আলো যেখানে কম একটি টেক্সটের জন্ম ও পাঠের যৌথ জীবনী ফিকশনের লেখা, পাঠ ও চিন্তা নিয়ে  লেখামালা | প্রথম কিস্তি | জুলাই ২০২৬   অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

আলো যেখানে কম একটি টেক্সটের জন্ম ও পাঠের যৌথ জীবনী ফিকশনের লেখা, পাঠ ও চিন্তা নিয়ে লেখামালা | প্রথম কিস্তি | জুলাই ২০২৬ অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্পাদকীয় নোট একটি টেক্সটেরও জীবন আছে। তার জন্ম আছে, নীরবতা আছে, পাঠ আছে, এমনকি তার পুনর্জন্মও আছে। সেই জীবনকে অনুসরণ করার এক দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা শুরু হচ্ছে আবহমান-এর এই সংখ্যা থেকে। অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন লেখামালা ‘আলো যেখানে কম’ ফিকশনের লেখা, পাঠ ও চিন্তার নানা দিক নিয়ে এগারোটি গদ্যে ক্রমান্বয়ে নির্মিত হবে। একটি বাক্য, একটি দৃশ্য, একটি কণ্ঠস্বর, একটি দৃষ্টি কিংবা একটি নীরবতাকে কেন্দ্র করে এই লেখাগুলি টেক্সটের নির্মাণ ও অর্থ-সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে ভাবতে আহ্বান জানাবে। আগামী এগারো মাস ধরে প্রতি মাসে একটি করে গদ্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে আবহমান-এ। আজ শুরু হল ‘আলো যেখানে কম’-এর যাত্রা।

আলো যেখানে কম
একটি টেক্সটের জন্ম পাঠের যৌথ জীবনী
ফিকশনের লেখা, পাঠ চিন্তা নিয়ে

লেখামালা | প্রথম কিস্তি | জুলাই ২০২৬

 

আলো যেখানে কম: একটি সূচনা

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হল, আমাদের শেখানো হয় কী পড়তে হবে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই শেখানো হয় কীভাবে পড়তে হবে। লেখকের নাম, সাহিত্য-ইতিহাস, কাহিনি, চরিত্র, এমনকি পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসতে পারে, সেসব আমরা শিখি; কিন্তু একটি টেক্সট কীভাবে খুলতে হয়, কীভাবে তার ভাষা কাজ করে, কীভাবে একটি বাক্য নিজের অর্থ তৈরি করে, কীভাবে নীরবতা, পুনরাবৃত্তি, ছন্দ, বস্তু, দৃষ্টিকোণ কিংবা ফর্ম ধীরে ধীরে একটি অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়, সেই শিক্ষা আমাদের প্রায় নেই। ফলে অধিকাংশ পাঠ গল্প জানার মধ্যেই থেমে যায়; টেক্সটের সঙ্গে তার সত্যিকারের সাক্ষাৎ আর ঘটে না।

অবনীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ছিল, আমাদের দেশে ছবি দেখতে শেখানো হয় না। কথাটি চিত্রকলা নিয়ে বলা হলেও, সাহিত্য সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। একটি টেক্সটের বিষয়বস্তু নয়, তার নির্মাণকে কীভাবে লক্ষ করতে হয়, সেই শিক্ষার অভাবই আমাদের সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু এই লেখামালা সেই অভাব পূরণ করার জন্য লেখা নয়। অন্তত এখন আর আমি তা মনে করি না। লিখতে লিখতে বুঝেছি, এটি আসলে পাঠ শেখানোরও প্রকল্প নয়; বরং একটি টেক্সট কীভাবে জন্ম নেয়, কীভাবে বাঁচে, এবং কীভাবে একজন পাঠকের ভেতরে এসে আবার নতুন করে জন্মায়, তার যৌথ জীবনী। একটি বাক্য লেখকের কাছে কী, পাঠকের কাছে কী, সময়ের কাছে কী—এই তিনটি প্রশ্ন বারবার একে অপরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলে লেখামালাটিও ধীরে ধীরে নিজের প্রকল্প বদলে ফেলেছে। আমি সেই পরিবর্তনের বিরোধিতা করিনি। কারণ কোনও লেখাই শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ লেখকের পরিকল্পনা অনুসরণ করে না; অনেক সময় সে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে।

এই লেখামালার পথে হাঁটতে হাঁটতে আমার নিজের কাছেও একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। শুরুতে ভেবেছিলাম, এটি ক্লোজ রিডিং নিয়ে একটি ধারাবাহিক হবে। অর্থাৎ একটি টেক্সটকে শব্দে শব্দে, বাক্যে বাক্যে, তার নির্মাণের ভেতরে প্রবেশ করে পড়ার একটি শিল্প, পদ্ধতি ও অনুশীলন। কিন্তু লিখতে লিখতে বুঝলাম, ক্লোজ রিডিং আমাদের যাত্রার শুরু হতে পারে, শেষ নয়। কারণ একটি বাক্যকে যত গভীরভাবে পড়ি, ততই দেখি সে তার নিজের সীমানা ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। কখনও লেখকের জীবনের দিকে, কখনও অনুবাদের দিকে, কখনও চিত্রকলা, সংগীত বা সিনেমার দিকে, কখনও পাঠকের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার দিকে। একটি বাক্যের ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েই আমরা তার বাইরের জগতে পৌঁছে যাই।

এই কারণেই এই লেখামালা ক্লোজ রিডিংয়ের কোনও পদ্ধতি-পুস্তক নয়। এখানে ক্লোজ রিডিং একটি সূচনা, একটি দৃষ্টি, একটি শৃঙ্খলা। কিন্তু সেই শৃঙ্খলা আমাদের বারবার নিজের সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করে। কারণ কোনও টেক্সট একা জন্মায় না, একা পড়াও যায় না। তার জন্মে যেমন ভাষা, ইতিহাস, শিল্প, লেখকের অভিজ্ঞতা ও সময় জড়িয়ে থাকে, তেমনি তার পাঠেও জড়িয়ে থাকে আর-একটি জীবন—পাঠকের। ফলে একটি টেক্সটের জীবন সবসময়ই যৌথ।

এই লেখামালার প্রথম আহ্বান তাঁদের প্রতি, যাঁরা এখনও একটি বাক্যের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হতে পারেন। তাঁরা লিখুন বা পড়ুন, তাতে বিশেষ পার্থক্য নেই। কারণ গভীর পাঠ একসময় লেখার দিকে নিয়ে যায়, আর গভীর লেখা শুরু হয় গভীর পাঠ থেকেই। যাঁদের মনে হয়, একটি সাহিত্যকর্মের ভেতরে গল্পের চেয়েও বেশি কিছু আছে, অথচ সেই ‘বেশি’-র কাছে পৌঁছনোর পথটি এখনও স্পষ্ট নয়, এই লেখামালা তাঁদের জন্য।

প্রতি মাসে একটি করে গদ্য প্রকাশিত হবে। এগুলি শেষ পর্যন্ত একত্রে (হয়ত) একটি বইয়ের রূপ নেবে। কিন্তু তার আগে, এগুলি পাঠকের সামনে তাদের প্রথম জীবন কাটাবে—একটি চলমান সংলাপ হিসেবে।

 

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
কোচবিহার

 

 

একটি বাক্য

 

একটি উপন্যাসের প্রথম বাক্য লেখকের প্রথম সিদ্ধান্ত। প্রথম বাক্য পরীক্ষাগার।

কথাটা গ্যাবরিয়েল গারসিয়া মারকেসের। প্লিনিও আপুলেইও মেনদোসাকে তিনি বলেছিলেন, একটি উপন্যাসের প্রথম বাক্য লিখে ফেলতে পারলেই তিনি বুঝতে পারেন, এই লেখার ভাষার গতি কী হবে, লেখাটি কত দূর যাবে, এমনকি মোটামুটি কত বড় হবে। অর্থাৎ প্রথম বাক্য লেখকের কাছে কোনও শুরু নয়; সেটিই সমগ্র লেখার পরীক্ষাগার। এখানেই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন, এই লেখা তার নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছে কি না।

পাঠকের কাছেও প্রথম বাক্যের গুরুত্ব কম নয়। অথচ আমরা অধিকাংশ সময় প্রথম বাক্যকে পড়ি খুব তাড়াহুড়ো করে। মনে করি, গল্প এখনও শুরু হয়নি। আসল ঘটনা সামনে। তাই প্রথম বাক্য পেরিয়ে আমরা যত দ্রুত সম্ভব দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ পাতায় পৌঁছতে চাই। অথচ একজন মনোযোগী পাঠক জানেন, একটি ভালো উপন্যাসের প্রথম বাক্যের মধ্যে প্রায়শই পুরো উপন্যাসের বীজ লুকিয়ে থাকে। ভাষা, ছন্দ, বর্ণনাকারী, দৃষ্টিকোণ, সময়বোধ, এমনকি লেখকের নৈতিক অবস্থানও অনেক সময় প্রথম বাক্যের মধ্যেই নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দেয়।

এই কারণেই কোনও উপন্যাস পড়ার সময় আমি সবসময়েই প্রথম বাক্যের কাছে ফিরে আসি। উপন্যাস শেষ হওয়ার পর আবার প্রথম বাক্যটি পড়ি। বিস্ময়ের বিষয়, দ্বিতীয়বার পড়লে সেই একই বাক্য আর আগের মতো থাকে না। কারণ তখন আমরা জানি, সামনে কী আছে। ফলে প্রথম বাক্যটিও নতুন অর্থে খুলে যেতে শুরু করে।

কিন্তু প্রথম বাক্যকে এত গুরুত্ব দেওয়া কেন? একটি উপন্যাসের প্রথম বাক্যকে আমরা কি একটু বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না? ধরা যাক, কোনও পাঠক ভুল করে প্রথম পাতাটিই ছিঁড়ে ফেললেন। তাহলে কি উপন্যাসটি আর পড়া যাবে না? নিশ্চয়ই যাবে। তাহলে প্রথম বাক্যের এই বিশেষ মর্যাদা কোথা থেকে আসে? প্রশ্নটি আমার কাছে বহুদিনের। একসময় ভাবতাম, প্রথম বাক্যের গুরুত্ব বোধহয় তার অবস্থানের জন্য। সে প্রথমে আসে বলেই গুরুত্বপূর্ণ। পরে বুঝলাম, বিষয়টি এত সহজ নয়। প্রথম বাক্য শুধু আগে আসে না, সে পরের সমস্ত বাক্যের অপেক্ষাও করে। উপন্যাস শেষ হওয়ার পরেও সে বদলে যায়। অর্থাৎ প্রথম বাক্যকে আমরা কোনওদিনই প্রথমবার পড়ি না। দ্বিতীয়বার পড়লে সে অন্য বাক্য। তৃতীয়বার পড়লে আরও অন্য।

একটি সেতারের আলাপের কথা ভাবুন। প্রথম কয়েকটি স্বর শুনেই কি একজন অভিজ্ঞ শ্রোতা বুঝতে পারেন না, আজ রাগটি কোন দিকে যেতে পারে? অবশ্যই পারেন। কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎবক্তা নন। তিনি শুনতে শুনতে একটি সম্ভাবনার জন্ম হতে দেখেন। প্রথম স্বরটি তাই শেষ স্বরের নিশ্চয়তা নয়; বরং তার সম্ভাবনা।

উপন্যাসের প্রথম বাক্যও কি তেমন? আবার চিত্রকলার দিকে তাকানো যাক। একজন চিত্রকর ক্যানভাসে প্রথম যে রেখাটি টানলেন, সেটি পরে হয়তো আর দেখা যাবে না। তার ওপর আরও দশটি স্তর পড়বে। রং বদলাবে। কোথাও কোথাও প্রথম রেখাটি সম্পূর্ণ ঢেকেও যাবে। তবু সেই অদৃশ্য রেখাটি কি ছবির ভেতরেই থেকে যায় না? শেষ ছবিটির ভারসাম্য কি তার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে না?

তাহলে প্রথম বাক্যও কি তেমন একটি অদৃশ্য রেখা? এই প্রশ্নগুলি আমাকে বারবার সাহিত্য থেকে অন্য শিল্পের দিকে নিয়ে যায়। কারণ সাহিত্য একা জন্মায় না। একজন লেখক যখন লিখছেন, তিনি তাঁর সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন তাঁর দেখা ছবিগুলো, শোনা সুরগুলো, হাঁটা রাস্তাগুলো, এমনকি যে ভাষায় তিনি স্বপ্ন দেখেন, সেটিও।

হয়তো সেই কারণেই একটি বাক্যকে শুধু ব্যাকরণ দিয়ে পড়া যায় না। আবার অন্য একটি প্রশ্ন করা যাক। প্রথম বাক্যটি কি লেখক লেখেন, না উপন্যাস লেখায়? প্রশ্নটা অদ্ভুত শোনাতে পারে। কিন্তু অনেক লেখকই বলেছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন একটি প্রথম বাক্যের জন্য অপেক্ষা করেছেন। সেই বাক্যটি না আসা পর্যন্ত লেখা শুরুই করতে পারেননি। যেন প্রথম বাক্যটি কোনও চাবি নয়, বরং একটি দরজা। দরজাটি না খুললে ঘরে ঢোকাই যায় না।

তাহলে কি প্রথম বাক্য লেখকের সিদ্ধান্ত? নাকি লেখকের আত্মসমর্পণ? আরও একটি বিষয় আমার কৌতূহল জাগায়। আমরা প্রায় সবাই কোনও উপন্যাসের শেষ বাক্য নিয়ে কথা বলি। প্রথম বাক্য নিয়ে এত কম কথা বলি কেন? শেষ বাক্য আমাদের মনে থাকে, কারণ তখন গল্প শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রথম বাক্য? আমরা কি সত্যিই তাকে মনে রাখি? নাকি তাকে ব্যবহার করি, তারপর ভুলে যাই?

এই লেখায় আমি একটু উল্টো পথে হাঁটতে চাই। গল্পে ঢোকার আগে দরজাটার কাছে একটু দাঁড়াতে চাই। কারণ দরজা পেরিয়ে সবাই যায়। কিন্তু খুব কম মানুষ ফিরে এসে দেখে, দরজাটি আসলে কেমন ছিল।

হয়তো আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করা দরকার। প্রথম বাক্য কি সত্যিই একা থাকে? আমরা তাকে প্রথম বলি, কারণ সে প্রথমে লেখা। কিন্তু সে কি সত্যিই প্রথম? তার আগে কি লেখকের দীর্ঘ নীরবতা নেই? দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি নেই? বহু বছর ধরে জমে থাকা দৃশ্য, স্মৃতি, অপমান, প্রেম, ব্যর্থতা, পাঠ, বিস্ময়—এসব কিছু কি তার আগেই সেখানে এসে জড়ো হয় না? তাহলে প্রথম বাক্য কি সত্যিই প্রথম? নাকি বহু বছরের অদৃশ্য ইতিহাসের প্রথম দৃশ্যমান চিহ্ন?

লেখক যখন প্রথম বাক্যটি লিখছেন, তখন তিনি কি সামনে এগোচ্ছেন, না পিছনে ফিরে তাকাচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোর কোনও নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো আমাদের লেখকের টেবিলের দিকে নিয়ে যায়। একটি উপন্যাস শেষ হয়ে গেলে আমরা তার ফল দেখি। কিন্তু প্রথম বাক্যের কাছে দাঁড়ালে আমরা নির্মাণের মুহূর্তটিকে দেখতে পাই। সেখানে এখনও কিছু স্থির হয়নি। সবকিছু সম্ভাবনা।

স্থাপত্যের কথা ভাবুন। একটি বাড়ির ভিত্তি মাটি খুঁড়ে ফেলার পরে আর চোখে পড়ে না। অতিথিরা কেউ ভিত্তি দেখতে যান না। তাঁরা বসার ঘর দেখেন, জানলা দেখেন, বারান্দা দেখেন। অথচ গোটা বাড়িটাই দাঁড়িয়ে থাকে সেই অদৃশ্য অংশটির ওপর। একটি প্রথম বাক্যও কি তেমন? উপন্যাসের যত পাতা আমরা পড়ি, তারা কি কোনও না কোনওভাবে সেই প্রথম বাক্যেরই সম্প্রসারণ?

আবার উল্টো প্রশ্নও করা যায়। এমন কি হতে পারে, লেখক প্রথম বাক্যটি লিখলেন, তারপর উপন্যাস যত এগোল, সেই প্রথম বাক্যই ধীরে ধীরে ভুল প্রমাণিত হতে লাগল? অর্থাৎ উপন্যাস নিজেই তার প্রথম সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াল?

এমনও তো হয়। জীবনে যেমন হয়। আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে পথ চলা শুরু করি। দশ বছর পরে ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেই প্রথম সিদ্ধান্তটির অর্থই বদলে গেছে। উপন্যাসও কি নিজের জীবনের মধ্যে দিয়ে যায় না?

এই কারণেই আমার মনে হয়, প্রথম বাক্যকে কখনও আলাদা করে পড়া যায় না। তাকে পড়তে হয় অন্তত দু’বার। একবার উপন্যাসে প্রবেশ করার আগে, আর-একবার উপন্যাস থেকে বেরিয়ে আসার পরে। এই দুই পাঠের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটিই আসলে পাঠকের অর্জন।

এখানে এসে আর-একটি বিষয় মনে পড়ে। আমরা যখন কোনও মানুষকে প্রথম দেখি, সেই প্রথম দেখাটিই কি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে? নাকি দীর্ঘ পরিচয়ের পরে সেই প্রথম সাক্ষাৎও নতুন অর্থ পায়? বহুদিনের বন্ধুর সঙ্গে প্রথম আলাপের কথাটি কি পঞ্চাশ বছর পরে একইরকম মনে হয়? মনে হয় না। কারণ স্মৃতি কখনও অতীতকে সংরক্ষণ করে না; তাকে পুনর্লিখন করে। একটি উপন্যাসও কি আমাদের স্মৃতির মধ্যে ঠিক এভাবেই পুনর্লিখিত হতে থাকে না?

তাহলে প্রথম বাক্য আসলে কোথায় থাকে? বইয়ের প্রথম পাতায়? নাকি পাঠকের স্মৃতিতে? হয়তো এই কারণেই আমি প্রথম বাক্যকে ঘটনাসূচক বলে মনে করি না। এটি বরং একটি প্রতিশ্রুতি। কখনও সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়, কখনও ভেঙে যায়, কখনও সম্পূর্ণ অন্য দিকে চলে যায়। কিন্তু একজন মনোযোগী পাঠক প্রথম বাক্যের সঙ্গে শেষ বাক্যের একটি নীরব কথোপকথন শুনতে পান।

এই লেখায় আমরা সেই কথোপকথনই শুনতে চেষ্টা করব। আমরা দেখব, একটি বাক্য কীভাবে আর-একটি বাক্যকে জন্ম দেয়, একটি শব্দ কীভাবে বহু পৃষ্ঠা পরে ফিরে আসে, একটি সামান্য সিদ্ধান্ত কীভাবে সমগ্র উপন্যাসের রক্তসঞ্চালন হয়ে ওঠে। কারণ কোনও উপন্যাস হঠাৎ করে বড় হয় না। তার সমস্ত বিস্তার, সমস্ত জটিলতা, সমস্ত বিস্ময়, কোথাও না কোথাও প্রথমে একটি বাক্যের মধ্যেই নিজেকে সংকুচিত করে রাখে।

 

চলুন, এবার এমন একটি প্রথম বাক্যের সামনে দাঁড়ানো যাক, যেটি পড়ার সময় আমাদের তাড়াহুড়ো না করাই ভালো।

 

‘আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।

অনতিদূরে উদার বিশাল প্রবাহিণী গঙ্গা, তরল মাতৃমূর্ত্তি যথা, মধ্যে মধ্যে বায়ু অনর্গল উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠে; এইস্থানে, বেলাতটে, বিবশকারী উদ্বিগ্নতা ক্ষুদ্র একটি জনমণ্ডলীকে আশ্রয় করিয়া আছে। কোথাও কারণের বিকার মাত্র নাই, প্রতিবিম্ব নাই, কোথাও স্বপ্ন পর্য্যন্ত নাই; এ কারণে যে, একটি মুহূর্ত্তের সকল কিছুকে বাস্তব করত স্মরণীয় করিয়া একের যে নাম ভিন্ন ক্রমাগতই অপ্রাকৃতিক পার্থিব, তাহারই প্রাণবায়ু নিষ্ক্রান্ত হইবে এবং তাই মানুষমাত্রই নিশ্চল, ম্রিয়মাণ, বিমূঢ়। ইহাদের প্রত্যেকেরই মুখে মুখে নির্ব্বোধ গাম্ভীর্য্য আরূঢ় হইয়া রহিয়াছে মনে হয়, কখন তাহারা কপালে করাঘাত করিবার অমোঘ সুযোগ পাইবে তাহারই যেন বা কাল গণনা করিতেছে। কেননা চির অসূর্য্যস্পশ্যা জীবন এই প্রথম আলোকের শরণাপন্ন, কেননা শূন্যতা লবণাক্ত এবং মহাআকাশ অগ্নিময় হইবে।

আমাদের স্নেহের এ জগৎ নশ্বর, তথা চৈত্ররুক্ষ অগণন অন্ধকার সকলই, মৃন্ময় এবং অনিত্য; তথাপি ইহার, এই জগতের, স্থাবর ও জঙ্গমে পূর্ণিমা; ইহার চতুর্বিংশতিতত্ত্বে, মানুষের দুঃখে, কোমল নিখাদে—সর্ব্বত্রে, এরূপ কোন তন্মাত্রা নাই যেখানে যাহাতে—হাসি নাই, কারণ সৰ্ব্বভূতে, বহুতে, তিনি বিরাজমান।’ (‘অন্তর্জলী যাত্রা’, কমলকুমার মজুমদার)

কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ শুরু হয় একটি আশ্চর্য বাক্যে। ‘আলো ক্রমে আসিতেছে।’ এই বাক্যটি পড়ে প্রথমেই প্রশ্ন করা দরকার, এখানে কী বলা হয়েছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কী বলা হয়নি।

কমলকুমার লেখেননি, ভোর হচ্ছে। লেখেননি, সূর্য উঠছে। লেখেননি, পূর্ব আকাশে আলো ফুটেছে। তিনি সূর্যকে সরিয়ে রেখে শুধু আলোর আগমনকে সামনে আনলেন। এই সিদ্ধান্তটি নিছক অলংকার নয়। কারণ সূর্য একটি বস্তু, কিন্তু আলো একটি অবস্থা। সূর্যকে দেখা যায়, আলোকে অনুভব করা যায়। উপন্যাসটি তাই কোনও বস্তু দিয়ে শুরু হচ্ছে না; একটি পরিবর্তন দিয়ে শুরু হচ্ছে।

এরপর খেয়াল করুন ক্রিয়াটির দিকে। আসিতেছে। আসিল নয়। আসিয়াছে নয়। আসিতেছে। ঘটনাটি সম্পূর্ণ হয়নি। তা এখনও ঘটছে। পাঠক এমন একটি সময়ে এসে উপস্থিত হচ্ছেন, যখন পৃথিবী বদলাচ্ছে। এই বদলে যাওয়ার মুহূর্তটিকেই কমলকুমার ধরতে চান। একটি বড় আখ্যান প্রায়ই এই ধরনের পরিবর্তনের মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়। কারণ আখ্যানের জন্ম স্থিতির মধ্যে নয়, রূপান্তরের মধ্যে।

আরও একটি শব্দ আছে, যেটি না পড়লে এই বাক্যটিই পড়া হয় না। ক্রমে। এই শব্দটি বাক্যের গতি নির্ধারণ করে। আমরা যদি বলি, আলো আসিতেছে, তাহলে বাক্যটি একরকম। কিন্তু ক্রমে শব্দটি ঢুকে পড়তেই সময় ধীর হয়ে যায়। আলো আর হঠাৎ আসে না। অন্ধকারের শরীরের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। একটি মাত্র শব্দ গোটা বাক্যের ছন্দ বদলে দেয়।

এবার দ্বিতীয় বাক্যে আসি। ‘এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ।’ এখানে লক্ষ করার বিষয়, প্রথম বাক্যের পরে আমরা এখনও কোনও মানুষের কাছে পৌঁছাইনি। কোনও চরিত্র নেই। কোনও সংলাপ নেই। লেখক আমাদের মাথার উপর আকাশটি তৈরি করছেন। কিন্তু সেই আকাশও তিনি বাস্তববর্ণনার ভাষায় আঁকছেন না। নভোমণ্ডলকে তিনি দেখছেন মুক্তাফলের ছায়ার মতো, হিম নীলাভ। অর্থাৎ দৃশ্যটি আমাদের চোখে যেমন ধরা পড়ে, তার চেয়ে বেশি ধরা পড়ছে লেখকের অনুভূতিতে। বাস্তব এখানে অনুভূতির মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে।

এই দুই বাক্য পরপর পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। কমলকুমার কোনও ঘটনা দিয়ে উপন্যাস শুরু করতে চান না। তিনি প্রথমে একটি পরিবেশ নির্মাণ করেন। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, একটি উপলব্ধির ভেতরে পাঠককে প্রবেশ করিয়ে দেন। তাঁর কাছে ঘটনা অপেক্ষা দৃষ্টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই প্রথম বাক্য আমাদের প্রথম পাঠ শেখায়। একটি উপন্যাসের শুরু মানে গল্পের শুরু নয়। একটি উপন্যাসের শুরু মানে সেই দৃষ্টির শুরু, যার ভেতর দিয়ে গোটা উপন্যাসটিকে দেখতে হবে।

আমরা যদি এই প্রথম বাক্যটিকে শুধু এই তথ্য হিসেবে পড়ি যে ভোর হচ্ছে, তাহলে আমরা গল্পের জন্য একটি তথ্য পেলাম। কিন্তু যদি আমরা লক্ষ্য করি কেন আলো, কেন ক্রমে, কেন আসিতেছে, তাহলে আমরা লেখকের নির্মাণ দেখতে শুরু করি। পড়ার কাজ সেখান থেকেই শুরু হয়।

সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় অভ্যাস সম্ভবত তাড়াহুড়ো। আমরা জানতে চাই, তারপর কী হল। গল্প কোন দিকে এগোল। চরিত্রটি কী করল। শেষ পর্যন্ত কী ঘটল। এই কৌতূহল স্বাভাবিক। আখ্যান নিজেই আমাদের সামনে টেনে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু একজন পাঠকের কাজ অনেক সময় সেই টানকে সাময়িকভাবে অস্বীকার করা। তিনি একটু থামেন। ফিরে তাকান। একটি শব্দের দিকে আবার তাকান। একটি ক্রিয়াপদকে আর-একবার পড়েন। কারণ তিনি জানেন, সাহিত্য সব সময় সামনে এগোয় না; অনেক সময় গভীরের দিকে নামে। এই নামার অভ্যাসই আমাদের তৈরি করতে হবে।

খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে আমরা কোনও বিশেষণ নিয়ে ভাবি না। একটি প্রতিবেদন পড়ে আমরা মূল তথ্যটি জানতে চাই। কিন্তু একটি উপন্যাস বা ছোটগল্প সংবাদ নয়। সেখানে একটি বিশেষণ, একটি ক্রিয়াপদ, একটি সর্বনাম, এমনকি একটি যতিচিহ্নও লেখকের সচেতন সিদ্ধান্ত। সেগুলোকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেলে গল্পটি হয়তো জানা যায়, কিন্তু লেখাটি আর পড়া হয় না।

এই কারণেই ভালো পাঠের প্রথম শর্ত স্মৃতিশক্তি নয়, ধৈর্য। একটি বাক্যকে সময় দেওয়া। তার ভেতরে কিছুক্ষণ বসে থাকা। লেখক যখন একটি বাক্য লেখেন, তিনি শুধু একটি তথ্য লেখেন না; তিনি একটি দৃষ্টি নির্মাণ করেন। সেই দৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত না হয়ে পরের বাক্যে চলে গেলে আমরা গল্পের ভেতরে প্রবেশ করি বটে, কিন্তু ভাষার ভেতরে প্রবেশ করতে পারি না।

উপন্যাসের প্রথম বাক্য এই কাজটিই করে। সে পাঠককে বলে দেয়, এই লেখাটি কীভাবে পড়তে হবে। সব মহৎ উপন্যাসের প্রথম বাক্য সমান স্মরণীয় নয়, কিন্তু প্রায় সব মহৎ উপন্যাসের প্রথম বাক্যই তাদের নিজস্ব পাঠপদ্ধতির ইঙ্গিত বহন করে। কোথাও ভাষা দ্রুত, কোথাও ধীর। কোথাও দৃশ্য আগে আসে, কোথাও কণ্ঠস্বর। কোথাও মানুষ, কোথাও বস্তু। কোথাও একটি ঘটনার মাঝখানে আমাদের ফেলে দেওয়া হয়, কোথাও দীর্ঘ প্রস্তুতির ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম বাক্য থেকেই লেখক পাঠকের সঙ্গে একটি অলিখিত চুক্তি করেন। এই উপন্যাসে আমি এইভাবে কথা বলব, তুমি কি এইভাবে শুনতে প্রস্তুত?

আমরা সাধারণত উপন্যাস শেষ করে বলি, গল্পটি ভালো লেগেছে, অথবা লাগেনি। খুব কম ক্ষেত্রেই আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি, এই উপন্যাসটি আমাকে কীভাবে পড়তে শিখিয়েছিল? অথচ প্রত্যেক মহৎ লেখক তাঁর নিজের পাঠপদ্ধতিও তৈরি করেন। কমলকুমারকে যে চোখ দিয়ে পড়তে হয়, সেই একই চোখ দিয়ে মানিককে পড়া যায় না। নবারুণের গদ্যের যে ছন্দ, তা নিয়ে বিভূতিভূষণের কাছে গেলে ভুল হবে। আবার বিভূতিভূষণের যে ধীর দৃষ্টি, তা নিয়ে সন্দীপনের কাছে পৌঁছলে তাঁর বাক্যের গতি ধরা পড়বে না। একজন ভালো পাঠক তাই সব লেখককে একই পদ্ধতিতে পড়েন না। তিনি আগে বোঝার চেষ্টা করেন, এই লেখাটি তাকে কী ধরনের পাঠক হতে বলছে।

এই লেখার উদ্দেশ্য সেই প্রস্তুতির কথাই বলা। কোনও টেক্সটের অর্থ বলে দেওয়া নয়, বরং টেক্সটটি কীভাবে নিজের অর্থ তৈরি করে, সেই পথটুকু একসঙ্গে হাঁটা। আমরা গল্পের সারসংক্ষেপ লিখব না। গল্পের নৈতিক শিক্ষা খুঁজব না। বরং দেখব, একটি শব্দ কোথায় বসানো হল, একটি দৃশ্য কোথায় থামল, একটি নীরবতা কেন রেখে দেওয়া হল। কারণ সাহিত্য তার সবচেয়ে গভীর অর্থগুলো প্রায়ই ঘোষণা করে না। সেগুলো ভাষার ভেতরে নিঃশব্দে কাজ করতে থাকে। একজন পাঠকের কাজ সেই কাজটুকু দেখতে শেখা।

কথাগুলো শুনে মনে হতে পারে, এত মন দিয়ে কি সত্যিই একটি বাক্য পড়া যায়? একটি উপন্যাসের তো শত শত পৃষ্ঠা। সেখানে প্রথম বাক্যের উপর এতটা জোর দেওয়ার কী অর্থ? এই প্রশ্নের উত্তর কোনও তত্ত্বে নেই। উত্তর রয়েছে উপন্যাসগুলির মধ্যেই। একটি উপন্যাসের প্রথম বাক্যকে আমি অনেকটা নদীর উৎসের মতো দেখি। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সেই সরু জলধারাকে দেখে কেউ হয়তো বুঝতেই পারবেন না, কয়েকশো কিলোমিটার পরে সেটিই বিশাল নদী হয়ে উঠবে। কিন্তু নদীটির স্বভাব, তার স্রোত, তার গতি, তার বাঁক নেওয়ার প্রবণতা, তার জলের রং—সবকিছুর ইঙ্গিত সেই উৎসেই থাকে। প্রথম বাক্যের ক্ষেত্রেও তা-ই। পুরো উপন্যাস সেখানে উপস্থিত থাকে না, কিন্তু তার সম্ভাবনা উপস্থিত থাকে। এই সম্ভাবনাটুকু দেখতে শেখাই পাঠের প্রথম অনুশীলন।

এবারে লক্ষ্য করুন, কমলকুমার প্রথম অনুচ্ছেদটি শেষ করছেন সেই বাক্য দিয়েই, যা দিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন। কিন্তু সত্যিই কি একই বাক্য? প্রথমে ছিল, ‘আলো ক্রমে আসিতেছে।’ শেষে এসে হয়ে গেল, ‘ক্রমে আলো আসিতেছে।’ শব্দগুলি একই, অথচ বাক্যটি আর একই নেই।

প্রথম বাক্যে জোর পড়ছে আলোর উপর। আলো-ই বিষয়। তার পরে ধীরে ধীরে যোগ হচ্ছে ক্রম। কিন্তু শেষ বাক্যে এসে বাক্যটির কেন্দ্র যেন সরে যায়। সেখানে আলোর চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তার আগমনপ্রক্রিয়া। ‘ক্রমে’ শব্দটি সামনে এসে দাঁড়ায়। যেন কমলকুমার আমাদের আলোর কথা বলছেন না; বলছেন, পৃথিবীতে কোনও কিছুরই হঠাৎ আগমন ঘটে না। সবকিছুই ক্রমে আসে।

এই সামান্য স্থানবদল তাই নিছক শব্দবিন্যাসের খেলা নয়। এটি দৃষ্টিরও পরিবর্তন। প্রথম বাক্যে আমরা একটি ঘটনা শুনেছিলাম। শেষ বাক্যে এসে সেই ঘটনাটি একটি সময়ে পরিণত হয়। আলো একটি বস্তু নয় আর; একটি গতি। একটি উদ্ভাসনের প্রক্রিয়া।

সেই কারণেই প্রথম অনুচ্ছেদটি বৃত্তাকারে ফিরে আসে। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন পুনরাবৃত্তি নয়। সংগীতে যেমন একটি সুর ফিরে আসে, অথচ দ্বিতীয়বার আর প্রথমবারের মতো শোনায় না, এখানেও তেমনই। প্রথম বাক্যটি ফিরে আসে, কিন্তু ফিরে আসার আগেই পাঠক বদলে গিয়েছেন। দুটি বাক্যের মাঝখানে ইতিমধ্যেই সময় প্রবাহিত হয়েছে। ফলে একই বাক্যও আর একই থাকে না।

এইখানেই কমলকুমার আমাদের একটি গভীর পাঠ দেন। একটি বাক্যের অর্থ শুধু তার নিজের মধ্যে থাকে না। তার আগে এবং পরে কোন বাক্য রয়েছে, তার উপরেও নির্ভর করে। একটি বাক্য একা বাস করে না; তার প্রতিবেশীরাও তার অর্থ তৈরি করে।

এরপর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে এসে আর-একটি বিস্ময় অপেক্ষা করে। এতক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃতি যেন নিজেই নিজের ভাষায় উপস্থিত হচ্ছিল। কিন্তু এখন মানুষের প্রবেশ ঘটে। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ এসে দৃশ্যটিকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে না। বরং দৃশ্যেরই একটি অংশ হয়ে যায়। গঙ্গা, বায়ু, আলো, আকাশ এবং মানুষ—সব যেন একই বর্ণনাতলে এসে দাঁড়ায়। মানুষ এখানে প্রকৃতির দর্শক নয়; প্রকৃতিরই একটি উপাদান।

আরও লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই অনুচ্ছেদে দৃশ্যের চেয়ে পরিবেশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন কিছু ঘটতে দেখছি না; বরং একটি ঘটনার আগে পৃথিবী কীভাবে অপেক্ষা করে, তা দেখছি। উদ্বিগ্নতা যেন কোনও মানুষের মানসিক অবস্থা নয়; সমগ্র প্রান্তরটির। বাতাসও অস্থির, জনমণ্ডলীও অস্থির, আলোও এখনও সম্পূর্ণ আসেনি। যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিজেই একটি প্রতীক্ষার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

তৃতীয় অনুচ্ছেদে এসে এই দৃষ্টি আরও একবার প্রসারিত হয়। একটি নির্দিষ্ট স্থান, একটি নির্দিষ্ট সকাল, একটি নির্দিষ্ট জনসমাবেশ—হঠাৎ সেখান থেকে ভাষা সরে যায় নশ্বরতার দিকে, অনিত্যতার দিকে, আবার সেই অনিত্যতার মধ্যেই পূর্ণতার দিকে। একটি দৃশ্য থেকে ভাষা দর্শনে পৌঁছয়, কিন্তু কোনও বিচ্ছেদ ছাড়াই। মনে হয় না, লেখক হঠাৎ ভাব প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। বরং দৃশ্যটিই ধীরে ধীরে তার অন্তর্নিহিত চিন্তাকে প্রকাশ করছে।

এইখানে এসে মনে হয়, কমলকুমার দৃশ্য বর্ণনা করেন না। তিনি দৃশ্যকে চিন্তা করতে দেন। তাঁর গদ্যে প্রকৃতি কখনও পটভূমি নয়, আবার দর্শনের উদাহরণও নয়। প্রকৃতি নিজেই ভাবতে শুরু করে। সেই কারণেই তাঁর বাক্যগুলি পড়তে পড়তে মনে হয় না আমরা কোনও ঘটনার দিকে এগোচ্ছি; মনে হয়, একটি চেতনার জন্ম প্রত্যক্ষ করছি।

আর-একটি ছোট্ট জায়গায় থেমে যাওয়া যাক। তৃতীয় অনুচ্ছেদে কমলকুমার লিখছেন, ‘মানুষের দুঃখে, কোমল নিখাদে’। প্রথমবার পড়লে মনে হতে পারে, এটি শুধু একটি কাব্যিক বাক্যাংশ। কিন্তু সত্যিই কি তা-ই? ‘কোমল নিখাদ’ তো ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বর। তিনি লিখতে পারতেন, মানুষের গভীর দুঃখে। অথবা মানুষের নিখাদ দুঃখে। কিন্তু তা লেখেননি। দুঃখকে তিনি একটি বিশেষ স্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন।

এই সিদ্ধান্তটি আকস্মিক নয়। ভারতীয় রাগসংগীতে কোমল নিখাদের একটি দীর্ঘ আবেগ-ইতিহাস আছে। বহু রাগে এই স্বর বিষাদ, আকুলতা, নিবেদন, বৈরাগ্য কিংবা অস্তমিত আলোর অনুভূতিকে গভীর করে তোলে। অবশ্য কোনও স্বরের অর্থ স্থির নয়; রাগভেদে তার কাজও বদলে যায়। তবু কোমল নিখাদের সঙ্গে আমাদের শ্রুতিস্মৃতির যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিছক ব্যাকরণের নয়, অনুভবের।

তাহলে কমলকুমার এখানে কী করলেন? তিনি দুঃখকে বর্ণনা করলেন না; দুঃখের স্বরলিপি লিখলেন। মানুষ আর শুধু দুঃখ ভোগ করছে না; সে যেন একটি নির্দিষ্ট স্বরে অনুরণিত হচ্ছে। ফলে বাক্যটি পড়া যায়, আবার শোনাও যায়।

এইখানেই ভাষা অন্য একটি শিল্পের স্মৃতি বহন করতে শুরু করে। একটি মাত্র শব্দের মধ্যে সংগীত এসে আশ্রয় নেয়। পাঠক যদি সেই সংগীতের দরজা দিয়ে বাক্যটিতে প্রবেশ করেন, তবে দেখবেন, এটি আর রূপক থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের সাংগীতিক নির্মাণ। শব্দের অর্থ তার অভিধানে নয়, তার অনুরণনে জন্ম নিতে থাকে।

প্রশ্ন জাগে, একটি টেক্সটকে পড়ার জন্য কি কখনও অন্য একটি শিল্পের শিক্ষাও দরকার? হয়তো সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথের ‘সংগীতচিন্তা কিংবা অবনীন্দ্রনাথের ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী সাহিত্যপাঠের ক্ষেত্রেও এত জরুরি হয়ে ওঠে। কারণ তারা আমাদের শেখায়, শিল্পের ভাষাগুলি পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কখনও একটি রং এসে বাক্যের মধ্যে বাসা বাঁধে, কখনও একটি স্বর এসে একটি বিশেষণের জায়গা নেয়। কমলকুমারের এই ‘কোমল নিখাদে’ ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত, যেখানে ভাষা আর সংগীতকে আলাদা করা যায় না। এখানেই তাঁর গদ্য পড়া মানে শুধু শব্দের অর্থ বোঝা নয়; তার সুরও শুনতে শেখা।

এই কারণেই ‘অন্তর্জলী যাত্রা-র শুরুটি এত অনন্য। এটি কোনও কাহিনির সূচনা নয়; একটি দেখার পদ্ধতির সূচনা। যে পাঠক এই দৃষ্টিতে প্রবেশ করতে পারেন না, তাঁর কাছে পরের ঘটনাগুলিও সম্পূর্ণ খুলবে না। কারণ এই উপন্যাসে গল্পের আগে জন্ম নেয় চোখ। আর সেই চোখের প্রথম উচ্চারণই—‘আলো ক্রমে আসিতেছে’। শেষে, প্রায় অদৃশ্যভাবে, সেই একই বাক্য আমাদের শেখায়, আসলে ক্রমেই আলো আসে। দুটি বাক্যের এই সামান্য অদলবদলের মধ্যেই হয়তো সমগ্র উপন্যাসের সময়বোধ লুকিয়ে আছে।

 

এবার আমরা আর-একটি উপন্যাসের দরজায় দাঁড়াব। এইবার কমলকুমারের শান্ত, ধীর, আলোকময় জগৎ থেকে একেবারে অন্য একটি ভাষায়, অন্য একটি শহরে, অন্য একটি তাপমাত্রায়। কারণ ভালো পাঠক হওয়ার অর্থ এক ধরনের চোখ তৈরি করা নয়; বারবার নিজের চোখ বদলাতে শেখা।

যদি আমরা কমলকুমারের কাছে যে প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলাম, সেই একই প্রত্যাশা নিয়ে অমিয়ভূষণের কাছে যাই, তাহলে প্রথম মুহূর্তেই ভুল করব। একজন লেখকের পাঠপদ্ধতি আর-একজন লেখকের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। প্রত্যেক মহৎ লেখক তাঁর পাঠককে নতুন করে তৈরি করেন। প্রত্যেক মহৎ উপন্যাস তার নিজের পাঠক নিজেই বানিয়ে নেয়।

এই কারণেই এখন আমাদের আগের পাঠটিকে সাময়িকভাবে ভুলে যেতে হবে। কমলকুমারের বাক্য পড়ার জন্য যে মনোযোগ দরকার ছিল, অমিয়ভূষণের বাক্য হয়তো আমাদের অন্য এক ধরনের প্রস্তুতি চাইবে। প্রথম কাজ হবে, সেই প্রস্তুতির লক্ষণগুলি চিনে নেওয়া। চলুন, এবার ‘মধু সাধু খাঁ’-র প্রথম অনুচ্ছেদের সামনে দাঁড়াই।

কমলকুমার, অমিয়ভূষণ—এঁরা দুজনেই ধীর গদ্যের লেখক, কিন্তু তাঁদের ধীরতা এক নয়। কমলকুমারের ভাষা অনেক সময় আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে; অমিয়ভূষণের ভাষা মানুষের মুখ, শরীর, অঙ্গভঙ্গি, রং, বস্তু—এসবের দিকে ঝুঁকে থাকে। অর্থাৎ, ধীর গদ্য মানেই একই ধরনের গদ্য নয়।

কমলকুমারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ উপন্যাসে আমরা দেখলাম, লেখক মানুষকে আড়ালে রেখে আলো দিয়ে শুরু করছেন। অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মধু সাধু খাঁ’-র কাছে এসে দৃশ্যটি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এখানে আলো নেই। আকাশ নেই। প্রকৃতি নেই। প্রথম বাক্যেই একজন মানুষ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

‘মদু সা সাতিশয় হারামজাদা ছিল—সন্দেহ কি?’

উপন্যাসের প্রথম বাক্য হিসেবে এর চেয়ে সাহসী সূচনা খুব বেশি নেই। একটু ভেবে দেখুন, লেখক যদি লিখতেন, মধু সা ছিল একজন দস্যু। অথবা, মধু সা ছিল নিষ্ঠুর মানুষ। তাহলে কী হত? আমরা একটি তথ্য পেতাম। কিন্তু অমিয়ভূষণ তথ্য দিয়ে শুরু করলেন না। তিনি বিচার দিয়ে শুরু করলেন। আরও লক্ষ করুন, এই বিচারটিও স্থির নয়। বাক্যের শেষে প্রশ্ন জুড়ে দেন—সন্দেহ কি? এই প্রশ্নটি পাঠকের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া। যেন লেখক বলছেন, আমি তো বলে দিলাম, এখন তুমি কী বলো? প্রশ্নটির মধ্যে উত্তর আগেই নিহিত। এখানে প্রশ্নটি কোনও সংশয় তৈরি করে না; বরং সংশয়ের সম্ভাবনাকেই বাতিল করে দেয়। পাঠক প্রথম বাক্যেই লেখকের সঙ্গে একটি গোপন সমঝোতায় ঢুকে পড়েন।

এই একটি বাক্যেই বর্ণনাকারীর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি দূর থেকে কোনও নিরপেক্ষ ইতিহাস লিখছেন না। তিনি এমন একজন, যিনি এই মানুষটিকে চেনেন। তাঁর সম্পর্কে মতামতও রাখেন। অর্থাৎ উপন্যাসটি প্রথম বাক্য থেকেই একটি কণ্ঠস্বরের উপর দাঁড়িয়ে যায়। সাহিত্যে কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব অনেক সময় ঘটনার চেয়েও বেশি। কারণ গল্প আমরা অনেকেই বলতে পারি, কিন্তু একই গল্প সবাই একই গলায় বলতে পারে না।

এখানে আমার মনে হয়, ‘সাতিশয়’ শব্দটি আসলে পুরো প্রথম বাক্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ। ‘হারামজাদা’ নয়। কারণ ‘হারামজাদা’ একটি গালি, একটি মূল্যায়ন। কিন্তু ‘সাতিশয়’ সেই মূল্যায়নকে পরিমাপ করে। অর্থাৎ লেখক শুধু বলছেন না, মধু সা হারামজাদা; বলছেন, সে সাতিশয় হারামজাদা। এই সাতিশয় শব্দটি যেন কোনও আদালতের রায় নয়, বহুদিনের জমে থাকা অভিজ্ঞতার নিঃশ্বাস। শব্দটির মধ্যে এক ধরনের অতিরিক্ত নিশ্চিততা আছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক তার পরেই বাক্যটি প্রশ্নে গিয়ে শেষ হয়—সন্দেহ কি?

এখানেই একটু থামা যায়। যদি বাক্যটি হত, মদু সা হারামজাদা ছিল—সন্দেহ কি? তাহলেও বাক্যটি চলত। কিন্তু অমিয়ভূষণ সেখানে সাতিশয় যোগ করলেন কেন? একটি শব্দ কি সত্যিই এতটা প্রয়োজনীয় ছিল? নাকি এই একটি শব্দই আমাদের বর্ণনাকারীর মানসিক দূরত্ব মেপে দেয়?

আমার মনে হয়, এই সাতিশয় আসলে চরিত্রকে যতটা নির্মাণ করে, তার চেয়েও বেশি নির্মাণ করে বর্ণনাকারীকে। কারণ মানুষকে আমরা প্রায়ই দেখি, কিন্তু এই ধরনের ক্রমবাচক শব্দ ব্যবহার করি তখনই, যখন সেই মানুষটিকে নিয়ে আমাদের বিচার অনেকদিন ধরে পাক খেয়ে বসে আছে। সাতিশয় একটি অভিধানগত শব্দ নয়, একটি আবেগগত শব্দ। এর মধ্যে দীর্ঘ সহবাস আছে, দীর্ঘ বিরক্তি আছে, হয়তো বিস্ময়ও আছে। ফলে প্রথম বাক্যেই আমরা বুঝতে পারি, যে-গলা এই গল্প বলছে, সে নির্লিপ্ত নয়। সে ইতিমধ্যেই তার অবস্থান বেছে নিয়েছে।

আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। সাতিশয় শব্দটি বাক্যকে সামান্য পুরোনোও করে তোলে। আজ আমরা দৈনন্দিন কথাবার্তায় বলি না, লোকটা সাতিশয় হারামজাদা। আমরা বলি, ভীষণ, খুব, মারাত্মক। অমিয়ভূষণ সাতিশয় বেছে নিলেন। কেন? এই শব্দের ধ্বনি, তার গাম্ভীর্য, তার সামান্য প্রাচীনতা কি উপন্যাসের সময়বোধও তৈরি করছে? অর্থাৎ প্রথম বাক্যেই কি ভাষা আমাদের বলে দিচ্ছে, এই জগতের সময় আমাদের দৈনন্দিন সময় নয়?

হয়তো এখান থেকেই আর-একটি প্রশ্ন জন্মায়। আমরা যখন একটি উপন্যাস পড়ি, তখন কি শুধু বিশেষ্য পড়ি? চরিত্রের নাম, জায়গার নাম, ঘটনার নাম? নাকি ক্রিয়াবিশেষণ, অব্যয়, মাত্রাসূচক শব্দগুলিও সমান মনোযোগ দাবি করে? অনেক সময় বড় অর্থগুলি বড় শব্দে থাকে না। তারা লুকিয়ে থাকে এইরকম আপাত তুচ্ছ শব্দে, যেগুলিকে আমরা পড়তে পড়তেই অতিক্রম করে যাই।

একজন ভালো পাঠক তাই বড় শব্দের চেয়ে ছোট শব্দে বেশি সময় দেন। কারণ অনেক সময় উপন্যাসের দরজা খুলে দেয় কোনও বিশেষ্য নয়, একটি ক্রিয়াবিশেষণ। এখানে সেই শব্দটি সাতিশয়।

এরপর দ্বিতীয় বাক্যে লেখক আমাদের আর-একটি কাজ শেখান। তিনি চরিত্রের পরিচয় দেন না, চরিত্রকে দেখান। ‘চিকন ঠান্ডা কালো রঙ, টিকলো নাক, টানা চোখ, বলে চক্ষু; সে প্রান্তগুলি আবার লাল; দাঁতগুলি সুগঠিত, কিন্তু কষ ঘণ্টায়-ঘণ্টায় পানরসে লাল।’

খেয়াল করলে দেখবেন, এখানে কোনও বিমূর্ত বিশেষণ নেই। লেখক বলেননি, লোকটি ভয়ংকর। বলেননি, লোকটি নিষ্ঠুর। বরং তিনি শরীরের বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে একে একে আমাদের সামনে রাখছেন। যেন একজন চিত্রকর ক্যানভাসে প্রথমে মুখের রেখা টানছেন, তারপর চোখ, তারপর ঠোঁট, তারপর পোশাক। চরিত্রটি আমাদের কাছে কোনও সংজ্ঞা হয়ে আসে না; ধীরে ধীরে দৃশ্য হয়ে ওঠে।

আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। এই বর্ণনায় প্রায় প্রতিটি বাক্যাংশ চোখে দেখা যায়। পড়তে পড়তে মনে হয় না আমরা শব্দ পড়ছি; মনে হয় আমরা একজন মানুষকে দেখছি। ভালো গদ্যের একটি লক্ষণই এই—ভাষা ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়, দৃশ্যটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

পোশাকের বর্ণনাটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ। মোটা তসরের মেরজাই, ডোরে বাঁধা পাঞ্জাবি, সূক্ষ্ম ধুতি—এসব তথ্য হিসেবে নয়, উপস্থিতি হিসেবে কাজ করে। একটি মানুষ নিজের শরীর নিয়ে যেমন বেঁচে থাকে, তেমনই নিজের পোশাক নিয়েও বেঁচে থাকে। অমিয়ভূষণ জানেন, চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে তার মুখ যেমন দরকার, তেমনই দরকার তার কাপড়ের ভাঁজও।

এখানেই কমলকুমার আর অমিয়ভূষণের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমলকুমার আমাদের প্রথমে একটি জগতের ভেতরে নিয়ে যান, তারপর সেখানে মানুষকে নিয়ে আসেন। অমিয়ভূষণ প্রথমেই একজন মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিলেন, আর সেই মানুষটির শরীর, মুখ, চোখ, পোশাকের ভেতর দিয়েই আমরা তার জগতে প্রবেশ করি।

দুজনেই প্রথম বাক্য দিয়ে উপন্যাসের দরজা খুলছেন। কিন্তু দরজা দুটি এক নয়। একটি খুলছে আলোর দিকে, অন্যটি খুলছে মুখের দিকে। এই পার্থক্যটুকু দেখতে পারাই পাঠের শুরু।

এখানে একটু থেমে যাওয়া যাক। কমলকুমারের প্রথম অনুচ্ছেদ পড়ার সময়ও আমরা দেখেছিলাম, তিনি ঘটনার আগে আলোকে দেখছেন। অমিয়ভূষণের কাছে এসে দেখি, তিনি চরিত্রের আগে শরীরকে দেখছেন। একজন আলো দিয়ে দৃশ্য নির্মাণ করছেন, অন্যজন রেখা, রং, ভঙ্গি আর বস্ত্র দিয়ে মানুষ নির্মাণ করছেন। দুজনের পথ আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় এসে তাঁরা মিলিত হন। দুজনেই লিখছেন যেন চোখ দিয়ে।

এটি কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। কমলকুমার মজুমদার এবং অমিয়ভূষণ মজুমদার—দুজনেই অসাধারণ চিত্রকর ছিলেন। ফলে তাঁরা পৃথিবীকে শুধু ভাষায় ভাবতেন না, দৃশ্য হিসেবেও ভাবতেন। হয়তো সেই কারণেই তাঁদের গদ্যে আমরা প্রায়ই বাক্যের আগে একটি ছবি দেখতে পাই। মনে হয় না, তাঁরা কোনও ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন; মনে হয়, ধীরে ধীরে একটি ক্যানভাসে রং উঠছে।

এইখানে এসে সাহিত্য আমাদের আর-একটি পাঠ দেয়। একজন লেখকের অন্য শিল্পমাধ্যমের অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষাকেও বদলে দেয়। যিনি ছবি আঁকেন, তিনি অনেক সময় শব্দের মধ্যেও রেখা খোঁজেন। যিনি সংগীত বোঝেন, তাঁর বাক্যে ছন্দের ব্যবহার অন্যরকম হয়। আর যিনি সিনেমা নিয়ে ভাবেন, তাঁর দৃশ্য নির্মাণে সময়ের প্রবাহও অন্যভাবে কাজ করে।

তাই কোনও লেখককে পড়তে গেলে তাঁর শুধু বই পড়লেই হয় না। তিনি পৃথিবীটাকে কীভাবে দেখতেন, সেটাও জানতে হয়। অনেক সময় সেই উত্তর তাঁর গদ্যের বাইরেই লুকিয়ে থাকে।

 

এবার একটু বাংলা ভাষার বাইরে যাওয়া যাক। কারণ পড়ার অভ্যাস যদি সত্যিই তৈরি হয়, তাহলে তা কোনও ভাষার মধ্যে আটকে থাকে না। বরং এক ভাষার সাহিত্য অন্য ভাষার সাহিত্যকে পড়তে শেখায়। হেনরি মিলারের এই গদ্যাংশ সেই কারণেই এখানে প্রাসঙ্গিক।

 

‘এ লেখা যখন লিখছি, রাত নেমে এসেছে। লোকজন সব ডিনারে চলল। সারাটাদিন ছিল ধূসর। প্যারিসে যেমন হামেশাই দেখা যায়। চিন্তায় হাওয়া লাগাতে ব্লকগুলোর আশপাশ দিয়ে হাঁটছি। করতে কিছুই পারছি না, শুধু ভাবছি নিউ ইয়র্ক আর প্যারিস এই শহর দুটোর মধ্যে কী ভীষণ তফাত। সেই একই সময়, একইরকম দিন, এমনকী এই ধূসর শব্দটাও, যা এইসব সঙ্গ থেকেই আসে, সেই গ্রিসাইলের সাথে অল্পই সাযুজ্য তার, একজন ফরাসির কানে যা চিন্তা ও অনুভূতির একটা জগৎ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। অনেক আগে, প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, দোকানের জানলায় রাখা জলরঙের কাজগুলো মন দিয়ে দেখতে দেখতে, আমি সেই জিনিসটার একক অনুপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলাম যাকে পেইন’জ গ্রে বলে। এটা আমি উল্লেখ করলাম কারণ, সবাই-ই জানে প্যারিস সবিশেষভাবে এমন এক শহর যার নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। উল্লেখ করলাম কারণ, আমেরিকান শিল্পীরা তৈরি করা ফরমায়েসি ধূসরকেই ব্যবহার করে অতিরিক্ত এবং বদ্ধমূলভাবে। ফ্রান্সে এই ধূসরমালা অসীম; এখানে ধূসর তার পরিণাম-লুপ্ত।

ধূসরতার এই বিপুল পৃথিবী নিয়ে ভাবছিলাম যাকে আমি এই প্যারিসেই চিনেছি। কারণ এরকম সময়ে, এমনিই যখন বুলেভার ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম, অধীর আগ্রহে মনে হল ঘরে ফিরে যাই, লিখি, আমার স্বাভাবিক অভ্যেসের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটা লেখা। ওখানে আমার সময় ফুরোলে আমি আবার প্রবৃত্তিগতভাবে ঠিক ভিড়ে মিশে যাব। এখানে এই ভিড়, সবরঙের শূন্যতা, সবকিছুর সূক্ষ্ম তারতম্য, সব ভেদ ও স্বাতন্ত্র্য, আমাকে নিয়ে যাবে আমার ভেতরে, ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার ঘরে, আমার কল্পনার মধ্যে এক নিরুদ্দিষ্ট জীবনের সেই জটিল ও মিশ্র উপাদানগুলোকে খুঁজতে, যখন সেগুলো সংমিশ্রিত ও আত্তীকৃত হয়ে প্রতিপালিত আর সুসংগত অস্তিত্বের সৃষ্টির দিকে হয়তো কী অনিবার্যভাবে পুনরুৎপাদন করছে কোমল ও স্বাভাবিক ধূসরকে। এরকম একটা দিনে, এরকম সময়ে র‌্যু লাফিত্তের যে কোনও জায়গা থেকে সাক্রে কয়্যেরের দিকে তাকিয়ে দেখাটাই আমাকে স্বপ্নাবেশে নিয়ে যেতে সক্ষম। এমনকী যখন আমি ক্ষুধার্ত কিংবা ঘুমনোরও কোনও জায়গা নেই তখনও আমার ওপরে এই দৃশ্যটার এরকমই প্রভাব চলত। পকেটে আমার হাজার ডলার থাকলেও আমি জানি এমন কোনও দ্রষ্টব্য নেই যা আমার মধ্যে এরকম স্বপ্নাবেশ জাগাতে পারে।’ (কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি, হেনরি মিলার। ভাষান্তর: অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়)

 

উপন্যাস শুরুর এই অনুচ্ছেদ দুটি পড়ে আপনার কী মনে থাকে? প্যারিস? নিউ ইয়র্ক? নাকি ধূসর? আমার মনে হয়, এই প্রশ্নটার কোনও তাড়াহুড়ো করে উত্তর দেওয়া উচিত নয়। বরং একটু দেখে নেওয়া যাক, লেখক নিজে কী করছেন। তিনি একটি শহরের বর্ণনা দিচ্ছেন না। কোনও চরিত্রের পরিচয়ও দিচ্ছেন না। তিনি যেন একটি রঙের ভেতরে প্রবেশ করছেন। তারপর সেই রং ধীরে ধীরে শহর হয়ে উঠছে, স্মৃতি হয়ে উঠছে, শিল্প হয়ে উঠছে, আবার নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার একটি পথও হয়ে উঠছে। একটি রং কি এত কিছু ধারণ করতে পারে? আমরা সাধারণত রংকে বিশেষণ বলে ভাবি। সাহিত্যে সে যেন অলংকারমাত্র। কিন্তু সত্যিই কি তাই? একটি শব্দ কি কখনও একটি সম্পূর্ণ চিন্তার জগৎ হয়ে উঠতে পারে না? একটি রং কি একটি উপন্যাসের বায়ুমণ্ডল তৈরি করতে পারে না? হেনরি মিলার যেন এই প্রশ্নগুলিই রেখে যান।

এইখানে আর-একটি তথ্য মনে পড়ে। হেনরি মিলার জলরঙে ছবি আঁকতেন। তথ্যটি জানা থাকলে অনুচ্ছেদটি কি অন্যরকম হয়ে ওঠে? হয়তো হয়, হয়তো হয় না। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়। একজন চিত্রকর যখন লিখছেন, তখন কি তিনি শব্দ দিয়ে শুরু করেন, নাকি রং দিয়ে? পেইন’জ গ্রে-র উল্লেখ কি নিছক একটি রঙের নাম, নাকি একজন চিত্রকরের অভিধান থেকে উঠে আসা একটি শব্দ?

কমলকুমারের কথা মনে পড়ে। তাঁর প্রথম অনুচ্ছেদে আলো ধীরে ধীরে পৃথিবীকে দৃশ্যমান করছিল। অমিয়ভূষণের কাছে এসে মানুষের শরীর, মুখ, পোশাক, রং আমাদের চোখের সামনে তৈরি হতে থাকে। এই দুজনেই ছবি আঁকতেন। হেনরি মিলারও আঁকতেন। তাহলে কি এখানে কোনও সম্পর্ক আছে? নাকি আমরা অকারণে সম্পর্ক খুঁজছি?

প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সম্ভবত একজন চিত্রকর পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখেন। তিনি কোনও মানুষকে দেখলে প্রথমে তার পরিচয় দেখেন না, তার ওপর পড়ে থাকা আলো দেখেন। কোনও রাস্তা দেখলে শুধু তার দৈর্ঘ্য দেখেন না, তার রংও দেখেন। সেই দেখাটাই হয়তো পরে ভাষার মধ্যে এসে পড়ে। তখন গদ্যও দৃশ্য নির্মাণ করতে শুরু করে।

এখানে আর-একটি প্রশ্ন করা যায়। আমরা যখন একটি উপন্যাস পড়ি, তখন কি সত্যিই শুধু শব্দ পড়ি? নাকি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি চোখকেও পড়ি? লেখকের বাক্য কি তাঁর দেখার পদ্ধতিরই আর-একটি রূপ নয়?

এই প্রশ্নগুলির কোনওটির উত্তর এখন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। উত্তর দিয়ে ফেললে প্রশ্নটি মরে যায়। বরং প্রশ্নটিকে সঙ্গে নিয়ে পরের লেখার দিকে এগোনো যাক। হয়তো অন্য কোনও উপন্যাসের প্রথম বাক্য, অন্য কোনও অনুচ্ছেদ, অন্য কোনও লেখক এসে এই প্রশ্নগুলির চারপাশে নতুন আলো ফেলবেন। তখন উত্তর না মিললেও দৃষ্টিটা বদলে যাবে। আমার বিশ্বাস, সাহিত্য পড়ার ক্ষেত্রে সেটাই বড় কথা।

 

এখানেই আমার আর-একটি প্রথম বাক্যের কথা মনে পড়ে। ভাষা আলাদা, দেশ আলাদা, সময়ও আলাদা। অথচ এই বাক্যটিও আমাদের পড়ার অভ্যাসকে প্রথম মুহূর্তেই অস্থির করে দেয়।

আলব্যের কামুর দ্য স্ট্রেঞ্জার শুরু হচ্ছে এভাবে—Mother died today. Or, maybe, yesterday; I can’t be sure. 

প্রথমবার পড়লে বাক্যটি খুবই সরল বলে মনে হয়। একজন মানুষ জানাচ্ছে, তার মা মারা গিয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কি এই বাক্যটির বিষয় মায়ের মৃত্যু? আমার মনে হয়, না। বরং বাক্যটির সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ মৃত্যু নয়। সবচেয়ে অদ্ভুত অংশটি হল পরের বাক্য—হয়তো আজ, হয়তো কাল; আমি নিশ্চিত নই। কীভাবে কেউ নিজের মায়ের মৃত্যুর দিন ভুলে যেতে পারে? এই প্রশ্নটি আমাদের মাথায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা অদ্ভুত এক ফাঁদে ঢুকে পড়ি। আমরা আর ঘটনাটি পড়ছি না। আমরা মানুষটিকে বিচার করতে শুরু করেছি।

একটু থামা যাক। কামু কি আমাদের মায়ের মৃত্যুর খবর দিচ্ছেন, না আমাদের বিচার করার অভ্যাসটিকে পরীক্ষা করছেন? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথম বাক্যটি আমাদের তথ্য দেয়। দ্বিতীয় বাক্যটি সেই তথ্যের নৈতিক ভিত্তিটাই নড়িয়ে দেয়। এত দ্রুত। মাত্র কয়েকটি শব্দে।

এখানে লক্ষ করার মতো আর-একটি বিষয় আছে। বাক্যটি কোথাও কোনও আবেগ ঘোষণা করছে না। শোক নেই। বিলাপ নেই। স্মৃতিচারণ নেই। ভাষা এতটাই সংযত যে সেই সংযমই পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে।

প্রশ্ন জাগে, আবেগের অনুপস্থিতিও কি ভাষার একটি ঘটনা? একটি বাক্য কি কখনও তার উচ্চারণ দিয়ে নয়, তার অনুচ্চারণ দিয়েও অর্থ তৈরি করে?

হয়তো এই কারণেই দ্য স্ট্রেঞ্জারের প্রথম বাক্যটি এতদিন ধরে পাঠকদের তাড়া করে এসেছে। কারণ এটি আমাদের শেখায় না, কী ভাবতে হবে। বরং আমাদের নিজের ভাবনাটিকেই সন্দেহ করতে শেখায়। আমি কেন সঙ্গে সঙ্গে এই মানুষটিকে নির্মম বলে ভাবলাম? কেন ধরে নিলাম, শোকের একটি নির্দিষ্ট ভাষা আছে? শোক কি সর্বদা প্রকাশ্য? নাকি নীরবতাও তার একটি রূপ হতে পারে?

দেখা যাচ্ছে, আমরা আর প্রথম বাক্য নিয়ে কথা বলছি না। আমরা পৌঁছে গেছি পাঠকের কাছেও। একটি বাক্য লেখকের সিদ্ধান্ত, ঠিকই। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের অর্ধেক থাকে লেখকের হাতে, বাকি অর্ধেক তৈরি হয় পাঠকের ভেতরে। বাক্যটি লেখা শেষ হওয়ার পরে তার কাজ শেষ হয় না। বরং তখনই তার দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়।

সম্ভবত এই কারণেই একটি প্রথম বাক্য কখনও নিঃসঙ্গ নয়। সে তার সঙ্গে নিয়ে আসে একজন সম্পূর্ণ পাঠককে, যিনি এখনও জন্মাননি। একটি সম্পূর্ণ উপন্যাসকে, যা এখনও লেখা হয়নি। এমনকি এমন কিছু প্রশ্নকেও, যেগুলোর উত্তর হয়তো কোনও দিনই দেওয়া যাবে না।

হয়তো একটি প্রথম বাক্যের সবচেয়ে বড় শক্তি এইখানেই। সে আমাদের গল্পের দিকে নিয়ে যায় না। সে আমাদের নিজেদের দিকে ফিরিয়ে দেয়।

এইখানে এসে আর-একটি বিষয় ভাবতে ইচ্ছে করে। আমরা যখন কোনও উপন্যাসের প্রথম বাক্য পড়ি, তখন আসলে কী পড়ি? বাক্যটি, না নিজের অভ্যাস? কারণ একই বাক্য একজন পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে, অন্যজনকে ফেলে না। একই বাক্য একজনের কাছে নির্মম, অন্যজনের কাছে নির্লিপ্ত, আর তৃতীয়জনের কাছে হয়তো আশ্চর্যরকম সৎ। তাহলে বাক্যটি কোথায় শেষ হচ্ছে? লেখকের ডেস্কে? না পাঠকের অভিজ্ঞতায়?

হয়তো এই কারণেই কোনও প্রথম বাক্যের একটিমাত্র পাঠ হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পাঠও বদলে যায়। যে-কিশোর প্রথমবার দ্য স্ট্রেঞ্জার পড়ে, আর যে মানুষ পঞ্চাশ বছর বয়সে একই বাক্যে ফিরে আসে, তারা কি একই বাক্য পড়ে? শব্দ তো একই থাকে। বদলে যায় পাঠক। তাহলে কি একটি বাক্যেরও বয়স বাড়ে? নাকি বয়স বাড়ে সেই চোখের, যে তাকে পড়ে?

এই প্রশ্নগুলি ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে হয়, প্রথম বাক্য আসলে উপন্যাসের দরজা নয়। দরজা হলে তো একবারেই পেরিয়ে যাওয়া যেত। বরং সে অনেকটা আয়নার মতো। আমরা বারবার তার সামনে ফিরে আসি, আর প্রতিবারই নিজের অন্য একটি মুখ দেখতে পাই। সেই জন্যই কোনও কোনও প্রথম বাক্য দ্বিতীয়বার পড়লে আরও বেশি খুলে যায়। উপন্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তারা যেন সত্যিই শুরু হয়।

এই কারণেই মহৎ লেখকেরা প্রথম বাক্য লেখার জন্য এত দীর্ঘ সময় নেন। তাঁরা শুধু উপন্যাসের প্রবেশপথ লিখছেন না। এমন একটি বাক্য লিখতে চাইছেন, যা উপন্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাঠককে আবার প্রথম পাতায় ফিরিয়ে আনবে। যে বাক্য দ্বিতীয় পাঠকে আহ্বান জানায় না, তার প্রথম পাঠও কি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়?

একটি প্রথম বাক্যের সাফল্য এখানেই যে, সে গল্পের সূচনা করে না, পুনর্পাঠের সম্ভাবনা তৈরি করে। কারণ প্রথমবার আমরা গল্প পড়ি। দ্বিতীয়বার আমরা ভাষা পড়ি। তৃতীয়বার হয়তো পড়ি নিজেদেরই। আর তখন বুঝতে পারি, প্রথম বাক্যটি এতদিন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

এই পর্যন্ত এসে মনে হতে পারে, প্রথম বাক্যের কথা আমরা যেন শুধু পাঠকের দিক থেকেই ভাবছি। পাঠক কীভাবে প্রথম বাক্য পড়বেন, কেন সেখানে থামবেন, কেন ফিরে আসবেন, এইসব নিয়ে। কিন্তু লেখকের কাছে প্রথম বাক্য কী? প্রশ্নটি আমাকে অন্য একটি জায়গায় নিয়ে যায়।

প্রথম বাক্য কি লেখা হয়? নাকি কখনও কখনও এসে পড়ে? এই প্রশ্নটি আমি তত্ত্বের বই পড়ে পাইনি। কোনও লেখকও আমাকে শেখাননি। বরং একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্নটি আমার কাছে এসেছে।

অনেক লেখকই বলেছেন, তাঁরা বছরের পর বছর একটি প্রথম বাক্যের জন্য অপেক্ষা করেছেন। বাক্যটি না এলে উপন্যাসও আসেনি। আবার এমন লেখকও আছেন, যাঁরা একটি বাক্য লিখেছিলেন, তারপর দশ বছর ধরে বুঝেছেন, সেই বাক্যটি আসলে কোন বইয়ের প্রথম বাক্য। এর অর্থ কী?

আর-একটি ক্ষুদ্র বিষয়েও চোখ রাখা যায়। স্টুয়ার্ট গিলবার্টের ইংরেজি অনুবাদে লেখা হচ্ছে, Mother died today. Or, maybe, yesterday; I can’t be sure. এখানে Or-এর পরের কমাটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যিই কি তুচ্ছ? ফরাসি মূল বাক্যটি ছিল, Aujourd’hui, maman est morte. Ou peut-être hier, je ne sais pas. (ওজুরদ্যুই, মামাঁ এ মোর্ত। উ প্যু-এত্র ইয়ের, ঝ্য ন্য সে পা) লক্ষ করলে দেখা যাবে, ইংরেজি অনুবাদক Or-এর পর একটি সামান্য বিরতি বসিয়েছেন। ফলে বাক্যটি আর সরল সংশোধন থাকে না। Or maybe yesterday বললে যে দ্রুততা তৈরি হত, Or, maybe, yesterday-তে এসে তা ভেঙে যায়। বাক্যটি যেন নিজেই নিজের ভেতরে ইতস্তত করছে। এটি কি স্মৃতির দ্বিধা? নাকি উচ্চারণের? নাকি চিন্তার? একটি কমা কখনও কখনও শব্দের অর্থ বদলায় না, কিন্তু চিন্তার গতি বদলে দেয়। আর চিন্তার গতি বদলে গেলে অর্থও কি একই থাকে?

এইখানে এসে অনুবাদ নিয়েও একটি প্রশ্ন জন্মায়। আমরা যখন কোনও উপন্যাস অনুবাদে পড়ি, তখন ঠিক কী পড়ি? লেখকের বাক্য, না অনুবাদকের পাঠ? কারণ এই কমাটি কামুর নয়, অনুবাদকের। অথচ বহু ইংরেজি পাঠকের কাছে এই সামান্য বিরতিটিই আজ স্ট্রেঞ্জারের প্রথম বাক্যের অভিজ্ঞতার অংশ। তাহলে একটি উপন্যাসের প্রথম বাক্যেরও কি একাধিক জীবন থাকে? একটি তার মূল ভাষায়, আর-একটি অনুবাদে, আরও একটি প্রতিটি নতুন পাঠকের মনে?

এই ধরনের প্রশ্নের কোনও চূড়ান্ত উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্নগুলিই আমাদের শেখায়, ক্লোজ রিডিং কখনও শুধু শব্দ পড়া নয়। কখনও কখনও একটি কমা পড়াও। কখনও একটি অনুবাদের দ্বিধা পড়াও। আর সেই কারণেই একটি বাক্য ভাষা বদলালে একই থাকে না; তার অর্থও প্রতিবার নতুন করে জন্ম নেয়।

‘আজ’ শব্দটি নিয়েও একটু থামা দরকার। ফরাসি মূল বাক্যটি শুরুই হচ্ছে Aujourd’hui, maman est morte. (ওজুরদ্যুই, মামাঁ এ মোর্ত। অর্থ: আজ, মা মারা গেছেন।) প্রথমে মনে হতে পারে, এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় মৃত্যু। কিন্তু বাক্যটির প্রথম শব্দটি তো মৃত্যু নয়, মা-ও নয়। প্রথম শব্দটি সময়—আজ। কেন? লেখক চাইলে লিখতে পারতেন, মা আজ মারা গেছেন। কিংবা, আমার মা মারা গেছেন আজ। কিন্তু তিনি সময়কে বাক্যের একেবারে সামনে নিয়ে এলেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, দ্বিতীয় বাক্যেই সেই সময়টিকেই অনিশ্চিত করে দিলেন—Ou peut-être hier, je ne sais pas. (উ প্যু-এত্র ইয়ের, ঝ্য ন্য সে পা। অর্থ: অথবা হয়তো গতকাল, আমি জানি না।) অর্থাৎ যে-সময়কে প্রথম বাক্যের প্রথম শব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হল, পরের বাক্যেই তার ভিত্তি ভেঙে পড়ল। তাহলে প্রথম শব্দটির কাজ কী? তথ্য দেওয়া, না তথ্যকে সন্দেহের মুখে দাঁড় করানো? সময়কে স্থির করা, না সময়ের ভঙ্গুরতা দেখানো? আমরা সাধারণত ভাবি, একটি বাক্যের প্রথম শব্দ পাঠককে স্থির মাটি দেয়। কামু তো ঠিক তার উল্টোটা করলেন। তিনি প্রথমে মাটি তৈরি করলেন, তারপর সেটিই সরিয়ে নিলেন। তখন বুঝতে পারি, উপন্যাসটি হয়তো একটি মৃত্যুর গল্প নয়; সময়, স্মৃতি এবং নিশ্চিততার অস্থিরতার গল্প। একটি মাত্র শব্দ—Aujourd’hui—এই সমগ্র দার্শনিক পরিসরের দরজাটি খুলে দেয়।

 

এতক্ষণ আমরা দেখলাম, একটি প্রথম বাক্য কখনও আলো দিয়ে একটি জগৎ নির্মাণ করছে, কখনও একটি মুখ, কখনও একটি রং, কখনও একটি নৈতিক অস্বস্তি। এবার আমরা এমন এক উপন্যাসের সামনে দাঁড়াই, যেখানে প্রথম বাক্য যেন কোনও জগৎ নির্মাণই করতে চায় না। বরং নিজের ভেতরেই একটা ফাটল খুলে দেয়। ‘নোটস ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’ শুরু হচ্ছে এইভাবে—I am a sick man… I am a spiteful man. I am an unattractive man.

প্রথমবার পড়লে মনে হতে পারে, একজন মানুষ নিজের পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি পরিচয় এভাবে দেওয়া যায়? একজন মানুষ কি নিজেকে প্রথমেই অসুস্থ, বিদ্বেষপরায়ণ এবং কুশ্রী বলে পরিচয় করায়? নাকি সে আমাদের এমন একটি চেতনার ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে আত্মপরিচয়ও আর স্থির থাকে না?

একটু লক্ষ করুন, তিনটি বাক্যের ব্যাকরণ প্রায় অভিন্ন। I am… I am… I am…। কিন্তু এই পুনরাবৃত্তি কি জোরের? নাকি সংশয়ের? যদি মানুষটি সত্যিই জানত সে কে, তাহলে কি তাকে তিনবার বলতে হত? নাকি প্রতিটি উচ্চারণের মধ্যেই আগের উচ্চারণটির উপর অবিশ্বাস জমা হচ্ছে? প্রথমে শরীর, তারপর স্বভাব, তারপর চেহারা। অসুখ কোথায়? লিভারে? চরিত্রে? নিজের মুখে? নাকি ভাষাতেই?

এই প্রশ্নগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে পরের কয়েকটি বাক্যে। সে বলে, তার বিশ্বাস লিভারের অসুখ হয়েছে। পরের মুহূর্তেই স্বীকার করে, অসুখটা আসলে কী, সে জানে না। ডাক্তার দেখায় না। কেন? বিদ্বেষ থেকে। কিন্তু কার প্রতি সেই বিদ্বেষ? সেটাও স্পষ্ট নয়। শেষে সে নিজেই মেনে নেয়, ডাক্তারদের কোনও ক্ষতি হচ্ছে না, নিজেরই হচ্ছে। তবু যাবে না। তাহলে এই বিদ্বেষের লক্ষ্য কে? অন্য কেউ, না নিজেরই অস্তিত্ব?

হয়তো এইখানেই উপন্যাসটির প্রথম বাক্য খুলতে শুরু করে। এতক্ষণ আমরা ভাবছিলাম, একজন মানুষ নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এখন মনে হতে থাকে, সে আসলে নিজের ভেতরে একটা আদালত বসিয়েছে, যেখানে সাক্ষীও সে, অভিযুক্তও সে, বিচারকও সে। প্রতিটি বাক্য তাই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, আবার পরের বাক্যেই সেই সাক্ষ্যকে নষ্ট করে দেয়। সত্য যেন এখানে কোনও স্থির জায়গা নয়; সত্য বাক্য থেকে বাক্যে সরে যাচ্ছে। আমরা পড়ছি না একজন মানুষকে, পড়ছি একটি চেতনার দোলাচল।

এইখানে এসে বইটির একেবারে শুরুতে রাখা লেখকের নোটটিও নতুন অর্থ পায়। দস্তয়েভস্কি আগেই জানিয়ে দেন, এই ডায়েরির লেখক কাল্পনিক। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেন, এমন মানুষ শুধু থাকতে পারে তা-ই নয়, আমাদের সমাজে তার থাকাই স্বাভাবিক। এই দুই ঘোষণাকে পাশাপাশি রাখলে কী তৈরি হয়? সত্য ও কল্পনার মাঝখানে একটি অদ্ভুত অঞ্চল, যেখানে সাহিত্য ইতিহাসের চেয়ে সত্য হয়ে উঠতে পারে। তাহলে উপন্যাসের প্রথম বাক্য কি সত্যিই I am a sick man? নাকি তারও আগে লেখকের সেই নোট? একটি উপন্যাস কোথা থেকে শুরু হয়? প্রথম বাক্য থেকে, না লেখক যে পাঠ-পদ্ধতি আমাদের হাতে তুলে দেন, সেখান থেকে?

এই প্রশ্নটি আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় প্রথম বাক্যের কাছেই। আমরা কি খুব সহজে ধরে নিই যে প্রথম বাক্য মানেই প্রথম লাইন? কিন্তু কোনও কোনও বইয়ে প্রথম বাক্যের জন্ম হয় তারও আগে। কখনও একটি এপিগ্রাফে, কখনও একটি ভূমিকায়, কখনও একটি লেখক-নোটে। যেন লেখক আমাদের বলে দিচ্ছেন, ভেতরে ঢোকার আগে চোখটা একটু বদলে নাও। কারণ একই বাক্য, ভিন্ন চোখে পড়লে, আর একই থাকে না।

এই কারণেই একটি প্রথম বাক্যকে আলাদা করে পড়া যায় না। তার আগে কী আছে, তার পরে কী আছে, এমনকি সে নিজেকে কীভাবে অস্বীকার করছে, সেসবও তার অংশ হয়ে ওঠে। প্রথম বাক্য তখন আর সূচনা নয়; একটি চিন্তার যন্ত্র। সে গল্পের দরজা খোলে না শুধু, পাঠকের ভেতরেও একটি প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়, আর সেই প্রশ্নটি অনেক সময় পুরো উপন্যাস শেষ হওয়ার পরেও বন্ধ হয় না।

এইখানে এসে আর-একটি প্রশ্ন মাথায় আসে, যেটি সম্ভবত শুধু দস্তয়েভস্কিকে নয়, সমস্ত সাহিত্যকেই নতুনভাবে পড়তে শেখায়। আমরা যখন কোনও বই খুলে প্রথম বাক্যটি পড়ি, তখন কি সত্যিই আমরা শূন্য থেকে পড়া শুরু করি? নাকি লেখক ইতিমধ্যেই আমাদের পাঠের কিছু শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন? একটি এপিগ্রাফ, একটি ভূমিকার অনুচ্ছেদ, একটি লেখক-নোট, এমনকি বইটির নামও কি আমাদের প্রথম পাঠকে নীরবে প্রভাবিত করে না?

এই কারণেই রোলাঁ বার্ত বলেছিলেন, টেক্সট কখনও একা আসে না। তার চারপাশে থাকে আরও বহু টেক্সট, বহু কণ্ঠস্বর, বহু পূর্বপাঠ। একটি বাক্য পড়ার আগেই আমরা বহু বাক্যের উত্তরাধিকার নিয়ে তার সামনে পৌঁছই। তাহলে প্রথম বাক্য কি সত্যিই প্রথম? নাকি সে নিজেও একটি দীর্ঘ কথোপকথনের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়?

দস্তয়েভস্কির লেখক-নোট আমাকে সেই কথাটাই মনে করিয়ে দেয়। তিনি যেন প্রথমেই পাঠকের দিকে তাকিয়ে বলছেন, তুমি যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে চলেছ, তাকে বাস্তব বলে ভেবো না, আবার অবাস্তব বলেও নিশ্চিন্ত হয়ো না। এই দ্বৈত নির্দেশ পাঠকের অবস্থান বদলে দেয়। আমরা চরিত্রটিকে আর কোনও নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বিচার করতে পারি না। তার প্রতিটি বাক্য তখন একই সঙ্গে স্বীকারোক্তি, অভিনয়, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং আত্মবিশ্লেষণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ প্রথম বাক্যের আগেই উপন্যাস আমাদের বিচার করার পদ্ধতিটিকে বদলে দিয়েছে।

তখন মনে হয়, প্রথম বাক্যের কাজ গল্প শুরু করা নয়। তার কাজ পাঠককে একটি নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া। একজন সঙ্গীতশিল্পী যেমন রাগ শুরু করার আগে তানপুরা মেলান, একজন চিত্রকর যেমন প্রথম রঙটি ক্যানভাসে তোলার আগে শাদা জমিটিকে দীর্ঘক্ষণ দেখেন, তেমনই একজন ঔপন্যাসিকও প্রথম বাক্যের আগে পাঠকের চোখটিকে একটু প্রস্তুত করেন। সেই প্রস্তুতিটুকু যদি আমরা না দেখি, তাহলে প্রথম বাক্যটিকেও সম্পূর্ণ দেখি না।

এইখানে এসে আবার মারকেসের কথাটিও অন্য অর্থে ফিরে আসে। তিনি বলেছিলেন, প্রথম বাক্যই পরীক্ষাগার। কিন্তু পরীক্ষাগার কি কখনও দরজা খুলেই শুরু হয়? তারও আগে থাকে যন্ত্রপাতি সাজানো, আলো জ্বালানো, রাসায়নিকের বোতলগুলি ঠিক জায়গায় রাখা। উপন্যাসের প্রথম বাক্যের আগেও তেমনই একটি অদৃশ্য প্রস্তুতি থাকে। কোনও বই সেই প্রস্তুতিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে, কোনও বই তাকে গোপন রাখে। কিন্তু সে থাকে।

একজন মনোযোগী পাঠকের কাজ এই অদৃশ্য অংশটুকুও পড়া। কারণ সাহিত্য শুধু যা বলেছে তা দিয়েই তৈরি হয় না; কীভাবে বলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে, সেটিও তার অংশ। একটি প্রথম বাক্য তাই কখনও একা দাঁড়িয়ে থাকে না। তার পিছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে আরও অনেক অব্যক্ত বাক্য, যেগুলো লেখা হয়নি, অথচ না থাকলে এই একটি বাক্যও জন্মাত না।

তখন প্রশ্নটি আরও একটু বদলে যায়। আমরা কি প্রথম বাক্য পড়ছি? নাকি প্রথম বাক্যের জন্ম পড়ছি? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথমটি ভাষার ঘটনা। দ্বিতীয়টি চিন্তার ঘটনা। আর সাহিত্যকে যদি চিন্তার ইতিহাস হিসেবেও পড়া যায়, তাহলে কোনও কোনও সময় সেই অদৃশ্য জন্মমুহূর্তটি দৃশ্যমান বাক্যের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বার্তের কথা যখন এলই, সেটাকে একটু বিস্তারে নেওয়া যাক। তিনি লিখেছিলেন, একটি টেক্সট আসলে অসংখ্য উদ্ধৃতির বুনন; সংস্কৃতির হাজার উৎস থেকে আসা অগণিত কণ্ঠস্বর সেখানে মিলেমিশে থাকে। লেখক কোনও সম্পূর্ণ নতুন ভাষা সৃষ্টি করেন না। তিনি ভাষার মধ্যে আগে থেকেই ছড়িয়ে থাকা নানা ধরনের উচ্চারণ, ভঙ্গি, স্মৃতি, বাগ্‌প্রকরণকে পাশাপাশি বসান, সংঘর্ষে আনেন, নতুন সম্পর্ক তৈরি করেন। তাই টেক্সটের অর্থ কোনও একক উৎসে ফিরে গিয়ে পাওয়া যায় না। তার জন্ম হয় বহু উৎসের মিলনস্থলে।

এই কথাটি দস্তয়েভস্কির লেখক-নোটের পাশে এসে নতুন অর্থ পায়। তিনি প্রথমেই লেখক হিসেবে নিজের কর্তৃত্বকে একটু সরিয়ে দেন। বলেন, এই মানুষটি কাল্পনিক। আবার বলেন, আমাদের সমাজেই তার জন্ম হওয়া অনিবার্য। অর্থাৎ চরিত্রটি কোনও ব্যক্তির নয়, একটি সময়েরও। তখন মনে হয়, আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান শুধু একজন মানুষ নন; তিনি উনিশ শতকের রাশিয়ার বৌদ্ধিক ইতিহাস, যুক্তিবাদের সংকট, আত্মসচেতনতার অতিরিক্ত ভার, ইউরোপীয় দর্শনের অস্থিরতা—এই সমস্ত কিছুর একটি ঘনীভূত ভাষা। তিনি যেন একজন নন, অনেকগুলি কণ্ঠস্বরের মিলিত প্রতিধ্বনি।

তাহলে প্রথম বাক্যটি—I am a sick man—সত্যিই কার বাক্য? আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যানের? দস্তয়েভস্কির? নাকি এমন একটি যুগের, যে যুগ নিজের অসুখকে প্রথমবার ভাষায় চিনতে শুরু করেছে? বার্তের কথাটি এখানে শুধু একটি সাহিত্যতাত্ত্বিক মত নয়; এটি পাঠের একটি পদ্ধতি। কারণ এই প্রশ্নটি আমাদের বাক্যের ভেতরে নতুন একটি দরজা খুলে দেয়। একটি বাক্যের বক্তা কে, এই প্রশ্নের পাশাপাশি আর-একটি প্রশ্নও উঠে আসে—এই বাক্যের ভেতরে আর কারা কথা বলছে?

এই কারণেই একটি টেক্সটকে ডিকোড করা মানে তার অর্থ উদ্ধার করা নয়; বরং তার ভেতরে পাশাপাশি বেঁচে থাকা নানা স্তরের কণ্ঠস্বর আলাদা করে শুনতে শেখা। একটি বাক্যে ইতিহাস কথা বলে, দর্শন কথা বলে, সমাজ কথা বলে, অন্য বই কথা বলে, এমনকি ভবিষ্যতের পাঠকরাও কখনও কখনও কথা বলতে শুরু করেন। একটি প্রথম বাক্য তাই কোনও একক চাবি দিয়ে খোলে না। তার তালায় একসঙ্গে বহু চাবি লাগে।

তখন পাঠও আর অনুসন্ধান থাকে না, হয়ে ওঠে শ্রবণ। আমরা আর শুধু দেখি না, শুনতেও শিখি। একটি বাক্যের মধ্যে কতগুলি ভাষা একসঙ্গে কথা বলছে, কতগুলি সময় একে অপরকে ছেদ করছে, কতগুলি অদৃশ্য টেক্সট নীরবে তার ভেতরে কাজ করছে—সেইসব শোনা থেকেই প্রকৃত ক্লোজ রিডিং শুরু হয়।

 

আমরা সাধারণত ভাবি, লেখক একটি উপন্যাসের পরিকল্পনা করেন, তারপর প্রথম বাক্য লেখেন। কিন্তু উল্টোটাও কি সত্যি হতে পারে? একটি বাক্য নিজেই কি তার উপন্যাসকে খুঁজতে বেরোয়?

আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। তবে আমার নিজের জীবনে এমন একটি বাক্য এসেছিল, যার কোনও উপন্যাস তখনও ছিল না। কোনও গল্পও ছিল না। এমনকি লেখার ইচ্ছাও ছিল না। ছিল শুধু একটি বাক্য। সে বাক্যটি কোথা থেকে এসেছিল, কেন এসেছিল, আমি তাকে লিখেছিলাম, না সে আমাকে লিখেছিল, আজও জানি না। শুধু এটুকু জানি, বহু পরে ফিরে তাকিয়ে দেখি, পরবর্তী কয়েক বছরে আমি যা-যা লিখেছি, তারা যেন সবাই কোনও না কোনওভাবে সেই একটি বাক্যেরই সম্প্রসারণ। তখন প্রশ্নটি আর শুধু সাহিত্যতাত্ত্বিক থাকে না।

এবারে যে প্রশ্নটি আসে, একটি বাক্য কি একটি বইয়ের শুরু? নাকি একটি জীবনেরও? এই প্রশ্নের কোনও নিশ্চিত উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাটুকু না বললে প্রথম বাক্য সম্পর্কে আমার নিজের ভাবনাও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

একদিন এমন এক ঘটনা ঘটল, যার পরে প্রথম বাক্য সম্পর্কে আমার ধারণাই বদলে গেল। ঘটনাটা সাহিত্যিক নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আমি তখন হাসপাতালে। ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের পুরুষ শল্য বিভাগ। শরীরে স্যালাইন, ক্যাথিটার, নাক দিয়ে রাইলস টিউব। বহুদিন ধরে অসুস্থ। লেখা নিয়ে ভাবার মতো কোনও মানসিক অবস্থাতেই নেই। লেখক হওয়া তো দূরের কথা, তখন একমাত্র ইচ্ছে ছিল একটু সুস্থ হয়ে ওঠা। এবং সেই ইচ্ছেটুকুও ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছিল।

একদিন বুঝলাম, ক্যাথিটার ঠিকমতো কাজ করছে না। অন্য এক রোগীর আত্মীয়ের সাহায্যে বাথরুমে পৌঁছলাম। সেখানে দীর্ঘ লাইন। সবাই অপেক্ষা করছে। আমিও দাঁড়িয়ে আছি, অথচ আমার দাঁড়িয়ে থাকার কোনও যুক্তিই নেই। ক্যাথিটার পরে কেউ ইউরিনালের লাইনে দাঁড়ায় না। সেই অদ্ভুত, প্রায় অবাস্তব মুহূর্তে হঠাৎ একটি বাক্য বিদ্যুতের মতো এসে উপস্থিত হল।

‘নরকের একটা ছোট্ট অংশ নেমে এসেছে এখানে, যেখানে আমরা হলাম সেই বোকচন্দর, যারা ক্যাথিটার পরে ইউরিনালের লাইনে দাঁড়িয়ে বলছি, দাদা, একটু তাড়াতাড়ি, পেট যে ফেটে গেল।’

আমি বাক্যটা লিখিনি। লিখে রাখার কোনও উপায়ও ছিল না। কাগজ নেই, কলম নেই। শুধু বারবার মনে মনে উচ্চারণ করছিলাম, যাতে ভুলে না যাই।

এখন ফিরে তাকিয়ে আমার নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে, ওই মুহূর্তে আমার মাথায় কেন একটি বাক্য এল? কোনও গল্প এল না কেন? কোনও চরিত্র নয় কেন? কোনও প্লট নয় কেন? ভাষা কেন ঘটনার আগেই এসে দাঁড়াল?

একটি বাক্য কি তার লেখককে খুঁজে নেয়? নাকি লেখকই অজান্তে বহুদিন ধরে সেই বাক্যের জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন? হাসপাতাল থেকে ফিরে আমি শুধু সেই একটি বাক্য লিখে রাখলাম। আর কিছু নয়। তারপর জীবনের এক অদ্ভুত পর্ব শুরু হল। কলকাতা ছাড়লাম। সংসারের প্রায় সব বিক্রয়যোগ্য জিনিস বিক্রি হয়ে গেল। একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার, কিছু বই এবং সেই একটি বাক্য নিয়ে কোচবিহারে এসে পৌঁছলাম। কোথায় থাকব, কীভাবে বাঁচব, আদৌ লিখতে পারব কি না, কোনও প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বাক্যটি আমাকে ছাড়ল না। প্রথমে একটি নাটক। তারপর একে একে উপন্যাস। পরে ফিরে দেখি, তারা একে অপরের মতো নয়, বিষয়ও আলাদা, ভাষাও আলাদা। অথচ কোথাও যেন একটি অদৃশ্য সুতো তাদের যুক্ত করে রেখেছে। যেন সেই প্রথম বাক্যটি নিজের নানা রূপে ফিরে ফিরে এসেছে।

তখন আমার মনে হল, আমরা হয়তো লেখকের জীবনকে একটু সরল করে দেখি। ভাবি, তিনি একটি বিষয় নির্বাচন করেন, তারপর একটি বই লেখেন। কিন্তু যদি ঘটনাটা উল্টো হয়? যদি একটি বাক্যই ধীরে ধীরে নিজের বই, নিজের ভাষা, এমনকি নিজের লেখককেও তৈরি করতে থাকে?

এমন প্রশ্নের কোনও প্রমাণ নেই। থাকার কথাও নয়। সাহিত্য বিজ্ঞানের পরীক্ষাগার নয়। তবু পাঠক হিসেবে, লেখক হিসেবে, আমি এই প্রশ্নের হাত ছাড়তে পারিনি।

এই কারণেই আজও কোনও নতুন উপন্যাসের প্রথম বাক্যের সামনে দাঁড়ালে আমি একটু থেমে যাই। আমি আর শুধু জিজ্ঞেস করি না, এই বাক্যটি কী বলতে চাইছে। আমি ভাবি, এই বাক্যটি কোথা থেকে এল? এর আগে কতদিনের নীরবতা ছিল? এর পরে কত পৃষ্ঠা অপেক্ষা করছে? আর সবচেয়ে বড় কথা, এই বাক্যটি কি তার লেখককে নিয়ে যাবে এমন কোনও জায়গায়, যার খবর লেখক নিজেও এখনও জানেন না?

 

পরবর্তী সংখ্যা

‘আলো যেখানে কম’ লেখামালার দ্বিতীয় গদ্য কে কথা বলছে?’ প্রকাশিত হবে আগামী সংখ্যায়।

(এই লেখামালা এগারোটি গদ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে)

 

কোচবিহার

arjunbandyopadhyay85@gmail.com

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes