
মোহনা মজুমদার-এর কবিতা
পাখি
কতগুলি শূন্য একত্রে উড়ে গেল। এখন এই কসমোপলিট স্নায়ুমুখে জন্মজল খুলে রাখি। স্নানের গন্ধ, নীরব চেটে খাই। তীব্র আলো, কী অসীম প্রণয়ে তৃণের দেহে ঝাঁপিয়ে পড়ে!
ডোরবেল বেজে ওঠে। দুপুর আসে, শ্রান্ত পায়ে। যে আলোর কোনো ধর্ম হয় না, তার জন্য রোদ্দুর হবো। এ কথা মনে মনে ভাবলে সিক্ত হয়ে ওঠে অন্ধবালক। কে হেঁটে যায়? কেই বা পিছু নেয়? ফিরেও তাকায় না সে। ওগো ঈর্ষাকাতর, ওড়না দিয়ে ঢাকো যৌনক্ষুধা। ওই দ্যাখো গোপন রাত্রি ছুটে আসছে। এক্ষুনি আত্মসাৎ করবে সবটুকু নিদ্রা। হেরে যাওয়া মানুষ যেভাবে তার বুকের ভেতর ছেঁড়া সুতো বেঁধে রাখে, একদিন ছিঁড়ে যাবে জেনেও।
তারপর হঠাৎই একদিন ছুটে আসা বন্ধ হয়ে যায়।তুমি উপলব্ধি করতে শুরু করো, এই ক্ষুধা এবং ছুটে আসার অন্তরালে একটি মৃত পাখি কিচিরমিচির করে চলেছে আজীবন।
অন্তরযান
অলাতচক্রে বিলাপ এবং মেলানকোলিকে
আলিঙ্গন করতে দেখে একদিন হেসে উঠেছিল ঝড়
‘আমাকে ছাড়া এ পথে মুক্তি নেই তোর!’ বলে
নিশ্চুপে লেহন করে গেছিল পাপড়ির অস্থি
এরপর আর দূরবীনের ভাবনাগুলো খুলে দেখেনি কেউ-
বলেছিল, ত্যাজ্য করবে শিহরিত নক্ষত্রের আলিঙ্গন
দেহ ও সঙ্গমের অব্যবধানে তুমি এক চক্ষুহীন কবিতা
হেমন্ত শেষের সন্ধ্যায়, এসো, উষ্মা মাখো ভ্রমর
নদীর তীরে আজ বিদ্ধ হবে তার নিথর বিবাহসাজ
কীভাবে বলবে, আমাদের সংসার ছেড়ে চলে গেছে অন্ধ সিলুয়েট?
ওলটপালট ভলক্যানোর মুখের দিকে চেয়ে আছে অবচেতন,
চিত্রনাট্যে যেটুকু ঘুম সন্ত্রাসবাদের জন্য সম্মত হয়, ততটুকুই আমাদের আবহসঙ্গীত
এমন লজ্জারহিত প্রণয়ক্ষনে প্রতিশোধের আংটি পাশাপাশি রাখি
দেখি
নিরীহ চাঁদ আমার
আগুন হাতে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে
জ্যোৎস্নার কুটিরে…
কালী
মেয়েটি এল লিখতে নতুন, শিক্ষিতা আর সুন্দরী
বাজারে এসেছে নতুন, চল ওই মেয়েটার পেছনে পড়ি
মোদোমাতাল, দুশ্চরিত্র বাপের বয়সি লোক
তবুও আমি পুরুষমানুষ, মেয়েবাজিতে আমার ঝোঁক
ও মেয়ে তুই ‘না’ বলবি? সাহস কত বড় তোর ?
চিৎকার কর, পুলিশ ডাক, উকিলের চিঠি দে
তারপর দ্যাখ কি করি আমি তোর
কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না আমার
কারণ আমি ডন
‘গাড় মেরে রেখে দেবো তোর!’
