
একটি ১৮৪৭ ও কয়েকটি প্রশ্ন
সব্যসাচী মজুমদার
১.
আঠারোশো চুরাশিতে কার্ল মার্ক্স প্লুরিসিতে ভুগে যখন মারা গেলেন, দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব ঘটে গেছে। এই রচনা যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের শিল্প বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ যথেষ্টই সম্ভ্রান্ত ও গভীর। ফলত শিল্প বিপ্লবের ধারা ও তার বিবর্তনের ইতিহাস প্রসঙ্গে এ ক্ষেত্রে প্রবেশ অতিরেক। কেবল কয়েকটি চিহ্ন স্মরণ করে নিতে চাই কার্ল মার্ক্সের মৃত্যু প্রসঙ্গে।
কি সেই চিহ্নগুলো?
প্রথমত : আঠেরোশো আঠারোতে কার্ল মার্ক্সের জন্ম। এ সময় অবশ্যই প্রথম শিল্প বিপ্লবের চূড়ান্ত গৌরবের দিন। প্রথম শিল্প বিপ্লব ভারি শিল্প নির্ভর বিকাশ। মোটামুটিভাবে ১৭৬০ থেকে আঠারোশো চল্লিশ পর্যন্ত এই শিল্প বিপ্লবের প্রলম্বন। এবং এ বিষয়ে আমরা একমত হব যে প্রথম শিল্প বিপ্লবের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল শ্রমজীবী মানুষ। বা উদ্বাস্তু কৃষক। মানুষের সংখ্যাও বাড়ন্ত স্বভাব পেয়েছিল।
দ্বিতীয়ত : মার্ক্স মারা গেলেন আঠারোশো চুরাশিতে। এবং দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব মোটামুটিভাবে ১৮৭০ থেকে ১৯১৪ সময়কালের মধ্যে ঘটেছিল। মার্ক্স দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সম্পূর্ণ অবয়ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন — সন্দেহ কোথায়? দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবে যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেমন— বিমান, রেল, ফোন, বিদ্যুৎ, ইস্পাত, রাসায়নিক শিল্প প্রধান হয়ে উঠল। এখানেও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করল শ্রমিক শ্রেণি। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই মানুষের সম্মিলিত পরিশ্রমে ও সিংহভাগ অংশগ্রহণে সার্থক হয়ে উঠল দুটো শিল্প বিপ্লবের শরীর। এবং রাজনৈতিকভাবে মার্ক্স গোটা পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেন।
তৃতীয়ত : তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সময় এসে গেল।আসলে ডিজিট্যাল বিপ্লব। আমরা জানি, ১৯৭০ থেকে আশির দশকে ঘটল এই বিপ্লব। মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই শিল্প বিপ্লবকে স্বভাবে আলাদা করে দিল। কম্পিউটার এবং কম্পিউটার নির্ভর ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং রোবোটিক্স। এই সময়ে দুটো আরও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। এক.শিল্প বিপ্লব বা উৎপাদনের জন্য মানুষের প্রয়োজন কমতে লাগল। দুই.বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটল। মার্কসের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা কমল। বলতে চাইছি না যে, মার্ক্সের প্রাসঙ্গিকতা কমল। বলতে চাইছি, রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা কমল। অন্তত আশির দশক থেকে পরপর যখন গোটা পৃথিবীতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব ফিকে হতে শুরু করল — এ কথা আমরা খুব জোর দিয়ে অস্বীকার করতে পারি না।
চতুর্থত : ঘটল চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। বা ইন্ড্রাস্ট্রি ৪.০। মোটামুটিভাবে ২০১৫ সাল নাগাদ ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ নামটি আমরা পেয়ে থাকি। এই পর্বে উন্নিত হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবর্গ পরিস্থিতি, স্মার্ট উপকরণ। এবং এই পর্বে এসে দেখা গেল লিবারেলিজমের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা অনেক ফিকে হয়ে গেছে।বরং ডেটাইজম অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে মানচিত্রকে নতুন করে তৈরি করতে চাইছে। মানুষের শ্রমের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই কমে গেল। মার্ক্স নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের চরিত্র ও চারিত্র্য বদলে উদবর্তন ঘটাল বটে কিছু নির্দিষ্ট দেশে, কিন্তু তার সঙ্গে কমিউনিজমের কতটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে — এতদ্বিষয়ে তর্কে কিন্তু উদ্বেল হয়েছি আমরা।
