আত্মত্যাগের আত্মশক্তি   হিন্দোল ভট্টাচার্য

আত্মত্যাগের আত্মশক্তি হিন্দোল ভট্টাচার্য

সম্প্রতি একটি সভায় শঙ্খ ঘোষের 'বাবরের প্রার্থনা' কবিতাটিকে ঘিরে কিছু অশিক্ষিত কাব্যে অদীক্ষিত মানুষ নানা মন্তব্য করলেন। বুঝতে পারি না এ কথাই, সাহিত্যে অদীক্ষিত ও অশিক্ষিত অজ্ঞ ব্যক্তিরা কীভাবে সাহিত্য নিয়ে এমন কদর্য মন্তব্য করেন। যাই হোক, মনে হয়, তাঁদের বইটি পড়া উচিত। কারণ অজ্ঞতা তো ভালো ব্যাপার না। ক্ষমতা হাতে মাইক ধরিয়ে দিলেই তো আর বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবির রচিত কবিতা সম্পর্কে এমন কদর্য মন্তব্য করা যায় না। মনে হয়, তাঁদের একটু পড়াশুনো করা দরকার। রাজনীতিতে তাঁরা হারকিউলিসের মতো শক্তিমান হোন। কিন্তু সূক্ষ্ম ও গভীর বোধ অর্জনের জন্য একটু শান্ত ভাবে পড়াশোনা করতে হয়। স্বাধীন ভাবে ভাবতে হয়। সেখানে আনুগত্য প্রকাশ এবং আধিপত্যবাদের সামনে হে-হে বলা সং হয়ে থাকলে, ঘোড়ায়ও হাসবে কত্তা। তো, আমার একটি পুরোনো লেখা, স্বাভাবিক ভাবেই, 'বাবরের প্রার্থনা' নিয়ে, পুনঃপ্রকাশ করলাম, পূর্বের কাগজটির কাছ থেকে একটু ক্ষমা চেয়ে নিয়েই। যদি এটা পড়ে বইটা পড়েন। বা না পড়ে বইটা পড়েন ভালো হয়। নর শব্দের শব্দরূপ জানলেই কেউ যেমন উপনিষদ পড়তে পারে না, তেমন বাংলা জানলেই কেউ শঙ্খ ঘোষের বাবরের প্রার্থনা পড়তে পারেন না, বলাই বাহুল্য। প্রতীক-- ব্যাপার সম্পর্কেও আপনারা সম্ভবত জানেন না। জানলে বুঝতেন, রামও একধরনের প্রতীক। কীসের প্রতীক, তা আবার অন্যদিনের আলোচ্য বিষয়।

 

 

ব্যক্তিগত ভাবে আমি টি এস এলিয়টের ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত প্রতিভায় যে পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার ভাবনার কথা বলা আছে, তা অনুসরণ করতে পছন্দ করি। মনে হয় সমস্ত সার্থক শিল্প ও শিল্পীর মধ্যেই এই সমন্বয় ঘটেছে। তিনি যেমন ঐতিহ্য, ইতিহাসচেতনা এবং  আবহমানকে ধারণ করে আছেন, তেমনভাবেই তিনি আগামীর দিকেও তাকিয়ে আছেন। তার তীক্ষ্ণ পাখির মতো দৃষ্টিতে ধরা পড়ছে যেমন আগামী খুঁটিনাটি, তেমন ভাবেই তাঁর অনুভূতিমালায় পাক খাচ্ছে ঐতিহ্যের শিকড়। এই শিকড়কে যেমন তিনি শেষ কথা বলে ভাবছেন না, তেমন এই শিকড়কে কেটে ফেলেও দিচ্ছেন না, তাকে সম্মান করে, গভীর ভাবে তার প্রতিটি আণুবীক্ষণিক পাঠ করছেন। আবার অজানা নতুন, সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিরতা, ধ্বংসস্তূপের হাহাকার তাঁর কলমের মধ্যে দিয়ে কথা বলে উঠেছে। তিনি যেন এক মাঝপথে পড়ে যাওয়া লোক। তিনি গাইতে চান সুন্দরের গান, কিন্তু আর্তনাদগুলো লিখে রাখেন সহিষ্ণু ও সংযত ভঙ্গিতে। সমস্ত ঘটনার গভীরে যে তাঁকে অবগাহন করতে হবে। জানতে হবে দেওয়ালে লেগে থাকা হাতের ছাপের কারণ। জানতে হবে ও কার পায়ের ছাপ মাটিতে? এই পথে কারা হেঁটে গিয়েছিল?

কবি শঙ্খ ঘোষের বাবরের প্রার্থনা নিয়ে আলোচনা করার কথা আমার। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রতিটি কবির প্রত্যেক কবিতা বই আসলে একটি হলোগ্রামের মতো। তাঁর প্রতিটি কবিতাগ্রন্থেই রয়েছে সেই বীজ, যা তাঁকে শণাক্ত করবে, তাঁর লেখনীর বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিহ্নিত করবে এবং একইসঙ্গে, সামগ্রিক ভাবে কীভাবে এই গ্রন্থের মধ্যে ফুটে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিগত সত্ত্বা, তা যেমন চিহ্নিত করবে, তেমন-ই চিহ্নিত করবে কীভাবে এই গ্রন্থের রয়েছে এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। ঠিক যেমন আমরা। আমরা প্রত্যেকে ধারণ করে আছি আবহমানকালের অখণ্ড চেতনাকে। কিন্তু আবার আমরাই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে প্রতিনিধিত্ব করছি এবং সেই অখণ্ড চেতনাকেও সমৃদ্ধ করছি বিশেষ ব্যক্তিত্বের অবদানে। হাতের ছাপ রেখে যাচ্ছি দেওয়ালে।

বাবরের প্রার্থনা এমন একটি কাব্যগ্রন্থ, যেখানে কবি শঙ্খ ঘোষ একইসঙ্গে অন্তর এবং বাহিরের সঙ্গে গ্রীক নাটকের কোরাসের মতো কথা বলছেন। আবার শেক্সপীয়রের নাটকের সলিলকির মতো কখনও তাঁর কণ্ঠস্বর থেকে ধ্বনিত হচ্ছে গভীর গভীরতম উচ্চারণ। কোরাস এবং সলিলকির যুগপৎ সঙ্গত তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটিকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা স্পর্শ করাই কঠিন। পাশাপাশি আমি বলতে চাই সমকালীনতার কথা। এই বইয়ের কবিতাগুলি মনে হয় এই দুহাজার উনিশের ভারতবর্ষে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যে অসহিষ্ণুতা, যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হিংসা, যে অস্থিরতার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে মানবিকতার, ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে, সেখানে আমরা সত্যই চোখে অন্ধকার দেখছি। সেই অন্ধকারে মন্ত্রের মতো প্রতিধ্বনিত হয় শঙ্খ ঘোষের এই কাব্যগ্রন্থের এক একটি কবিতা। মনে হয়, আমিও তো বলতে চাই এই কথাগুলিই। কিন্তু এই কথাগুলি কি উচ্চকিত ভাবে বলা? এই কথাগুলি কি স্লোগান? না। এই কথাগুলিতে কি শঙ্খ ঘোষের কাব্যব্যক্তিত্ব নেই? তাঁর যে আবহমান সত্ত্বা ঐতিহ্যের শিকড়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সমকালীনতার দিকে তাকান, তা নেই? না, তাও নয়। সবকিছুই আছে। এক নীরব ভাষা রয়েছে। যে ভাষায় রয়েছে দৃঢ়তা। যেমন-

আমি বলতে চাই, নিপাত যাও

এখনই

বলতে চাই, চুপ

 

তবু

বলতে পারি না। আর তাই

নিজেকে ছিঁড়ে ফেলি দিনের পর দিন।…

 

( ধ্বংস করো ধ্বজা)

 

এই কবিতাটি দিয়ে শুরু হয় বাবরের প্রার্থনা নামক কাব্যগ্রন্থটি। নিজের কাছে নিজের প্রশ্ন আসে, তবে কি আমি সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার জায়গা থেকেই তাঁর এই বইটিকে আলোচনা করব, না কি আবহমানকালের কাব্যিক প্রবহমানতার এক অংশ হিসেবে। আসলে এই দুটি কাজ একসঙ্গে যে গ্রন্থে লেখাই আছে, তাকে তো সেই গ্রন্থের মতো করেই পড়ে যেতে হবে। আর আলোচনা তো পড়ার এক প্রতিফলন ছাড়া আর বিশেষ কিছুই না। আমি আর কীই বা করতে পারি, যেভাবে পড়ছি, তার অপ্রত্যাশিত দিকগুলিকে তুলে ধরা ছাড়া। এই যেমন এই কবিতাটিতে, পুরনো গাছের গুঁড়ি শীর্ষক কবিতাটিতে তিনি লিখলেন- “ দুধারে ছড়ানো এই প্রণতি ও উত্থান, মনে হয়েছিল/ তুমি আছো, আছো তুমি। তবু// চোখ যদি ফিরে আসে মূলে/ খুলে যায় রজনীর নীল-/ নিচু হয়ে বলি ঃ / পুরনো গাছের গুঁড়ি, বাকলে ধরেছে কত ঘুণ?” বাবরের প্রার্থনা সমগ্র কাব্যগ্রন্থটিই এভাবে কখনও আবহমানতাকে থেকে তুলে আনে ঐশ্বর্যের খনি, তো কখনও সাম্প্রতিকতার মধ্যে থেকে তুলে আনে সেই আবহমানতার প্রতীক। সে যেন ইতিহাসযানের ভূমিকা পালন করার জন্যই এসেছে এখানে। এই ভূমিকা কিন্তু কবি তাঁর জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ দিনগুলি রাতগুলি থেকেই করে আসছেন। এটি রীতিমতো ভাবার বিষয় যে কবির বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ১৯৭৬ এর অগস্টে। অর্থাৎ ধরে নিতেই পারি, জরুরি অবস্থার যে স্বৈরতান্ত্রিক ভারতবর্ষে বসে তিনি এই কবিতাগুলি লিখেছিলেন এবং তার আগে যে ব্যাপ্ত সময় জুড়ে শাসকের হাতে খুন হয়ে গিয়েছিল মানুষের কণ্ঠ, যে টালমাটাল সত্তর দশকের প্রেক্ষাপটেই তিনি লিখেছিলেন এই সমস্ত কবিতা, তাতে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এই রক্তক্ষরণ শঙ্খ ঘোষের কবিতায় ততটা উচ্চকিত নয়, বরং নীরব। আর এই নীরবতার, এই শূন্যতার, এই স্থানাঙ্কহীনতার মধ্যেই কবি খুঁজে চলেছিলেন সমস্ত মানুষের শ্বাস নেওয়ার বসবাসযোগ্য জায়গা। এই শূন্যতাকে, বাধ্যতামূলক নীরবতাকে তিনি লিখেছিলেন নানা ভাবে। যেমন- ফিরে আসার সময়ে কেবল শোনা যায় পায়ের শব্দ- / কোনও একজন নেই/ সে কথা কারো-বা মনে পড়ে অল্প-স্বল্প।“ ( ডানা এখন চুপ)

কিন্তু একজন প্রকৃত কবির কাছে কবিতা হল দিগন্তের মতো। দিগন্তের মধ্যে সমস্ত রঙ, সমস্ত উচ্চতা, দৃশ্যগুলি কেমন একরকমের হয়ে যায়। যেন সবাই মিলেমিশে বলতে থাকে একটিই কোনও কথা।  ঠিক সেভাবেই সমস্ত যন্ত্রণা কখনও কখনও মিশে যায় যন্ত্রণাবোধের ভিতর। সমস্ত পৃথক পৃথক ক্ষুদ্র সত্য তখন মিলেমিশে রচনা করে এক বৃহত্তর সত্যের। দুঃখ তখন দুঃখবোধের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। ছোট দুঃখের থেকে শিল্পী বা কবি বা ভাবুক তখন রওনা দেয় বড় দুঃখের দিকে। এই যে নীরবতার কথা কবি বললেন, সেই নীরবতার নানা দৃশ্যকে, নানা স্তব্ধতাকে তিনি আবিষ্কার করতে থাকেন। একজন কবি যখন এই বড় দুঃখের কাছে পৌঁছে যান, তখন  তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় এক নির্বিকল্প বোধি।

 

… দিনের বেলা যাকে দেখেছিলে চণ্ডাল

আর রাত্রিবেলা এই আমাদের মাঝি

কোনও ভেদ নেই এদের চোখের তারায়

 

জলের ওপর উড়ে পড়ছে স্ফূলিঙ্গ

বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে ভস্ম

পাঁজরের মধ্যে ডুব দিচ্ছে শুশুক

 

এবার আমরা ঘুরিয়ে নেব নৌকো

দক্ষিণে ঐ হরিশ্চন্দের ঘাট

দুদিকেই দেখা যায় কালু ডোমের ঘর

 

চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা

এক শ্মশান থেকে আরেক শ্মশানের মাঝখানে

আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না।

 

( মণিকর্ণিকা)

 

 

এই মাঝি, এই পারাপার কি আবহমানের পারাপার নয়? যে বলে ‘ অনুমোদনের জন্য হৃদয়ে অপেক্ষা নেই আর’। যে ভীষণ একাকী হয়ে যায় এই ভারতবর্ষেই। একাকী হয়ে যায় জীবনের সমস্ত অনুসন্ধানের কাছে গিয়ে। আমাদের জীবনপ্রণালী প্রকৃতই একটি শ্মশান থেকে আরও একটি শ্মশানের মাঝখানে কারো মুখের দিকে না তাকানোর মতো শূন্যতা। কিন্তু কবি তো শুধু এই শূন্যতার কথা বলতে চান না। এখানেই তো কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে তথাকথিত অস্তিত্ববাদী আধুনিকতার বিরোধ। যে অস্তিত্ববাদী আধুনিকতা মানুষকে শুধুমাত্রই শূন্যতার মধ্যে নিজেকে শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বরূপে ভাবতে শেখায়, জানায়, কবি অনেকটাই তার বিপরীতে। তিনি জানেন যে খণ্ড অস্তিত্ব একপ্রকার মায়া মাত্র। আবার অখণ্ড অস্তিত্ব একপ্রকার ধারণা মাত্র। কিন্তু তিনি খণ্ড অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়ী শূন্যতার কাছে আত্মসমর্পণ করেন না। বরং তিনি আরও বড় কোনও শূন্যতার কথা বলেন। যা শূন্য হলেও শূন্য নয়।

 

“ তোমার কোনও বন্ধু নেই তোমার কোনও বৃত্তি নেই

কেবল বন্ধন

তোমার কোনও ভিত্তি নেই তোমার কোনও শীর্ষ নেই

কেবল তক্ষক

তোমার কোনও নৌকো নেই তোমার কোনও বৈঠা নেই

কেবল ব্যাপ্তি

তোমার কোনও উৎস নেই তোমার কোনও ক্ষান্তি নেই

কেবল ছন্দ”

 

(তক্ষক)

 

এই যে মন্ত্রের মতো একটি কবিতায় কবি বলছেন আসলে আমাদের কিছু নেই। এই না-থাকাটা যে এক বিরাট বড় থাকা। এই শূন্যতা যে এক বিরাট বড় পূর্ণতা, তা তো আমরা এই বইয়ের পরের একটি কবিতায় পেয়ে যাব। যেখানে তিনি বলছেন-

 

“ কেননা উড়ন্ত ফুল, চিতার রূপালি ছাই, ধাবমান শেষ ট্রাম

সকলেই চেয়েছে আশ্রয়

 

সেকথা বলিনি? তবে কীভাবে তাকাল এতদিন

জলের কিনারে নিচু জবা?

 

শূন্যতাই জানো শুধু? শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে

সে কথা জানো না?”

 

( শূন্যের ভিতরে ঢেউ)

 

 

একদিকে যেমন শূন্যতা রয়েছে, তেমন আরেকদিকে শূন্যের ভিতরে রয়েছে ঢেউ। এই দুটিকেই তো জানতে বা অনুভব করতে হবে আমাদের। মাঝেমাঝে মনে হয় বাবরের প্রার্থনার কবিতাগুলি বেলা অবেলা কালবেলার ঠিক পরের ভাবনাস্রোত। যেমন ভাবে এই কবিতাগুলিকে আমরা ওয়েস্টল্যান্ডের পরের ভাবনাস্রোত হিসেবেও ভাবতে পারি। এমনকী যেখানে হলো মেন শেষ হয়ে গিয়ে বলছে – দিস ইজ দ্য ওয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড এন্ডস/ নট উইথ এ ব্যাং/ বাট এ হুইম্পার, ঠিক তার পরে শুরু হচ্ছে এই কবিতাগুলির ভাবনাস্রোত।

ঠিক এইখানে এসে আমার আবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, কবিতার নিজস্ব এক সত্ত্বা আছে। এই প্রকৃতি কথা বলছেন, কথা বলাচ্ছেন। কারো কারো কাছে এই প্রকৃতির জায়গায় ঈশ্বর হতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে তিনি এই মহাপ্রকৃতি, বিশ্বসংসার। তিনি সমস্ত কথা প্রকাশ করার জন্য বলে গেছেন। সেই কথাগুলি উপযুক্ত আধার খুঁজে বেড়াচ্ছে। যে এই আধার হয়ে উঠছে, সে কথাগুলিকে প্রকাশ করছে। তাই মনে হয় জীবনানন্দ যে কথাগুলিকে বলেছিলেন তাঁর বেলা অবেলা কালবেলা কাব্যগ্রন্থে, বাবরের প্রার্থনার কবিতাগুলি ঠিক তার পরে বলে ওঠা। আর অন্যদিকে হলো মেনে যে সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এলিয়ট, তার পরের-ই এই উচ্চারণ- শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সে কথা জানো না? কিন্তু আমরা কি আদৌ পড়ি এ ভাবে? ট্রান্সমাইগ্রেশন অফ সোল যেমন হয়, তেমন কি হয় না ট্রান্সমাইগ্রেশন অফ থট? আত্মার কি আদৌ পুনর্জন্ম হয় না কি হয় সেই সব ভাবনার, যেগুলি হঠাৎ করে অপ্রত্যাশিতর মতো জ্বলে ওঠে। কারণ এই প্রকৃতি তো সেই সব কথার জন্য অপেক্ষা করে থাকে।

তো, কবি শঙ্খ ঘোষ ঠিক এভাবেই অস্তিত্ববাদী আধুনিকতার থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। সেখানে নীরবে যেমন উপস্থিত থাকলেন রবীন্দ্রনাথ, তেমন-ই নিয়তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন জীবনানন্দ। কিন্তু কবি নিজেই তো এই কাব্যগ্রন্থে বলে গেছেন- ‘ কেউ কারো মতো নয়, সমস্ত নিঃশব্দ নিজে আলো’। ফলে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না, যাবতীয় নেতিগুলিকে নিয়েই তিনি এক অস্তির দিকে এগিয়ে যান সবসময়। আজ থেকে দশ বছর আগে যখন এই কাব্যগ্রন্থ পড়েছিলাম, তখন সত্যি বলছি, মনে হয়েছিল, এই যে এত আলো আসছে এত অন্ধকারের মধ্যে, তা কবির কোথাও এক গাঢ় ঔচিত্যবোধকেই সূচিত করছে। কিন্তু পরে যখন আমার নিজের বয়স বাড়ল, যখন অন্ধকার আর আলোর মধ্যে ততটা পার্থক্য করে উঠতে পারলাম না, যখন বুঝলাম, অন্ধকারও কখনও কখনও আলো, তখন, এই কবিতাগুলি আমার কাছে নিজে নিজেই খুলে গেল। সত্যিই তো তিনি যে ধ্বংসস্তূপের কথা বলছেন, সেখানে তো রয়েছে গভীর গভীরতম অন্ধকার। কিন্তু তিনি তো লিখছেন তো সেই ইতিহাসের কথা, যেখানে বাবর নিজের সন্তান্তের সুস্থ ভবিষ্যৎ চেয়ে বলছেন তাঁকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা। এই যে স্যাক্রিফাইস বা ত্যাগের দর্শনের মাধ্যমে প্রতিরোধ হিংস্র অন্ধকারের বিরুদ্ধে, এটাই তো আলো। এই রিনান্সিয়েশনের দর্শনের হাত ধরেই তো গান্ধীজি একটা সময় তাঁর ব্যক্তিগত সাম্যবাদী ভাবনা এনেছিলেন ভারতবর্ষে। কিন্তু সে প্রসঙ্গে হয়ত অনেক দূরের প্রসঙ্গের অবতারণা। বস্তুত, বাবরের প্রার্থনা কবিতাটিতে ছত্রে ছত্রে আত্মনিবেদন এবং ত্যাগের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা সুস্থ দেশ গড়ে তোলার ভাবনা।

 

… জাগাও শহরের প্রান্তে প্রান্তরে

ধূসর শূন্যের আজান গান;

পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

 

… না কি এ প্রাসাদের আলোর ঝলসানি

পুড়িয়ে দেয় সব হৃদয় হাড়

এবং শরীরের ভিতরে বাসা গড়ে

লক্ষ নির্বোধ পতঙ্গের?

 

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার

জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?

ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

 

এই যে কবিতাগুলি সম্পর্কে আলোচনা করলাম, সেগুলি সবকটাই বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থের প্রথম অংশ মণিকর্ণীকার কবিতা। এর পরের অংশ হল খড়। সেখানে যেমন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হল শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে / সে কথা জানো  না?, ঠিক তেমন মোরগঝুঁটি, খড় – এই কবিতাগুলি যেন এক ভিন্ন ভাষ্যে রচনা করল আস্তিকতার এক পরাবাস্তব।  তরাই থেকে উঠে আসে রাত্রি/ শিখর থেকে গড়িয়ে আসে নিশ্বাস/ মস্ত এক চাকার নীল ঘূর্ণি”। প্রেম ও আস্তিক্যবোধের উচ্চারণ কত যে নীরব এবং নিখিল ও আকাশের মতো সহজ , মহৎ ও উদার হতে পারে, এই কবিতাগুলি তার উদাহরণ। আমরা যদি ধারাবাহিক ভাবে ‘খড়’ অংশের কবিতাগুলির দিকে তাকাই, আমরা দেখতে পাব এক শান্ত প্রতীকী কবির অন্তর্গত সংলাপ। হয়ত অঙ্গার কবিতাটির মধ্যে তার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত আছে।

 

আসলে শান্ত খুব, চুপ

গৃহী বলে মেনে নিই মনে;

হঠাৎ খুলেছে সব জামা

বুকে সূর্যাস্তের হামা

দাউ দাউ জ্বলে ওঠে নীল;

 

তারপর নীরব নিখিল

পড়ে থাকে ক্ষীণ অঙ্গার।

( দু-একটী ছবি/ অঙ্গার)

 

কী অনবদ্য সব হীরকখণ্ডের মতো কবিতা রয়েছে এই অংশে। কখনও মনে পড়ে যায় রুমির কথা আবার কখনও বা মনে পড়ে যায় গ্বালিবের কথাও। অনবদ্য প্রেমের কবিতাগুলির প্রেক্ষাপটে কিন্তু তখন ধোঁয়া উঠছে দূরে কোথাও। এক অন্তর্লীন বিষাদ এবং সংকটের হাওয়া ঘুরছে। কিন্তু তা কখনওই প্রেমকে অতিক্রম করে উঠতে পারেনি। কারণ প্রেম এখানে সেই অখণ্ড পূর্ণতা, যা কবিতাগুলিকে অন্ধকারের বিপ্রতীপে এক ভিন্ন আলো করে তুলেছে। এ প্রসঙ্গে শুধু এই কাব্যগ্রন্থ নয়, বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা প্রেমের একটি কবিতা এখানে তুলে ধরা যায়-

 

এখন তুমি ভালো, কেননা এখন কোনো কথা বলোনি।

 

যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালে, শরীরে লাগল ঢেউ ঃ

 

এই শুধু, আর কোনো কথা নেই

 

চোখের শুশ্রুষা হলো, এই শুধু।

( শুশ্রুষা)

এর পর আবার আমরা ধাক্কা খাই কবির সমকালীনতায়। ফিরে আসি যারা বাবরের প্রার্থনার মতোই আরেকধরনের ত্যাগের মাধ্যমে সমাজটাকে বদল করতে চেয়েছিলেন। যেমন ‘ কিছু না থেকে কিছু ছেলে’ নামক কবিতায় তিনি বলছেন- ‘ তবু তো দেখো আজও ঝরি/ কিছু-না থেকে কিছু ছেলে// তোমারই সেন্ট্রাল জেলে,/ তোমারই কার্জন পার্কে!” আব্বার তিনি লিখছেন হাসপাতালে বলির বাজনা নামক একটি রক্তপাত।

 

… ঠোঁটের ভিতর ফেনিল ঢেউ ঃ এল, ঐ এল ওদের নিশান,

আমায় ছাড়! তুবড়ি ওঠে জ্ব’লে।

 

আমরা সবাই বলেছিলাম ঃ শেষ সময়ের প্রলাপ।

 

হাসপাতালে বলির বাজনা ঃ ভাই ছিল ফেরার।

 

যদি জরুরি অবস্থা এবং নকশাল আন্দোলনের কথা ভাবা যায়, তাহলে, এই কবিতাগুলি হল রক্তপাত, প্রতিবাদ এবং নীরব অনুচ্চকিত প্রতিরোধের এক প্রমাণ। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এই কবিতাগুলির অনেকগুলিই নিকানোর পাররার-এর কবিতার অন্তর্গত প্রতিরোধ এবং শূন্যতার কবিতাগুলির সঙ্গে সমতূল্য। আমার কাছে অন্তত শাস্তি, কালযমুনা, পাখি বিষয়ে দুটি, মার্চিং সং, বিকল্প – এই কবিতাগুলি চরমতম রাজনৈতিক। রাজনৈতিক এই কবিতাগুলিতে স্পষ্টত ফুটে উঠেছে সেই সময়ের এক একটা ভাঙা চিত্র। রাজনীতিও যে কত সূক্ষ্মভাবে সামান্য স্পর্শের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে হয়, তা কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কবি শঙ্খ ঘোষের এই কবিতাগুলিতেও স্পষ্ট।

 

১) নিচু গলায় কথা বলার অপরাধে তার

যাবজ্জীবন

কারাদণ্ড হলো।

 

হামলে পড়ল তার ওপর তিনটে ভালুক

ঠিক ভালুক নয়, প্রহরী

ঠিক প্রহরীও নয়, সত্যি বলতে, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

 

মেরুদণ্ড থেকে শাঁস তুলে নিতে নিতে

বলল তারা, খবরদার

এদিক-ওদিক তাকাবে না, কেবল গলা খুলে চেঁচাও।

 

(শাস্তি)

 

২) বন থেকে বেরুলেন টিয়ে

ইতিউতি তাকালেন

তারপর উঠলেন গিয়ে

বাবুদের মোটরে

এবার শিল্প হোক, এবার শিল্প হোক

বাবুরা মাতেন বনে

কোটরে।

 

( উপঘরণী)

 

৩) পেটের কাছে উঁচিয়ে আছ ছুরি

কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি

এখন সবই শান্ত, সবই ভালো।

তরল আগুন ভরে পাকস্থলী

যে-কথাটাই বলাতে চাও বলি

সত্য এবার হয়েছে জমকালো।

 

( আপাতত শান্তিকল্যাণ)

 

৪) শব্দ কোর না

হেসো না বাচ্চা

চুপ

হাত-পা ছুঁড়ো না

দাঁত খুলে রাখো-

বাঃ

এবার শান্তি

স্বস্তি এবার

ওঁ!

 

(শৃঙ্খলা)

 

৫) সবাই যদি বলেও আমায়

মিথ্যে এবং মেকি

নিজের কথার জ্বালায় যদি

জ্বলে নিজের ডেরা

পুড়তে পুড়তে তখনও তার

জানলা দিয়ে দেখি

জীবনযাপন করছে যত

চাকরবাকরেরা।

(বাবু বলেন)

 

৬) … এবার নিভৃত এই অপমানে শোকে

যে-কটি অন্তিম জবা উঠেছিল জ্বলে

আগুনে ঝরিয়ে দিতে হবে। আর তোকে

যমের দক্ষিণ হাতে দিতে হবে আজ

চায় তোকে দৃষ্টিহীন বধির সমাজ!

 

(নচিকেতা)

 

যতবার বাবরের প্রার্থনা – এই বইটির কাছে পৌঁছই, তত মনে হয় এই বইটি আজকেই লেখা হল। বইটির মধ্যে প্রথমেই যে ইতিহাসযানের কথা আলোচনায় এনেছিলেন, তার সঙ্গে আমি যুক্ত করতে চাই সময়যানের কথাও। তবে, তা কেবলমাত্রই এ কারণে নয়, যে , যে অস্থিরতা সে সময়ে এই বইয়ের অনেক কবিতার অন্তর্নিহিত জগতের রান্নাঘর, সেই অস্থিরতার চেয়েও আরও বড় কোনও অস্থিরতা আমাদের এই সময়েও চেপে ধরেছে। ১৯৭৬ কিংবা তার আগের যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রেক্ষিতে এই কবিতাগুলি রচিত, এখন তার চেয়েও ভয়ংকর এক ফ্যাসিবাদী ভারতবর্ষে আমাদের বসবাস। প্রতি মুহূর্তে আমাদের দিকে চোখ পাকাচ্ছে সেই ভয়ংকর পরিস্থিতি। আজকেও যখন কবিতাগুলি পড়ছি, নিজেকে ও নিজের সময়কে যেন দেখতে পাচ্ছি কবিতাগুলির মধ্যে। পাঠক হিসেবে মনে হচ্ছে, না- হলেই বরং ভালো হত। যদি, এই কবিতাগুলি পড়ে বলা যেত ১৯৭৬ এর সমসাময়িক এই ঐতিহাসিক দলিল হয়ে বাবরের প্রার্থনা সময়ের কাছে সাক্ষ্য রেখে গেছে এবং যাচ্ছে, তাহলে হয়ত শান্তিতে থাকতাম। কিন্তু এখন শাসক, রাষ্ট্র এবং মৌলবাদীদের ভ্রুকুটির সামনে বসে এই কবিতাগুলি ছাড়া আমাদের আর অন্য কোনও অবলম্বন নেই। বাংলা তথা ভারতের রাজনৈতিক কবিতার ইতিহাস যদি লেখা হয়, তাহলেও রাষ্ট্রের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই কবিতাগুলিকেও আমাদের আগামীকালের দিকে এগিয়ে দিতে হবে। তার সঙ্গে মনে রাখতে হবে রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি তিনি এক অস্তির দর্শনের কথাও বলেছেন এই কাব্যগ্রন্থে, বলেছেন ট্রান্সমাইগ্রেশন অফ সেলফ-এর কথাও। নীরবতা এবং স্বরের মধ্যে যে হাইফেন, তা অতিক্রম করেছেন কবি। জীবনজিজ্ঞাসার গভীরতম প্রশ্নগুলিকেও তুলে ধরেছেন। ফলে এই বাবরের প্রার্থনা নামক কাব্যগ্রন্থটিকে কিন্তু কোনও ছাঁচে ফেলতে পারবেন না কেউই। কবিতাও যে একধরনের যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ যে কেবল সামনের কোনও শত্রু নয়, কখনও কখনও সেই শত্রু নিজের ভিতরেই লুকিয়ে আছে, টেনে বের করতে হয় তাকে। এই সামগ্রিকতার যুদ্ধকেই তিনি লিখে রেখেছেন এই কাব্যগ্রন্থে। খেয়াল রাখতে হবে, এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটির নাম-ই ধ্বংস করো ধ্বজা। কিন্তু এই ধ্বজা আসলে কোথায়? যেমন তা বাইরে আছে, তেমন তা তো ভিতরেও আছে। আর তাকে ধ্বংস করা যায় আমার আত্মশক্তি দ্বারাই। এই কাব্যগ্রন্থ আত্মশক্তির মন্ত্র উচ্চারণ করে প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই। সভ্যতার এই চরম সংকটে হয়ত এই কাব্যগ্রন্থটি আমাদের মতো প্রতিটি মানুষের গোপন রেডবুক অথবা নিত্য ম্যানিফেস্টো হয়ে উঠতে পারে।

আর কিছু না বদলাতে পারি, অন্তত নিজেকে তো বদলাই। শূন্যের ভিতরে যে অনেক ঢেউ। আত্মশক্তির এই কাব্যগ্রন্থটিকে আমরা বাংলার এক চিরকালীন সময়চেতনার কাব্যগ্রন্থ বলতেই পারি। আগামীকাল এই কাব্যগ্রন্থটিকে আবার নতুন করে পড়ুক, এই আশা রাখি সময়ের কাছে।

 

বাবরের প্রার্থনা। শঙ্খ ঘোষ। দেজ ।

প্রচ্ছদ করেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী।

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes