মাদাম দ্য ব্রেভেসের বিষণ্ণ গ্রীষ্মাবকাশ  মার্সেল প্রস্ত  অনুবাদঃ রাহুল দাশগুপ্ত

মাদাম দ্য ব্রেভেসের বিষণ্ণ গ্রীষ্মাবকাশ মার্সেল প্রস্ত অনুবাদঃ রাহুল দাশগুপ্ত

Marcel Proust (বাংলা উচ্চারণ: মার্সেল প্রুস্ত) বিংশ শতাব্দীর বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। ১৮৭১ সালের ১০ জুলাই ফ্রান্সের অতোইয়ে (Auteuil) জন্ম এবং ১৯২২ সালের ১৮ নভেম্বর প্যারিসে মৃত্যু। তাঁর পূর্ণ নাম ভ্যালঁতাঁ লুই জর্জ ইউজেন মার্সেল প্রুস্ত। আধুনিক উপন্যাসের রূপান্তরে তাঁর অবদান এত গভীর যে জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উল্‌ফ ও ফ্রান্ৎস কাফকার সঙ্গে তাঁকে আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের প্রধান নির্মাতাদের একজন বলে বিবেচনা করা হয়। প্রুস্তের বাবা ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক অ্যাদ্রিয়াঁ প্রুস্ত এবং মা জ্যাঁ ভেইয় ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত, অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক একজন নারী। মায়ের কাছ থেকেই তিনি সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ অর্জন করেন। শৈশব থেকেই তিনি হাঁপানিতে ভুগতেন। এই দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা তাঁকে অনেকটা নিভৃত জীবন বেছে নিতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে একটি কর্ক-আবৃত কক্ষে বসে লিখতেন, যাতে বাইরের শব্দ তাঁর মনোসংযোগে ব্যাঘাত না ঘটায়। প্রুস্তের সাহিত্যজীবনের প্রথম দিকে প্রকাশিত হয় Les Plaisirs et les Jours (১৮৯৬), গল্প ও গদ্যকবিতার সংকলন। পরে তিনি ইংরেজ শিল্পসমালোচক John Ruskin-এর রচনা ফরাসিতে অনুবাদ করেন। এই অনুবাদের মাধ্যমে শিল্প, স্থাপত্য ও স্মৃতি সম্পর্কে তাঁর চিন্তা আরও গভীর হয়। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত Jean Santeuil এবং Contre Sainte-Beuve গ্রন্থে তাঁর সাহিত্যদর্শনের বীজ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রুস্তের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সাত খণ্ডের মহাকাব্যিক উপন্যাস In Search of Lost Time। ১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে এর সাতটি খণ্ড প্রকাশিত হয়; শেষ কয়েকটি তাঁর মৃত্যুর পরে। এই সাতটি খণ্ড হলো— Swann's Way (Du côté de chez Swann, ১৯১৩) In the Shadow of Young Girls in Flower (১৯১৯) The Guermantes Way (১৯২০–২১) Sodom and Gomorrah (১৯২১–২২) The Prisoner (১৯২৩) The Fugitive (১৯২৫) Time Regained (১৯২৭) এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয় স্মৃতি, সময়, প্রেম, ঈর্ষা, শিল্প এবং আত্ম-অনুসন্ধান। বাহ্যিক ঘটনাপ্রবাহের তুলনায় মানুষের অন্তর্জগৎ, স্মৃতির অদৃশ্য প্রবাহ এবং অনুভূতির সূক্ষ্ম পরিবর্তন এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রুস্ত দেখিয়েছেন, মানুষ সময়কে ঘড়ির কাঁটায় নয়, স্মৃতির ভেতর দিয়ে অনুভব করে। প্রুস্তের সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণা হলো অবচেতন বা অনৈচ্ছিক স্মৃতি (Involuntary Memory)। উপন্যাসে একটি ছোট্ট মাদেলেন কেক চায়ে ডুবিয়ে খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শৈশবের বহুদিন আগের স্মৃতি হঠাৎ ফিরে আসে। এই "মাদেলেন মুহূর্ত" বিশ্বসাহিত্যে এক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষের জীবনের সত্যিকারের অভিজ্ঞতা অনেক সময় সচেতন স্মৃতিতে নয়, হঠাৎ জেগে ওঠা ইন্দ্রিয়গত স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। প্রুস্তের ভাষাশৈলী অসাধারণ। তাঁর বাক্য দীর্ঘ, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং সুরেলা। একটি বাক্যের মধ্যে তিনি চরিত্রের অনুভূতি, সামাজিক পর্যবেক্ষণ, দার্শনিক চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে একত্রে বুনে দেন। ফলে তাঁর রচনা দ্রুত পড়ার নয়; ধীরে, মনোযোগ দিয়ে পড়লে তার সৌন্দর্য উন্মোচিত হয়। প্রুস্তের উপন্যাসে ফরাসি উচ্চবিত্ত সমাজের একটি বিস্তৃত চিত্রও উঠে আসে। অভিজাত শ্রেণি, মধ্যবিত্ত, শিল্পী, লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ—সবাই তাঁর চরিত্রজগতের অংশ। কিন্তু এই সমাজচিত্র কখনোই নিছক বাস্তববাদী নয়; বরং স্মৃতি ও অনুভূতির আলো-ছায়ায় রূপান্তরিত এক মানসিক ভূগোল। মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে প্রুস্ত অনন্য। প্রেমকে তিনি সুখের চেয়ে অধিকাংশ সময় অনিশ্চয়তা, অধিকারবোধ ও ঈর্ষার উৎস হিসেবে দেখেছেন। মানুষের পরিচয় তাঁর কাছে কখনো স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী অস্তিত্ববাদী ও আধুনিকতাবাদী সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ১৯১৯ সালে In the Shadow of Young Girls in Flower গ্রন্থের জন্য তিনি ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ প্রি গঁকুর (Prix Goncourt) পুরস্কার লাভ করেন। যদিও তখন অনেক সমালোচক তাঁকে অতিরিক্ত দীর্ঘ ও জটিল লেখক বলে মনে করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। আজ প্রুস্তকে কেবল একজন ঔপন্যাসিক নয়, সময় ও স্মৃতির দার্শনিক হিসেবেও দেখা হয়। সাহিত্যকে তিনি বাহ্যিক ঘটনার বিবরণ থেকে মানুষের অন্তর্জগতের অনুসন্ধানে নিয়ে গিয়েছেন। তাঁর রচনা প্রমাণ করে, জীবনের প্রকৃত অর্থ প্রায়ই লুকিয়ে থাকে আপাত তুচ্ছ অভিজ্ঞতা, বিস্মৃত মুহূর্ত এবং স্মৃতির আকস্মিক প্রত্যাবর্তনের মধ্যে। বিশ্বসাহিত্যে মার্সেল প্রুস্তের প্রভাব অপরিসীম। Samuel Beckett, Vladimir Nabokov, Jorge Luis Borges, Milan Kundera-সহ বহু লেখক তাঁর শিল্পদৃষ্টির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। আজও In Search of Lost Time কেবল একটি উপন্যাস নয়; মানবস্মৃতি, সময় এবং শিল্পের প্রকৃতি নিয়ে রচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে পঠিত ও আলোচিত।

 

সেদিন বিকেলে অনেকক্ষণ ধরেই ইতস্তত করছিল ফ্রাঁসোয়াজ দ্য ব্রেভেস। সে স্থির করতে পারছিল না রাজকুমারী এলিজাবেথের বাড়ি, অপেরা নাকি লিভ্রের নাটক দেখতে যাবে। এক বন্ধুর বাড়ি একটু আগেই সে নৈশভোজ সেরেছে। তখন যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের সকলে এক ঘন্টারও বেশি আগে এই ঘর থেকে চলে গিয়েছেন। এখন কোথায় যাবে, তা সে একা বসে মনস্থির করতে পারছিল না।  ফ্রাঁসোয়াজের সঙ্গে তার বন্ধু জেনবিয়েভেরও ফেরার কথা।  সে চাইছিল এলিজাবেথের বাড়ি যেতে। কিন্তু ফ্রাঁসোয়াজ ভাবছিল অন্য দুটো বিকল্প নিয়েই। এমনকী তৃতীয় একটি কথাও তার মনে হচ্ছিল।  সে ভাবছিল সোজা বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়বে।  তার গাড়ি এসে গিয়েছিল।  কিন্তু তবু সে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারল না।

জেনবিয়েভ বলল, তোমার পক্ষে এটা মোটেই ঠিক কাজ হচ্ছে না। রেজকি হয়তো এখন গাইছে। ওর গান আমার ভালো লাগে। তোমাকে দেখলে কেউ ভাববে এলিজাবেথের বাড়ি গেলে মারাত্মক কিছু ঘটে যাবে, এই আশঙ্কাতেই তুমি সেখানে যাচ্ছ না। এলিজাবেথ তোমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।  অথচ এ বছর ওর একটা আমন্ত্রণও তুমি রক্ষা করোনি।  এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না।

চার বছর আগে ফ্রাঁসোয়াজের স্বামী মারা যান। তখন তাঁর বয়স ছিল কুড়ি। এরপর থেকে জেনবিয়েভই তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। তাকে ফ্রাঁসোয়াজ সবসময়েই খুশি রাখতে চায়। জেনবিয়েভের চাপকে বেশিক্ষণ সে অগ্রাহ্য করতে পারল না। বাড়ির লোকদের ও অতিথিদের কাছে বিদায় চাইল। পারির এক অত্যন্ত জনপ্রিয় মহিলার বিদায় আসন্ন দেখে তাদের সবার মন খারাপ হয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে এসে ফ্রাঁসোয়াজ তার ভৃত্যকে বলল, রাজকুমারী এলিজাবেথের বাড়ি নিয়ে চল।

 

রাজকুমারীর বাড়িতে সেদিনের বিকেল ছিল ভীষণ একঘেয়ে। একসময় ফ্রাঁসোয়াজ জেনবিয়েভের কাছে জানতে চাইল, ‘তোমাকে পানভোজনের জন্য যে যুবক নিয়ে গেছিল, সে কোথায়?’

‘সে তো মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ। তাঁর সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছুই জানি না। তুমি কী তাঁর সঙ্গে পরিচিত হতে চাও? এর আগে সেও একবার তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছে। কিন্তু আমি তাকে কোনও স্পষ্ট জবাব দিইনি। লোকটা খুবই মামুলি আর একঘেয়ে। সে মনে করে তুমি খুবই সুন্দরী। একবার পাকড়াও করলে ওর হাত থেকে তুমি সহজে ছাড়া পাবে না।’

‘তাহলে অবশ্য দেখা না হওয়াই ভালো। লোকটার চোখদুটো খুব সুন্দর। তবু মোটের ওপর বেশ সাদামাটা গোছেরই মনে হয়।’

জেনবিয়েভ বলল, ‘ঠিকই বলেছো। এরপর থেকে প্রায়ই ওর সঙ্গে তোমার দেখা হবে। এখনই ওর সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেলে তখন আর তোমার ভালো নাও লাগতে পারে।’ যেন রসিকতা করেই সে আরও যোগ করল, ‘তবে ওর সঙ্গে তোমার যদি অন্তরঙ্গ আলাপ করার বাসনা থাকে, এর থেকে ভালো সুযোগ আর পাবে না।’

‘হ্যাঁ, খুব ভালো সুযোগ।’ কিছুটা অন্যমনস্কভাবে বলে ওঠে ফ্রাঁসোয়াজ। ইতিমধ্যেই সে যেন অন্য কিছু ভাবতে শুরু করে দিয়েছে।

কিন্তু নিজের এই ভুমিকায় নিজেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠল জেনবিয়েভ। তার মনে হল, ফ্রাঁসোয়াজের সঙ্গে কথা বলে ওই যুবক যদি কিছু আনন্দ পায়, তবে সেই বা কেন কাবাব মে হাড্ডি হতে যাবে? সে তাই বলল, ‘সে যাই হোক, এটাই তো আর তোমাদের শেষ দেখা হচ্ছে না। তাহলে না হয় গুরুতর কিছু ঘটার সম্ভাবনা থাকত! তোমার পক্ষে এই আলাপ-পরিচয়টা বরং ভালোই হতে পারে।’

‘তাহলে তো ভালোই।’ ফ্রাঁসোয়াজ বলল, ‘এখন সে যদি একটু এদিকে আসে।’

কিন্তু সে এল না। সে তাদের দিকে উলটোমুখ করে বসবার ঘরের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিছুক্ষণ পর জেনবিয়েভ বলল, ‘আমরাই বরং এগিয়ে যাই।’

‘আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো।’ ফ্রাঁসোয়াজ বাধা দিল।

সে ওই যুবকের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল। মাঝে মাঝে মুহূর্তের জন্য চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু সে শুধু আবার চোখে চোখ রেখে দীর্ঘসময় তাকিয়ে থাকবে বলে। এক অদ্ভুত খেয়াল তাকে বশ করে ফেলল। তার মনে হল, এভাবেই কিছু সময় ধরে ওই যুবকের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় চালিয়ে যাবে। তাঁর চোখে সে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে তার দৃষ্টিতে আরও তীব্র সোহাগ ঢেলে দিতে চাইছিল। কোনও বিশেষ কারণে সে এসব করছিল, তা নয়। এটা করতে তার ভালো লাগছিল। এটা করে সে কাউকে ধন্য করে দিতে চাইছিল। যেন বা কিছুটা অহংকারও মিশে ছিল এর মধ্যে। সে চাইছিল, অপ্রয়োজনীয় কিছু করতে।  গাছের গায়ে অনেকে নাম লিখে যায় সেই অজ্ঞাত পথচারীদের জন্য, যাদের সঙ্গে তাদের কোনওদিনই দেখা হবে না। অনেকে সমুদ্রের ঢেউয়ে বোতল ছুঁড়ে দেয়। তাদের মতোই প্রয়োজন ছাড়াই কিছু করার আনন্দ সে পেতে চাইছিল।

সময় কেটে যাচ্ছিল। মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরও দরজা খোলাই রইল। সেই ফাঁক দিয়ে ফ্রাঁসোয়াজ দেখল, প্রবেশ ঘরের সুদূর প্রান্তে মালপত্রের দায়িত্বে থাকা পরিচারকের হাতে তিনি তাঁর নম্বরটি তুলে দিচ্ছেন।

‘তুমি ঠিকই বলেছিলে, এবার আমাদের যাওয়া উচিত।’ সে বলল জেনবিয়েভকে।

তারা দু-জনেই উঠে দাঁড়াল। কিন্তু জেনবিয়েভকে আটকে দিল তার এক বন্ধু। একা ফ্রাঁসোয়াজ প্রবেশ-ঘরে গিয়ে হাজির হল। ওই ঘরে তখন একমাত্র অপর যে ব্যক্তিটি উপস্থিত ছিলেন, তিনি ওই মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ। তিনি তাঁর হাতের ছড়িটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরিহাসের ছলে ফ্রাঁসোয়াজ আগের মতোই তাঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। লালেয়ঁদ তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন। তাঁর কনুই আলতো করে স্পর্শ করল ফ্রাঁসোয়াজের কনুই। লালেয়ঁদের চোখ জ্বলে উঠল। যেন সেই ছড়িটিকেই খুঁজছেন, এমন ভান করে বলে উঠলেন, ‘আমার বাড়ির ঠিকানা: ৫, রু রয়াল। সেখানে দেখা করুন।’

এরকম কিছু ঘটতে পারে, তা ফ্রাঁসোয়াজের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ খুব মনোযোগ দিয়ে হাতের ছড়িটি খুঁজছিলেন। পরে অনেকবার এই দৃশ্যের কথা ভেবেছে ফ্রাঁসোয়াজ। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনি, সত্যিই ঘটেছিল, নাকি সবটাই তার মনের ভুল। সে খুব ভয় পেয়ে গেছিল। ঠিক তখনই রাজকুমারী এলিজাবেথ সে ঘরে এসে হাজির হলেন। লালেয়ঁদের সঙ্গে তিনি স্বচ্ছন্দে কথা বলছিলেন। পরদিন কোথাও একটা ঘুরতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করার ব্যাপারে তাঁরা কথা বলছিলেন। কথাবার্তা শেষ হওয়ার পরই লালেয়ঁদ বেরিয়ে গেলেন। পরের মুহূর্তেই ঘরে ঢুকল জেনবিয়েভ। দুই মহিলা একইসঙ্গে বেরিয়ে গেল।

জেনবিয়েভকে কিছু জানালো না ফ্রাঁসোয়াজ। সে তখনও একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। পরম তৃপ্তিতে সারা মন ভরে গেছিল। যদিও মনের গভীরে এই ঘটনা তখনও সেভাবে নাড়া দেয়নি। বরং লালেয়ঁদ এইমাত্র যা বলে গেলেন, তা নিয়ে তার সন্দেহই হচ্ছিল। সেগুলিকে সে মনে করার চেষ্টা করল। পুরোপুরি সফল হল না। তার মনে হল, ওই কথাগুলি সে কোনও স্বপ্নের মধ্যে শুনেছে। দু-জনের কনুইয়ে যে স্পর্শ লেগেছিল, সেটাও ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি, বরং অসাবধানেই লেগে গিয়েছিল। এরপর সে লালেয়ঁদকে নিয়ে ভাবাই থামিয়ে দিল। কখনো তাঁর নাম উচ্চারিত হলে, সে তাঁর মুখ মনে করার চেষ্টা করত। কিন্তু সেটা সে পুরোপুরি ভুলে গেছিল। প্রবেশ-ঘরের ঘটনাটা তার কাছে এখন মনের ভুল বলেই মনে হত।

সে বছর জুনের শেষে বছরের শেষ সমাগমে আবার তাদের দেখা হল। কিন্তু লালেয়ঁদের সামনে যাওয়ার সাহস হল না ফ্রাঁসোয়াজের। লালেয়ঁদকে দেখে অপরিচ্ছন্ন লাগছিল। তাছাড়া তাঁকে দেখতে এমন কিছু বুদ্ধিদীপ্তও নয়। তবু তাঁর সঙ্গে কথা বলার একটা তীব্র ইচ্ছা পেয়ে বসল ফ্রাঁসোয়াজকে। জেনবিয়েভের কাছে গিয়ে সে বলল, ‘মঁসিয়ে লালেয়ঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দাও। আমি অভদ্রের মতো আচরণ করতে চাই না। আবার নিজেকে জড়িয়ে ফেলতেও চাই না। এটা যে আমারই ইচ্ছা, সেকথা ওকে তুমি বলো না।’

‘ঠিক আছে, কিন্তু ওকে তো এখন কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে না। ওকে দেখতে পেলেই আমি বলছি।’

‘কিন্তু ও কোথায় গেল, সেটা কী তুমি খুঁজে দেখতে পারো না?’

‘ও বোধহয় চলে গেছে।’

‘না, না, এ হতে পারে না,’ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল ফ্রাঁসোয়াজের, ‘এত তাড়াতাড়ি সে যেতে পারে না। ওফ্, এ যে বারোটা বেজে গেছে! জেনবিয়েভ, আমার বন্ধু, এটা এমন কোনও কঠিন কাজ নয়। সেদিন বিকেলে এ ব্যাপারে তুমি আগ্রহ দেখিয়েছিলে। আর আজ আমিই ব্যগ্র হয়ে উঠেছি। আমার জন্য এটুকু তুমি করে দাও।’

জেনবিয়েভ অবাক হয়ে ফ্রাঁসোয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মঁসিয় লালেয়ঁদের খোঁজে চলে গেল। কিন্তু লালেয়ঁদ ইতিমধ্যেই চলে গেছিলেন।

ফ্রাঁসোয়াজের কাছে ফিরে এসে জেনবিয়েভ বলল, ‘আমি তোমাকে ঠিকই বলেছিলাম। ও চলে গেছে।’ ফ্রাঁসোয়াজ বলল, ‘এখানে একঘেয়েমির চোটে আমার মরে যাওয়ার জোগাড়। তাছাড়া মাথাও ধরেছে। কিছু মনে করো না, এখানে আমি আর একমুহূর্তও থাকতে পারছি না। চল, বাড়ি ফিরে যাই।’

 

 

এরপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে ফ্রাঁসোয়াজ অপেরায় যেতে শুরু করল। প্রতিটা নৈশভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে শুরু করল। একটা অস্পষ্ট, ক্ষীণ আশাতেই সে এসব করছিল। দু-সপ্তাহ কেটে গেল। কোথাও মঁসিয় লালেয়ঁদের হদিশ পাওয়া গেল না। দেখা করার জন্য নানা ছক কষতে শুরু করল ফ্রাঁসোয়াজ। তার ভালো ঘুম হয় না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন নানা পরিকল্পনা মাথায় আসে। নিজেকে সে ক্রমাগত বোঝাতে চায়, লালেয়ঁদ একটি মামুলি লোক, সুপুরুষও নয়। কিন্তু যত বিচক্ষণ ও আকর্ষনীয় পুরুষকে সে জানে, তাদের সবার চেয়ে বেশি লালেয়ঁদ তাকে ভাবাতে শুরু করল। তার সমস্ত মন জুড়ে বিরাজ করতে শুরু করল। গ্রীষ্ম শেষ হয়ে গেলে লালেয়ঁদকে দেখার আর সুযোগ পাওয়া যাবে না। ফ্রাঁসোয়াজ ঠিক করল, যেভাবেই হোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই হবে। এটাই হয়ে উঠল তার সর্বক্ষণের একমাত্র চিন্তা।

একদিন বিকালে জেনবিয়েভকে সে বলল, ‘মঁসিয় লালেয়ঁদ বলে তুমি একজনকে চিনতে না?’

‘জাক দ্য লালেয়ঁদ? হ্যাঁ, আবার না-দুটোই সত্যি। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল বটে। কিন্তু এর বেশি আমি কিছুই জানি না। এমনকী কোনও পরিচয়পত্রও সে আমাকে দেয়নি।’

ফ্রাঁসোয়াজ বলল, ‘দেখ, তোমাকে আমি খোলাখুলি সব বলছি। লালেয়ঁদকে দেখার জন্য, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার মনে অল্পবিস্তর, না না, তার চেয়ে অনেক বেশি, একটা তীব্র কৌতুহল জেগে উঠেছে। যদিও যে কারণে এটা হয়েছে, সেটার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনও সম্পর্ক নেই। আগামী একমাসের মধ্যে এ নিয়ে আর কিছু আমার কাছে জানতে চেয়ো না। আমি বলতে পারব না।’

মনে মনে সে বলল, এই সময়ের মধ্যে নিশ্চয়ই লালেয়ঁদের সঙ্গে তার দেখা হবে। তখন জেনবিয়েভকে বলার জন্য দু-জনে মিলে কিছু একটা মিথ্যা গল্প বানিয়ে নেওয়া যাবে, যাতে সে ধরা না পড়ে। আর এই মিথ্যাটা শুধুমাত্র তারা দু-জনেই জানবে। একথা ভেবেই ফ্রাঁসোয়াজ মনে মনে উষ্ণ হয়ে উঠল।

জেনবিয়েভকে সে আরও বলল, ‘অনুগ্রহ করে, তাঁর সঙ্গে দেখা করার কোনও একটা উপায় বাতলে দাও। গ্রীষ্ম শেষ হতে চলল। অথচ এখনও পর্যন্ত কিছুই ঘটল না। সামনে আর কোনও পার্টিও নেই, যেখানে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হতে পারে।’

অন্য কেউ হলে, বিশেষ করে সমাজের বেশিরভাগ লোকই এসব ক্ষেত্রে সুযোগ নিত। বাজে কৌতূহল দেখাত। ভিতরের কথা টেনে বার করে মজা পাওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু ফ্রাঁসোয়াজ ও জেনবিয়েভের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আর বন্ধুত্ব যখন বিশ্বস্ততার পর্যায়ে চলে যায়, তখন তার মতো বিশুদ্ধ আর কিছুই হয় না। জেনবিয়েভ বা ফ্রাঁসোয়াজ কেউই এ নিয়ে আর বিশেষ কোনও কৌতূহল দেখাল না। বন্ধুকে প্রশ্ন করে কিছু জেনে নেওয়ার কোনও অভিপ্রায়, আকাঙ্ক্ষা, এমনকী এরকম কোনও ভাবনাই জেনবিয়েভের মনে এল না। সে বরং সর্বান্তকরণে লালেয়ঁদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করল। আর তা না পেয়ে তার হতাশাও বেড়ে চলল।

‘সবদিক থেকেই আমাদের ভাগ্য খারাপ।’ সে বলল, ‘রাজকুমারী এলিজাবেথ এখানে নেই। মঁসিয় দ্য গ্রুমেলো অবশ্য আছেন। কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু লাভ হবে না। তাকে আমরা কী বলব? ওফ্, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। লালেয়ঁদ বেহালা বাজাত। যদিও বেশ খারাপই বাজাত। কিন্তু মঁসিয় গ্রুমেলোর সেই বাজানোও ভালো লাগত। তিনি এরকমই একটি নির্বোধ। এ ব্যাপারে তাঁর সাহায্য চাইলে তিনি খুশিই হবেন। শুধু একটাই সমস্যা। এর আগে গ্রুমেলোকে দেখে তুমি বরাবরই এড়িয়ে গেছো। কিন্তু আমি জানি, কারো সাহায্য নিয়ে তাকে ভুলে যাওয়াটা তুমি মোটেই পছন্দ করো না। আগামী বছর গ্রুমেলোকেও তোমাকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে।’

ফ্রাঁসোয়াজের মুখ ইতিমধ্যেই খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। দরকার পড়লে পারিতে যত বিদেশি ভুঁইফোড় এসে হাজির হয়েছে তাদেরও আমি আমন্ত্রণ জানাব। কিন্তু জেনবিয়েভ, আমার দয়ালু বন্ধু, যা করার দ্রুত করো।’

জেনবিয়েভ তখন গ্রুমেলোকে লিখলঃ

‘তুমি জানো, আমার বন্ধু মাদাম দ্য ব্রেভেসকে খুশি করার জন্য এই দুনিয়ায় সম্ভব সমস্ত কাজ আমি করতে পারি। আমার বন্ধুর সঙ্গে আগেও তোমার সাক্ষাৎ হয়েছে। সে বেহালা শুনতে ভালোবাসে। যখনই এ নিয়ে আমাদের কথা হয়, সে মঁসিয় লালেয়ঁদের কথা তোলে। তাঁর বাজনা শুনতে পায়নি বলে বহুবার সে আমার কাছে আক্ষেপ করেছে। লালেয়ঁদ তোমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি ও আমার বন্ধু তাঁর বেহালা শুনতে চাই। এ ব্যাপারে তুমি কী একবার তাকে অনুরোধ করতে পারো? এখন আমাদের সবারই হাতে প্রচুর সময়। তোমার পক্ষে এটা খুব একটা অসুবিধাজনক হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া এতে আমরাও উপকৃত হব।

আন্তরিক শ্রদ্ধাসহ,

আলেরিউভ বুইউভ’

চিঠিটা এক পরিচারকের হাতে দিয়ে ফ্রাঁসোয়াজ নির্দেশ দিল, এটা নিয়ে সোজা মঁসিয় গ্রুমেলোর কাছে চলে যাও। উত্তরের জন্য অপেক্ষা করো না। তবে চিঠিটা যে তাঁর হাতে পৌঁছেছে এটা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখে আসবে। পরদিন গ্রুমেলো উত্তর পাঠালেন। জেনবিয়েভ সেটা ফ্রাঁসোয়াজের কাছে পাঠিয়ে দিল। সেই চিঠিতে লেখা ছিলঃ

মাদাম,

আপনাদের উপকার করতে পারলে আমি এত খুশি হতাম যে, তা আপনারা কল্পনাই করতে পারবেন না। মাদাম দ্য ব্রেভেসকে আমি অল্পই চিনি। কিন্তু তাঁর প্রতি আমার রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় সহানুভূতি। কিন্তু খুব দুঃখের সঙ্গে আমি জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে, মঁসিয় লালেয়ঁদ দু-দিন আগেই বিয়ারিৎস চলে গেছেন। সেখানে তিনি কয়েক মাস থাকবেন। জানি, এই খবর শুনে আপনাদের খারাপ লাগবে। তবু যা বাস্তব তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া তো উপায় নেই।

গ্রুমেলো

 

চিঠি পেয়ে ফ্রাঁসোয়াজের মুখ সাদা কাগজের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে সে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু ঘর পর্যন্ত পৌঁছোনোর আগেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার দু-চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়াতে শুরু করল। এতদিন পর্যন্ত সে লালেয়ঁদের সঙ্গে দেখা করার, তাঁকে জানার নানারকম কল্পনা করে এসেছে। এসবই যে একদিন ঘটবে, সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত ছিল। এই আশা-আকাঙ্ক্ষাই মনের ভিতরে তাকে সজীব রেখেছিল, যদিও সে নিজেই এতদিন সেটা ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। এই আশা তার মনের জমিতে প্রোথিত হয়ে কবে যেন শেকড়বাকড় চারিয়ে দিয়েছিল, যা তাকে এতদিন ধরে বেঁচে থাকার রস সরবরাহ করেছে। হঠাৎ কেউ যেন সেই শেকড়বাকড়গুলোকে উপড়ে ফেলে ফালতু বলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছিল। তার সমস্ত সত্ত্বাকেই কেউ যেন উৎপাটিত করে দিল। এই উৎপাটন, উপড়ে ফেলার যন্ত্রণা সে টের পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, তার সমস্ত আশারই কোনও ভিত্তি ছিল না, এতদিন ধরে সে একটি মিথ্যাকে পুষে এসেছে। এক প্রকাণ্ড দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়ে সে তার ভালোবাসার বাস্তব চেহারাকে প্রত্যক্ষ করল।

 

8

প্রতিদিন একটু একটু করে জীবনের সমস্ত আনন্দ থেকে ফ্রাঁসোয়াজ নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছিল। আগে যেসব মুহূর্ত তাকে নিবিড় আনন্দ দিত, যেমন মা বা জেনবিয়েভের সঙ্গে সময় কাটানো, গান শোনা বা বই পড়া, পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো- এখন সেই সমস্ত আনন্দের মুহূর্তেও সে অন্যমনস্ক থাকে। সবসময়েই তার ভিতরে একটা ঈর্ষামেশানো দুঃখ কুড়ে কুড়ে খায়, এক মুহূর্তের জন্যও তাকে ছেড়ে যায় না।

তার কষ্ট বেড়েই চলল। সে বুঝতে পারল, এই কষ্টের কোনও শেষ নেই। বিয়ারিৎস যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।  কিন্তু সেখানে পৌঁছোনো যদি সম্ভবও হত, তাহলেই বা কী হত? সে তো কোনওভাবেই নিজের এই মরিয়া অবস্থাকে মঁসিয় লালেয়ঁদের কাছে প্রকাশ করতে পারত না। সে এমন কিছু করতে পারত না যাতে লালেয়ঁদের কাছে তার মর্যাদা এতটুকু ক্ষুন্ন হয়।

বিয়ারিৎসে না যাওয়ার জন্য, কোনওরকম আপোস না করার জন্য মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করে বসল। কিন্তু এহেন প্রতিজ্ঞার ফলে তার কষ্টের কোনও সীমা-পরিসীমা রইল না। সে হয়ে উঠল এমন এক দুর্ভাগ্যের শিকার, যার কারণ সে নিজেই জানে না। মাসের পর মাস এরকম কষ্ট চলতে থাকবে ভেবে সে আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে টের পেল, কোনও সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত এই কষ্টের হাত থেকে তার রেহাই নেই। শান্তভাবে সে ঘুমোতে পারত না। স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখতে পারত না।

লালেয়ঁদ এসব কিছুই জানে না এবং অজান্তেই আবার কোনওদিন সে পারিতে ফিরে আসতে পারে ভেবে তার মন উদ্বেগে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সুখের সম্ভাবনা এত কাছে এসেও ফসকে যাওয়ায় সে আরও সাহসী হয়ে উঠেছিল। লালেয়ঁদ সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য সে তার এক পরিচারককে পাঠাল। কিন্তু লালেয়ঁদের বাড়ির দ্বাররক্ষী কিছুই জানাতে পারল না।

ফ্রাঁসোয়াজের মনে হল, তার দুঃখের সমুদ্রের কোনও শেষ নেই, তা অনন্তে বিস্তৃত হয়েছে, আর কখনো সেখানে আশার পাল তুলে কোনও জাহাজ আসবে না। দিগন্তরেখার কাছে গিয়ে যেন তার জীবন থেমে গিয়েছে, তার ওপারে আর কিছু চোখে পড়ে না। সে অনুভব করল, নিজেকে আর সে ঠেকাতে পারবে না। ভয়ংকর কিছু একটা পাগলামো করে ফেলবে। সেটা কী-তা সে জানে না। হয়তো কোনও চিঠি লিখবে। অথবা নিজেই নিজের চিকিৎসক সেজে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করবে। সে নিজেকে বোঝাল, লালেয়ঁদকে এবার বিষয়টি জানানো দরকার। সে যে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়, এটাই তাকে জানাতে হবে। গ্রুমেলোকে সে একটা চিরকুট পাঠালো। তাতে লিখলঃ

জেনবিয়েভ আপনার সহানুভূতিশীল শব্দগুলি আমার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। সেগুলি গভীরভাবে আমাকে স্পর্শ করেছিল। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু একটা ব্যাপার আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ আবার আমাকে হঠকারী ভেবে বসেননি তো? এ ব্যাপারে আপনার কিছু না জানা থাকলে তাঁকে প্রশ্ন করে জেনে নিন। তারপর যত দ্রুত সম্ভব সঠিক সত্যটা আমাকে জানান। এটা জানার জন্য আমি কৌতূহল বোধ করছি। যদি সফল হন, আমার বিশেষ উপকার হয়। আপনাকে আবার ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি। শুভেচ্ছা সহ…

একঘন্টা পর একজন পরিচারক গ্রুমেলোর কাছ থেকে উত্তর নিয়ে এলঃ

আপনার উদ্বেগের কোনও কারণ নেই, মাদাম। আপনি যে মসিয় লালেয়ঁদের বাজনা শুনতে চেয়েছিলেন, তার কিছুই উনি জানেন না। আমি ওনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কবে উনি আমার বাড়ি আসতে পারবেন এবং সম্ভব হলে বাজনা শোনাতে পারবেন। কিন্তু কারা সেই বাজনা শুনতে চেয়েছে, সে ব্যাপারে কিছুই প্রকাশ করিনি। বিয়ারিৎস থেকে তিনি আমাকে জানিয়েছেন, জানুয়ারির আগে পারিতে তিনি ফিরতে পারছেন না। তাছাড়া বারবার ধন্যবাদ দিয়ে আমাকে লজ্জা দেবেন না। জেনে রাখবেন, আপনার হয়ে সামান্য কিছু করতে পারলেও নিজেকে আমি কৃতার্থ মনে করব।

গ্রুমেলো

 

এই চিঠির পর আর কিছুই করার রইল না। ফ্রাঁসোয়াজও আর কিছু করল না। শুধু যতদিন যাচ্ছিল সে আরও বিমর্ষ হয়ে উঠছিল। মনস্তাপে ভরে উঠছিল তার সারা মন। ফ্রাঁসোয়াজের অবস্থা দেখে তার মা-রও দুঃখ বেড়ে চলছিল। তিনিও আরও বেশি করে বিষণ্ণ হয়ে উঠছিলেন।

ফ্রাঁসোয়াজ কিছুদিন গ্রামাঞ্চলে কাটিয়ে এল। তারপর ত্রুভিলের দিকে যাত্রা করল। লালেয়ঁদ সামাজিকভাবে কতটা উচ্চাভিলাষী, সে সমস্ত সে সেখানে গিয়ে শুনল। তাকে তুষ্ট করতে জনৈক প্রিন্স যখন জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কী আপনার কোনও উপকারে আসতে পারি?’, তখন তার প্রায় হাসিতে গড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা হল। সে যদি সৎভাবে উত্তর দেয়, তাহলে ওই প্রিন্সের কী অবস্থা হতে পারে, একথা ভেবেই তার হাসি পেয়েছিল।

আসলে এক তিক্ত বৈপরিত্যের কথা, ভাগ্যের উপহাসের কথা তার মনে পড়ে গেছিল। একদিকে কিছু লোক তার জন্য কত না কঠিন, মহান সব ঘটনা ঘটাতে প্রস্তুত। অন্যদিকে একটা সামান্য ব্যাপার, যা একইসঙ্গে সহজ এবং অসম্ভব, যা তার এবং তার ঘনিষ্ঠ মানুষদের জীবনে আবার সুখ, শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে পারে, তার রুগ্ন চেহারায় নতুন রক্ত সঞ্চারিত করতে পারে।

একমাত্র ঘরে একাকী সে যখন পরিচারকদের সঙ্গে থাকত, তখনই কিছুটা স্বস্তিবোধ করত। তারা তার দুঃখকে অনুভব করতে পারত। তাদের শ্রদ্ধা ও শোকে পরিপূর্ণ নীরবতার দিকে তাকিয়ে তার মঁসিয় লালেয়ঁদের কথা মনে পড়ে যেত। গভীর আনন্দের সঙ্গে সে তাদের নীরবতাকে লক্ষ্য করত, তারাও ধীরে ধীরে, দেরি করে তাকে সকালের খাবার দিত, যতক্ষণ না বন্ধুবান্ধবেরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসে, যখন ভিতরের শোক-দুঃখকে গোপন করে আবার তাকে অভিনয় শুরু করতে হবে।

দুঃখের যে অম্লমধুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছিল, তাকে সে জমিয়ে রাখতে চাইছিল, সুস্বাদের মতো একটু একটু করে উপভোগ করতে চাইছিল। সে চাইছিল, লোকে আরও বেশি করে লালেয়ঁদকে নিয়ে কথা বলুক। যাতে তার হৃদয়ের সমস্ত অংশ জুড়ে যা রয়েছে, তা যেন তার চারপাশেরও সিংহভাগ অংশ জুড়ে থাকে। সজীব, সবল বন্য জন্তুদের সান্নিধ্য সে চাইত, যারা তার দুঃখে ক্রমশ নিস্তেজ, মৃতপ্রায় হয়ে উঠবে। হতাশায় কখনো-বা মরিয়া হয়ে উঠত। ইচ্ছা করত সমস্ত সম্মান খুইয়ে এখুনি লালেয়ঁদকে একটি চিঠি লেখে, এমনকী অন্য কাউকে দিয়ে লেখায়, কারণ এখন কিছুতেই আর কিছু এসে যায় না।

কিন্তু তখনই নিজেকে সংযত করে সে ভাবত, ভালোবাসার স্বার্থেই তার সবকিছু সহ্য করা উচিত, নিজের সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, যা তাকে হয়তো বা একদিন তার ভালোবাসার মানুষটিকে জয় করার, তাকে অধিকার করার শক্তি জোগাবে, অবশ্য এমন কোনও দিন কখনো যদি আসে। সেই মানুষটির সঙ্গে একটা সংক্ষিপ্ত অন্তরঙ্গ আলাপই পারে তার সমস্ত ঘোর ভেঙে দিতে, তারপর কোনও স্বাচ্ছন্দ্য, কোনও অবলম্বন ছাড়াই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে তার কোনও অসুবিধা হবে না।

