
মৌপিয়া মুখার্জী-র কবিতা
উত্তর অধিকার
মহিলা কবিদের একটা ইতিহাস থাকে।
আপনি হাসলেন।
আমাকে আপনি চিনতেন, বলেননি-
আমিও চিনি আপনাকে।
কোথায় কোন পত্রিকায়,কখন, কবে,…
ঠিক আপনার মতোই একজনকে, এই তো সেদিন-
জিন্স-টপে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন।
আপনার কবিতায় বারবার নীল রঙের শাড়ি, পশ্চিমের ঘর, জোটবদ্ধ বিয়োগ আর
অক্টোবর মাস, আপনি এরপর কাঁদবেন-
আপনার হাতের বাদ পড়তে পড়তে টিকে যাওয়া শিরায় আমার সদ্যমুক্ত বই।
আপনাকে আমি কাঁদতে দেখছি, সেই আপনি
যিনি আইনী বিচ্ছেদের সন্ধেয় আমায় সই করে দিলেন উত্তরাধিকার।
অথচ, আপনি স্বীকার করলেন না।
‘যেকোনো একটা চাকরি’ খুঁজে হন্যে হওয়া বাংলা কবি-
পুরস্কার তালিকায় আপনার কবিত্বের পূর্বে অনড় ঐ একঘেয়ে ‘মহিলা’ শব্দটি জানে-
এই বইমেলার ভিড়ে আমাকেও আপনি ইতিহাস দিয়ে যাবেন!
পার্থিব
বহু আলোচনার পর তুমি সিদ্ধান্তে এলে-
নির্ঘাত আমার মনের অসুখ।
কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ, গোধূলির আকাশ, কোজাগরী রোদ্দুর, এমনকি-
তিতিরদের বাড়ির পাশের মজে যাওয়া পুকুরেও আজকাল ভাসতে দেখা যায়
আমার মনের অসুখের সপক্ষে অসংখ্য প্রমাণ।
অতএব একদিন, ঐ পুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে
আমি সরাসরি পৌঁছে গেলাম মন সারানোর ওষুধ আনতে।
অন্তত তিনি বুঝবেন জলের নিচে কতখানি শব্দ শোনা যেত,
ইচ্ছে থাকলেই-
তুমি তো বোঝনি, এই তীব্র অভিমান নিয়ে
তাঁর সমস্ত প্রশ্নের উত্তরে আমি মেঘলা হয়ে থাকলাম, ক্রমাগত।
ফেরার ঠিক মুহূর্ত পূর্বে বলে এলাম-
তোমার মতন মানুষ হয় না, তুমি বলেই আমার সঙ্গে…
বৃষ্টি নামবে।
আমি ছাতা হয়ে যাচ্ছি তোমায় বাড়ি ফিরিয়ে নিতে…
সংকেত
বাবা চলে যাওয়ার দিন আমাকে জড়িয়ে ধরে
মা কেঁদেছে।
আমাকে জড়িয়ে ধরে-
আমাকে।
যোগ্যতম সন্তান হিসেবে সেদিন থেকেই
আমার গর্ব বোধ হয়!
আহত
তোমাকে পাওয়ার ভিড়ে আকণ্ঠ ভয় সব
গিল নেব-
দোলপূর্ণিমা হবে গ্রহণের চাঁদ।
শব্দকল্পভিত, প্রস্তর বালি-
অযাচিত অভিমান সমূলে বিনাশ করি-
নিজেও নিজেকে-
জপমালা হাতে যদি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখো-
বুঝে নাও আভরণে-
ধামাচাপা পড়ে গেছি, তোমার
বিবাহকাল থেকে!
মাটি
আবার বুঝি মন ভেঙেছে?
মন তো আমার তোমার মতোই
মাটির থেকেও শক্ত বেশি-
নরম না তো? সকাল থেকে সমার্থকে
ভুল করেছি, ভুল করেছি বৃষ্টি এলে
তোমার জন্য কারোর চোখে যেই না সেদিন জল দেখেছি-
দেরাজ ভেঙ্গে হাতড়েছিলাম সমুদ্রটা-
ঢেউগুলো ঠিক বুঝতে পারে কার কতটা ঘর জমেছে
বুকের ভাঁজে।
কেবল তোমার তেষ্টা পেলে আগল ভাঙ্গা বন্যা হয়ে
ভাসতে জানি, আমিই জানি-
শুনছ? কেবল আমিই জানি-
জলের দামে হারছে তোমার আমায় ছাড়া জীবনখানি!
উজান
আজ শুধু ঘুম আসে-
ভয় হয়-
জেগে আছি ভেবে
তুমি চলে যাবে দায়ভার দিয়ে!
লিপি
কিছু কিছু গান শুনে মনে হয়
এই তো অমন সুর, সেই লয়, শব্দ-
আর কিছু না ছুঁয়েও কেটে যাবে বাকিটা জীবন-
তুমি তো দাঁড়িয়ে দেখো, বোকা মেয়ে এই গান
বদলে ফেলবে কাল সহজেই-
ভুলে যাবে প্রিয় সুর, যদি তুমি
বেসুর শোনাও!
অথৈ
স্বপ্নে এলি স্বপ্ন হয়ে,
ঘুম পাড়াব আদর বয়ে
কষ্ট পেয়ে ফুরোস না তুই
আলতো মিহি-
শীত করে তোর আমার কাছে?
এই দুহাতে যে ‘তুই’ আছে
সবটুকু হোক তার চাদরের
জবাবদিহি।
যাত্রীকাল
তোমার জন্য জমিয়ে রাখি
খুচরো করা এক একটা দিন
আর সেদিনের হঠাৎ দেখায়
সংকুচিত, যাত্রীবিহীন-
সেই স্টেশনে আগেও আমি
থমকে গেছি ওভারব্রিজে,
একটা টিকিট দুহাত পেতে
আরেকটা দাম জোটায় নিজে-
লাইনচ্যুত হলেই বা কী
হাত দেখাব লাল নিশানায়
খবর পড়ব পুনর্জন্মে
যুগল বাঁচল দুর্ঘটনায়-
তোমার জন্য পাশের সিটে
জায়গা রেখে
একশো বছর ধরে আমি ডাকছি দেখো রেলগাড়িকে…।
আস্বাদন
আমাদের ঘর আছে।
আমাদের প্রতিরাত ঘুম আসে।
আমাদের পাশ ফিরে স্বপ্নের রোদ্দুর
ছোঁয়া দেয়, পশ্চিম অবধি।
এরপর মেঘ করে এলে
তোমাকে আভাস দেবো অনায়াস নিঃশ্বাস-
এইসব যোগফলে বেঁচে থাকা যাবে-
আরও, অনন্তকাল।
গ্রহণ
এভাবে কী আর থেকে যাওয়া যায়-
ঘনঘোর দুর্যোগ!
তুমি তো জানতে এভাবেই ঠিক
থেকে গেছিলাম রোজ!