এখন প্রসঙ্গ হল মার্ক্সের মৃত্যু। এক্ষেত্রে যে মার্ক্সের জীবন যাত্রার করুণ সমাপতনের গল্প পড়তে চাইছি না আমরা তা তো স্পষ্ট। আমরা জানতে চাইছি, আদৌ কি মার্ক্স কিংবা মার্ক্সের মাধ্যমে আমরা ব্যখ্যা করতে পারছি আমাদের সমকালীন ও সম্ভাব্য পৃথিবীকে ? এটা একটা বিরাট প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে পথ হারাবার প্রভূত সম্ভাবনা। আমি কেবল কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি করতে চাইছি প্রাজ্ঞ পাঠক সমীপে।
এ কথা এ তাবৎ মার্ক্স চর্চার ফলে নতুন কিছু নয় যে, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে বিংশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি করেছিলেন মার্ক্স। কোন অর্থে? প্রথম এবং দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় মানুষের প্রায় সমস্ত অংশকেই স্পর্শ করেছিলেন। সমবণ্টনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। অধিকার সচেতন করে তুলেছিলেন। এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের সমাজ গঠনের সবচেয়ে বড় জোর যেটা, মানুষের সারভাইভালের সবচেয়ে নির্ভর যেখানে, অর্থাৎ যৌথ যাপনের শৌর্যকে উদযাপন করেছিলেন। আমরা জানি, মানুষ অনেক অক্ষমতা সত্বেও প্রাণী জগতের শীর্ষে অবস্থান করতে পারছে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে অন্যান্য প্রাণী সমূহকে, তার প্রধান কারণ সমবেতভাবে একই জিনিস ভাবার ক্ষমতা ও ভাবানোর ক্ষমতা। আর অন্য কোনও প্রাণী এটা বোধহয় পারে না। কার্ল মার্কস সম্ভবত মানুষের উদবর্তনের প্ররোচনায় অর্জিত এই স্বভাবের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে চেয়েছিলেন। ছড়িয়ে থাকা শিল্প বিপ্লবে ( প্রথম ও দ্বিতীয়) ব্যবহৃত মানবসম্পদের ওপর বঞ্চনাকে যৌথ সচেতনার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে চেয়েছিলেন — এভাবে যদি সরলীকরণ করি, তবে এই দু’হাজার ছাব্বিশে এসে তিনটি প্রসঙ্গ ও প্রশ্ন বিশদ হয়ে উঠেছে।
এক্ষেত্রে আমাদের তিনটে চিন্তার ওপর আলোকপাত করতে হবে। প্রথমত সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো, দ্বিতীয়ত এন্টিনেটালিজম এবং তৃতীয়ত সিন্থেটিক এ আই।
সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো:
সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো সম সময়ে একটি জনপ্রিয় চর্চা হয়ে উঠলেও কিন্তু ১৯৮৫ সালে ডোনা হারাওয়ের একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে বিশেষ এই চিন্তাটি নথিবদ্ধ হয়। হলিউড এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে একশন মুভির একটা সিকোয়েল ‘টার্মিনেটর’ তৈরি করলেও ম্যানিফেস্টো অতটাও রোমান্টিক নয়। ইউরোসেন্ট্রিক বলে চিহ্নিত করতেই পারি, তবে চিন্তাটি এখন ইউরোপের বাইরেও জনপ্রিয় হচ্ছে। খুব সরলীকরণে এভাবে বলা যেতে পারে যে, সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো আসলে যন্ত্র এবং জৈবের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক নতুন ধরনের মানুষের প্রাসঙ্গিকতার কথা বলতে চাইছে। যন্ত্র তো আসলে প্রাকৃতিক একটি সম্পাদনা। মানুষের সম্পাদনা। সেই সম্পাদিত নির্মাণকে মানুষের জৈবিক গঠনের সঙ্গে মিশিয়ে একটি আধা যান্ত্রিক মানুষ তৈরি হলে হারাওয়ের বিশ্বাস মূলত তিনটি দ্বন্দ্ব শেষ হতে পারে। পশু ও মানুষের দ্বন্দ্ব, পশু-মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের দ্বন্দ্ব এবং জৈব ও অজৈবের দ্বন্দ্ব। কিন্তু, এই আলোচকের মনে হয় মূলত নারীবাদী প্রসঙ্গের জন্য চিন্তাটি গৃহীত হচ্ছে। যন্ত্র ও মানুষের মিশ্রণে তৈরি নতুন মানুষ প্রজাতির ভেতর নারী পুরুষের ভেদ কমে যাবে। থাকবে না। যদিও ইতিমধ্যে জেন জি ও আলফা লিঙ্গের পার্থক্য স্বীকার করতে চাইছে না। উইল স্মিথের ছেলে জাদেন স্মিথকে এক্ষেত্রে আমরা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি। এখন, বক্তব্য হল মানুষ এই সাইবর্গ ম্যানিফেস্টোর চিন্তাকে জীবনে গ্রহণ করছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে। মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন থেকে গৃহীত মনস্তত্ত্বের বিবর্তন ঘটাচ্ছে ‘প্যাচ ওয়ার্ক গার্ল’। শেলি জ্যাকসন রচিত এই উপন্যাসটি আমরা পড়ে দেখতে পারি। এখন, প্রশ্ন হল সাইবর্গ ম্যানিফেস্টোকে বিশ্বাস করছেন ও পালন করে নতুন মানুষের সংজ্ঞা তৈরি করতে চাইছেন যাঁরা, তাঁদের কাছে বা যাঁরা সাইবর্গ, তাঁদের কাছে, সমাজ ধারণা, যৌথতার ধারণা বদলে যাবে। বদলে যাচ্ছেও। সেক্ষেত্রে মার্ক্স নির্ভর কমিউনিজম চর্চা তার ব্যখ্যা কিভাবে রাখবে ? অন্তত এই অমিত ক্ষমতাশীল, প্রায় স্বয়ংনির্ভর মানুষ কিভাবে যৌথ খামারের বা সমবণ্টনের আওতায় আসতে পারে ?
আপনি হাসছেন। এই ইউরোসেন্ট্রিক হাইপারথিসিস প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক তা তো এখনও পরীক্ষিত নয়, তাহলে এই রজ্জুতে সর্পভ্রমের অর্থ কি ? যদি তাই হয়, তবে আমরা এই সূত্র ধরে চলে যাব সিন্থেটিক এ আইয়ের প্রসঙ্গে। যদিও প্রসঙ্গ গ্যালপ করে যাব না।
ফলত আমরা এবার দেখে নেব
এন্টিনেটালিজমকে।
এন্টিনেটালিজম :
এন্টিনেটালিজমকে আমরা নতুন বোতলে পুরোনো মদের মতো ভাবতেই পারি। সন্তান গ্রহণে অনীহা। এতো নতুন কিছু নয়। যেখানেই মানুষের সমাজ গড়ে উঠেছে, উজ্জাগরিত হয়েছে ধর্ম। আর প্রতিটি ধর্মেই অবিবাহিত থেকে সন্তান উৎপাদন না করে ঈশ্বর ভজনা স্থান পেয়েছে, গুরুত্ব পেয়েছে। তবে, এও ঠিক সম্ভবত সবক্ষেত্রেই সন্তান উৎপাদন না করার প্রবণতাটি সফল হয়নি। ভারতীয় পৌরাণিক ইতিহাসেই আমরা অবিবাহিত ঋষির মাধ্যমে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের খবর আমরা পাই। সম্ভবত এন্টিনেটালিজম যা বলতে চায়, তাকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করে বৌদ্ধ ধর্মের গঠন ও কাঠামো।
লক্ষ করার বিষয় হল, এই এন্টিনেটালিজম এখন কেবল হাইপারথিসিস নয়। সম্প্রতি ২০২৫ সালে বাংলাদেশের একটি সন্তান বনাম বাবা -মায়ের আইনি সংঘাতের মাধ্যমে বোঝা গেছে এই চিন্তাটি এখন কেবল ধারণার স্তরেই আটকে নেই। খুব সহজে বলা যায় যে, সমকালীন দূষিত পৃথিবীতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অস্থির পৃথিবীতে সন্তান জন্ম দেওয়ার মানে তাকে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে বাধ্য করা। ফলত সন্তান উৎপাদনের বিষয়টিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করে পৃথিবী থেকে নিজেদের অর্থাৎ সেপিয়েন্স শ্রেণির একটি নির্দিষ্ট অংশকে বিলোপের পথে নিয়ে যেতে চান। এই চিন্তার বিরুদ্ধে একাধিক কথা বলা যায়। কিন্তু, একটা প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে, কেন ? এই চিন্তার প্রসার ঘটছে কেন ? মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকেরা এই চিন্তাকে জীবনে গ্রহণ করছেন কেন ? প্রতিরোধের বদলে প্রত্যাহার কেন বেছে নিচ্ছেন?
এই উত্তরটিকে খুঁজতে গেলে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে এই আলোচনার একটি পূর্বোল্লিখিত প্রসঙ্গে। শিল্প বিপ্লব। তৃতীয় এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর মানুষের, শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমে গেল একেবারেই। অর্থাৎ প্রথম এবং দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের জন্য যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছিল, বলা ভাল যে শ্রমজীবী শ্রেণির সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছিল, এখন তারা অতিরেক। এখন তারা পুঁজি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বোঝা। এখন বিলোপের প্রয়োজন। কেন প্রয়োজন বিলোপের?
দেখুন, আশির দশক থেকেই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহারের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কারখানায় বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে জন সম্পদের প্রয়োজন কমতে লাগল। বিভিন্ন দেশের সরকারি এবং বেসরকারি চাকরির বিলুপ্তির তথ্য দেখলেই এর ভয়াবহতা টের পাওয়া যায়। গুগলে সহজেই তথ্য পাওয়া যায় বলে আর ভারাক্রান্ত করলাম না এই সন্দর্ভ। কেবল একটি উল্লেখ রাখা যায় যে, কেবলমাত্র ভারতীয় রেল প্রায় দু’লক্ষের মতো পদ বিলোপ করেছে। এখন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রও নয়, দু’হাজার পনেরোর পর এ আই, বলা ভাল সিন্থেটিক এ আই দায়িত্ব নিচ্ছে যাবতীয় উৎপাদনের। নোয়া হারারি ইতিপূর্বে একটি আশংকার কথা প্রকাশ করেছেন। যা ইতিমধ্যেই বাস্তবতা পাচ্ছে। সিন্থেটিক এ আই এবং সাধারণ এ আইয়ের যৌথ উপস্থিতি মূলত শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কর্মহীন করে দেবে দু’হাজার চল্লিশের মধ্যে।( আবহমানে প্রকাশিত ‘এন্টিনেটালিজম’ সম্পর্কে এই লেখক রচিত প্রবন্ধে এ সম্পর্কে বিশদ তথ্য ব্যবহার করা গেছে।) তারা উৎপাদন করবে আর মানুষ সেই উৎপাদন বন্টন করে নেবে নিজেদের মধ্যে — খুব ভাল ব্যবস্থা সন্দেহ নেই। ইলন মাস্ক বলেই দিচ্ছেন আগামীতে চাকরি অপশনাল হয়ে যাবে। চাকরি না করলেও মানুষ রাষ্ট্রের মাধ্যমে উৎপাদনের অংশ পাবেন। যাকে ভাতা বলে। বস্তুত যেসব রাজনৈতিক দল আজকের ভারতে বা পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে — হয়তো অল্প কিছুর বন্দোবস্ত করতে পারবে, কিন্তু, বেকার বাড়বেই। হয়তো তাঁরা জেনে অথবা না জেনে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, কেননা আমরা ভারতীয় মধ্যবিত্তেরা চাকরির ওপরে নির্ভর করতে ভালবাসি; কিন্তু ওটা ভোট বৈতরণী পর্যন্তই। ভোটের ফলাফল কখনও ঘটমানতার গতি রোধ করতে পারে না। রেল থেকে স্বাস্থ্য থেকে হোটেল থেকে নির্মাণ থেকে শিক্ষা — সবক্ষেত্রে এ আইয়ের ব্যবহার বাড়ালে চাকরির সুসমব্যবস্থা অসম্ভব। মানুষের ভবিষ্যত এখন চাকরি নির্ভর নয়— স্রেফ ক্রিয়েটিভিটি অথবা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ভাতা বা সম্পদের বন্টন। বস্তুত বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি কেমব্রিজের কৃতিদের অস্বীকার করে, অশিক্ষিত কিন্তু উদভাবনী শক্তি সম্পন্ন মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি। ভারতে এরকম শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলছেন ফোবর্সের শ্রীধর ভেম্বু। ফলে ভাল ইউনিভার্সিটির স্কলার হয়েও বড় কোম্পানির চাকরি এখন আর সহজ নয়।
যা হোক, রাষ্ট্র যদি এ আইয়ের উৎপাদনকে সংগ্রহ করে তার অধিবাসীদের মধ্যে বণ্টন করে — তবে তো উদ্ভাবকদের পক্ষে খুবই প্রসন্ন সময় আসতে চলেছে। কিন্তু, সব মানুষই তো উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন হন না বা হঠাৎ করে চর্চা ছাড়া উদ্ভাবক হয়েও ওঠা যায় না — তাঁদের কি হবে? আমরি সেক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টি ফেরাব এই সময়ের জাপানের দিকে। সঙ্গত কারণেই, টেকনোলজির কারণেই জাপান ভবিষ্যতের দিকে এক দশক এগিয়ে অন্তত।
সোসাইটি ৫.০ :
ইউনেস্কোর সায়েন্স রিপোর্ট জানাচ্ছে সোসাইটি ৫.০ -র দিকে যাওয়ার সময় বেড়ে গেছে জাপানের আত্মহত্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক রোগ। কেন ? এ আই এবং স্বয়ংক্রিয়তা নির্ভর জাপানে চাকরির বাজার সত্যিই ঐচ্ছিক হয়ে গেছে প্রায়। এখন স্পষ্ট দুটো শ্রেণি জাপানে তৈরি হয়েছে। একটি হায়ার্ড শ্রেণি এবং আরেকটি নন হায়ার্ড। মানে, একদল যোগ্য, যারা চাকরি পাচ্ছে। আরকে দল যোগ্য যারা চাকরি পাচ্ছে না — নন হায়ার্ড।
যাঁরা নন হায়ার্ড, তাঁদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার মতো উপযুক্ত ভাতা। কিন্তু, একধরনের নিষ্কর্মা জীবন তাঁদের হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। আর হায়ার্ড যাঁরা, তাঁদের অবস্থাও সঙ্গীন। বস্তুত প্রতি মুহূর্তে এ আইয়ের সঙ্গে লড়াই চালাতে হচ্ছে চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য। বাড়ি ফেরার সময় তো হচ্ছেই না। ঘুমেরও। সেখানেও শুরু হয়েছে মৃত্যু মিছিল। আধ ঘণ্টা ঘুমানোর জন্য পার্লার খোলা হয়েছে সে দেশে।
এ প্রসঙ্গে একবার দেখে নেওয়া যাক, সোসাইটি ৫.০ বলতে কি বোঝানো হচ্ছে —
“The transition to Society 5.0 is deemed similar to the ‘Fourth Industrial Revolution’, in that both concepts refer to the current fundamental shift of our economic world towards a new paradigm. However, Society 5.0 is a more far-reaching concept, as it envisions a complete transformation of our way of life.
In Society 5.0, any product or service will be optimally delivered to people and tailored to their needs. At the same time, Society 5.0 will help to overcome chronic social challenges such as an ageing population, social polarization, depopulation and constraints related to energy and the environment.
In Society 5.0, autonomous vehicles and drones will bring goods and services to people in depopulated areas. Customers will be able to choose the size, colour and fabric of their clothing online directly from the garment factory before having it delivered by drone. A doctor will be able to consult her patients in the comfort of their own home via a special tablet. While she examines them from a distance, a robot may be vacuuming the carpet. At the nursing home down the road, another robot may be helping to care for the aged.”( Japan pushing ahead with Society 5.0 to overcome chronic social challenges : UNESCO science report : 2019. Last update 2024)
এখন আমার প্রশ্ন হল, যখন শ্রমজীবী অপ্রাসঙ্গিক অংশে পরিণত, যখন মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী শ্রেণিকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কখনও এন্টিনেটালিজমের মাধ্যমে, কখনও সিন্থেটিক এ আইয়ের মাধ্যমে — সে ক্ষেত্রে মার্ক্স নির্ভর কমিউনিজম এবং তার রাজনৈতিক প্রয়োগ কিভাবে পথ দেখাতে পারছে ? কতটাই বা সে প্রাসঙ্গিক?
কেননা, যৌথতার ধারণাকেও একটা মিথে পরিণত করার চেষ্টা চলেছে অনিবার। কিভাবে? দেখুন, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বোধের ধারণা বহু বছর আগে অকৃতকার্য হয়েছে। এ কথা আমরা বুঝে গেছি একটি মানুষ মানে একটা বিরাট সময় পর্বের অভিঘাত। একটা মানুষ মানে অনেক মানুষ এবং চিন্তার যৌথ নির্মাণ। ফলে ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার উপাদান তৈরি হয়েছে। এবং তা ঘন সংঘবদ্ধ হচ্ছে। এর নিপুণ উদাহরণ স্মার্টফোন। একটি স্মার্টফোন আর জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার যোগান থাকলেই মানুষকে আর বাড়ি থেকেই বেরুতে হচ্ছে না। এমনকি বাড়িতে বসেই কনটেন্ট ক্রিয়েট করেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রোজগার করা যাচ্ছে। তাছাড়াও এ কথা আমরা অস্বীকার করতে পারছি না, স্মার্টফোন এখন একইসঙ্গে এমন একটা মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্ব, যা মানুষের প্রায় শারীরিক অংশে পরিণত। মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যাচ্ছে মোবাইলের জন্য। এমনকি ফেসবুকের অ্যালগোরিদমের জন্য কবিতার আকারও ছোট হয়ে যাচ্ছে।
এখানেই ফিরে আসছে সাইবর্গ প্রসঙ্গ। সাইবর্গ কেবলমাত্র শরীরের ভেতর যন্ত্রাংশ বইলেই হয় না, যন্ত্র নির্ভরতার এহেন উদাহরণ অবশ্যই আমাদের সাইবর্গ ধারণার দিকে ইঙ্গিত দেয়। মানুষ স্বাতন্ত্র্য বোধের বদলে বিচ্ছিন্নতার চর্চায় নিমগ্ন হয়েছে অনেক। যার একটি নমুনা লোন উলফ। অর্থাৎ, বলবার কথা হল, ক্রমশ নিজের প্ররোচনায় নিজের অর্জিত সামাজিক স্বভাবের থেকে দূরে যেতে শুরু করা মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে কতটা প্রশমন পাচ্ছি কার্ল মার্ক্সের নির্ণয় থেকে? কতটা পাচ্ছি এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের শ্রম ধারণাকে ব্যখ্যা করতে ?
তার ওপর আরও একটু সন্দেহ এবং মৌল একটি সন্দেহ তৈরি হয়েছে মানুষের মার্ক্স নির্ভর কমিউনিজম চর্চার ওপর। এই সন্দেহের বড় ভিত্তি হল তথ্য। আমরা যদি আমাদের বিগত শতকের ইতিহাস লক্ষ করি , তবে, দেখতে পাব, ফাসিস্ট কিংবা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে তথ্য সবসময় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে থেকেছে। রাষ্ট্র তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অতঃপর লিবারালেরা তথ্যের মুক্তি ঘটালে তথ্য এখন এই দু’হাজার খ্রিস্টাব্দ পরের পৃথিবীতে নিজেই একটা মতবাদে পরিণত। যার স্পষ্ট দুটো দিক আছে। একটি তথ্য এবং তার দ্বিমুখী অভিঘাত মানুষের সমাজে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন এনেছে। তার মধ্যে একটি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। ক্রিপ্টো কারেন্সি এবং বিট কয়েনের কথা বলছি। সাম্প্রতিক বাজারে এই দুটি দৈত্য আক্ষরিক অর্থেই আমাদের বিগত অর্থনৈতিক ধারণা ও পরিস্থিতিকে পাল্টে দিয়েছে।
পূর্ব সূত্র অবশ্যই ছিল। কিন্তু, এতটা নতুন শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাজার খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী সময়ে মার্ক্সিজম নতুন ব্যখ্যা চেয়েছে। চেয়েছে বিন্যাসের ভিন্ন মাত্রা। এ আমরা বুঝতে পারি। যখন পূর্বোল্লিখিত একটি তথ্যের দিকে আবার লক্ষ করি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রথম শিল্প বিপ্লবের পর তার অভিজ্ঞতা নিষ্ণাত এবং দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের পর্বে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে মার্ক্সিস্ট চিন্তা। অতঃপর তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শুরু থেকেই সে প্রশ্ন বিদ্ধ হতে শুরু করে এবং গোটা পৃথিবীতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে।
এবং এই ক্ষমতা হারানোর প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়তে পারে সাঁর্ত্র-কাম্যুর তর্কটি। এই আলোচকের মনে হয়, বিপ্লবের প্রাথমিক দিনগুলোর পর বোধহয় কোথাও কাম্যুর চিন্তাই অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে কাম্যুর একটি মন্তব্য উদ্ধার করতে ইচ্ছে করছে,
A man who says no, but whose refusal does not imply a renunciation. He is also a man who says yes, from the moment he makes his first gesture of rebellion.
এবং
An act of rebellion is not, essentially, an egoistic act. Of course, it can have egoistic motives…The rebel…demands respect for himself, of course, but only in so far as he identifies himself with a natural community…When he rebels, a man identifies himself with other men and so surpasses himself, and from this point of view human solidarity is metaphysical.
মানুষের বিবিধ বৈচিত্র্য ও অভিমুখের কথা আমরা যদি ভাবতে না পারি তাহলে আদর্শ রাষ্ট্রের বোল অফ সালাড তৈরি হয় কি ? যতটুকু ধারণা হয়, মানুষ তার নিজের মতো, নিজের নিরাপত্তা ও উদবর্তনের সাপেক্ষে এক এক রকমভাবে যৌথতাকে ভেবেছিল, তাকে নির্মাণ করেছিল। ভূগোল এবং আবহাওয়ার তাড়নায় এই যৌথতার ধারণা ও শর্ত বদলেছে। তা যে সবসময় সর্বতোগামী হয়ে উঠতে পেরেছে, তা তো নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তার সঙ্গে শ্রেণি সাপেক্ষে দ্বন্দ্ব গড়ে উঠেছে। খুব সরলীকরণে বলা যায়, ফিউডালিজম থেকে মার্ক্সিজম — প্রত্যেকেই তার নিজের মতো করে কমিউনিজমকে, নিজের নিরাপত্তা ও উদবর্তনের সাপেক্ষে কমিউনিজমকে ভেবেছে। সেক্ষেত্রে মার্ক্সিজম বোধহয় সবচেয়ে বেশি মানুষের, সব শ্রেণির মানুষকে ছুঁতে পেরেছিল, ব্যখ্যা করতে পেরেছিল। তাই কি বলা যায়! আমাদের উপমহাদেশের সাপেক্ষে ভাবলে বৌদ্ধ দর্শন, চৈতন্য দর্শনকে কি মনে পড়ছে না ? এ সব বহু চর্চিত কথা। মূল বক্তব্যে ফেরা যাক, মানুষ বিভিন্নভাবে, বিবিধ অবস্থানে তার গোষ্ঠীর সার্থ রক্ষা করতে চেয়েছে। সেই গোষ্ঠী কখনও সংকীর্ণ আকারে কখনও বৃহত্তর আকারে ব্যাখ্যা পেয়েছে।
আবার ডেটাইজমও কিন্তু তথাকথিত :তথ্যের সাম্য’ তৈরি করতে পেরেছে। দেখুন, আপনার কাছে ঠিক যে যে তথ্য আছে বা থাকতে পারে বা যে তথ্য ভাণ্ডারে আপনি প্রবেশ করতে পারেন, তা কিন্তু একজন তথাকথিত ক্ষমতাবান মানুষেরই মতনই পারেন। আপনার কাছেও সেই সুযোগগুলি রয়েছে, যার ফলে আপনার তথ্য সংগ্রহের সমান অধিকার জন্মেছে।এখন সেই সংগ্রহের দৌড়ে আপনি কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকলেন — নির্ভর করছে আপনার ওপর। এবং এই সংগৃহীত তথ্যকে আপনি অস্ত্র হিসেবে না উত্তরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন— নির্ভর করছে আপনারই ওপর। কিন্তু তথ্যের সাম্যবাদ তৈরি হয়েছে।
এটাই বলার যে, কমিউনিজমের বাংলা যদি সাম্যবাদ হয়, তবে, মানুষের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার ধরনের, বিস্তৃতির, মাত্রার, উপাদানের বিবর্তন ঘটেছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে। যূথ নির্ভর মানুষ নিজের তাগিদেই যৌথের ধারণা, সমতার ধারণা বজায় রেখেছে। কিন্তু সে ধারণা বিবর্তিত হয়েছে সমাজ বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে।
এখন প্রশ্ন হল, মার্ক্সের সাম্যবাদের ধারণা কি মানুষের বিবর্তনের দু’হাজার খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী মানুষের সমাজ বিবর্তনের সঙ্গে বিবর্তিত হতে পেরেছে? যদি জিও পলিটিক্সের দিকে তাকাই — তথ্য আমাদের নঞর্থকতার দিকে টানছে। আবার সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো, এন্টিনেটালিজম, এলজিবিটিকিউ আন্দোলন বা অ্যান্ড্রোজেনিক চিন্তাপ্রবাহ আমাদের একই ধারণার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না কি ! কেন ? এখনও সমস্ত দেশেই পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মার্ক্সবাদের চর্চা হয়ে চলেছে অবিরত। তবুও এই ধারণা হচ্ছে কেন, যে, মার্ক্সবাদ দুই হাজার পরবর্তী সময়ে মানুষের সমাজ বিবর্তনের অনুপাতে বিবর্তিত হতে পারেনি ! সেক্ষেত্রে আমাদের পূর্বে উল্লেখিত আরেকটি প্রসঙ্গকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কাম্যু এবং পার্টি।
সেক্ষেত্রে আমাদের এই লেখাটির দ্বিতীয় পর্বে যেতে হবে।
২.
১৮৪৭ -এর কমিউনিস্ট লিগ প্রতিষ্ঠিত হল। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো তৈরি হল। তবে রাজনৈতিক পার্টি হিসেবে আনুষ্ঠানিক ১৯১৯কে যদি ধরা যায়, এরপর থেকে মনে হয়, পার্টি মার্ক্সের বিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। আবার এই এই পার্টিই মার্কসের প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ভর। কেন এ কথা মনে হচ্ছে?
আলোচনা বিশদ করার আগে একটি কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। তা হল, একটি রাজনৈতিক দল যখন একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে, শাসন পরিকাঠামোয় প্রাথমিক বদল হয়তো আনে। রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সমান্তরাল ধারা অথবা বিবর্তনকে, বদলকে সে হয়তো স্বীকার করে।গ্রহণ করে, স্থাপন করে। তারপর আমরা দেখেছি, বিবর্তনের যে স্তরটিকে সে প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেছে, সেটিকেই ধারণ করে, প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু বিবর্তনের সঙ্গে তার আর চলা হয় না। যদি বিবর্তনের সঙ্গে পার্টিকেও, তার ব্যকরণকেও বিবর্তিত হতে হয়, অর্থাৎ স্বতঃবিবর্তনের ধারার সঙ্গে তাকে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, তবে, আত্মবিরোধীতার যে অবকাশ তৈরি হয়, তা বোধহয় রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে অক্ষম হয়। ক্ষমতা নিজেকে স্বরাট দেখতে চায়, রাষ্ট্র চায় স্থিতি।আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যদি ‘পুঁজি’ শব্দটিকে ব্যবহার করি। তবে, পুঁজির অধিকারী চাইবেন স্থিতি। আর রাষ্ট্রের ধারণা যদি প্রতি মুহূর্তে নিজের বিরুদ্ধে বিপ্লব শুরু করে, স্বভাবতই পুঁজির বিপদ।
এই আত্ম বিরোধীতা যে কোন পর্যায়ে যেতে পারে, তার নমুনা আমরা একটি সমীকরণের মাধ্যমে দেখতে পারি— সাঁর্ত্র অস্তিত্ববাদী। ডস্টয়ভস্কি অন্যতম অস্তিত্ববাদী চিন্তা প্রণেতা। এবার তারকোভস্কিও অস্তিত্ববাদী, বিশুদ্ধতার দর্শনে নির্ভর করতেন।তবে স্টালিন তান্ত্রিক শাসনকেও আপোসে-বিরোধে সমর্থন করতেন। যেমন সমর্থন করতেন সাঁর্ত্র। এবার তারকোভস্কি ‘ইডিয়ট’-কে নিয়ে কাজ করার কথা ভাবলেন। বিরোধীতা করল রাশিয়া। তারকোভস্কি দেশ ছাড়লেন। ইতালিতে গেলেন। সমর্থন পেলেন সাঁর্ত্রর। এখন সাঁর্ত্র = কমিউনিস্ট রাষ্ট্র — এই সমীকরণটি কি দাঁড়াল ?
যা হোক,মানুষ তার সীমাবদ্ধতার ভেতরেই স্বাধীনতার সিদ্ধি তৈরি করে। অর্থাৎ এভাবে, যদি, আমরা দেখি, যখন একটি জীবের আকার তৈরি হচ্ছে, সে তার নির্মাণের কারণেই সীমাবদ্ধ। তার স্বাধীনতার ধারণাও আসলে, তার বা তার গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। পূর্ণ স্বাধীনতার ধারণা অনেকটাই অলীক। একটি সম্মিলিত চিন্তা তার ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী স্বাধীনতার কথা চিন্তা করে।
ঠিক এই স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার দিকে যাত্রার প্রবণতার প্রশ্নে সাঁর্ত্র-কাম্যুর বিরোধ তৈরি হয়।
Man is condemned to be free — এই চিন্তা সাঁর্ত্র, কাম্যু দু’জনকে মিলিয়েছিল। কিন্তু, কি করে এই স্বাধীনতা আসবে — এই চিন্তাই দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কাম্যু মানুষকে স্বভাব বিদ্রোহী বলেই মনে করতেন। কিন্তু, বিদ্রোহের মিতাচার ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। অপর দিকে সাঁর্ত্র চেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠা। মতবাদের, চিন্তার প্রতিষ্ঠা। যে প্রতিষ্ঠার পথ সবসময় পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক। অন্তত শিল্পোবিপ্লবোত্তর পৃথিবীতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে লড়াইটাও অনেক কঠিন হয়ে যায়। একটি চিন্তায় ধীরে জারিত হওয়ার জন্য যে সময়টি লাগে সেই সময়কে ব্যবহার করে অনায়াসে বিরোধী চিন্তা পরিস্থিতিকে গ্রাস করতে পারে। এই পরিস্থিতি হয়তো অনুভব করতে পেরেছিলেন এবসোলিউট ফ্রিডমের স্বপক্ষের সাঁর্ত্র। একটা পরিবর্তিত চিন্তায়, বিপ্লবের বাসনায় একটি জন গোষ্ঠীর বেশ কিছু সময় লাগে। যে সময়ের ব্যপন কয়েক শতাব্দী ধরেও হতে পারে। কিন্তু, তা বিদ্রোহের চাইতেও বিবর্তনকে সমর্থন করে অধিক। সাঁর্ত্র যে বিদ্রোহকে চেয়েছিলেন তার প্রত্যক্ষ এবং প্রতিষ্ঠাকামী। রাষ্ট্র, বিশেষ করে পার্টির পক্ষে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যখন বিরোধ ও শোষন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে সামাজিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো হরণ করে নিচ্ছে, ঠিক সে সময় অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র কেই সঠিক উত্তর যদি ধরে নিই,তবে বিকল্প ভাবনার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা দখল দুইই সহজ হয়ে যায়। এই এনার্কিজম ক্ষমতা দখলের রাজনীতির মতো মনে হলেও প্রতিষ্ঠা নির্মাণের পর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা ক্ষমতার শরীরের বদলের প্রয়োজন সাঁর্ত্রর অন্বিষ্ট ছিল। কিন্তু, প্রশ্নটা ওই ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়ে গেল।
ধরা যাক, একজন ফ্যাসিস্টকে কানে বন্দুক রেখে কমিউনিজমের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য করা হল। কিন্তু, বিশ্বাস করানো গেল না। যে অবিশ্বাসটুকু তার চিন্তায় রয়ে গেল, তার প্রত্যাঘাত মারাত্মক হতে পারে। কারণ বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী আঘাতের সমান শক্তিশালী প্রত্যাঘাতও স্বাভাবিক। কাম্যুও আঘাত করতে চেয়েছিলেন। চিন্তার গোড়ায়। পুরোনো বা প্রাক্তন চিন্তাকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। সেটাও আঘাত। কিন্তু, সে মহত্তর আঘাতের প্রত্যাঘাতও চিন্তার মাধ্যমেই আসবে — এমনটাও মানবগোষ্ঠীর ক্রমবির্তমান ওপর নির্ভর করে বলা যায় না। যাহোক, অস্ত্র প্রতিক্রিয়ায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ আমরা বিবিধ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে দেখতে পেয়েছি। আসলে পার্টি তার নিজের প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতায় হাত সেঁকতে পছন্দ করে, ক্ষমতার রূপ বদলে আগ্রহী হয় না। যদিও তাত্ত্বিকভাবে হওয়া উচিত। কিন্তু, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কাম্যু হয়তো সঠিক ভেবেছিলেন আমূল ও দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনই প্রকৃত বিপ্লবের পথ হতে পারে। কিন্তু, তা পার্টির সাপেক্ষে কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে সেটাও ভাবনার। আবার একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র চিন্তার বিবর্তনকে জায়গা নাও দিতে পারে। তার ওপর আঘাত নামিয়ে আনতেই পারে। মুছে দিতে পারে চিন্তার আমূল। সাঁর্ত্র এই বাস্তবতাকে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিকে অনুভব করতে পেরেছিলেন। এবং হয়তো একারণেই কমিউনিজমের ফলেই শোষিতের ক্রমমুক্তি হবে — অনুভব করে কমিউনিজমের এবং কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে ভেবেছিলেন অস্ত্র বিপ্লবের কথাও। তাছাড়া যখন শাসক উদ্যত ভল্ল, আপনি নিষ্ক্রিয় বা চিন্তার ওপর নির্ভরশীল হলে, অপমৃত্যু স্বাভাবিক।
সাঁর্ত্র – কাম্যুর তর্ক প্রসঙ্গে এটুকুই সাব্যস্ত করা যায় যে, এ তর্ক অনিঃশেষ। কেননা, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতিটি অবস্থানের কৌণিক ও সূক্ষ্ম ফারাক শেষ পর্যন্ত তাকে আত্মবিরোধী করে তোলে, বিদ্রোহী করে তোলে। আবার সমাজ নির্মাণ ছাড়া তার অস্তিত্বের উদবর্তন প্রায় অসম্ভব।
এখন সেই আরেকটি প্রশ্ন ফিরে আসে, দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের সঙ্গে কি তাল মেলানো গেল ? বিপ্লবের পর আরেকটি ‘রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠাই কেবল হল ?
এখন সমস্যাটা তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ বনাম মার্ক্সবাদের স্বাভাবিক বিবর্তন এবং কমিউনিজমের স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তনের মধ্যে বলেই মনে হয়। আর এমন সময় এই দ্বন্দ্বের, বিরোধাত্মক দ্বন্দ্বের কথা আমাদের সম্মুখে বেশি করে আসছে, যখন রাষ্ট্র ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ লিবারেলিজমের হাত থেকে বেরিয়ে এসে ডেটাইজমের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। আর এই ডেটাইজমকে বহন করছে কর্পোরেট ব্যবস্থা। ধীরে ধীরে এ আই শক্তি বাড়াচ্ছে। দুই হাজার পঁচিশে ঘোষণা হয়েছে AI is dead. Now it is the time of synthetic AI—এর মানে এখন এ আই আর মানুষের অতীতকে নকল করবে না, এখন এ আই সমান্তরাল বাস্তবতা, মানুষের সমান্তরাল বাস্তবতা নির্মাণ করতে সক্ষম। তাছাড়া সে নিয়ে নিচ্ছে মানুষের সমস্ত কাজ। নিজেই শ্রমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এবং এ কথা আমাদের গোপনে থাকে না যে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটা শ্রেণির মানুষ চেষ্টা করবেই বৃহত্তর জনসংখ্যা কমাতে। চেষ্টা করবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবলুপ্তি তরান্বিত করতে। আত্মভুক পৃথিবীর ফসল আত্মভুক মানুষ আরও নিরাপত্তার আরও উদবর্তনের তাগিদে নিজের স্ফিতিকেই কমাতে উদযোগী হওয়ায় আমাদের অর্থাৎ মানুষের প্রান্তিক শ্রেণি বিপন্ন। তবে বিপন্নতার মাত্রা আরও দীর্ঘ হয়, যখন আমাদের মনে পড়ে, এ আই এখন স্বয়ংক্রিয়। মানুষের প্রতি কৌতুহলী এ আই এখন নিজের ভাষা তৈরি করে ভাবনা আদনপ্রদান করছে। এই কৌতুহলই আমার ধারণা, এমন একটি শ্রেণির মানুষকে টিঁকিয়ে রাখবে যারা উদ্ভাবনাময়। তাঁদের কাছ থেকে মানব মনস্তত্ত্বের নতুন মাত্রা, রহস্য জানার জন্য এ আই তাঁদের টিকিয়ে রাখবে। বাকি মানুষেরা এ আইয়ের কাছে বাহুল্য মাত্রে পরিণত হবে। আসলে, গোটা সেপিয়েন্স শ্রেণিটাই বিপন্নতার সম্মুখে। যত সময় এগোবে এই বিপন্নতার গভীরতা বাড়বে বলেই ধারণা। এবং এও বিশ্বাস যে একমাত্র হিউম্যানিজমই এক্ষেত্রে মানুষের ঢাল হয়ে উঠতে পারবে। হিউম্যানিজম বলতে সবকটি অঙ্গ সমেত হিউম্যানিজমকেই বোঝাতে চাইছি। এক্ষেত্রে ফিউডালিজম থেকে ডেটাইজম পর্যন্ত প্রত্যেকটি চিন্তা যা মানুষকে কেন্দ্র করে ভাবতে চেয়েছে, চেয়েছিল বা চাইছে— সকলের কাছ থেকে সংগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত বিবর্তিত কমিউনিজমেই আস্থা রাখতে হবে মানুষকে। কার্ল মার্ক্স কি সেখানে একটি নিউক্লিয়্যাটিক ভূমিকা পালন করবেন না ? কার্ল মার্ক্সের মৃত্যু শেষ পর্যন্ত হতে পারছে কৈ! যতই পার্টির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হতে হতে স্মারকে পরিণত হোন না কেন, শেষ পর্যন্ত কার্ল মার্ক্স বিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা রাখেন বলেই অনুমিত হয়। তবে, একথা বলে এই আলোচনায় ইতি টানা যায় বোধহয়,এ সমস্ত চিন্তাই কিন্তু কেবল মানুষের সাপেক্ষে। আমাদের চিন্তাগুলো বৃহত্তর প্রাণের সাপেক্ষে পৃথিবীকে ভাবতে শিখল কোথায় ?

