
ধ্বংসকালীন গান
শুভদীপ রায়চৌধুরী
সমাজমাধ্যমে এদিক-ওদিক চোখ রাখলে একটি জিনিস চোখে না পড়ার উপায় নেই যে একটি ভাষ্য ক্রমাগত ভেসে যাচ্ছে, ছুঁয়ে যাচ্ছে লক্ষ কোটি মানুষকে। সেই ভাষ্যে দক্ষিণপন্থী কিংবা মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল ও চিন্তকরা বারবার চিৎকার করে বলছেন, মার্ক্সবাদ একটি মৃত মতবাদ। যদিও “মার্ক্সবাদ” কথাটাই তাঁরা সবসময় ব্যবহার করেন না। কখনো বলেন কমিউনিজম, কখনো সমাজতন্ত্র। এই প্রবল ঘোলাটে পরিভাষার মধ্যে আমি এখন ঢুকতে চাইছি না। এ লেখার বিষয় অন্য। আমার উদ্দেশ্য উত্তর-মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মার্ক্সকে নতুন করে দেখার একটি ছোট্ট চেষ্টা। আর সে জন্য আমি, যেমন মরীচিকার কাছে তৃষ্ণার্ত, যাব গত শতাব্দীর অন্যতম প্রধান চিন্তক ও দার্শনিক, জ্যাঁক দেরিদা-র কাছে।
১৯৯৩ সালে, যখন বনস্পতি পতনের শব্দ শোনা যায় অরণ্যের ও-প্রান্ত থেকে; সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে গেল, ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা, ইতিহাস ও মানুষের শেষ ঘোষণা করে ফেলেছেন, দেরিদা ফিরে গেলেন মার্ক্সের এক নিবিড় এবং উত্তর-গঠনবাদী পাঠের কাছে। তিনি, তাঁর অননুকরণীয় রসবোধ (কেম্ব্রিজের দার্শনিকরা দেরিদাকে সাম্মানিক উপাধি দেওয়ার বিষয়ে বিপুল প্রতিরোধ করেছিলেন যেসব কারণে তার একটা হল ওঁর লেখায় জোকস আর ‘পান’-এর আধিক্য!) এবং বিশ্লেষণের ক্ষুরধার অস্ত্রে অপাবরণ করেছেন এক প্রেতের অপাবর্তণের।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যে মানবসভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশাল ঘটনা, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সে আপনি মার্ক্সবাদ সমর্থন করুন বা না করুন। এই বিপুল পতন যে ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল, তা গোটা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মাত্রায় অনুভূত হয়েছে। সেই ভূমিকম্পের একটি আফটারশক ছিল এই বয়ানের জন্ম— মার্ক্সবাদ শেষ, কমিউনিজম শেষ, ইতিহাস শেষ। ধনতন্ত্রের বিজয় পতাকা পতপত করে উড়ছে ভেঙে পড়া মানবতার স্তূপের উপর।
ঠিক এইখানেই দেরিদা ফিরে আসেন তাঁর বহুত্ববাদী চিন্তাবীজ নিয়ে। লিখে ফেলেন সেই গ্রন্থ, যা, ঠাণ্ডা-যুদ্ধ-উত্তর পৃথিবীতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বকে চিনে নিতে চায় একটি সম্পূর্ণ আলাদা আলোয়। তিনি লেখেন ‘দ্য স্পেক্টার অফ মার্ক্স’। এ লেখা, সে সম্পর্কেই। পরিসরে ও পাণ্ডিত্যে যত দীন হোক না কেন।
কেন আলাদা এই বই? ঠিক কোথায় দেরিদা চিহ্নিত করেন একটি স্বত্রন্ত প্রস্থানপথ? সেটা অনুধাবন করার জন্য আমরা দুটো বিষয়কে সামনে আনার চেষ্টা করব। যার মধ্যে প্রথমটি হল এই বইকে আমরা মার্ক্সের তত্ত্ব সম্পর্কে লিখিত অন্য যেকোনো একটি বইয়ের পাশে রেখে পড়ব। এই মুহূর্তে আমার নাম মনে পড়ছে এমিল বার্নসের ‘What is Marxism’— যার ১৯৬৪ সালের এবং এক-রুপী মূল্যের একটি এডিশান, আমার দিল্লী-ভ্রমণের সময় বুক বাজার থেকে কেনা এবং পুরোটা পড়ে, ‘ওহো! ডগম্যাটিক’ বলে রেখে দেওয়া কপিটা আমি আজ আর কিছুতেই খুঁজে পাইনা।
বার্নসের বইটির সমস্ত শরীরে আধুনিকতার ছেনি-হাতুড়ির দাগ। যে ইউরোপীয় আধুনিকতা রেনেসঁ থেকে শুরু হয়— এবং মধ্যযুগের বিরুদ্ধাচারণ করার সময়ের ও রাজনৈতিক দাবী থেকে যার মূল ভিত্তিটাই স্থাপিত হয় যুক্তিবাদ বা র্যাশনালিজমের ওপরে। যেখানে ইতিহাসের একটিই নির্দিষ্ট গতিপথ— যা ফিউডালিজম হয়ে সর্বহারার একনায়কতন্ত্রে শেষ হবে— সম্ভব এবং সেটাই ধ্রুব ধরে নিয়ে লেখক সেটাকে তারপরে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে মার্ক্সবাদ হল এই পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট এবং বিজ্ঞানসম্মত ফ্রেমওয়ার্ক (ছোটবেলায়, সিপিএম আমল তখন, আমার গ্রামের ওদিকে, দেওয়ালে লেখা থাকত, ‘মার্ক্সবাদ সত্য কারণ ইহা বিজ্ঞান’। এমনকি তখনই, কতই বা বয়স আমার তখন, আমি শ্রাগ করেছি, ‘সাচ নেইভিটি!’)। এ অনেকটা লাঙ্গল জোগাড় হওয়ার আগেই গোরু জুতে দেওয়ার মত ব্যাপার। দেরিদা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন রাস্তায় হাঁটেন। তিনি সব বাঁধন খুলে ভাষার অন্তর্গত অর্থব্যবস্থার কন্ট্রাডিকশানের এঁড়ে গোরুকে ছুটিয়ে দেন।
আমি যা বলতে চাইছি তা হলো এই যে, মার্ক্সবাদের তথাকথিত পতনকে দেরিদা অস্বীকার করেননি। তিনি অস্বীকার করেননি সোভিয়েত মডেলের ব্যর্থতাকেও। কিন্তু তিনি করেছেন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে মার্ক্স যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন—শ্রেণী বৈষম্য, শ্রেণী চরিত্র, এবং শ্রেণী সংগ্রাম—সেগুলো ইতিহাসের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি। বরং বর্তমান পৃথিবীতে সেই প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ফিরে এসেছে।
এখানে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে যদি আমরা বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকাই, তাহলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আমরা দেখছি সাম্রাজ্যবাদ নতুন রূপে ফিরে আসছে। ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির নানা মুখোশ খুলে যাচ্ছে এবং তার ভয়ঙ্কর, দাঁতনখময় চেহারা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এক অদ্ভুত গিগ-ইকোনমির দিকে, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা দক্ষতা গৌণ। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অ্যালগরিদমের দয়া, ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা, এবং একটি ডিজিটাল দৃশ্যমানতার বাজার।
এই অবস্থায় দেরিদার পাঠ আমাদের একটি অদ্ভুত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সামনে দাঁড় করায়। প্রেত বা স্পেক্টারের ধারণা। দেরিদা বলেন, ইতিহাসে কিছু ধারণা কখনো পুরোপুরি মরে না। তারা ফিরে আসে। তারা বর্তমানকে তাড়া করে। মার্ক্স সেই ধরনের একটি প্রেতাত্মা, যাকে যতবার আমরা কবর দিতে চাই, ততবার ফিরে এসে আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।
এবং প্রশ্নগুলো সাধারণ, কিন্তু খুব অস্বস্তিকর। কেন পৃথিবীতে এত বৈষম্য? কেন বিপুল সম্পদ তৈরি হওয়ার পরও কোটি কোটি মানুষ অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে বাস করে? কেন শ্রমের মূল্য ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে? কেন প্রযুক্তিগত উন্নতি মানুষের মুক্তির পরিবর্তে তার বেঁচে থাকাকে ক্রমশ আরও জটিল শৃঙ্খলে জড়িয়ে দিচ্ছে? কেন, ক্রমেই মনে হচ্ছে সবকিছু নিয়ে এক প্রবল ঝাঁপ দিয়েছি আমরা আর খাদের নিচটা কুয়াশায় অদৃশ্য?
হ্যামলেটে— যাকে দেরিদা প্রত্যাশিতভাবেই প্রেতের মেটাফর হিসাবে বহুল ব্যবহার করেছেন তাঁর লেখায়— একটি বিখ্যাত সংলাপ আছে, “The time is out of joint”। সময় যেন নিজের জায়গা থেকে সরে গেছে। দেরিদা মনে করেন আধুনিক পৃথিবীর ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। আমরা ভাবতে ভালোবাসি যে ইতিহাস সরলরেখায় এগোয়, এক যুগ শেষ হয়, আরেক যুগ শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবে ইতিহাস অনেক বেশি জটিল। পুরনো প্রশ্নগুলো, পুরনো দ্বন্দ্বগুলো বারবার ফিরে আসে।
এই অর্থে মার্ক্স হয়তো আর কোনো রাজনৈতিক পতাকার নাম নয়। একটি দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। একটি ছায়া, (দেরিদা ম্যানিফ্যাস্টোর মেটাফরকে ভেঙ্গেই ‘স্পেক্টার’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন) এবং সেই প্রতিধ্বনির ভেতরেই, ‘আলোর রহস্যময়ী সহোদরার’ মত সেই ছায়ার অন্ধকারে, আমরা আমাদের সময়ের কিছু অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন শুনতে পাই।
এই লেখা শেষ করার সময় আমার মনে পড়ছে প্রবাদ-কথিত রোম সম্রাট নিরো-র কথা। শহর পুড়ে যাওয়ার সময় তিনি বেহালা বাজিয়েছিলেন কিনা সেটা সঠিক না জানলেও, সেই ঘটনার প্রেত আমাদের সময়ে ফিরে এসেছে। সমগ্র পৃথিবীতে যখন মানুষের বেঁচে থাকা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা মায় প্রাণের নিশ্চয়তা, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের লোভের সামনে অবলুপ্তপ্রায়, আমরা শুনে চলেছি আইপিএলের বেহালা, রিলের বাঁশি। এই ধ্বংসকালীন গান কি একদিন আমাদের বিদায়সঙ্গীত হয়ে উঠবে?

