
ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (প্রথম পর্ব) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়
আটের দশকের মফসসল শহরে বেড়ে উঠছিল একটি মেয়ে। ঋতি। এক অসুস্থ শৈশবে, ভিড়ের মধ্যেও নির্জনে তার বড়ো হয়ে ওঠা। একটু যত্ন, সামান্য ভালোবাসা না পাওয়া কাঙাল এই মেয়েটির বড়ো হয়ে ওঠা এই উপন্যাসের বিষয়। দমবদ্ধ এক পারিবারিক আবহে অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা মেয়েটির জীবন, তার লড়াই! নারী হিসেবে, অসুন্দর হিসেবে, গরীব হিসেবে এই সমাজ মানসের সঙ্গে তার একার লড়াই। পাশে রয়েছে মা, নিরুপায়, অসহায়। তবু অদম্য জেদ ঋতিকে এগিয়ে দিয়েছে। যদিও এই উপন্যাস ঋতির ক্ষরণের ইতিহাস। তার নির্মল মন, তার নিখাদ ভালোবাসার ক্ষরণ। সমকাল, তার মনবদল, নববইয়ের বিচিত্র পট পরিবর্তন সবই ছুঁয়ে আছে এই উপন্যাসের শরীর! ঋতি কি শেষপর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে! আজ প্রথম পর্ব।
প্রথম পর্ব
১
দুপুরের কড়া রোদে এতটা রাস্তা হেঁটে এসে মোড়ে দাঁড়িয়ে রাগেশ্রী ঘামছিল। যদিও সময়টা ফেব্রুয়ারি; সন্ধের পর থেকে একটা ঠান্ডা আমেজ থাকে; তবু ছাতা না নিয়ে এতটা রাস্তা হেঁটে আসতে গিয়ে তার শরীর খারাপ লাগছিল। আজকাল প্রায়ই এমনটা হয়। একটু বেশি কাজকর্ম করলেই মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে; শরীর অবশ লাগে; তবু রাতে শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না! কি একটা দুশ্চিন্তা যেন তার মাথার ভিতর দিয়ে গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সারারাত ধরে কড়িকাঠ গোনা ছাড়া করার কিছুই থাকে না। শেষ রাতের দিকে আস্তে আস্তে চোখ লেগে আসে। ভোর হতেই রান্নাঘরে চায়ের বাসনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়; ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসেই মনটা অতিরিক্ত মাত্রায় সজাগ হয়ে যায়। সারাদিন নানা আশঙ্কা আর আতঙ্ককে ছায়ার মতো পাশে পাশে ঘুরতে দেখে নিজেকে কি ভীষণ ক্লান্ত লাগে! ভুল; মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে সে জীবনে! যার খেসারত হয়তো সারা জীবন দিয়ে তাকে মেটাতে হবে! মা, বাপী, কাকুর ওপর রাগ করে যে নিজেকেই এমন স্বেচ্ছাবন্দিত্বে বেঁধে ফেলবে সে বুঝতে পারেনি। ভুল ভাঙতে অবশ্য খুব বেশি সময় লাগেনি; মাত্র এক সপ্তাই যথেষ্ট ছিল তার জন্য! তারপরই শুরু হয়েছিল আফশোস; যে আফশোস বোধহয় তার সারা জীবনেও মিটবে না; বরং বাড়বে। এ ক’দিনে প্রতিমুহূর্তে সে উপলব্ধি করেছে তাদের বিরাট যৌথ পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের অনাবশ্যক যাতায়াতের মধ্যেও যে নিশ্চিন্ত আশ্রয় তার ছিল তা তাকে বাইরের পৃথিবীটা সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞান করে রেখেছিল। শুধু সে-ই নয়; তার ভাই-বোনেরাও তো একইরকম সরল! সরল নয়,বোকাই বলা যায়! তার বাপী,মা,কাকুও কি তার থেকে বেশি কিছু! ওই চৌহদ্দির বাইরে এসে যে জটিলতার পরিচয় সে পেয়েছে তা কি তার বাড়ির মানুষজন কখনো ভাবতে পারবে! মানুষের মন যে এতো ছোটো হতে পারে জানাই ছিল না রাগেশ্রীর। এ কদিনের অভিজ্ঞতায় নিজেকে তার খুব পুরোনো বলে মনে হয়। আর সেই পুরোনো যেন তার কানে কানে বলে, এই তো সবে শুরু! আরও কত পুরোনো,জীর্ণ হওয়া বাকি! মনটা তার কাঁটা বেঁধার মতো তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে; অপ্রত্যাশিত আঘাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে।
বাস মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। পেছনের লেডিস সিটে বসেও এসব কথাই রাগেশ্রী ভাবছিল! চুলগুলো তার রুক্ষ হয়ে মাথার ওপর উড়ছে; কতদিন যে মাথায় একফোঁটা তেল পড়েনি! বিয়ের পর প্রথম দু-তিন দিন কেউ দেখিয়ে না দিলেও সসংকোচে তাকে রাখা তেলের শিশিটা থেকে সে তেল ব্যবহার করেছিল। বৌভাতের দুদিন পর স্নান করতে যাওয়ার সময় শাশুড়ি তাকে বলে, ‘তুই বাড়িতে তেল মাখতিস না কি!’
প্রশ্নটা শুনেই রাগেশ্রী চমকে তাকায়!
‘তোর মাথায় তো চুলই নেই! রোজ একগাদা তেল মেখে কি করবি!’’
রাগেশ্রীর কান গরম হয়ে উঠেছিল।নিজেকে তার কেমন চুরির দায়ে ধরা পড়া আসামির মতো মনে হচ্ছিল।
‘শোন, আমার বড় বৌমার মাথার চুল তো দেখছিস! কত সুন্দর চুলের গোছা ওর! সারাদিনে সংসারে কাজ করে চুলের যত্ন নিতে পারে না। তাই বিশু ওর জন্য লক্ষীবিলাস তেল এনে দিয়েছে। জানিস তো ওই তেলের দাম কত! সবাই মিলে ওর থেকে ভাগ বসালে চলে!’
রাগেশ্রী তাড়াতাড়ি তেলের শিশিটা তাকে রেখে দেয়। রুক্ষ মাথায় জল ঢেলে স্নান সেরে নেয়। তার খুব অবাক লাগে; কোনো বাড়িতে আলাদা আলাদা মানুষের জন্য এমন আলাদা ব্যবস্থা থাকতে পারে সে ভাবতে পারেনি! বাপের বাড়িতে সে এমনটা কখনো দেখেনি। মা তো বাড়িতে তারককেও কখনো আলাদা করে কম খাবার পরিবেশন করেনা! মাছটা,দুধটা যেটুকু তাদের চার ভাইবোনের পাতে পড়ে তারকও তাই-ই খায়!
রাতে শোবার সময় চুল বাঁধতে গিয়ে তার কোঁকড়ানো চুলে জট পড়ে গেছে দেখে অনন্ত জিজ্ঞাসা করে, ‘চুলে তেল দাওনি?’
রাগেশ্রী সকালের ব্যাপার নিয়ে অস্বস্তিতেই ছিল। অনন্ত জিজ্ঞাসা করায় ও গড়গড় করে সব বলে ফেলে।
অনন্ত সোজা হয়ে বসে বিছানায়।
রাগেশ্রী তখনও অনন্তর মুখ দেখে পরিস্থিতি আঁচ করতে শেখেনি। সে বলে ফেলে, ‘মা তো তত্ত্বে আমার জন্য তেল-সাবান সবই পাঠিয়েছে। ওগুলোই তো আমি ব্যবহার করতে পারি।’
অনন্ত দাঁতে কটকট আওয়াজ করতে করতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। বসার ঘরে দাঁড়িয়ে অতো রাতেই চিৎকার করে বলতে শুরু করে, ‘মা, তুমি শ্রীকে তেল মাখতে দাওনি? শ্রী তাই বাপের বাড়ি থেকে আসা ওর তত্ত্বের খোঁজ করছে?
রাগেশ্রীর হাত-পা অবশ হয়ে যায়।গলা কাঠ হয়ে আসে। হতভম্ব হয়ে ও অনন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে।
শাশুড়ি বিছানা থেকে উঠে এসে অদ্ভুত মোলায়েম গলায় বলে ওঠে, ‘ও মা বুধু, আমি তোর বউ কে তেল মাখতে মানা করব কেন! আমি তো শুধু জিজ্ঞেস করেছি ও বাপের বাড়িতে কখনো তেল মাখত কি না!’ বলেই তিনি রাগেশ্রীর ঘরের সামনে গিয়ে হাত নেড়ে বলতে শুরু করেন, ‘কি রে! তুই আবার এসব কথা সাতখানা করে বরের কাছে লাগিয়েছিস?’
রাগেশ্রী ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ক্রমশ কুঁকড়ে যেতে থাকে।
অনন্ত বলে, ‘মা ওর বাপের বাড়ি থেকে কি পাঠিয়েছে ওকে দিয়ে দাও।’
শাশুড়ি বড় বৌকে ইশারা করলে মাধুরী ঘর থেকে নতুন স্যুটকেসটা এনে রাগেশ্রীর সামনে মেঝেতে ঠক করে রাখে। ‘নে রে, তোর বাপের বাড়ির জিনিস ঘরে তালা বন্ধ করে রাখ! তোর পেটে পেটে এত হিংসে আগে বুঝিনি বাপু!’
রাগেশ্রীর তখন আর কথা বলার মতো অবস্থা নেই। কান্নার দমকে তার চোয়াল আড়ষ্ঠ হয়ে গেছে। সে কোনোরকমে স্যুটকেসটা শাশুড়ির পায়ের সামনে রেখে ঘরে চলে যেতে চায়।
কিন্তু শাশুড়ি আরো খানিক ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, ‘তোকে তো এর আগে কখনো স্নো-পাউডার মাখতে দেখিনি। তাই এগুলো তুলে রেখেছিলাম বিজুর বউয়ের জন্য। আর তো দু’মাসের মাথায় বিয়ে! তা তোর যখন নিজের জিনিস আর কাউকে দেওয়ার ইচ্ছে নেই, তখন তুলে রাখ ওসব। আমারই বাপু ঘাট হয়েছে।’
রাগেশ্রী আরো একপ্রস্ত অবাক হয় একথায়। সে তো নিজের জিনিস কাউকে দেব না বলেনি। আবার কোনোকালে তেল মাখেনা এমনও বলেনি। এরা তো তারই মুখে কথা বসিয়ে তাকে যা তা বলছে! তার মনে হয় তার নিজের কথাটা গুছিয়ে বলা দরকার। কিন্তু গলার কাছে কি যে একটা আটকে আছে, রাগেশ্রীর আর কোনো কথা বলা হয় না। রাগেশ্রীকে আরো খানিকটা বিমূঢ় করে অনন্ত ঘরে ঢুকে বিছানায় উল্টো পিঠ করে শুয়ে পড়ে। রাগেশ্রী অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে কোনো অন্যায় না করেও সে কেমন করে এদের চোখে অপরাধী, হিংসুটে প্রমাণ হয়ে গেল। সেদিনের কথা মনে করে আজও চোখ ঝাপসা হয়ে আসে রাগেশ্রীর।
হঠাৎ গায়ে হাত পড়তে রাগেশ্রী চমকে তাকিয়ে দেখল বাণী দি, ‘কেমন আছ রাগেশ্রী?’
রাগেশ্রী হাসার চেষ্টা করে; মনে মনে ভাবে দিদিমণির তার নাম এখনো মনে আছে!
বাণী দি বলেন, ‘ওমা, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে? কেন! এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে কেন?’
রাগেশ্রী মাথা নিচু করে নেয়। কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না।
‘পড়াশোনা করছ তো?’
‘হ্যাঁ দিদিমণি। সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা।’
‘আচ্ছা। আর নাচ?’
‘নাচ আমি কোনোদিন শিখিনি দিদিমণি।’
‘নাচ শেখোনি! তুমি তো কি ভালো নাচতে! তোমার মহিষাসুরমর্দিনীর নাচ আমি এখনো ভুলতে পারি না।’
‘বড় দিদিদের কাছে শিখেছিলাম দিদিমণি।’ বলতে বলতে রাগেশ্রী উঠে পড়ে। তার কলেজ এসে গেছে। বাণীদিকে প্রণাম করে সে নেমে পড়ে। কিছুক্ষণ আগের মন খারাপ কেটে গিয়ে একটুকরো হাসি তার ঠোঁটের কোণায় দেখা দেয়। স্কুলের এত ছাত্রীদের মধ্যে বাণী দি তাকে আজও মনে রেখেছেন ভেবে কেমন রোমাঞ্চিত লাগে।
২
গত শতাব্দীর আটের দশকের গোড়ার সময়। খুব বেশি স্কুল সে সময় উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করানোর অনুমোদন পায়নি। তাই মাধ্যমিকের পরই শুরু হতো কলেজ জীবন। রাগেশ্রী আজ কলেজে এসেছে এডমিড কার্ড নিতে। আর দেড়-দু মাসের মধ্যে তার পরীক্ষা শুরু হবে। হয়তো তার পড়াশোনার জীবনের শেষ পরীক্ষা! এমনটাই ঘটবে জানে রাগেশ্রী। অনন্তর আচরণে অন্তত সেটারই আভাস পাওয়া গেছে।
জীবনের শুরুটা কিন্তু এমন ভাবে হয়নি রাগেশ্রীর। বিরাট যৌথ পরিবারে দশ ভাইবোনের সংসারে বড় ছেলের প্রথম সন্তান সে। কাকারা কাজের সূত্রে নানা জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু উৎসব-অনুষ্ঠানে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে দেখা-সাক্ষাৎ, থাকাথাকি চলতেই থাকে। রাগেশ্রীর বাপী পুলিশে চাকরি করে। কিছুদিন হলো পাতুলিয়ার পুলিশ ব্যারাক থেকে লাটবাগানের বিরাট কোয়ার্টারে উঠে এসেছে। সেজ কাকুও তাদের সঙ্গেই থাকে। সামান্য কিছু ব্যবসা করে আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের একজন সক্রিয় সদস্য। মাঝে মধ্যেই নানা জায়গায় বৈঠক থাকে। আর.এস.এসের পশ্চিমবঙ্গ শাখাটির দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত। বাপী অবশ্য কাকুর এসব হিন্দুত্ববাদী আদর্শ-টাদর্শ নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু তার এই আড়বোঝা গোঁয়ার ভাইটাকে স্নেহও করে।
কাকুর কাছেই গল্প শুনেছে রাগেশ্রী। তার তিন বছর বয়সে যখন মেজ বোনের জন্ম হল তখন আদরের সোনার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের হাতে নিয়েছিল কাকু। সারাদিন প্রায় কাকুর পেছনে পেছনে ঘুরত রাগেশ্রী। রাতে কাকুর কাছেই ঘুমতো। মাঝরাতে কাকুকে ডেকে বলত, ‘কাকু,আমি হিসি করে ফেলেছি। কাঁথা পাল্টে দাও।’ তারপর যখন ভাই হল তখন তো আরোই মায়ের কাছে থাকা সম্ভব হল না। ছোট্ট রাগেশ্রীর জগৎ জুড়ে তখন শুধুই কাকু। কাকুর কাছেই স্নান-খাওয়া-ঘুমনো-পড়াশোনা। সন্ধে থেকে রাগেশ্রী অপেক্ষা করত কাকু ফিরলে কাকুর কাছে পড়তে বসবে। কিন্তু কাকুর ফিরতে ফিরতে সন্ধে পেরিয়ে যেত। ক্লান্ত কাকু তখন ভোরবেলা পড়ানোর আশ্বাস দিত। ছোট্ট রাগেশ্রী তাই ভোরবেলা নিজে নিজেই ঘুম থেকে উঠে কাকুকে ডেকে তুলত, ‘কাকু, আমায় পড়াবেনা?’
কাকু মনে মনে বেশ অবাক হতেন; এতটুকু মেয়ের পড়াশোনায় এত আগ্রহ! ক্লাস ফোর পর্যন্ত রাগেশ্রীকে কাকুই পড়াতো। রাগেশ্রী ভালো রেজাল্ট করতো। ফোরে বৃত্তি পরীক্ষায়ও সে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল। মাত্র দশ বছরের রাগেশ্রীর মাথায় কে যে ওই অঞ্চলে এবং আশেপাশের বেশ কিছু অঞ্চলের মধ্যে বিখ্যাত ব্যারাকপুর গার্লস হাইস্কুলে পড়ার ভূতটা চাপিয়ে ছিল! রাগেশ্রী জীবনে ওই একবারই বাপীর কাছে জেদ ধরে বসেছিল। যদিও যাতায়াতের অসুবিধের জন্য তাকে পাতুলিয়ারই একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। ততদিনে তার ছোটো বোনের জন্ম হয়েছে। তিন মেয়ের বিয়ের চিন্তাই হয়তো বেশি তাড়িত করেছিল রাগেশ্রীর বাবা-মাকে।
রাগেশ্রী কিন্তু নতুন স্কুলেও যথারীতি ভালো রেজাল্ট করছিল। কাকু আর পড়ানোর সময় পায় না বলে রাগেশ্রীর জন্য স্থানীয় একটি ছেলেকে মাষ্টার ঠিক করা হয়েছিল। তারা তিন ভাইবোন একসাথে মাষ্টারের কাছে বসে পড়াশোনা করত। মেজবোন অস্মিতার পড়াশোনায় একেবারেই মন ছিল না। মাষ্টারমশাইকে ‘আসছি’ বলে সেই যে পালাত সকালের মধ্যে আর বাড়িমুখো হতো না। কার গাছে পেয়ারা ধরেছে, কোথায় চালতা পেকেছে… এই করে বেড়াত সারাদিন। অর্ধেক দিন তার স্কুল যেতে দেরি হয়ে যেত। মায়ের কাছে ঘা কতক খেয়ে দুপুরবেলা সে আবার পাড়া বেড়াতে বেরতো। বন্ধুও কটা জুটিয়েছিল ওরই মতো! দৈবাৎ যদি কোনোদিন স্কুল যেতে বাধ্য হতো তো পেছনের বেঞ্চে বসে টানা ঘুমোত। ভাই ছোট; মাষ্টারমশাই যা বলত শুনত। মন দিয়ে লেখাপড়াটা করত রাগেশ্রী। মাষ্টারমশাই এতো ভালো পড়াত যে অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল কোনোকিছুই বুঝতে তার অসুবিধে হতো না। আর একবার বুঝে গেলে আর কখনো ভুল হতো না। কোনোকিছু না বুঝে মুখস্থ করতে তার ভালো লাগত না। মাষ্টারমশাইও বুঝে পড়ার ওপর জোর দিতেন। সেবার ক্লাসের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। রাগেশ্রী খুব ভালো নম্বর পেয়েছে। দিদিমণিরা তার প্রশংসা করেছে। তার বাড়ি পৌঁছনোর আগেই আশেপাশের বাড়ির মেয়েরা সে খবর রাগেশ্রীর মাকে জানিয়েছে। মা এতো খুশি হয়েছে যে রান্না-বান্না ফেলে উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে আছে বড় মেয়ের জন্য। দূর থেকে রাগেশ্রী মা’কে দেখতে পেয়েছে। মার মাথায় ঘোমটা, মুখের কাছে আঁচল টেনে হাসি হাসি মুখে মা দাঁড়িয়ে আছে। সেই দৃশ্যটা আজও রাগেশ্রী ভুলতে পারেনি। মায়ের চোখে নিজের জন্য যে গর্বটুকু সেদিন দেখেছিল সে তা তার জীবনের আজ অবধি পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।
কিন্তু এতো আগ্রহ সত্ত্বেও রাগেশ্রী ধারাবাহিক ভাবে ভালো রেজাল্ট করতে পারল না। ক্লাস সেভেনের পড়াশোনা শুরু হতেই মাষ্টার রাগেশ্রীর কাকুকে জানাল পুলিশ ব্যারাকে রাগেশ্রী ও তাকে জড়িয়ে নোংরা কথা রটেছে। তার পক্ষে এই পরিস্থিতিতে আর পড়ানো সম্ভব নয়। অথচ রাগেশ্রী তখন সবে ১৩ বছরের মেয়ে; রোগা রোগা ছোট্টখাটো শরীর; তখনও স্কার্ট ব্লাউজ। এমন একটা বিশ্রী ব্যাপার তাকে নিয়ে হতে পারে সে নিজে তো ভাবেইনি, তার বাড়ির লোকও কখনো ভাবেনি। ছোটোবেলা থেকে তার ঠাকুরদার মুখে বারবারই সে শুনেছে নিজের অসৌন্দর্যের কথা। দুই কাকা ছাড়া তার বাড়ির সবাই সুন্দর; যেমন তাদের গায়ের রঙ, তেমনি কাটাকাটা চোখ-নাক,তেমনি লম্বা-চওড়া। ঠাকুরদা তাই বিরক্ত হয়ে প্রায়ই বলতেন, ‘এই কেলটিটা আমার বংশে জন্মালো কি করে!’ তাতে অবশ্য সামান্য মন খারাপ ছাড়া আর কিছুই আলাদা করে মনে হতো না রাগেশ্রীর। কালো কে কালো বলবে সেই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে ঘিরেও যখন এমন সমস্যার সৃষ্টি হল তখন সত্যিই মানুষের মনের বিকৃতি তাকে কষ্ট দিল। এবার পড়াশোনার কি হবে! সেভেন থেকে তো অ্যালজেব্রা আছে! তাকে কে বোঝাবে! অন্য বিষয়গুলোরই বা কি হবে! ভাইকে ভর্তি করা হল একটা কোচিং ক্লাসে। কিন্তু তার জন্য মাষ্টার রাখার কথা তো কেউ ভাবল না! একটা বছর স্কুলের পড়া শুনে-বুঝে পড়া তৈরি করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু স্কুলে তো উদাহরণের অঙ্কগুলো শুধু করিয়ে দেয়। বাড়িতে প্রশ্নমালার অঙ্কগুলো করতে গেলে নানা জায়গায় আটকে যায়। সব ইকোয়েশান বুঝতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে অঙ্কের স্টেপগুলো মুখস্থ করতে থাকে। না বুঝে মুখস্থ করায় সেগুলো মনে রাখতেও পারে না। সেভেনে থেকে এইটে কোনোরকমে টেনেটুনে পাশ করেছিল রাগেশ্রী। মায়ের মন খারাপ হয়েছিল। বাপী তো পাশ করেছে শুনেই খুশি। আর বেশি তলিয়ে ভাবার তার সময়ও নেই, প্রয়োজনও নেই। পুলিশের চাকরি নিয়ে ব্যস্ততা তো তার রয়েইছে, সেই সঙ্গে বাড়িতে অতিথি লেগেই আছে। হয় শালী-ভায়েরাভাই তাদের মেয়েকে নিয়ে মাস খানেক রয়ে যায়,নয় বোন-ভগ্নীপতি… বাবু-মা তো আছেই… মাঝে মধ্যেই সেজ ভাই জুটিয়ে আনে সংঘের লোক। দূরের জেলা থেকে কলকাতায় কোনো কাজে এসেছে; রইল এ বাড়িতে টানা পনেরো দিন। তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতেই বাপী হিমশিম খায়। ছোটো ভাই তিনটে এখনো পড়াশোনা করছে। তাদের জন্য খরচ আছে। ছোটো দুই বোনের বিয়ে দিতে হবে। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে এসব দায়িত্ব তারই। সেইসঙ্গে নিজের তিনটে মেয়ে। ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে আলাদা করে মাথা ঘামাবার সময় পাননা তিনি।
একদিন রাতে বেশ দেরি করে বাড়ি ফিরে কাকু দেখে রাগেশ্রী ঘরের বাইরে দাওয়ায় বসে কাঁদছে। ‘কি হয়েছে সোনা? তুমি কাঁদছ কেন?’
‘আমার পড়াশোনা তো কিছু হচ্ছে না কাকু? আমি যে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। এবার যে আমি ফেল করে যাব কাকু?’
কাকু হেসে ফেলে, ‘আচ্ছা আচ্ছা, এবার থেকে আমার সোনাকে আমিই পড়াব। তাহলে হবে তো!’
রাগেশ্রীর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘ সত্যি তুমি পড়াবে কাকু!’
‘হ্যাঁ সোনা, আমার সোনা পড়তে চাইছে,আর আমি তাকে পড়াবোনা!’
অনেকদিন পর সেদিন রাতে রাগেশ্রী ভালো করে ঘুমোয়। স্বপ্ন দেখে পরীক্ষায় আবার সে ভালো করেছে।দিদিমণিরা তাকে ঘিরে রয়েছে; ওই তো দূরে দাঁড়িয়ে মা; হাসি হাসি মুখে…
কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই রাগেশ্রী বুঝতে পারে নিয়মিতভাবে তাকে পড়ানো কাকুর পক্ষে সম্ভব নয়। কাকু নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। যদি বা কখনো সুযোগ ঘটে তো বাড়িতে এত ভিড় থাকে যে পড়াশোনার পরিবেশই থাকে না। এমনিতেই তাদের বাড়িতে এসোজন-বসোজন লেগেই আছে! তার ওপর আজকাল বাড়িতে কেউ এলেই অস্মি এমন করে তাদের থেকে যাওয়ার জন্য বায়না করে যে দু-তিন দিনের অতিথি এক সপ্তা কাটিয়ে তবে ফেরে। এই এক সপ্তা অস্মি তাদের গায়ের সঙ্গে লেপটে থাকে।গল্প করে,আড্ডা মারে,মাঠে খেলে, খাওয়ার সময় তাদের সঙ্গেই খায়, তাদের সঙ্গেই ঘুমোয়। বেশ মজাই লাগে তার। স্কুলে যেতে হয় না,পড়তে বসতে হয় না। বাড়ির কেউ তাকে বকাবকি করার সুযোগও পায় না। আর রাগেশ্রীকে মায়ের হাতে হাতে কাজ করতে হয়। তাদের খাওয়া-শোওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। রাতে সবাই ঘুমলে তবে একটু পড়ার সুযোগ পায়। অস্মির ওপর তার তখন খুব রাগ হয়। সুযোগ মতো কখনো ওর চুলের মুঠি ধরে নেড়ে দেয়। অস্মি অমনি কাঁদতে কাঁদতে বাপীর কাছে নালিশ জানায়।বাপী রাগেশ্রীর ওপর রাগ করে।
কিন্তু এতো চেষ্টা করেও শেষরক্ষা হয়না। একসময়ের ভালো রেজাল্ট করা মেয়ে মাধ্যমিকে অঙ্কে ব্যাক পায়। লজ্জা পায়নি তাতে রাগেশ্রী। সে তো দু-এক বছর আগে থেকেই বুঝতে পারছিল তার পরিণতি কী হতে চলেছে। ফলে তার তো অবাক হওয়ার বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। হতাশা শব্দটার সঙ্গে খুব বেশি পরিচয় তার ছিল না। সে শুধু চুপ করে গেছিল। কারো কাছে কৈফিয়ত, দায়িত্ব তলব করতে যায়নি! আর বড়োরা কেউ তার কাছে কৈফিয়ত চায়নি। তার পরিবারের পড়াশোনা বিষয়ে এমন উদাসীনতার কারণটা রাগেশ্রীর কাছে স্পষ্ট ছিল না।
৩
রাগেশ্রীর মায়েরা ছ’বোন, এক ভাই; ছোটবোনের জন্মের সময় মা মারা যান; বাবামশাই-ই তাদের কাছে সব। পশ্চিম দিনাজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাঁদগঞ্জে গোপেন্দ্র নারায়ণ মিশ্রের বিশাল জমিদারী ছিল। আগে ছিলেন রাজশাহীতে। দেশভাগের সময় ওপার বাংলার জমি-বাড়ি ছেড়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে এপারে চলে আসেন। কিন্তু ওপারের টান কোনোদিন অস্বীকার করতে পারেননি। ফেলে আসা বাড়ি-মানুষের টানে মাঝে মাঝেই চলে যেতেন বর্ডার পেরিয়ে কুসুমতালায় তাদের পরিত্যক্ত ভিটে,জাগ্রত কালীথানে। রাগেশ্রীও ছোটোবেলা মা’র সঙ্গে সেখানে গেছে; পূর্বপুরুষের ভিটে রাগেশ্রীর ভিতরেও টান দিয়েছিল। বাবার বাড়ির তুলনায় মা’র বাপের বাড়ি অনেক বেশি আপন রাগেশ্রীর। দাদামশাই আদর করে তাকে রু বলে ডাকতেন। যত্ন করে কোলে বসিয়ে খাওয়াতেন।
দাদামশাই কিন্তু ওই গণ্ডগ্রামে বসেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় অবহেলা করেননি। কখনো বালুরঘাট টাউনে রেখে,কখনো মালদায় হস্টেলে রেখে ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছিলেন। রাগেশ্রীর মামা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। মায়ের পিসতুতো ভাই মস্ত ডাক্তার। মামাতো এক দাদা ইতিহাসের অধ্যাপক। তাঁর লেখা ইতিহাস বই রাগেশ্রীদের স্কুলে পড়ানো হতো। রাগেশ্রীর মা’র হাতের লেখা মুক্তোর মতো। সেই পরিবারের মেয়ে হয়ে রাগেশ্রী মাধ্যমিকে ব্যাক পেল। সে কি এতোটাই নিরেট!
রাগেশ্রী এ নিয়ে গভীর ভাবে ভেবেছে। তার মনে হয়েছে তাঁর আত্মীয়তায় যুক্ত এই দুই পরিবারের মানুষজন এখনো পর্যন্ত নিজেদের জীবনগুলোই সাজিয়ে তুলতে পারেনি। নিজেদের প্রজন্মকেই উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারেনি। সেই পরিস্থিতিতে পরবর্তী প্রজন্মের দায়ভার নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। দাদামশাইয়ের মৃত্যুর পর রাগেশ্রীর মা তাদের বিশাল জমিদারীর কাজ, ছোটো দুই বোনের দায়িত্ব এসব নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। আর রাগেশ্রীর বাবা-কাকা তাদের ছোটো ছোটো ভাইবোনদের নিয়ে… এসবের মধ্যে রাগেশ্রীরা চার ভাইবোন যে অবহেলিত হচ্ছে তা তাঁদের মনে হয়নি। জীবন-গঠনের সময়টাতে এমন ফাঁকিতে পড়ে রাগেশ্রীদের জীবন যে এক ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলেছে একথা বাড়ির বড়োদের মাথায় আসেনি।
যাই হোক, তখনকার মতো রাগেশ্রীর জন্য একজন অঙ্কের মাষ্টারমশাই রাখা হয়েছিল। তাঁর কাছে অঙ্ক করতে বসে রাগেশ্রী নতুন করে যেন অঙ্কে ইন্টারেস্ট পেল। দিনরাত তখন রাগেশ্রীর একটাই কাজ; অঙ্ক করা। দুপুর বেলা তার কাছে এসে জুটত পুলিশ ব্যারাকেরই দুটি ছেলে। তারা পরের বছর মাধ্যমিক দেবে। তারা রাগেশ্রীর অঙ্ক করা দেখে অবাক হত।বলত, ‘তুমি এতো ভালো অঙ্ক করো! অথচ অঙ্কে ব্যাক পেলে কি করে!’
‘না রে, গত বছর এভাবে অঙ্ক করতে পারিনি।কেউ দেখিয়ে দেবার ছিল না। এবছর নতুন মাষ্টারমশাই খুব ভালো শেখাচ্ছেন। তাই পারছি।’
‘ইস, গতবছরই যদি কাকু তোমাকে একজন মাষ্টার দিতেন!
রাগেশ্রীর মন খারাপ হয়ে যেত। সারাজীবনের মতো তাকে এই অকৃতকার্যতা বয়ে বেড়াতে হবে। কেউ ভেবে দেখবেনা আসল কারণটা। সবাই তাকে নিয়ে ঐলীক করবে,মজা করবে; হেয় হতে হবে তাকে সর্বত্র।
পরেরবার অবশ্য রাগেশ্রী ভালোভাবেই পাশ করেছিল। কাছাকাছি একটি কলেজে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল আর্টস নিয়ে। ততদিনে রাগেশ্রীর বাবা লাটবাগানে বড়ো কোয়ার্টার পেয়ে গেছেন।রাগেশ্রীকে কলেজে আসার জন্য অনেকটা হাঁটতে হত; তারপর বাস। মর্নিং কলেজ; বাড়ির প্রায় কেউই অত সকালে ঘুম থেকে উঠত না; রাগেশ্রী নিজের মতো দুটো বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে পড়ত। দুপুর ১ টা অবধি ক্লাস থাকত। তার খিদে পেয়ে যেত।অথচ হাতে বাসভাড়া ছাড়া কিছুই থাকত না। টিফিন আনা যেতেই পারত। কিন্তু মা দুবেলা হেঁসেল ঠেলে এতটাই ক্লান্ত থাকে যে ভোরবেলা টিফিন বানিয়ে দেওয়ার কথা বলতে ইচ্ছে করত না। রাগেশ্রী ভাবত তার বাপী-মার একবারও কি মনে হয় না যে সকাল থেকে এতটা সময় কলেজে মেয়েটার খিদে পেতে পারে!
পিরিয়ডের সময়টা রাগেশ্রী পেটে ব্যথায় মারাত্মক কষ্ট পেত। একে তো কাপড় ব্যবহার করতে হয়। তার ওপর রাগেশ্রীর ব্লিডিং এতো বেশি হয় যে মোটা করে কাপড় নিতে হয়। ফলে হাঁটতে অসুবিধে হয়। থাইয়ে ঘষা লেগে নুনছাল উঠে যায়। পেটের যন্ত্রণায় খেতে ইচ্ছে করে না। এইসবের মধ্যে কলেজ, পড়াশোনা সবই চলে। এসব কথা বাপী-কাকুকে জানাবার নয়। কিন্তু মা তো জানত সবই। মায়েরও কখনো মনে হয়নি রাগেশ্রীকে ডাক্তার দেখানো দরকার। একে তো রোগা! তার ওপর শরীর থেকে এতো রক্ত বেরিয়ে গেলে যুঝবার ক্ষমতাটাই তো থাকবেনা!! নাঃ এসব ভাবেনি রাগেশ্রীর মা।
হয়তো দু-দিন হল চটি ছিঁড়ে গেছে; সেফটিপিন লাগিয়ে কোনোমতে কলেজে এসেছে রাগেশ্রী। বাপীকে বলেছে; কিন্তু উদ্যোগ নিয়ে জুতো কেনার কথা কারো মনে হয়নি। এমনকি কাকুর ও না। সেফটিপিন লাগিয়ে হাঁটতে গিয়ে রাগেশ্রীর পায়ে ফোসকা পড়ে গেছে। এদিকে বাড়িতে ভালো ভালো রান্না হচ্ছে, খাওয়া হচ্ছে।মাছ,মাংস, ক্ষীর,গোকুল পিঠে কোথাও কোনো খামতি নেই। খামতি শুধু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায়! এসব সত্ত্বেও রাগেশ্রী পড়াটা চালিয়ে যাচ্ছিল। কলেজেরই একজন প্রফেসরের কাছে তারা কয়েকটি মেয়ে ভর্তি হয়েছিল । তিনি দর্শন, ইতিহাস, শিক্ষাবিজ্ঞান,বাংলা খুবই ভালো পড়াতেন। কিন্তু ইংরেজিটা তেমন ধরতে চাইতেন না। কলেজের ইংরাজির প্রফেসর এত দ্রুত ইংরেজিতে কথা বলেন যে সবটা বোঝা যায় না। বারবার জিজ্ঞেস করতেও অস্বস্তি হয়। ফলে এবার ইংরেজিতে ফাঁকি পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। রাগেশ্রী বুঝতে পারছিল অন্য বিষয়গুলোতে পাশ করতে পারলেও ইংরেজিতে সে পাশ করতে পারবে না। প্রত্যেকটা ধাপে এক বছর করে ফেল করে করে সে কতদূর এগোবে। তার মা-বাপীর ওপর রাগ হয়।এত উদাসীনতা কেন! নিজেদের নিয়ে এত কিসের ব্যস্ততা যে ছেলেমেয়েগুলোর দিকে নজর দেওয়া যায় না। তোমাদের ব্যর্থতার দায়ভার তারা বহন করবে কেন! কিন্তু মনে মনে ভাবলেও এসব কথা বলা হয়ে ওঠেনি কখনো। বরং অনন্তর মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে একরকম মায়ের বিরুদ্ধে গিয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিল রাগেশ্রী। এখানে তার কিচ্ছু হবে না। তার থেকে অনন্ত তার দায়িত্ব নিলে সে আবার নতুন করে চেষ্টা করে দেখবে।
৪
অনন্ত এই অঞ্চলে পরিচিত গায়ক হিসেবে। খড়দায় স্বপ্না মুখার্জির কাছে ও গান শেখে। অবশ্য বেশ বড় বয়সেই গান শিখতে শুরু করেছিল ও। তারপর সেটা নেশা হয়ে গেছে। ওই গানের স্কুল থেকেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় বলরাম দা’র। বলরাম দা পুলিশে চাকরি করে আর তবলা বাজায়। অনন্তর সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি তার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। বলরাম তাকে নিয়ে যায় পুলিশ ইন্সপেক্টর শিবপ্রসাদ সিং এর কাছে। এই ভদ্রলোকও তবলা বাজান; আর শ্যামাসঙ্গীত গান।অনন্তকে তার খুব পছন্দ হয়। প্রথমত ছেলেটি খুবই ভালো গান গায়;কোনো জড়তা নেই; স্পষ্ট উচ্চারণ;তাল জ্ঞান যথাযথ; সবচেয়ে ভালো তার গলাখানি। যেমন সুরেলা,তেমনি দরাজ! আর কোনো গানে ছেলেটির আপত্তি নেই। অতুলপ্রসাদী, রজনীকান্ত, নজরুল গীতি, আধুনিক গান চুটিয়ে গায়। সেই সঙ্গে আছে তার মিষ্টি হাসিখানি। এতো অমায়িক ব্যবহার অনন্তর যে তাকে ভালো না বেসে পারা যায় না।
লাটবাগানে প্রায়ই সন্ধেবেলা করে ছোটোখাটো গানের জলসা বসে। শিবপ্রসাদ সেখানেই অনন্তর গান গাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। অনন্ত গেয়েওছিল সেদিন মন খুলে। আসড় জমে গেছিল একেবারে। নজরুলগীতিগুলোতে অনন্ত গলা খেলিয়ে নানা কাজ করে; ছোটো ছোটো মুড়কি, সুরের মারপ্যাঁচ করে সোমে ফিরে শিবপ্রসাদ দা কে বাজানোর সুযোগ দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই শিবপ্রসাদ দা তবলায় ছোট্ট একটা লহরী বাজিয়ে নিয়ে সোমে ফিরে ফের অনন্তর হাতে ছেড়ে দেয়। এই অপূর্ব সমঝোতায় সেদিন শ্রোতা ধন্য ধন্য করে উঠেছিল। রাগেশ্রীর বাবা গান ভালোবাসেন ভীষণ। তাই লাটবাগানের অনুষ্ঠানে তিনি তো উপস্থিত থাকবেনই। সেদিন সঙ্গে রাগেশ্রীও ছিল। ভদ্রলোকের গান শুনে মনে মনে মুগ্ধ হয়েছিল রাগেশ্রী। বাপী তো তাকে বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণই করে বসেছিল।
সেদিন টিউশন থেকে ফিরতেই অস্মি বলে উঠল, ‘দিদি তুই আজ এতো দেরি করলি কেন! তোর কথা খুব মনে হচ্ছিল!’
‘কেন?’
ছোটো বোন টুয়া এসে দিদির হাত ধরে বলল, ‘জানিস দিদি, অনন্ত কাকু এসেছিল। সেই যে রে, যে সেদিন মাঠের ফাংশানে দারুণ গান করল!’
‘তাই! উনি আমাদের বাড়ি চিনলেন কি করে?’
‘আরে, শিবপ্রসাদ কাকু নিয়ে এসেছিল। এবার থেকে মাঝে মাঝে আসবে বলেছে। আমাকে আর ছোড়দিকে গান শেখাবে!’
রাগেশ্রীর খুব আনন্দ হয়েছিল। অতো ভালো একজন গায়ক তাদের বাড়ি আসবেন!
এরপর অনন্ত প্রায়ই রাগেশ্রীর বাড়ি যাতায়াত করত। অস্মি আর টুয়াকে গান শেখাত, গল্প করত; রাগেশ্রীর ঠাকুমা,বাপী মুগ্ধ হয়ে তার গান শুনত।রাগেশ্রীরও ভালো লাগত অনন্তকে। এত ভালো গান গায়, কিন্তু কোনো অহংকার নেই। যদিও অনন্তর সঙ্গে রাগেশ্রীর আলাদা করে কোনো কথা হত না।
একদিন অনন্ত থাকাকালীন ধীরাজ কাকু এসেছিলেন। ধীরাজ কাকুকে রীতিমতো পণ্ডিত বলা যায়।রাগ-রাগিণীর ওপর দারুণ দখল। রাগেশ্রী ধীরাজ কাকুর একনিষ্ঠ ভক্ত। যদিও রাগেশ্রী গান গাইতে পারে না। তার গলায় ফ্যারেনজাইটিস আছে। কিন্তু ধীরাজ কাকুর কাছে শুনে শুনে সব রাগ তার মুখস্থ;সুর শুনে সে বলে দিতে পারে কোন্ রাগটি গাওয়া হচ্ছে। রাগগুলি গাওয়ার সময়, কড়ি কোমল স্বরের ব্যবহার সব সে জানে। শুধু সুরটুকুই তার গলায় নেই। তাই কেউ ভালো গান গাইলে সে কেমন আবিষ্ট হয়ে পড়ে। গান গাওয়া মানুষটিকে তার ঈশ্বরের সন্তান মনে হয়। ধীরাজ আসাতে রাগেশ্রীর বাপীও খুশি হয়েছিলেন। অনন্তর মতো একটি প্রতিভার প্রকৃত সমঝদার তো ধীরাজের মতো মানুষই! অনন্ত অবশ্য এই ধীরাজ দাকে আগে থেকেই চিনত; আর সে পরিচয় খুব সন্তোষজনক ছিল না। কারণ ধীরাজ গুণি হলে হবে কি; অত্যন্ত অহংকারী। অন্যকে হেয় করে সে আরাম পায়। অনন্ত এসব জানত বলেই সেদিন সুযোগ পেয়ে বেশ কিছু রাগাশ্রয়ী গান শোনায়। ধীরাজ মুখে নানা শব্দ করে নিজের অপছন্দ জাহির করতে থাকে, বলে, ‘ক্ল্যাসিকাল বেস না থাকলে এসব গান গাওয়া উচিত নয়!’
রাগেশ্রীর বাপীই বিরক্ত হয় একথায়। অনন্তর ক্ল্যাসিক বেস না থাকলেও তার রেওয়াজী গলা! গানগুলি অপূর্ব শুনতে লেগেছে।
ধীরাজ বলে, ‘রাগ-রাগিণী গাইতে না পারলে সে আবার গানের কি জানে হে!’
‘শোনো,ধীরাজ, ভালো গান গাওয়াটাই বড় কথা! শ্রোতার কেমন লাগছে সেই হল আসল।’
‘সে তুমি বলতেই পার! তবে আমার কাছে গানের ব্যাকরণ জানাটা জরুরি।’
‘ধীরাজ, তুমি যদি জানতে অনন্তর ক্ল্যাসিকাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে তাহলে এই গানগুলোরই তুমি প্রশংসা করতে!
এই পুরো তর্কটির মাঝে অনন্ত একটা কথাও বলেনি সেদিন। রাগেশ্রীর কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু রাগেশ্রী অনন্তর সংযম ও ভদ্রতাবোধ দেখে অভিভূত হয়েছিল। তাকে নিয়েই তর্ক। অথচ সে একটি শব্দ ব্যবহার তো করেইনি, এমনকি এতো টুকু বিরক্তি প্রকাশ করা বা অসম্মান করা… কিচ্ছু না। রাগেশ্রীর চোখে সেদিন অনন্তর জন্য শ্রদ্ধাভাব পড়ে ফেলা খুব কঠিন ছিল না।
এরপর স্বাভাবিক ভাবেই এ বাড়িতে অনন্তর যাতায়াত বেড়েছিল। সন্ধেগুলো গানে,গল্পে দারুণ কাটত। রাগেশ্রীর ভাই অনন্তর সঙ্গে তবলা বাজাতো। অস্মি,টুয়া গান গাইত। আর রাগেশ্রী মুগ্ধ শ্রোতা। একদিন অনন্ত চলে যাওয়ার পর কাকু বলল, ‘ ছেলেটি বেশ ভালো কিন্তু! এবাড়ির জামাই হিসেবে বেশ মানায়!’
রাগেশ্রী কাকুর দিকে অবাক হয়ে তাকায়, ‘কাকু হয় তো!’
রাগেশ্রীর কাকু অদ্ভুত ভাবে হাসেন। খুব মজা পেলে কাকু মাঝে মাঝে এভাবে হাসে। যার কথায় হাসি পেল তার কথাটাই গলাটাকে সরু করে বারবার বলতে থাকে আর হাসতে থাকে।
এর কয়েকদিন পরেই একদিন কলেজ থেকে বেরোবার মুখে রাগেশ্রী দেখে অনন্ত সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জানে না কেন, রাগেশ্রীর শরীরটা কেমন কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। কানটা গরম হয়ে গেছিল আর হাতের তালু ঠান্ডা বরফের মতো। রাগেশ্রীকে দেখে অনন্ত নিজে থেকেই এগিয়ে এসেছিল, ‘এদিকে এসেছিলাম একটা কাজে।তোমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম।’
রাগেশ্রীর ভিতরে কেমন যেন একটা আনন্দ হচ্ছিল। হালকা হাসতে গিয়ে সে বোঝে ভেতরের আনন্দটা সে চেপে যেতে পারছেনা। বাসস্টপে দাঁড়াতে চাইলে অনন্ত বলে, ‘চলো না, আমি তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি।’
অনন্তর আগ্রহ দেখে রাগেশ্রীর আর না বলতে ইচ্ছে হয় না। যদিও এমন হঠাৎ করে একজন বাইরের লোকের সাইকেলে চড়ে বসাটা খুব অস্বস্তিকর। তার ওপর আবার অনন্তর সাইকেলে ক্যারিয়ারও নেই; বসতে হবে সামনের হ্যান্ডেলে। ফলে রাগেশ্রী কি করবে বুঝতে পারে না।এভাবে কোনোদিন তো সে বাপীর সাইকেলেও চড়েনি। অনন্ত বোধহয় বোঝে কিছু, বলে, ‘আচ্ছা চলো হাঁটতে হাঁটতে যাই!’
রাগেশ্রী এবার খুশি হয়। এতোটা রাস্তা হেঁটে যাওয়া যে বেশ কষ্টকর একথা তার মনে হয় না। ওদিকে অনন্ত নানারকম কথা বলতে থাকে। বাড়ির কথা,দাদা-বৌদি,মা,ভাই… ছোটোবেলার কথা,কৃষ্ণনগরে মামার বাড়ির কথা! শুনতে শুনতে কখন যে রাস্তাটা ফুরিয়ে যায় রাগেশ্রী বুঝতেই পারে না। লাটবাগানে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে অনন্ত এবার বিদায় নিতে চায়। রাগেশ্রী হঠাৎ করেই বলে বসে,’ওবেলা আসবেন তো?’
অনন্ত তাকিয়ে হাসে। সে হাসির মধ্যে এমন কিছু ছিল রাগেশ্রীর কানদুটো আবার গরম হয়ে যায়। ঘুরে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায় ও। মনে মনে ভাবে আজ যেন একটু বেশিই তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে গেল সে।
এরপর থেকে সপ্তাহে এক-দুদিন অনন্তর কোনো না কোনো কাজ পড়তে থাকে রাগেশ্রীর কলেজের দিকে। ফেরার পথে অবধারিত দেখা হতো রাগেশ্রীর সঙ্গে। ততদিনে অবশ্য রাগেশ্রী হয়ে গেছে শ্রী। তারপর বাকি পথটা কাটত ওড়াউড়ি তে। লজ্জা, লজ্জা পেরিয়ে দু-একটা কথা, হঠাৎ চোখে চোখ পড়ে যাওয়া, ছোট্ট কোনো ইশারা… পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কখন যে একে অপরের হাত ধরে ফেলেছিল তারা! অনন্তর কথা শুনতে শুনতে শ্রীর মনে হতো অনন্ত যেন বহুকাল চুপ করেছিল। কারো সঙ্গে তার কথা বলা হয়নি। অথচ কত কথাই যে জমেছিল তার মনে! শ্রীই বুঝি তার একমাত্র মুগ্ধ শ্রোতা! অনন্ত ফাঁকা রাস্তায় আপন মনেই গান ধরত। খালি গলার সে সব গান যেন হাওয়ায় হাওয়ায় মিশে যেত, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায়…আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি আমারি তিয়াসী বাসনায়… শ্রীর মনে হতো সে যেন নতুন করে দেখছে এই পৃথিবীকে… কত রঙ ছিল তার চারপাশে! সে এতো দিন চোখ মেলে দেখেইনি! কত আলো আর আলো… সে আলো রাঙিয়ে দিত তার মুখখানা… ভিতরে কেমন তিরতির করে বয়ে যেত আনন্দ…কোনো কারণ নেই; অথচ এতো আনন্দ! তার দৈনন্দিন জীবনের সুবিধা অসুবিধা কিছুই যেন আর গায়ে লাগত না! অস্মির ওপর আর বিরক্ত আসত না। কে যেন কোন অদৃশ্য সুতোয় টান দিয়েছিল তার মর্মখানি! সেই আবেশেই দিন কাটছিল। কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে আনমনেই চোখ যেন কাকে খুঁজে ফিরত। অথচ খুঁজে পাওয়ার পর আর চোখ তুলে দেখাই যেত না। চোখের পাতা ভারি হয়ে যেন ডুব দিতে চাইত কোন অপার্থিব অনির্বচনীয়তায়!
কিন্তু বাইরের পৃথিবী যে বড় হিসেবী! অনির্বচনীয়তায় তার বিশ্বাস নেই! পাওনা-গন্ডা বুঝে নিয়ে তবে সে মুক্তি দেয়। তাতে সব রস শুকিয়ে জীবনটা ছিবড়েই কেন না হয়ে যাক! সেই পৃথিবীই একদিন এসে কড়া নাড়ল শ্রীর জীবনে! অনন্তর মা এসে উপস্থিত হলেন শ্রীর বাবা-মার কাছে। অল্প বয়সের বিধবা; একা হাতে মানুষ করেছেন এক মেয়ে আর তিন ছেলেকে। এখন বেশ বয়স হয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় একসময় সুন্দরী ছিলেন।বড় বড় চোখ, পাতলা ঠোঁট; কিন্তু মুখের ভাব কেমন শক্ত, কঠিন; কোথাও এতটুকুও কমনীয়তা নেই। ওঁকে দেখেই শ্রীর বুকের ভিতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠেছিল; মনে হচ্ছিল নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।শ্রীর মা’কে ডেকে তিনি বলেছিলেন, ‘ বৌমা, আমার মেজ ছেলের জন্য তোমার বড় মেয়েটিকে চাই।’
শ্রীর মা অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন ওঁর দিকে। বড় মেয়ের বিয়ে নিয়ে দু-চার কথা তার স্বামী, দেওরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বটে; কিন্তু অনন্ত!
অনন্তর মা বলেন, ‘ তোমার মেয়ে আর আমার ছেলে যখন নিজেরা পছন্দ সেরেই ফেলেছে তখন আর দেরি করা উচিত নয়।’
শ্রীর মা যেন আকাশ থেকে পড়ে, নিজেরা পছন্দ করেছে মানে! শ্রী তো নিজে থেকে অনন্তর সঙ্গে কথাও বলে না! পছন্দ করল কখন! তবে এসব কথা তিনি কিছুই বলে উঠতে পারেন না। এমনিতেই তিনি কম কথার মানুষ। আর এই মুহূর্তে তিনি এতটাই হতভম্ব হয়েছেন যে গুছিয়ে কিছু বলে উঠতেই পারেন না।
শ্রীর কাকু কিন্তু এ প্রস্তাবে বেজায় খুশি হয়েছিলেন। ভালোই তো, বেশ গানবাজনা হবে, আনন্দ হবে।
‘সে কি! ছেলেটা তো কিছুই করে না!’
‘কে বলল, কেলভিন জুট মিলে কাজ করে তো! প্রতাপ বলেছে ও চেনে। ভালো ছেলে।’
‘আরে সে তো টেম্পরারি! কটা টাকা মাইনে পায়! প্রতাপ পার্মানেন্ট হয়েই বা কতটুকু ভালো রাখতে পেরেছে তোমার সেজ বোনকে!’
‘আরে সে আমি প্রতাপের সঙ্গে কথা বলেছি। ও পার্মানেন্ট হয়ে যাবে!’
শ্রীর মা দেওরের কথায় যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলেন। ‘এমন অনিশ্চিতের পথে মেয়েটাকে ফেলে দেব কেন! ও কি বোঝা হয়ে গেছে না কি!’
‘ধুর! কি যে বলনা বৌদি! বোঝা হবে কেন! তাই বলে বিয়ে দেবে না!’
সে ভালো পাত্র খোঁজ করে, সরকারি চাকরি করে দেখে বিয়ে দেব! অনন্তর কতটুকু রোজগার! তাতে ওর নিজের কি করে চলে তার ঠিক নেই! ও শ্রীর দায়িত্ব কি নেবে!’
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শ্রী এসব কথা শুনছিল। মা একটু চেঁচিয়ে তাকে শোনানোর মতো করেই বলে ওঠেন, ‘আড়াইশো টাকা মাইনে! তাও কোনো মাসে পায়,কোনো মাসে পায় না! তাই দিয়ে সংসারই বা কি চালাবে! আর তোর শখ-শৌখিনতাই বা কি মেটাবে!’
মার কথা শুনে শ্রী প্রথমটায় বেশ ভয় পেয়েছিল। অনন্ত ওর থেকে প্রায় ১১বছরের বড়ো। আপত্তিটা এই দিক থেকেই আসতে পারে বলে তার মনে হয়েছিল। কিন্তু অনন্তর রোজগার নিয়ে তো কখনো সে ভেবে দেখেনি। সেদিন রাতে দুশ্চিন্তায় শ্রী দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। সে তো এতদিনে অনন্তর বাড়ির কথা কিছু কিছু জেনেছে।অনন্তর দাদাও মিলেই চাকরি করে।সেই সঙ্গে বিজনেসও করে। সংসার উনিই চালান। অনন্তকে কোনো দায়িত্ব নিতে হয় না। তাহলে অসুবিধা কোথায়!
বাপীকে তো গোটা পরিবারের বোঝা টানতে হয়। শ্রী, ওর ভাই-বোনেদের দিকে নজর দেওয়ার সময় কোথায় বাপীর। মা-কাকুই বা কতটুকু তাদের অসুবিধে বোঝে! কতটুকু যত্ন করে তাদের। আর অনন্ত তো শুধু তার দায়িত্ব নিচ্ছে! অল্প মাইনে তো কি হয়েছে! এমন নানা কথা ভেবে শ্রী একরকম যুক্তি তৈরি করে নিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, তার পড়াশোনা, শখ-আহ্লাদ, প্রয়োজন কোনো দিকেই নজর নেই তার পরিবারের। বাপী-মা-কাকুর ওপর তো সেই কবে থেকেই অভিমান করে রয়েছে সে। তাতেই বা কার কী এসে গেছে! তার থেকে অনন্তর কাছে তার মূল্য অনেক। অনন্তই তো তাকে বুঝিয়েছে সেও কারো কাছে বিশেষ হয়ে উঠতে পারে। কারো অপেক্ষা, আকুলতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে!সেই আকুলতাকে কিসের জোরে উপেক্ষা করবে শ্রী! নাঃ, যাই ঘটুক না কেন, সে অনন্তর বুকের মধ্যেই তার কাঙ্ক্ষিত আশ্রয় খুঁজে নেবে!
অনন্তর মায়ের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পরও যখন শ্রীদের বাড়ি থেকে কথা এগোনোর কোনো আগ্রহই দেখা গেল না, তখন আবার একদিন বিকেলে অনন্তর মা এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এবার আর কোনো রাখ-ঢাক না করে তিনি সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন, ‘বৌমা, তোমরা যদি মেয়ে দিতে রাজি না হও তবে আমি তোমার চোখের সামনে দিয়েই আমার বাড়ির বৌকে তুলে নিয়ে যাব! তুমি সেটা আটকাতে পারবে তো! না কি তোমাদের পক্ষে সেটা খুব সম্মানজনক হবে!
শ্রীর পুরো পরিবার এই হুমকির সামনে কেমন থতমত খেয়ে গেছিল। তাঁরা এমনিতে শান্তিপ্রিয় মানুষ। ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি এড়িয়ে চলেন। শ্রীর বাবা পুলিশে চাকরি করলে কি হবে পুলিশসুলভ দাপট, চোখরাঙানি এসবে অভ্যস্ত নন। এমনকি শ্রীও অনন্তর মা’র এই কথায় ভয় পেয়েছিল। কিন্তু কেউই আর দ্বিরুক্তি করেনি এ বিষয়ে। শ্রী আর অনন্তর বিয়ে হয়ে গেছিল।
৫
শাড়ির নিচের দিকটা হাঁটু পর্যন্ত ভিজে। মাথার ওপর ঘোমটা টানা। বারবার সরে যাচ্ছে বলে দু’কানের পাশ দিয়ে শাড়ির আঁচলটা আটকে নিয়েছে। দু’হাতে বদল করে করে এক পেল্লাই লোহার বালতি করে জল নিয়ে আসছে শ্রী বাইরে থেকে। বড় রাস্তার মোড়ে মিউনিসিপ্যালেটির কল আছে। সেখান থেকে গলি রাস্তা পেরিয়ে, উঠোন পেরিয়ে, সদর দরজা পেরিয়ে বাড়ির পিছনের চৌবাচ্চায় জল ভরা চলছে। খাওয়া বা রান্নার জল প্রতিদিন এভাবেই নিয়ে আসতে হয়। কখনো মাধুরী, কখনো শ্রী নিয়ে আসে। মাধুরীর আর কয়েকমাসের মধ্যেই ডেলিভারি। তাই এখন এই কাজটা শ্রীই করে। একগাদা হিন্দুস্তানি বৌয়ের কথা, ঝগড়ার মাঝে দাঁড়িয়ে এভাবে জলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে ভালো লাগেনা শ্রীর। হিন্দুস্তানিগুলো এতো নোংরা! গায়ে কি রকম বিকট গন্ধ! তারপর সাধারণ কথা বললেও মনে হয় ঝগড়া করছে। প্রথম প্রথম তো ওদের চেঁচামেচি শুনে চমকে চমকে উঠত শ্রী। এখন খানিকটা অভ্যেস হয়ে গেছে। কিন্তু নিজেকে ওদের মতো একই গোত্রের ভাবতে ইচ্ছে করে না।
আজ অবশ্য শুধু খাওয়ার জলই নয়, স্নানের জলও শ্রীকেই বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হচ্ছে।
এমনিতে জল ভরে দেওয়ার জন্য বিশ্বদেব মিলের এক কুলিকে ঠিক করে রেখেছে। প্রতিদিন সকালে ৯টা নাগাদ এসে সে জল ভরে দেয়। আজও এসেছিল। চৌবাচ্চায় তখন গতকালের তলানি জলটুকু পড়ে আছে। ছেত্রীলালকে বালতি নিয়ে বেরোতে দেখেই শ্রী চৌবাচ্চার তলানি জলটুকু ফেলে দিয়ে চৌবাচ্চার মেঝেটা পরিষ্কার করে রাখছিল। একাজ মাঝে মাঝেই বড়দি মাধুরীকে শ্রী করতে দেখেছে। আজ যে কি হলো, তলানি জলটুকু ফেলে দিচ্ছে দেখে ছেত্রীলাল প্রচণ্ড রেগে গেল। লোহার বালতিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে দেশোয়ালী ভাষায় কি সব বলতে বলতে চলে গেল। শ্রী প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। ছেত্রীলাল হঠাৎ কেন রেগে গেল সেটাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল মাধুরীর কাছে। তার মধ্যেই শাশুড়ি এসে চিৎকার জুড়ে দিল, ‘দিলি তো ছেত্রীলাল কে রাগিয়ে! নে এবার জলটা কে ভরবে! কাজের ধুঁচুনি একেবারে!’
‘আমি কি করলাম! ও এসেছে বলে তো চৌবাচ্চা টা পরিষ্কার করছিলাম!’
কে বলেছে মা তোমাকে এত কাজ করতে! সারাদিন তো হাত গুটিয়ে বসে থাক। আমার বড় বৌমা এই শরীর নিয়ে সব করে। হুঁ, কাজ দেখাচ্ছে! শোন, এই আমি বলে রাখলাম, ছেত্রীলালকে হয় তুই ডেকে নিয়ে আসবি; না হয় নিজে জল ভরবি।
শ্রীর মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো। তাড়াতাড়ি দৌড়ে সে বেরোলো ছেত্রীলালের খোঁজে। এ তল্লাটে আরো কয়েকটা বাড়িতে ও জল তুলে দেয়। সেখানেই খোঁজ করতে ছুটল। দত্তবাড়ি পৌঁছোতেই বন্ধু নীপার মা নিচে নেমে এসেছে, ‘ওমা, রাগেশ্রী, তুমি?’
‘ছেত্রীলাল এসেছে কাকিমা?’
‘না, ওতো আর একটু পরে আসে। কেন গো?’
‘পরে বলব কাকিমা’ বলে শ্রী তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসছিল।
নীপার মা-ই আটকালো, ‘কি চেহারা হয়েছে রাগেশ্রী তোমার! বিয়ে করে যখন এলে কি সুন্দর লাগতো তোমাকে! তোমার শাশুড়ি তো ছোটোবউ নিয়েই অজ্ঞান; ফর্সা,মাথা ভর্তি চুল! আমরা তাই আলোচনা করতাম, তিন বউয়ের মধ্যে রাগেশ্রীকেই ভালো লাগে! কোঁকড়া চুল, ঢলঢলে মুখখানা! ঠিক যেন লক্ষ্মী প্রতিমার মতো!’
শ্রীর এখন এসব শোনার সময় নেই। কাকিমার হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
কাকিমা কিন্তু ছাড়ে না, বলে, ‘জানো, সেদিন লাহা গিন্নি কথায় কথায় একথা বলতেই তোমার শাশুড়ি বলল, ‘যৌবনের কুত্তিও সুন্দরী!’ বিশ্বাস করো রাগেশ্রী আমার এতো কষ্ট হয়েছিল! আমরা বুঝি মা, তুমি ভালো নেই।’
শ্রী থমকে একমুহূর্ত দাঁড়ায়। তারপরই বেরিয়ে আসে।নাঃ, লাহা বাড়িতেও ছেত্রীলাল নেই। আরো খানিকটা এগিয়ে ডাক্তার বাবুর বাড়িতে ছেত্রীলালের দেখা মেলে। এতোটা রাস্তা বাড়ির কাপড়ে চলে আসায় অস্বস্তি হতে থাকে শ্রীর। কিন্তু কিছু করার নেই। ছেত্রীলালকে ডাকতে গেলে ও চেঁচাতে শুরু করে, ‘হাম কাম নহি করেঙ্গে! মহেনত করকে পানি ভরে হাম অঔর তুম সব ফেঁক দো! নহি করেঙ্গে যাও!’
শ্রী নানাভাবে বোঝাবার চেষ্টা করে। কিন্তু ছেত্রীলাল গোঁ ধরে থাকে। শ্রী শেষপর্যন্ত কেঁদে ফেলে, ‘এখন কি হবে! বাড়িতে কারো স্নান হয়নি। সব জল এখন তাকে ভরতে হবে!’ চোখে অন্ধকার দেখছিল শ্রী। বাড়ি ফিরে সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনতে পায় শাশুড়ি আর ননদ মিলে পা ঠুকে ঠুকে তার নামে নিন্দে করে চলেছে। আর মাধুরী হিহি হিহি করে হেসেই চলেছে, ‘সত্যি বাবা, মেজ বৌটা যে কি করে না!’
শ্রী অবাক হয়। শাশুড়ি,ননদের গালাগাল সে প্রায়ই শোনে। ‘কিন্তু বড়দি! বড়দি হাসছে কেন! একবার তো বলতে পারত যে শ্রী তো ঠিকই করেছে। ছেত্রীলালই বদমাইশি করল।’
তাকে দেখেই শাশুড়ি আবার চেঁচাতে শুরু করল। শ্রী কোনো কথা না বলে জলের বালতি নিয়ে বেরিয়ে এল। তারপর থেকে চলছে জল তোলা। হাতের তালু লাল হয়ে উঠেছে। চড়া রোদে এভাবে খালি মাথায় বাইরে কাজ করতে গিয়ে ঘামে ভিজে গেছে শ্রী। তার শরীর থেকে যেন ভাপ উঠছে! এদিকে বাড়িতে কারো কোনো হেলদোল নেই। মাধুরী শুধু মাঝে মাঝে বলে উঠছে, ‘ছেড়ে দাও না! আর ভরতে হবে না’। কিন্তু এ যে শুধুই কথার কথা তা আর বুঝতে অসুবিধে হয় না শ্রীর। চৌবাচ্চাটা ভর্তি করতে না পারলে আজ অশান্তি আরো বাড়বে।
১১ টা অবধি জল ভরে স্নান করে সকালের জলখাবার খেতে এসে শ্রী দেখে মাধুরী তাড়াতাড়ি কোঁচড়ে কি যেন লুকোচ্ছে। এসব এখন আর বুঝতে অসুবিধে হয় না তার। এ বাড়ির ধরন-ধারণই এমন। যে ছেলের বেশি রোজগার সেই ছেলের আর তার বৌয়ের বেশি কদর। বিশ্বদেব কেলভিন জুট মিলের সুপারভাইজার। সেইসঙ্গে পিয়ারলেস করে। মিলে বন্দোবস্ত করে বেশিরভাগই নাইট ডিউটি নেয়। সারাদিন পিয়ারলেসের কাজ করেন। সিনিয়ার অফিসার হয়েছে বেশ কিছুদিন হলো। টিমের ছেলেদের নিয়ে মিটিং লেগেই থাকে। আবার সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য বম্বে, আমেদাবাদ বিভিন্ন জায়গায় ট্যুর করে। ছোটো ভাই বিজয়দেবও বম্বেতেই থাকে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। সামান্য চাকরি করে। আর বড়দার কথামতো পিয়ারলেস করে। বিশ্বদেবের এখন রোজগারপাতি ভালোই। মাসে ৭০-৮০ হাজার হয়েই যায়। তবু মিলে নামটা জুড়ে রেখেছে মূলত এই মিল কোয়ার্টারটির সুবিধে পাচ্ছে বলে।তাদের প্রথম সন্তান রুচি। এ বাড়ির সবাই মনে করে মাধুরী আর রুচি এ বাড়ির লক্ষ্মী। ওদের পয়েই বিশ্বদেবের এতো আয়। আবার ছোটো বউ সম্পূর্ণাও খুব গুছুনি মেয়ে। পড়াশোনা না করলে কি হবে বম্বের মতো জায়গায় নিজে নিজে সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। শ্রীর কাছে সম্পূর্ণা গল্প করেছিল, ফুলশয্যার রাতে বিজু বলেছিল, ‘আমার বড় বৌদি হল এ বাড়ির লক্ষ্মী। আমাদের পরিবারকে একসাথে বেঁধে রেখেছে। বৌদির কথা মতো চলবে।’
সম্পূর্ণা উত্তরে বলেছিল, ‘তুমি জানলে কি করে তোমার বৌদির থেকে আমার বুদ্ধি-বিবেচনা কম। আমার হাতে সংসারের দায়িত্ব দিয়ে আগে দেখো পারি কি না! তারপর নাহয় তোমার বৌদির কথা মতো চলার পরামর্শ দেবে।’
উত্তর শুনে বিজু আর কোনো কথা বলতে সাহস পায়নি।
যাই হোক, বিশ্বদেব যখন দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করে তখন শাশুড়ি প্রথমে রেগে গেছিলেন। তার রাগেও যখন সিদ্ধান্ত বদলাল না তখন তিনি সোজা গিয়ে উঠলেন ছোটোছেলে বিজয়দেবের কাছে। ওদিকে শাশুড়ি রেগে গেছে বলে মাধুরীও মেজাজ দেখিয়ে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করল। এসবের মধ্যে শ্রী পড়েছিল ফাঁপড়ে। এসময়টা তো বাচ্চার জন্যই আরো বেশি করে ভালো ভালো খাবার-দাবার খেতে হবে। অথচ মাধুরী কিছুতেই খাবে না। রোজ সন্ধেবেলা শ্রী দুধ ঘন করে জ্বাল দিয়ে এক গ্লাস ভর্তি করে বড়দি কে দিয়ে আসে। মাধুরী হয়তো তখন বড়াই অর্থাৎ রুচিকে নিয়ে পড়তে বসিয়েছে। কোনো না কোনো ভাবে হাতে লেগে প্রায় দিনই দুধের গ্লাস টা মাটিতে পড়ে যায়। শ্রীর মনে হয় বড়দি ইচ্ছে করে গ্লাসটা ফেলে দেয় দুধ খাবে না বলে। শাশুড়ি আর বড় বৌমার এই মান-অভিমানের পালা চলেছিল কয়েক মাস। তারপর অবশ্য বৌমার অযত্ন হচ্ছে ভেবে নিজেই ফিরে এসেছেন তিনি। সেটা বৌমাকে ভালোবেসে না কি বড় ছেলের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি দেখে বলা মুশকিল। যাই হোক এসেই কিন্তু সমস্ত রাগ বর্ষিত হতে শুরু করেছে শ্রীর ওপর। অভিযোগ দুটো, শ্রী নাকি সারাদিন পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকে। এই অবস্থায় সব কাজ করতে হয় মাধুরীকে।এমনকি আদরের মেজ ছেলে বুধুর আড়ালে শাশুড়ি একথাও বলেছেন, ‘রোজগারের মুরোদ নেই। একখানা বিয়ে করে চলে এলো! এরপর কান্ডিগুচ্ছের বাচ্চা হবে! তাদের দায়িত্বও দাদার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হবে! হয়েছে ভালো!’
শ্রীর মনে হয়েছিল বিয়ে দিতে এতো আপত্তি যখন ছিল তখন বিয়ে দিয়েছিল কেন! তার বাড়ি থেকে তো কারো এ বিয়েতে মত ছিল না। এরাই তো একরকম জোর করে বিয়ের বন্দোবস্ত করেছিল।
শাশুড়ি ওদিকে বলেই চলেছে, ‘আমার বড় ছেলে রোজগার করে গুষ্টির সংসার সামলাবে। আর বড় বৌমা কাজ করে করে শুকিয়ে মরবে! এ আমি কিছুতেই হতে দেব না!’
অথচ সকালের চা করা থেকে বাসনমাজা, জলভরা, জামাকাপড় কাচা, বাথরুম পরিষ্কার করা সবটাই শ্রী করে। মাধুরী ওই সময়ের মধ্যে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসে আর সকালের টিফিন টা বানায়। স্নান সেরে কোনোরকমে খেয়ে শ্রী বসে যায় দুপুরের রান্নার জোগাড় করতে। কুটে-বেটে-ধুয়ে গুছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তার। রান্নাটা করে মাধুরী। সন্ধে থেকে চা, জলখাবার, রাতের রান্নার সব দায়িত্ব শ্রীর। মাধুরী তখন মেয়েকে পড়ায়। এতো কিছুর পরেও শাশুড়ি শ্রীকে মুখ ঝামটা দেওয়ার পাশাপাশি বড় বৌমার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। পাড়ায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি বলে এলেন। দত্তগিন্নি বলেছিলেন, ‘কি বলছেন আপনি দিদি। আমরা তো দেখি, আপনার বাড়ির মেজো বৌ সারাদিন কাজ করে। জল তোলা, জামাকাপড় কাচা… আমি তো তাই নীপাকে বলছিলাম ওর বাপের বাড়িতে কারো এমন কাজ করার অভ্যেস নেই। অথচ মেয়েটা এখানে এসে… ওইটুকু তো শরীরটা! খেটে খেটে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে।’
বিরক্ত শাশুড়ি এর উত্তরে বলেছিলেন, ‘বাইরে থেকে দেখে ওরম অনেক কিছুই মনে হয়। যারা ঘর করে তারা বোঝে কি জিনিস!’
এসব কথা আবার নীপাই শ্রীকে বলেছে। শুনে শ্রীর মনে হয়েছে আর ঠিক কি কি করলে এবাড়ির মানুষজন বিশ্বাস করবে যে সে মিনি মাগ্না খাচ্ছে না এ বাড়ির অন্ন। রীতিমতো পরিশ্রম করে তবেই… শ্রীর গলার কাছটায় কান্না উঠে আসে।
শ্রীর বিরুদ্ধে তার শাশুড়ির দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল শ্রী নাকি মাধুরীর মুখের খাবার কেড়ে খেয়ে নেয়। এ বাড়িতে বিয়ে হয়ে থেকে শ্রী দেখে আসছে খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-আশাক, যত্নআত্তি সব ব্যাপারেই রোজগেরে বড় ছেলের প্রতি শাশুড়ি মার বেশি নজর। যৌথ পরিবারে এমন বিশেষ করে কারো যত্ন নেওয়া ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। তাদের বাড়িতেও তো মূল রোজগেরে শ্রীর বাপী। কিন্তু মাকে তো কখনো দেখেনি বাপীর জন্যই আলাদা করে বড় মাছটা,মুড়ো টা, বাটি ভরে দুধ সরিয়ে রাখতে। বাড়ির আর সবাই যা ভাগ পায় বাপীও তাই পায়। এ নিয়ে বাপীকেও কখনো কোনো অভিযোগ করতে শোনেনি। কিন্তু এবাড়িতে এসব হয়। বড় ছেলে বেশি টাকা উপার্জন করে বলে সকালের টিফিনে তার জন্য বাটার দিয়ে পাউরুটি, ডিম সেদ্ধ,কলা এসব থাকে। পাশাপাশি অনন্ত খায় রুটি-তরকারি। কোনোদিন ভুলেও তার পাতে একটা ডিম সেদ্ধ বা কলা পড়ে না।শ্রী অনন্তের সঙ্গে এনিয়ে কথা বলতে গেলে অনন্ত অন্যান্য বারের মতো ছিটকে ওঠেনি ঠিকই; কিন্তু শ্রীকে এসব নিয়ে কথা বলতে বারণ করেছে, ‘দাদা রুটি-ফুটি খেতে পারে না। তাছাড়া এতো পরিশ্রম করে…’ শ্রীর বলতে ইচ্ছে হয়েছে, ‘তুমি দাদার মতো রোজগার করোনা ঠিকই,তাই বলে পরিশ্রম তো কম হয় না। মা হয়ে দুই ছেলের পাতে দুরকম খাবার তুলে দেয় কোন প্রাণে!’
বড়াই ফল খেতে ভালোবাসে বলে বাজারের টাকায় তার জন্য প্রচুর ফল কিনে নিয়ে আসে শাশুড়ি মা নিজে। সেই ফল বাড়ির আর কেউ খাবে না। এখন অবশ্য বাচ্চা হবে বলে শ্রীকে লুকিয়ে লুকিয়ে মাধুরীর কোঁচড়ে ফল দিয়ে দেয় শাশুড়ি। মাধুরীও লুকিয়ে লুকিয়ে খায়। শ্রীর চোখে পড়ে গেলে শ্রী নিজে থেকেই সরে আসে। বাড়িতে পাঁঠার মাংস বা ইলিশ মাছ এলে শাশুড়ি মা নিজে সেসব ভাগ করতে বসেন। খাবা খাবা মাংস বা ইলিশের বড় পিসটা থাকে ভাসুরের জন্য। মাধুরী, অনন্ত, ননদের জন্য মোটামুটি সমান ভাগ। বাকি হাড়ভর্তি দুটো পিস রাখা হয় শ্রীর জন্য। প্রত্যেকবার শাশুড়ি মা মাছ কিনতে গেলে একটা পিস কি করে যেন খুব ছোটো হয়। ওই পিসটাই ধার্য হয় শ্রীর জন্য। রোজ খেতে বসে ভাত কম পড়ে। তবু শাশুড়ি মা কখনো একমুঠো চাল বেশি নেবেন না। নিজেদের খাওয়া হয়ে গেলে দুই বৌয়ের ভাত তিনি বেড়ে দেবেন। প্রত্যেকদিন মাধুরীর ভাতটা বাড়ার পর হাঁড়ির তলানিতে আর এক ছিটে ভাত পড়ে থাকে। তিনি অম্লান বদনে সেটুকুই শ্রীর জন্য বেড়ে দেন। এসব চক্ষুলজ্জাহীনতা দেখে দেখে কষ্ট পেয়ে পেয়ে এতদিনে শ্রীর পোক্ত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয় না। তার মনের মাটি আজও এতটাই ভিজে যে প্রত্যেকবার তাতে আঁচড় পড়ে, প্রত্যেকবার রক্ত ক্ষরণ হয়। কিন্তু এতো কিছুর পরেও অভিযোগ শেষ হয় না। মাধুরী ওর আর শ্রীর দুজনের জলখাবার একই থালায় নিয়ে খেতে বসে। তরকারি এতোই অল্প যে আলু ছেঁচকির ছোট্ট একটুকরো আলু দিয়ে যদি একটা করে রুটির গ্রাস খাওয়া হয় তাতেও কম পড়ে। শ্রী তাই প্রায় শুধু শুধুই রুটিগুলো খেতে থাকে। সকাল থেকে জলের কাজ করে করে তার আঙুল,হাত-পা সিঁটিয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। তখন আর শুধু রুটি গলা দিয়ে নামতে চায় না। কোনো কোনোদিন একটু চিনি চেয়ে নেয়। তরকারি কম বলে মাধুরীও চিনি নেয়। ননদ ওমনি গিয়ে শাশুড়ি কে লাগায়, ‘বড় বৌয়ের সব তরকারি মেজ বৌ খেয়ে নিয়েছে। দেখো গে যাও, তোমার আদরের বড় বৌ চিনি দিয়ে রুটি খাচ্ছে।’ শাশুড়ি এই নিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে। মাধুরীও সব শোনে। কিন্তু কোনোদিন এতটুকু প্রতিবাদ করে না। সে কি ভয়ে! না কি অন্যকে হেয় করে কষ্ট দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে তার অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হচ্ছে সেই লোভে! না কি সেও বিরক্ত যে তার স্বামীর রোজগারের টাকায় অন্যরা ভালোমন্দ খাচ্ছে! কিন্তু খাওয়ার কষ্ট শ্বশুরবাড়িতে যে তাকেও ভোগ করতে হয়নি এমনটা নয়। সে যখন প্রথম প্রথম বিয়ে হয়ে এসেছিল রাতের খাবার হিসেবে তার জন্য বরাদ্দ থাকত দুটো রুটি। অথচ দুটো রুটিতে তার পেট ভরত না। তাই সবাই শুয়ে পড়লে সে আরো দুটো রুটি চিনি মাখিয়ে নিয়ে বাথরুমে চলে যেত। একথা মাধুরীই গল্প করেছে শ্রীর কাছে। যে নিজে কিছুটা হলেও এসব অত্যাচার ভোগ করেছে সে আর একটা মেয়েকে অত্যাচারিত হতে দেখেও কেন যে প্রতিবাদ করে না, কিসের লোভে তাই আশ্চর্য। স্বামীর কাছে, শাশুড়ি, ননদের কাছে ভালো মানুষ হয়ে থাকার লোভ কি একটা মানুষের দিনের পর দিনের যন্ত্রণার থেকেও বেশি হতে পারে!
এক-আধদিন অবশ্য খাওয়ার সময় শাশুড়ি মা না থাকলে নিজের পাত থেকে মাংসটা, মাছটা মাধুরী শ্রীর পাতে তুলে দেয়, ‘একসাথে খেতে বসা, একজন কম একজন বেশি এভাবে খাওয়া যায় না কি! অথচ শাশুড়ি যখন মাধুরীর পাত থেকে তুলে বেশিটা খেয়ে নেয় বলে বড় ছেলের কাছে শ্রীর নামে অভিযোগ করে তখন মাধুরী অকারণে হাসে। কখনো বা বলে, ‘বাদ দিন না মা ওসব কথা।’ এসব বলে যে শ্রীকে আরো বেশি করে দোষে দুষ্ট করা হচ্ছে তা কি মাধুরী বোঝে না!
বাড়িতে ডিম রান্না হলে সবার জন্য গোটা ডিম থাকে। শুধু দুই বৌয়ের জন্য অর্ধেকটা করে… বড়াইয়ের আগেই খাওয়া হয়ে গেছে। সেও গোটা ডিম খেয়েছে। তবু মা-কাকিমা খেতে বসলে সে বলে, ‘কাকিমা তোমার মাখা খাব।’ শ্রী প্রথম প্রথম খুশি হয়ে দিত। তার ভাত এমনিতেই অল্প! তবু যা হোক,ও তো বাচ্চা! এসব বোঝে না। কাকিমার হাতে খেতে ভালোবাসে। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হতো না। বড়াই বলত, ‘শুধু ভাত দিচ্ছ কেন! ডিমের কুসুম দিয়ে দাও।’ খিদের মুখে লোভের অর্ধেকটা কুসুম দিতে শ্রীর মন খারাপ হয়ে যেত। এমনি করে ইলিশের ছোটো টুকরোর বেশিটা, হাড়ের গায়ে যেটুকু মাংস লেগে আছে সবটাই চলে যায় বড়াইয়ের পেটে। শ্রী তাই এ ব্যাপারে আর খুব একটা স্নেহ অনুভব করতে পারে না বড়াইয়ের প্রতি। মাধুরীও কোনোদিন এসবের জন্য মেয়েকে ধমক দেয় না। নিজের টা খেয়ে পরের পাতেরটা এমন চেয়ে খাওয়া যে খারাপ অভ্যেস তাও শেখায় না।
শ্রীর মনে পড়ে সে রোগা বলে ছুটির দিনে মা বাড়িতে তাকে সকালবেলা গরম ফেনা ভাত ঘি দিয়ে,আলু সিদ্ধ দিয়ে মেখে দিত। শ্রী তখন বেশি খেতে পারবে না বলে জেদ করত। অস্মি ছোটো থেকেই ভারি। তাই মা ওকে রুটি-তরকারি দিত। অস্মি জেদ করত ভাত খাবে বলে। মা তখন তেড়ে যেত ওর দিকে। শ্রীই তখন লুকিয়ে এক-দু দলা ভাত অস্মিকে খাইয়ে দিত। সেসব দিনের কথা ভাবলে শ্রীর কিরকম স্বপ্ন মনে হয়। তখন কি সে একবারও ভাবতে পেরেছিল একদিন এভাবে তাকে খেতে বসে খোঁটা সহ্য করতে হবে। চোখের জল ফেলতে ফেলতে আধপেট খেয়ে উঠে যেতে হবে! নিজেকে তার শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের দুঃখী নারী চরিত্র মনে হয়।
৬
কাল রাত থেকে শ্রীর ধূম জ্বর। একে তো ভাদ্র মাসের পচা গরম; চড়া রোদ;তার মধ্যে আধভিজে অবস্থায় বালতি বালতি জল টানা! আর মানসিক চাপ তো আছেই। চৌবাচ্চা ভর্তি করে দেওয়া সত্ত্বেও শাশুড়ি-ননদের থ্যাকনা সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি অনন্তও ছেড়ে কথা বলেনি, ‘আজ তো খুব বীরত্ব দেখিয়েছ? কাল থেকে কি হবে! তোমাকে বলেছি না মা-বৌদির কথা মতো চলবে!’
শ্রীর সারা শরীর থেকে যেন আগুন ছুটছে! ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তার চারপাশে কেমন আবছায়া তৈরি হয়েছে! সে অনুভব করছে ছোট্ট হতে হতে সে কেমন গুটিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু কই! তার তো কোনো কষ্ট হচ্ছে না! যেন জলের মধ্যে ভেসে আছে সে! কাজুবাদামের মতো একটা আবরণ! তার কি ভীষণ নিশ্চিন্ত লাগছে, আরাম লাগছে! আর কোথাও কোনো কষ্ট নেই! কিন্তু এ কি! সে তো পরীক্ষা দিতে বসেছে! ইংরেজি পরীক্ষায় সে কিচ্ছু পারছেনা। তার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে! কে যেন বলছে, ‘তোমার কাকা তোমার মাষ্টারের ফি টা আমাকে দিতে বলেছে! আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর পড়তে যাওয়ার দরকার নেই।’ ভয়ঙ্কর ভাবে কে যেন অন্ধকারে হাতড়ে ফিরছে একটুকরো নিঃশ্বাস; না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। কে যেন জলের মধ্যে বিছানা পেতে আরামে… কে যেন খুব দৌড়তে দৌড়তে হোঁচট খেয়ে…. ঘুম ভেঙে গেল শ্রীর। অনন্তর গলার আওয়াজটা এখনো যেন বুকের মধ্যে হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে! এটা ছিল অনন্তর কাছ থেকে পাওয়া শ্রীর প্রথম আঘাত। বিয়ে-বৌভাত-অষ্টমঙ্গলা মিটে যাওয়ার পর শ্রী সেদিন প্রথম শ্বশুরবাড়ি থেকে পড়তে যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল। অনন্ত ড্রেসিং টেবিলের ছোট্ট শো-কেসের ওপর বসে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। হঠাৎই বলে ওঠে, ‘তোমার কাকা তোমার মাষ্টারের ফি টা আমাকে দিতে বলেছে!’
‘তাই!’ শ্রী একটু লজ্জা পায়। কাকু যে কি করে না! অনন্ত যেখানে আমার সব দায়িত্ব নিয়েছে, সেখানে এই কথাটা আর আলাদা করে বলার কি আছে!
‘শ্রী, তুমি তো সবই জানো! আমার পক্ষে এটা সম্ভব নয়!’
এতটা বিস্মিত এর আগে কি কখনো শ্রী হয়েছিল! এক মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল সে একটা কানা গলির শেষ পাঁচিলটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে!
শ্রীর হতভম্ব ভাব দেখে হয়তো অনন্তর রাগ হয়েছিল।উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল ও।
শ্রী শেষবারের মতো একবার পাঁচিলটা পেরোতে চেয়েছিল; হাঁচোড়-পাঁচোড় করে বলে উঠেছিল, ‘তাহলে! আমি আর পড়তে যাব না?’
‘আজকের দিনটা যাও। স্যারকে বলে এসো আর যাবে না।’
‘কিন্তু পরীক্ষা?’
‘হ্যাঁ, পরীক্ষাটা দাও। প্রাইভেট মাষ্টার ছাড়া কি পরীক্ষা দেওয়া যায় না?’
শ্রী আর কথা বাড়ায়নি। বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু পড়তে যাওয়া আর তার হয়নি। সেদিন সন্ধের আবছা অন্ধকারে একটি মেয়ে শহরের ফুটপাতে ফুটপাতে একা একা হেঁটে বেড়িয়েছিল। নিজেকে তার মনে হয়েছিল চূড়ান্ত বোকা! কি করে সে ভাবল, তার বাপী-কাকু যে দায়িত্ব পালন করেনি, সেই দায়িত্ব অন্য একটা বাইরের লোক তার জন্য করবে! কি আছে! কিসের জোরে এমন একটা কথা সে ভাবতে পেরেছিল! ভালোবাসা! আচ্ছা, ভালোবাসা বলে কি সত্যি কিছু আছে! নাকি সবটাই দৃষ্টিভ্রম!
প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে শ্রীর মাথার মধ্যে ক্রমাগত এসব কথাই পাক খাচ্ছিল। কংক্রিট কোনো ভাবনা নয়, কেমন টুকরো টুকরো ছেঁড়া ছেঁড়া সব কথা। একমুহূর্তে এই উত্তাপ যেন ওম এর মতো মনে হচ্ছে। ঠিক যেন কাকুর কাছে পড়তে বসেছে শ্রী। আর পর মুহূর্তেই আগুন জ্বলছে সারা শরীর জুড়ে।
অনন্ত শরৎ ডাক্তারকে ধরে এনেছে। ডাক্তার বলা ভুল হলো। শরৎ আসলে ছিল এক বড়ো ডাক্তারের কম্পাউন্ডার। কম্পাউন্ডারি করতে করতে সে এতো অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে যে এ অঞ্চলে এখন সে ডাক্তার বলেই পরিচিত। শরৎ ডাক্তার এসে সব শুনে ওষুধ দিল। কিন্তু ওষুধ খাওয়ার পর থেকেই সারা রাত পেটের যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে হলো শ্রীকে। অনন্তও ঘুমোয়নি; সারারাত তারও দুশ্চিন্তায় কেটেছে। সকালের দিকে বাথরুমে গিয়ে শ্রী দেখল তার শরীর থেকে অদ্ভুত লাল রঙের একথোকা রক্ত বেরিয়ে গেল। এখন তো তার শরীর খারাপের সময় নয়। তবে! শ্রী আরো অবাক হলো তার পেটে ব্যথা কমে গেছে দেখে। মাধুরী কে ডেকে সব কথা বলতেই মাধুরী বাড়ি তুলকালাম করে তুলল, যাঃ সব্বোনাশ হয়ে গেল মা! দেখুন শ্রী কি কাণ্ডটাই না ঘটাল। তাড়াতাড়ি শ্রীকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। উফ্ মা গো কী কষ্ট! কী যন্ত্রণা! শ্রীর মনে হচ্ছে তার ভিতরটা যেন কেউ ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে খুবলে দিচ্ছে! শাশুড়ির কথাটা তার কানে বাজছে, বাচ্চাটাকে খেয়ে ফেললি রে হতভাগী! ছেলে ছিল রে! ছেলে! শ্রী দ্বিতীয়বারের জন্য হতবাক হয়ে গেছিল। সন্তান! তার পেটে সন্তান এসেছিল! আর সে কিছুই বুঝতে পারলো না! এতোটা বোকা সে! নিজের সন্তানকে সে এভাবে শেষ করে ফেলল!
আসলে তুই তো চাসনি না। তোর বর গরিব। তাই তো তুই বাচ্চা চাসনি! সেই জন্য এভাবে মেরে ফেলতে হয়! ছিঃ ছিঃ ছিঃ কোনো মেয়ে পারে! নে এবার সারা জীবন বাঁজা হয়ে থাক! একবার নষ্ট করেছিস। আর কোনোদিন হবে না এই আমি বলে দিলাম। অলক্ষণে মেয়ে মানুষ কোথাকার।
শ্রীর মনে হয় এই অপবাদও তার ভাগ্যে ছিল। এসবও তাকে শুনতে হলো! নিজের সন্তানকে সে নিজেই…বাপের বাড়িতে বসে বসে শ্রীর মনের মধ্যে এসব কথাই ঘুরে চলেছে। তার সন্তান! তার প্রথম সন্তান! পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাকে চিরকালের মতো অন্ধকারে ঠেলে দিল তার মা। শ্রীর কেমন পাগল পাগল লাগে! সে বুঝল না কেন! ঠাকুর তাঁর সহায় হলো না কেন! এ কোন যন্ত্রণায় ঠাকুর তাকে ফেলল। এ যে সারাজীবনেও মিটবে না। আর সত্যি যদি তার কোনো সন্তান না আসে! হে ঠাকুর, তুমি কি এতোটা নিষ্ঠুর হবে!! শুধু আরোও একটা কথা ভেবে সে খুব অবাক হয়েছে। মাধুরীর ছোটো মেয়ে জন্মানোর পর থেকে শ্রী বাচ্চাটাকে এতো আদর করত,যত্ন করত যে শাশুড়ি প্রায়ই বলে উঠত, এই তোর মেয়ে, বুঝলি। তোর আর বাচ্চা-কাচ্চার দরকার নেই। বুধুর তো তেমন রোজগার নেই। আর বাচ্চা নিয়ে দরকার নেই তোদের।
শ্রী অবাক হয়ে শুনত এই কথাটা। রোজগার কম বলে এক দম্পতির সন্তান আকাঙ্ক্ষাও থাকবে না! এদের বাড়ির মানুষদের এ কেমন বিচার! এরা টাকা ছাড়া জীবনের আর কোনো মূল্য ভাবতেই পারে না কেন!
শ্রীর কেমন হাসি পায় এসব ভাবলে! এরাই তো চায়নি আমার বাচ্চা হোক।আর এখন বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর এরাই আবার কেমন আমাকে অপরাধী করে দিল। অনন্ত রোজই আসে দেখা করতে। এ বিষয়ে বিশেষ কিছুই বলে না। শরীরের খোঁজ নেয়। সেদিন শ্রীকে কাঁদতে দেখে হঠাৎ ই বলে উঠল, বৌদি বলছিল, গোপাল দা নাকি বলেছিলেন, প্রথম সন্তান ছেলে হলে বাবা-মার বিদেশ যোগ আছে। এটুকুই কথা। তবু শ্রীর হঠাৎ কেমন বুকটা ফাঁকা লাগল। হঠাৎ তার শীত করে উঠল।
৭
আজ পাঁচ মাস হলো অনন্তর মিল বন্ধ। অনন্ত সারাদিন বাড়িতেই থাকে। সকালের দিকে একবার আধবার মিলে যায়। রাজার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারে। ইউনিয়নের নেতা সি পি এমের চামচাগুলোকে গালি দেয়। বিকেলে নানা জনের বাড়িতে গানের আসরে যায়। কখনো কখনো শ্বশুরবাড়িতেও আড্ডা বসায়। শ্বশুরবাড়িতে অনন্তর সবচেয়ে ভাব শ্রীর ঠাকুমার সঙ্গে। নাত জামাই আর দিদি শাশুড়ি মিলে বেশ খানিকটা গল্প করে তারা। শ্রীর ঠাকুমার বয়স হয়েছে। দশটা সন্তানের জননী। আঁতুড়ঘরেই তার দিন কেটেছে বেশি। সংসারটা কোনোদিনই মন দিয়ে করেননি। শ্রীর দাদু যা রোজগার করতেন খাওয়া-দাওয়ার পেছনেই তার সব শেষ। কখনো কখনো তাও কুলতো না। তখন অনায়াসেই তিনি গায়ের গয়না বন্দক দিয়ে সংসার চালাতেন। সে নিয়ে কোনো দুখ-দরদও তাঁর ছিল না। ছেলেদের পড়াশোনা কি করে হবে,মেয়েদের বিয়ে দেবেন কি করে এসব ভাবনা তাঁর ছিল না। বলতেন, জীব দিয়েছেন যিনি, খাদ্যও দেবেন তিনি। বই পড়তে অসম্ভব ভালোবাসতেন। চিরকেলে সংসারী উদাসীন মানুষ হলে যা হয়। শ্রীর মা কিন্তু এসব পছন্দ করেন না। কখনো শাশুড়িকে কিছু বলেন না! কিন্তু এমন উড়নচণ্ডী পনা তার পোষায় না। এ বাড়িতে বউ হয়ে এসে থেকে শ্রীর মাকে অনেক করতে হয়েছে। এই বিরাট সংসার সামলানোর দায়িত্ব তো আছেই,সেই সঙ্গে ননদদের বিয়ে দেওয়া, দেওরদের নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া শেখানো। বছরে একবার করে দিনাজপুর গিয়ে জমির চাষের টাকা নিয়ে আসেন তিনি। কখনো জমি বিক্রি করে টাকা আনেন। সেই টাকা দিয়েই শ্রীর বাবা তার এসব দায়িত্ব সামলান। এ নিয়ে শ্রীর মা কখনো কিছু না বললেও শাশুড়ি মা এসবে তার অহঙ্কার আবিষ্কার করে ফেলেছেন। সে নিয়ে মনে মনে বিরক্ত থাকেন। নাতজামাইকে মনের মতো পেয়ে এসব কথা ওগলান। এমনকি অনন্তর সঙ্গে শ্রীর বিয়ে দিতে যে শ্রীর মা রাজি ছিলেন না, সেকথাও তিনি বলেছেন জামাইকে। অনন্ত স্বাভাবিকভাবেই এসব কথা ভালো মনে নেয়নি। সেইসঙ্গে তিনি অনন্তর মনে তার একটা সন্দেহ তীব্র ভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তিনি বড় বৌমা আর সেজ ছেলের সম্পর্ককে খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না।সেজ ছেলে বিয়েই করল না বড়ো বৌমার জন্য। একথাও তিনি অনন্তকে বলেছেন। অনন্ত তারপর থেকে শাশুড়ি আর খুড়শ্বশুরকে ভালো চোখে দেখে না। মাঝে মাঝেই শ্রীর মা আর কাকু সন্ধের অন্ধকারে গরমের দিনে মাঠে বসে গল্প করেন। শীতের দিনে দুপুরে হয়তো একই চাদরের তলায় দুজনে বসে আছেন। অনন্তর এসব পছন্দ নয়। তাদের বাড়িতেও যখন শ্রীর মা-বাবা যান,তখন কাকু আর মা একটা রিক্সায়। আর শ্রীর বাবা সাইকেলে। এগুলো সহজ ভাবে নিতে পারে না অনন্ত। তার বিরক্ত লাগে। এই অপছন্দ আর সন্দেহ বাড়তে বাড়তে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে অনন্তর মনে হয় শ্রীর ভাইবোনদের তো প্রায় রাজপুত্র রাজকন্যার মতো দেখতে! শ্রীকে অন্যরকম দেখতে কেন! শ্রীর মুখের ঢঙ যেন একেবারে শ্রীর কাকুর মতো। অনন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেয়াল করে। এই দুটো মানুষকে তার কিছুতেই আর পছন্দ হয় না। শ্রীর মা জমিদারের ঘরের মেয়ে বলে তার মধ্যে যেন অহঙ্কার ঝরে ঝরে পড়ছে। আর শ্রীর কাকুর একটাই কথা। বাপের বাড়িতে মেয়েকে রেখে যাও। অনন্তও থাক। বাপের বাড়িতেই রাখার এতো ইচ্ছে তো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিল কেন! ওদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া ভালো। বাড়িতে কাজের লোক আছে। পরিশ্রম কম। এজন্যই ওর কাকু ওকে রেখে দিতে চায়। সেটাই অনন্তর রাগের কারণ হয়ে যায়। শ্রী আবার কাকু বলতে অজ্ঞান। কাকু যা বলে তাই যেন ধ্রুবসত্য। তাই যেন শিরোধার্য। অনন্তর রাগ আরও বেড়ে যায়।
শ্রী কিন্তু অনন্তর মনের এসব খবর জানে না। শ্রীর এসব ভাবার সময়ই নেই এখন। অনন্তর মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এ বাড়িতে এক একটা মুহূর্ত তার অসহ্য হয়ে উঠেছে। শাশুড়ি,ননদ সবাই মিলে তাকে যেন দিনরাত পিষছে। তার সম্বন্ধে যে কতরকম বদনাম দেওয়া হচ্ছে শ্রী সেসব ভাবতেও পারে না । মাধুরীর আবার মেয়ে হয়েছে। সেই নিয়ে মাধুরী আর শাশুড়ির মন খারাপ। মেয়েটার দেখাশোনার ভার নিয়েছে শ্রী। বাচ্চাটার দেড় বছর মতো বয়স হলো। শ্রীকে কামা কামা বলে ডেকে সে অস্থির। কামার কাছে শোবে,কামার কাছে ঘুমোবে। ওকে পেয়ে শ্রীর মনটাও একটু জুড়িয়েছে। কিন্তু হলে হবে কি! ননদ বদনাম দিয়ে বলেছে রুশির খাবার থেকে না কি শ্রী খেয়ে নেয়, ওকে না খাইয়ে। একটা বাচ্চার খাবার নিয়ে যে এভাবে কেউ বলতে পারে এ অভিজ্ঞতাও শ্রীর নতুন। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। দীর্ঘদিন মিল বন্ধ। আর এই অত্যাচার। শ্রী আর সহ্য করতে পারছিল না। এরা তাকে বাপের বাড়িতেও থাকতে দেবে না। তাহলে তো তার খাওয়া পরার খরচটা বাঁচে। কাজ করেও এদের সন্তুষ্ট করা যায় না। শ্রী তাই ধরল কাকুকে। কাকু লোহা লক্করের ব্যবসা শুরু করেছে। শ্রী বলল, ওই ব্যবসায় তুমি অনন্তকে ঢুকিয়ে নাও কাকু। কাকু প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। অনন্তকে ভালোই বোঝে কাকু। বোঝে তাকে একেবারে পছন্দ করে না অনন্ত। তবু এক রকম শ্রীর দিকে তাকিয়েই নিমরাজি হলো কাকু। মনে মনে ঠিক করল, ছোটোবোনের বেকার জামাইকেও অনন্তর সঙ্গে জুড়ে দেবে। দুটিতে মিলে কাজ করুক। অনন্ত কে বুঝিয়ে মালের অর্ডার দিয়ে পাঠানো হলো বড়োবাজারে। অনন্ত খানিকটা পুঁজি আর পরিশ্রম নিয়ে সেই কাজে যুক্ত হলো। সঙ্গে থাকল ছোটো পিসে শ্বশুর। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে অনন্ত দেখল নাটবল্টুর অর্ডার নেওয়া হয়েছে প্যাঁচের মাপ না নিয়েই। বিষয়টা কাকুকে জানাতে উনি বললেন, ওসবের প্রয়োজন নেই। আমি যেভাবে বলছি মাল তৈরি করো। অনন্ত মেনে নিয়েছিল সে কথা। বড়োবাজারের এক লোহার আড়ত থেকে আরেক আড়ত ঘুরে মাল তৈরি করে যেদিন সাপ্লাই দেওয়া হলো সেদিন সমস্ত মাল রিজেক্টেড হলো। বাড়ি ফিরে পিসে শ্বশুরের কাছে শুনল কাকু নাকি বলেছে, এ বাড়ির জামাইগুলো পাঁঠা। একটা কাজ ঠিক মতো করতে পারে না। শুনে এমনিতেই অনন্তর ফেটে পড়ার দশা। হঠাৎই সে খেয়াল করে মাল জমা রাখার জন্য যে ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে সেখানে তার আর পিসে শ্বশুরের নামের ওপর এরোচিহ্ন দিয়ে শ্রীর মায়ের নামও লেখা। ব্যস অনন্ত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, এই বিলটা দেখেছ শ্রী??
শ্রী বিষয়টা প্রায় কিছুই জানে না। উৎসুক হয়ে বিলটা দেখতে যেতেই অনন্ত ফেটে পড়ল, কি ভেবেছ তোমরা!! আমাকে সবাই মিলে ঠকানো! আমার টাকায় ব্যবসা করে যে যার মতো লাভ করবে! আর আমি আঙুল চুষব!
মানে! কি বলছ তুমি এসব!
ঠিকই বলছি! একে তো মাল সব রিজেক্টেড হয়েছে তোমার কাকুর জন্য! তারওপর তোমার মাকেও ব্যবসায় ঢুকিয়ে নিচ্ছে! ঠগবাজ, জোচ্চর একটা লোক!
কি বলছ কি তুমি! শ্রী কথা বলতে পারে না। মনে হয় এর থেকে তার মরণ ভালো ছিল। তার অমন সাত্ত্বিক কাকুকে ঠগবাজ,জোচ্চর…
ঠিকই বলছি! আসলে অন্য কিছু করবে কি করে!! সারাদিন তো বউদির আঁচলের তলায়… শ্রী যেন পাথর হয়ে যায়… অনন্তর কুইঙ্গিতের সামনে তার হতবাক হওয়ারও যেন শেষ নেই।
শ্রী প্রায় সেই মুহূর্তে দৌড়ে পৌঁছয় বাপের বাড়ি। কাকুকে সব বলে। বিকেলে শ্রীর বাবা আর কাকু এসে উপস্থিত হন শ্রীর শ্বশুর বাড়ি। তাদেরকেও অনন্ত যা তা কথা বলে। অনন্তর মাও স্পষ্ট ভাষায় ছেলেকেই সমর্থন করে, বলে, আপনারা তো আমার সংসার ভাঙতে চাইছেন। এইসব ব্যবসা করে মেয়ে জামাইকে সরিয়ে নিতে চাইছেন। বিশ্বদেব বলে, বাড়িতে সবাই যদি বাইরের কাজে ব্যস্ত থাকে, তবে বাড়িটা কে সামলাবে! শ্রীর মনে হয় এর থেকে অকাট্য যুক্তি তো আর কিছু হতেই পারে না। এরা একমুখে কত কথাই না বলে! এই তো তাকে উঠতে বসতে টাকা টাকা করে খোঁটা দিচ্ছে। এই আবার তারই বর কাজ করতে চাইলে বাধা দিচ্ছে। এরা আসলে কি চায়! তার ওপর অত্যাচার করেই কি এদের আনন্দ! তারই ব্যবস্থা!
শেষপর্যন্ত শ্রীর কাকু অনন্তর খরচ হওয়া টাকাটা অনন্তকে ফেরৎ দিয়ে দেয়। চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে ওরা বাড়ি ফেরে। শ্রীর মনে হয় কাকু এরকম বোকামি না করলেও পারত। অনন্তকে তো কাকু চেনে!!
৮
শ্রী প্রেগনেন্ট। আজ মাস তিনেক হলো। এবার আর অসুবিধে হয়নি। মাসিক বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে অনন্তকে জানিয়েছিল। তারপর ডা কৃষ্ণপদ ঘোষ ওর দেখাশোনা করছেন। এমনিতে কোনো কমপ্লিকেশন নেই। শুধু দুর্বলতা আছে। এই যা! শ্রী দেখেছে যখনই জীবন তাকে টেনে হিঁচড়ে একেবারে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দেয়, ঠিক তখনই আবার এমন কোনো কিছুর অবলম্বন তার কাছে পাঠায় যে তার বাঁচার ইচ্ছেটা আরেকবার তাকে ছুঁয়ে যায়। এবারও তাই হলো। অনন্ত যে ব্যবহার বাপী,কাকু, মার সঙ্গে করেছে তারপর তো আর অনন্তর সঙ্গে একটা দিনও কাটানো সম্ভব ছিল না। কিন্তু সে মা হতে চলেছে। সন্তান আসছে তার। তার জীবনের আলো। তার জন্য শ্রী সব করতে পারে। অনন্তর সঙ্গে একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতেও পারে। হয়তো সন্তান এলে অনন্তরও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। ও হয়তো এবার পরিবার, দায়িত্ব এসব শব্দের মানে বুঝতে পারবে। এসব ভেবে দিনগুলো তার একরকম কাটছিল। শ্রী একবারও ভাবেনি এই সন্তান তার জীবনে বাধা হয়ে এলো। তার অনন্তর কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিল এই সন্তান। তার পড়াশোনা, নতুন করে জীবন শুরু করতে পারার ইচ্ছেটাকে সমূলে উপড়ে দিতে হবে এবার। নাহ্, এসব শ্রী ভাবেনি। এসব ইচ্ছে কবেই মরে গেছে তার। চলে যেতে চাইলেও যাবে কোথায়! বাড়িতে দুই অবিবাহিত বোন। ভাই পড়াশোনা করছে। আত্মীয় পরিজনে বাড়ি সবসময় ভর্তি। তার মধ্যে মূর্তিমান আপদের মতো সে কোথায় যাবে! আর কীই বা করবে সেখানে গিয়ে। লেখাপড়া তো তার হলো না। চাকরি করার সুযোগও নেই। তাহলে!
আপাতত এসব চিন্তা ফেলে যে সন্তান আসছে তার কোল আলো করে তাকে নিয়েই মগ্ন হয়ে আছে শ্রী। কিন্তু তাকে নিজের মতো থাকতে দিলে তো! কদিন ধরেই বাড়িতে একটা অশান্তির হাওয়া বইছিল রুচিকে নিয়ে। রুচিকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার দায়িত্ব শ্রীর। আসার সময় প্রায় দিনই রুচি বায়না করে বৌমার হাতের রান্না খেতে যাবে বলে। বৌমা মানে শ্রীর মা। শ্রীর শাশুড়িমা হৈমবতী দেবী শ্রীর মাকে বৌমা বলে সম্বোধন করেন। সেই শুনে রুচিও তাই বলে। রুচিকে নিয়ে গেলে বাড়ির সবাই খুব খুশি হয়। রুচি খুব মিষ্টি দেখতে। গায়ের রঙ চাপা। কিন্তু চোখ দুটো ভাসা ভাসা। গাবলু গুবলু। খেতে ভালোবাসে। তাই প্রায় দিনই রুচিকে বাপের বাড়ি থেকে খাইয়ে নিয়ে যায় শ্রী। এটা মাধুরী ভালো চোখে দেখে না।হৈমবতীর মনে হয়, শ্রীর নিজের বাপের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে। সেটাই রুচির নাম করে চালায়। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রিক্সা করে আসতে আসতে রোজের মতো রুচি দিদি অর্থাৎ ঠাকুমা, পিসি আর ওর মায়ের কথা বলছিল। তারা শ্রীর সম্বন্ধে কী বলে না বলে ইত্যাদি। শ্রী যত তাকে এসব বলতে বারণ করে সে বলবেই। মেয়েটা এসব শিখছে। একজনের কথা অন্যের কাছে লাগানো ভাঙানো। বড়দের মতো কথা বলছে। এসব ওর অবোধ শৈশবকে নষ্ট করে দিচ্ছে। শ্রী এসব কথায় কিছুতেই গুরুত্ব দিতে চায় না। আবার একেবারে না দিয়েও পারেনা। তার শ্বশুর বাড়ির লোক তাকে অলক্ষী ছাড়া কথা বলেনা। বলে বিয়েতে বাবা অনেক দিয়েছে। তাই অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। শ্রীর মা নাকি কখনো কাউকে আশীর্বাদ করেনা। কেউ প্রণাম করলে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এসব কথা রুচির কাছেই শুনেছে শ্রী। রুচিকে ওর বুধু একসময় রোজ বিকেলে নিয়ে বেড়াতে বেরোতো। বিয়ের পর স্বাভাবিক ভাবেই সেটা কমেছে। তাই মাধুরী মেয়েকে বলেছে, এখন তো তবু এক আধদিন তোকে নিয়ে বেড়োয়। এরপর ভাই হলে তোকে নিয়ে আর কোথাও যাবে না। শ্রী এসব শোনে আর ভাবে মাধুরীও বোধহয় চায়নি তার মেজ দেওরের বিয়েটা হোক। অধিকার হারিয়ে গেলে রাগ হওয়ারই কথা। সেদিন এসব বলতেই বলতেই হঠাৎ রুচি একটা বাঁদর দেখতে পায়। রিভারসাইড রোডের যে দিকটায় রুচির স্কুল সেখানে বাঁদরের খুব উৎপাত।রুচি রাস্তায় বাঁদর দেখেই তাকে আদর করতে গেছে। আর বাঁদরটা রুচিকে কামড়ে দিয়েছে। শ্রী ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল। ব্যস রুচি তো চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছে। তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে এসে সবাইকে সবটা বলতেই মাধুরী প্রায় বাড়ি মাথায় তুলে ফেলল, দেখেছেন মা, আমি বারণ করেছিলাম শ্রীকে এসব না করতে বলাই ভালো। হলো তো এবার, হলো তো! আমার মেয়েটার একটা ক্ষতি করে ছাড়ল!
হৈমবতীও হাত পা নেড়ে শুরু করলেন, সত্যি রে মেজ বৌ। তোর এতো রাগ ওইটুকু মেয়ের ওপর যে তুই ওকে বাঁদরের সামনে ছেড়ে দিলি!
শ্রী যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে ইচ্ছে করে রুচির ক্ষতি করেছে। রুচিকে সহ্য করতে পারেনা বলে! এসব এরা কী বলছে!
মাধুরী আবারও বলতে থাকে, পান থেকে চুন খসলে আমার মেয়েটাকে শাসন। সারাদিন শুধু শাসন করছে।
শ্রী বলে ওঠে,বড়দি ও তো বড়দের মাঝখানে থেকে পাকা পাকা কথা শিখছে। দুষ্টুমি করছে তাই আমি ওকে শাসন করেছি।
বিশ্বদেব সেই সময় বাড়িতে ছিল না। কলকাতায় গেছে টিমের কাজ নিয়ে। শ্রীই রুচিকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করল। সঙ্গে মাধুরীও ছিল। মাধুরীকে শ্রী আজ প্রায় তিন বছর দেখছে। এরকম আগে কোনোদিন দেখেনি। মাধুরীর চোখদুটো কেমন যেন গোল গোল হয়ে গেছে। রাগে মুখটা তেতে উঠেছে। এতো রাগ তার ওপর। বাপের বাড়ি থেকে কটা জিনিস দিয়েছে বলে!
এর কদিন পরেই বিশ্বদেব মাধুরী,রুচি রুশিকে নিয়ে বম্বে চলে গেল। ছোটোবউ সম্পূর্ণারও বাচ্চা হবে। ওর ওখানে লোকের প্রয়োজন। শ্রী ভাবল তাহলে বোধহয় তাকে এরা বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু না। শ্রী ওই অবস্থায় ভারি ভারি বালতি করে জলটানা, রান্না করা, সংসারের সবটা সামলাতে লাগল। একদিন উনুনে আঁচ দিতে গিয়ে শ্রী খেয়াল করল বেশ কিছু পুরনো চিঠি। বিশ্বদেব আর মাধুরীর মধ্যে দেওয়া নেওয়া হয়েছে। এখন উনুন জ্বালানোর জন্য রাখা আছে। সবকটি চিঠি জুড়ে শুধু শ্রী আছে। শ্রী ঠিক কতটা খারাপ,রুচিকে শাসন করে,কোনো কাজ করে না সেই বৃত্তান্ত। চিঠিগুলো পড়তে পড়তে শ্রী কাঁদতে থাকে। যে জা-ভাসুরকে সে এতো সম্মান করে তারা কিনা তার সম্পর্কে এসব আলোচনা করেছে। উনুনের ধোঁয়া গলগল করে ওঠে। আর শ্রীর চোখের জলও অনর্গল….
৯
সাত মাসে শ্রী শেষপর্যন্ত ছুটি পেল। অনন্তর যদিও ইচ্ছে ছিল না। প্রথম বাচ্চা তার কাছে থেকেই হোক সেটাই সে চেয়েছিল। কিন্তু খরচের ভয়ে পিছিয়ে আসতে হলো। ডা কৃষ্ণপদ ঘোষ ব্যারাকপুরের বিখ্যাত অমিয় চ্যাটার্জির নার্সিং হোমে সিজার করবেন। নার্সিংহোমের খরচ, ডাক্তারের ফি এসব করা অনন্তর সাধ্যের অতীত। ফলে শ্রীর বাবার ঘাড়েই সবটা ফেলে দিতে হলো। হৈমবতী বললেন, প্রথম বাচ্চা বাপের বাড়ি থেকেই হবে। তার খরচাও বৌয়ের বাবাই দেয়। যদিও বিজয়দেবের বাচ্চা হওয়ার খরচ কেন বিজয়দেবই করে চলেছে তার কোনো ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। শ্রী অবশ্য এসব জানে না। ছুটি পেয়ে প্রায় দৌড়েই সে মায়ের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিল। যাই হোক, এত দুঃখেও শ্রীর রূপ বেশ খুলেছে। গায়ে মাংস লেগেছে। গালদুটো বরাবরই তার অল্পে লাল হয়ে ওঠে। বাপের বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গে অস্মি আর টুয়া যেভাবে ছুটে এসেছে, ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখেই শ্রীর মন ভালো হয়ে গেছে। মা তাকে দেখে হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে থেকেছে। কাকু তো নানা রগড় শুরু করেছে। বাপী তো একইরকম আন্ডারওয়্যার পরে উবু হয়ে টিএবিল করতে ব্যস্ত। বাড়িতে আত্মীয় স্বজন এখন কেউ নেই। শ্রীর মনে হলো এবাড়িতে এসে সে হাফছেড়ে বাঁচল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে এক একদিন যেন সে ভুলেই যায়, কোনোদিন তার বিয়ে হয়েছিল। ওই পর্বটাকে তার দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়। সে তো এখানেই ছিল, আছে। তার সন্তান নিয়ে যদি সে এখানেই থেকে যেতে পারত!
শ্রীর এখন কোনো কাজ নেই। এই সময়টা শীতের আমেজ। সামনে সরস্বতী পুজো। শ্রী মন দিয়ে ফুলগাছ করতে শুরু করল। গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা,ডালিয়া… গাছ তার হাতে সুন্দর হয়। বারান্দার নিচে মাটিতে গাছ লাগানো হয়েছে। সকালবেলা অদ্ভুত একটা রোদ আসে। সেই রোদ পিঠে লাগিয়ে কমলালেবু খেতে খেতে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে শ্রীর। আর নিয়ম করে সে পড়ে শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত। ছোটো ছোটো গল্পের আকারে রামকৃষ্ণের বাণী তার অশান্ত মনটাকে শান্তি দেয়। মা এখানে সব প্রিয় প্রিয় খাবার বানিয়ে দেয়। গাওয়া ঘির লুচি তরকারি, রোজ মাছ ভাত, আধসেদ্ধ ডিম দিয়ে গরম রুটি খেতে খুব ভালোবাসে শ্রী। অনন্ত প্রায় রোজ আসে। ভাইবোনগুলোর সঙ্গে খুনসুটি করে,গান গায়… অনন্ত কে যেন চেনাই যায় না। তিন বছর আগে অনন্তকে এরকম দেখেছিল শ্রী। এই তিন বছরে যে অনন্ত তার চোখের সামনে ধরা দিয়েছে তাকে নিষ্ঠুর বলবে না অসহায় বলবে ভেবে পায় না শ্রী।
দু আড়াই মাস যে কোথা দিয়ে কেটে গেল ঠাহর করতে পারল না শ্রী। সেদিন ব্যথা উঠলে তাকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হল। ডাক্তার সিজার করার কথাই বারবার বলে আসছিলেন। সেই ব্যবস্থাই হলো। শ্রীর কাকু ছিলেন না। বাপী,মা,অস্মি,টুয়া,ভাই সবাই এসে হাজির। ওদিকে মাধুরী,হৈমবতী রুচিকে নিয়ে এসেছে। অনন্ত তো অপারেশন রুমের বাইরে কেঁদে আকুল। শ্রীর বাবাই সামলাচ্ছে অনন্তকে। ওদিকে মাধুরী ছটফট করেই যাচ্ছে। এতো অতিরিক্ত করছে যে চোখে লাগছে। কেন যে এমন করছে। শ্রীর মার ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক ঠেকে। অপারেশন শেষ হতেই ডা ঘোষ হাত মুছতে মুছতে এসে আগে ওঁর টাকাটা চাইলেন। মাধুরী তার মধ্যেই দুবার প্রশ্ন করে বসল কী হয়েছে? ছেলে না মেয়ে? ডাক্তার টাকা নিয়ে জানাল মেয়ে হয়েছে। মাধুরী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বসে পড়ল পাশের চেয়ারে। কোনোটাই চোখ এড়িয়ে গেল না শ্রীর মার। বুঝলেন মাধুরীর দুই মেয়ে হয়েছে বলে ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ আছে হৈমবতীর। সম্পূর্ণারও মেয়ে হয়েছে। কিন্তু শ্রীর ছেলে হলে এ বাড়িতে শ্রীর দর বেড়ে যেত। সেই নিয়েই মাধুরীর এতো দুশ্চিন্তা। যদিও শ্রীর মা নিজেও তো তার তিন মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। এসব ভাবতে ভাবতে শ্রীর মা বলেই ফেললেন, আবার মেয়ে! অনন্তর কানে যথারীতি কথাটা গেছে। অনন্ত এমনিতেই পছন্দ করে না এই মহিলাকে। ভীষণ অহংকারী। টাকা আর জমি ছাড়া কথা নেই। আর আজ মেয়ে হয়েছে বলে খুঁত কাটল। অনন্ত বিরক্তিটা গিঁট দিয়ে রাখল।
সেদিন দুপুরে নার্সিংহোমের এই ঘরটায় ছায়া ছায়া রোদ। বাইরের দাবদাহ যেন সবুজ পর্দার চাদর উড়িয়ে নিয়েছে দুদণ্ড শীতলতার আশায়। বসন্তের হাওয়া এখনো মৃদুমন্দ গাছের পাতায় দোলা দিচ্ছে। প্রসূতি বিভাগের মেয়েদের হাতের চুড়ির রিনরিন আওয়াজ এই নিস্তব্ধ দুপুরকে আরো কিছুটা নৈঃশব্দ উপহার দিচ্ছে। এইসময় দীর্ঘ ঘুম ভেঙে জেগে উঠল রাগেশ্রী। চেতনা ফিরতেই আড়ষ্ঠ ব্যথায় কুঁকড়ে যেতে যেতে তার প্রথম মনে হলো তার সন্তানের কথা। নার্স কাছাকাছিই ছিলেন। রাগেশ্রীকে চোখ খুলতে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। রাগেশ্রীর তখন ঠোঁট জিভ সব শুকনো, সারা শরীর ব্যথায় জর্জর। রাগেশ্রী কোনো প্রকারে শুধু বাচ্চা শব্দটাই উচ্চারণ করতে পারল। নার্স প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে একটা কাপড়ের পুঁটুলি এনে রাগেশ্রীর পাশে শুইয়ে দিলেন।রাগেশ্রীর যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না! তার সন্তান! কালোকুলো গোল বাটির মতো মুখ। ছোট্ট বাঁশির মতো নাকখানা। মোটামোটা ঠোঁট। কিন্তু সবচেয়ে উজ্জ্বল বড় বড় ফালাফালা কালো মিশমিশে চোখদুটো। মাথায় কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। এই তার সন্তান, তার মেয়ে। ১০ মাস ধরে যে তার সর্বক্ষণের সুখ দুঃখের সাথী। কেন কে জানে হঠাৎই রাগেশ্রীর মনে হলো সারাজীবনের মতো পাশে থাকবি তো! মাকে বুঝবি তো!
জীবন একেবারে নতুন হয়ে দেখা দিল শ্রীর কাছে। যেন ভরা পূর্ণিমা এসেছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্না কোলে করে নতুন মায়ের উপচে পড়া সুখ। শ্রীর ঠাকুমা চলে এসেছেন। নাতনির ঘরের পুতির কাঁথাকানি করবেন বলে। মেয়ে তো ভারি দুষ্টু! রাতে মোটে ঘুমোতে চায় না। সারাদিন ঘুমোবে আর রাতে খেলবে আপন মনে। চার হাত পা পারলে সে একসঙ্গে মুখে ঢোকায়! যদি বা একটু ঘুমোয়, ঠিক ভোরবেলা উঠে পড়ে। ঠাকুমা তখন বলে, দে আমাকে দে। আমি কোলে করে খেলাচ্ছি। তুই ঘুমো। স্নান করাতে গিয়ে আবিষ্কার হলো মেয়ে মাথায় তিনটে জটা নিয়ে জন্মেছে। রাগেশ্রী তো হেসেই পাগল। তারকনাথের কাছে সে মনে মনে মানদ করেছিল যেন একটা সুস্থ বাচ্চা হয়। ছেলে মেয়ে যাই হোক না কেন সুস্থ যেন হয়। তারকনাথ তার কথা রেখেছে। জটাধারী তার মতোই একজনকে শ্রীর কোলে পাঠিয়েছে। মা – বাপী -কাকুর খুশির তো কোনো সীমা পরিসীমা নেই। অস্মি আর টুয়া কে বাচ্চাটাকে কোলে নেবে তাই নিয়ে চলে কাড়াকাড়ি। ভাই খেলার ফাঁকে ফাঁকে এসে দেখে যায়। এতো বছর পর বাড়িতে প্রথম বাচ্চা। সবার বড়ো আদরের। এর মধ্যেই একদিন জা- ভাসুর এলো। রুচি রুশির নামের সঙ্গে মিলিয়ে নামের কথা ভাবছিলেন। তেমন নাম পাওয়া গেল না। নাম দিলেন ঋতি । ইংরেজি R এর মিলটা থাকল। এই অবধি। নামের মানে নিয়ে রাগেশ্রী তেমন না ভাবলেও নামটা তার ও খুব পছন্দ হলো। দিনগুলো তার সুন্দর কাটছে। মা বাবার আশ্রয়ে মেয়েকে নিয়ে। কিন্তু ঈশ্বর তো তার জীবনে ভালো থাকা লেখেননি। সে যতই চেষ্টা করুক, ভালো থাকা তার আর হয় না।
১০
রাগেশ্রী আজ প্রায় একবছর হলো বাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি। এমনিতে তার বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ নেই। অনন্ত এক আধবার নিয়ে বেরিয়েছে। কখনো সিনেমা দেখতে গেলে রুচি,মাধুরী বা হৈমবতী ওদের সঙ্গে যায়। বিয়ের পর একবার দীঘা যাওয়া ছাড়া আলাদা করে তাদের দুজনের কোথাও যাওয়া হয়নি। একবার মনে আছে অনন্ত তাকে নিয়ে গিয়েছিল শ্যামবাজারে। সেখানে গোলাবাড়ির কষামাংস আর রুটি খাওয়া হয়েছিল। তারপর বড়ো বড়ো সন্দেশ। শ্রী অতো খেতে পারেনি। অনন্ত বাকিটা খেয়ে নিয়েছিল। সেসব দিনের আনন্দই অন্যরকম। অনন্ত প্রচুর কথা বলে, গান গায়। অনন্তকে তখন আবার নতুন করে ভালো লাগে।
সেদিন অস্মিই তাল তুলল। সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবে। বাপীকে রাজি করিয়ে টিকিট কাটানো হলো। কিন্তু মেয়েটার কি হবে! মেয়ে তো মাকে ছেড়ে একমুহূর্ত থাকতে পারে না। সবার মাঝে থেকেও মা ছাড়া তার চলে না। কাকু তাকে সকাল সকাল হাম্বা দেখাতে নিয়ে যায়। অস্মি দুপুরে তাকে নিয়ে মাঠে খেলায়। গল্প বলে। মাথাটা তার টলমল করতে করতে বুকের কাছে নেমে আসে।। মুখ থেকে নাল ঝরে পড়ে। কিন্তু মাকে দেখতে পেলে সে আর কারো কাছে থাকবে না। তাহলে উপায়! ওকে রেখে তো যাওয়া যাবে না! শ্রী ভাবল ওকে নিয়েই না হয় যাই! কী আর হবে! ওদের বেরিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অনন্ত এসে উপস্থিত। অনন্তর সঙ্গে বাপীই কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু অনন্ত এসেই শ্রী আর ঋতি র খোঁজ করল। সিনেমা দেখতে গেছে শুনে কেমন যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হঠাৎ চিৎকার শুরু করল, সিনেমা দেখতে গেছে মানে? ওইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়েছে?
বাপী বোঝাবার চেষ্টা করে, হ্যাঁ, সবাই মিলে ধরল। তাই আর কি…
তাই বলে ওইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে এই জোলো হাওয়ায় বাইরে বেরোলো… যে কোনো সময় বৃষ্টি আসতে পারে…
না না, ওরা তো রিক্সায় গেছে। আর ঢাকাঢুকি দিয়ে নিয়ে গেছে।
আমি শালা কবে থেকে বলছি এবার বাড়ি চলো… সে কথা ভালো লাগছে না। আসলে ভালো লাগবে কি করে! এখানে তো মধু আছে! নিজের সুখের জন্য এখানে পড়ে আছে। লজ্জা করে না! বাচ্চাটার অযত্ন হচ্ছে! আপনারা বাড়িতে বড়ো তিনজন থাকা সত্ত্বেও ঋতি কে দেখার লোক পাওয়া গেল না! ওকে নিয়ে যেতে হলো!
বাপী,কাকু সবাই মিলে বোঝালেও অনন্ত কে শান্ত করা গেলনা। সে চিৎকার করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পর শ্রীরা সবাই হৈ হৈ করে বাড়ি ফিরল। অনন্ত হয়তো বাইরে কোথাও অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সেও ঢুকল। ঢুকেই শ্রীর কাছ থেকে ঋতি কে ছিনিয়ে নিয়ে সে চলে যেতে চাইল। শ্রী কিছু না বুঝতে পেরে কেঁদে উঠেছে। অনন্ত আরো একবার ফেটে পড়ল। যা নয় তাই সে শ্রীকে বলতে শুরু করল। কাকু রেগে গিয়ে অনন্ত কে কিছু বলতে আসছিল। বাপী আটকে দিল। সবাই নীরব দর্শকের মতো দেখল একটা বাচ্চাকে নিয়ে কী পরিমাণ টানাটানি চলছে। অনন্ত চেঁচিয়েই চলেছে।তারপর সে একসময় বেরিয়ে গেল। শ্রী পাগলের মতো কাঁদছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। কাকু তরপাচ্ছে। কিন্তু জোর করে কিছু করতে গিয়ে যদি বিয়েটা ভেঙে যায়! বাচ্চাটা আছে। বাপীর পক্ষে তো সম্ভব নয় দায়িত্ব নেওয়া। শ্রী তো পাশটাও করতে পারেনি। চাকরিই বা করবে কী করে! এসব ভাবতে ভাবতেই হৈমবতী এসে হাজির। তিনি কারো সঙ্গেই কোনো কথা বললেন না। শ্রীকে শুধু বললেন, জিনিসপত্র গুছিয়ে নে। ও বাড়ি যাবি। শ্রী কাঁদতে কাঁদতে কোলে ঋতি কে নিয়ে রিক্সায় উঠল। মেয়েটা এতক্ষণ নাগাড়ে কাঁদছিল। চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেছিল ভীষণ। এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। শ্রী ভাবছিল মেয়েটা যেদিন জন্মালো তারপরদিন থেকেই অনন্তর মিল বন্ধ। ও বাড়িতে যে কী পরিস্থিতি হয়ে আছে! কী যে তাকে ভোগ করতে হবে! এসব ভেবেই ঋতি কে আরো চেপে ধরছিল শ্রী।
বাড়িতে ফিরে শ্রী যথারীতি দেখল ইরা এসেছে। ইরা মানে মন্দিরা। মাধুরীর বোন। অবিবাহিত। একসময় অনন্তর সঙ্গে ওর বিয়ের কথা হয়েছিল। মাধুরীর বাড়ি থেকে রাজি হয়নি। মাধুরীর ঠাকুমা মৃত্যুর আগে নিদান দিয়েছিল দুই বোন যেন দুই জা না হয় কখনো। তাই ইরা আর অনন্তর বিয়েটা হয়নি। কিন্তু ইরার তো অনন্তকেই পছন্দ। কেমন বর চাই জিজ্ঞেস করলেই ইরা নাম না করে অনন্তর বর্ণনা দেয়। তাকে ভালো গান গাইতে হবে, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা পড়বে, সিগারেট খাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন তো বাপের বাড়ি থেকে এসে শ্রী আবিষ্কার করেছিল অন্ধকার ঘরে অনন্তর মাথা টিপে দিচ্ছে ইরা। কেমন একটা অস্বস্তি হয়েছিল তার, আমি বাড়িতে না থাকলেই ইরা আসে কেন!
অনন্ত রেগেমেগে বলেছিল, বৌদির বোন হয়, আসতেই পারে!
আজও সেই ইরাকে দেখে ভালো লাগল না শ্রীর।
এই ঘটনার দুদিন পরেই অনন্তর মিল খুলল। আনন্দে অনন্ত সিনেমার টিকিট কেটে বাড়ি ফিরল।সাব্যস্ত হলো ইরা, অনন্ত, শ্রী আর হৈমবতী সিনেমা যাবে। মাধুরী দুই মেয়েকে নিয়ে সন্ধে থেকে নাজেহাল থাকে। তার পক্ষে আর ঋতি কে দেখা সম্ভব নয়। অতএব ঋতি কে নিয়ে যাওয়া হলো। শ্রী মনে মনে দুদিন আগের অনন্তর কথাগুলো ভাবছিল। সে না যৈতেই পারত। একই তো সিনেমা। তার তো বাপের বাড়িতে দেখা হয়ে গেছে। তবু অনন্তর আনন্দকে নষ্ট করতে ইচ্ছে হলো না তার । অনন্ত বেকারির বিস্কুট কিনে আনল। শ্রী খেতে ভালোবাসে বলে। যাক,হল থেকে বেড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে বাচ্চা নিয়ে শ্রী আর এগোতেই পারছে না। হঠাৎই তার লম্বা বিনুনিতে টান পড়েছে। চুল ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করতে গিয়ে শ্রী দেখল হৈমবতী তার বিনুনি ধরে টানছেন আর মুখে অঙ্গভঙ্গি করে ইরাকে কি যেন বলছেন! শ্রী অবাক হয়ে তাকায়। হৈমবতী চেঁচিয়ে বলে আগে এগিয়ে যাচ্ছিস কেন! ডাকছি তাও শুনছিস না! তাই তো চুল ধরে টানলুম। শ্রী কোনো কথা বলে না। অনন্তকে এসব কথা বলা সে কবেই ছেড়ে দিয়েছে।নিজেই এসব সে এখন হজম করে। হয়তো এ তার বাপের বাড়িতে থাকার শাস্তি…
(ক্রমশ)


