টানদের মৃত্যু, কোনোটাই প্রাচীন সংস্কৃতি ও সমাজ-রাজনীতি-কে ক্ষয়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে পারেনি: কিন্তু এই সন্দেহাতীত শিক্ষা থেকে কেউ কিছু শিখে উঠতে পারেনি। লোকে মনে করে যে এসবই ছিলো হঠাৎ-করে-ঘটে-যাওয়া ভুলভ্রান্তি, প্রাচীন কালে এসবের থেকে কেউই মুক্ত থাকতে পারতো না, কিন্তু এখন আর কখনো তাদের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না; আর এই নিশ্চয়তায় মজে লোকে আগের মতোই প্রতিটা সত্য থেকে ‘সিদ্ধসিদ্ধান্ত’ টানার অভ্যাস বহাল রাখে ও নিজেদের টানা সেই সিদ্ধসিদ্ধান্তগুলো দিয়েই সত্যের বিচার করে। তার ফলও তারা হাতেনাতে পায়। যদিও এই পৃথিবী এমন বহু প্রাজ্ঞ মানুষ দেখেছে যাঁরা এমন বহু কিছু জেনেছিলেন যার মূল্য মানুষদের-প্রাণ-বাজি-রেখে-পিছু-ধাওয়া-করা ধনসম্পদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি, তবু এখনও আমাদের কাছে প্রাজ্ঞতা হলো সাত-পাকে-বেঁধে বন্ধ-করে-রাখা বই, এমন এক নুকোনো ভাণ্ডার যা আমাদের নাগালের বাইরেই থেকে যায়। এমনকি অনেকে— হয়তো তাঁরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই হবেন— খুব আন্তরিকভাবে মনে করেন যে দর্শন-ভাবনা হলো সবচেয়ে বিরক্তিকর ও যন্ত্রণাকর এমন এক বৃত্তি যা সেইসব দুর্ভাগা অকালকুষ্মাণ্ডদেরই সইতে হয় যারা ‘দার্শনিক’ পদবাচ্য হওয়ার মোহে লালায়িত হয়। আমার বিশ্বাস যে এমনকি দর্শনের অধ্যাপকরাও, এমনকি সবচেয়ে বুদ্ধিমান অধ্যাপকরাও, প্রায়শই এই মতের ভাগীদার হন এবং ধরে নেন যে ঠিক এইখানেই তাঁদের আরাধ্য বিজ্ঞানের চূড়ান্ত গোপন কথাটি সেঁধিয়ে আছে যা কেবল দীক্ষিতপ্রাপ্তদের কাছেই উন্মোচিত হয়ে থাকে। সৌভাগ্যবশত, ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। এমনটা হতেই পারে যে এ ব্যাপারে মনুষ্যজাতি পাল্টানোর নয়, আজ থেকে আরো হাজার বছর পরেও মানুষরা স্বয়ং সত্যের চেয়ে সত্য থেকে টানা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ‘সিদ্ধসিদ্ধান্ত’-গুলো নিয়েই অনেক-অনেক বেশি মাথা ঘামিয়ে চলবে; কিন্তু যাঁরা প্রকৃত দার্শনিক, যাঁরা জানেন যে তাঁদের লক্ষ্য কী ও তাঁরা কী চান, তাঁরা ওইসব খুব গায়েও মাখবেন না। তাঁরা আগের মতোই তাঁদের সত্যগুলো উচ্চারণ করে যাবেন, এ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাও ঘামাবেন না যে যুক্তিপ্রেমীরা সেসব সত্য থেকে কী না কী সিদ্ধান্ত টেনে বসতে পারে।