যদিও এরকম কিছু ঘটতে পারে, তা সে একমুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করত না, এমনকী কল্পনাই করতে পারত না। তার হৃদয় শোকে-দুঃখে অন্ধ হয়ে গেছিল। কিন্তু মন স্বচ্ছ থাকায় সেই নিষ্ঠুর সম্ভাবনাকে সে প্রত্যক্ষ করত। তার জীবনে যদি অন্য কোনও প্রেম আসে, তাকে গ্রহণ করার শক্তিও তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। সে ভাবত, পারিতে ফিরে যাওয়ার পর লালেয়ঁদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটাও তাকে সাহায্য করবে। নিজেকে সে তার অনুভূতিগুলির থেকে আলাদা করে একটি ভিন্ন বস্তু হিসাবে দেখতে চাইত।

নিজেকে সে বলত, ‘আমি জানি এবং বরাবরই জেনে এসেছি, সে অত্যন্ত সাধারণ। তার সম্পর্কে এটাই আমার স্থির মতামত। এর কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাকে নিয়ে এত আবেগ, এত বিক্ষোভ, তবু এই মত অটল রয়েছে, কোনও রদবদল হয়নি। সে আমার জীবনে কিছুই না। কিন্তু সেই কিছু না-য়ের জন্যই আমি বেঁচে আছি। আমি বেঁচে আছি জাক দ্য লালেয়ঁদের জন্য।’

তৎক্ষণাৎ, লালেয়ঁদের নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই, নিজের অনিচ্ছাতে কোনওরকম না ভেবেচিন্তেই সে তাঁকে দেখতে পেত। তখন দুঃখ ও উচ্ছ্বাসের চোটে সে বিহ্বল হয়ে পড়ত, তার মনে হত, লালেয়ঁদের থাকা না থাকাটা কোনও ব্যাপার নয়, বরং সে তাকে যেভাবে দুঃখ বা আনন্দ দেয়, তার কাছে এই জগতের বাকি সবকিছু তুচ্ছ, কিছুই না। সে বুঝতে পারল, লালেয়ঁদকে ভালোভাবে জানার পর এই সব অনুভূতি উধাও হয়ে যাবে। শুধু লালেয়ঁদের এই ছবিটি তার সমস্ত বাস্তবতা নিয়ে থেকে যাবে, যার মধ্যে তার এতদিনের বেদনা ও প্রতীক্ষা প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে।

এমনকী একটা গানের সামান্য কয়েকটা লাইনই পারে তার মনে লালেয়ঁদের ছবিটি সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে। ‘মাস্টারসিংগার্স’-য়ের থেকে নেওয়া এই গানটি সে শুনেছিল রাজকুমারী এলিজাবেথের বাড়ি সেদিন বিকেলে। তার কাছে এই গানটিই হয়ে উঠেছিল লালেয়ঁদের স্মৃতিচিহ্ন। ত্রুভিলে একটি কনসার্টে এই গানটি শুনে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কখনো এই গান এমন ভারী হয়ে তার ওপর চেপে বসত, যে সে ছুটে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিত। তারপর পিয়ানোয় বসে গানের সুরটা বাজাতে থাকত। তার চোখ বোজা থাকত, যাতে সে লালেয়ঁদকে স্পষ্ট দেখতে পায়। এটাই তার কাছে ছিল একমাত্র আনন্দ, আফিমের মতো নেশা, যা ছাড়া তার চলত না, যা তার মধ্যে উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলত, কিন্তু তারপরেই মোহভঙ্গের ব্যথায় সে ভেঙে পড়ত।

যেভাবে ঝর্ণার দিকে ঝুঁকে কেউ জলের একটানা বিষণ্ণ মধুর কলতান শুনে যায়, সেভাবেই পিয়ানো বাজিয়ে সে তার নিজের বেদনাকে শুনত। গান গাইতে গাইতে সে আচমকাই থেমে যেত, তারপর ডুবে যেত গভীর চিন্তায়। সে ভাবত ভবিষ্যতের কথা। একদিকে রয়েছে ভবিষ্যতের লজ্জা, যার ফলে তার পরিবারে নেমে আসবে গভীর বিষাদ ও হতাশা। অন্যদিকে যদি সে তার এই কামনা-বাসনাকে আর প্রশ্রয় না দেয়, এক অনন্ত দুঃখ তার সঙ্গী হয়ে থাকবে। তার ভালোবাসায় আনন্দ ও বেদনা এরকম কৌশলে মিশে আছে দেখে নিজেকে সে অভিশাপ দিত। একে ভয়ংকর বিষ বলে সে পরিহার করতেও পারত না, আবার এর থেকে আরোগ্যের উপায়ও জানত না।

সবচেয়ে বেশি নিজের দৃষ্টিকে সে দোষারোপ করত। কিন্তু সেই দৃষ্টিকে যারা চালিত করে, যুবাদের আকৃষ্ট করতে তার একজোড়া চোখকে ফুলের মতো খুলে রাখে, মনের সেই কৌতূহল এবং প্রেমের ভান করার প্রবণতার প্রতি তার অভিযোগ ছিল আরও বেশি। এই প্রবণতাগুলিকে সে ঘেন্না করতে শুরু করেছিল। এই প্রবণতাগুলিই তাকে সেদিন বাধ্য করেছিল তীরের চেয়েও তীক্ষ্ণ এবং মরফিনের চেয়েও মধুর দৃষ্টি দিয়ে মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদকে বিদ্ধ করতে। নিজের কল্পনাকে সে অভিশাপ দিত।

এত সযত্নে সে তার ভালোবাসাকে লালন করেছে যে ফ্রাঁসোয়াজের সন্দেহ হত তার ভালোবাসা আদতে তার কল্পনারই সন্তান কিনা। যে সন্তান এখন তার মায়ের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার চালাচ্ছে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চলেছে। নিজের উদ্ভাবন ক্ষমতাকে সে অভিশাপ দিত। এই ক্ষমতার জোরেই সে তার নায়কের সঙ্গে মিলনের যত রোমান্সপূর্ণ স্বপ্নজাল বুনে গেছে। সেগুলি অসম্ভব ভেবে আজ যখন সে বিষণ্ণ হয়ে উঠছে, তখন সেগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের নায়কও হয়ে উঠছে আরও অসম্ভব একটি ব্যাপার।

তার দয়ালু, কমনীয় হৃদয়কে সে অভিশাপ দিত, যা তার অপরাধে ভরা প্রেমের আনন্দকে মনস্তাপ ও লজ্জায় ভরিয়ে রাখে। তার ভিতরে ইচ্ছার যে অদম্য বেগ রয়েছে, তাকেও সে অভিশাপ দিত। যখন এক অসম্ভব লক্ষ্যের দিকে সে ছুটে যাচ্ছে, এই বেগই তাকে সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করার শক্তি জুগিয়েছিল। কিন্তু আজ যখন সেই লক্ষ্যকে সে অস্বীকার করতে চাইছে, তখন এই বেগই হয়ে উঠেছে নরম, দুর্বল, ভঙ্গুর। এমনকী অন্য কোনও আবেগকে ঢোকার পথও তা রুদ্ধ করে দিয়েছে।

সর্বশেষে সে অভিশাপ দিত, তার ভাবনাচিন্তা করার স্বর্গীয় ক্ষমতাকে। সে ভাবতে পারে, এটাই তার সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। এই সম্পদকে মানুষ অজস্র নামে ডাকতে চেয়েছে কিন্তু কোনওদিনই সঠিক নামটি খুঁজে পায়নিঃ কবির প্রজ্ঞা, ভক্তের উচ্ছ্বাস, প্রকৃতি ও সঙ্গীতের প্রতি প্রগাঢ় অনুভব। এই সম্পদই তার প্রেমকে সুউচ্চ শিখর ও অনন্ত দিকচক্রবালের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাদের স্নান করিয়ে দিতে চেয়েছে তার ভালোবাসার অতিপ্রাকৃতিক আলোয় এবং এইভাবে তার ভালোবাসা তাদেরই একটা অংশ হয়ে উঠেছে। ভাবনা তার প্রেমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে, প্রেমকে ভরিয়ে তুলেছে নিজের উদার, অন্তরঙ্গ, অন্তর্জীবন দিয়ে, তার কাছে নিজেকে উৎসর্গ করেছে, যেভাবে একটি চার্চের সম্পদ ম্যাডোনাকে উৎসর্গ করা হয়। এভাবেই মন ও হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান অলংকারগুলি সে তার প্রেমকে উৎসর্গ করেছে।

