আলো যেখানে কম <br /> একটি টেক্সটের জন্ম ও পাঠের যৌথ জীবনী ফিকশনের লেখা, পাঠ ও চিন্তা নিয়ে লেখামালা | দ্বিতীয় কিস্তি | অগাস্ট ২০২৬ <br /> অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

আলো যেখানে কম
একটি টেক্সটের জন্ম ও পাঠের যৌথ জীবনী ফিকশনের লেখা, পাঠ ও চিন্তা নিয়ে লেখামালা | দ্বিতীয় কিস্তি | অগাস্ট ২০২৬
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্পাদকীয় নোট-- একটি টেক্সটেরও জীবন আছে। তার জন্ম আছে, নীরবতা আছে, পাঠ আছে, এমনকি তার পুনর্জন্মও আছে। সেই জীবনকে অনুসরণ করার এক দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়েছে আবহমান-এর জুলাই (২০২৬) সংখ্যা থেকে। অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন লেখামালা ‘আলো যেখানে কম’ ফিকশনের লেখা, পাঠ ও চিন্তার নানা দিক নিয়ে ধারাবাহিক গদ্যে ক্রমান্বয়ে নির্মিত হচ্ছে। একটি বাক্য, একটি দৃশ্য, একটি কণ্ঠস্বর, একটি দৃষ্টি কিংবা একটি নীরবতাকে কেন্দ্র করে এই লেখাগুলি টেক্সটের নির্মাণ ও অর্থ-সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে ভাবতে আহ্বান জানাবে। প্রতি মাসে একটি করে গদ্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে আবহমান-এ। আজ ‘আলো যেখানে কম’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম পর্ব ‘কে কথা বলছে?—কণ্ঠস্বরের জন্ম’।

 

২.

 

কে কথা বলছে?
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

২.১ কণ্ঠস্বরের জন্ম
‘হাতিই সব প্রাণীর মধ্যে সর্বাধিক প্রাজ্ঞ। একমাত্র সেই-ই তার পূর্বজন্মগুলির কথা স্মরণ করতে পারে। আর সেই কারণেই সে দীর্ঘ সময় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—নিজের সেই পূর্বজন্মগুলির স্মৃতি নিয়ে ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে।’
— একটি বৌদ্ধ সূত্র, অঁদ্রে মালরো, ‘অ্যান্টি মেমরিজ’

প্রথম পড়ায় মনে হয় উদ্ধৃতিটি যেন হাতিকে নিয়ে। দ্বিতীয়বার পড়লে বোঝা যায়, এটি স্মৃতিকে নিয়ে। আর একটু মন দিয়ে পড়লে মনে হয়, আসলে এটি ভাষাকে নিয়ে।
হাতি কেন প্রাজ্ঞ? কারণ সে অনেক কিছু জানে বলে নয়; কারণ সে মনে রাখতে পারে। প্রজ্ঞা এখানে তথ্যের আর-এক নাম নয়, স্মৃতির আর-এক নাম। যে নিজের পূর্বজন্মের দিকে ফিরে তাকাতে পারে, সে জানে, কোনও জীবনই একা নয়। বর্তমানের মধ্যে বহু অতীত নীরবে এসে বাস করে।
একটি সত্যিকারের বাক্যও কি তেমন নয়? আমরা যখন কোনও মহৎ সাহিত্যকর্মের একটি বাক্য পড়ি, তখন কি শুধু সেই মুহূর্তে লেখকের লেখা কয়েকটি শব্দ পড়ি? নাকি তারও অনেক আগে থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে? সেই বাক্যের ভেতরে এসে বসে আছে বহু পুরোনো উচ্চারণ, বহু বিস্মৃত ছন্দ, বহু অদেখা অভিজ্ঞতা, বহু অজানা পাঠ। এমন কিছু শব্দও সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়, যেগুলো হয়তো লেখক নিজেও কোনও দিন সচেতনভাবে শোনেননি। ভাষা তাঁর ভেতরে বহুদিন ধরে জমেছে, পাল্টেছে, অপেক্ষা করেছে; তারপর একদিন একটি বাক্যের রূপ নিয়েছে।
তাহলে একটি বাক্যেরও কি পূর্বজন্ম থাকে?
সম্ভবত থাকে। কারণ একটি বাক্য কখনও একা জন্মায় না। আমরা যাকে একজন মানুষের ভাষা বলে চিনতে শিখি, তার ভেতরেও বহু জীবনের প্রতিধ্বনি জমা থাকে। জন্মের পর থেকেই আমরা অন্যের শব্দ ধার করে পৃথিবীকে চিনতে শিখি। প্রথমে মায়ের মুখ, তারপর ঘর, উঠোন, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি, বই, প্রেম, অপমান, শোক, গান, গল্প, প্রার্থনা, লোককথা—একটি জীবন যত এগোয়, ততই তার ভেতরে আরও অসংখ্য কণ্ঠস্বর এসে বাসা বাঁধে। আমরা যখন লিখতে বসি, তখন একা বসি না। আমাদের সঙ্গে বসে সেই সমস্ত শোনা শব্দ, বিস্মৃত উচ্চারণ, পড়ে-ফেলা বই, হারিয়ে-যাওয়া মুখ, এমনকি এমন সব বাক্যও, যাদের উৎস আমরা আর মনে করতে পারি না। না হলে কোনও কোনও বাক্য পড়ামাত্রই আমাদের এত অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হয় কেন? যেন আগে কোথাও শুনেছি, অথচ মনে করতে পারছি না কোথায়। যেন সেটি শুধু লেখকের নয়, ভাষারও স্মৃতি বহন করে এনেছে। তার মধ্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এমন কিছু গভীর মানবিক অভিজ্ঞতাও মিশে থাকে, যা কোনও একক মানুষের সম্পত্তি নয়।
তাই একটি বাক্যের মধ্যে শুধু একটিই কণ্ঠস্বর শোনা যায় না। সেখানে কেউ সম্মতি জানায়, কেউ আপত্তি তোলে, কেউ প্রশ্ন করে, কেউ চুপ করে থাকে। কোনও বাক্য কোনও দিন সম্পূর্ণ একবচন নয়। এমনকি যে বাক্যটি একা বলে মনে হয়, তারও ভেতরে বহু অদৃশ্য সংলাপ চলতে থাকে। একটি বাক্য লেখা মানে অনেক সময়ই সেই সমস্ত কণ্ঠের মধ্যে একটি সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছনো।
এই কারণেই একটি বাক্যকে শুধু তার লেখকের কাছে ফিরিয়ে দিলে তাকে ছোট করা হয়। কারণ লেখক একটি বাক্যের জন্ম দেন বটে, কিন্তু তিনি তার একমাত্র অধিবাসী নন। একটি বাক্যের মধ্যে বাস করে আরও অনেক জীবন, অনেক সময়, অনেক স্মৃতি।
তাই একটি বাক্যের সামনে দাঁড়ালে আমাদের প্রশ্নটিও বদলে যায়। তখন আর শুধু জানতে ইচ্ছে করে না, এর অর্থ কী, কিংবা এটি কে লিখেছেন। জানতে ইচ্ছে করে—এই বাক্যের মধ্যে এসে কথা বলছে কোন কোন কণ্ঠস্বর?
সেজন্যেই একটি বাক্যকে শুধু তার অর্থ দিয়ে বোঝা যায় না। তার ভেতরে শোনা দরকার তার প্রতিধ্বনিগুলিও। কোন কোন কণ্ঠস্বর সেখানে এসে জমেছে? কোন নীরবতা তাকে ঘিরে আছে? কোন বিস্মৃত উচ্চারণ তার শব্দগুলোকে এখনও অদৃশ্যভাবে বহন করে নিয়ে চলেছে?
একটি বাক্যের সামনে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আর-একটি প্রশ্ন ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে থাকে। একটি বাক্য কোথা থেকে এল, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়তো আর-একটি প্রশ্ন—বাক্যটি কার?
প্রশ্নটি প্রথমে খুব সহজ বলেই মনে হয়। একটি উপন্যাসের বাক্য লেখকের। লেখকই তো লিখেছেন। কিন্তু একটু ভেবেই দেখি, বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ একটি উপন্যাস লেখেন একজন মানুষ, অথচ তার ভেতরে কথা বলে কতজন? First Person-এ লেখা মানেই কি লেখক নিজে কথা বলছেন? Third Person কি সত্যিই নিরপেক্ষ? আর কোনও নামহীন কণ্ঠস্বর, যার কোনও শরীর নেই, যে শুধু দেখে, শুধু বলে, সে কে?
আমরা সহজেই আশ্চর্যরকম একটি ভুল করে ফেলি। কোনও উপন্যাসে ‘আমি’ শব্দটি দেখলেই ধরে নিই, এই ‘আমি’ লেখক। যেন লেখক নিজের জীবনই লিখছেন। অথচ সাহিত্য সম্ভবত আমাদের প্রথম যে-শিক্ষাগুলির একটি দেয়, তা হল, ‘আমি’ সবচেয়ে অবিশ্বাস্য সর্বনাম। এই ‘আমি’ কখনও লেখক, কখনও চরিত্র, কখনও মুখোশ, কখনও এমন একটি কণ্ঠস্বর, যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। আবার কখনও এমনও হয়, লেখক নিজের চেয়ে সত্য কথা বলতে পারেন সেই কাল্পনিক ‘আমি’-র মুখ দিয়েই।
একটি ছোট্ট উদাহরণ ভাবা যাক। একটি বাক্য—আমি আজ খুব ক্লান্ত। এই বাক্যটির অর্থ বোঝার জন্য শব্দগুলো জানাই যথেষ্ট নয়। কে বলছে? সারাদিন খেটে-ফেরা একজন শ্রমিক? অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা একজন মানুষ? বহু বছর ধরে নিজের বিবেকের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়া কেউ? না কি একটি উপন্যাসের এমন এক চরিত্র, যে আমাদের সঙ্গে মিথ্যেও বলতে পারে? বাক্যটি একই থাকে, অথচ বক্তা বদলালে তার অর্থও বদলে যায়। অর্থাৎ, আমরা শব্দ পড়ি ঠিকই, কিন্তু অর্থ তৈরি হয় কণ্ঠস্বর থেকে।
এই কারণেই একটি উপন্যাস পড়ার সময় আমাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, কী বলা হচ্ছে। বরং, কে বলছে? কারণ সাহিত্যে অনেক সময় ঘটনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ঘটনাটি কোন গলায় বলা হচ্ছে। একই গল্প হাজার মানুষ বলতে পারে। কিন্তু একই কণ্ঠস্বর আর কেউ ধার নিতে পারে না।
এইখানেই সাহিত্য জীবন থেকে আলাদা হয়ে যায়। বাস্তব জীবনে আমরা প্রথমে মানুষটিকে দেখি, তারপর তার কথা শুনি। উপন্যাসে ঠিক উল্টোটা ঘটে। আমরা প্রথমে শুনি একটি কণ্ঠস্বর। মানুষটিকে অনেক পরে চিনতে পারি। কখনও কখনও চিনতেই পারি না। অথচ সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরই ধীরে ধীরে আমাদের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সহানুভূতি, বিরক্তি, মুগ্ধতা—সবকিছুকে পরিচালিত করতে থাকে। একটি উপন্যাসের প্রকৃত নায়ক তাই সবসময় তার চরিত্র নয়; অনেক সময় তার কণ্ঠস্বর।
এই প্রশ্নটি মনে রেখেই এবার দস্তয়েভস্কির ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর দিকে তাকানো যাক। উপন্যাসের প্রথম বাক্য—I am a sick man… I am a spiteful man. I am an unattractive man. প্রথমবার পড়লে মনে হয়, একজন মানুষ নিজের পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা কি সত্যিই একজন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি? একটু আগেই তো লেখক আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন। মূল আখ্যান শুরু হওয়ার আগে একটি অথর্স নোটে তিনি জানিয়ে দেন, এই মানুষটি কাল্পনিক। কিন্তু পরের বাক্যেই আবার বলেন, এমন মানুষ শুধু থাকতে পারে তা-ই নয়, আমাদের সমাজে তার থাকা প্রায় অনিবার্য। এখানেই পড়ার জায়গাটা জটিল হয়ে ওঠে। কারণ লেখক একই সঙ্গে দুটো বিপরীত কাজ করছেন। তিনি চরিত্রটিকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন, আবার আমাদের সমাজের একেবারে মাঝখানেই এনে বসিয়ে দিচ্ছেন।
তাহলে কথা বলছে কে? দস্তয়েভস্কি? তা হলে লেখক-নোটের এই দূরত্ব তৈরির প্রয়োজন ছিল কেন? আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান? কিন্তু যদি তিনি নিছক একটি চরিত্রই হন, তবে তাঁকে একটি যুগের প্রতিনিধি বলা হচ্ছে কেন? না কি এখানে কথা বলছে একটি বিশেষ মানসিকতা, এমন এক চেতনা, যা একজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি সময়ের অসুখ হয়ে বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দস্তয়েভস্কি আমাদের দেন না। বরং উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনাটাই স্থগিত রাখেন। আর সেই স্থগিততার মধ্যেই পাঠ শুরু হয়।
এখানেই সাহিত্য আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। উপন্যাসে যে-কণ্ঠস্বরটি আমরা শুনি, তাকে খুব তাড়াতাড়ি কোনও ব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ সাহিত্য প্রায়ই মানুষকে নয়, মানুষের ভেতরে বাস করা একটি অবস্থাকে কথা বলায়। আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান তাই শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি ক্ষত, একটি আত্মবিরোধ, একটি মানসিক আবহাওয়া। তিনি এমন একজন, যিনি নিজের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলেন, তেমনই পৃথিবীর বিরুদ্ধেও। তাঁর ‘আমি’ কোনও স্থির সর্বনাম নয়; প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ বদলায়।
খেয়াল করুন, প্রথম তিনটি বাক্যেই তিনি নিজের সম্পর্কে তিনটি ঘোষণা করেন—আমি অসুস্থ, আমি বিদ্বেষপরায়ণ, আমি কুৎসিত। এগুলি কি তথ্য? নাকি আত্মবর্ণনা? আর আত্মবর্ণনা কি কখনও নিরপেক্ষ হতে পারে? একজন মানুষ যখন নিজের সম্পর্কে কথা বলেন, তখন তিনি কি নিজেকে প্রকাশ করেন, না নিজেকেই নির্মাণ করতে থাকেন? এই ‘আমি’ কি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ, না নিজের ভাষা দিয়ে নিজেকে তৈরি করতে থাকা একটি কণ্ঠস্বর?
এই কারণেই এখানে দস্তয়েভস্কি লেখক হিসেবে ধীরে ধীরে আড়ালে সরে যান। সামনে থেকে যেতে থাকে শুধু একটি গলা। সেই গলা সত্যও বলতে পারে, মিথ্যেও বলতে পারে, নিজেকে চিনতেও পারে, আবার ভুলও চিনতে পারে। লেখক আমাদের কোথাও বলেন না, এই মানুষটিকে বিশ্বাস করো। আবার এটাও বলেন না, বিশ্বাস কোরো না। তিনি শুধু এমনভাবে কণ্ঠস্বরটিকে নির্মাণ করেন, যাতে পাঠকের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায়—কী বলা হচ্ছে, তার আগে বুঝে নেওয়া, কে বলছে।
এইখানে এসে আর-একটি প্রশ্ন মাথায় আসে। আমরা যখন বলি, একটি চরিত্র কথা বলছে, তখন কি সত্যিই একজন মানুষ কথা বলছে? মানুষ কি এত সহজে একটি মাত্র কণ্ঠস্বরের মধ্যে ধরা পড়ে? অঁদ্রে মালরো ‘অ্যান্টি মেমরিজ’-এ লিখেছিলেন, মানুষ আসলে কী? সে কি তা-ই, যা সে করে? না কি সে আসলে একটি রহস্যের দুঃখজনক ঢিবি? কথাটি শুনতে দার্শনিক মনে হলেও, এর ভেতরে একটি পাঠগত প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। কারণ উপন্যাসের কোনও চরিত্রই তার উচ্চারিত বাক্যের সমান নয়। সে যা বলছে, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে কেন এইভাবে বলছে, কেন এই মুহূর্তে বলছে, কেন এই কথাটিই বলছে। অর্থাৎ, একটি কণ্ঠস্বর কখনও নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ নয়। তার পেছনে জমে থাকে ইতিহাস, অপমান, স্মৃতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা, এমনকি এমন সব নীরবতাও, যেগুলির কোনও ভাষা নেই। আমরা যখন বলি, আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান কথা বলছে, তখন আসলে এই সমস্ত স্তর একসঙ্গে কথা বলছে। সেই জন্যই একটি চরিত্রকে শোনা মানে কখনও একটি মাত্র মানুষকে শোনা নয়; একটি সমগ্র মানসিক ভূগোলকে শোনা।
এইখানে এসে একটি পুরনো অভ্যাসে ফাটল ধরতে শুরু করে। আমরা ছোটবেলা থেকে শিখেছি, বইয়ের প্রতিটি বাক্যের পেছনে একজন লেখক আছেন, এবং সেই লেখকই তার শেষ অর্থ জানেন। যেন বই পড়া মানে লেখকের উদ্দেশ্য উদ্ধার করা। কিন্তু সত্যিই কি তা-ই? যদি তাই হত, তাহলে দস্তয়েভস্কির এই প্রথম বাক্য পড়ে আমাদের এত প্রশ্ন তৈরি হত না। লেখক নিজেই তো উপন্যাসের শুরুতে সরে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এই মানুষটি কল্পিত, অথচ আমাদের সমাজে তার অস্তিত্ব অনিবার্য। তারপর কথা বলতে দিয়েছেন সেই মানুষটিকেই। ফলে আমরা যত এগোই, দস্তয়েভস্কিকে তত কম শুনি, আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যানকে তত বেশি শুনি।
এখানে রোলাঁ বার্তের সেই বহুচর্চিত কথাটি নতুন অর্থে ফিরে আসে—লেখকের মৃত্যু। কথাটি শুনতে যত নাটকীয়, তার অর্থ ততটা নয়। লেখক মারা যান মানে লেখক অদৃশ্য হয়ে যান না, কিংবা তাঁর জীবনের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তাঁর একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। তিনি আর একমাত্র বক্তা নন। তিনি এমন একটি যন্ত্র নির্মাণ করেন, যার ভেতরে ঢোকার পরে অর্থ তাঁর হাত ছেড়ে অন্যত্র যাত্রা শুরু করে।
এই কারণেই একটি উপন্যাসের কণ্ঠস্বরকে লেখকের কণ্ঠস্বর বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান যা বলছে, দস্তয়েভস্কি কি তা-ই বলছেন? নিশ্চয়ই নয়। আবার এটাও বলা যায় না যে দস্তয়েভস্কির সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে, কিন্তু সেটি সরল নয়। লেখক এখানে একজন ভেন্ট্রিলোকুইস্টের মতো। পুতুলের মুখ নড়ছে, কিন্তু সেই মুখ থেকে যে শব্দ বেরুচ্ছে, তাকে আর সরাসরি পুতুলনাচিয়ের ব্যক্তিগত মত বলে পড়া যায় না। সাহিত্য এই দূরত্বটুকুই তৈরি করে।
তাহলে অর্থ কোথায় জন্মায়? লেখকের টেবিলে? চরিত্রের মুখে? না পাঠকের ভেতরে? হয়তো এই তিনটির মাঝখানেই। একটি বাক্য লেখা হয়ে যাওয়ার পরে তার ভাগ্য আর লেখক একা নির্ধারণ করেন না। যে-পাঠক তাকে পড়ছে, তার অভিজ্ঞতা, তার সময়, তার ভাষা, তার ক্ষত—সবকিছু মিলিয়ে বাক্যটি আবার নতুন করে লেখা হতে থাকে। সেই জন্যই একই উপন্যাস দুই পাঠকের কাছে কখনও একই থাকে না।
এই প্রসঙ্গে আমার শিক্ষক, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, কথাপ্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেন, There is no meaning, there are meanings. কথাটি তখন যতটা সহজ মনে হয়েছিল, পরে ততটাই কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ এর অর্থ এই নয় যে, একটি টেক্সটের যে-কোনও পাঠই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। বরং অর্থ এই যে, একটি সাহিত্যকর্মের সম্ভাব্য অর্থ একটিমাত্র নয়। একটি পাঠ আর-একটি পাঠকে বাতিল না-ও করতে পারে; বরং তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে আরও জটিল, আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে। একটি মহৎ টেক্সট এই বহুত্বকে ধারণ করেই বেঁচে থাকে।
এই কারণেই আমরা যখন জিজ্ঞেস করি, কে কথা বলছে, তখন প্রশ্নটি ধীরে ধীরে বদলে যায়। আমরা আর শুধু বক্তাকে খুঁজি না। আমরা খুঁজি, এই কণ্ঠস্বর আমার ভেতরে এসে কীভাবে অন্য একটি কণ্ঠস্বর তৈরি করছে। কারণ একটি উপন্যাসের সত্যিকারের সংলাপ চরিত্র আর চরিত্রের মধ্যে নয়; টেক্সট আর পাঠকের মধ্যে। লেখক সেই সংলাপের আয়োজন করেন মাত্র। তারপর ধীরে ধীরে তিনিও আমাদের সঙ্গে বসে পড়েন একজন পাঠক হিসেবে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি আবার অন্যদিকে ঘুরে যায়। যদি লেখক সত্যিই আড়ালে সরে যান, তাহলে আমরা কাকে পড়ি? এই যে এতক্ষণ ধরে বললাম, লেখকের কণ্ঠস্বর আর চরিত্রের কণ্ঠস্বর এক নয়, তাহলে উপন্যাসের মধ্যে যে এক ধরনের বুদ্ধি, সংযম, নির্বাচন, ছন্দ, নৈতিকতা, এমনকি রসবোধও অনুভব করি, তার উৎস কোথায়?
ওয়েন সি. বুথ এই প্রশ্নটিরই একটি আশ্চর্য উত্তর দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, আমরা যখন কোনও উপন্যাস পড়ি, তখন প্রকৃত লেখককে পড়ি না। পড়ি লেখকেরই নির্মিত আর-একজনকে। তিনি রক্তমাংসের মানুষ নন। বইয়ের পাতায় তাঁর কোনও সংলাপও নেই। অথচ তিনি সর্বত্র আছেন। কোন দৃশ্যটি থাকবে, কোনটি বাদ যাবে, কোথায় বাক্য দীর্ঘ হবে, কোথায় হঠাৎ থেমে যাবে, কোন চরিত্রকে আমরা বিশ্বাস করব, কোন চরিত্রকে সন্দেহ করব, এই সমস্ত সিদ্ধান্তের মধ্যে ধীরে ধীরে তাঁর উপস্থিতি তৈরি হয়। বুথ এই উপস্থিতিকেই বলেছিলেন ইমপ্লায়েড অথর।
কথাটি প্রথম শুনলে একটু অদ্ভুত লাগে। লেখকের আবার আর-একজন লেখক হয় নাকি? কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই দেখা যায়, আমরা প্রতিদিনই এই মানুষটির সঙ্গে দেখা করি, অথচ তাঁর নাম জানি না।
ধরা যাক, দস্তয়েভস্কির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। তবু ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ পড়তে পড়তে আমাদের মনে হয়, এই বইটির পেছনে এমন একজন উপস্থিত আছেন, যিনি আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান নন, আবার তাঁকে বিচারও করছেন না। তিনি চরিত্রটিকে এমনভাবে নির্মাণ করছেন, যাতে আমরা তাঁর কথায় কখনও বিশ্বাস করি, কখনও অস্বস্তি বোধ করি, কখনও তার ওপর রাগ করি, আবার পরমুহূর্তেই নিজের ওপর সন্দেহ করতে শুরু করি। এই যে সূক্ষ্ম পরিচালনা, এটি চরিত্রের কাজ নয়। আবার সরাসরি লেখকের ব্যক্তিগত মতও নয়। এর মধ্যবর্তী যে উপস্থিতি, বুথ তারই নাম দিয়েছিলেন।
এই কারণেই কোনও উপন্যাস পড়ার সময় লেখকের জীবনী সবসময় খুব বেশি সাহায্য করে না। কারণ বইয়ের মধ্যে যে মানুষটির সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়, তিনি বাস্তবের মানুষটির হুবহু প্রতিলিপি নন। বাস্তব লেখক হয়তো রাগী, অস্থির, বিশৃঙ্খল, পক্ষপাতদুষ্ট। কিন্তু তাঁর নির্মিত এই অন্তর্লেখক আশ্চর্যরকম সংযত হতে পারেন। আবার উল্টোটাও সত্যি। বইয়ের মধ্যে যে মানুষটির সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সহাবস্থান, তিনি একটি শিল্পিত নির্মাণ।
তাহলে কি আমরা কখনও লেখককে পড়িই না? হয়তো পড়ি। কিন্তু সরাসরি নয়। যেমন কোনও মানুষকে আমরা তার ছায়া দেখে চিনতে পারি, অথচ ছায়া মানুষটি নয়। ইমপ্লায়েড অথরও অনেকটা সেরকম। তিনি লেখকের ছায়া নন, আবার সম্পূর্ণ অন্য কেউও নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি শুধু এই বইটির ভেতরেই আছেন। অন্য বই খুললেই তিনিও বদলে যান।
এইখানে এসে ‘কে কথা বলছে?’ প্রশ্নটি আরও একবার বদলে যায়। এতক্ষণ আমরা ভাবছিলাম, কথা বলছে চরিত্র। তারপর বুঝলাম, লেখকও সরাসরি কথা বলছেন না। এখন দেখা যাচ্ছে, এই দুজনের মাঝখানে আর-একজন নীরবে উপস্থিত আছেন, যিনি কোনও বাক্য উচ্চারণ করেন না, অথচ সমস্ত বাক্যের বিন্যাস তাঁরই সিদ্ধান্তে গড়ে ওঠে। একটি উপন্যাসের গভীরে প্রবেশ করা মানে অনেক সময় এই নীরব মানুষটিকেও ধীরে ধীরে চিনে নেওয়া।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি থেমে থাকে না। বরং আরও একটু এগিয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে আমরা জিজ্ঞেস করছিলাম, কে কথা বলছে? এখন মনে হচ্ছে, তারও আগে আর-একটি প্রশ্ন করা দরকার। কে দেখছে?
ফরাসি তাত্ত্বিক জেরার জেনেত এই দুই প্রশ্নকে আলাদা করেছিলেন। তাঁর কাছে কে কথা বলছে, আর কে দেখছে, এক কথা নয়। প্রথমটি বর্ণনার প্রশ্ন, দ্বিতীয়টি দৃষ্টির। প্রথমটি কণ্ঠস্বরের, দ্বিতীয়টি চোখের। সাহিত্যে এই দুটোকে এক করে ফেললে অনেক কিছুই অস্পষ্ট থেকে যায়।
প্রথমে বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই দেখা যাবে, আমরা নিজেরাও প্রতিদিন এই পার্থক্যের মধ্যে বেঁচে আছি। আমি একটি ঘটনা আপনাকে বলতে পারি। কিন্তু ঘটনাটি আমি যেভাবে দেখেছি, আপনি সেভাবে দেখেননি। আবার এমনও হতে পারে, আমি নিজেই ঘটনাটি দেখিনি; অন্যের মুখে শুনে বলছি। তখন যে গলা কথা বলছে, আর যে চোখ ঘটনাটি দেখেছে, তারা একই নয়।
উপন্যাসও অনেক সময় এই বিচ্ছেদ তৈরি করে। যে বলছে, সে সবসময় দেখে না। আর যে দেখে, সে সবসময় বলে না।
এই পার্থক্যটি একবার চোখে পড়লে অনেক উপন্যাস নতুনভাবে খুলতে শুরু করে। ধরুন, একটি শিশুর চোখ দিয়ে আমরা পৃথিবী দেখছি, অথচ বর্ণনা করছেন একজন প্রাপ্তবয়স্ক। অথবা একজন সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী কথা বলছেন, কিন্তু একটি দৃশ্যকে দেখছি শুধু একটি চরিত্রের সীমিত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। তাহলে বক্তা এক, দৃষ্টি আর-এক। গলা এক জায়গায়, চোখ অন্য জায়গায়।
ধরুন, ‘পথের পাঁচালী’। আমরা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে প্রায়ই মনে করি, অপুই যেন আমাদের পৃথিবী দেখাচ্ছে। কিন্তু একটু থেমে প্রশ্ন করা যাক। সত্যিই কি অপু বলছে? না। উপন্যাসটি তো অপু লিখছে না। আবার সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীও সব সময় নিজের চোখ দিয়ে দেখছেন না। বহু জায়গায় পৃথিবীটি আমাদের সামনে খুলছে অপুর বিস্ময়ের মধ্য দিয়ে। বর্ষার জল, দুর্গার সঙ্গে ছোটাছুটি—এসব দৃশ্যের ভাষা প্রাপ্তবয়স্কের, কিন্তু দৃষ্টি শিশুর। যে বলছে, সে শিশু নয়; যে দেখছে, সে শিশু। এই সামান্য পার্থক্যটিই উপন্যাসের আবেগকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
এইখানে জেনেতের কথাটি হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। Narration আর Focalization এক জিনিস নয়। বর্ণনা এক কণ্ঠস্বরের, কিন্তু দেখা অন্য এক চেতনার। আমরা এতদিন এই দুইকে একসঙ্গে মিশিয়ে পড়ছিলাম বলেই পার্থক্যটি চোখে পড়েনি।
আবার উল্টোটাও সম্ভব। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-তে এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যেখানে বর্ণনাকারী কুবেরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু কোনও দৃশ্যের আবেগ, সংকোচ বা আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছি কুবেরের ভেতর থেকে। লেখক যেন অদৃশ্যভাবে ক্যামেরাটি চরিত্রের কাঁধে রেখে দিয়েছেন। ফলে বাক্য একই সঙ্গে বাইরে থেকেও আসে, ভেতর থেকেও।
কিংবা ধরুন, ‘মিসেস ড্যালোওয়ে’। প্রথম দিকে আমরা যেন ক্ল্যারিসা ড্যালোওয়ের সঙ্গে হাঁটছি। লন্ডনের রাস্তাঘাট, সকালের আলো, দোকানের জানলা, ফুল কিনতে যাওয়া—সবকিছু যেন তাঁর চোখ দিয়েই দেখা। কিন্তু একটু পরেই, প্রায় অদৃশ্যভাবে, সেই একই বর্ণনা সরে যায় সেপটিমাস ওয়ারেন স্মিথের দিকে। তারপর আবার অন্য কারও দিকে। আশ্চর্যের বিষয়, বক্তার গলা খুব বেশি বদলায় না। বদলে যায় দৃষ্টি। যেন ক্যামেরাটি এক মুখ থেকে অন্য মুখে চলে গেল, অথচ যে ধারাভাষ্য দিচ্ছে, সে একই মানুষ রয়ে গেল।
এইখানে ভার্জিনিয়া উলফ আমাদের একটি সূক্ষ্ম বিষয় শিখিয়ে দেন। একটি উপন্যাসে দৃষ্টি স্থির নয়। সে এক চরিত্র থেকে আর-এক চরিত্রে সঞ্চারিত হতে পারে। কখনও কোনও ঘোষণা ছাড়াই। পাঠক যদি এই সঞ্চরণটি লক্ষ না করেন, তাহলে তিনি গল্প পড়বেন ঠিকই, কিন্তু উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণগুলির একটি তাঁর চোখ এড়িয়ে যাবে।
বাংলা সাহিত্যের একটি উপন্যাসের কথা মনে পড়ে, যেখানে প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ পড়তে পড়তে বহুবার মনে হয়, আমরা কোনও একক চরিত্রের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখছি না। আবার সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর দূরত্বও সেখানে ঠিক আগের মতো কাজ করছে না। দৃষ্টি যেন এক মানুষের নয়, সমগ্র ভাষার ভেতরে ছড়িয়ে আছে।
কমলকুমারের গদ্যে আলো, নদী, কুয়াশা, শরীর, শব্দ—এসব কোনও চরিত্রের অনুভূতির অনুবাদ হয়ে আসে না। বরং তারা নিজেরাই একটি দেখার পদ্ধতি তৈরি করে। মনে হয়, দৃশ্যটি কোনও মানুষ দেখছে না; ভাষা নিজেই ধীরে ধীরে দৃশ্য হয়ে উঠছে। ফলে এখানে কে দেখছে, তার উত্তর একটি চরিত্রের নাম বলে দেওয়া যায় না।
ঘটনাটি কোথায়, সেই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, এই দেখার ভঙ্গিটি কোথা থেকে এল? এই বাক্যগুলির চোখ কার? লেখকের? চরিত্রের? না কি সেই বিশেষ ভাষার, যা এই উপন্যাস ছাড়া আর কোথাও নেই?
এখানে জেনেতের প্রশ্নটি আবার একটু বদলে যায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, বক্তা আর দর্শক এক নাও হতে পারেন। কমলকুমারের কাছে এসে মনে হয়, দৃষ্টিও যেন আর কোনও একক মানুষের সম্পত্তি নয়। ভাষা যখন যথেষ্ট ঘন হয়ে ওঠে, তখন সে নিজেই একটি দৃষ্টি তৈরি করে। আমরা তখন কোনও চরিত্রের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখি না; একটি গদ্যের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে শুরু করি।
সেই কারণেই মহৎ লেখকের ভাষা অনুকরণ করা এত কঠিন। আমরা শব্দ ধার নিতে পারি, বাক্যের দৈর্ঘ্যও নকল করতে পারি, কিন্তু সেই ভাষার দৃষ্টি ধার নিতে পারি না। কারণ দৃষ্টি শব্দের মধ্যে থাকে না; থাকে শব্দগুলির পারস্পরিক সম্পর্কে, তাদের ছন্দে, তাদের নীরবতায়, তাদের আলো ফেলার ভঙ্গিতে। একটি উপন্যাসের সত্যিকারের চোখ অনেক সময় কোনও চরিত্রের চোখ নয়; তার ভাষার চোখ।
এখানে এসে মনে হয়, ‘কে কথা বলছে?’ এবং ‘কে দেখছে?’—এই দুটি প্রশ্নের পাশে আর-একটি প্রশ্নও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা নিজেও কি কখনও দেখে? প্রশ্নটি হয়তো তত্ত্বের নয়, সাহিত্যের। আর সেই কারণেই তার উত্তরও কোনও সংজ্ঞায় নয়, শুধু একটি মহৎ গদ্যের অভিজ্ঞতার মধ্যেই পাওয়া যায়।
এখানে প্রশ্নটি তাই আর শুধু কে দেখছে নয়। প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়ায়, এইমাত্র দৃষ্টিটি বদলে গেল কখন? কোন বাক্যে? কোন শব্দে? লেখক কি আমাদের জানিয়ে দৃষ্টি বদলালেন? না আমরা টেরই পেলাম না, কখন অন্য একজনের চেতনার মধ্যে ঢুকে পড়েছি? একটি মহৎ উপন্যাসের সাফল্য অনেক সময় এইখানেই। সে দৃষ্টি বদলায়, কিন্তু সেলাইয়ের দাগ দেখা যায় না।
একবার এই দৃষ্টিবদল চোখে পড়লে বোঝা যায়, উপন্যাস আসলে ঘটনাগুলিকে পাশাপাশি সাজায় না; পাশাপাশি সাজায় চেতনাগুলিকে। একই শহর, একই সকাল, একই আকাশ—কিন্তু ক্ল্যারিসা যে-লন্ডন দেখছেন, সেপটিমাস সেই লন্ডন দেখছেন না। শহর একটিই, অথচ তার সংখ্যা অনেক। পৃথিবী বদলায়নি; বদলেছে দৃষ্টির অবস্থান।
এই কারণেই জেনেতের প্রশ্নটি এত জরুরি। তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করতে শেখান, কে বলছে—তার আগে বা তার পাশাপাশি—কে দেখছে? কারণ সাহিত্যে সত্য অনেক সময় ঘটনায় নয়, দৃষ্টিতে বাস করে। একই ঘটনাকে দুটি আলাদা চোখ দিয়ে দেখানো মানে দুটি আলাদা উপন্যাস লেখা। আর সেই কারণেই একজন মহৎ লেখক শুধু বাক্য লেখেন না; তিনি চোখও নির্মাণ করেন। পাঠক যখন সেই চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে শুরু করেন, তখনই একটি উপন্যাস সত্যিকার অর্থে পড়া শুরু হয়।
এইখানে হয়তো সাহিত্যকে সিনেমার সাহায্যে ভাবা যায়। ক্যামেরা আর ভয়েস-ওভার কি একই জিনিস? এক ব্যক্তি কথা বলছে, কিন্তু ক্যামেরা তাকিয়ে আছে অন্য কারও দিকে। অথবা ক্যামেরা যা দেখছে, বক্তা তা জানেই না। সিনেমায় এই পার্থক্য আমরা সহজেই বুঝতে পারি। সাহিত্যে ভাষার কারণে সেটি অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ উপন্যাসও এক ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করে। শুধু ক্যামেরাটি শব্দ দিয়ে তৈরি।
এই কারণেই সাহিত্যকে শুধু ভাষার শিল্প বললে কম বলা হয়। সাহিত্য দৃষ্টিরও শিল্প। কে কী দেখছে, কী দেখতে পাচ্ছে না, কী দেখতে চেয়েও দেখতে পারছে না—এই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ কখনও শুধু তার কথায় সীমাবদ্ধ নয়; সে তার দেখার সীমার মধ্যেও বন্দি।
এইখানে এসে হঠাৎ মনে হয়, একটি উপন্যাস পড়ার সময় আমরা আসলে দুটি আলাদা স্রোত অনুসরণ করি। একদিকে একটি কণ্ঠস্বর আমাদের নিয়ে চলেছে। অন্যদিকে একটি দৃষ্টি আমাদের পৃথিবী দেখাচ্ছে। অনেক সময় এই দুই স্রোত পাশাপাশি চলে। আবার কখনও তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করে। মুখ এক কথা বলে, চোখ আর-এক কথা দেখে।
এই কারণেই একজন ভালো পাঠক শুধু বাক্য শোনেন না; তিনি বাক্যের চোখও খুঁজে বের করেন। কারণ কে কথা বলছে, এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলেও পাঠ শেষ হয় না। তখনও জানতে হয়, এই পৃথিবীটি কার চোখ দিয়ে দেখা হচ্ছে। অনেক সময় একটি উপন্যাসের গভীরতম অর্থ উচ্চারিত বাক্যে নয়, সেই দৃষ্টির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, যে দৃষ্টি নীরবে আমাদের পৃথিবী দেখার পদ্ধতিটাকেই বদলে দেয়।
এই প্রশ্নগুলির অনেকগুলিই আমাদের বাংলা ভাষার উপন্যাসেও বহুদিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু আমরা হয়তো তাদের সেই নামে ডাকিনি। কমলকুমারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ খুললেই সেই অভিজ্ঞতা হয়। প্রথম কয়েকটি অনুচ্ছেদ পড়ার পরেই মনে হয়, এখানে কথা বলছে কে? কোনও চরিত্র? কিন্তু কোনও চরিত্র তো এখনও সামনে এসে দাঁড়ায়নি। লেখক? কিন্তু একজন লেখক কি সত্যিই এইভাবে কথা বলেন? নাকি এই গলাটি শুধু এই উপন্যাসেরই? যেন ভাষা এখানে একজন মানুষের কণ্ঠস্বর নয়, নিজেই একটি চরিত্র।
আর-একটি প্রশ্নও ধীরে ধীরে এসে পড়ে। যে বলছে, সে কোথায় দাঁড়িয়ে বলছে? দৃশ্যের ভেতরে? না বাইরে? সে কি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে? না আকাশেরও একটু ওপরে? তার অবস্থান কি আমাদের মতোই সীমিত? নাকি সে এমন এক জায়গা থেকে দেখছে, যেখানে আলো, জল, মানুষ, মৃত্যু—সব একসঙ্গে ধরা পড়ে?
এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর নেই। কারণ কমলকুমার তাঁর বর্ণনাকারীকে কখনও সম্পূর্ণ দৃশ্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দেননি, আবার সম্পূর্ণ বাইরেও রাখেননি। তিনি এমন এক অবস্থান তৈরি করেন, যেখানে বর্ণনাকারী উপস্থিত, অথচ অদৃশ্য। তাঁর উপস্থিতি আমরা মানুষ হিসেবে টের পাই না; পাই ভাষার ভঙ্গিতে।
এইখানেই আর-একটি প্রশ্ন জেগে ওঠে। কমলকুমারের ভাষা এত অলংকারময় কেন? এটি কি শুধু শৈলী? নাকি দেখার একটি বিশেষ পদ্ধতি?
আমরা প্রায়ই অলংকারকে ভাষার সাজসজ্জা বলে মনে করি। যেন সরলভাবে যা বলা যেত, তাকে একটু সুন্দর করে বলা হল। কিন্তু কমলকুমারের কাছে অলংকারের কাজ অন্য। তাঁর ভাষা কোনও দৃশ্যকে বর্ণনা করে না; ভাষার মধ্যেই সেই দৃশ্য নির্মাণ করে। যেন পৃথিবীকে প্রথমবার দেখা হচ্ছে। ফলে তাঁর উপমা, রূপক, বিশেষণ—এসব বাক্যের গায়ে বসানো গয়না নয়; এগুলিই সেই চোখ, যার মাধ্যমে দৃশ্যটি জন্ম নিচ্ছে।
এই কারণেই কমলকুমারকে দ্রুত পড়া যায় না। তাঁর বাক্যের অর্থ বুঝে ফেললেই পাঠ শেষ হয় না। বরং তখনই প্রশ্ন শুরু হয়—এইভাবে দেখার প্রয়োজন হল কেন? একটি নদীকে নদী না বলে অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন কী? একটি আলোর বর্ণনা এত দীর্ঘ কেন? একটি বিশেষণই বা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
কারণ তিনি আমাদের কোনও ঘটনাই দেখাতে চান না। তিনি আমাদের দেখাতে চান, একটি ঘটনা দেখা বলতে কী বোঝায়।
এইখানে এসে জেনেতের প্রশ্নটি আর-একবার বদলে যায়। এতক্ষণ আমরা জিজ্ঞেস করছিলাম, কে কথা বলছে, কে দেখছে। কমলকুমারের কাছে এসে মনে হয়, আরও একটি প্রশ্ন করা দরকার। কী দিয়ে দেখা হচ্ছে? মানুষের চোখ দিয়ে? না ভাষার চোখ দিয়ে?
মহৎ গদ্যের জন্ম সেখানেই, যেখানে ভাষা আর দৃশ্যকে বর্ণনা করে না; ভাষাই ধীরে ধীরে দৃশ্যে পরিণত হয়। তখন বর্ণনাকারীকে আলাদা করে দেখা যায় না। তিনি মিশে যান তাঁর বাক্যের মধ্যেই। আর পাঠকের কাজ হয়ে দাঁড়ায় শুধু গল্প অনুসরণ করা নয়; সেই অদৃশ্য দৃষ্টির জন্মটিকেও অনুসরণ করা।

এতক্ষণ আমরা এমন এক বর্ণনাকারীর সঙ্গে ছিলাম, যিনি নিজের উপস্থিতিকে ভাষার মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁকে আলাদা করে দেখা যায় না; তাঁর দৃষ্টি ছড়িয়ে থাকে বাক্যের শরীরে। কিন্তু সব উপন্যাস এমন নয়। এমন উপন্যাসও আছে, যেখানে বর্ণনাকারী প্রথম বাক্যেই নিজের অবস্থান ঘোষণা করে দেন। তিনি শুধু দেখেন না, বিচারও করেন। শুধু বর্ণনা করেন না, রায়ও দেন। তখন প্রশ্নটি আর শুধু কে কথা বলছে থাকে না। প্রশ্নটি হয়ে ওঠে—কোন জায়গা থেকে কথা বলছে? এইখানেই অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মধু সাধু খাঁ’ একেবারেই অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা।

‘মদু সা সাতিশয় হারামজাদা ছিল—সন্দেহ কি?
চিকন ঠাণ্ডা কালো রঙ, টিকলো নাক, টানা চোখ, বলে চক্ষু; সে চোখের প্রান্তগুলি আবার লাল; দাঁতগুলি সুগঠিত, কিন্তু কষ ঘণ্টায়-ঘণ্টায় পানরসে লাল; চলেও যেন সাক্ষাৎ কালীমায়ের পুতি। গায়ে মোটা তসরের মেরজাই, অর্থাৎ কুনুই পর্যন্ত হাতা, বোতামের বদলে বগলের নিচে ডোরে বাঁধা ছোট ঝুলের পাঞ্জাবি, পরনে দু-আঙুল চওড়া পাড়, খাটো কিন্তু সুক্ষ্ম ধুতি।
লক্ষ্য করলে দেখা যায় টিকলো নাকের উপরে চুলের মতো সূক্ষ্ম করে টানা রসকলি। পায়ে চামড়ার কট্কি। তার নৌকার মাঝি-মাল্লারা হিন্দু, কিন্তু বদর এবং বলা? তার জন্য পাক করে তোপদার, জাতে সে ব্রাহ্মণ, কিন্তু সে বলার সঙ্গে একত্র পানাহার করে, বদরের ছোঁয়া খায়। বদর সম্ভবত মুসলমান, আর বলা ফিরিঙ্গি। মদু সা-ই নাম দিয়েছে, অর্থাৎ সে কানাই আর ফিরিঙ্গি বেটা বলাই। হারামজাদা সন্দেহ নেই।
মদু সা অন্যূন চারটে ভাষায় কথা বলে। নিজভাষা রাঢ়ী ছাড়াও, সংস্কৃত, গৌড়ের ভাঙা ফারশি, হার্মাদি-মগাই। ইদানীং পঞ্চমের চর্চা চলছে। মদু সা বলেছে—ও বলা, ই গোট কহা উচিত হয় তোর দেশর নাম অঙ্গ আরু আমার ভাষার নাম বাংলিশ। তোর ভাষার নাম আংলিশ আরু আমার দেশর নাম বাংলা যদ্যপি হয়, এমতে কেনে না হৈব। মদু সা তার ঐ আংলিশ ভাষার যে দুটি শব্দ প্রথম মনে রাখতে পেরেছিল, তারা স্কাব এবং লাউস্। মদু সা-র নিজের বাঁ পুরোবাহুর ভিতর দিকে এক বিঘৎ লম্বা তিন চার আঙুল চওড়া ক্ষতচিহ্ন আছে। তরোয়ালেব চোপ। বলা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে বললে মদু বুঝেছিল তাকেই স্কাব বলছে ফিরিঙ্গি। কিন্তু তাই কি? দৃশ্যটা মনে ফিরে এসেছিল মদুর, শত হলেও নিজের কাকার ছেলে। একত্র মানুষ হওয়ার, ভালোবাসার স্মৃতি ছিল। ঘাড়টাই দো ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। কী রক্ত, আর কী শূন্যতা। তাকে আর জোড়া দেয়া যায় না। হাতে একটা দাগ পড়েছে বৈ তো নয়, কী হতো যদি তুমি শির না মারতে? ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে মদুর। হ্যাঁ, বলা, তাকেই স্কাব বলে, হাতের দাগদাগালি নয় শুধু, মনের এই দীর্ঘশ্বাসও। কিন্তু লাউস্? ধুশ্ শালা উক্কুন? হো-হো করে হেসে উঠেছিল মদু সা। নাম জলে। গা ঘশো গঙ্গার মাটি তুলে। বলাকে জোর করে গঙ্গায় নামিয়েছিল দুই মাল্লা, সেই নবদ্বীপের গঙ্গায়। এখন বলা রোজই স্নান করে। তার সেই স্যাকসেকে ধবল চামড়া এখন খানিকটা তবু তামাটে হয়ে উঠেছে আর লাউসও নেই।’

এইখানে এসে আর-একটি ভ্রম ভেঙে যায়। আমরা প্রায়ই ভাবি, বর্ণনাকারী মানেই তিনি নিরপেক্ষ। যেন তিনি একটি ক্যামেরা, যা যা ঘটছে শুধু তা-ই রেকর্ড করছে। কিন্তু অমিয়ভূষণের কাছে এসে বোঝা যায়, এমন ক্যামেরা বলে কিছু নেই। চোখ মানেই একটি পক্ষ। দেখা মানেই ইতিমধ্যেই একটি সিদ্ধান্ত।
মদু সা-কে তিনি আমাদের চিনতে দেন না। তার আগেই তাকে বিচার করে ফেলেন। ‘মদু সা সাতিশয় হারামজাদা ছিল—সন্দেহ কি?’ এই বাক্যটি শুধু একটি চরিত্রের পরিচয় নয়; এটি বর্ণনাকারীর আত্মপরিচয়ও। কারণ একটি চরিত্র সম্পর্কে আমরা যতটা জানি, ঠিক ততটাই জেনে যাই, যে মানুষটি তাকে দেখছে, সে কেমন মানুষ।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেও সেই দূরত্ব আর তৈরি হয় না। মদু সা-র চেহারা বর্ণনা করা হচ্ছে, পোশাকের বিবরণ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই বিবরণের মধ্যেও মূল্যায়ন ঢুকে পড়ছে। ‘চলেও যেন সাক্ষাৎ কালীমায়ের পুতি।’ এটি কোনও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ নয়। এটি একটি বিশেষ চোখের দেখা। একটি বিশেষ ভাষার দেখা।
তৃতীয় অনুচ্ছেদে এসে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ‘হারামজাদা সন্দেহ নেই।’ লক্ষ করুন, এই বাক্যটি তথ্যের মতো লেখা হলেও, এটি তথ্য নয়। এটি আবারও রায়। যেন বর্ণনাকারী নিজের আগের বক্তব্যকে পুনর্ব্যক্ত করছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই পুনরাবৃত্তি আমাদের বিরক্ত করে না। বরং ধীরে ধীরে আমরা সেই গলার ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। কখন যে আমরা তার বিচারের ভেতর দিয়ে মদু সা-কে দেখতে শুরু করেছি, তা টেরও পাই না।
এখানেই প্রশ্ন জাগে, একটি উপন্যাস কি শুধু চরিত্র তৈরি করে? নাকি পাঠকের দৃষ্টিও তৈরি করে? আমরা কি সত্যিই মদু সা-কে দেখছি, নাকি সেই মানুষটির চোখ দিয়ে দেখছি, যিনি বারবার তাকে ‘হারামজাদা’ বলে ডাকছেন?
এই কারণেই উপন্যাস পড়ার সময় একটি প্রশ্ন আরও জরুরি হয়ে ওঠে। বর্ণনাকারী কী বলছেন, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তিনি কোন শব্দগুলি বেছে নিচ্ছেন। কারণ শব্দ কখনও নির্দোষ নয়। প্রতিটি শব্দের মধ্যেই একটি অবস্থান থাকে। একটি নৈতিকতা থাকে। একটি ইতিহাস থাকে। ‘দস্যু’ আর ‘হারামজাদা’ এক জিনিস নয়। প্রথমটি একটি সামাজিক পরিচয়। দ্বিতীয়টি একটি কণ্ঠস্বরের বিস্ফোরণ। সেখানে অভিধানের চেয়ে বেশি কাজ করে মানুষের রাগ, ঘৃণা, বিস্ময়, ঘনিষ্ঠতা, এমনকি লোকভাষার দীর্ঘ স্মৃতিও।
এজন্যেই অমিয়ভূষণের বর্ণনাকারীকে আলাদা করে দেখা যায় না। তিনি তাঁর বর্ণনার মধ্যেই ছড়িয়ে আছেন। তিনি ঘটনাগুলির বাইরে দাঁড়িয়ে নেই; ঘটনাগুলির ভাষার মধ্যেই বাস করছেন। ফলে আমরা যত এগোই, ততই বুঝতে পারি, এখানে শুধু মদু সা-র কাহিনি বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, একটি সমাজ কীভাবে একজন মানুষকে নিয়ে কথা বলে। আর সেই সমাজের ভাষাও নিরপেক্ষ নয়। তারও পক্ষপাত আছে, রসিকতা আছে, গালাগাল আছে, লোকমুখের অতিরঞ্জন আছে। অর্থাৎ এখানে যে কথা বলছে, সে শুধু একজন বর্ণনাকারী নয়; তার মধ্যে একটি সময়, একটি অঞ্চল, একটি সামষ্টিক স্মৃতিও কথা বলছে।

কিন্তু বর্ণনাকারীর উপস্থিতি সব সময় সমানভাবে দৃশ্যমান হয় না। কখনও তিনি প্রথম বাক্যেই আমাদের বলে দেন, কাকে ভালোবাসেন, কাকে ঘৃণা করেন, কাকে বিশ্বাস করেন। আবার কখনও তিনি যেন অনেক দূর থেকে ফিরে আসেন। তখন তাঁর কণ্ঠস্বরের ভেতরে মিশে থাকে সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান। তিনি শুধু একটি ঘটনার কথা বলছেন না; বলছেন, সেই ঘটনাকে এত বছর পরে কীভাবে মনে পড়ছে।
এইখানেই এসে আমার মনে পড়ছে বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’।
আশ্চর্যের বিষয়, উপন্যাসটি অরণ্য দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় কলকাতায় (প্রস্তাবনা অংশে)। সারাদিন অফিসের কাজের পরে গড়ের মাঠে বসে থাকা এক মানুষকে দেখি। একটি বাদামগাছ, ফোর্টের পরিখা, শহরের পরিচিত দৃশ্য। অথচ এই দৃশ্যের মধ্যেই হঠাৎ আর-একটি দৃশ্য ঢুকে পড়ে। মনে হয়, তিনি যেন লবটুলিয়ার সরস্বতী কুণ্ডীর ধারে বসে আছেন। তারপর একটি মোটরের হর্ন সেই ভ্রম ভেঙে দেয়।
এই মুহূর্তটিই আমাদের থামিয়ে দেয়। কারণ প্রশ্ন জাগে, কথা বলছে কে? কলকাতার সেই মানুষটি? না বহুদিন আগের অরণ্যে ঘুরে বেড়ানো যুবকটি? নাকি স্মৃতি নিজেই এখানে একজন বর্ণনাকারী হয়ে উঠেছে?
এর পরেই বিভূতিভূষণ লিখছেন, ‘অনেক দিনের কথা হইলেও কালকার বলিয়া মনে হয়।’
এই একটি বাক্যের ভেতরেই বক্তার অবস্থান বদলে যায়। যে বলছে, সে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু যে দেখছে, সে এখনও অতীতের মধ্যে বাস করছে। দুটি সময় পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। একটি কণ্ঠস্বরের ভেতরেই দুটি মানুষ কথা বলতে শুরু করে।
তারপর অরণ্যের দীর্ঘ বর্ণনা। কিন্তু সেই বর্ণনাও যেন কোনও ভ্রমণকাহিনির বর্ণনা নয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, তিনি অরণ্যকে দেখছেন না, স্মরণ করছেন। এই স্মরণের জন্যই জঙ্গল, পাহাড়, ঝাউবন, কাশবন, নীলগাই, মহিষ—সবকিছু ধীরে ধীরে বাস্তব থেকে সরে গিয়ে স্বপ্নের মতো হয়ে ওঠে। শেষে তিনি লিখছেন, ‘মনে হয় বুঝি কোনও অবসর-দিনের শেষে সন্ধ্যায় ঘুমের ঘোরে এক সৌন্দর্যভরা জগতের স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম।’
এইখানেই বর্ণনাকারীর প্রকৃত পরিচয় ধরা পড়ে। তিনি অরণ্যের ইতিহাস লিখছেন না। তিনি লিখছেন অরণ্য-হারানোর স্মৃতি। তাঁর কণ্ঠস্বরের মধ্যে তাই শুধু দেখা নেই; হারিয়ে ফেলার বেদনাও আছে। যে মানুষটি বলছেন, তিনি আর সেই মানুষটি নন, যিনি একদিন লবটুলিয়ায় ঘুরে বেড়াতেন। সেই দূরত্বই তাঁর ভাষাকে তৈরি করেছে।
তখন মনে হয়, একটি উপন্যাসের বর্ণনাকারী শুধু একজন মানুষ নন। কখনও কখনও তিনি নিজের অতীতেরও পাঠক। তিনি স্মৃতিকে যেমন ছিল তেমনভাবে ফিরিয়ে আনতে পারেন না। বরং স্মৃতি তাঁকে যেমনভাবে ফিরিয়ে আনে, তিনি তেমনভাবেই কথা বলেন। সেই কারণেই ‘আরণ্যক’ পড়তে পড়তে আমরা শুধু একটি অরণ্যের ভেতরে প্রবেশ করি না; প্রবেশ করি এমন একটি কণ্ঠস্বরের ভেতরে, যার সবচেয়ে বড় উপাদান ঘটনা নয়, সময়।

‘আরণ্যক’-এ আমরা দেখলাম, একটি কণ্ঠস্বরের মধ্যে দুটি সময় পাশাপাশি বাস করতে পারে। বর্তমানের মানুষটি কথা বলছেন, অথচ তাঁর ভেতরে এখনও বেঁচে আছে বহুদিন আগের সেই মানুষটি, যে একদিন লবটুলিয়ার পথে হেঁটেছিল। এবার আর-একটি উপন্যাসের সামনে দাঁড়াই। প্রশ্নটি একই থাকে—কে কথা বলছে? কিন্তু উত্তরটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ খুলতেই একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে। উপন্যাসের প্রথম বাক্যেরও আগে রয়েছে হাতে-আঁকা দুটি মানচিত্র। সাধারণত মানচিত্রের কাজ পথ দেখানো। কোথায় নদী, কোথায় গ্রাম, কোথায় রাস্তা, কোথায় সীমান্ত—এইসব বোঝানো। কিন্তু এই মানচিত্রগুলি যেন শুধু ভৌগোলিক নয়; এগুলি পাঠেরও মানচিত্র। লেখক যেন আমাদের প্রথমেই বলে দিচ্ছেন, তুমি যে জগতে প্রবেশ করতে চলেছ, সেখানে শুধু মানুষের দিকে তাকালে চলবে না। নদীও কথা বলবে, রাস্তা কথা বলবে, হাট কথা বলবে, এমনকি ফাঁকা জায়গাগুলিও কথা বলবে। কারণ এই উপন্যাসে কোনও মানুষকে তার চারপাশ থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। প্রত্যেক মানুষই একটি ভূখণ্ডের অংশ, আর সেই ভূখণ্ডও এই আখ্যানের একজন সক্রিয় চরিত্র।
এই কারণেই প্রথম পর্বের নামও লক্ষ্য করার মতো—‘হাটের পথে’। কোনও মানুষের নাম নয়, কোনও চরিত্রের পরিচয় নয়, একটি সামাজিক পরিসরের নাম। অর্থাৎ উপন্যাসটি শুরু থেকেই আমাদের ব্যক্তির দিকে নয়, সমষ্টির দিকে তাকাতে শেখায়। তারপরই আসে সেই প্রথম বাক্য—‘একই হাটে একসঙ্গে দুটো সাইনবোর্ড যাচ্ছে—এ বড় একটা দেখা যায় না।’ বাক্যটি ধীরে পড়ুন। আমরা সাধারণত বলি, দু’জন লোক সাইনবোর্ড নিয়ে যাচ্ছে। দেবেশ তা বলছেন না। তিনি লিখছেন, ‘দুটো সাইনবোর্ড যাচ্ছে।’ কর্তা মানুষ নয়, সাইনবোর্ড। এই সামান্য বাক্যবিন্যাসের পরিবর্তনই সমগ্র দৃশ্যটিকে অন্য অর্থ দেয়। মানুষ এখানে বাহক মাত্র; আগে চলতে শুরু করেছে ভাষা, প্রশাসন, রাষ্ট্রের উপস্থিতি। একটি সরকারি ঘোষণা নিজের পায়ে হেঁটে হাটের দিকে যাচ্ছে।
এইখানেই একটি টেক্সট পড়ার প্রথম পাঠ লুকিয়ে আছে। একটি বাক্য কী বলছে, তার চেয়েও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সে কীভাবে বলছে। লেখক যদি লিখতেন, ‘দুজন লোক সাইনবোর্ড নিয়ে যাচ্ছে’, তা হলে ঘটনাটি একই থাকত, কিন্তু তার ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেত। অথচ মাত্র একটি ব্যাকরণগত সিদ্ধান্ত—কর্তাকে মানুষ থেকে সাইনবোর্ডে সরিয়ে দেওয়া—পুরো দৃশ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যই পালটে দিল। ক্লোজ রিডিংয়ের কাজ এই সূক্ষ্ম স্থানান্তরগুলোকে লক্ষ্য করা। কারণ সাহিত্য প্রায়ই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলি উচ্চারণ করে না; বাক্যের গঠনের মধ্যেই রেখে দেয়।
তারপর দেখি, একটি বোর্ডে লেখা ‘কৃত্রিম গো-প্রজনন কেন্দ্র’, অন্যটিতে ‘হলকা ক্যাম্প’। এই নামগুলিও নিছক তথ্য নয়। এগুলি রাষ্ট্রের ভাষা। প্রশাসনের ভাষা। নথির ভাষা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেবেশ এখনও মানুষের নাম বলছেন না। আমরা জানি না তাঁরা কারা। বরং মানুষদের চেনানো হচ্ছে তাঁরা কী বহন করছেন, সেই পরিচয়ে। ব্যক্তিগত পরিচয়ের আগেই এসে দাঁড়াচ্ছে একটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়। এখানেই প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে—কে কথা বলছে? একজন বর্ণনাকারী? একজন লেখক? নাকি এমন একটি ভূখণ্ড, যার মধ্যে মানুষ, নদী, রাস্তা, প্রশাসন, ইতিহাস এবং ভাষা—সবাই একসঙ্গে বাস করে? ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ শুরু থেকেই আমাদের এই নতুন ধরনের শ্রবণশক্তি অর্জন করতে বাধ্য করে। এখানে একটি মাত্র কণ্ঠস্বরকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। একটি বাক্যের ভেতরেই বহু উপস্থিতি পাশাপাশি উচ্চারিত হতে থাকে।
এরপরের অনুচ্ছেদগুলিতে এই নতুন ধরনের বর্ণনার প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হতে থাকে। দেবেশ রায় শুধু দৃশ্য নির্মাণ করছেন না; তিনি চলার একটি ছন্দও নির্মাণ করছেন। ‘একবার ঝুলিয়ে নেয়’, ‘বগলেও নেয়’, ‘অবশেষে মাথায়’—এই ক্রিয়াগুলির পুনরাবৃত্তি মানুষটির কষ্টকে শুধু জানায় না, শরীরেও অনুভব করায়। তারপর আসে ড্যাশ—‘এক হাতে মাথার ওপর সাইনবোর্ডটা ধরা, আর-এক হাতে নাইলনের জুতোজোড়াটা ঝোলানো—পেছনের ঝোরা পেরতে খুলতে হয়েছিল, সামনে আছে পায়ে ও ফেরিতে পার-হওয়ার আরো নদী…’। এই ড্যাশ নিছক যতিচিহ্ন নয়। বাক্যটি এখানে সামান্য থামে, আবার এগোয়; যেমন মানুষটি একটি ঝোরা পেরিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে। বাক্যের শ্বাস-প্রশ্বাসও ভূখণ্ডের চলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যায়। কোনও কোনও লেখক যতিচিহ্ন ব্যবহার করেন ব্যাকরণের জন্য; দেবেশ ব্যবহার করেন অভিজ্ঞতার জন্য।
আরও লক্ষণীয়, মানুষদের পরিচয় ক্রমশ বস্তু দিয়ে তৈরি হচ্ছে। আমরা এখনও তাঁদের নাম জানি না। একজন ‘কৃত্রিম গো-প্রজনন কেন্দ্র’, আর-একজন ‘হলকা ক্যাম্প’। বস্তু মানুষকে ছাপিয়ে উঠছে। সাইনবোর্ড, জুতো, প্যান্ট, থলি, স্যান্ডেল—এই সমস্ত জিনিসের বর্ণনা এমন মনোযোগ দিয়ে করা হয়েছে যে তারা চরিত্রের সম্প্রসারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ক্ষয়ে-যাওয়া স্যান্ডেলের বর্ণনা—‘পা থেকে খসাতে গেলে, পায়ের পাতাও যেন কিছুটা খসে আসবে।’ এখানে স্যান্ডেল আর বাহ্যিক বস্তু নয়; শরীরেরই একটি অঙ্গ। এইখানেও একটি পাঠপদ্ধতি শিখে নেওয়া যায়। কোনও টেক্সট যদি কোনও বস্তুর ওপর অস্বাভাবিক পরিমাণ মনোযোগ দেয়, তবে বুঝতে হবে, সেই বস্তু আর শুধু বস্তু নেই; তার মধ্যে একটি জীবনযাপন, একটি ইতিহাস, একটি সমাজ জমা হয়ে আছে।
তারপর হঠাৎ বাক্যের কর্তা আবার বদলে যায়। ‘কৃত্রিম গো-প্রজনন কেন্দ্র’ এখন দুলে-দুলে ছুটছে। মানুষটি যেন সম্পূর্ণ অদৃশ্য। চলেছে একটি শব্দবন্ধ, একটি প্রশাসনিক ভাষা। বাস্তবে মানুষ বোর্ড বহন করে; কিন্তু বাক্যের ভেতরে বোর্ডই মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছে। একজন মানুষ নিজের নাম হারিয়ে সেই ভাষার নামেই পরিচিত হয়ে উঠছেন, যা তিনি বহন করছেন। ভাষা এখানে যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা নিজেই একটি সামাজিক শক্তি।
শব্দের দিকেও তাকানো দরকার। ‘ডডং-ডং ডডং-ডং’—এই অনুকারশব্দটি শুধু আওয়াজ নয়, উপন্যাসের প্রথম সংগীত। দৃশ্যের আগে ছন্দ এসে যায়। টিনে আঘাতের প্রতিধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ চারপাশ নির্জন। সেই নির্জনতা শব্দটিকে আরও বড় করে তোলে। আমরা শুধু একজন মানুষের হাঁটার শব্দ শুনি না; শুনি একটি ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের প্রবেশের শব্দ। ভাষা, প্রশাসন, চলাচল এবং প্রকৃতি—সব একসঙ্গে সেই ছন্দে মিশে যায়।
এইখানেই উপন্যাসের শুরুতে রাখা মানচিত্রগুলির দিকে আবার ফিরে তাকাতে হয়। প্রথমে মানচিত্র, তারপর হাট, তারপর রাস্তা, তারপর নদী, তারপর মানুষ। এই বিন্যাস কোনও অলংকার নয়; এটি উপন্যাসটির চিন্তার বিন্যাস। সাধারণ উপন্যাসে মানুষ ভূগোলের মধ্যে বাস করে। এখানে ভূগোল মানুষের আগেই উপস্থিত। নদী পটভূমি নয়; সক্রিয় শক্তি। রাস্তা শুধু পথ নয়; জীবনযাত্রার নিয়ামক। হাট শুধু একটি স্থান নয়; বহু সম্পর্কের মিলনবিন্দু। মানুষের প্রতিটি ছোট কাজ—কাপড় গোটানো, জুতো খুলে নেওয়া, নদীর জলের উচ্চতা আন্দাজ করা—দেখায় তাঁরা কোনও বিমূর্ত প্রকৃতির মধ্যে নয়, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রতিদিন আলোচনায় বসে বাঁচেন।
তখন ‘কে কথা বলছে?’ প্রশ্নটি তার সবচেয়ে গভীর রূপে পৌঁছে যায়। এখানে কোনও একক বর্ণনাকারীকে আলাদা করে দেখানো যায় না। একজন লেখক আছেন, একজন কথক আছেন, কিন্তু তাঁদের ভেতর দিয়ে আরও অনেক কিছু কথা বলছে—নদীর প্রবাহ, হাটের চলাচল, প্রশাসনিক ভাষা, লোকজ অভ্যাস, পথের ধুলো, ক্ষয়ে-যাওয়া স্যান্ডেল, বহুদিন ধরে একই পথে হাঁটা মানুষের স্মৃতি। এই কণ্ঠস্বরের কোনও নির্দিষ্ট শরীর নেই। এটি একসঙ্গে ভূখণ্ড, ইতিহাস, মানুষের চলাচল এবং ভাষার স্মৃতি হয়ে কথা বলে। আর তখন বুঝতে পারি, কোনও কোনও উপন্যাসে বর্ণনাকারী একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সমগ্র জীবন্ত অঞ্চলের উচ্চারণ। এখানেই দেবেশ আর-এক ধাপ এগিয়ে যান। বিভূতিভূষণের বর্ণনাকারীকে গড়ে তুলছিল সময়; দেবেশ রায়ের বর্ণনাকারীকে গড়ে তুলছে ভূগোল। আর সেই কারণেই ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ পড়তে বসলে আমাদের প্রথম কাজ গল্প শোনা নয়; প্রথম কাজ, একটি বাক্যের মধ্যে কারা কারা কথা বলছে, তা শুনতে শেখা।
এবার আর-একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম, কে কথা বলছে। এখন প্রশ্নটিকে আর-একটু বদলানো দরকার। এই কণ্ঠস্বরটি কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে? একজন মানুষের স্মৃতি থেকে? একটি চরিত্রের অভিজ্ঞতা থেকে? না কি বহু মানুষের দীর্ঘ চলাচলের ভেতর থেকে? কারণ ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ যত এগোয়, ততই দেখা যায়, এখানে কোনও একক মানুষ ভাষার উৎস নয়। ভাষা যেন মানুষেরও আগে পথ চলতে শুরু করেছে।
উপন্যাসে প্রথম পর্বে হাটের শেষ দৃশ্যটি লক্ষ করুন। লেখক মানুষ গণনা করছেন না; তাঁদের চলাচলের বিন্যাস দেখছেন। কে কখন হাটে আসে, কে মাঝবেলায় আসে, কে একেবারে শেষ বিকেলে আসে—এই সময়ক্রম আসলে একটি সামাজিক ব্যাকরণ। যেন একটি দিনের মধ্যেই একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, ক্ষমতার স্তরবিন্যাস এবং জীবনযাত্রার ছন্দ লেখা হয়ে আছে। প্রথমে আসে পাইকার, তারপর জোতদার, তারপর গৃহস্থ। অর্থাৎ পথটি দিয়ে শুধু মানুষ হাঁটছে না; একটি সমাজ হাঁটছে। এইজন্যই শেষ দৃশ্যে ‘লাইন’ শব্দটি এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আর মানুষের সারি নয়; একটি সামাজিক বিন্যাসের দৃশ্যমান রূপ।
এই ‘লাইন’-এর ওপরই এসে ভর করে দাঁড়ায় দুটি সাইনবোর্ড। লক্ষ্য করুন, লেখক লিখছেন, ‘লাইন বাঁধা হয়ে যায় বলেই আকাশের দিকে ফেরানো ‘কৃত্রিম গো-প্রজনন কেন্দ্র’, আর পিঠে-ঝোলানো ‘হলকা ক্যাম্প’ যেন এই পুরো লাইনটিরই পরিচয় হয়ে উঠতে চায়।’ ‘পরিচয়’ শব্দটিই এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এতক্ষণ ধরে যাদের আমরা হাঁটতে দেখলাম, তাঁদের নিজস্ব কোনও পরিচয় উচ্চারিত হল না। অথচ পরিচয় পেল দুটি সাইনবোর্ড। অর্থাৎ মানুষ নিজের পরিচয় নিয়ে হাটে ঢুকছে না; তাকে একটি প্রশাসনিক ভাষা নতুন করে চিহ্নিত করতে চাইছে। ‘কৃত্রিম গো-প্রজনন কেন্দ্র’ এবং ‘হলকা ক্যাম্প’—দুটি শব্দবন্ধই রাষ্ট্রের ভাষা। একটির মধ্যে উন্নয়নের অভিধান, অন্যটির মধ্যে ভূমি-জরিপের অভিধান। হাটের লোকেরা এই ভাষায় কথা বলে না, কিন্তু এই ভাষা তাদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে এগিয়ে আসছে। একটি বাক্যের মধ্যেই দুই ভাষার সাক্ষাৎ ঘটে—লোকজ জীবনের ভাষা এবং প্রশাসনের ভাষা।
এই জায়গায় এসে উপন্যাসের শুরুতে দেখা নামহীনতার অর্থও স্পষ্ট হয়। আমরা কোনও চরিত্রের নাম জানি না, কিন্তু সরকারি প্রকল্পের নাম জানি। এই উল্টে-দেওয়া বিন্যাস কোনও কৌতুক নয়। এটি আখ্যানের দৃষ্টিভঙ্গি। ক্লোজ রিডিং করতে গিয়ে এই ধরনের অসম বণ্টনের দিকে সবসময় নজর রাখা দরকার। টেক্সট কোথায় বেশি শব্দ ব্যয় করছে, আর কোথায় ইচ্ছে করেই নীরব থাকছে? অনেক সময় লেখকের সবচেয়ে গভীর অবস্থান উচ্চারণে নয়, এই বণ্টনের মধ্যেই ধরা পড়ে।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। দেবেশ প্রায়ই মানুষের গতিকে বস্তু দিয়ে মাপছেন। সাইনবোর্ডের উচ্চতা, স্যান্ডেলের ক্ষয়, কাপড়ের ভাঁজ, নদীর জল, রাস্তার ঢাল—সবকিছু মিলিয়ে চলার একটি পরিমাপ তৈরি হয়। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এখানে প্রথম সারিতে নেই। তার জায়গায় আছে শরীরের অভ্যাস। কে কীভাবে জুতো খুলছে, কে কতখানি ধুতি গুটিয়েছে, কার চলার তাল কেমন—এইসব ক্ষুদ্র তথ্য ধীরে ধীরে চরিত্রের চেয়েও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে। কারণ মানুষের মন অনেক সময় মিথ্যে বলতে পারে, কিন্তু তার শরীরের অভ্যাস সাধারণত মিথ্যে বলে না।
এখানেই বাক্যের ছন্দও নতুন অর্থ পায়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দেবেশ রায়ের বাক্য কখনও হঠাৎ লম্বা হয়, আবার হঠাৎ ছোট হয়ে আসে। ড্যাশ, কমা, পুনরাবৃত্তি—সব মিলিয়ে বাক্যগুলি এমনভাবে এগোয়, যেন তারা নিজেরাও হাঁটছে। কোথাও নদী পেরোতে থামছে, কোথাও কাদা এড়িয়ে বাঁক নিচ্ছে, কোথাও আবার খোলা রাস্তায় গতি পাচ্ছে। অর্থাৎ বাক্যের স্থাপত্য আর ভূখণ্ডের স্থাপত্য পরস্পরকে প্রতিফলিত করছে। সাহিত্য পড়ার সময় এই প্রশ্নটিও জরুরি—বাক্যটি শুধু কী বলছে, তা নয়; বাক্যটি কীভাবে চলছে? কারণ অনেক লেখকের ক্ষেত্রে বাক্যের চলাই আখ্যানের প্রকৃত বিষয়।
এই কারণেই ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’-এর বর্ণনাকারীকে একটি শরীরের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তিনি কোনও সর্বজ্ঞ ঈশ্বর নন, আবার কোনও নির্দিষ্ট চরিত্রও নন। তিনি এমন একটি কণ্ঠস্বর, যার মধ্যে একই সঙ্গে জমা আছে নদীর পথবদল, হাটের নিয়ম, মানুষের পায়ের অভ্যাস, প্রশাসনিক শব্দভাণ্ডার, লোকমুখের উচ্চারণ এবং বহু প্রজন্মের চলাচলের স্মৃতি। তাঁর চোখ কোনও এক জায়গায় স্থির থাকে না। যেমন নদী নিজের খাত বদলায়, তেমনি তাঁর দৃষ্টিও মানুষ থেকে বস্তুতে, বস্তু থেকে ভূগোলে, ভূগোল থেকে ইতিহাসে, আবার ইতিহাস থেকে একটি শব্দের ভেতরে চলে যায়।
এখানে ‘কে কথা বলছে?’ প্রশ্নটির আর-একটি সম্ভাব্য উত্তর খুলে যায়। কোনও কোনও উপন্যাসে বর্ণনাকারী একজন মানুষ নন; একটি অঞ্চল নিজের সম্পর্কে যা মনে রাখে, তিনি সেই স্মৃতির ভাষা। সেই ভাষার মধ্যে কোনও একক মালিক নেই। সেখানে মৃত মানুষের পদচিহ্ন যেমন আছে, তেমনি বর্তমানের হাঁটার শব্দও আছে। সেখানে নদী যেমন কথা বলে, তেমনি রাস্তা; হাট যেমন কথা বলে, তেমনি সাইনবোর্ডও। ফলে উপন্যাসটি পড়তে-পড়তে আমরা আর কোনও ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনি না; শুনি একটি ভূখণ্ডের দীর্ঘ উচ্চারণ। একজন লেখক সেই উচ্চারণকে লিখে দেন, কিন্তু তিনি তার একমাত্র বক্তা নন। তাঁর কলমে তখন কথা বলতে শুরু করে এমন এক সম্মিলিত স্মৃতি, যার কোনও নির্দিষ্ট মুখ নেই, অথচ যার ভাষা আশ্চর্যরকম স্পষ্ট। এখানেই দেবেশ রায়ের ন্যারেটর বাংলা উপন্যাসে এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেন। তিনি আমাদের শেখান, এমনও আখ্যান সম্ভব, যেখানে কণ্ঠস্বরের প্রকৃত অধিকারী কোনও মানুষ নয়, একটি সম্পূর্ণ জীবনবিশ্ব।


পরবর্তী সংখ্যা
‘আলো যেখানে কম’ লেখামালার তৃতীয় গদ্য ‘কে কথা বলছে?—কণ্ঠস্বরের গোলকধাঁধা’ প্রকাশিত হবে আগামী সংখ্যায়।
(এই লেখামালা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।)

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes