
রুমেলা দাশগুপ্ত-র কবিতাগুচ্ছ
তুমি স্বর, স্বরধ্বনি
১.
তোমাকে বসাবো যে আসনে
ফুলের মতন কিছু এঁকে এঁকে রাখি,
তুমি বুঝি দেবতার মতো
অলৌকিক কিছু শখ গোপন রেখেছ,
আমিও তেমনই এই পৃথিবীর ঘরে
দেয়ানেয়া শেষ করে
ফিরে যাব ভাবি,
অন্য সে পথের টানে ভারহীন দেহ
তোমাকেই দেব,
যেন ডেকে যাবে কোনো নামে
এই পৃথিবীর হয়তো চেনা,
তাই, বারে বারে ফিরে দেখে,
কে যে কাকে এত ডাকে
আকণ্ঠ তেষ্টায়,
এত শক্তি, এত লোভ, এত রুখে যাওয়া
কে যে এত টেনে ধরে
মনে মনে শুধু দোষারোপ!
২.
হতেও তো পারতো
এই অবসরে তুমি এসেছ গোপনে,
সরোবরের সে কোন কাঁপা কাঁপা জলে
পড়েছে তোমার গাঢ় ছায়া,
ঘন নীল জল যেন মুহূর্তে অচেনা,
কী স্বাদু উপায়ে তুমি মিশেছ সন্দেহে,
তুমি, নাকি তোমার পিপাসা,
কার অপরিশোধিত তেজে
এতখানি কেঁপে উঠি!
শূন্যতা না জেনে দেখো পড়েছি ঝাঁপিয়ে,
সরোবরে।
৩.
মুছে দিই স্মৃতি,
ঘরের ভিতর আরো কিছু
যা ছিল, ছিল না জেনে মন দৃঢ় হয়
পাঠ নেয় নিয়ম মেনেই,
তোমার অলক্ষ্যে আজ
পরিচয় তোমার সাথেই,
তাই মিছিমিছি রোদ এলে ভয় নেই
তোমার ছাতার নিচে দেহসার কথা
রেখে যাই সচেতন,
অনিমেষ তুমি এই দূরপাল্লার ট্রেনের ছায়া
রেখেছ গোপন
আমি সেখানেই মুছি রোদ, মুছি স্মৃতি
আরও ধীরে যে দহন!
৪.
যেকোনো সংলাপে জুড়ে থাকি-
পরিত্রাণ এই,
নইলে জ্বর এসেছে যেভাবে,
প্রতিরাতে,
কেড়ে নিয়ে গেছে ঘুম, কিছুটা ব্যথাও
বালিশে বালিশে দাগ অবিন্যস্ত খেলা
অভ্যাসে খুলেছে মুখ, তুলেছে প্রসাদ,
তবুও তো সারেনি অসুখ,
যে-সংলাপ ঘোরে ফেরে
শুধু তারই হাওয়া
চিনিয়েছে জটিল সে ভ্রম।
৫.
ফের আছড়ে পড়েছে সুনামি
আছড়ে তো পড়তোই,
সারাটা সকাল জুড়ে যেভাবে কুড়িয়ে রেখেছিলে মেঘ,
ভয় হয়, এই এত তেজ
বিফলে যায়নি তো ,
কতদিন তো এমনই এসেছে প্রলোভন,
কত রঙ্গরস ফেলে তোমার কাছেই
অফুরান দিন,
যদি না ভরে এ মন, ভয় তো ছিলই
তবে কি এবারে মিলে গেল যত ধাঁধা
জটিল গণিত!
কতদিন পরে দু’পা ধুয়ে নিতে নিতে
একমনে তাকিয়ে থেকেছি
জলের তলায়।
৬.
সবটুকুই সঙ্গত, তাই
এই আছড়ে পড়ে থাকা মেনে নাও আজ,
অথবা, অলীক কোনো স্বপ্নে
তোমার আসার কথা ছিল,
এই সত্যটুকু মনে থাক,
সমস্ত কাজের শেষে অমূলক ভয়
তোমাকে ঘিরেছে,তাই
তুমি অস্বীকার এই মেঘ দেহ জল,
অসঙ্গত তোমার অভাব।
৭.
আশ্চর্য শৃঙ্খলা,
অসময়ে হাজিরা খাতায়
উপস্থিতি জানান দিয়েছে,
বারেবারে
তারপর ফের যেই ঘুরিয়েছে মন,
দুর্বার স্মৃতির মাথা কোটা,
যেভাবেই হোক, এসো আজ
যে সময় ধার্য ছিল,
হতে পারে কিছুটা আগেই
অবিভক্ত মন নিয়ে এসেছ প্রকৃত,
কবিতার মতোই তোমার
উদ্বেল স্বভাব,
এনে দাও শেষ রাত, অথবা গোধূলি
বিশৃঙ্খল এত মার
সয়ে যাব জেনেছ যখন,
দাও তবে তোমার আদর!
৮.
অদ্ভুত সন্দেহ জাগে
পাড়ার মোড়ের দোকানীকে কী যেন দেখাতে চেয়ে,
হাত নেড়ে ইশারায় খুব
দুপুরের রক্ত শুষে নেওয়া বিশ্রী রোদে
ডাকাডাকি,
কতবারই সে তাকিয়ে দেখে
ভাবি, বুঝে গেছে এই বার
অথচ ফিরিয়ে নেয় মুখ,
অন্ধকার নামে,
অন্ধকারে একা আমি
আরও একা হয়ে যাব, এই ভেবে
মাথার কাছেই রাখা কাচ
দেখি, দোকানেরই ধারে
ঢেলেছে জ্যোত্স্না
কে বলে দেখেনি সে আলো
নদী পাড় ধুয়ে সারারাত চাঁদ,
যা ছিল বলার মতো,
ধুয়ে যায়
ছাদের কিনার বেয়ে
নিরুপায় কোনো হাত ধরে।
৯.
এই রূপ সত্য নয় জেনে এতদূর
কত রোদে জলে ঘুরে শ্রাবণে আশ্বিনে
ভেঙেচুরে
দেখেছি নির্লজ্জ চেয়ে থাকা,
পারদের চড়তে থাকা অসীম সিঁড়িতে,
তুমি মনোবল
কী বিপুল জয়ে অধিষ্ঠিত!
অন্যথা সম্ভব নয়, জেনে বারে বারে
মাথা রেখে আসি ওই নিভৃত আসনে,
তারপরে যা হবার হোক!