এই সেই হৃদয়, যে বিকেলগুলোয় অথবা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর সময় বিলাপ করত। প্রেমিককে না দেখতে পেয়ে তার মনের কাতরতা ও হৃদয়ের এই বিষণ্ণতা যেন দুই বোনের মতো মিলেমিশে গিয়েছিল। বস্তুজগতের যে রহস্যকে শুধু অনুভব করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় না, তাকেও সে অভিশাপ দিত। যখন প্রেম আরও গভীর, ব্যাপ্ত ও অশরীরী হতে হতে অনন্তে মিশে যেতে থাকে, আমাদের মন তখন সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণে ডুবে যায়, ঠিক যেভাবে সূর্য সমুদ্রের স্রোতে ডুবে যায়, যদিও প্রেমের ভিতর গুটিয়ে থাকা বেদনা এতে এতটুকুও কমে না। শরতের দিনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে বোদল্যের যেমন লিখেছিলেন, ‘এই কমনীয় অনুভবগুলি অস্পষ্ট, যদিও প্রগাঢ়, কারণ এর মধ্যে ঘটেছে অনন্তের ধারালো অনুপ্রবেশ।’

 

মাদাম দি ব্রেভেসের সঙ্গে সম্প্রতি আমার দেখা হয়েছিল ত্রুভিলে। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আগে তাকে অনেক বেশি হাসিখুশি দেখাত। এখন আর তার পক্ষে সেরে ওঠা সম্ভব নয়। মঁসিয় লালেয়ঁদকে যদি সে সুন্দর দেখতে বা বুদ্ধিমান বলে ভালোবাসত, আমরা না নয় সৌন্দর্যে ও বুদ্ধিতে তাঁকে ছাড়িয়ে যায়, এমন কাউকে খুঁজে বার করতাম। যদি তার প্রতি লালেয়ঁদের প্রেম ও বিশ্বস্ততার জন্য সে তাকে ভালোবাসত, তাহলে অন্য কাউকে খুঁজে দেখা যেত, যে তাকে আরও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ভালোবাসবে।

কিন্তু মঁসিয় লালেয়ঁদ রূপবানও নন, বুদ্ধিমানও নন। তিনি কোমল মনের না কঠিন মনের, বিশ্বস্ত না ভুলো স্বভাবের এমন কিছু প্রমাণ করারও কখনো সুযোগ পাননি। সুতরাং তিনিই সেই, একমাত্র যাকে ফ্রাঁসোয়াজ ভালোবাসে, তার কোনও গুন বা আকর্ষণশক্তি নয় যা অন্য কারো মধ্যেও সমানভাবে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সুতরাং তিনিই সেই, যার সমস্ত ত্রুটিবিচ্যুতি, স্বাতন্ত্র্যের অভাব সত্ত্বেও ফ্রাঁসোয়াজ তাকে ভালোবাসে। সব কিছু সত্ত্বেও নিয়তির নির্দেশেই যেন সে তাকে ভালোবাসে।

কিন্তু সে কী জানে, যাকে সে ভালোবাসে, সে আসলে কে? কখনো সুখ, কখনো বা শূন্যতা দিয়ে সে তার জীবনকে এমনভাবে আশংকায় পরিপূর্ণ করে রাখে, যে জীবনের আর কিছুকেই সে ধর্তব্যের মনে করে না। সবথেকে সুন্দর দেহসৌষ্ঠব, সবচেয়ে মৌলিক বুদ্ধির কোনও পুরুষের পক্ষে সেই বিশিষ্ট ও রহস্যময় অপরিহার্যতাকে অর্জন করা সম্ভব নয়। সে এত অনন্যসাধারণ যে, অসীম পৃথিবী আর অনন্ত সময়ের পরিসরে এরকম দ্বিতীয় কোনও মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

জেনবিয়েভ সরলভাবে তাকে রাজকুমারী এলিজাবেথের বাড়ি না নিয়ে গেলে, এসব কিছুই ঘটত না। কিন্তু পরিস্থিতি শৃঙ্খলের আকার নিয়ে তাকে কারাবন্দী করে তুলল, সে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হল। দুরারোগ্য, কারণ যুক্তি দিয়ে এই রোগের ওষুধ বাতলানো সম্ভব নয়। মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ বিয়ারিৎসের সমুদ্রতীরে নিঃসন্দেহে এখন খুব নিরস জীবন কাটাচ্ছেন। তুচ্ছ সব স্বপ্নে ভরে আছে সেই মাঝারি মানের জীবন। তিনি যদি তাঁর এই অন্য একটা জীবনের খবর পেতেন, তাহলে নিশ্চয়ই স্তম্ভিত হয়ে যেতেন। এই জীবন এত অলৌকিক, এত প্রগাঢ় যে তার কাছে অন্য সব কিছু তুচ্ছ হয়ে যায়, তাদের আর কোনও অস্তিত্ব থাকে না।

তার এই অন্য জীবন রয়েছে মাদাম দ্য ব্রেভেসের হৃদয়ে, যা তার ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে বয়ে চলেছে, একইরকমভাবে নিজেকে সক্রিয় করে তুলছে, কিন্তু তবু এটা তাঁর বাস্তব জীবনের থেকে আলাদা। এটা আলাদা কারণ এই জীবনে চৈতন্যের ধার অনেক বেশি, বিরাম কম, প্রাচুর্য বেশি। এই জীবন অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। রক্তমাংসের চেহারায় যিনি নেহাৎই মামুলি জীবন কাটান, নিজের এই অন্য জীবন দেখে তিনি অবাক হয়ে যেতেন। তিনি দেখতেন, মাদাম দি ব্রেভেস যেখানেই চলেছেন, তার সঙ্গে সঙ্গে তার একমাত্র আগ্রহের বিষয় হিসাবে তিনিও চলেছেন।

ব্রেভেসের হৃদয়ের মধ্যে ঢুকে তিনি বসে আছেন সমাজের সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষদের সঙ্গে, সবচেয়ে বিশিষ্ট ড্রয়িংরুমগুলিতে, সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর মধ্যে। তিনি দেখতেন, অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েও, এই মহিলার কোনওদিকে খেয়াল নেই, তার সমস্ত ভাবনা, সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত মনোযোগ, একমাত্র তাঁকে, তাঁর স্মৃতিকে ঘিরেই, যার পাশে অন্য সব কিছু ধোঁয়াটে হয়ে গেছে। যেন সেই একমাত্র বাস্তব মানুষ, আর বাস্তব যা কিছু, তা সবই ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মাদাম দ্য ব্রেভেস যখন কোনও কবির সঙ্গে হাঁটেন, কোনও আর্চডাচেসের সঙ্গে বাড়িতে বসে মধ্যাহ্নভোজ সারেন, গ্রাম ও পাহাড় দেখার জন্য ত্রুভিলে যান, একা বসে বই পড়েন বা প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে গল্প করেন, ঘোড়ায় চড়ে বেড়ান বা ঘুমের অতলে তলিয়ে যান, লালেয়ঁদের নাম ও তাঁর ছবি, আনন্দে, বেদনায়, অনিবার্যভাবে তার সামনে ভেসে বেড়ায়, যেভাবে আমাদের মাথার ওপর ভেসে থাকে বিস্তৃত আকাশ।

অবস্থা এতদূর গড়ায়, যে বিয়ারিৎস শহরকে সে ঘৃণা করত, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই তার কাছে একটা মর্মস্পর্শী ও বেদনাপূর্ণ আকর্ষণ নিয়ে আসে। কারা ওই শহরে থাকে, কারা ওই শহরে যাচ্ছে, কারা তাঁকে দেখতে পাবে, কারা তাঁর সঙ্গে থাকার সুযোগ পাবে, সেই সুযোগের মাহাত্ম্য না বুঝেই, এই সব ব্যাপারেই সে আগের থেকে খোঁজখবর নিয়ে রাখত। তাদের প্রতি তার কোনও বিদ্বেষ ছিল না, তাদের দিয়ে কোনও খবর পাঠানোর কথাও ভাবত না, সে শুধু তাদের নানারকম প্রশ্ন করে যেত। সে অবাক হয়ে ভাবত, নিজের গোপন বিষয়ে এত কথা বলার পরও, তারা কেন কিছুই অনুমান করতে পারছে না!

তার ঘরে সামান্য যে কয়েকটি সামগ্রী ছিল, তার মধ্যে একটি হল বিয়ারিৎসের একটি বৃহৎ ফটোগ্রাফ। ওই ছবিতে যেসব পর্যটককে দেখা যাচ্ছে, তাদের একজনকে দেখে, যার মুখ রীতিমতো অস্পষ্ট, তার মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদ বলে মনে হত। সে যদি জানত কী সস্তা গানই না লালেয়ঁদ পছন্দ করে, তাহলে নিশ্চয়ই সেগুলি প্রথমে তার পিয়ানোয়, পরে তার হৃদয়ে আশ্রয় পেতো, যে হৃদয় সর্বদা পরিপূর্ণ হয়ে থাকে বিথোভেনের সিমফনি এবং ভাগনারের অপেরায়। যে মানুষের আকর্ষণ তার জীবনের সমস্ত আহ্লাদ ও বেদনার উৎস, তাঁর জন্য নিজের রুচিবোধকে নিচুস্তরে নামিয়ে আনতেও সে পিছু হটত না, কারণ ওইসব গানের মধ্য দিয়ে সে সেই মানুষটিকে খুঁজে পেত।

এই মানুষটিকে সে জীবনে দু-তিনবার দেখেছে, তাও মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য, জীবনের বাইরের ঘটনাবলীতে যে খুব মামুলি স্থান দখল করে আছে, কিন্তু যে তার মন ও হৃদয় ভরিয়ে রেখেছে নিজের সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে, ফ্রাঁসোয়াজের ক্লান্ত চোখের স্মৃতিপটে কখনো-বা সেই মানুষের ছবি মলিন হয়ে আসত। তখন সে আর তাঁকে দেখতে পেত না, তার আকৃতি-অবয়ব মনে করতে পারত না, এমনকী তার সেই সুন্দর চোখদুটিও স্পষ্ট মনে পড়ত না। কিন্তু সেই মানুষের যেটুকু তার কাছে রয়েছে, এই ছবিই তার সব। এই ছবি হারিয়ে যেতে পারে, এমন ভয় তাকে তাড়া করে। তার কামনাগুলি যদিও তাকে কষ্ট দেয়, তবু এগুলিই তার সমগ্র সত্ত্বা হয়ে উঠেছে, সমস্ত কিছু থেকে পালিয়ে সে সেখানেই গিয়ে আশ্রয় নেয়, তাদের সে আঁকড়ে ধরে থাকে, যেভাবে কেউ নিজের গোপন সম্পদকে আঁকড়ে থাকে।

কারো জীবন ভালো বা মন্দ হতে পারে, শূন্যতায় বিলীন হয়ে যেতে পারে, তবু সে রেখে যেতে পারে অস্বস্তি ও বেদনায় ভরা একটা স্বপ্ন, যদিও কীভাবে তার উদয় হল, তা সে জানতে পারে না, এমনকী নিজের ভাবনার মধ্যেও সে আর তাকে খুঁজে পায় না, সেখানে তাকে লালন-পোষন করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিছু সময়ের জন্য তার মনের ভিতর এইসব উৎপাত চলে, তারপর আকস্মিক আবার সে মঁসিয় দ্য লালেয়ঁদকে দেখতে পায়। আবার তার বেদনাবোধ ফিরে আসে, যদিও এখন তা আহ্লাদের মতো মনে হয়। জানুয়ারির আগে তার ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। তাহলে কীভাবে ফ্রাঁসোয়াজ পারিতে ফিরে এসে সব সহ্য করতে পারবে? এখন থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সে কী করবে? ফ্রাঁসোয়াজ কী করবে? আর তারপর ফিরে এসে লালেয়ঁদই বা কী করবে?

অন্তত কুড়িবার বিয়ারিৎস গিয়ে লালেয়ঁদকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম। এর পরিণতিও মারাত্মক হতে পারত। কিন্তু এ নিয়ে জল্পনা করা বৃথা। ফ্রাঁসোয়াজকে এ নিয়ে কিছু বলার প্রশ্ন ছিল না। সে অনুমতিও দিত না। কিন্তু সেই উদ্ভট প্রেমের নির্দয় আঘাতে তার কপালের মসৃন ত্বক ভিতর থেকে কুচকে যাচ্ছে, শরীর ভেঙে যাচ্ছে দেখে আমার দুঃখ হত। তার জীবনের ছন্দেই মিশে গিয়েছিল এই নিদারুণ যন্ত্রণা। অনেক সময় সে কল্পনা করত, শীঘ্রই লালেয়ঁদ ত্রুভিলে এসে পৌঁছোবে, তার কাছে আসবে, তাকে সে ভালোবাসে, এই কথা জানাবে।

সে তাকে দেখতে পেত। সে দেখত, তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। তার সেই অভিব্যক্তিহীন, স্বপ্নিল স্বরে সে তার সঙ্গে কথা বলছে, যা একইসঙ্গে তাকে বিশ্বাস করতে নিষেধ করে, আবার তার কথা শুনতে বাধ্য করে। সেই এসব কথা বলে। সে সেইসব শব্দ উচ্চারণ করে, যা আমাদের উত্তেজিত করে, অথচ যাদের আমরা শুধুমাত্র স্বপ্নেই শুনতে পাই। দু-জনের নিয়তি যেন মিলিতভাবে হেসে ওঠে। এই হাসি উজ্জ্বল ও হৃদয়বিদারক, স্বর্গীয় ও বিশ্বস্ততায় পরিপূর্ণ। তখনই আকস্মিকভাবে তার ঘুম ভেঙে যায়।

সে অনুভব করে, তার বাস্তব জগৎ এবং তার কামনার জগৎ, সমান্তরালভাবে বয়ে চলেছে। শরীর ও তার ছায়া যেমন কখনোই একে অপরের সাথে মিশে যেতে পারে না, তেমনই এই দুই জগতের মিলনও কোনওদিন সম্ভব নয়। তখনই তার মনে পড়ে সেই মুহূর্তের কথা, যখন তাদের কনুই পরস্পরকে স্পর্শ করেছিল, যখন সে তাঁর শরীর তাকে দিতে চেয়েছিল। তখন যদি তার ইচ্ছা হত, তখন যদি সে তাকে জানত, তাহলে এখন যেমন চায়, সেভাবে দু-হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরত। কিন্তু সে এখন অনেক দূরে চলে গেছে, সম্ভবত চিরকালের জন্য।

ডুবন্তের জাহাজে যেমন হাহাকার শোনা যায়, তেমনই হতাশা ও বিদ্রোহের এক তীব্র চিৎকার যেন ভিতর থেকে উঠে এসে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরে। সাগরতীরে বা বনের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবাবেশে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। কোনও মিষ্টি গন্ধ, বা বাতাসে অস্পষ্টভাবে ভেসে আসা গানের আওয়াজ, মুহূর্তের জন্য তার সমস্ত ব্যথা-বেদনা ভুলিয়ে দেয়। তারপরই হৃদয়ের গভীরে সে একটি জঘন্য ক্ষতকে অনুভব করে। সমুদ্রের ঢেউ ছাড়িয়ে বা গাছের পাতার বহু ওপরে, গাছগাছালি বা সাগরের কুয়াশাবৃত দিগন্তরেখায় সে সেই অদৃশ্য ও সদাবিরাজমান জয়ী মানুষের আবছা ছবি দেখতে পায়। মেঘের মধ্য দিয়ে তার চোখ জ্বলতে থাকে ঠিক সেদিনের মতোই, যেদিন সে নিজে থেকে তার কাছে আসার প্রস্তাব দিয়েছিল। এরপর সে উড়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার আগে শেষবারের মতো তার তূণীর থেকে আরও একটি তির ছুঁড়ে তাকে বিদ্ধ করে যায়।

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes