
পিয়াল রায়-এর কবিতাগুচ্ছ
অগ্নিহোত্র
১
শিবনেত্র তোমার
বহুদূর দেখে নাও বুঝি
স্বর্গ মর্ত্য পাতাল
ভীষণ সোজাসুজি
তবু কাছাকাছি এসে
বসতে বড় ভয়!
অনারোগ্য, যন্ত্রণা, ক্ষত
বিবিধ সংশয়
গতজন্ম দিয়েছিল এসে
অসুখও দংশনও
এ জন্মে সে শব্দই তাই
পুনঃ পুনঃ শোন
নিজেকে চেনো না তুমি
দেওয়াল ধরে হাঁটো
অসৈরণে বারবার তবু
ব্যথার হাত পাতো
যা চেয়েছ প্রাণেমনে
শূন্য দিয়েছে তুলে
ফিরেছ কি পূণর্ভবা
পূর্বজন্ম ভুলে?
২)
কতদিন হল বাইরে বাইরে হাঁটছ
এবার একটু ভিতরে এসে বোসো
দগ্ধ হয়ে আছ বড়, শীতল হও
কর্পূর দিয়েছি পানে, হে ফণীভূষণ,
স্বাদ নাও মায়াবিদ্যার
চরণে মালিশ নাও, জড়িবুটি তেল
ডাকিনী কাজলে আঁকা সম্মোহনী খেল
সিংহাসন নেই, সামান্য চারপাই
মখমলি আসন নেই, হৃদয় পেতে দেব
বড় তাপ, বড় ধুলো মেখে আছ চন্দ্রশেখর
এবার ফেরো…
ফিরে এসো নির্মলে, সত্য এবং ঋতে
কেন এত ভয়, হে মনোময়,
যে আনন্দ দেহাধিষ্ঠিত সে-ও কি রুহময় নয়?
সংকল্পে-বিকল্পে ঘুরলে এতকাল
কী পেলে ঘোর প্রখরতা ছাড়া?
সৃষ্টিতে এস শিব, হিরণ্যগর্ভে এস
সমিধ প্রস্তুত। প্রাণ প্রজ্জ্বলিত হোক।
৩)
কেন অকারণ ছুটে ছুটে যাওয়া?
কেন এত জল চাওয়া – সত্ত্ব রজ তম
কেন এত উষ্ণতা ভিক্ষা অগ্নিহোত্র?
কোনো অতীত শিখিনি আমি
জানলায় বসে শুধু দৌড়ে যেতে দেখি
প্রাণের নিবিড় কোলাহল
ব্যষ্টি যে তার সমস্ত ভেদসহ
সমষ্টি ও পরস্পর ভেদাভেদ রহিত
কিছু তার চৈতন্য কিছু অচৈতন্যে
ভয়াভয় জরতি জড়োজড়ো
আর দুটো একটা দিন
আর দুটো একটা দিন যদি
টিকে যেতে পারি কোনোক্রমে
ভেসে যাওয়া শিখে যাব ঠিক
৪)
ছদ্মবেশে ভেসে বেড়ালে শিব
ভালোবেসে সন্দেহ পুষে
পুড়লে অহর্নিশ… অথচ তোমার
কথা ছিল নীলকণ্ঠ হওয়ার
অথচ কথা ছিল নীলকণ্ঠ হওয়ার
গভীর সাধনপ্রণালী… নিদিধ্যাসন
তবু দেখ পুড়ে গেলে অসত্যে
নেমে গেলে বিশ্বাত্মা থেকে দ্বৈত খণ্ড
বিষয়জবাসনায়
কেন ছদ্মবেশে ভেসে বেড়ালে শিব
অন্তরে একবার উঁকি না দিয়ে
ভূমিবিমুখ ভেসে ভেসে গেলে
যেন আগন্তুক কোনো নিজ আত্মার ভিতর
বসবাস মাত্র দু’দিনের
তারপর আর কিছু নেই
বিরাট এই শূন্যালয়ে নাম রূপ রসাদি
নির্বিশেষ কিছুমাত্র নেই
নিত্য নেই শিব নেই সত্য নেই তুমি নেই
বিস্তৃত তরঙ্গে কেবল ভেদ নেচে নেচে চলে
৫)
আকারে নেই, নিরাকারেও
আমার সৃষ্টি আদি থেকেই নষ্টকল্পনা
আমার চক্ষুতে এই যে পুরুষ দেখা যায়
ইনিই তিনি যিনি দ্রষ্টারূপে দর্শন করেন
আমার মৃত্যু-শোক-ক্ষুধা-জরা-ভয়
কামার্ত বাসনায় সুরারূপে পান করেন
আমার সম্ভ্রম
এই সেই পুরুষ অলঙ্কার ও সুবসনসজ্জিত
ছায়া থেকে ছিঁড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা
বসিয়ে রাখেন জলের ওপর
জলের নিচে থৈথৈ করে আমার সংসার
আমি কৌশল চিনি
কুশলচাতুরী … বিনাশ ইচ্ছা
দেহ অন্ধ হলে প্রতিবিম্ব চক্ষুষ্মান — এ অসম্ভব
ফিরে আসার আগে
মৃত অলঙ্কার, বস্ত্র, গন্ধমালাদি খুলে
পরলোক জয় করে আসি
৬)
স্পর্শ কর আমার ললাট
ওখানে তৃতীয় নয়ন খেলা করে
জমিন-আসমান খেলা করে
জগৎ-সংসার খেলা করে
বড় মধ্যবিত্ত হয়ে আছি
মনের ভিতর গুমরে গুমরে
যা বলার বলি না
কী শুনতে চাই জানিনা
অনাদ্যন্ত পৃথিবীর ঊর্ণনাভ
জাল বুনি বসে বসে
ললাটে হাত রাখ আগন্তুক
ওখানে ভয়াল খেলা করে
ব্যপ্তবীজ খেলা করে
যোগমায়া খেলা করে
আজ মধ্যাকাশে অভিজাত আলো
কণ্ঠিবদল হোক তবে আজ
বাসররাত একা-দোকা একা-দোকা
অদ্বৈত নূপুর বাজাক
ললাটে হাত রাখ দয়িত
কালসর্প ফনা তুলুক
তোমার আমার
৭)
দেখা হয় না কারো সঙ্গে
ভূমিহীন এই নির্বাসন
দিন গুনি রাত গুনি
একে একে ফাঁকা হয় পাড়া
খবর পাই শেষ বাড়িটিও
শিকড় উপড়ে নিয়ে গেছে কারা
কথা বন্ধ
কতদিন যেন হল?
দু একটা ফুল প্রেমে অপ্রেমে
ঝুড়ি ভরে সাজানো বন্ধ
সেও কতকাল?
ধীরে ধীরে রাত নামে
মানুষ ঘুমায়
শুধু একটি জোড়া চোখ
স্নান সারে বিনম্রতায়
৮)
কেন মনে হয় বারবার
কেউ যেন দূর থেকে ডাকছে আমায়
সে কি উগ্রচণ্ড শিব
আমাকে মাথায় নিয়ে নাচে সারাদিন?
তরঙ্গে তরঙ্গ গাঁথে বাসনাবিহীন?
এ ক্রিয়াভূমি ক্রীড়াভূমি-স্বপ্নাবিষ্ট
আমিও ডাকি তাকে শিবাশিব
কেউ নেই কিছু নেই… গুপ্ত আবেশে
সত্যিই কি? সত্যিই কি সে আমাতে জাগ্রত?
আমি জানি এটুকু সাহচর্যই
তাকে ফিরিয়ে দেবে
তার নিভৃতে আমারই অন্য
শোনো পাখি শোনো
কবি ভালোবাসা চায়
ব্যথা চায় চিরতরের কবিতার জন্য
৯)
পাখি, কার কথা ভেবে ভেবে
সারারাত জ্বালিয়েছ আলো
সে কি সেই? সে কি সেই?
বহুদূরে যার মন পড়ে আছে
কী অপূর্ব একাকীত্ব তোমার
কেউ নেই তবু মৃদু ছলাৎছল
জল হয়ে ভেসে ভেসে আসে
যদি থাকত কেউ
সত্য হয়ে? অনন্ত হয়ে?
প্রাণময় জগতের উপাসনা হয়ে?
সুশৃঙ্খল, সুস্পষ্ট হয়ে?
তবুও কি মন দিতে না পাঠে?
দিনের আলোয় বৈচিত্র্যময় তুমি
রাত্রিকালে একীভূত হও
জমাট শিক্ষা করো অরূপবিদ্যার
মন নাও…মন দাও…একাগ্রতার
১০)
শান্ত হও বিধি, স্থির হও
এমন অক্লান্ত তির ছুঁড়ো না
তূণ শূন্য হলে তোমার পৌরুষ
রাখবে কোথায়?
আমাকে ফেরাবার
কোনো আয়োজন করোনি রাজা
এত অন্ধকার গৃহে পা রাখব কোথায়?
কোথায়ইবা রাখব শরবিক্ষুব্ধ হৃদয়?
সমগ্র নগরী আজ আলোময়
আনন্দপানে মশগুল
স্বয়ম্ভু চাঁদ মেলে দিয়েছেন ডানা
কেন তবে গৃহ এত শূন্য দিয়ে ভরে দিলে আজ?
কেন এত যুদ্ধপিপাসু হলে?
রক্তপিপাসু হলে দয়াময় পুরুষোত্তম ?
জিতে যাওয়ার সুস্পষ্ট রীতি নেই কোনো
তবু যদি আজ আগুনে নিক্ষেপ করো
আমি শুদ্ধাশুদ্ধেই জন্মাব আবার

