
সভ্যতার সংকট ও দুহাজার ছাব্বিশ সব্যসাচী মজুমদার
১৯৪১ সনে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর — আমাদের জানা তথ্য। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ যে আমাদের সময়ের চিন্তা-চর্চার একটি স্মারক — আমাদের সন্দেহ নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত, বিদগ্ধ আলোচনা ইতিপূর্বে ঘটেছে। তবুও কেন সভ্যতার সংকট আরেকবার আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে — প্রশ্নটি সঙ্গত। এর কৈফিয়ত সম্ভবত তৈরি করা যাবে, এই আলোচনার উপসংহারেই।
সভ্যতার সংকট রচিত হচ্ছে বিগত শতকের চল্লিশের দশকের শুরুতে এবং রবীন্দ্রনাথের জীবনের একদম শেষ পর্বে। এই সময়ের অনতি ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই — একটি বিপুল বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হব আমরা। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব ঘটে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দ্রুত পৃথিবীর আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ দৃঢ় করছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা মার্ক্সিয় দর্শন তখন গোটা পৃথিবীর চিন্তাকে আচ্ছন্ন করেছে। ঘটে গেছে সোভিয়েত বিপ্লব। এবং এই বিপ্লবকে আমরা ফ্যাসিবাদের পতন চিহ্ন হিসেবে ধরি। অর্থাৎ আমরা যদি কথাটা এভাবে বলি যে, শতাব্দীর প্রথমাংশে হিউম্যানিজমের অন্যতম অংশ ফ্যাসিজমের পতন ঘটল এবং হিউম্যানিজমেরই আরে অংশ মার্ক্সিয় কমিউনিজমের উত্থান ঘটল। এই সময়ের জিও পলিটিক্স আমাদের জানা। ফলে এইটুকু স্মরণের পর আমরা অনায়াসে চলে আসতে পারি ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে। এবং এক্ষেত্রেও আমাদের খুব তথ্য ভারাক্রান্ত হতে হবে না। এবার আমরা যদি আমাদের মানচিত্রের দিকে লক্ষ করি — দেখব রাজতন্ত্র উপনিবেশের হাতে অবসৃত হওয়ার পর চল্লিশের দশকে এসে শুরু হয়েছে উপনিবেশের পতনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা। মূলত ন্যাশনালিস্ট আন্দোলন লড়াই করছে উপনিবেশের বিরুদ্ধে। ভারতে গড়ে উঠেছে কমিউনিস্ট পার্টি। তারা শ্রমিক – কৃষকদের সম্মিলিত করছে। এবং গাঢ় হয়ে উঠছে বিভাজনের ছায়া। যার অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বেই বাঙালির ঘটে গেছে।
এমন একটি সময়ে ভারত বর্ষের ইতিহাসের বিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক আলোচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন কিন্তু আর কর্ষণ আর কলের দ্বন্দ্ব নেই। শ্রম বিভাজন মিলে মিশে গেছে। পাট চাষের সঙ্গে সঙ্গে চটকলেরও কি ভীষণ দরকার, চটকলে শ্রমিকেরও দরকার — বুঝে গেছে ভারতীয় মানুষ। রবীন্দ্রনাথ সেই পর্বে লিখছেন সভ্যতার আশু সংকট ও সম্ভাবনার কথা।
কথাগুলো সম্পর্কে আলোচনার আগে আমরা আরেকটু মনে করে নিই, ১৮৯৩ সনে নিরুদ্দেশ যাত্রা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,
দেখালে সমুখে প্রসারি কর
পশ্চিম পানে অসীম সাগর,
চঞ্চল আনো আশার মতন
কাঁপিছে জলে।
তরীতে উঠিয়া শুধানু তখন
আছে কি হোথায় নবীন জীবন,
আশার স্বপন ফলে কি হোথায়
সোনার ফলে?
মুখপানে চেয়ে হাসিলে কেবল
কথা না বলে’!
কখনই পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি নিঃসন্দেহ হতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ।
এখন আমরা একটি অন্য প্রসঙ্গে চলে যাব। অন্য প্রসঙ্গ বলতে এই আলোচনার আবহ নির্মাণ করব। বিংশ শতকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার পতন ঘটল। উত্থান ঘটল অতঃপর ডেটাইজমের। কিরকম? শতকের শুরুতে আগেই বলা গেছে, কমিউনিজমের কাছে অবসন্ন হল ফ্যাসিজম। অতঃপর কমিউনিজম অবসন্ন হল লিবারেলিজমের ছায়ায়। বিংশের শেষ থেকে এবং একবিংশের শুরুতে প্রধান হয়ে দাঁড়াল ডেটাইজম। লিবারেলিজমের ভেতর থেকেই জন্মাল ডেটাইজম এবং আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপহার দিল। ঘটতে শুরু করল সোসাইটি ৫.০ । এবং এই সময়ে আমরা যদি অভিনিবেশ করি, দেখতে পাব,পেট্রোডলার ক্রমশ পতনশীল। ইরান যুদ্ধের পর দশাটা আরও চোখে পড়ছে। বিশ্বের ক্ষমতা এখন ধীরে এশিয়ার কুক্ষিগত হতে চলেছে। খুব সরলীকরণ না করেও আমাদের প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে আমরা একথা বলতেই পারি বোধহয়। অর্থাৎ ইউরোপ অতঃপর আমেরিকা ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে সরে যেতে পারে তাও আমরা বুঝতে পারছি। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন,
“আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটীরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই। ” ( সভ্যতার সংকট )
পূর্বেই আমরা এ কথা বলে নিয়েছি যে, যে সময়ে রবীন্দ্রনাথ এ কথা লিখছেন, সে সময় উপনিবেশের অবসান ঘটছে। এবং কমিউনিজমের উত্থান ঘটছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ ক্রান্তদর্শী হয়ে উঠেছিলেন — এ কথা বলে সরলীকরণ করব না। বরং খুঁজব যুক্তি। বস্তুত প্রায় একশো বছর পর জিও পলিটিক্স কোন দিকে মোড় নিতে চলেছে এবং যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিক নিষ্পত্তি — কোন যুক্তিতে রবীন্দ্রনাথ অনুমান করেছিলেন? এর কৈফিয়তে এভাবে বলা যেতে পারে, রবীন্দ্রনাথের গোটা চিন্তা প্রক্রিয়াটিই আমরা জানি আত্ম দ্বন্দ্বে পূর্ণ। প্রকৃত কবির স্বভাবে প্ররোচিত হয়েই রবীন্দ্রনাথ আজীবন নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, সন্দেহ করেছেন, নস্যাৎ করেছেন। অতঃপর পৌঁছে গেছেন আরেক দার্শনিক অবস্থানে। অর্থাৎ একটি ‘আত্মপ্রতিবাদের ঐক্য’ ( অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত) ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক ধারাকেও অনুসরণ করেই বুঝতে পেরেছিলেন কবি— ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিশ্বের শক্তি কেন্দ্রকে বিবর্তিত করবে। ইতিহাস আমাদের জানায় একটি উপনিবেশ তখনই স্থায়ীত্ব পায়, যখন তার চিন্তার নবীনতা বজায় থাকে। নচেৎ জোর করে শ্রেষ্ঠত্ব বা উপনিবেশ ধরে রাখতে গেলে ব্যবহার করতে হয় পেশী শক্তি। এবং যার ব্যবহার পতনের পথই সুগম করে সাধারণ মানুষের অসূয়া বৃদ্ধি করে।
রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করে আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন সভ্যতার স্বভাবের কথা। একটি অধ্যায়ের গড়ে ওঠা ও তার ক্ষয়ে যাওয়ার কথা। তবে এই প্রবন্ধের প্রধান অবলম্বন অবশ্যই অনতি ইতিহাস। অর্থাৎ ইংরেজ আগমনের পর থেকে ভারতীয় সমাজ সভ্যতার উত্থান-পতনকে নির্ণয় করেছেন রবীন্দ্রনাথ
