এণাক্ষী রায়ের গল্প – অমলতাসের ডাল

এণাক্ষী রায়ের গল্প – অমলতাসের ডাল


দুপুরের দু ঘন্টা ঘুম, নিদ্রাহীন রাত প্রকট করে দিয়ে চলে যায় বিকেলের দিকে। আকাশের রঙ বদল হয়, যেন সিনেমা। কোদালি মেঘের ফেনায় দুই রঙা তিন রঙা রোদ ক্রমশ ছাই হয়ে যায়। বাতাসের গন্ধ যেমন এসময় বদলে যেত লুইত পাড়ে, তেমনটাই ঘটে। শেষ বেলার কাঠঠোকরা সঙ্গী নিয়ে বাড়ি ফিরবে বলে, ডেকে ওঠে আগেরই মতো। আকাশটা ছাই থেকে ঘোর কালো হতে হতে পেট চিরে দু’টুকরো হয়ে গেলে, পেট ফুঁড়ে সূর্যটা বেরিয়ে আসে। তখন ঘন কালো শহরের গাছপালাগুলো কচিকলাপাতা রঙের হয়ে যায়। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমে আসার আগে ঝড় আসে। কচিকলাপাতা রঙের ঝড়। কাকেরা সমস্বরে কা কা করতে করতে সময়ের আগেই বাড়ি ফিরতে থাকে। দুপুরের কাঁথাঘুমের আরাম থেকে বেরিয়ে দু’হাত মেলে দিয়ে কাকেদের মতো দু’হাত ছড়িয়ে পাড়ার এমাথা থেকে ওমাথা কা কা করে ছোটে ছোট বাচ্চারাও। হ্যালোও যোগ দেয় ওদের দলে। গাছেদের খাবারটুকু এই বৃষ্টি এসে জুটিয়ে দিল বলে আনন্দ হয়, খুব আনন্দ।
ঘোর বৃষ্টিতে কাজকামের খুব অসুবিধে হয় ঠিকই। কিন্তু বড় একটি ভারও লাঘব হয়। বৃষ্টি খানিক থামলে ধড়াচূড়া পরে হ্যালো। নিজে সেজেগুজে, রিক্সাটাকে সাজিয়ে বের হয়। নরম কাদামাটির মধ্যে কী করে শেকড় সেঁধিয়ে দিয়ে হাসি হাসি মুখে চেয়ে থাকে তার বাচ্চারা, প্রাণ ভ’রে দেখে। নিজের পাতলা হয়ে যাওয়া চুলের ওপর একটা বিড়ার মতো ক’রে, ফেট্টি বাঁধা থাকে হ্যালোর। বাইরে যাওয়ার সময়, সেই ফেট্টিতে সব সময়ই গোঁজে কিছু ফুল পাতা। মুকুটের মতো ফুল গুঁজে, রিক্সার হাতলে ঝুলিয়ে দেয় কোনো পাতাবাহারের ডাল। এই সাজ না হলে কাজে যায় না সে। ইন্দিরা কলোনি থেকে রাজার মতো রিক্সা বের করে রাজবাড়ির দিকে ছোটে।
যখন লুইত-পার থেকে এ শহরে প্রথম এসেছিল, রাজবাড়ির দিঘির পাড়ের ঢিপিটা বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। আর তার মাথার ওপরে ঝরে ঝরে পড়ত প্রাচীন অশ্বত্থের পাতা। নিচের রাস্তা থেকে এই ঢিবিটাকে দেখলে একটা ছোটখাটো পাহাড় মনে হত তখন। পাহাড়ের ওপরে বৌদির বেড়ার চায়ের দোকানে বিনি মাগনায় চা খাওয়াত বৌদি। অশ্বত্থের ডাল বেয়ে সূর্যের আলো এসে আলপনা কেটে কেটে যেত বৌদির দোকানের বেড়ায়। ছায়াটা দুলত, হ্যালোর মনে হ’ত আরেকটা জীবন্ত গাছ বেড়ে উঠছে বৌদির দোকানের বেড়ায়। এই ছায়া ছায়া দোকানের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যেত হ্যালো। ঢিবির একদম ওপরে বৌদির দোকান। এপারে রাস্তা। দোকানের মুখ রাস্তার দিকে, দোকানের পেছনে তাকালে সোজাসুজি রাজবাড়ি পুকুরের এপার-ওপার। ঢিবির ঢালু বেয়ে ওদিকে নেমে গেছে সিঁড়ি। পুকুরের শ্যাওলা-পড়া ঘাট। ঘাটের পাশে রাণীর কাপড় ছাড়ার ঘর ইট বের হয়ে শ্যাওলা মেখে দাঁড়িয়ে তখনও।
বাঁদিকের মনসামন্দিরের ফাটলে গজিয়ে-ওঠা অশ্বত্থের চারাগুলো তখন প্রাণপণে যুদ্ধ করছে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। জলহীন, মাটিহীন ছোট্ট চারাগুলো সূর্যের দিকে তাকিয়ে চোখের সামনে বেড়ে উঠছে ফাটলের গায়ে। দোকানি বৌদি বলত ওই ফাটলগুলোয় নাকি সাপেদের বাস। মনসা মন্দিরের সাপ। বলে, কপালে হাত ঠেকাত বৌদি। ওইসব ফাটলে বেশ কটি অশ্বত্থের চারা মুখ বাড়িয়ে সমানে ডাকত হ্যালোকে। কিন্তু সাপের গর্তে জল দেওয়া মানা। দোকানি বৌদি কিছুতেই জল ঢালতে দেবে না গাছের গোড়ায়। বাচ্চা বাচ্চা গাছগুলো হ্যালোকে দেখলেই দু-হাত বাড়িয়ে ডাকত। ওদের তেষ্টায় চোখে জল আসত হ্যালোর। একদিন ভোর ভোর বৌদির দোকান খোলার আগেই এসে চারাগুলোকে তুলে নিয়েছিল হ্যালো। তারপর পুঁতে দিয়েছিল পুকুরের উল্টোদিকের পাড়ে। এখানে জলের কষ্ট নেই। বাচ্চাগুলো তেষ্টায় কাঁদবে না আর। কচি কচি বাচ্চাগুলোকে প্রাণ দিতে পেরে খুব আনন্দ হয় হ্যালোর।

সেদিন আনন্দর চোটে রাস্তা দিয়ে না এসে, ঝপাং করে রাজবাড়ির পুকুরে ঝাঁপ দেয় সে। আলো ফুটে দিন শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। সূর্যের আলোটা সোনালি থেকে রুপোলি হওয়ার সময়ে রাজবাড়ির পুকুরে রাজহাঁসের মতো ভেসে ভেসে আসতে আসতে হ্যালো বুঝতে পারে তার দুপাশে লাইন দিয়ে সাঁতরাচ্ছে রাণীর হাঁসগুলো। ঝকঝকে পুকুরপাড়ে উঠে আসতে গিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, পুকুরের ধার ঘেঁষে পদ্ম ফুটে আছে শত শত। মেয়েদের ঘাটে রাজবাড়ির মেয়েরা সোনালি থেকে রুপোলি হতে থাকা জলে আলতা-পরা পা ডুবিয়ে খাবার দিচ্ছে মাছদের। ওদিকে যাবার সাহস হয় না আর। ঘুরে ছেলেদের ঘাটে গিয়ে উঠতে উঠতেই এইসব ভোজবাজি মিলিয়ে যায় যেন। রাজা-রাণী, পাইক বরকন্দাজ সব ভোঁ ভাঁ। ছেলেদের ঘাট থেকে উঠে, সোজা শিবমন্দিরের দরজা। খাঁ খাঁ করছে চাতাল। ঢিবির ওপরে উঠলে দেখতে পায় পেছনে একটা নারকেল গাছ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মলিন সিংহদুয়ার। না রাজা, না রাণী। এমনকি রাণীর রাজহাঁসগুলোও বেপাত্তা। চারাগুলো পুঁতে এসে, নিজেকেই রাজা মনে হতে থাকে হ্যালোর। রাজবাড়ির শিবমন্দিরের পাশে ঝাপড়া জবাগাছে লাল জবা ফুটে আছে অগুনতি। তার থেকে দুটো জবা ছিঁড়ে নিয়ে দু-কানে গুঁজে নিতে নিতে নিজেকে মুকুট পরা রাজা মনে হয়। রাজবাড়ি দিঘির জল সোনালি হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। কিছু পাতিহাঁস ছেড়ে দিয়ে গেছে কেউ। মেয়েদের ঘাটের কাছে ময়লা এসে ঠেকেছে। তার মধ্যেও ফুল ফুটিয়ে বসে আছে কিছু কচুরিপানা। হ্যালো মনে মনে ভাবে, কাল কচুরিপানার মুকুট পরবে ও।


— এই জেলা পরিচিতই ছিল থ্রি টির জন্য, বুঝলা! থ্রি টি মানে টি, টিম্বার, টোব্যাকো। জেলার সমস্ত চা বাগানের অফিস ছিল এই শহরে। এখন চায়ের ব্যবসা তো লাটে, জঙ্গলও সাফ, তামাক চাষ না-করার জন্য শুনি এখন অন্যান্য সবজির বীজ বিনা পয়সায় দিচ্ছে সরকার।
থেমে থেমে বহু কষ্টে কথাগুলো বলেন মজুমদার মশাই। এই শহরের সবাই একডাকে স্যার বলে চেনে মজুমদার মশাইকে।
— কিন্তু স্যার, যে জমিতে যেটা স্বাভাবিক ভাবে হয়, সেটা কেন বন্ধ করতে চাইবে সরকার! হ্যাঁ তামাক নেশার জিনিস সেটা মানছি। তা বলে নেশাটাকে তো বন্ধ করা হচ্ছে না। তামাক চাষ না হলে তামাক আমদানি করবে সরকার, সেটার দাম আরও বেশি পড়ে যাবে।
— সেইটাই তো খেলা। প্রকৃতিকে উলটায় দেওয়ার খেলা। এটাই তো চলতেছে। এখন তো শুনি কাগজে লেখে থ্রি টি মানে, টি, টিম্বার, ট্যুরিজম। এই ট্যুরিজম আবার ধ্বংস করতেছে জঙ্গলকে।

এই বাড়িতে আসতে খুব ভালো লাগে হ্যালোর। চারদিকে গাছপালা-ঘেরা বাড়িটি নিচু হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে প্রায়। চারচালা টিনের হলুদ রঙের বাড়িটায় একটা জংলা গন্ধ লেগে থাকে সব সময়। তার সঙ্গে যোগ হয়, একেক দিন একেক ফুলের গন্ধ।
বাবুপাড়া থেকে শহরের ছেলেদের স্কুলের মাস্টার শুভ্র রক্ষিতকে নিয়ে এই বাড়িতে প্রায়ই আসে হ্যালো। আসা যাওয়ার সময়টুকু শুভ্র মাস্টার বন্ধুর মতো গল্প করতে করতে সময় পার করে দেন। তখন ইচ্ছে করে সোজা পথে না এসে, অনেকটা ঘুরে ঘুরে মাস্টারকে নিয়ে আসে হ্যালো। এই সব কথাবার্তায় হ্যালোর অনেক পুরনো কথা বেরিয়ে পড়ে মাস্টারের কাছে। মাঝে মাঝে তিস্তার বাঁধেও নিয়ে যায় শুভ্র মাস্টারকে। মাস্টারের একটা পা একটু ছোট বলে ভালো করে হাঁটতে পারে না। সবাই বলে ল্যাংড়া মাস্টার। খুব মায়া হয় হ্যালোর। এমনিতেই শহরে টোটো এসে যাবার পর থেকে রিক্সায় লোকে কম চড়ে। টোটোতে হুস করে চলে যাওয়া যায় এপাড়া থেকে ওপাড়া। শুভ্র মাস্টারের মতো নিঃসঙ্গ মানুষেরাই শুধু রিক্সা খোঁজে। এক জায়গায় গিয়ে রিক্সাওয়ালাকে বেশি পয়সা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে, ফেরার সময় যাতে অসুবিধে না হয়।
খুব গোনাগুনতি কয়েকটা জায়গায় যান শুভ্র মাস্টার। প্রতি রবিবার আসেন্ এই অধ্যাপক মজুমদার মশাইয়ের কাছে। মাস্টার যতক্ষণ এখানে থাকেন, হ্যালোর বসে থাকা ছাড়া কোনো কাজ থাকে না। মজুমদার মশাইয়ের বাগানে ঘুরে ঘুরে তখন আগাছা পরিষ্কার করে দেয় হ্যালো। কিছু কিছু গাছের ডাল ভেঙে নেয় অন্য কোথাও লাগাবে ব’লে। কিছু গাছের বীজ, চারা যোগাড় করে। আবার অন্য কোথাও ভালো চারা পেলে এই বাগানে লাগিয়ে যায়, নিজে থেকেই। শুভ্র মাস্টারের জন্য ভেতর বাড়ি থেকে চা এলে, হ্যালোর জন্যও আসে এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট। চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে খেতে বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসা দু-জন স্যারের কথাবার্তা শোনে হ্যালো। একজন প্রায় অন্ধ, আরেকজনের পায়ে ডিফেক্ট। দু-জন অসমবয়সী বন্ধু যেন, কত কী এদের আলোচনা। সবটা বোঝার ক্ষমতাও নেই হ্যালোর। তবু এটুকু বোঝে, সব পড়াশোনার আলোচনা।
শুভ্র মাস্টারের প্রতি একটা মায়ার টান অনুভব করে হ্যালো। যেমন টান অনুভব করে রাস্তায় রাস্তায় নিজের লাগানো গাছগুলোর ওপর। শুভ্র মাস্টার এই শহরের মানুষ না হলেও জানতে চান শহরটাকে, এ-কথা বুঝতে হ্যালোর অসুবিধে হয় না। এই মজুমদার স্যারের বাসায় যখনই আসেন, হাতে একটা ডাইরি পেন নিয়ে আসেন শুভ্র মাস্টার। মজুমদার স্যারের কথাগুলো খসখস করে লিখে নেন। যেমন এখন লিখে নিচ্ছেন। মজুমদার সাহেব রাশিয়া টাশিয়া কী সব বলছে।
— সোভিয়েত পড়ে গেল আর ভারতের চায়ের বিরাট অংশের ক্রেতা নষ্ট হয়ে গেল।
— এখন তো শুনছি ইরাক নিচ্ছে। ভাঙা সোভিয়েতের কিছু কিছু দেশও নিচ্ছে।
— সে আর কতটুকু! ইরাক বেশির ভাগ চা বরাবর শ্রীলঙ্কার থেকে নেয়। পৃথিবীর ইতিহাস দেখতে গেলে দেখবা সবাই সবার সঙ্গে কোনো না কোন ভাবে এক সুতায় বাঁধা। কোথায় কোন সোভিয়েত ভাঙল, আর আমাদের চায়ের ব্যবসার কোমর ভেঙে দিয়ে গেল।

একটু বেশি কথা বললেই হাঁপাতে থাকেন মজুমদার মশাই। জল খান। এই বারান্দার টেবিলে জল ঢাকা দেওয়া থাকে সব সময়। সন্ধ্যা হতে হতে মশার ঝাঁক ঘিরে ধরে হ্যালোকে। বাগানটা অন্ধকার হয়ে আসে। টুক টুক করে এইবার ফুলগুলো ফুটবে, গন্ধ পায় হ্যালো। শুভ্র মাস্টারও উঠে পড়েন এই সময়। তাকে পৌঁছে দিয়ে হ্যালো যাবে রাজবাড়ি পাড়ার রিক্সা স্ট্যান্ডে।


রাস্তায় নীল ওড়না সাদা সালোয়ার কামিজ পরা দুটো মেয়ে।
— অ্যাই রিক্সা যাবা?

ওরা কোথায় যাবে, হ্যালোকে বলে দিতে হয় না। স্কুলের ড্রেস দেখলেই বুঝতে পারে কোন স্কুল। যখন আসাম থেকে এসে প্রথম রিক্সা চালানো শুরু করেছিল, তখন এসব জানত না – সাদা লাল কোন স্কুল, সাদা সবুজ কোন স্কুল বা সাদা নীলই বা কোন স্কুল! জিজ্ঞেস করে বসত, আর বিরক্ত হ’ত মেয়েরা। এখন সবই জানে। তখন উঁচু ক্লাসের মেয়েরা স্কুলে শাড়ি পরত। সাদা শাড়িতে লাল, নীল, সবুজ কমলা পাড় দেখে বুঝতে হ’ত কোন স্কুল। এখন সব স্কুলে উঁচু ক্লাসে সালোয়ার কামিজ পরা মেয়ে। এদের দেখেই বুঝেছে দোলনা পুলের পাশের স্কুলে যাবে।
মুখে কিছু না বলে ইউটার্ন নিতে নিতে রিক্সার হর্নটা প্যাক প্যাক করে বাজাতে বাজাতে মুখে হ্যালো হ্যালো বলার অভ্যেস ওর। যারা ওকে চেনে জানে, এই স্বভাবে অভ্যস্ত, তারা ওকে হ্যালো বলে ডাকে আজকাল। ওদের দোষ নেই, নিজের আসল নাম যে বাবু মণ্ডল সেটা ভুলে গেছে হ্যালোও। হ্যালো হ্যালো বলতে বলতে ওদের সামনে দাঁড় করিয়ে নেয় রিক্সাটা।
ওকে ভালো করে দেখে, একটা মেয়ে আরেকজনের ওড়না টেনে ধরে। রিক্সায় না উঠে সোজা হাঁটা লাগায় মেয়ে দুটো। হ্যালো শুনতে পায়, একটা মেয়ে ফিসফিস করে আরেকজনকে বলছে
— উঠিস না। এটা পাগল।
রিক্সার আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখে হ্যালো। ওকে কি পাগলের মতো দেখতে! বেশ তো লাগছে, চুলটা পাতলা হয়ে এসেছে, সামনের দিকটায় দু একটা মাত্র চুল দিয়ে টাকটা ঢাকা যায় না। তা না যাক, বাকি চোখ মুখ তো খারাপ নয় ওর। মাথার ফেট্টিটা টাইট করে বেঁধে তাতে ফুল গুঁজে মুকুটের মতো পরা। চোখা চোখা নাক চোখ মুখে এই বেশে, ওকে তো বেশ কেষ্ট ঠাকুরের মতোই লাগছে। রিক্সার হ্যাণ্ডেলে একটা গোলাপি মুসাণ্ডা গুঁজেছে। সেই যেদিন রাজবাড়ির পুকুর থেকে রাজহাঁসের সঙ্গে সাঁতার দিয়ে উঠে কানে জবাফুল গুঁজেছিল, পরদিন কচুরিপানা ফুল! সেই থেকে রোজই মাথায় কানে ফুল গোঁজার অভ্যেস হয়ে গেছে। তখন মাথায় চুল ছিল অনেক, এখন প্রায় টাক। তখন রাজবাড়ির দিঘির পাড়টা একটা ছোটখাটো পাহাড়ের মতো লাগত। এখন সেই পাহাড়ের মাথা সমান করে সেখানে পার্ক হয়েছে। বেঞ্চ বসেছে। রাজবাড়ির দিঘি রেলিং দিয়ে ঘেরা। সিঁড়িতে পাথর বসিয়ে ঝকঝকে করে দিয়েছে সরকার। মন্দির, ঘাট সব নতুন মনে হয়। পায়ের নিচে একটুও বালি লাগে না, মাটি লাগে না, সবটাই সিমেন্ট।
বৌদির বেড়ার চায়ের দোকান এখন ভোজবাজির মতো হাওয়া। সেখানে ঘোরানো গেট। শুধু ডালপালা ছাঁটা অশ্বত্থের গাছটা একা একা বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে দেখে খুব কষ্ট হয় হ্যালোর। আশপাশের গাছগুলো সব কাটা পড়েছে। একা হয়ে গেছে বেচারা। ওর ছানাপোনাও আর গজায় না। গজাবে কী করে! মাটি কই! দেওয়ালের ফাঁকফোকর কই! সাপেদের গর্ত কই! সব উবে গেছে ভোজবাজির মতো।
পুকুরের উল্টোদিকে যে অশ্বত্থের চারাগুলো পুঁতে এসেছিল হ্যালো। তার মধ্যে একটা ডাগর ডোগর হয়েছে। বাকিগুলো মুড়িয়ে খেয়ে গেছে গরু-ছাগলে। সেই অশ্বত্থের চারা থেকে প্রথম গাছ পোঁতা শুরু। তারপর থেকে যেমন নিজেকে সাজায়, তেমনি যেখানে সেখানে গাছ পোঁতে হ্যালো। নেশার মতো গাছ পোঁতে।
সরকার সরু রাস্তা ভেঙেচুরে নতুন রাস্তা করেছে। রাজবাড়ির সিংহদুয়ার আর মলিন নেই। রঙ করে, আলো দিয়ে ঝকঝকে করে দিয়েছে। চারদিকে খালি আলো আর আলো। সিংহদুয়ার মাঝখানে রেখে আরেকটা রাস্তা এখন। দুটো রাস্তার মাঝখানে সামান্য মাটি। সেখানটাই হ্যালোর বাগান এখন। হ্যালো সারাদিন রিক্সা নিয়ে ঘোরে, এদিক থেকে ওদিক, আর চোখ রাখে কোন বাড়ির বাগানে কী গাছ পাওয়া যায়! এমন কী গাছ, যা গরু ছাগলে মুখ দেয় না! রঙিন কচু গাছ! লিলি ফুলের গাছ! সব তুলে তুলে এনে দুই রাস্তার মাঝখানে সাজায়। একা, ডালভাঙা অশ্বত্থের কষ্ট দেখতে পারে না হ্যালো। ওকে দেখে লোকে পাগল ভাবে! ভাবুক। নিজেকে রাজা ভাবে ও।


গাছেরও প্রাণ আছে। শুভ্র মাস্টার একদিন বলেছে ওকে। গাছের গোড়ায় বিষ ঢাললে গাছ মরে যায়। শহরের রাস্তার দু-ধারে মাথার ওপর ছাতা হয়ে থাকা বড় বড় শিরিশ গাছগুলোকে একটার পর একটা শুকিয়ে মরতে দেখছে হ্যালো। তারপর কাটা পড়ছে গাছগুলো। বিষ দিলে গাছ মারা যায় একথা এখন আর কারো জানতে বাকি নেই। তবে গাছের যে প্রাণ আছে হ্যালো জানত সেই ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলায় সবাই বলত রাতে গাছেরা ঘুমায়। তখন ফুল পাতা ছিঁড়তে নেই। সন্ধ্যেবেলা তুলসীতলায় প্রদীপ দেখিয়ে বাতাসা খাইয়ে তুলসীগাছকে ঘুম পাড়িয়ে আসত আশেপাশের বাড়ির সব মা-কাকিমারা। সেই থেকে রাতে কোনো গাছের ডালপালার সঙ্গে ঘষা খেলেও হ্যালোর মনে হতো ওদের ঘুম ভেঙে গেল বুঝি। সন্ধ্যেতে শাঁখে ফু দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত পাখিরা ঘরে ফেরে। গাছের ডালে ডালে নিজের নিজের জায়গায় গিয়ে ঘুমে ঢোলে পাখিরা। তখন গাছেরাও ঘুমোয়। কিন্তু একটা কথা হ্যালো জানত না, শুভ্র মাস্টারের কাছেই প্রথম জানল, গাছেদেরও রান্নাঘর আছে। পাতায় পাতায় সূর্যের আলোয় খাবার বানায় গাছেরা। চোঁ চোঁ করে মাটি থেকে জল খায়। কিন্তু ঘুমের মধ্যে ওরা ফুল ফোটায় কী করে! যেমন করে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে মানুষ, গাছের স্বপ্নগুলো কি ফুল হয়ে ফোটে? নিশ্চয় তাই। হ্যালো একটা স্থির বিশ্বাসে আসতে পারে।

রিক্সায় যেতে যেতে শুভ্র মাস্টার বলেন — এই যে রোজ গাছের ডাল ভেঙে রিক্সায় লাগাও, ফুল গোঁজো মাথায়, এগুলো কেন ছেঁড়! গাছেরও তো প্রাণ আছে। ওদেরও ব্যথা লাগে। এদিকে গাছ লাগাবা, ওদিকে ডালও ভাঙবা, সেইটা কেমন!
— আপনে নখ কাটেন না মাস্টার? চুল? কাটেন না? ব্যথা লাগে? গাছদেরও লাগে না। ভগমান ওই ভাবেই তৈরি করসে ওদের। ব্যথা লাগলে আমি ঠিকই বুঝতে পারতাম। অত ভোদাই না।

হ্যালোর যুক্তির কাছে থতমত লাগে শুভ্র মাস্টারের! হ্যালোকে বোঝাবেই বা কেমন করে! তিনি নিজেও তো জানেন না গাছেদের ব্যথা লাগে কি লাগে না। হ্যালোর চুল আর নখের উদাহরণে নিজেই ভোদাই হয়ে যায় শুভ্র মাস্টার।
শুভ্র মাস্টারকে নিয়ে নদীর উঁচু বাঁধে ঠেলে ঠেলে রিক্সা ওঠায় হ্যালো। নদীর বুকে হালকা একটা আলো জেগে ওঠে এই সময়, বুজে-যাওয়া নদীর মধ্যেখানের সবুজ ঝোপ কালো হয়ে আসে। পাশ দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া সোঁতায় নৌকা ভাসে। নৌকার রঙ বোঝা যায় না। সমস্তটাই ছাই রঙ দিয়ে আঁকা ছবির মতো মনে হয়। রিক্সা থেকে শুভ্র মাস্টারকে ধরে ধরে নামিয়ে বসিয়ে দেয় অমলতাস গাছের তলায় কাঠের বেঞ্চে। এদিকের ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো জ্বলে উঠলে ওদিকের ছাই রঙা ছবিটা আরও ফিকে হয়ে যায়। হলুদ ফুলের পাপড়িগুলো আরও বেশি হলুদ লাগে আলোতে। আলো থেকে সরে রিক্সার সিটে হেলান দিয়ে বসে, একটা বিড়ি ধরায় হ্যালো। ঘুমিয়ে পড়া নদীর রঙ ছাই বর্ণ থেকে কালো হয়ে ওঠে। নদীর স্বপ্নগুলো জোনাকি হয়ে জ্বলে। আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো হাজার হাজার জোনাকি অমলতাসের ঝুরো পাপড়ির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে থাকে। বেঞ্চটাও গাছ হয়ে যায়। সূর্যের আলোয় রান্না করে খাবার, মাটি থেকে চোঁ করে টেনে নেয় জল। হাত পা ছড়িয়ে মৃত বেঞ্চ গাছ হয়ে স্বপ্ন ফোটায়। হ্যালো চিনতে পারে এটা গামারি গাছ। পাতাহীন গাছে সোনার ফুলে ছেয়ে যায়। ফুল থেকে ফল হয় সোনার বর্ণ। সমস্ত দিক সোনালি হয়ে যেতে থাকে।
একবার ছাইবর্ণ নদী, আরেকবার গামারি গাছের কোলে শুভ্র মাস্টারকে দেখতে দেখতে, শুভ্র মাস্টারকেও অমলতাসের একটা ভাঙা ডাল বলে মনে হয় হ্যালোর। অমলতাসের ভাঙা ডালটা বেঞ্চের ওপরে স্থির। তাকে ঘিরে সোনালি পরীরা হাত ধরাধরি করে নাচে। দূরের অন্ধকারে আগুনের স্ফুলিঙ্গরাও এলোমেলো নাচ করে।

মনে মনে সারা শহরের রাস্তাঘাট, মাঠ, নদীর চর, খালি জমির কথা ভাবতে থাকে হ্যালো। এই অমলতাসের ভাঙা ডালটাকে কোথায় পোঁতা যায়, কোথায় পোঁতা যায়, ভেবে ভেবে তোলপাড় হয়ে যেতে থাকে হ্যালোর মন। এতবড় শহরে অমলতাসের ভাঙা ডালটার জন্য এক ফোঁটা জমিও কি খুঁজে পাওয়া যাবে না! ভাবতে ভাবতেই, উঁচু বাঁধ থেকে নিচে শুকিয়ে যাওয়া নদীর অস্পষ্ট সোঁতায় একফালি চাঁদ নৌকা হয়ে ভেসে ওঠে। সোঁতার জল বাতাসে থিরথির করে কেঁপে কেঁপে চাঁদটাকে ভেঙে ভেঙে জলে সোনালি রঙ গুলে দেয়। আকাশের ওপর আরেকটি চাঁদ চাঁপাফুলের পাপড়ির মতো বাঁধের শেষ প্রান্তের ঝাপড়া গাছটায় এসে আটকে থাকে। অমলতাসের ভাঙা ডাল নড়ে চড়ে উঠে বসে হ্যালোর অলৌকিক রিক্সায়। প্যাডেলে চাপ দিয়ে ব্রেক ধরে রাখে হ্যালো। উঁচু বাঁধ থেকে এবার তরতর করে নিচের দিকে গড়িয়ে যাবে চাকা।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)