
উচ্চাকাঙ্খা হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস
লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।
অনুবাদক পরিচিতি- ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।
(পাঁচ)
মানুষের জীবনের লক্ষ্য যাই হোক না কেন, সেই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য মানুষকে কিছু বিশেষ মানসিক গুণের অধিকারী হতে হয় ।জুলিয়া ওব্রেজউদ নামের একজন বিদূষী মহিলার মতে মানুষের সবগুলি মানসিক গুণের মধ্যে সবচেয়ে বিরলতম মূল্যবান গুণটি হল ধৈর্য।মানুষকে চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেবার জন্য কয়েকটি মূল্যবান বইলেখা স্যামুয়েল স্মাইলস নামের (১৮১২-১৯০৪)বিশ্ব বিখ্যাত ইংরেজ লেখক তাঁর একটি গ্রন্থে জুলিয়া ওব্রেজউদের উক্তি উদ্ধৃত করে তাকে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করে বলেছেন–’ অনেক মানুষ মানসিক গুণাবলী নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু সেই সব কাজে খাটিয়ে জীবনের উৎকর্ষ সাধন করার জন্য ধৈর্যশীল পরিশ্রমের প্রয়োজন। বেকন,নিউটন, ওয়াট, স্কট, বাইরন,থেকারে– এরা প্রত্যেকেই নিজের জীবনে এক একজন সাধারণ মেকানিকের মতো পরিশ্রম করতেন। সত্যি কথা বলতে গেলে অশেষ ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষে উচ্চস্থানে আরোহণ করা সম্ভব নয়। বুফন নামের একজন চিন্তাশীল লেখক বলেছিলেন যে মহৎ মানুষের প্রতিভা বললে আমরা সাধারণত যে কথাটা বুঝি তা আসলে সর্বসাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক ধৈর্য ছাড়া অন্য কিছু নয়। অর্থাৎ প্রতিভাশালী কৃতি মানুষের ধৈর্য শক্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি। কিছুই তাদেরকে বিরক্ত বা ক্লান্ত করে না, প্রতিটি মুহূর্তকে তারা কিছু না কিছু একটা কাজে লাগায়।’
কেবল নিজের চেষ্টা এবং পরিশ্রমের সাহায্যে বড়ো মানুষ হওয়া বেঞ্জামিন ফ্রেঙ্কলিনও বলেছিলেন যে ধৈর্যগুণ থাকা মানুষ জীবনে যা হতে চায় তাই হতে পারে।
কিন্তু উপদেশের চেয়ে উদাহরণ বেশি ভালো, সেই জন্য অশেষ ধৈর্যের সাহায্যে জীবনে কৃতকার্যতা অর্জন করা কয়েকজন মানুষের জীবনের সত্য কাহিনি তোমাদের কাছে বলব।
সংস্কৃত ভাষার অনেক ব্যাকরণের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং শ্রেষ্ঠ ব্যাকরণটি রচনা করেছিলেন পাণিনি নামের একজন মহা পন্ডিত। যিশুখ্রিষ্টের আগে তার জন্ম হয়েছিল বলে পন্ডিতরা স্থির করেছেন। মানুষের প্রতিভা যে সমস্ত কঠিন এবং উত্তম কাজ সমাধা করেছেন, সেইসবের তালিকায় পাণিনির ব্যাকরণ অবশ্যই জায়গা পাবে বলে কয়েকজন ইউরোপীয় মনীষী মত প্রকাশ করেছেন। পাণিনি ব্যাকরণের ব্যাখ্যা করে পরবর্তীকালে কয়েকজন পন্ডিত সংস্কৃত ব্যাকরণ রচনা করেছেন। তাদের ভেতর বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করা একজন বৈয়াকরণ হলেন বোপদেব। তাঁর রচিত বিখ্যাত ব্যাকরণটির নাম ‘মুগ্ধবোধ’।
কিন্তু পরবর্তী কালে মহা পন্ডিত বলে পূজিত হওয়া বোপদেব ছাত্র অবস্থায় এতটাই মূর্খ ছিলেন যে তাকে প্রতিদিনই শিক্ষকদের কাছ থেকে কেবল তিরস্কার শুনতে হতো। শিক্ষক এবং সহপাঠীরা প্রত্যেকেই তাকে অত্যন্ত অবহেলার চোখে দেখত। কিন্তু তিরস্কার শুনে শুনে তিনি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে একটা সময়ে তিনি সমস্ত অপমান নির্বিকার ভাবে সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন।
কিন্তু একদিন শিক্ষক এবং ছাত্র কেউ কাউকে সহ্য করতে না পারা একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। সেদিন বোপদেবের মূর্খতা তার একজন শিক্ষককে প্রায় পাগলের মতো করে তুলল। তিনি বোপদেবকে উদ্দেশ করে চিৎকার করে করে বলতে লাগলেন–’ এই পৃথিবীতে যত মূর্খ আছে সেই সবগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো মূর্খ হলি তুই। তুই এই জীবনে কোনো কিছু শিখতে তো পারবিই না, আগামী সাত জন্মেও তোর পক্ষে কোনো কিছু শেখা সম্ভব হবে না। তুই পাঠশালায় এসে কেবল আমাদের সময় নষ্ট করছিস।’
শিক্ষকের কথা শুনে বোপদেব নিজের হৃদয়ের মধ্যে একটি লৌহ শলাকা ঢুকে যাওয়ার মতো অনুভব করলেন। জীবনে প্রথমবারের জন্য তিনি সমস্ত আশা এবং নিজের ওপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন। তার মন থেকে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নাই হয়ে গেল। পাঠশালা ছুটি হওয়ার পরে তিনি বাড়িতে না গিয়ে আত্মহত্যা করার উদ্দেশ্যে গ্রামের জনগণের পুকুরের তীরে গেলেন।
পুকুরের তীরে দাঁড়িয়ে তিনি কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াতে নদীর ঘাটে থাকা একটা বড়ো পাথরের ওপরে তার চোখ পড়ল। গ্রামের মেয়ে বৌ-ঝিরা কাপড় ধোয়ার সময় পাথরটাকে কাপড় আছড়ানোর জন্য ব্যবহার করে। প্রতিদিন দেখতে থাকা জিনিসটা বোপদেবের চোখে সেদিন নতুন ভাবে ধরা দিল।কাপড় আছড়াতে আছড়াতে প্রকাণ্ড পাথরটা মিহি এবং চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।হঠাৎ দিব্য জ্ঞান লাভ করা মানুষের মতো বোপদেব মনে মনে ভাবতে লাগলেন–’ পাথরের মতো কঠিন একটা জিনিসকে কাপড়ের মতো একটা কোমল জিনিস এভাবে ক্ষয় করে করে মিহি এবং চ্যাপ্টা করতে পেরেছে। এটা কীভাবে সম্ভব হল? দিনের পর দিন, মাসের পরে মাস, বছরের পর বছর ধরে কাপড়ের ঘষা লাগার ফলে পাথর ক্ষয় হয়ে মিহি হয়ে গেছে। আমি যদি এভাবে নিজের মনটাকে বুদ্ধিদীপ্ত করে তোলার জন্য ধৈর্য না হারিয়ে চেষ্টা করে যাই, তাহলে একদিন না একদিন আমি নিশ্চয় কৃতকার্য হতে পারব।’
আত্মহত্যা না করে মনে নতুন সংকল্প নিয়ে বোপদেব বাড়ি ফিরে এলেন। পরের দিন তিনি আরম্ভ করলেন জীবনের নতুন সাধনা। কেবল জ্ঞানের সাধনা নয়, জ্ঞানের সঙ্গে ধৈর্যের সাধনা। যে জিনিস মহা মূর্খ বোপদেবকে একদিন মহা পন্ডিত করে তুলল, সেটাই ছিল অসীম ধৈর্য সহকারে করা কঠোর পরিশ্রম।
যে কোনো বড়ো কাজ করার জন্য প্রতিভা এবং পরিশ্রম ক্ষমতা তো লাগবেই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হল ধৈর্য। উদাহরণ স্বরূপ, ডক্টর টমাস কুপারের কথা মনে করা যেতে পারে। একটি বৃহৎ আকারের ইংরেজি অভিধান তিনি একা প্রণয়ন করেছিলেন। অভিধানের কাজে বেশি করে সময় এবং মনোযোগ দিতে হওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি সংসারের দায়িত্ব কিছুটা অবহেলা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার জন্য তার পত্নী মনে মনে ক্ষুন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সে যাই হোক না কেন, আট বছর কঠোর পরিশ্রম করে ডঃ কুপার অবশেষে অভিধানটি লিখে শেষ করলেন।একদিন তিনি বিশেষ কাজে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ফিরে এসে তিনি দেখলেন– মুখে একটি অস্বাভাবিক আনন্দের হাসি ফুটিয়ে তার পত্নী লেখাপড়া করা রুমটিতে বসে আছেন।কিছু একটা অঘটনের আশঙ্কায় ডঃ কুপারের বুকটা কেঁপে উঠল। ঘরের যে জায়গায় তিনি অভিধানের পর্বতাকার পান্ডুলিপিটা রেখেছিলেন সেদিকে তার চোখ গেল। অভিধানটি সেখানে নেই।
‘আমার কাগজ গুলি কি হল?’– তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি সেই সব পুড়িয়ে ফেলেছি।’
মানুষটার আট বছরের পরিশ্রম এখন তার সামনে পড়ে রয়েছে এক মুঠো ছাই হয়ে। এই দৃশ্য দেখে ক্রোধে বা যন্ত্রণায় ডঃ কুপারের পাগল হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। যে কোনো সাধারণ মানুষের মতো সেটাই হলে আজ আমরা তাকে স্মরণ করতাম না। কিছুক্ষণ ছাইয়ের স্তূপ্টার দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে তিনি শান্তভাবে বললেন–’ তোমাকে ক্রোধের পরিবর্তে আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি,কারণ তুমি আমার আয়ু আট বছর বাড়িয়ে দিলে। অভিধানটি আমি আবার লিখতে শুরু করব, আর এটাও ঠিক যে সেটি শেষ না করা পর্যন্ত আমি কখনও মরব না।’
ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল উনিশ শতকের ইংরেজ চিন্তা নায়ক টমাস কার্লাইলের জীবনে। তিনি ফরাসি বিপ্লবের একটি সুবৃহৎ ইতিহাস লিখেছিলেন। প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার পান্ডুলিপিটা কার্লাইল তার বন্ধু জন স্টুয়ার্ট মিলকে পড়তে দিয়েছিলেন। একদিন মিল বাড়িতে না থাকা অবস্থায় তাঁর একজন কর্মচারী ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের পান্ডুলিপিটাকে ফেলে দেওয়া কাগজের স্তূপ ভেবে ঝেড়ে পুঁছে বাইরে নিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন। সেই হৃদয়বিদারক খবরটি পেয়েও কিন্তু কার্লাইল হতাশায় ভেঙ্গে পড়লেন না– যেভাবে ভেঙ্গে পড়েননি ডঃ কুপার। তিনি পুনরায় বইটি লিখতে শুরু করলেন, আর একদিন সেটি লিখে শেষ করে ফেললেন।
এই ধরনের উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। পৃথিবীতে যে মানুষ কিছু একটা কঠিন বা মহৎ কর্ম সম্পাদন করেছেন তার জীবন কাহিনি পড়ে দেখলে আমরা জানতে পারব যে প্রধানত ধৈর্যের জোরেই তার পক্ষে এই ধরনের কাজ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যেকোনো ক্ষেত্রে কৃতকার্য হওয়ার জন্য কেবল ধৈর্য হলেই চলবে না; তার সঙ্গে যোগ হতে হবে অধ্যবসায়, অর্থাৎ ক্রমাগত চেষ্টা করে যাওয়া। আসলে ধৈর্য এবং অধ্যবসায় একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ঘষতে থাকলে পাথর ক্ষয় হয়। কিন্তু মাত্র একবার বা দুবার ঘষলেই তা ক্ষয় হয় না। অনেকদিন ধরে নিয়মিতভাবে ঘষতে থাকলে তবেই তা ক্রমে ক্রমে ক্ষয় হতে থাকে। যেকোনো কঠিন কাজের ক্ষেত্রেও এই একই কথা খাটে। কাজটা করার জন্য আরম্ভ করে কঠিন বলে ভাবতে শুরু করে ছেড়ে দিলে মানুষ সেই কাজের সুফল ভোগ করার কথা কখনও আশা করতে পারবে না। কিন্তু ঘষতে থাকলে পাথরও ক্ষয় হওয়ার মতো চেষ্টা করে থাকার ফলে অতি কঠিন কাজটিও ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসে। কাজ করে থাকার সময় অনেকবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হতে হতে পারে; এরকম মুহূর্তে হতাশা মানুষকে গ্রাস করে ধরাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।কিন্তু মানুষ হতাশাকে জয় করতে পারে একমাত্র ধৈর্যের বলে। বিদ্যুৎ আলোর বাল্ব আবিষ্কারের সময় টমাস আলভা এডিসন এক হাজার দুশো বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন;অর্থাৎ বাল্বটা নির্মাণ করার কাজে সম্পূর্ণ কৃতকর্ম হওয়ার আগে সেই কাজে তিনি এক হাজার দুশো বার অকৃতকার্য হয়েছিলেন। সহস্রাধিকবার ব্যর্থ হয়েও সেই একই কাজে লেগে থাকার জন্য কতটা ধৈর্যের প্রয়োজন হতে পারে সে কথা কল্পনা করে দেখ। এডিসনের বিষয়ে বলা হয়েছে তিনি পৃথিবীটা আলোকিত করে রেখে গেলেন। কিন্তু দশ বার,একশো বার বা পাঁচশো বার করে অকৃতকার্য হওয়ার পরে তিনি যদি বিদ্যুতের বাল্বের উদ্ভাবন করার চেষ্টা পরিত্যাগ করতেন, তাহলে পৃথিবীটা আজও অন্ধকার হয়েই থাকত না কি?
টমাস আলভা এডিসন কেবল পৃথিবীটাকে আলোকিত করে যাননি; একই সঙ্গে তিনি সমস্ত মানুষকে এই বহুমূল্য শিক্ষাও দান করে গেছেন যে অসীম ধৈর্যই হল কৃতকার্যতার গোপন রহস্য।
কৃতকার্যতার গোপন রহস্য অবশ্য কেবল একটি নয়– যেভাবে একটি সুস্বাদু ব্যঞ্জনের উপকরণ মাত্র একটি বা দুটি হতে পারে না। মানুষ যে কাজ করে সেই কাজটিকে ভালোবাসতে শিখতে হবে। পছন্দ না করা একটা কাজ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে করে থাকতে হলে তা বেঁচে থাকার আনন্দ অনেকখানি হরণ করে। যেকোনো কাজ– যতটাই বিরক্তিকর হোক না কেন– ভালোবাসার প্রধান উপায় হল কাজটার প্রতিদানে পেতে পারা সুন্দর পুরস্কারটার কথা সবসময় মনে রাখা বা কল্পনা করতে থাকা। উদাহরণ স্বরূপ, প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে শারীরিক ব্যায়াম করাটা অত্যন্ত বিরক্তিদায়ক কাজ। এই বিরক্তির ভয়ে বেশিরভাগ মানুষ ব্যায়াম করে না। কিন্তু বিরক্তিকে জয় করে যে সমস্ত লোক নিয়মিত ব্যায়াম করে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। মানুষের সুখ এবং আনন্দের প্রধান উৎস গুলির ভেতরে একটি হল সু-স্বাস্থ্য। সেইজন্য নিয়মিতভাবে ব্যায়াম করতে বিরক্তি অনুভব করা মানুষ যদি সতত নিজেকে এই কথা বলতে থাকে যে ব্যায়াম করে থাকার ফলে আমি একদিন একটি সুন্দর এবং শক্তিমান শরীরের অধিকারী হব, তাহলে বিরক্তিকে জয় করাটা তার পক্ষে খুবই সহজ হয়ে পড়বে।
গিয়ার্ডিনি নামের একজন বিখ্যাত ভায়োলিন বাদক ছিলেন। তার শিষ্য হওয়ার জন্য একদিন একজন যুবক তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন– মহাশয় ভায়োলিন শিখতে কত দিন লাগবে?’ গিয়ার্ডিন উত্তর দিলেন —’দিনে বারো ঘন্টা করে অভ্যাস করলে কুড়ি বছরে তুমি ভায়োলিনটা বাজাতে পারবে।’
মানুষের জীবনের লক্ষ্য যতই বড়ো হয়, ততই কঠোর এবং দীর্ঘ হয় তার পরিশ্রম। ঘাস যেমন দ্রুত বাড়ে তেমনি দ্রুত মরে। একটি বড়ো গাছ বা অশ্বত্থ গাছের চরম বৃদ্ধি হতে বহু বছর লাগে; কিন্তু সে বেঁচে থাকে বহু বছর। মানুষকে সতত এই কথা মনে রাখতে হবে যে কিছু না কিছু একটা দাম না দিয়ে সে এই পৃথিবীতে কোনো জিনিস পেতে আশা করতে পারে না। জীবনের যেকোনো কর্ম ক্ষেত্রে কৃতকার্যতার জন্য দিতে হওয়া দামটি হল কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়। বেশি কৃতকার্যতার জন্য বেশি দাম, কম কৃতকার্যতার জন্য কম দাম। সেই কথাটা এভাবে বলতে পারা যায় যে তুমি পুঁটি মাছ খেতে চাইলে পুঁটি মাছের দাম দিলেই হবে; কিন্তু রৌমাছ খেতে চাইলে তোমাকে রৌ মাছের দাম দিতে হবে। তুমি যদি কোনো মতে পেটে ভাতে খেয়ে জীবনটা শেষ করে দিতে চাও, তাহলে মাত্র কিছু সময় কাজ করে কাটিয়ে দিল তোমাকে কেউ বাধা নিষেধ করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যদি তুমি শারীরিক এবং মানসিক ভোগের অনেক উপকরণ আহরণ করে বেঁচে থাকার আনন্দ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে চাও, তাহলে তোমাকে তার জন্য যথেষ্ট দাম দিতে হবে কঠোর পরিশ্রমের রূপে।
জীবনের কিছু একটা লক্ষ্য ঠিক করে নিয়ে সেখানে উপনীত হতে চাওয়া মানুষকে প্রথমে যে সমস্ত গুণ আয়ত্ত করে নিতে হবে,সেইসবের মধ্যে তিনটি প্রধান গুণ হল ধৈর্য,অধ্যবসায় এবং পরিশ্রম শক্তি। কিন্তু এইসবের সঙ্গে আরও একটি গুণ যুক্ত হওয়া দরকার।সেটা হল একাগ্রতা।পাণ্ডব এবং কৌ্রবকে অস্ত্র-শিক্ষা দিয়েছিলেন দ্রোণাচার্য।শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পরে গুরু শিষ্যদের পরীক্ষা করার জন্য একটা দিন ঠিক করলেন।তিনি কৌরব এবং পাণ্ডবদের একটি গভীর অরণ্যের মধ্যে নিয়ে গেলেন।একটা বড়ো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি পরীক্ষার্থীদের একজন একজন করে ডেকে বললেন-‘গাছটির কোনো একটি ডালে একটি পাখি বসে আছে।তোমাকে ধনুকের তীর মেরে পাখিটার চোখদুটিকে বিদ্ধ করতে হবে।এখন তুমি গাছটার ওপরের দিকে মাথা তুলে তাকাও এবং কী দেখছ আমাকে বল।’বেশিরভাগই বলল যে তাঁরা গাছটি ,গাছটাকে ঘিরে থাকা লতাগুলি এবং ডালপাতাগুলি দেখতে পাচ্ছে;তারমধ্যে কেউকেউ পাখিটাকেও দেখছে।দ্রোণাচার্য ঘোষণা করলেন যে তাঁরা প্রত্যেকেই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে।তখনই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য কর্ণ এগিয়ে এল।তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে দ্রোণাচার্যকে বললেন যে তিনি গাছের বহু ওপরের একটা ডালে বসে থাকা একটা পাখি দেখতে পাচ্ছেন।কিন্তু কর্ণের উত্তরেও দ্রোণাচার্য সন্তুষ্ট হলেন না।একেবারে শেষে এল দ্রোণাচার্যের প্রিয়তম শিষ্য অর্জুন।তিনি ওপরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন—‘আমি অনেক ওপরে একটা পাখির দুটো চোখ দেখতে পাচ্ছি।তার বাইরে আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’
দ্রোণাচার্য অর্জুনকে সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর বলে ঘোষণা করলেন।
একেই বলে একাগ্রতা,অর্থাৎ একটি মাত্র লক্ষ্যে সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা কার্য।চারটি ঘোড়া যদি একটি রথ মাত্র একদিকে টানে,তাহলে রথটি সেই দিকে দ্রুতবেগে ধাবিত হবে।কিন্তু রথটি যদি চারটি ঘোড়া চারদিকে টানে,তাহলে রথটা কোনোদিকেই এগোতে পারবে না,বরং চারদিকের টানা হেঁচড়ায় সে অবশেষে ভেঙ্গে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কেও সেই একই কথা বলা যেতে পারে।মানুষ যদি যেকোনো একটা লক্ষ্যকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে নিয়ে কেবল সেই লক্ষ্য অভিমুখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে ,তাহলে একদিন না একদিন সে সেই লক্ষ্যে উপনীত হতে পারার আশা থাকে।কিন্তু তা না করে সে যদি একই সময়ে কয়েকটি লক্ষ্য অভিমুখে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে,বা মানসিক অস্থিরতার বশবর্তী হয়ে ঘন ঘন লক্ষ্য পরিবর্তন করে,একটাকে ছেড়ে অন্যটা ধরে,তাহলে সে কোনোদিকেই এগোতে পারে না,বরং তাঁর শক্তি সামর্থ্যের অনর্থক অপচয় হবে,এবং চারটি ঘোড়া চারদিকে টানা একটি রথের মতো তাঁর জীবনটিও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
একজন মানুষ হয়তো জীবনের একটি লক্ষ্য ঠিক করে নিয়েছে এবং অনেক সহজ গুণ আয়ত্ত করে সেই লক্ষ্য অভিমুখে এগিয়ে চলেছে।তথাপি তিনি লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবেনই ,বা কৃ্তকার্য হবেনই,তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।রোগ,আকস্মিক দুর্ঘটনা,জলের নিচের কাঁটার মতো নানা অদৃশ্য বাধা বিপত্তি-এইসব জীবনের পথে পদে পদে মানুষের চিন্তা-শক্তির পরীক্ষা করে।এই সমস্ত কিছু অতিক্রম করে বাঞ্ছিত লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য মানুষকে আয়ত্ত করতে হবে অপরাজেয় মনোবল।সেটা কীভাবে করা যেতে পারে তার একটা ছোটো উদাহরণ দিই।
ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পরে যে সমস্ত মহানুভব ইংরেজ মনীষী এই দেশে আধুনিক জ্ঞান-চর্চা এবং শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন উইলিয়ম কেরী।তিনি মূলত একজন ধর্ম-প্রচারক ছিলেন।এবং ভারতে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যেই তিনি এই দেশে এসেছিলেন।কিন্তু তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্র কেবল ধর্ম-প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখেন নি।ভাষাতত্ত্ব এবং উদ্ভিদ বিদ্যায় অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করা উইলিয়াম কেরী বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করা এবং করানোর দায়িত্ব নেওয়া ছাড়া ভারতীয় ভাষাগুলির ব্যাকরণ এবং এবং অভিধান প্রণয়ন করেছিলেন।একজন বিদেশি ইংরেজ হয়েও তিনি ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের বাংলা,মারাঠি এবং সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক।এইসব কিছু ছাড়াও তিনি ভারতের কৃ্ষি এবং উদ্ভিদের বিষয়েও কয়েকটি গবেষণা মূলক গ্রন্থ লিখে রেখে গেছেন।
উইলিয়াম কেরীর কর্মক্ষেত্র এত বিস্তৃত ছিল যে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসেও তাঁর নাম উল্লেখ করতে হয়েছে।ডঃমহেশ্বর নেওগ ‘অসমিয়া সাহিত্যের রূপরেখায় লিখেছেন-ই ডেনিয়েল পটছ তাঁর ‘ব্রিটিশ বেপ্টিস্ট মিসনারিজ ইন ইণ্ডিয়া’নামের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে ১৮০৩ সনে জগন্নাথে তীর্থ করতে গিয়ে ফিরে আসা ব্রাহ্মণ পন্ডিত একজনকে ডঃকেরী দেখা পাওয়ার পরে তিনি শ্রীরামপুরে বসবাস শুরু করেন।’এই ব্রাহ্মণ পন্ডিতই কলিয়াবরের আত্মারাম শর্মা হওয়ার সম্ভাবনা।গুণাভিরাম বরুয়া লিখেছেন-‘মানের দিনের পুর্বেই কলিয়াবরের আত্মারাম নামে একজন অসমিয়া ব্রাহ্মণ গিয়ে শ্রীরামপুরে বসবাস করছিলেন।তিনি সেখানে বিয়ে করেছেন,সন্তান সন্ততি হয়েছে।তিনি ছাপাখানার পন্ডিত ছিলেন।তাঁর সাহায্যে ডাক্তার কেরী পাদ্রি সাহেব প্রথমে অসমিয়ায় খ্রিষ্টানদের বাইবেল গ্রন্থ ছাপান।’
উইলিয়ম কেরী ছিলেন একজন দরিদ্র মুচির ছেলে।কঠোর সাধনা এবং পরিশ্রম করে তিনি সেই সাধারণ অবস্থা থেকে অনেক ওপরে উঠেছিলেন।তিনি যে ওপরে উঠবেনই তার প্রমাণ বাল্যকালেই পাওয়া গিয়েছিল।একদিন তিনি একটি বড়ো গাছে বেয়ে ওপরে উঠার চেষ্টা করছিলেন।গাছটার অর্ধেক উঠার পরেই পা পিছলে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন এবং তাঁর একটা পা ভেঙে গেল।তাকে কয়েক সপ্তাহ বিছানায় পড়ে থাকতে হল।কিন্তু যখন ভাঙা পা জোড়া লাগল এবং তিনি শরীরের শক্তি ফিরে পেলেন,তখন বিছানা থেকে উঠেই কেরী করা প্রথম কাজটা কী ছিল?
তিনি দৌড়ে গাছটার কাছে গেলেন এবং গাছটা বেয়ে একেবারে ওপরে উঠে গিয়ে ক্ষান্ত হলেন।