“বৃহৎ মানববিশ্বের সঙ্গে আমাদের প্রত্যক্ষ পরিচয় আরম্ভ হয়েছে সেদিনকার ইংরেজজাতির ইতিহাসে। আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে উদঘাটিত হল একটি মহৎ সাহিত্যের উচ্চশিখর থেকে ভারতের এই আগন্তুকের চরিত্রপরিচয়। তখন আমাদের বিদ্যালাভের পথ্যপরিবেশনে প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য ছিল না। এখনকার যে বিদ্যা জ্ঞানের নানা কেন্দ্র থেকে বিশ্বপ্রকৃতির পরিচয় ও তার শক্তির রহস্য নতুন নতুন করে দেখাচ্ছে তার অধিকাংশ ছিল তখন নেপথ্যে অগোচরে।”
তবে এ কথা কতটা প্রশ্নাতীত — এ বিষয়েও আমাদের কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকে। হ্যাঁ শিল্প বিপ্লবাতীত পৃথিবী যে ইংরেজ আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্পর্শ করেছে — এ বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নেই। আবার এই বিষয়েও সন্দেহ নেই যে, বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে ভারত ভূখণ্ডের যথেষ্ট সম্পর্ক ছিল ইতিপূর্বের পৃথিবীতে। এবং তা কখনও ভারতবর্ষের নিজের তাগিদে, কখনও ব্যবসা অথবা উপনিবেশের প্ররোচনায়। কিন্তু, ঘটেছে। এখন, এই শিল্প বিপ্লবের পরের পৃথিবী যে প্রায়োগিক বিবর্তন ঘটিয়েছিল, তার সঙ্গে সম্পর্ক সত্যিই ছিল না আমাদের ভারতের এবং আমরা বোধহয় একমত হব যে, আমাদের উনবিংশ শতকের ইতিহাস ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা নির্মাণে ক্ষেত্রে ইংরেজ অবশ্যই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এবং এ কথাও ঠিক ইংরেজ কিন্তু এই আদান-প্রদানে খুব আগ্রহী ছিল না। বরং ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মন যুগিয়ে চলতেই স্বস্তি পেত। এ কথার সাক্ষ্য দেয় শিবনাথ শাস্ত্রী প্রণীত ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’। তবে সঙ্গে সঙ্গে আমরা এও মানব যে তৎকালীন চিন্তা চর্চায় ইউরোপ ও ইংরেজ সক্রিয় ও প্রায়োগিক ছিল — তার অভিঘাত অবশ্যই ভারতীয় মনস্তত্ত্বকে স্পর্শ ও উজ্জীবিত করেছিল। উদ্ধৃত অংশে যখন রবীন্দ্রনাথ ‘এখনকার’ শব্দটি ব্যবহার করলেন, প্রনিধান যেন যাথার্থ্য পেল। শিল্পবিপ্লবের পরের পৃথিবীতে ভারত বর্ষ ইংরেজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক হয়েছে। বস্তুত পক্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্য দুশো বছর ধরে বিস্তার পেয়েছিল নিশ্চিতভাবেই তার চিন্তা ও বাণিজ্য সাম্রাজ্যের কারণে। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের উপুর্যপরি সাধনা ও ঘটমান চর্চা পশ্চিমকে প্রধান নির্ধারক শক্তি করে তুলেছিল। তাদের অস্ত্র সমৃদ্ধিই সব কথা বলেনি। কখনও বলতে পারে না।
অতঃপর ইতিহাসের সূত্রেই আমরা জানি ধীরে ক্ষমতা বলয়ের রূপ বদলাতে শুরু করে। অন্তত দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই ক্ষমতার এই বিবর্তনকে আমরা বুঝতে পারছিলাম। আমরা এও বুঝতে পারছিলাম যে, ইউরোপিয় মানচিত্রের বাইরে দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ক্রমশ প্রাধান্য আদায় করে নিচ্ছে। একটি রাশিয়া এবং আরেকটি আমেরিকা। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এশিয়ার জাপান এবং চিনও একটি বিকল্পের ধারণা দিচ্ছে। সে কথা আমরা সভ্যতার সংকটে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ হিসেবেই পাচ্ছি,
“ইংরেজ এই পরজাতীয়ের পৌরুষ দলিত করে দিয়ে তাকে চিরকালের মতো নির্জীব করে রেখেছে। সোভিয়েট রাশিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রিক সম্বন্ধ আছে বহুসংখ্যক মরুচর মুসলমান জাতির। আমি নিজে সাক্ষ্য দিতে পারি, এই জাতিকে সকল দিকে শক্তিমান করে তোলবার জন্য তাদের অধ্যবসায় নিরন্তর। সকল বিষয়ে তাদের সহযোগী ক’রে রাখবার জন্য সোভিয়েট গভর্নমেণ্টের চেষ্টার প্রমাণ আমি দেখেছি এবং সে-সম্বন্ধে কিছু পড়েছি। এইরকম গবর্নমেণ্টের প্রভাব কোনো অংশে অসম্মানকর নয় এবং তাতে মনুষ্যত্বের হানি করে না। সেখানকার শাসন বিদেশীয় শক্তির নিদারুণ নিষ্পেষণী যন্ত্রের শাসন নয়। “( সভ্যতার সংকট)
একই সঙ্গে এ কথারও ইঙ্গিত রবীন্দ্রনাথ দিয়ে রাখলেন যে, উপনিবেশের ধারণা পাল্টাচ্ছে। ইংল্যান্ড ও ইউরোপ তাদের উপনিবেশ ধরে রাখার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছে তা মানবিকতার চর্চা থেকে বহুদূরের বিষয়। বরং রাশিয়া তুলনামূলকভাবে মানবিক হয়ে উঠতে পেরেছে বলে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। আর এই মানবিকতার গভীর চর্চাই রাশিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করছে।
এখন এই ‘মানবিকতা’ শব্দটিকে লক্ষ করলে আমাদের মনে পড়বে যে মানব সংক্রান্ত যে কোনও চিন্তাই মানবিকতার অন্তর্গত। যেমন ফিউডালিজম, কলোনিয়ালিজম বা ফাসিজমও কিন্তু মানব সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়। অর্থাৎ আমরা এভাবে যদি দেখি, রবীন্দ্রনাথ এক্ষেত্রে কলোনিয়ালিজমের একধরনের রূপের অবসান যখন ইঙ্গিত করছেন, একইসঙ্গে কলোনিয়ালিজমের আরেকটি বিবর্তিত রূপের পক্ষেই সওয়াল করছেন। কমিউনিজমকে সম্ভবত এক্ষেত্রে ইঙ্গিত করতে চাইছেন ও তার বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতার বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছেন! কলোনিয়ালিজমকে ধরে রাখতে গেলে কমিউনিজমের ওপর নির্ভর করতে হবে ? তবে এ কলোনির ধারণা আসছে একটি বিবর্তিত রূপের ওপর নির্ভর করে। তার অবয়ব আর নির্দিষ্ট মানচিত্রের ওপর নির্ভর করবে না। এখন চিন্তার উপনিবেশ তৈরি হবে। মানচিত্রহীন কমিউনিস্ট পৃথিবীর কথা ভেবেছিলেন কমিউনিস্টরা। এটাও কিন্তু একধরনের কলোনির প্রবণতা — আমরা কি অস্বীকার করতে পারি ? তবে বিকল্প কলোনি। অস্ত্র বিজয়ের, অন্য মানচিত্রে প্রবেশের সেই হিংসাত্মক রূপ এখন ধারণ করবে শান্ত মূর্তি, কুহক মূর্তি। কালক্রমে পেট্রো ডলারের উত্থান, ক্রিপ্টো কারেন্সির বাজার দখলের পর, ইরান যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে ক্রমে পেট্রো ডলারের পতনমুখীতা আমাদের বুঝিয়ে দেয় কলোনির বহু মাত্রিক স্বভাবের অবয়ব। আমরা বস্তুত বুঝতে পারি গণতন্ত্র একটি বৃহত্তর সাপেক্ষে চাপিয়ে দিচ্ছে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের রূপ। আর এই জটিল ও উত্তেজনার পরিস্থিতিকে রবীন্দ্রনাথ কি স্পষ্ট আন্দাজ করেছিলেন? হয়তো নয়। কিন্তু, এটা বুঝতে পেরেছিলেন ক্ষমতা দ্বন্দ্ব নির্মাণ করবেই আর সেই দ্বন্দ্বের অভিঘাত তার লক্ষ এবং লক্ষণকে ভিন্ন মাত্রা দেবে। এবং সেই মাত্রা আপাতত তৈরি করবে গণতন্ত্র। এখন এই গণতন্ত্রে কিন্তু কিছু প্রশ্ন থাকে। একদম মৌলিক প্রশ্ন। গণতন্ত্র মানুষের তথ্যের অধিকারকে ব্যহত করে। এবং বিরোধীর মাধ্যমে একটা সেল্ফকারেক্টিং সিস্টেম তৈরি করে। ফলে গণতন্ত্র মানুষের মুক্তির জন্য কতটা উপযোগী এবং লিবারেলিজম কতটা এগিয়ে কথা বলতে চাইছে — এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। এবং এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই লিবারেলিজম ধীরে ডেটাইজমের ভেতরে নির্বাণ পায়।
এখন আমরা যদি এই ডেটাইজমকে খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করি, একটি বিষয় সবার আগে আমাদের গোচরে আসবে, তা হল — ডেটাইজম আসলে চর্চার বহুমুখী পথকে খুলে দিতে চাইছে। এরফলে বহুস্তরিক সমাজ তার পূর্ণ উচ্চাবচ রূপ পাচ্ছে। দীর্ঘ দিন কালীন কোনও মত বা পথের প্রতিষ্ঠান এখন বোধহয় আর সম্ভব নয়। কেন নয়? তথ্যের মুক্তির কারণেই একটি বিষয়ের সমান্তরাল অনেক তথ্য একইসঙ্গে মানুষের কাছে মজুদ। সে সন্দেহ, প্রশ্ন করার অবকাশ পাচ্ছে। এবং সেই অবকাশ নিঃসন্দেহে একটি চিন্তার স্বরাট হয়ে ওঠাকে রদ করছে সম্ভবত।
কিন্তু এই ডেটার চর্চা এবং ব্যবহার নৈপুণ্যই পারে একটি চিন্তা বা মতকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে। ডেটা বলতে কি কেবল মাত্র তথ্য বলতে যা বুঝি তাই? একটি ঘটমান জগতের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে, প্রতিটি বিষয়ের বিবর্তনের ধারণাকেই আসলে তুলে ধরে ডেটা। এই ধারণাকে অর্জন যে যত বেশি করতে পারবে — তার সাফল্যের উপায় ততটাই — এমন একটা সরলীকরণ করলে খুব আপত্তির হয় না বোধহয়। যেমন ইরান জানত আমেরিকা আর ইসরায়েলের ক্ষমতা ও অস্ত্র সম্পর্কে। আমেরিকা ইসরায়েল জানতো ইরান পরমাণু শক্তিধর দেশ নয়। তারা এও জানত যে আমেরিকা ইসরায়েল পরমাণু ক্ষমতাধর দেশ। কিন্তু আমেরিকা- ইসরায়েল জানত না ইরান শব্দ শক্তিকে ব্যবহার করছে। দ্রুতি বেগের বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ইরান নাস্তানাবুদ করল পরমাণু শক্তিধর দুটো দেশকে। অর্থাৎ তথ্য চর্চা জরুরি। আমেরিকা ক্ষমতার চূড়ায় ওঠার পর আর নিজেকে খতিয়ে দেখার ততটা প্রয়োজন বোধ করেনি। যতটা বোধ করেছে ইরান। আর করেছে বলেই একটা যুদ্ধেই পেট্রোডলারের সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিতে পেরেছে। ঠিক এই সূত্রটিকেই রবীন্দ্রনাথ হয়তো বলতে চেয়েছেন, চর্চার সূত্র,
“আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি—পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ! কিন্তু, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। “( সভ্যতার সংকট)
কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ কেন পূর্বকেই আগামী সভ্যতার বাহক বলে মনে করে নিলেন ? এখানেই আমাদের দেখা হয় ন্যাশনালিস্ট রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে,
“ভারতবাসী যে বুদ্ধিসামর্থ্যে কোনে অংশে জাপানের চেয়ে ন্যূন, এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই দুই প্রাচ্যদেশের সর্বপ্রধান প্রভেদ এই, ইংরেজশাসনের দ্বারা সর্বতোভাবে অধিকৃত ও অভিভূত ভারত, আর জাপান এইরূপ কোনো পাশ্চাত্য জাতির পক্ষছায়ার আবরণ থেকে মুক্ত। “( সভ্যতার সংকট)
এ কথা আমাদের কাছে গোপন নয় যে, রবীন্দ্রনাথ সবসময়ই চেয়েছিলেন অ্যাসিমিলেসন। কেবল পাশ্চাত্য বা সদ্যাগত চিন্তার অনুগমন নয়, বরং, ভারতীয়ত্বের সঙ্গে আগত চিন্তার মিলন ঘটুক — চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নতুন স্থাপত্যের ভিত হিসেবে ভারতীয় সঙস্কৃতির উপাদনকেই চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আশা বা কাঙ্খা শেষ কথা নয়। মানুষ তারপরেও নিজের মতো করে ভেবেছে। কিন্তু, এটাও বোধহয় ঠিক, যে, ভারতীয়ত্বের থেকে বহুদূর সরে গিয়ে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত চেয়েছে আধুনিকতাকে নির্মাণ করতে। যদিও দু’হাজার পরবর্তী ভারতবর্ষে আবার ভারতীয়ত্বের দাবি ফিরে এসেছে। মানচিত্রের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর সঙস্কৃতির লালন এক বিষয় নয়। রবীন্দ্রনাথের ভারতীয়ত্ব সম্ভবত তাঁর সঙস্কৃতির ঐতিহ্য থেকেই উদ্ভুত।আর সেখানেই সওয়াল করেন রবীন্দ্রনাথ। ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে মিশুক আন্তর্জাতিক চিন্তা।
এই কথার সূত্র ধরেই আমরা ফিরে যাব আবার প্রথম প্রসঙ্গে, অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের দর্শন এই সময়কেও কিভাবে যাথার্থ্য দিচ্ছে। সেই কৈফিয়ৎটি। সভ্যতার সংকট কেন এখনও প্রাসঙ্গিক? পেট্রো ডলারের পতন ঘটছে। বদলে অহিফেন আক্রান্ত সেই দারিদ্র্য লাঞ্ছিত চিনের টাকা এখন সার্বভৌম হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় কথা, দুহাজার পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষ বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে খুব বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সাফল্যও পেয়েছে। চাঁদে পৌঁছে গেছে ভারত। এটা বালখিল্য পদক্ষেপ নয়। এই মুহূর্তে পৃথিবীর চিন্তা ও চর্চা ধীরে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্ভর হয়ে পড়ছে। হিলিয়াম থ্রি-র প্রয়োজন ক্রমশ বাড়ছে। তাছাড়া বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের থেকে অনেক বেশি নিরাপদ ও উপযোগী এই হিলিয়াম থ্রি। এখন আমরা সকলেই জানি যে, পৃথিবীতে যতটুকু হিলিয়াম থ্রি পাওয়া যায় তা দরকারের চেয়ে সামান্য। চাঁদ হিলিয়াম থ্রি-র ভাণ্ডার মজুদ রেখেছে। এরপর চাঁদ থেকে হিলিয়াম থ্রি যে দেশ যত বেশি আনতে পারবে, সম্ভবত তার হাতেই থাকবে পৃথিবীর অর্থনৈতিক রাশ। এবং সেদিকে ভারত অন্যান্য দেশের থেকে কিছুটা এগিয়ে গেছে। তাছাড়া নব্বই পরবর্তী ভারত ধীরে একটা বড় সুপার মার্কেট হয়ে উঠেছে এবং ভারতের ওপর পৃথিবীর বাজারের অনেকটা অংশ নির্ভর করে — আমাদের জানা। জাপান অনেক দশক এগিয়ে রয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহারে। ইতিমধ্যেই ৫.০ সোসাইটি জাপানে সক্রিয়। ইরান সনিক ক্ষমতায় হার মানিয়েছে সুপার পাওয়ারকে। প্রাচ্য যে পৃথিবীর রাশ দখল করছে — আমাদের সন্দেহ সেক্ষেত্রে এখন সামান্যই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝেছিলেন ইতিহাসের গতিসূত্রটিকে এবং ইতিহাসের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলিকে। বুঝেছিলেন বলেই হয়তো সভ্যতার সংকট এখনও প্রাসঙ্গিক। নিরন্তর চর্চা আর বিবর্তনই ক্ষমতার সৃষ্টি করে।