এসব আমার এক চুটকির ফোন
আগেও টেনেছি ইজ্জত
যদি না রাজি হয়েছে কেউ
মেয়েটি শুধু করেছিল প্রতিবাদ
তারপর একে একে শুরু হল খেলা
এ আই বানালো রকমারি নথি
শুরু হল ব্ল্যাকমেইল, হেনস্থা আর বুজরুকি
ভেবেছিল এসবে ভয় পেয়ে, মেয়েটি যাবে ফিরে
হাতে পায়ে বলবে ধরে
বন্ধ কর এসব, আমি রাজি তোমার প্রস্তাবে
হায়রে বিকৃত মস্তিষ্কের সারমেয়নন্দন
জিভ বের করে চারপায়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবিস
নারী এতই সস্তা, এতই ঠুনকো
ঘেউ ঘেউ করবি যত, হাসবেন অন্তর্যামী
পাপের ঘরা পূর্ণ হলে
ওই দ্যাখ অসুর, মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে
খর্গ হাতে নির্যাতিতা কালী


নারী দিবসে প্রকাশিত মোহনা মজুমদারের তিনটি কবিতা— ‘পাখি’, ‘অন্তরযান’ এবং ‘কালী’—এক গভীর এবং বহুমাত্রিক জীবনবোধের পরিচয় দেয়। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেম, দার্শনিক নিঃসঙ্গতা এবং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
’পাখি’ কবিতায় কবির জীবন ভাবনা এক পরাবাস্তব ও দার্শনিক রূপ নিয়েছে। এখানে জীবন মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং এক অনন্ত শূন্যতাকে বয়ে বেড়ানো। যেমন—
অপ্রাপ্তির বেদনা: “কতগুলি শূন্য একত্রে উড়ে গেল”—এই পঙক্তিটি জীবনের নিঃস্বতাকে চিহ্নিত করে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর প্রাপ্তির মাঝে যে ব্যবধান, কবি তাকেই তুলে ধরেছেন।
মৃত চেতনার দীর্ঘশ্বাস: ক্ষুধার আড়ালে যে “মৃত পাখি কিচিরমিচির করে”, তা আসলে আমাদের অপূর্ণ ইচ্ছা বা মৃত স্বপ্নের প্রতীক। কবি মনে করেন, মানুষ জেনেবুঝেই তার বুকের ভেতর “ছেঁড়া সুতো” বেঁধে রাখে, অর্থাৎ ধ্বংস অনিবার্য জেনেও সে মায়ার টানে জীবনকে আঁকড়ে ধরে।
’অন্তরযান’ কবিতাটি কবির চেতনার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণের দলিল। এখানে প্রেম কেবল আনন্দ নয়, বরং এক নিরন্তর দহন ও বিলাপের নাম। যেমন—
সম্পর্কের নিঃসঙ্গতা: কবি সম্পর্কের ভেতরেও এক ধরণের বিচ্ছিন্নতা বা “অন্ধ সিলুয়েট” খুঁজে পান। দেহ ও সঙ্গমের ঊর্ধ্বে এক ধরণের আধ্যাত্মিক বা মানসিক হাহাকার এখানে ফুটে উঠেছে।
প্রকৃতি ও দহন: “অলাতচক্র” (আগুনের চাকা) বা “ভলক্যানো”র মতো শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি জীবনের ভেতরের অস্থিরতা ও ধ্বংসাত্মক প্রেমকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে প্রণয় এবং প্রতিশোধ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে ‘কালী’ কবিতাটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক এবং সরাসরি প্রতিবাদী। এখানে কবির জীবন ভাবনা অনেক বেশি লড়াকু এবং বাস্তবমুখী। যেমন—
পুরুষতন্ত্রের নগ্ন রূপ: ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ পুরুষ সমাজ যখন নারীকে কেবল ভোগের বস্তু মনে করে এবং আধুনিক প্রযুক্তি (AI) ব্যবহার করে হেনস্তা করে, কবি তাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন।
নারীর জাগরণ: কবি বিশ্বাস করেন, নারী কেবল “সস্তা” বা “ঠুনকো” কোনো সত্তা নয়। সহ্যশক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেলে সেই নির্যাতিতা নারীই সংহারী ‘কালী’ রূপে আবির্ভূত হয়। এখানে কবির জীবন ভাবনা কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত হুঙ্কার।
মোহনা মজুমদারের এই গুচ্ছ কবিতায় জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সংবেদনশীল অথচ নির্মোহ। তিনি যেমন জীবনের সূক্ষ্ম আবেগ এবং শূন্যতাকে চেনেন, তেমনি সমাজের বিকৃতিকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে জানেন। তাঁর জীবন ভাবনায় একদিকে রয়েছে বিষণ্ণতা ও একাকীত্বের বোধ (Melancholy), অন্যদিকে রয়েছে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার অদম্য সংকল্প। তিনি নারীকে অবলা হিসেবে নয়, বরং দহন ও সৃজনের এক মিলিত শক্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন।